নিংপিং আর ম্যাজিক পোশন
সুস্মিতা কুণ্ডু
॥১॥
জঙ্গলটা ক্রমাগত আরও ঘন হয়ে আসতে লাগল। গাছের পাতার মোটা চাদর ভেদ করে সূয্যিমামার সাধ্যি কী ভেতরে উঁকি মারে! নিংপিং নির্ঘাৎ পথ হারিয়েছে। কতক্ষণ ধরে ঘুরপাক খেয়ে চলেছে বনের মধ্যে! আকাশপথে উড়ে উড়ে যে যাবে সে উপায়ও নেই। জঙ্গলটা এতই ঘন, এত বেশি লম্বা উঁচু গাছপালায় ভর্তি যে তার ভেতর দিয়ে নিংপিংয়ের মত বড় ড্রাগনছানার পক্ষে ওড়া সম্ভব নয়। আর জঙ্গলের বাইরের আকাশ দিয়ে উড়লে ভেতরের কিছুই দেখতে পাওয়া যাবে না। তাহলে কী করে খুঁজে পাবে গোল্ডিকে! কোথায় যে গেল গোল্ডি!
হয়েছেটা কী, গোল্ডি ম্যাকমাফিন লেপ্রিকন তো নিংপিং ড্রাগনছানা আর মেই লিং রাজকন্যের ভারী বন্ধু। গোল্ডি থাকে দূরের রেইনবো পাহাড়ে। যখনই বন্ধুদের সাথে ওর খেলতে ইচ্ছে করে গোল্ডি ওর সোনায় ভর্তি কলড্রনের মুখের ঢাকনাটা খুলে দেয়, ওমনি সাতরঙা রামধনু ছিটকে যায় আকাশের বুকে। আর নিংপিং তাদের ড্রাগনপাহাড় থেকে উড়ে গিয়ে গোল্ডিকে পিঠে চাপিয়ে হাজির হয় মেই লিং-এর রাজপ্রাসাদে। কখনও ওরা বাগানে খেলে, কখনও ওরা যায় সমুদ্রের তীরে যেখানে আছে ফু ফেং কাছিমদাদু, আর ওদের তিনজন নতুন বন্ধু। মৎসকন্যা ওশিয়ানা রাজকন্যে, হম্পকম্প গোটালাট্টু নামের হলদে ঘোড়ামাছ আর গ্রে নাইফটিথ নামের হাঙরসর্দার। নাইফটিথ আগে দুষ্টু থাকলেও এখন সে খুউউউব ভালো হয়ে গেছে।
অনেকদিন গোল্ডি রামধনু পাঠিয়ে ডাকেনি বন্ধুদের তাই নিংপি গিয়েছিল রেইনবো পাহাড়ে, ওকে খুঁজতে। কিন্তু গিয়ে দেখে কেউ কোত্থাও নেই। অমন সুন্দর সবুজ ঘাসে রঙিন ফুলে সাজানো রেইনবো পাহাড়ের সব গাছপালা যেন শুকিয়ে গেছে। চারিদিকে খুঁজে অবশেষে দেখল একটা মাটির ঢিপির আড়ালে গোল্ডির ছাইরঙা কলড্রনটা উল্টে পড়ে আছে। ঢাকনাটা খোলা আর ভেতরে কণামাত্রও সোনা নেই। দেখে তো নিংপিং এর মনে ‘কু’ ডাকল। গোল্ডির সোনার ঘড়ার এই দশা মানে গোল্ডি নিশ্চয়ই কোনও বড় বিপদে পড়েছে। নিংপিং চারিদিকে উড়ে খোঁজ করতে লাগল বন্ধুর। কোত্থাও দেখা নেই গোল্ডির। বারবার ডাকল, নাহ্ তাও কোনও সাড়া মিললনা গোল্ডি ম্যাকমাফিনের।
রেইনবো পাহাড়ের পাদদেশে ছিল ঘুটঘুটে অন্ধকার এক বিশাল জঙ্গল। সেই জঙ্গলের বাইরে এক জায়গায় নিংপিং দেখল গোল্ডির মাথার সবুজ টুপিটা খুলে পড়ে আছে। তার মানে কি কেউ গোল্ডির সোনা চুরি করে গোল্ডিকে ধরে নিয়ে গেছে জঙ্গলের ভেতর? নিংপিং আর সময় নষ্ট না করে ঢুকে পড়ল জঙ্গলের ভেতর। তখন কি আর জানত যে জঙ্গলটা এমন সাংঘাতিক ভয়ঙ্কর! জঙ্গল তো নয় যেন খোদ শয়তানের গুহা।
ওই ঘন অন্ধকার জঙ্গলের ভেতর দিয়েই এগিয়ে চলল নিংপিং। হঠাৎ অন্ধকারটা খানিকটা ফাঁকা হয়ে এল। সামনে বেশ অনেকটা জায়গায় আর বড় বড় গাছ নেই, শুধু একটা কুঁড়েঘর দাঁড়িয়ে। কী বিকট কুঁড়েঘরটা! জানলার খড়খড়িগুলো হাড় দিয়ে তৈরী। দরজাটার ওপরে একজোড়া ড্যাবড্যাবে চোখ লাগানো, সেটা বনবন করে ঘুরছে। কুঁড়ের মাথায় একটা বাঁকাট্যারা চিমনি, তাই দিয়ে কালো কালো দুর্গন্ধময় ধোঁয়া বেরোচ্ছে। এ আবার কীরকম জায়গা রে বাবা! নিংপিং এর মত সাহসী ড্রাগনছানারও বুকটা কেঁপে উঠল। কুঁড়েঘরটার সামনে একটা অদ্ভুত গাছ, ঠিক বাজ পড়া গাছেদে মত দেখতে। গাছটায় কোনও পাতা নেই, ডালগুলোও কেমন ভাঙা কালো কালো। সেই গাছে একটা বড়সড় কুচকুচে কালো দাঁড়কাক বসে, কাকটার চোখগুলো কেমন আকাশী নীল রঙের। কাকটা হঠাৎ ‘ক্কঃ ক্কঃ’ করে ডেকে উঠল।
নিংপিং একটু চমকে গেল, ওকে দেখে ফেলল নাকি! হঠাৎই ভাঙাচোরা চিমনিটার ভেতর থেকে সাঁআঁআঁ করে একটা কী বেরিয়ে এল। তারপর সেটা ধেয়ে এল নিংপিং-এর দিকে, সেই সঙ্গে তীক্ষ্ন একটা হাসির শব্দ কানে এল। নিংপিং এর ঠিক সামনে এসে থামল একটা উড়ন্ত ঝাড়ু। সেই ঝাড়ুর ওপর চেপে বসে রয়েছে একটা বিকট দর্শন সবজে ডাইনি। তার নাকটা ইয়া লম্বা আর বাঁকা, ঠোঁটটা কালো, চোখগুলো বড় বড়, মাথায় একটা ছুঁচলো কালো টুপি। নিংপিং এর সামনে এসে হঠাৎ করে একটা গোল কাঁচের বোতল থেকে বেগুনী রঙের একটা তরল বার করে নিংপিং এর গায়ে ছুঁড়ে দিল। তারপরই নিংপিং এর মনে হ’ল যেন ওর চারপাশের জঙ্গলটা দুলছে, গাছগুলো যেন চড়চড় করে আরও লম্বা হয়ে যাচ্ছে। সবকিছু বোঁ বোঁ করে ঘুরছে। চোখে অন্ধকার ঝেঁপে এল নিংপিং-এর।
॥২॥
যখন জ্ঞান ফিরল নিংপিং দেখলো ও একটা লোহার খাঁচায় বন্দী। কিন্তু এ কী! বাইরের সব জিনিস এত বড় বড় লাগছে কেন? একটা ইয়াব্বড় কাঠের ভাঙাচোরা টেবিলের ওপর ওর খাঁচাটা রাখা। খাঁচার ঠিক বাইরেই একটা ওষধি গুঁড়ো করার খল নুড়ি রাখা। খল মানে পাথরের বাটিটা যেটা কিনা নিংপিং এর কঁড়ে আঙুলের সমান হওয়ার কথা সেটা বিশাল হয়ে ওর সমান হয়ে গেছে প্রায়। আর নুড়িটা তো এত বড় যে নিমপিং তুলতেই পারবেনা। সামনের ঝুলে ঢাকা দেওয়ালগুলোয় বিশাল বিশাল বাঁকাট্যারা তাক আর সেই তাকে বড় বড় গোল গোল কাঁচের বোতল। কোন বোতলে লাল কোন বোতলে নীল রঙের তরল ভরা ঠিক যেমন ওই ডাইনিটার কাছে ছিল। কিন্তু সেটা তো অনেক ছোট্ট বোতল ছিল। নিংপিং এর মাথাটা আবার ভোঁ ভোঁ করতে লাগল। এসব কী হচ্ছেটা কী!
এমন সময় একটা ঠং ঠং করে একটা আওয়াজে চমকে উঠে নিংপিং খাঁচাটার গরাদের বাইরে তাকিয়ে দেখল একটা বড় কাঁচের বোতলের মধ্যে বন্দী গোল্ডি ম্যাকমাফিন লেপ্রিকন।বোতলের গায়ে কয়েকটা ছিদ্র করা, শ্বাস নেওয়ার জন্য। গোল্ডি বলতে লাগল,
-“নিংপিং! নিংপিং! গোল্ডি এখানে! বাঁচাও গোল্ডিকে। শয়তান ডাইনি হেকেটি বন্দী করে রেখেছে গোল্ডিকে।”
নিংপিং বলে উঠল,
-“আমি তো তোমাকে খুঁজতে খুঁজতেই এই জঙ্গলে ঢুকলাম গোল্ডি। তারপর কী জানি কী হ’ল একজন ঝাঁটায় চেপে এসে আমার ওপর বেগুনী একটা তরল ছুঁড়ে দিল, আর আমার কিছু মনে নেই।”
গোল্ডি বলে উঠলো,
-“ওটাই, ওইটাই তো ডাইনি হেকেটি। ও গোল্ডির মত জাদুর প্রাণীদের ধরে আনে, তারপর তাদের শরীর থেকে সমস্ত জাদু শুষে নিয়ে নিজের ক্ষমতা বাড়ায়। আর ঐ বেগুনী তরলটা হ’ল বড় থেকে ছোটো করার ম্যাজিক পোশন। তোমাকে আর গোল্ডিকে এভাবে আকারে ছোটো করে বোতলে আর লোহার খাঁচায় ভরে দিয়েছে।”
গোল্ডি ম্যাকমাফিনের এরকম করেই কথা বলার অভ্যাস। নিজেকেই নাম ধরে ডাকে। মাঝেমাঝে এমন গুলিয়ে যায় নিংপিং-এর! কতবার বলেছে ঠিক করে কথা বলতে, কিছুতেই বলবে না গোল্ডি।
ওদের কথার মাঝেই একটা বড়োসড়ো হুমদো মত কালো বেড়াল জোর গলায় “ম্যাঁয়াওও” করে ডেকে এসে লাফিয়ে পড়ল টেবিলের ওপর। নিংপিংকে হেকেটি ডাইনি এমনই ছোট্টটি করে দিয়েছে যে বেড়ালটাকে দেখে ওর মনে হ’ল যেন বিশাল একটা বাঘ। বেশ ভয়ই পেল নিংপিং। গোল্ডি চেঁচাতে লাগল,
-“সাবধান সাবধান! এটা হেকেটির পোষা বেড়াল, ইভিলস্কি! তার মানে ডাইনি আসছে।”
নিংপিং দেখল এই বেড়ালটার সারা গা কালো হ’লে কী হবে চোখদু’টো কেমন যেন আকাশী নীল। কুঁড়েঘরের বাইরের পোড়ো গাছটায় বসে থাকা কাকটারও চোখদু’টো এরকমই আকাশী রঙের দেখেছিল। কিছু তো একটা রহস্য আছে।
এমন সময় কুঁড়েঘরটা থরথরিয়ে কেঁপে উঠল, ফায়ারপ্লেসটার ওপর ঝরঝরিয়ে কালো ছাইপাঁশ পড়ল। চিমনি দিয়ে কেউ আসছে। সাঁআঁআঁ করে ঝাঁটায় চেপে নেমে এল ডাইনি হেকেটি। নিংপিং আর গোল্ডির থেকে চেহারায় এখন অনেকটা বড়, ওদের তুলনায় ডাইনিকে যেন দৈত্য মনে হচ্ছে। হেকেটির নাকিসুরের অট্টহাসিতে চারদিকের শিশিবোতল ঝনঝনিয়ে উঠল।
-
“নিংপিং টিংটিং
দুষ্টু ড্রাগনছানা
কড়মড়িয়ে চিবিয়ে খাবো,
করবি না কেউ মানা!
তুইই সেই বদমাইশ ড্রাগনছানা না যে হুয়াং সুওকে হারিয়েছিলি? আমার কুঁড়ের বাইরে গাছের আড়ালে লুকিয়েছিলি কী মতলবে শুনি?”
এইবেলা বলে রাখি, হুয়াং সুও একটা বদমাইশ জাদুকর যে নিংপিং এর বন্ধু রাজকুমারী মেই লিং এর রাজ্য দখল করেছিল। নিংপিং এর বাবা মা আর সমস্ত ড্রাগনদের বন্দী করে রেখেছিল। কেন? না সোনার লোভে। ড্রাগনরা যে তাদের মুখ থেকে আগুন ছুঁড়ে লোহাকে সোনা করে দিতে পারে। নিংপিং তাকে হারিয়ে সব ড্রাগনদের মুক্ত করেছিল আর মেই লিং-এর রাজ্য উদ্ধার করেছিল।
নিংপিং বলল,
-“হ্যাঁ আমিই সেই! আমি আমার বন্ধু গোল্ডিকে উদ্ধার করতে এসেছি। কিন্তু তুমি কীকরে জানলে হুয়াং সুওর কথা?”
-“আমি দুনিয়ার সবথেকে বেশি ক্ষমতাশালী ডাইনি হেকেটি। হুয়াং সুও আমার স্যাঙাৎ ছিল। তুই তাকে নাস্তানাবুদ করেছিস, বন্দী করেছিস। তার শাস্তি তোকে পেতেই হবে! রোজ একগাদা লোহাকে তুই সোনা করবি আমার জন্য। তবে তার আগে এই লেপ্রিকনটার থেকে কিছুটা জাদু শুষে নিই।”
এই বলে ডাইনি হেকেটি গোল্ডির কাঁচের বোতলটা দু’হাতের চেটো দিয়ে ধরতেই গোল্ডির গা থেকে সবুজ সবুজ আলো বেরিয়ে ডাইনির হাতের ভেতর ঢুকে গেল। বেচারা গোল্ডি তো দুর্বল হয়ে বোতলের ভেতর শুয়ে পড়ল।
নিংপিং হেকেটিকে আটকানোর জন্য আগুন ছোঁড়ার চেষ্টা করল কিন্তু ও এখন এতটাই ছোটো হয়ে গেছে যে আগুনটা খাঁচার বাইরে বেশি দূর গেলোই না।
নিংপিং এর অবস্থা দেখে হেকেটি হেসে উঠে বলল,
-“ঐ আগুন আর কোনও কাজেই লাগবে না। আমি বরং চাট্টি লোহার গয়না দিলুম তোকে, দে দিকি এগুলো সোনা করে। আমার সোনার গয়না পরার বড্ড শখ। ঘুরে এসে যেন দেখি কাজ হয়ে গেছে।”
এই বলে হেকেটি বেশ কিছু লোহার গয়না এনে নিংপিং এর খাঁচার বাইরে রেখে ঝাঁটায় চেপে চিমনি দিয়ে উড়ে বেরিয়ে গেল। পাহারায় রেখে গেল নীল চোখো কালো বিড়াল ইভিলস্কিকে।
-“অ্যাই হাঁদা বেড়াল! নজর রাখবি যেন ওরা পালাতে না পারে!”
॥৩॥
ডাইনি চলে যেতে বিড়ালটা একটা কোণে রাখা বস্তাভর্তি সোনার ওপর উঠে বসে থাবা চাটতে লাগল। এগুলোই তবে হেকেটি গোল্ডির কলড্রন থেকে চুরি করে এনেছে। এদিকে নিংপিং মনে মনে একটা মতলব ভাঁজল। ডাইনি হেকেটির শয়তান শিষ্য জাদুকর হুয়াং সুওর যেমন সোনার লোভ ছিল, হেকেটিরও তেমনই সাংঘাতিক সোনার লোভ। এই দিয়েই জব্দ করতে হবে ওকে। নিংপিং করল কী, লোহার গয়নাগুলোকে সোনা না করে, ও মুখের আগুন দিয়ে যে লোহার খাঁচাটায় বন্দী রয়েছে সেটাকেই সোনার করে দিল। এবার চুপটি করে অপেক্ষা করতে লাগল।
বেশ অনেকক্ষণ পর ডাইনি ফিরে এল। এসে সোজা গেল নিংপিং এর খাঁচার দিকে, সোনার গয়নার সন্ধানে। কিন্তু গিয়ে দেখে অবাক কাণ্ড! নিংপিং এর গোটা খাঁচাটাই সোনার হয়ে গেছে। অত বড় সোনার খাঁচা দেখে তো হেকেটির চক্ষু চড়কগাছ। তড়িঘড়ি খাঁচার দরজা খুলে এক হাতে নিংপিংকে ধরে অন্য হাতে সোনার খাঁচাটা তুলে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে লাগল। লোভে তো ওর চোখ চকচক করছে। আর নিংপিং করেছে কী, এই সুযোগে ফুঁ দিয়ে বেশ খানিকটা আগুন ছুঁড়েছে ডাইনির হাতটায়।
হেকেটি তো,
-“ইঁয়াও! জ্বলে গেলুম! পুড়ে গেলুম! মরে গেলুম!”
এই বলে চেঁচাতে শুরু করেছে। এক হাত থেকে সোনার খাঁচাটা পড়ে গেল আর অন্য হাতের মুঠোটা পোড়ার যন্ত্রনায় আলগা হয়ে যেতেই নিংপিং এক ঝটকায় বেরিয়ে গেল। আগেই তাকের ওপরের বেগুনী রঙের তরলে ভরা কাঁচের বোতলটা দেখে রেখেছিল ও। ওই ছোট্ট শরীর নিয়েই ডানা ঝাপটে উড়ে গিয়ে বোতলটা ধাক্কা মেরে ফেলে দিল হেকেটির ওপর। হেকেটি ওমনি ছোট্ট এতটুকুনি হয়ে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেল মাটিতে। নিংপিং তখন ওকে ঠেলেঠুলে ওই সোনার খাঁচাটায় ভরে, দিল দরজা বন্ধ করে।
এদিকে এই সব আওয়াজে গোল্ডিরও জ্ঞান ফিরে এসেছে ততক্ষণে। নিংপিং শিগগিরই গোল্ডির বোতলের ঢাকনাটা খুলে দিতেই ও বেরিয়ে পড়ল। হেকেটির জ্ঞান ফিরে আসার আগেই গোল্ডিকে নিয়ে পালাতে হবে। কিন্তু এই ছোট্ট ছোট্ট শরীরে তা কী করে সম্ভব। আগে তো ওদের স্বাভাবিক রূপে ফিরতে হবে। কী উপায়! ওরা নানা চিন্তাভাবনা করতে লাগল।
এমন সময় দেখল ঘরের কোন থেকে নীল চোখো কালো বেড়ালটা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। নিংপিং একটু ভয় পেল। বেড়ালটা আবার ঘাড়ে ঝাঁপাবে না তো? গোল্ডি ভয়ের চোটে চিৎকার করে উঠল। নিংপিং ঝপ করে তাক থেকে সবুজ বোতল একটা ফেলল বেড়ালের ঘাড়ে। বেড়ালটা ওমনি একটা সবুজ ব্যাঙ হয়ে থপথপ করে লাফিয়ে যেতে লাগল গোল্ডির দিকে। নিংপিং ফের একটা হলুদ বোতল ফেলল সবুজ ব্যাঙের ওপর। সবুজ ব্যাঙ চোখের নিমেষে একটা হলুদ সাপ হয়ে গেল। হলুদ সাপ হিসহিস শব্দ তুলে এগিয়ে এল। এবার নিংপিং একটা নীল বোতল ফেলল ব্যাঙের ঘাড়ে, ওমনি ব্যাঙটা সুন্দর ফুটফুটে এক কিশোর হয়ে গেল। ছেলেটার চোখ দু’টো নীল।
সে বলে উঠল,
-“থামো থামো! আর ম্যাজিক পোশন ঢেলো না আমার ওপর! বহুযুগ পর নিজের আসল রূপে ফিরলাম আমি।”
এই দেখে তো নিংপিং আর গোল্ডি দু’জনেই থ! ছিল বেড়াল, হ’ল মানুষ!
-“ত্ ত্ তুমি কে গো?”
বলল নিংপিং।
ছেলেটা বলল,
-“আমি ইভিলস্কি বেড়াল নই! আমার নাম ইভান। আমি তোমাদের সাহায্য করব। আমাকে আর আমার বোনকে ওই শয়তান হেকেটি ডাইনি আমাদের দেশ থেকে কত যুগ আগে চুরি করে এনেছিল। আমরা দু’জন অনাথ বাচ্চা, আমাদের কেউ ছিল না। হেকেটি এসে বলল একদিন, ও নাকি আমাদের মাসি। আর আমরাও সেটা বিশ্বাস করে ওর ফাঁদে পা দিয়ে এখানে এলাম। হেকেটি আমাকে জাদুবিদ্যা শিখিয়ে ওর স্যাঙাৎ বানাতে চেয়েছিল। কিন্তু জাদু শেখার পর আমি দেখলাম হেকেটি শুধু খারাপ কাজই করাচ্ছে আমাকে দিয়ে তখন আমি বাধা দিলাম। ও রেগে গিয়ে আমাকে কালো বেড়াল করে দিল। তারপর থেকে আমার আর কিছু মনে নেই, জাদুতে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল আমায়। আমার বোনটাও যে কেমন আছে কোথায় আছে আমি কিচ্ছু জানিনা। আজ তোমরা এই নীল ম্যাজিক পোশন ঢালতে আমি আবার নিজের রূপ ফিরে পেলাম।”
এতগুলো কথা একসাথে বলে ইভিলস্কি... থুক্কুড়ি... ইভান একটু হাঁপাতে লাগল।
নিংপিং আর গোল্ডি তো অবাক এই সব কাণ্ড দেখে শুনে। নিংপিং বলল,
-“ইভান, আজ থেকে তুমি আমাদের বন্ধু হ’লে ভাই।”
গোল্ডি বলে উঠল,
-“হ্যাঁ হ্যাঁ তুমি গোল্ডিরও বন্ধু।”
ইভান তো ভীষণ আনন্দ পেল। ডাইনিবুড়ির হাত থেকে মুক্তি পেল সেই সাথে দু-দু’জন বন্ধু।
-“বন্ধু আমি ডাইনিবুড়ির সব ম্যাজিক পোশনের রহস্য জানি, আর ওগুলো বানাতেও জানি। আমি এক্ষুনি তোমাদের আগের মত করে দিচ্ছে। তবে তোমরা তার আগে ডাইনির মাথার ওই ছুঁচলো টুপি খুলে নাও, ওতেই ওর সব শক্তি আছে। এইবেলা ও অজ্ঞান হয়ে আছে, জ্ঞান ফিরলেই না জানি কী জাদু করবে। যতই আকারে ছোটো হয়ে যাক, যতই খাঁচায় বন্দী থাকুক, ওর জাদুর সাংঘাতিক জোর।
গোল্ডি ওমনি ছুট্টে গিয়ে সোনার খাঁচার ফাঁক দিয়ে হাত গলিয়ে হেকেটির টুপিটা খুলে আনল আর নিংপিং আগুনে ফুঁ দিয়ে পুড়িয়ে দিল ঝপ করে সেটা। এদিকে ইভানও ততক্ষণে, ব্যাঙের ছাতা, কচুর মাথা, গিরগিটির ডিমের খোলা, প্যাঁচার পালক, আরও কীসব কীসব মিশিয়ে একটা লাল রঙের ম্যাজিক পোশন বানিয়ে ফেলেছে। ওরা তিনজন কুঁড়েঘরের বাইরে এল, তখন ইভান ম্যাজিক পোশনটা নিংপিং আর গোল্ডির গায়ে ছড়িয়ে দিতে ওরা আবার আগের মত স্বাভাবিক বড় আকারের হয়ে গেল। ইভান হাততালি দিয়ে উঠল, বলল,
-“সব ভালো যার শেষ ভালো তার। শুধু যদি আমার বোনটাকে খুঁজে পেতুম! তাকে যে কী করল শয়তান হেকেটি!”
এই শুনে নিংপিং এর হঠাৎ একটা জিনিস মাথায় এল। বলল,
-“ইভান আর গোল্ডি, তোমরা দু’জন কুঁড়েঘরের ভেতর থেকে ওই নীল ম্যাজিক পোশনটা একটু আনো তো, যেটা দিয়ে বিড়াল ইভিলস্কি মানুষ ইভান হ’ল।”
ওরা নীল পোশনটা কুঁড়ের বাইরে আনতেই নিংপিং সেটা সামনের পোড়ো গাছটায় বসে থাকা নীল চোখের কালো দাঁড়কাকটার গায়ে ছুঁড়ে দিল। ওমা! ওমনি দাঁড়কাক কোথায়! সে একটা ফুটফুটে সুন্দর সোনালী কোঁকড়ানো মাথাভরা চুল আর নীল চোখের একটা মেয়ে হয়ে গেল। তার মুখের ভারী মিল ইভানের সাথে। ইভান তো ছুট্টে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে বলে উঠল,
-“রেভেন রেভেন! বোন আমার! আমি তোর ইভানদাদা! ডাইনি হেকেটি তোকে দাঁড়কাক বানিয়ে রেখেছিল, আর আমাকে বিড়াল!”
-“ইভানদাদা! আমরা কীকরে ফের মানুষ হলাম?”
-“এই যে ড্রাগনছানা নিংপিং আর গোল্ডি ম্যাকমাফিন মিলে আমাদের উদ্ধার করেছে।”
-“দাদা শিগগির চলো, আমরা সবাই পালাই এখান থেকে নইলে হেকেটি এসে আবার ক্ষতি করবে আমাদের।”
এবার নিংপিং বলে উঠলো,
-“ভয় পেওনা বোন। ইভানের নীল চোখ দেখে আর ওর সব কথা শুনে আমার সন্দেহ হল যে তোমাকেই ডাইনি নীল চোখের দাঁড়কাক করে দিয়েছে জাদু করে। কিন্তু আর কোনও চিন্তা নেই, হেকেটি আর কোনও ক্ষতি করতে পারবে না তোমাদের। ও এখন আকারে এক আঙুলে হয়ে খাঁচায় বন্দী। তোমাদের দু’জনকে আমি নিয়ে যাব আমাদের বন্ধু মেই লিং রাজকন্যের কাছে। ও খুব ভালোবেসে তোমাদের আশ্রয় দেবে। আর মেই লিং এর রাজ্যেই বন্দী আছে হেকেটির শিষ্য শয়তান জাদুকর হুয়াং সুও। হেকেটিও বন্দী থাকবে সেখানেই।”
এই বলে নিংপিং গোল্ডিকে পিঠে নিয়ে উড়ল। ইভান আর রেভেন হেকেটির উড়নঝাড়ুতে চেপে নিংপিং এর পেছন পেছন রওনা দিল। গোল্ডি একহাতে নিল ওর হারানো সোনার থলে আর অন্যহাতে ঝোলালো সোনার খাঁচায় বন্দী এক আঙুল আকারের হেকেটিকে। যাওয়ার আগে অবশ্য ওরা ডাইনির বিকট ওই কুঁড়েটা পুড়িয়ে দিল আর জঙ্গলের বাইরে পড়ে থাকা গোল্ডির হারানো সবুজ টুপিটা কুড়িয়ে নিল।
মেই লিং এর রাজপ্রাসাদে পৌঁছতে সকলের কী আনন্দ! শুরু হল উৎসব। দু-দু’জন নতুন বন্ধু ওরা পেয়েছে বলে কথা! মেই লিং তো ইভান আর রেভেনকে নিজের ভাইবোনের মত বুকে টেনে নিয়ে আশ্রয় দিল রাজপ্রাসাদে। ইভানও কথা দিল যে ডাইনি হেকেটির কাছে শেখা জাদুবিদ্যা সে মানুষের ভালোর জন্য ব্যবহার করব। আর খাঁচাশুদ্ধু এক-আঙুলে হেকেটির স্থান হল অন্ধকূপে, যেখানে বন্দী আছে শয়তান হুয়াং সুও। এবার যত খুশি দু’জন সোনা চুরির বদ মতলব আঁটুকগে। গোল্ডি ম্যাকমাফিনও মেই লিং এর মায়ের হাতের তৈরি ওর প্রিয় ব্লু-বেরি মাফিন খেয়ে রওনা দিল ওর বাড়ি রেইনবো পাহাড়ে। বস্তাভর্তি সোনা কলড্রনে যথাস্থানে রাখতেই তা থেকে বেরিয়ে এল রামধনু, ঝিকমিকিয়ে উঠল আকাশ, গান ধরল গোল্ডি আনন্দে। ওদিকে নিংপিং-ও ওর পাহাড়ের গুহাবাড়িতে ফিরে গিয়ে মায়ের পাখনার ভেতর ঢুকে গান শুনতে শুরু করেছে। তবে তা যে মোটেই বেশিক্ষণের জন্য নয় তা আমরা ভালো করেই জানি, পরের অভিযানে বেরোতে হবে না?
(সমাপ্ত)

No comments:
Post a Comment