সুস্মিতা কুণ্ডু
এক পাহাড়ের মাথায় থাকত একটা ড্রাগনের ছানা। ডিম ফুটে বেরনোর পর থেকেই সে তার মা বাবা দাদা দিদি মামা কাকু দিদা দাদু ঠাকুমা পিসি কাউকে দেখেনি। এমনকি ওর মত দেখতে আর একটাও প্রাণীকে এতদিনেও দেখেনি। সবাই-ই খুব ছোটো ছোটো আকারে আয়তনে। ওর সাথে কথা বলার খেলাধুলো করার কোনও সঙ্গী নেই। এমনকি ওকে নাম ধরে একটিবার ডাকারও কেউ নেই। ড্রাগনছানার যেহেতু মা বাবা নেই তাই নিজেই নিজের নাম রেখেছে নিংপিং।
নিংপিং সারা দিন আকাশে উড়ে বেড়ায়, এটা ওটা খুঁটে খায়। নিংপিংয়ের মুখে দুই সারি ধারালো দাঁত থাকলে কী হবে, ও কিন্তু মাছ মাংস খায়না মোট্টে। ওর সবচেয়ে প্রিয় ফল হল স্ট্রবেরি আর চেরি। লাল টুকটুকে ফলগুলো খেতে ওর খুব ভালো লাগে। কখনও কখনও লাল টমেটো লাল বেল পেপার ক্ষেত থেকে তুলে কাঠিতে গেঁথে পুড়িয়ে বার্বিকিউ করেও খায়। ও হো আমি বলতেই ভুলে গেছি নিংপিং মুখ দিয়ে আগুন ছুঁড়তে পারে। তাই বলে আগুন দিয়ে ও কক্ষণও কারুর ক্ষতি করে না। মাঝেসাঝে পাহাড়ের মাথায় খুব বরফ পড়লে, গুহার মধ্যে ঢুকে শুকনো পাতা গাছের ডাল সব জমা করে আগুন জ্বালে আর কখনও বা আগুনে সব্জি পুড়িয়ে খায়।
নিংপিং যতই নিরীহ হোক না কেন অত বড় আগুন ছোঁড়া সবুজ ড্রাগনকে সব পশু পাখিই ভয় পায় আর দূরে দূরে থাকে। একদিন তাই নিংপিং মনে মনে ঠিক করল ওর সব আত্মীয় স্বজনদের খুঁজতে বেরোবে। পুঁটুলিতে চাট্টি খাবারদাবার বেঁধে নিয়ে, নিজের গুহাটার মুখে একটা পাথর চাপা দিয়ে, বেরিয়ে পড়ল নিংপিং।
নিংপিং এ দেশ যায় ও দেশ যায়, একে শুধোয় ওকে শুধোয়, কেউ বলতে পারে না। ওড়ে ওড়ে, ডানায় হাঁপ ধরে, নিংপিং পৌঁছয় এক নীল সাগরের ধারে। ঢক ঢক করে খানিকটা নোনা জল খেয়ে জিরোতে বসে। এমন সময় সমুদ্রের জল থেকে উঠে আসে একটা মস্ত বড় বুড়ো কাছিম। এত বয়স যখন তখন এ নিশ্চয়ই জানবে ড্রাগনদের খবর। নিংপিং হেঁকে শুধোয়,
“কাছিমদাদু ও কাছিমদাদু, আমি সবুজ ড্রাগন নিংপিং। তুমি তো অনেক জানো অনেক শোনো। আমার মত বাকি সব ড্রাগনরা কোথায় গেল বলতে পারো? আমি তাদের খুঁজতে বেরিয়েছি।”
কাছিম তো এতো বড় ড্রাগন দেখে ভয়েই খোলের ভেতর ঢুকে পড়ল। সেখান থেকেই চেঁচিয়ে বলল,
-“জানি বৈকী! ওই পূবদেশের রাণী মেই লিং বন্দী করে রেখেছে সব ড্রাগনদের। ড্রাগনদের মুখের আগুন দিয়ে লোহা গলালে সে লোহা নাকি সোনা হয়ে যায়। ঐ সোনার লোভেই তো রাণী আর রাণীর অনুচর শয়তান জাদুকর হুয়াং সুও মিলে একটা জাদুর খাঁচায় ভরে রেখেছে সব ড্রাগনদের। যতই গায়ে শক্তি থাকুক ড্রাগনদের, যতই আগুন উগরোক সেই জাদুর বন্দীশালার গরাদের কিচ্ছুটি হবে না।”
এসব শুনে তো নিংপিং এর ভারী দুঃখ হল। বলল,
-“এত সোনা নিয়ে কী করবে রাণী মেই লিং?”
কাছিম ফের তার খোলসের ভেতর থেকে বলল,
-“কী আবার করবে? রাণী গয়না গড়িয়ে অঙ্গে পরে সোনার সিংহাসনে বসে থাকে। তুমি দেখছি মহাবুদ্ধু নিংপিং। তুমি কীকরে জাদুকরের হাত থেকে উদ্ধার করবে তোমার আত্মীয় স্বজনদের? তার আগেই হুয়াং সুও তোমায় ধরে দেবে ঐ জাদুখাঁচায় ভরে।”
নিং পিং পড়ল ভারী চিন্তায়। জন্ম থেকেই পাহাড়ের মাথায় বাস করেছে সে। এত দুনিয়াদারী সম্পর্কে সে জানেটা কী? এখন তাহলে উপায়?
-“ও কাছিমদাদু! তোমার এত বয়স, এত কিছু দেখেছো সারা জীবন ধরে, তুমিই একটা উপায় বাতলাও না। কী করে উদ্ধার করব আমি ড্রাগনদের।”
কাছিম চেঁচিয়ে বলে,
-“হ্যাঁ আমি তোমায় সব বলি আর তোমরা সব ড্রাগনরা ছাড়া পেয়ে তারপর আমাদের আগুনে ঝলসে টপাটপ খেয়ে নাও আর কী!”
এই শুনে তো নিংপিং কানে আঙুলচাপা দেয়, মান ওই ডানাচাপা দেয় আর কী।
-“ছি ছি কাছিমদাদু এসব কী বলছো? আমি মোটেও অমন নৃশংস নই। আমি তো আগুনে আলু টমেটো সব্জি এসব ঝলসে খাই, প্রাণীহত্যা করিনে।”
-“আর তোমার সাঙ্গোপাঙ্গোরা?”
-“আমি তো তাদের কক্ষণও দেখিইনি দাদু। জানিনা তারা কী খায়। তবে আমি তোমায় কথা দিলুম তারা তোমার কোনও ক্ষতি করবেনা।”
নিংপিং এর কথা শুনে কাছিমের মনে একটু ভরসা জাগল। গুটিগুটি খোলস থেকে বেরিয়ে এল। এসে দেখে নিংপিং ভারী মিষ্টি একটা ড্রাগনছানা। জঙ্গলের মত ঘোর সবুজ তার গায়ের রঙ, পিঠে দুটো সবুজ সবুজ পাখনা। পিঠের মাঝ বরাবর লালে আর হলুদে নকশা করা আঁশ, বাকি শরীরে সবুজ আঁশ। লম্বা লেজের ডগায় একটা তিনকোনা লাল হলুদ তীক্ষ্ন ফলার মত। সব মিলিয়ে ভয় পাওয়ার মত চেহারা হ’লে কী হবে, মুখটা একবারে ছেলেমানুষের মত। একগাল সরল হাসি আর রাজ্যের কৌতুহলে ভরা বড় বড় গোল্লা গোল্লা চোখ। একে আবার নাকি ভয় পায় কেউ! কাছিমবুড়ো ফিক করে হেসে ফেলল নিজের মনে।
-“শোনো বাছা! আমি হ’লুম ফু ফেং কাছিম।তোমায় একটা বুদ্ধি দিই। রাণী মেই লিং বরাবর এইরকম ছিলনা। সে যখন ছোট্ট মেয়েটি ছিল, তখন দুই বিনুনী বেঁধে টাট্টু ঘোড়ায় চেপে বাবা মায়ের সাথে আসত এই সাগরতীরে। ওই দূরে যে পাহাড় দেখছ ওর চূড়ায় ফুটত বেগুনী লান হুয়া ফুল। মেই লিং এর খুব পছন্দের। বনের পাখিরা সেই ফুল তুলে এনে দিত আর মেই লিং এর মা সেই ফুলের মুকুট, মালা, বাজুবন্ধ বানিয়ে পরিয়ে দিত মেয়েকে। ডানাবিহীন ছোট্ট পরীর মত লাগত মেই লিংকে। আমরা জল থেকে গলা বাড়িয়ে দেখতাম সব। কিন্তু কালে কালে কী যে হ’ল! ওই শয়তান জাদুকর হুয়াং সুও এসে রাজা-রাণীকে মানে মেই লিং এর বাবা মাকে বশ করে বন্দী করল। তারপর আর তাদের কেউ দেখেনি। মেই লিং হ’ল নতুন রাণী। কিন্তু সে রাজ্য চালায় হুয়াং সুও-র পরামর্শ মত।”
এই অব্দি বলে একটু দম নিয়ে ফের বলে চলে ফু ফেং কাছিম,
-“তুমি যদি পাহাড়ের মাথা থেকে বেগুনী লান হুয়া ফুল এনে মুকুট বানিয়ে মেই লিংকে উপহার দাও তবে হয়ত তার পুরনো কথা মনে পড়তে পারে। তখন খুশি হয়ে বন্দী ড্রাগনদের মুক্ত করে দিতে পারে। তোমার মত ড্রাগন ছাড়া আর কারোর তো মেই লিং এর প্রাসাদে ঢোকার ক্ষমতা হবে না!”
ফু ফেং এর বুদ্ধি মনে ধরে নিংপিংয়ের। এমনিতেও ও মারামারি করতে মোট্টে ভালোবাসেনা। ফুল দিয়ে যদি রাণীর মন জয় করতে পারে তাহলে তো সেটাই সবচে’ ভালো। অতএব যেমনি ভাবা তেমনি কাজ। নিংপিং পাহাড়চূড়া থেকে বেগুনী লান হুয়া ফুল এনে গয়না বানিয়ে সোজা গিয়ে হাজির হল মেই লিং এর দরবারে। কেউ আটকাতে পারল না ওকে। সবাই ‘ড্রাগন এসেছে পালাওও ভাগোও’ বলে ছুটোছুটি শুরু করে দিল। শুধু মেই লিং বসে রইল সিংহাসনে আর তার পাশে দাঁড়িয়ে রইল হুয়াং সুও। মেই লিং যেমন সুন্দরী, হুয়াং সুও তেমনই ইয়া বড়সড় চেহারার। হাতে লম্বা লম্বা নখ। কালো লম্বা চুলটাকে মাথার ওপর ঝুঁটি করে প্যাঁচানো। সরু সরু চোখগুলো দেখলেই মনে হবে বদবুদ্ধি ভর্তি মাথায়। হাতে একটা বিটকেল বাঁকা সাপের ফনার মত লাঠি। দুজনেরই গায়ে প্রচুর সোনার অলংকার। সারা দরবার সোনায় মোড়া। মেই লিং রেগে বলে উঠল,
-“সব ড্রাগন তো বন্দী খাঁচায়। এটা কোত্থেকে এল?”
হুয়াং সুও বলে উঠল,
-“এটাকেও ওর আত্মীয়দের কাছে পাঠানোর বন্দোবস্ত করছি দাঁড়াও।”
এই বলে ওর জাদুর লাঠি থেকে সাঁই করে নীল আগুনে রশ্মি ছুড়ল। এটা যার গায়ে লাগবে সে ওমনি হুয়াং সুওর বশ হয়ে যাবে। নিংপিং ঝটাপট ঝটাপট ডানা নেড়ে রশ্মির সামনে থেকে নিজেকে সরিয়ে নিল। চিৎকার করে বলল,
-“রাণী মেই লিং আমি কোনও ক্ষতি করতে আসিনি, আমি একটা উপহার এনেছি তোমার জন্য।”
এই বলে নিংপিং করল কী, ফুলের গয়নাগুলো মেই লিং এর কোলে ফেলে দিল। ফুলগুলো দেখে মেই লিং এর এক এক করে ছোটোবেলার কথা মনে পড়তে লাগল, মা বাবার কথা মনে পড়তে লাগল। আসলে তো মেই লিং খুব ভালো মেয়ে। শয়তান হুয়াং সুও তার জাদু দিয়ে মেই লিং এর বাবা মা আর সব শুভাকাঙ্খীদের বন্দী করে রেখেছে। ড্রাগনদেরও সোনার লোভে আটকে রেখেছে। হুয়াং সুও যেই বুঝতে পারল ওর জাদুর প্রভাব আস্তে আস্তে কেটে যাচ্ছে ওমনি সাপের ফনার মত লাঠিটা তুলে এবার লাল আগুনে রশ্মি ছুঁড়ল নিংপিংয়ের দিকে। এই রশ্মি যার গায়ে পড়বে সে একদম পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। কিন্তু এবারেও নিংপিং নিজেকে বাঁচিয়ে নিল হুয়াং সুওর আঘাত থেকে। হুয়াং সুও বুঝল নিংপিংকে এত সহজে হারাতে পারবে না। এদিকে মেই লিংয়ের সব আগের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। হুয়াং সুওর জাদুর প্রভাব থেকে ও মুক্ত হয়ে যাচ্ছে। তখন বদমাশ হুয়াং সুও সাপের ফনা লাঠি তুলে মেই লিংকে আঘাত করতে গেল।
নিংপিং এবার আর থাকতে না পেরে মুখ থেকে ভুসসস করে আগুন ছুঁড়ে দিল। সেই আগুন ছুটে গিয়ে দিল ওই শয়তানি লাঠিটাকে পুড়িয়ে। আর হুয়াং সুও দুম করে আছাড় খেয়ে পড়ল তিন হাত দূরে মাটিতে।
লাঠি নষ্ট হয়ে যেতেই ব্যস শয়তান হুয়াং সুওর সব কালোজাদুর খেল খতম হয়ে গেল। মেই লিং এর সঅঅব মনে পড়ে গেল। মেই লিং এর বাবা মাকে অন্ধকূপে বন্দী করে রেখেছিল হুয়াং সুও, তাদের উদ্ধার করতে লোক পাঠালো সঙ্গে সঙ্গে। আর বদমাশ হুয়াং সুওর হাত পা বেঁধে ওই কারাগারেই নিক্ষেপ করতে আদেশ দিল। ওদিকে ড্রাগনদের খাঁচা কালোজাদুর প্রভাবমুক্ত হতেই ড্রাগনরাও সবাই খাঁচা ভেঙ্গে বেরিয়ে এল। তাদের দলে নিংপিং এর মা বাবাও ছিল।
নিংপিং যখন ছোট্ট ডিমটি ছিল তখন হুয়াং সুও বরফ পাহাড়ের মাথায় ড্রাগনদের বসতির সন্ধান পেয়েছিল। নিরীহ ড্রাগনদের মিথ্যে জাদুতে ভুলিয়ে মেই লিং এর রাজ্যে এনে খাঁচায় বন্দী করে রেখেছিল সোনার লোভে। সেই থেকেই নিংপিং এর সব আত্মীয় পরিজনরা বন্দী হয়েছিল আর ও বেচারা একা হয়ে গেছিল। কিন্তু দুষ্টু লোকেদের তো একটা না একটা সময় পরাজয় ঘটেই। আর যারা ভালো তারা আবার ফিরে পায় সবকিছু, সুখে শান্তিতে বাস করে তারা।
নিংপিং ও তেমনই ফিরে পেল ওর মা বাবা আত্মীয় সকলকে। সেই সাথে পেল ফু ফেং কাছিমদাদু, মেই লিং এর মত বন্ধু, মেই লিং এর সারা রাজ্যের সমস্ত লোকের ভালোবাসা। হুয়াং সুও সবার ওপর অত্যাচার করত কীনা, তাই কেউ ওকে পছন্দ করত না। কিন্তু ওর ঐ জাদুলাঠির ক্ষমতার ভয়ে কিছু করতে পারত না। এখন সবাই খুব আনন্দে থাকে আর উৎসবের দিন ড্রাগনের মুখোশ পরে আনন্দে নাচে, ড্রাগনদের জন্য ফল সব্জি পুড়িয়ে বার্বিকিউ করে দেয়। রাণী মেই লিং আর কাছিমদাদু ফু ফেংকে পিঠে চাপিয়ে নিংপিংও মাঝে মাঝে বেড়াতে নিয়ে যায়, তুলে এনে দেয় বেগুনী লান হুয়া ফুল। হইহুল্লোড়ে মেতে থাকে ড্রাগনরা মানুষরা আর সব পশু পাখিরা। এত আনন্দ যখন এমনিই আসে মিলেমিশে থাকলে তখন আর সোনাদানার কী দরকার শুনি!
(সমাপ্ত)

No comments:
Post a Comment