সুস্মিতা কুণ্ডু
নিংপিং ড্রাগনছানার তো আর মজার শেষ নেই! অ্যাদ্দিন মা বাবা কই, আত্মীয়স্বজন কই, বন্ধু বান্ধব কই, বলে মন খারাপ করত। আর এখন মা বাবাকে তো ফিরে পেয়েইছে, তার সাথে কত্ত নতুন বন্ধু হয়েছে। রাজকন্যে মেই লিং, ফু ফেং কাছিমদাদু, গোল্ডি ম্যাকমাফিন লেপ্রিকন। ওদের সাথে খেলাধুলো করতে করতে কোথা দিয়ে দিন গড়িয়ে যায়। বিকেল হলেই মনটা ছটপট করে ডানাটা সুড়সুড় করে বন্ধুদের কাছে উড়ে যাওয়ার জন্য।
অনেকদিন ফু ফেং দাদুর কাছে গল্প শোনা হয়নি। নিংপিং তাই আজ ঠিক করল নীল সাগরের তীরে যাবে কাছিমদাদুর কাছে। আর মা বলেছে ভালো জিনিস সবার সাথে ভাগ করে নিতে হয় তাই আগে যাবে রেইনবো পাহাড়ে নতুন বন্ধু গোল্ডির কাছে। ওকে পিঠে বসিয়ে উড়িয়ে নিয়ে যাবে রাজকন্যে মেই লিংয়ের রাজপ্রাসাদে। সেখান থেকে মেই লিংকেও সাথী বানিয়ে জমিয়ে গিয়ে বসবে ফু ফেং দাদুর কাছে। সাগর রাজ্যে, গভীর জলের দুনিয়ার গপ্পো শুনতে খুউউব ভালো লাগে নিংপিং এর।
তিনমূর্তি গিয়ে হাজির হ’ল সাগরতীরে। জোরে জোরে ডাকল ফু ফেং দাদুকে। কাছিমবুড়ো আসে না। ওরা ফের ডাকল আরও গলা তুলে, তাও আসে না কাছিমদাদু। এমন সময় জল থেকে মাথা তুলে উঁকি দিল একটা ঘোড়া! ঘোড়া মানে ঘোড়ার মাথা, মেই লিং এর হাতের বুড়ো আঙুলের মত লম্বা হলদেপানা মাথাটা। তাই না দেখে তো ভারী অবাক হ’ল ওরা তিনজনেই। সে ঘোড়া জলের ওপর আরও খানিকটা ভেসে উঠল। কী কাণ্ড! মাথাটা আর গলাটা ঘোড়ার মত হলে কী হবে, বাকিটা অদ্ভুতদর্শন, লম্বা লেজের মত। সবশুদ্ধু মেই লিং এর হাতের চেটোর মধ্যে ধরে যাওয়ার মত চেহারা। জলের মধ্যে সোজা হয়ে সাঁতার কাটছে, মাছেদের ম’ত কাত হয়ে নয়। সেই অদ্ভুত দেখতে ঘোড়া-মাছ মাথা তুলে বলল,
-“তোমরা ফু ফেং দাদুকে খুঁজছ? দাদু তো ক’দিন হ’ল সেই যে ওশিয়ানাকে খুঁজতে বেরিয়েছে, আজও ফেরেনি। আমরা সবাই ভারী দুঃশ্চিন্তায় আছি। সমুদ্রের রাজ্যে মস্ত বিপদ চলছে এখন।”
এই বলে ঘোড়া-মাছ খানিকটা ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করে কাঁদে। চোখের জল মেশে নোনা সমুদ্রের জলে।
মেই লিং বলে উঠল,
-“আহাহা কেঁদোনা বাপু ঘোড়ামাছ! আমাদের দলে দেখেছো তো আছে সুপারহিরো নিংপিং ড্রাগন। তুমি সব খুলে বলো আমাদের। আমরা ঠিক সমাধান করব।”
ঘোড়ামাছ তাই না শুনে আরও জোরে ভেউভেউ করে কেঁদে উঠে বলল,
-“কতবার বলেছি আমায় ঘোড়ামাছ বলে কেউ ডাকবে না! আমার নাম হিপ্পোক্যাম্পাস গুট্টুলাটুস!”
নিংপিং তাকে কোনওক্রমে থামানোর জন্য তড়িঘড়ি বলে উঠল,
-“হ্যাঁ হ্যাঁ তোমায় আমরা ওই হম্পকম্প গোটালাট্টু বলেই ডাকবখ’ন। তুমি আগে বিপদটা কী ঘটেছে সেটা তো বলো।”
ঘোড়ামাছ কিছু একটা রেগেমেগে বলতে গিয়ে থেমে যায়, তারপর বলে,
-“শোনো তবে। আমাদের সমুদ্রের রাজ্যের জলপরীদের রাণী হলেন, সাইরিনা। তাঁর একমাত্র মেয়ে রাজকন্যা ওশিয়ানাকে গত এক সপ্তাহ ধরে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা।
আর তাকে খুঁজতে গিয়ে বুড়ো কাছিম ফু ফেং-ও হারিয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, যারা যারাই ওশিয়ানাকে খুঁজতে যাচ্ছে কেউ আর ফিরছেনা। রাণীমা মহা দুশ্চিন্তায়।”
-“কেউ কোনও খবর দিতে পারছে না?”
-“একটা উড়ো উড়ো খবর মিলেছে বটে কিন্তু সে ভারী ভয়ঙ্কর খবর! ওই লম্বা ঠোঁট কিচিমিচি সাদা পাখিগুলো উড়ে যায় সমুদ্রের ওপর দিয়ে, ওদের মুখ থেকেই ফু ফেং কাছিম শুনেছিল।সেইদিন বিকেলের কথা। ওশিয়ানা তখন ওর সবথেকে প্রিয় পাথরটার আড়ালে বসে ঝিনুকের চিরুনি দিয়ে ওর নীল রঙের চুল আঁচড়াচ্ছিল। তাতে গোলাপী মুক্তো দিয়ে সাজাচ্ছিল। এমন সময় এক বিশাআআল বড় ঈগলপাখি ওশিয়ানার লেজটুকু দেখে ভেবেছে বুঝি ইয়াব্বড় একটা মাছ। খপাৎ করে ওকে ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে উড়ে পড়েছে। বেশ অনেকদূর গিয়ে যখন দেখল মাছ নয় আসলে জলপরী তখন ওশিয়ানাকে একটা নির্জন দ্বীপে ফেলে রেখে চলে গেছে।”
নিংপিং এই অব্দি শুনে বলে ওঠে,
-“তো ওশিয়ানা তো জলপরী! ও সাঁতার কেটে চলে আসছে না কেন?”
হম্পকম্প গোটালাট্টু তাই শুনে ভেংচে বলল,
-“চলে আসচে না ক্যানোওওও! যেন কত সহজ চলে আসাটা। কোন দ্বীপে ফেলেছে তা জানো কি? হাঙরমুখো দ্বীপে। সেই দ্বীপের চারদিকে বালির চেয়ে বেশি হাঙর আছে। জলপরীরাজ্যের কোনও সৈন্যই ঘেঁষতে পারছে না সেই দ্বীপের কাছে, আর ঐ অত্তটুকুনি মেয়ে সে কীকরে সাঁতার কেটে আসবে ওই হাঙরদের মাঝখান দিয়ে শুনি? আমাদের তো আর তোমার মত ডানা নেই যে উড়ে চলে যাব।”
এই শুনেই গোল্ডি ম্যাকমাফিন তুড়ুক তুড়ুক করে নেচে গেয়ে উঠল,
-“ইউরেকা! ইউরেকা! গোল্ডির মাথায় দারুণ একটা বুদ্ধি এসেছে। তোমাদের ডানা নেই তো কী হয়েছে? নিংপিং এর তো আছে। ও উড়ে গিয়ে সেই হাঙরমুখো দ্বীপ থেকে উদ্ধার করে আনবে ওশিয়ানাকে।”
এই শুনে নিংপিংও মাথা উঁচু করে দু’বার জানা ঝাপটে বললো,
-“হ্যাঁ! অবশ্যই! সে আর বলতে! আমি উড়ে গিয়ে ঠিক উদ্ধার করে আনব ওশিয়ানা রাজকন্যেকে।”
মেই লিং বলল,
-“যেতে যেতে পথে ফু ফেং দাদুকেও খুঁজে দেখো নিংপিং।”
নিংপিং সবাইকে হাত নেড়ে টাটা করে উড়তে শুরু করল। নীল সমুদ্রের ওপর দিয়ে ডানা মেলে ভেসে চলল। নীচে মেই লিং, গোল্ডি, হম্পকম্প সবাইকে এই এত্তটুকুনি ক্ষুদে ক্ষুদে পুতুলের মত দেখতে লাগছে। অনেক বড় দায়িত্ব এখন নিংপিং এর ওপর। না জানি কত বিপদে আছে ছোট্ট ওশিয়ানা। যতদূর চোখ যায় শুধু জল আর জল। যেদিকে লাল সূর্যটা ডোবে সেই দিকে লক্ষ্য করে উড়তে লাগল নিংপিং। বন্ধুরা আস্তে আস্তে দৃষ্টির সীমানা থেকে মিলিয়ে গেল। একটু ভয় যে করছেনা নিংপিং এর তা নয় কিন্তু ওশিয়ানার কথা ভেবে মনে সাহস এনে উড়ে চলল। মা বলেছে ভয় সবারই করে, কিন্তু যে ভয়কে জয় করতে পারে সেই প্রকৃত সাহসী।
নিংপিং উড়তে থাকে... উড়তে থাকে। ডানায় হাঁফ ধরে, তবু ওড়া থামায়না। হঠাৎ অনেকটা দূরে চোখে পড়ল খানিকটা ডাঙার আভাস। কালো কালো বড় বড় ডুবো পাথরে ঘেরা একটা দ্বীপ। ওপর থেকে দ্বীপটা দেখতে লাগছে যেন একটা বিশাল বড় হাঙর জলের ওপর শুয়ে আছে। দ্বীপের মাঝখানে একটা পাহাড়। এত দূর থেকেও দেখা যাচ্ছে সেই পাহাড়ের গায়ে একটা বিশাল গুহামুখ। গুহামুখে সারি সারি পাথর এমনভাবে সাজানো যে দেখে মনে হবে যেন একটা বিশালাকায় হাঙর হাঁ করে রয়েছে তার ধারালো দাঁতগুলো বার করে। ওইজন্যই দ্বীপটার নাম হাঙরমুখো বুঝি।
একটু নীচের দিকে নেমে আসে নিংপিং। দ্বীপের তীরের কাছে কালো কালো ত্রিভূজের মত কতকগুলো শক্ত শক্ত জিনিস জলে ঘুরে বেড়াচ্ছে। নিংপিং বুঝলো ওগুলো হাঙরের পিঠের পাখনা। তার মানে হাঙরগুলো তীর বরাবর পাহারা দিচ্ছে যাতে ওশিয়ানা পালাতে না পারে। দ্বীপ থেকে বেশ খানিকটা দূরে একটা বড় ডুবো পাহাড়ের আড়ালে সবুজ রঙের গোলপানা একটা কী যেন নড়াচড়া করছে। ওটাতো ফু ফেং দাদুর পিঠের শক্ত খোলসটা মনে হচ্ছে। এই রে! একবার যদি হাঙরগুলো টের পায় তাহলে তো ফু ফেং কাছিমের দফা শেষ। নিংপিং শাঁআআ করে নেমে এসে এক ছোঁ মেরে তুলে নিল ফু ফেং কে। ফু ফেং ওমনি চেঁচিয়ে উঠল,
-“বাঁচাও বাঁচাও রাক্ষুসে ঈগল ওশিয়ানা কন্যের পর এবার আমাকেও ধরল গো!”
নিংপিং হি হি করে হেসে বলল,
-“আমি গো আমি দাদু! নিংপিং ড্রাগনছানা। আমি ওই হাঙরমুখো দ্বীপ থেকে ওশিয়ানাকে উদ্ধার করতে এসেছি গো। নীচে জলে কত হাঙর ঘুরছে দেখেছো? তোমাকে দেখতে পেলে আর আস্ত রাখবে না। আমি সোজা উড়ে গিয়ে নামব দ্বীপের মাঝখানে একেবারে।”
এই বলে নিংপিং উড়ে গিয়ে নামল হাঙরমুখো দ্বীপের পাহাড়ের মাথায়। এদিক ওদিক চোখ চালিয়ে দেখল কোনও জলাশয়টয় আছে নাকি। ওশিয়ানা তো আর ডাঙ্গায় একটানা থাকতে পারবে না। নিশ্চয়ই কোনও জলের উৎসর কাছে থাকবে। নিংপিং ডাকতে লাগল,
-“ওশিয়ানা! বন্ধু ওশিয়ানা! তুমি কোথায়? সাড়া দাও।”
এমন সময় হাঙরের মুখের মত গুহার ভেতর থেকে একটা সরু মিহি গলা ভেসে এল,
-“আমি এখানেএএএ!”
গলার আওয়াজ শুনে গুহার মুখটায় ঝুঁকে উঁকি মেরে দেখল নিংপিং। গুহার ভেতরে অনেকটা নীচে একটা ছোটো লেগুন মত, নীল জলে ভরা। তাইতে একটা ছোট্ট মেয়ে, তার মাথায় একরাশ নীল চুল। কোমর থেকে বাকিটা মাছের মত, গোলাপী আঁশে ঢাকা। ওশিয়ানা!
নিংপিং তড়িঘড়ি গুহার ভেতর মুখটা ঢুকিয়ে ডাকতে গেল ওশিয়ানাকে, কিন্তু গুহামুখটাতে ওর বড় শরীরটা ঢোকার মত জায়গা নেই। এদিকে এত্তবড় ড্রাগনটা দেখে তো ওশিয়ানা টপাং করে লেগুনের জলে ডুব দিল। ফু ফেং দাদু তখন নিংপিং এর লেজের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে বলে উঠল,
-“ওশিয়ানা কন্যে ভয় পেয়ো না! ও হোলো ড্রাগনছানা নিংপিং। আমাদের সবার বন্ধু। ও এসেছে তোমাকে উদ্ধার করতে।”
ওশিয়ানা তখন ফের জলের ওপর মাথা তুলল ফু ফেং দাদুর গলা পেয়ে। রিনরিনে স্বরে বলল,
-“থ্যাংক ইউ ফু ফেং দাদু, থ্যাংক ইউ বন্ধু নিংপিং। এই লেগুনের জল একটা ছোট্ট সুড়ঙ্গ দিয়ে বাইরের সমুদ্রের সাথে যুক্ত রয়েছে। আমায় যখন ঈগল পাখি এই দ্বীপের তীরে এনে ফেলে দিলো, তখন আমি কোনওমতে বালি পেরিয়ে জলে নেমে সাঁতরে বাড়ি ফিরতে গেছিলাম। কিন্তু দুষ্টু একচোখো হাঙর সর্দার গ্রে নাইফটিথ আমাকে তার দলবল নিয়ে তাড়া করল। আমি কোনওমতে জলের তলার একটা সরু সুড়ঙ্গে ঢুকে পড়লাম। সুড়ঙ্গটা এমন সরু ছিল যে মোটা মোটা হাঙরগুলো ঢুকতে পারল না। সুড়ঙ্গর আরেকটা প্রান্ত এসে শেষ হয়েছে এই লেগুনে। সেই থেকে আমি এখানেই আছি। ক’দিন আগে আমার মায়ের পাঠানো ক’জন জলমানব সৈন্য এখানে আমার খোঁজ করতে করতে চলে আসে। ওদেরও গ্রে নাইফটিথের দল তাড়া করে। আমরা জলপরীরা জলের মধ্যে শব্দতরঙ্গ পাঠিয়ে যোগাযোগ করতে পারি। সেভাবেই ওদেরও ডেকে নিয়ে এই সুড়ঙ্গের পথ দেখাই। ওরাও আমার সাথে এখানে আটকে আছে। সুড়ঙ্গের অপর প্রান্তটায় বদমাইশ গ্রে নাইফটিথ পাহারা বসিয়ে রেখেছে দিনরাত্রি যাতে আমরা পালাতে না পারি।”
এতগুলো কথা বলে ওশিয়ানা হাঁপাতে লাগল। নিংপিং গুহার ভেতরের লেগুনে ভালো করে চেয়ে দেখল আরও কজন জলমানব ভেসে রয়েছে ওশিয়ানার আশেপাশে। এদের সকলকে উদ্ধার করতে হবে। কিন্তু এই গুহার ভেতরে তো নিংপিংও প্রবেশ করতে পারছে না। কী করে তুলে আনবে ওদের? দড়িতে করে তুলে আনা যায় কিন্তু জলপরীরা জলের বাইরে আকাশপথে কি অতটা পথ পাড়ি দিতে পারবে নিংপিং এর পিঠে চেপে? ভাবনায় পড়ল নিংপিং। এমন সময় ফু ফেং বলল,
-“একটা মতলব এসেছে মাথায়! তাইতে দুষ্টু হাঙর সর্দার গ্রে নাইফটিথকেও একটু শিক্ষা দেওয়া হবে। কানটা এদিকে আনো তো নিংপিং, চুপিচুপি বলি!”
ফু ফেং দাদুর কথা মত নিংপিং সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে হেঁকে হেঁকে বলতে লাগল,
-“কোথায় তুমি একচোখো নাইফটিথ। আমি নিংপিং দ্য মাইটি ড্রাগন। আমি মারমেইড রাজকন্যে ওশিয়ানাকে উদ্ধার করতে আর তোমায় উচিত শিক্ষা দিতে এসেছি। সাহস থাকলে সামনে এসো।”
কয়েকবার এমনি করে হাঁক দিতে একটা বিশাল বড় ধূসর রঙের একটা হাঙর তার দলবল নিয়ে জলের ওপর ভেসে উঠল। তার একটা চোখে পট্টি, দু’পাটি দাঁতের সারি ঝিকঝিক করছে। দাঁতগুলো ছুরির মত তীক্ষ্ণ। পাখনার মতো হাতে ধরা একটা জলদস্যুদের তরোয়াল। সে ড্রাগন নিংপিংকে দেখে একটু ঘাবড়ালেও জোর গলায় বলল,
-“ওশিয়ানা আমার বন্দী! আমি ছাড়ব না ওকে!”
নিংপিং তখন বলল,
-“আবার বলছি ভালোয় ভালোয় যেতে দাও ওদের সকলকে নিজেদের রাজ্যে! নইলে ভালো হবেনা কিন্তু বলে দিলাম।”
এই শুনে নাইফটিথ আর তার সঙ্গীসাথীরা হা হা করে অট্টহাস্য করে উঠল।
নিংপিং তখন ফু ফেং দাদুর বুদ্ধিমতো আকাশে উড়ে নাইফটিথের দলের চারদিকে জলটা মুখের আগুন ছুঁড়ে উত্তপ্ত করে দিল। জলটা গরম হয়ে প্রায় টগবগ করে ফুটতে লাগল। সেই ফুটন্ত জলের বেষ্টনীর ভেতর নাইফটিথ আর তার দলবল আটকা পড়ল। ভেতরের জলটা গরম হতে লাগল ধীরে ধীরে। হাঙররা তো ‘উঃ! আঃ! কী গরম!’ করে চিৎকার করতে লাগল।
হাঙর সর্দার তার হাতের তরোয়ালটা নিংপিংকে লক্ষ্য করে ছুঁড়ল। কিন্তু ড্রাগনদের শরীর তো লোহার মত শক্ত আঁশে মোড়া থাকে, ঠিক বর্মের মত। নিংপিং এর লেজে লেগে ‘ঠং’ করে শব্দ তুলে তরোয়ালটা জলে পড়ে গেল।
নিংপিং আরেকটু আগুন ছুঁড়ে জলটা আরও গরম করল। ফের বলল,
-“এবার সুড়ঙ্গমুখ থেকে তোমার পাহারাদারদের সরাবে নাকি আরও জল গরম করব?”
নিংপিং এর হাতে এরকম জব্দ হয়ে আর পথ না পেয়ে নাইফটিথ অবশেষ বলল,
-“ঠিক আছে ঠিক আছে! তুমিই জিতলে। আমি পাহারাদারদের সরিয়ে নিচ্ছি।”
হাঙররা সরে যেতে ওশিয়ানা আর বাকি জলমানব সৈন্যরা সব সাঁতরে বেরিয়ে এল লেগুন থেকে। ফু ফেং দাদুর পেছন পেছন সাঁতরে তারা চলল নিজেদের রাজ্যের দিকে। নিংপিং তখন নাইফটিথকে বলল,
-“খবর্দার! ওদের যদি তাড়া করো তাহলে তোমাকে ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে গিয়ে ওই গুহার ভেতরের লেগুনে ফেলে দেব। বাইরে বেরোতে পারবে না সরু সুড়ঙ্গ দিয়ে, ওখানেই বন্দী থাকবে। খোলা সমুদ্রে সাঁতার কাটতে পারবে না। লাল সূর্য কেমন লাফিয়ে ওঠে নীল জল থেকে, আবার টপাং করে ডুবে যায়, দেখতে পাবেনা। চাঁদের সাদা আলোয় রাতের কালো জল কেমন ঝিকমিক করে দেখতে পাবে না। তখন বুঝবে বন্দী থাকতে কেমন লাগে। মিলেমিশে যদি না থাকতে শেখো তাহলে কষ্ট তো পেতেই হবে!”
সেই শুনে নাইফটিথ আর তার সাঙ্গোপাঙ্গোরা পাখনা দিয়ে নাক মুলে বলল,
-“আর আমরা কক্ষণও এমনটি করবনা নিংপিং। আমাদের মাফ করে দাও। আমরা বন্ধু হয়েই থাকব।”
নিংপিং তখন জোরে ফুঁ দিয়ে গরম ফুটন্ত জলকে ঠাণ্ডা করে দিয়ে মুক্তি দিল সব হাঙরদের।
হাঙর সর্দার একচোখো গ্রে নাইফটিথ বলল,
-“আজ থেকে আমরা বন্ধু হলাম। বিদায় নিংপিং ড্রাগনছানা। ওশিয়ানা জলপরীকে আমাদের সকলের তরফ থেকে ‘সরি’ বলে দিও আর এই উপহারটা সাহসী ওশিয়ানা কন্যেকে দিও।”
এই বলে নিজের তরোয়ালটা নিংপিংকে দিল নাইফটিথ।
নিংপিংও সবাইকে টাটা করে রওয়ানা দিল কাছিমদাদু আর জলপরীদের পিছু পিছু। ওরা চলল জলে সাঁতরে, নিংপিং চলল আকাশে উড়ে। সেই সমুদ্রতটে যেখানে ওদের অপেক্ষায় আছে মেই লিং রাজকন্যে, গোল্ডি ম্যাকমাফিন লেপ্রিকন, ওশিয়ানার মা রাণী সাইরিনা আর নতুন বন্ধু ছটপটে ঘোড়ামাছ হম্পকম্প গোটালাট্টু।
(সমাপ্ত)
ছবি: আমি :)
নিংপিং এর প্রথম গল্প:
নিংপিং এর দ্বিতীয় গল্প:

No comments:
Post a Comment