গল্প : দুই যে ছিল দেশ



দুই যে ছিল দেশ
সুস্মিতা কুণ্ডু

আজ একটা অন্যরকম দেশের গল্প শোনাই এসো। একটা নয়, একসাথে দু’দুটো দেশের গল্প। এক ছিলো সূর্যের দেশ আর এক ছিলো চাঁদের দেশ। এক দেশ অষ্টপ্রহর সূর্যের আলোয় উজ্জ্বল সোনালী। অন্য দেশটা চাঁদের স্নিগ্ধ আলোয় মায়াবী রুপোলী। একটা সময় ছিলো যখন এই দুই দেশের রাজা-রাণী-প্রজা সকলের মধ্যে খুব বন্ধুত্ব ছিলো। আলোর দেশের লোকেরা বেড়াতে আসতো চাঁদনী দেশে আর চাঁদের দেশের লোকেরা যেতো রোদ্দুরমাখা দেশে। 

সবই ঠিক চলছিল কিন্তু হঠাৎই ঘটল বিপদ। একটা অতি তুচ্ছ কারণে বিবাদ শুরু হল দুই দেশের মধ্যে। এ দেশের লোকেরা ও দেশের লোকেদের বলে,
-“কী বিশ্রী তোমাদের দেশ! সারাদিন শুধু ফটফটে আলো। চারদিক তেতেপুড়ে গরম।”
অন্য দেশের লোকেরাও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়, তারাও বলল,
-“তোমরা অন্ধকারের লোক সব, আলোর মর্ম কী বুঝবে? ওই তো কালো ঘুটঘুটে দেশে বাস করো!”
কথায় কথা বাড়ে, ঝগড়া বাড়ে, অশান্তি বাড়ে। দুই দেশের বাসিন্দাদের মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়ে গেলো। আর সেই যে কথা বন্ধ হ’ল, যুগের পর যুগ আর কোনও সম্পর্কই রইলনা দুই দেশের। শুধু তাই নয়, দুই রাজা লম্বা পাঁচিল তুলে দিলো দুই দেশের সীমানা বরাবর। এত উঁচু পাঁচিল যে সেটা ডিঙ্গোনোর সাধ্য কারও নেই। দুই দেশের সীমানায় ছিল একটা বিশাল লম্বা প্রাচীন গাছ, ইয়া মোটা তার গুঁড়ি, ঝামড়ি ঝুমড়ি পাতায় ভরা। সেই গাছটা কাটতে দুই রাজার কারোরই মন চাইলনা। তাই দু’দিকের পাঁচিল এসে শেষ হ’ল বুড়ো গাছের দুই দিকে। রাজামশাইরা নির্দেশ দিলেন কেউ যেন ওই গাছে বেয়ে ওইপারে না যায়। যে যাবে তাকে কারাগারে বন্দী করা হবে। 

ধীরে ধীরে দিন যায়, রাত যায়, সপ্তাহ যায়, মাস যায়, বছর যায়, যুগ পেরিয়ে যায়। রাজার ছেলে রাজা হয়, তার ছেলে রাজা হয়। সূর্যের দেশের লোকেরা ভুলেই যায় যে চাঁদের দেশ বলেও কোনও দেশ ছিল। তারা শুধু জানে পাঁচিলের ও’পারে, বুড়ো বটগাছের ও’পারে যেতে নেই, ও’পারে বিপদ আছে। একই কাণ্ড চাঁদের দেশেও। ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরাও জানে যে পাঁচিলের ও’পারে যাওয়া নিষেধ, কিন্তু কেন সেটা আর কেউ জানেনা, ভাবেনা। 

অনেকগুলো বছর পর একদিন হঠাৎ সূর্যের দেশের একটা মিষ্টি মেয়ে, তার তিনকূলে কেউ নেই, তাকে বারণ করার কেউ নেই, খেলতে খেলতে ঘুরতে ঘুরতে হাজির হ’ল সেই উঁচু পাঁচিলের ধারে। দেখে লম্বা লম্বা ঝুরি নেমেছে পাঁচিলের সেই বুড়ো বটগাছ থেকে। সে মেয়ে ভারী মজা পায়, বলে,
-“বাহ্ রে বাহ্! এই গাছের ঝুরিতে আমি দোলনা টাঙিয়ে দুলব।”
যেমনি ভাবা তেমনি কাজ। গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে দোলনায় দোলে সে মেয়ে। সূর্য দেখে, আকাশ দেখে, পাখিদের সারি দিয়ে উড়ে যাওয়া দেখে। 

এমনই মজার কাণ্ড, চাঁদের দেশের এক ছেলে, তারও কোত্থাও কেউ নেই, মা বাপ আত্মীয় স্বজন কেউ না, সেও ঘুরতে ঘুরতে এসে হাজির হ’ল পাঁচিলের অন্য দিকে। ঝুরিওয়ালা বটগাছ দেখামাত্র আনন্দে লাফাতে লাফাতে, দোলনা বানিয়ে দোল খেতে শুরু করল। সে ছেলে চাঁদ দেখে, আকাশের ঝিকিমিকি তারা দেখে, টিমটিম জোনাকি দেখে।

রোজ তারা আসে সেই গাছে দোল খেতে, খেলা করতে। ছেলেটা রোজ শুনতে পায় ওইপার থেকে মিষ্টি সুরে গুনগুন করে ভেসে আসা গান। মনে মনে ভাবে,
-“সবাই যে তবে বলে ওইপারে বিপদ আছে। তাহলে এমন সুন্দর মিঠে গান কে গায়?”
বড্ড কৌতূহল হয় তার। একদিন আর থাকতে না পেরে ছেলেটা বুড়ো বটগাছ বেয়ে উঠে ওপারে যায়। চাঁদের মায়াবী আলোয় থাকা অভ্যাস তার, ওইপারে যাওয়ামাত্রই সূর্যের উজ্জ্বল আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যায়। ধীরে ধীরে আলো সয়ে এলে দেখে, ঠিক তারই মত একটা ছোট্ট মেয়ে বটগাছের ঝুরিতে দোলনা বেঁধে দোল খাচ্ছে আর গান গাইছে। ছেলেটার চোখে চোখ পড়তেই মেয়েটা গান থামিয়ে অবাক চোখে চেয়ে রইল। 

একটু ভয়টা কাটতে দু’জনে সেই যে বকবক করা শুরু করল, সে আর থামেনা। দু’জনই নিজের দেশের কথা অন্যজনকে শোনায়, অন্যজনের দেশের কথা অবাক হয়ে শোনে। মেয়েটার খুব ইচ্ছে করে চাঁদের দেশ দেখতে। একদিন ছেলেটার হাত ধরে গাছ বেয়ে ওপারে গিয়ে দেখে সেই দেশ। ঝকমকে আলোয় থাকতে অভ্যস্ত সে মেয়ের চাঁদের নরম সাদা আলোয় চোখ জুড়িয়ে যায়। মিটিমিটি তারাগুলোকে মুঠোয় ভরে নিতে মন চায়। 

এরপর থেকে মাঝেমধ্যেই ছেলেটা আসে সূর্যের দেশে আর মেয়েটাও যায় চাঁদের দেশে, কিন্তু লুকিয়ে লুকিয়ে। রাজামশাইরা জানতে পারলে যে কারাগারে বন্দী করবেন! কিন্তু এভাবে কী আর মন ভরে? তখন, দুই দোস্ত মিলে একটা মতলব ভাঁজল। চাঁদের দেশের ছেলে একটা ঝুড়িতে করে একরাশ সাদা সুগন্ধী রজনীগন্ধা ফুল, ফুটোওয়ালা ঢাকনা চাপা কাঁচের বয়ামে ভরে জোনাকি এনে দিলো। সেই সাথে দিলো তার নিজের হাতে আঁকা একফালি চাঁদ আর ঝিকিমিকি তারায় ভরা নীলচে কালো আকাশের একটা ছবি। সূর্যের দেশের মেয়েও ঝুড়িতে করে আনল হলুদবরণ সূর্যমুখী ফুল, লাল গোলাপ, পাকা আম, রসালো জাম, গন্ধে ম ম কাঁঠাল। দু’জনে ঝুড়িদু’টো অদলবদল করে নিয়ে গেল যে যার দেশের রাজার কাছে। 

তারা কিনা ছোটো ছোটো ছেলেমেয়ে তাই রাজপ্রাসাদের প্রহরীরা কেউ আটকালোনা তাদের। ভাবলো ছেলেমানুষ, রাজপ্রাসাদের জাঁকজমক দেখতে এসেছে বুঝি। সূর্যের দেশের মেয়ে সটান হাজির হল রাজদরবারে রাজা প্রতাপকিরণের সামনে। রাজা অবাক হয়ে বললেন,
-“কে তুমি? কী চাই তোমার?”
সে মেয়ে কোনও কথা না বলে শুধু ঝুড়িটা এগিয়ে দিল। সাদা ফুলের সুগন্ধে ভরে উঠল চারিদিক। রাজা আর সভাসদরা ঝুঁকে পড়ে দেখল সে ফুল। সূর্যের দেশের সব ফুল রঙিন কিনা, এমন সাদা স্নিগ্ধ ফুল দেখে তারা তো অবাক। কাঁচের বয়ামে রাখা জোনাকি দেখে তারা তো ভেবেই বসলো, সূর্যের গা থেকে বুঝি আলোর বিন্দু খসে পড়ে অমন টিমটিম করে জ্বলছে। তাদের দেশে তো রাতই হয়না, তাই জোনাকি দেখবে কেত্থেকে। রাজামশাই বিস্ময়ভরে জিজ্ঞাসা করলেন,
-“এ সব জিনিস তুমি কোথায় পেলে মা?”
মেয়েটা তখন তার দোস্তের আঁকা ছবিটা সামনে মেলে ধরে বললে,
-“এই যে, এই দেশে রাজামশাই।”
রাজা বললেন,
-“এমন সুন্দর স্নিগ্ধ মায়াবী দেশ আমি তো আগে কখনও দেখিনি। কোথায় এই দেশ? কীকরে যায় এই দেশে? আমায় পথ বলে দাও। আমিও যেতে চাই ওখানে।”
সে মেয়ে খিলখিলিয়ে হেসে বলল,
-“সে দেশ তো আমাদের দেশের পাশেই গো রাজামশাই। ওই উঁচু পাঁচিলের ওইপারে, বুড়ো বটগাছের ওইধারে।”
সভাশুদ্ধু লোক তো আঁতকে উঠলো! পাঁচিলের ওইপারে? বলে কী পুঁচকে মেয়েটা। সেই কোন পূর্বপুরুষদের আমল থেকে সবাই শুনে আসছে পাঁচিলের ওইপারে যাওয়া মানা, ওদিকে নাকি বিপদ আছে। অথচ এ বলে নাকি সেই দেশ এমন সুন্দর!

ওদিকে পাঁচিলের ওইপারের দেশেও একইরকম ঘটনা ঘটছে। চাঁদের দেশের ছেলেটা যেই না রাজা চন্দ্রভানুর কাছে ঝুড়ি খুলে সূর্যমুখীফুল, গোলাপফুল দেখিয়েছে, সবাই তো অবাক। সাদা ছাড়া এমন রঙিন ফুলও হয় বুঝি? আর ফলের ঝাঁপি খুলতে তো আর কথাই নেই। এমন সুস্বাদু আম জাম কাঁঠাল ওরা আগে কেউ কক্ষণও খায়নি। সবাই কনুই অব্দি রস চেটে ফল খেলো। চন্দ্রভানু বললেন,
-“হ্যাঁ রে ছেলে এমন রঙিন ফুল, এমন সুস্বাদু ফল তুই পেলি কোত্থেকে শুনি?”
সে ছেলে বলল,
-“কেন? পাঁচিলের ওপারে, ওই আলো ঝলমল দেশে।”
সবার তো মুখ হাঁ!
-“বলিস কী রে? ওইপারে তো সব আগুন উগরানো জন্তুদের বাস বলেই জানি! ওখানে এসব হয় নাকি?”
ছেলে ঠোঁট উল্টে বললো,
-“আগুন উগরানো না ছাই! আমার মত ছোটো ছেলে সেই দেশে গেলাম কীকরে তবে শুনি? একটু গরম দেশ বটে, আমাদের দেশের মতন এমন ঠাণ্ডা শীতল নয়। কিন্তু সে দেশেও ঢের ঢের মজা।”
সবাই তো এ ওর মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। তবে কি যুগ যুগ ধরে যা শুনে এসেছে ওরা সব ভুল, মিথ্যে? পাঁচিলের ওইপারে, বুড়ো বটগাছের ওধারে সত্যিই এক সুন্দর দেশ আছে? 

চাঁদের দেশের রাজা চন্দ্রভানুর মত একই প্রশ্ন সূর্যের দেশের রাজা প্রতাপকিরণ আর দুই দেশের বাকি সকলের মনেও। কিন্তু জানার উপায় কী? 
এগিয়ে এল সেই মেয়েটা আর ছেলেটা। যে যার দেশের রাজাদের নিয়ে এল পাঁচিলের কাছে দোলনাঝোলানো বুড়ো বটের সামনে। তারপর তরতরিয়ে দু’জন গাছের টঙে উঠে বসে খিলখিলিয়ে হেসে বলল,
-“কই গো রাজামশাইরা! সবাই হাজির। এবার একটু হেঁকে কথা বলে সব বিবাদ মিটিয়ে নাও দিকিনি।”
এই শুনে রাজা প্রতাপকিরণ গলাখাঁকারি দিয়ে শুরু করলেন,
-“অ্যাহেম অ্যাহেম! ওইপারের রাজামশাই শুনছেন? আমি সূর্যের দেশের রাজা প্রতাপকিরণ। আপনার দেশের ছবি দেখলুম। ভারী সুন্দর দেশ আপনার।”
ওদিক থেকে রাজা চন্দ্রভানু গদগদ হয়ে বললেন,
-“আমি চন্দ্রভানু, চাঁদের দেশের রাজা। আপনার দেশের ফুল দেখলে চক্ষু জুড়িয়ে যায়। আর ফল! সে তো অমৃত একেবারে।”

দুই রাজা একে অন্যের দেশের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে বকবর করে চললেন। এদিকে প্রজাদের কি আর তর সয়? তারা শাবল গাঁইতি এনে ঠকাঠক করে পাঁচিল ভাঙতে লেগে পড়ল। দেখতে দেখতে পাঁচিল ধুলোয় মিশে গেল। চাঁদের দেশ আর সূর্যের দেশের লোক একসাথে আনন্দে হইহই করে উঠল। কারোর মনেই নেই যে আদৌ কী কারণে দুই দেশের মাঝে বিভেদ জেগেছিল, কেন পাঁচিল উঠেছিল। কী-ই বা হ’বে ওসব তুচ্ছ জিনিস মনে করে! এখন বরং কত কী জানার আছে, দেখার আছে, শোনার আছে, একে অপরের দেশ সম্পর্কে। উৎসবের মরশুম নেমে এল দুই দেশে। 

আর সবচেয়ে খুশি হ’ল কারা জানো? সেই মেয়েটা আর ছেলেটা। ওরা এখন রোজ বিকেলে বুড়ো বটের ঝুরির দোলনায় নিশ্চিন্তে দোলে, গান গায় আর বকবক করে। 
যাহ্ ওদের নামগুলোই তো বলা হয়নি তোমাদের! থাক, আমি আর বলবো কেন? এখন তো সবার মুখে মুখে ওদেরই নাম। তোমরা নিজেরাই বরং চাঁদ-সূর্যের দেশে বেড়াতে গিয়ে শুনে নিও’খন। 

(সমাপ্ত)

No comments:

Post a Comment