Showing posts with label বিয়েট্রিক্স পটার. Show all posts
Showing posts with label বিয়েট্রিক্স পটার. Show all posts

বেঞ্জামিন খরগোশের গপ্পো : বিয়েট্রিক্স পটার (অনুবাদ: সুস্মিতা কুণ্ডু)



বেঞ্জামিন খরগোশের গপ্পো

বিয়েট্রিক্স পটার 

(অনুবাদ: সুস্মিতা কুণ্ডু)
 
এক সুন্দর হলুদরঙা সকালে একটা ছোট্ট খরগোশ বসে ছিল একটা নদীর ধারে। নাম তার বেঞ্জামিন। আপন মনে বসে বসে সে নিজের কান খোঁচাচ্ছিল একটা খড়কে কাঠি দিয়ে। এমন সময় একটা টাট্টু ঘোড়ার খুরের ‘খট খটাশ-খুট খুটুশ’ আওয়াজ কানে এল। একটা দু-চাকার ঘোড়ার গাড়ি আসছে রাস্তা ধরে। মিস্টার ম্যাকগ্রেগর চালাচ্ছেন গাড়িটা, পাশে বসে আছেন মিসেস. ম্যাকগ্রেগর। মিসেস ম্যাকগ্রেগরের মাথায় আবার বেশ দামি একটা টুপি, রেশমি ফিতে দিয়ে থুতনির কাছে বাঁধা। 

 
যেই না গাড়িটা রাস্তা ধরে এগিয়ে গেল একটু দূরপানে ওমনি বেঞ্জামিন খরগোশ গড়গড়িয়ে নেমে এল রাস্তার ওপর। তারপর থুপুস থাপুস, ধুপুস ধাপুস লাফিয়ে লাফিয়ে রওয়ানা দিল সব সাঙ্গোপাঙ্গোদের খবর দিতে। বেঞ্জামিনের খুড়তুতো মাসতুতো পিসতুতো এইতুতো ওইতুতো ভাইবোনেরা সব থাকে মিস্টার ম্যাকগ্রেগরের বাগানের পেছনের বনটায়। 
 
জঙ্গলটা খরগোশের গর্তে একদম ভর্তি। আর সেই খরগোশের গর্তগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সাফসুতরো গুছনো সাজানো বালির গদিওয়ালা যেটা, সেটায় থাকত বেঞ্জামিনের খুড়তুতো চার ভাইবোন। ফ্লপসি, মপসি, কটন-টেল আর পিটার। 

চার ছেলেমেয়েকে নিয়ে একাই বাস করত খরগোশ মা মিসেস ব়্যাবিট। ছানাদের বাবা তো মারা গিয়েছিল সেই কবেই। খরগোশ মা খরগোশের লোমের দস্তানা আর কব্জিঢাকা মাফিতি বানিয়ে দিন গুজরান করত। আমিও তো বাজার থেকে কিনেছিলাম সেই দস্তানা। শুধু শীতের পোশাকই নয়, খরগোশ মা নানারকম ভেষজ ওষধি, রোজমেরি টি, খরগোশদের স্পেশাল তামাক এইসবও বিক্রি করত। তামাক শুনে ভেবো না যেন খরগোশেরা আবার তামাকও খায় বুঝি! খরগোশরা যাকে তামাক বলে সেটা আসলে হল গিয়ে বেগনেরঙা ল্যাভেণ্ডার, বুঝলে? 

ছোট্ট বেঞ্জামিন তার ভাইবোনদের সঙ্গে দেখা করতে খুব উদগ্রীব হলেও তাদের মায়ের সামনাসামনি হতে একটু ভয়ই পেত। আন্টি ব়্যাবিট একটু বেশিই কড়া কিনা। আর বেঞ্জামিনের তো মাথায় দুষ্টুবুদ্ধি গিজগিজ করছে। আন্টির কাছে ধরা পড়লেই বিপদ। সেইজন্য বেঞ্জামিন করল কী ফার গাছটার পেছন দিয়ে লুকিয়ে আসার চেষ্টা করল। আর সেটা করতে গিয়েই প্রায় হুড়মুড়িয়ে পড়ল তার ভাই পিটারের ঘাড়ের ওপর। 

 
পিটার তখন আপনমনেই উদাস হয়ে বসেছিল। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল বেজায় মন খারাপ বেচারার। একখানা লাল সূতীর রুমালকেই গায়ে জড়িয়েছিল জামার মত। 
-“পিটার!” ফিসফিসিয়ে ডাকল ছোট্ট বেঞ্জামিন। 
-“তোর কোট প্যান্টালুন কে নিল রে?”
পিটার উত্তর দিল, 
-“কে আবার! মিস্টার ম্যাকগ্রেগরের বাগানের কাকতাড়ুয়াটা।”
এই বলে পিটার কীকরে মিস্টার ম্যাকগ্রেগরের বাগানে তাড়া খেল, কোট আর জুতোজোড়া হারাল সব ঘটনা খুলে বলল ভাইকে। 

ছোট্ট বেঞ্জামিন বসল ভাইয়ের পাশে। ভাইকে নিশ্চিন্ত করে খবর দিল যে একটু আগেই মিস্টার ম্যাকগ্রেগর ঘোড়ার গাড়ি চেপে বাইরে গেছেন। নির্ঘাৎ সারাটা দিনের জন্যই গেছে কারণ মিসেস ম্যাকগ্রেগর ওঁর সবচেয়ে সুন্দর টুপিখানা মাথায় চাপিয়েছেন। 

 
পিটার বললে,
-“আজ বেশ বৃষ্টি হয় ঝমঝমিয়ে, খুব ভালো হয় তাহলে।”
দুই ভাইয়ের বকমবকমের মাঝেই মিসেস ব়্যাবিটের গলা ভেসে এল গর্তের ভেতর থেকে। 
-“কটনটেল! কটনটেল! কোথায় গেলি বাছা। আরও ক’টা ক্যামোমাইল ফুল নিয়ে আয় তো দেখি।”

মায়ের গলা কানে যেতেই পিটার বললে,
-“চল বেঞ্জামিন। একটু হেঁটে আসি। তাতে যদি মনটা আমার একটু ভালো হয়।”

 
পিটার আর বেঞ্জামিন দুই ভাই হাত ধরাধরি করে চলল মিস্টার ম্যাকগ্রেগরের বাগানের দিকে। প্রথমেই গিয়ে বনের পাদদেশে চওড়া পাঁচিলটা বেয়ে উঠে, তার মাথায় দাঁড়াল দুটিতে। পাঁচিলের ওপর থেকে মিস্টার ম্যাকগ্রেগরের গোটা বাগানটা দিব্যি দেখা যাচ্ছে। পিটারের সেই নীল জ্যাকেট আর জুতোজোড়াও সাফ দেখা যাচ্ছে দূরে দাঁড়ানো কাকতাড়ুয়াটার গায়ে। কাকতাড়ুয়াটার মাথায় আবার মিস্টার ম্যাকগ্রেগরের উলের গোল বলের মত থুপীওয়ালা টুপি চাপানো একটা। 

 
ছোট্ট বেঞ্জামিন বলল, 
-“গেটের তলা দিয়ে গলে ঢুকতে গেলে জামাকাপড় দুমড়েমুচড়ে নষ্ট হবে খামোকা। সবকিছুরই একটা সোজা উপায় আছে বুঝলি? যেমন মিস্টার ম্যাকগ্রেগরের বাগানে ঢোকার সবচে’ সহজ রাস্তা হল ন্যাশপাতি গাছ বেয়ে ভেতরে নেমে যাওয়া।”

বেঞ্জামিনের বুদ্ধিমত সেইটেই করতে গেল পিটার কিন্তু হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড় করে নামতে গিয়ে মুখ থুবড়ে মাথা ঠুকে পড়ল আগে। অবিশ্যি তাতে পিটারের বিশেষ কিছু চোট লাগল না বরাতজোরে। গাছের তলার মাটিটা সদ্যই বেশটি করে খুঁড়ে ঝুরঝুরে নরম করা ছিল। লেটুসের চাষ হয়েছে গোটা জায়গাটা জুড়ে। সেই কচি লেটুস জমির ওপরটা ছোট্ট ছোট্ট পায়ের ছাপে ভরে গেল খানিকক্ষণের মধ্যেই। বিশেষ করে বেঞ্জামিনের পায়ের গামবুটজোড়ার ছাপগুলো আরও বেশি করে দেখা যেতে লাগল। 


বেঞ্জামিন বললে, 
-“চল! সব্বার আগে তোর জামাকাপড়গুলো উদ্ধার করি। নইলে তোকে এই লাল রুমাল পকেটে রাখার বদলে গায়েই জড়িয়েই থাকতে হবে!” 
 

পিটার আর বেঞ্জামিন মিলে কোট আর  জুতোজোড়াটা কাকতাড়ুয়ার খড়ের গা থেকে খুলে নিল। আগের দিনই রাতভর বৃষ্টি হয়েছে। জুতোজোড়ার ভেতরটা জল থইথই করছিল। শুধু তাই নয়, কোটটাও যেন খানিকটা খাটো হয়ে গেছে বহরে। বেঞ্জামিন থুপিওয়ালা টুপিটা মাথায় চাপাল কিন্তু সেটা এতই ঢাউস যে বেঞ্জামিনের চোখই ঢাকা পড়ে যেতে লাগল। 

শেষমেষ টুপি ফেলে বেঞ্জামিন বুদ্ধি দিল, 
-“চল এই পকেট রুমালটায় অন্তত পেঁয়াজ ভরে নিয়ে যাই। আন্টি ব়্যাবিট উপহার পেয়ে খুব খুশি হবে।”
পিটারের অবিশ্যি যে বিশেষ মজা পাচ্ছিল ব্যাপারটায় তা নয়, উল্টে বারবার কানে এটাসেটা আওয়াজ আসছে খেয়াল করতে লাগল।  
 

ওদিকে বেঞ্জামিন দিব্যি হাত পা ছড়িয়ে মজা করে একটা লেটুসপাতা চিবোতে চিবোতে ঘুরে বেড়াতে লাগল। সঙ্গে বকবক করতে লাগল,
-“জানিস পিটার আমি প্রায়ই তো আসতুম এই বাগানে বাবার সঙ্গে, রবিবার রাতের ডিনারের জন্য লেটুসপাতা তুলতে।” 
ছোট্ট বেঞ্জামিনের বাবার নাম ছিল ওল্ড মিস্টার বেঞ্জামিন বানি।
লেটুস পাতাগুলো সত্যিই খেতে ভারি সুস্বাদু। 

কিন্তু পিটার কিছুই খেল না। বারবার বলতে লাগত, 
-“চল না বেঞ্জামিন বাড়ি ফিরে যাই, আমার বিশেষ সুবিধের ঠেকছে না এখানে বেশিক্ষণ থাকাটা।”
এই বলতে বলতে চঞ্চল হয়ে আদ্দেক পেঁয়াজই হাত থেকে ফেলে দিল। 
 

ছোট্ট বেঞ্জামিন বললে, 
-“এই এত সব্জিপাতি হাতে নিয়ে বাপু ন্যাশপাতি গাছ বেয়ে ওঠা মুশকিল। তার চেয়ে বরং চল বাগানের শেষমাথার দিকে যাই।”
এই বলে সে থপ থপাস করে লাল ইঁটের দেওয়ালের গা বরাবর বিছোনো কাঠের তক্তাগুলোর ওপর দিয়ে হেঁটে চলল। 


ছোটো ছোটো ইঁদুরগুলো তাদের গর্তের সামনে বসে ফলের বীজ ভাঙার চেষ্টা করছিল। কতরকমের ফলের বীজ! চেরিফলের বীজ, পিচ ফলের বীজ, প্লামের বীজ। পিটার আর বেঞ্জামিনকে যেতে দেখে তারা পুটুস পুটুস করে চোখ মেলে দেখতে লাগল। 
 সেইদিকে দেখতে দেখতে পিটারের হাত থেকে পেঁয়াজভরা রুমালটা আবার দুম করে পড়ে গেল। 

দুই ভাই মিলে ফুলের টব, সব্জির মাচা, জলের গামলার ফাঁক দিয়ে এদিক ওদিক গলে হাঁটতে থাকলে। যত এগোতে লাগল পিটারের কানে তত যেন অদ্ভুত কিম্ভুত শব্দ আসতে লাগল। চোখদু’টো ললিপপের মত বড় বড় করে পিটার নজর করতে লাগল ডাইনে বাঁয়ে। 
 


পিটার বেঞ্জামিনের দু-কদম আগেই হাঁটছিল। হঠাৎই হাঁটা বন্ধ করে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। দুই ভাই পথের সামনেই যা দেখল তাইতে তাদের আত্মারাম খাঁচাছাড়া হওয়ার জোগাড়। বেঞ্জামিন এক ঝলক সেইটা দেখেই এক পলকের মধ্যে পেঁয়াজবাঁধা রুমালসহ পিটারকে টানতে টানতে গিয়ে লুকলো বড়সড় একটা ঝুড়ির তলায়। 
 

 
ভাবছ বুঝি ওরা কী এমন দেখে এমন সাংঘাতিক ভয় পেল? 
বেড়াল! একটা হুমদোহামদা বেড়াল। 
বেড়ালটা শুয়েই ছিল। তারপর বাবু আড়মোড়া ভেঙে উঠল। খানিক পিঠ বাঁকিয়ে হাত পা টানটান করে কসরৎ করল। দুলকি চালে এগিয়ে এল ঝুড়িটার দিকে। মুখটা নিচু করে গন্ধ শুঁকতে লাগল ঝুড়িটার। নির্ঘাৎ পিটার আর বেঞ্জামিনের রুমালে জমা করা পেঁয়াজগুলোর গন্ধ পেয়েছে ব্যাটা। 


যাই হোক, গন্ধটন্ধ শুঁকেটুকে শেষমেষ সে বেড়াল চেপে বসল ঝুড়িটারই মাথায়। 

বসে রইল তো বসেই রইল, নড়ার আর নামচর্চা নেই। টানা পাঁচ পাঁচটা ঘন্টা বসে রইল সেখানে। 
 


তোমাদের বলে বোঝাতে পারব না বুঝলে যে পিটার আর বেঞ্জামিনের সেই ঝুড়ির তলায় কী দশা হচ্ছিল! একে তো ঝুড়ির তলাটা ঘন অন্ধকার তার ওপর পেঁয়াজের ঝাঁঝালো গন্ধ! এই দুইয়ের ঠ্যালায় তো পিটার আর বেঞ্জামিনের ডাক ছেড়ে কাঁদার অবস্থা প্রায়! নেহাতই ঝুড়ির ওপর বেড়ালটা বসে আছে তাই মুখে হাতচাপা দিয়ে রয়েছে দুই ভাই। 
 

 
কতক্ষণ যে ঝুড়িচাপা হয়ে রইল দুটিতে। সূয্যিমামা ধীরে ধীরে পেছনের জঙ্গলের আড়ালে গা-ঢাকা দিল। বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নামল, তাও বেড়ালব্যাটা ঝুড়ির ওপর থেকে নামল না। 

পিটার আর বেঞ্জামিন মুক্তির আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছে, এমন সময় একটু দূরেই কেমন একটা খুটুর খাটুর শব্দ হতে লাগল। শুধু আওয়াজই নয় ওপরের চাল থেকে বেশ কিছু চোকলা খসে পড়তে লাগল। 
 

 
বেড়ালটা চমকে যেই না ওপরে তাকালো দেখতে পেল 
ওল্ড মিস্টার বেঞ্জামিন বানি মানে ছোট্ট বেঞ্জামিন  বানির বাবাকে। চালের ওপর তিড়িংবিড়িং করে লাফিয়ে বেড়াচ্ছেন। ঠোঁটের ডগায় ঝুলছে একটা পাইপ, তাতে ল্যাভেণ্ডার মানে খরগোশ স্পেশাল তামাক। আর হাতে গাছের ডালের একটা লিকলিকে  ছড়ি। মিস্টার বেঞ্জামিন ছেলেকে খুঁজতে বেরিয়েছেন। 


ওল্ড মিস্টার বেঞ্জামিন বানি খুব একটা বেড়ালদের পছনেদ করতেন না। বেড়ালদের সম্পর্কে একটু নাকউঁচু ভাবই ছিল। 

নিচে ঝুড়ির ওপর বেড়ালটাকে বসে থাকতে দেখে মস্ত একটা লাফ দিলেন চালের ওপর থেকে সোজা বেড়ালের ঘাড়ে। সেই জোরদার ধাক্কায় বেড়ালব্যাটা হুড়মুড়িয়ে পড়ে গেল ঝুড়ির ওপর থেকে। তারপর মিস্টার বেঞ্জামিন জোরসে পা ছুঁড়ে এক লাথিতে বেড়ালটাকে সোজা ঢুকিয়ে দিলেন বাগানের ঘরটায়। তার সঙ্গে এক খাবলা লোমও আঁচড়ে ছিঁড়ে নিলেন বেড়ালের গা থেকে। 
 


বেড়ালটা হঠাৎ এই আক্রমণে এতটাই ভয় পেয়েছিল যে উল্টে মিস্টার বেঞ্জামিনকে আঁচড়ে দিতেও ভুলে গেল। 


 ওদিকে মিস্টার বেঞ্জামিন বেড়ালটাকে বাগানের ঘরটায় ঢুকিয়ে বাইরে থেকে দিলেন হুড়কো তুলে। 

 তারপর ঝুড়ির কাছে ফিরে এসে সেটা তুলে ছোট্ট বেঞ্জামিনের কানটি ধরে টেনে বার করে আনলেন। হাতের ছড়িটা দিয়ে ঘা-কতক দিলেনও ছেলের পিঠে। তারপর একে একে বার করে আনলেন ভাইপো পিটারকে আর সবশেষে রুমালে বাঁধা পেঁয়াজগুলোকে। সবকিছু বগলদাবা করে বীরদর্পে হেঁটে বেরিয়ে এলেন বাগান থেকে। 

ওদিকে মিস্টার ম্যাকগ্রেগর যখন ফিরে এলেন আধঘন্টাটাক পরে, তখন বাগানের হাল দেখে তো হতভম্ব হয়ে গেলেন। এমন মনে হচ্ছে যেন কেউ সারা বাগানে একজোড়া গামবুট পরে দৌরাত্ম্য করে বেড়িয়েছে। আরও আশ্চর্যের কথা বল গামবুট পরা পায়ের ছাপগুলো অস্বাভাবিক রকমের ছোটো ছোটো। শুধু কী তাই? বেড়ালটাও নিজেই নিজেকে কীকরে গ্রিন হাউসটার ভেতর বন্দী করে, দরজার বাইরের খিল আটকাল, সেটাও ভেবে কূলকিনারা পেলেন না। 
 

 
এদিকে পিটারেরও কপাল ভালো, যখন বাড়ি ফিরল মা তখন আর রাগটাগ না করে ছেলেকে ক্ষমা করে দিল। কারণ পিটার নিজের কোট আর জুতো খুঁজে পেয়েছে সেই দেখেই মা বেজায় খুশি হল কিনা। কটনটেল আর পিটার দুজন মিলে সেই লাল রুমালটা পরিপাটি করে ভাঁজ করে রাখল। মিসেস ব়্যাবিট অত কষ্ট করে উদ্ধার করে আনা পেঁয়াজগুলো দড়িতে মালার মত করে গেঁথে ঘরের সিলিং থেকে ঝুলিয়ে দিলেন, ল্যাভেন্ডার মানে খরগোশ তামাকের পাশেই। 

(সমাপ্ত) 

পিটার খরগোশের গপ্পো : বিয়েট্রিক্স পটার (অনুবাদ: সুস্মিতা কুণ্ডু)


পিটার খরগোশের গপ্পো

বিয়েট্রিক্স পটার 

(অনুবাদ: সুস্মিতা কুণ্ডু)


অনেক অনেক দিন আগে এক নদীর ধারে থাকত চার চারটে খরগোশের ছানা। নরম তুলোর বলের মত ফুরফুরে ছটপটে ছানাগুলো।   বালির চড়ার পাশে একটা বিশাল বড় ফার গাছের তলায় গর্ত খুঁড়ে বাসা বেঁধেছিল খরগোশ মা। সেই চারটে দুষ্টুমিষ্টি খরগোশছানার নাম কী ছিল জানো? ফ্লপসি, মপসি, কটন টেল আর সবচেয়ে দুষ্টুজনের নাম ছিল পিটার। 

 

একদিন সকালবেলা সূয্যিমামা উঠতে খরগোশ-মা মিসেস ব়্যাবিট তাঁর ছানাদের বললেন, 

-“বাছারা, চাঁদের টুকরো সোনারা আমার, 

আমার ক’টা কথা মন দিয়ে শোন। খেলতে বেরোলে পরে মাঠে যাস, হাটে যাস, পথে যাস, ঘাটে যাস কিন্তু ভুল করেও মিস্টার ম্যাকগ্রেগরের বাগানে যাসনেকো! উঁহু খবর্দার নয়! তোদের বাবা ওই বাগানে গিয়েই তো...”

চোখ ছলছল করে, গলা ধরে আসে খরগোশ মায়ের। রুমালের খুঁটটায় চোখ মুছে বলেন, 

-“তোরা বড় হচ্ছিস বাছারা, হেথাহোথা যেতে শিখেছিস। বিপদ তো চারিদিকে ওঁৎ পেতে বসে আছে। তাই তোদের সব কথা না জানিয়ে রাখলে পরে নিজেদের রক্ষা করবি কী করে! ওই মিস্টার ম্যাকগ্রেগরের বাগানেই তো আটকা পড়ল তোদের বাবা। আর মিসেস ম্যাকগ্রেগরের রান্নাঘরে প্রাণটা বেঘোরে শেষ হল।”


ফ্লপসি, মপসি, কটন-টেল আর পিটার গা ঘেঁষাঘেঁষি করে কাঁদোকাঁদো মুখে চেয়ে থাকে। 

নিজেকে সামলে নিয়ে খরগোশ মা বলেন, 

-“এবার বাছারা খেলতে যাও তোমরা। কিন্তু আমার কথাগুলো মনে থাকে যেন। একদম কোনও দুষ্টুমি নয়! আমি এবার একটু বাজারে বেরোবো। তোমরা লক্ষ্মী হয়ে থাকবে, কেমন?”

চারটে ছানা একযোগে ঘাড় হেলায়। 


খরগোশ মা এক হাতে একটা বেতের ঝুড়ি আর অন্য হাতে একটা ফুল ফুল ছাপ ছাতা নিয়ে চললেন বাজারে। জঙ্গলের পথ ধরে অনেকটা গিয়ে কেক পাঁউরুটির দোকান। দোকানে থরে থরে সাজানো নানারকম সুস্বাদু কেক, রঙচঙে কাপকেক, সাদা পাঁউরুটি, বাদামী পাঁউরুটি। সেই সবের মধ্যে থেকে মিসেস ব়্যাবিট কিনলেন বড়সড় একটা বাদামী পাঁউরুটির টুকরো আর কিশমিশ দেওয়া পাঁচখানা পাঁউরুটি। 


ওদিকে মা যখন দোকানে গেছে ফ্লপসি, মপসি আর কটন-টেল ভাবে ‘কী করা যায়!’। তিনজনই তো ভারি শান্তশিষ্ট খরগোশছানা। মায়ের কথা সবসময় শুনে চলে, অবাধ্য হয় না মোটেই। তাই ওরা ফলের ঝুড়ি নিয়ে গেল ব্ল্যাকবেরি তুলতে। 


কিন্তু পিটার! পিটার তো দুষ্টু শিরোমণি! সে মোটেই অন্য ভাইবোনদের মত শান্ত হয়ে ফল কুড়োতে গেল না। সোওওজা ছুট লাগালো মিস্টার ম্যাকগ্রেগরের বাগানে। যে জিনিসটা বড়রা বারণ করে সেইটে করতেই তার বেশি আগ্রহ। বাগানের বড় গেটটার তলা দিয়ে হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড় করে গলে গিয়ে ঢুকে পড়ল ভেতরে। 


মিস্টার ম্যাকগ্রেগরের সারা বাগান জুড়ে নানা রকম সব্জি ফলমূলের চাষ। পিটার বাগানে ঢুকেই প্রথমে কচমচিয়ে চিবিয়ে খেল চাট্টি সবুজ সবুজ কচি লেটুসপাতা। তারপর গেল ফ্রেঞ্চ বিনসের ছোটোছোটো গাছগুলোর দিকে। পটাপট পটাপট গোটাকতক লম্বা লম্বা পুরুষ্ট সবুজ বিন ছিঁড়ে নিয়ে মুখে পুরে চেবাতে শুরু করল। সেগুলো শেষ করে ইতিউতি চেয়ে দেখল একটু দূরে ঝুরঝুরে মাটির ভেতর থেকে সারি দিয়ে মাথা উঁচিয়ে রয়েছে ঝাড়ালো পাতাগুলো আর তাদের গোড়ায় উঁকি মারছে লাল টুকটুক মূলো। লাফিয়ে লাফিয়ে পিটার গেল সেদিক। মাটি খুঁড়ে ক’টা লাল লাল মূলো বার করে মনের সুখে উদরস্থ করল। 


এবার এই এত্তকিছু খেয়ে তো পেটে ব্যথা হওয়ারই কথা। পিটারেরও তাই হল। পেটের ভেতর যেন কেমন ভুটুরভাটুর হয়। হাওয়া ভরা গ্যাস বেলুনের মত ঢিপঢাপ করে। পিটারের মনে পড়ে যায় পেটব্যথা হলেই মা পার্সলে পাতা এনে চিবোতে দেয় চাট্টি। ম্যাজিকের মত সেরে যায় পিটার। তাই আর দেরি না করে পিটার বাগানে পার্সলে পাতা খুঁজতে লাগল। 


এদিক যায়, ওদিক যায়, সেদিক যায়। একটু দূরেই বাঁশের মাচায় ঝুলছিল লম্বা লম্বা শসা। সেই শসার মাচার আড়াল থেকে যেই না পিটার বেরলো তক্ষুনিই ঘটল বিপদ! সামনে ওটা কে! এ তো খোদ মিস্টার ম্যাকগ্রেগর। 


হাঁটু মুড়ে উবু হয়ে বসে একটা খুরপি দিয়ে মাটি খুঁড়ে বাঁধাকপির ছোট্ট চারা বসাচ্ছেন। যেই না মিস্টার ম্যাকগ্রেগর পিটারকে দেখতে পেলেন ওমনি লাফিয়ে উঠে তাড়া করলেন পিটারকে। একটা লোহার কাঁটা লাগানো ইয়াব্বড় পাতা সাফ করার লাঠি হাতে নিয়ে রে রে করে ছুটতে লাগলেন পিটারের পিছুপিছু। সেইসঙ্গে চিৎকার করতে লাগলেন,

-“ধর ধর ব্যাটা চোরকে!”


পিটারের তো ভয়ে আত্মারাম খাঁচাছাড়া হওয়ার জোগাড়। গোটা বাগানময় পাঁইপাঁই করে ছুটতে শুরু করল। ভয়ের চোটে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পিটার ভুলেই বসল কোন পথ দিয়ে সে বাগানে ঢুকেছিল। 


একপাটি জুতোই খুইয়ে বসল বাঁধাকপির ক্ষেতে। আরেকপাটি জুতো যে কোথায় গেল কে জানে! মনে হয় আলুর ক্ষেতেই সেটা ফেলেছে দৌড়তে গিয়ে। 


দু’পাটি জুতোই হারানোর পর পিটার করল কী চার হাতপায়ে ভর দিয়ে ছুট লাগাল, আরও জোরে, আরও জোরে। প্রায় বেরিয়েই গিয়েছিল মিস্টার ম্যাকগ্রেগরের নাগাল থেকে কিন্তু পিটার বেচারার কপালটাই খারাপ। পড়বি তো পড় সোজা একটা আমলকি গাছের চারপাশে লাগানো জালের মধ্যেই গিয়ে পড়ল পিটার। পিটারের পরণের জ্যাকেটের বড় বড় বোতামগুলো এইসান আটকে গেল জালের ফাঁকে যে কিছুতেই আর বেরোয় না। পিটারের সাধের সুন্দর পেতলের বোতামওয়ালা নীল জ্যাকেটখানা! প্রায় নতুনই আছে। সেই জ্যাকেটই কিনা এমন বিপদ ডাকল! 


পিটার খানিকক্ষণ নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে অবশেষে মনের দুঃখে হাল ছেড়ে দিল। চোখ দিয়ে বড় বড় জলের ফোঁটা উপচে গাল বেয়ে গড়াতে শুরু করল। কিন্তু ওর কান্না কেউই শুনল না, শুনল শুধু ক’টা চড়ুইপাখি। তারা অবিশ্যি ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ করে পিটারের চারদিকে উড়তে লাগল। বারবার ওকে বলতে লাগল আরেকটু জালটা ধরে টানাটানি করে নিজেকে ছাড়াতে। 


কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। মিস্টার ম্যাকগ্রেগর একটা বড় চালুনি নিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছেন। উদ্দেশ্যটা হল ওপর থেকে চালুনিটা চাপা দিয়ে পিটারকে বন্দী করা। কিন্তু পিটারও একবার মরিয়া হয়ে শেষ চেষ্টা করল। শরীরটাকে দুমড়ে মুচড়ে জ্যাকেটটা খুলে ফেলে রেখে কোনওমতে জালটা থেকে নিজেকে মুক্ত করে দৌড় লাগাল। উফ্! একদম ঠিক সময়ে পালিয়েছে। আরেকটু হলেই নইলে চালুনিচাপা পড়ছিল।  


জাল থেকে বেরিয়েই পিটার সোজা দৌড় লাগাল বাগানের কোণের ঢেয়োঢাকনার ঘরটার দিকে। বাগানে ব্যবহার করার রাজ্যের সরঞ্জাম যন্ত্রপাতি বোঝাই ঘরটায়। প্রথমেই পিটার লাফ মারল একটা গাছে জল দেওয়ার ঝারির ভেতর। জিনিসটা লুকনোর জন্য মন্দ জায়গা ছিল না কিন্তু নেহাতই জলে ভর্তি তাই বেশ অসুবিধেই হল পিটারের। 


মিস্টার ম্যাকগ্রেগর দিব্যি বুঝতে পারছিলেন যে পিটার ওই ঢেয়োঢাকনার ঘরেই লুকিয়েছে। হয়ত কোনও ফাঁকা ফুলের টবের তলায় ঢুকে বসে আছে। মিস্টার ম্যাকগ্রেগর একটা একটা করে সব টব উল্টে উল্টে খুঁজতে লাগলেন পিটারকে। 


এমন সময় সেই জলের ঝারির ভেতর থেকে পিটার জোরসে শব্দ করে হেঁচে ফেলল, 

-“আঁ আঁ আঁচ্ছুউউউহ্!”

ব্যাস! হয়ে গেল বিপদ। মিস্টার ম্যাকগ্রেগর টের পেয়েই ফের তাড়া করলেন পিটারকে সঙ্গে সঙ্গে। পায়ে করে পিটারকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করলেন। পিটারও কম যায় না। সহজে ধরা দেওয়ার মত শান্ত খরগোশই নয় সে। যেই না ধরতে যাওয়া ওমনি পিটার তুড়ুক করে লাফ দিল জানালা দিয়ে। তিন তিনটে টবের ফুলগাছের ঘাড় মটকে গেল পিটারের লাফের ঠ্যালায়। মিস্টার ম্যাকগ্রেগরও বেপরোয়া হয়ে পিছু নিতেন, নেহাতই জানালাটার আকারের তুলনায় মিষ্টার ম্যাকগ্রেগরের বপুটি অনেকটাই বড় আয়তনে তাই সে যাত্রায় পিটার রক্ষা পেল। এদিকে এতক্ষণ ধরে একটা ছটপটে খরগোশের পেছনে ছুটে ছুটে মিস্টার ম্যাকগ্রেগরও হা-ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। কাজেই পিটারকে কব্জা করার আশা ছেড়ে দিয়ে তিনি নিজের কাজেই ফিরে গেলেন। 


পিটার হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। দু-দণ্ডের জন্য বসল জিরেন নিতে। দমটা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে ছুটে ছুটে। থরথরিয়ে কাঁপছে গোটা শরীরটা। পিটারের বিন্দুমাত্র ধারণা নেই যে এবার কোন পথে গেলে এই বাগানের গোলকধাঁধা থেকে বেরোতে পারবে। গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মত আবার জলের ঝারির ভেতর লুকোতে গিয়ে ভিজেও গেছে সপসপিয়ে। 


কিছুটা সময় বিশ্রাম নেওয়ার পর পিটার ভাবল এভাবে বসে থাকলে তো আর পথ মিলবে না। তাই ধীরে ধীরে উঠে থুপুস থাপুস করে লাফিয়ে চারদিকটা দেখতে লাগল। 


একটু পরেই দেওয়ালের গায়ে একটা দরজা আবিষ্কার করল পিটার। কিন্তু দুঃখের বিষয় দরজাটায় তালা ঝোলানো। তলা দিয়ে যে গলে যাবে সেরকম বিশেষ জায়গাও নেই। ওইটুকু ফাঁক দিয়ে কি আর পিটারের মত গোলুমোলু খরগোশ গলতে পারে! 


একটা বুড়িমত ইঁদুর দরজার আর তলার পাথরটার ফাঁক দিয়ে বারবার ভেতরে বাইরে যাওয়া আসা করছিল। মুখে করে মটরশুঁটি বিনস এইসব নিয়ে যাচ্ছিল। বাগানের পেছনের বনটার মধ্যে মনে হয় ইঁদুরটার পরিবার থাকে। পিটার ইঁদুরটাকে জিগ্গেস করল গেটটা কোনদিকে। কিন্তু সে বেচারা মুখের ভেতর ইয়াব্বড় মটরশুঁটি পুরে রেখেছে। তাই একটা কথাও কইতে পারল না শুধু ঘাড় নাড়াল এদিকওদিক। 


কী যে উপায় হবে এখন! কী করে পিটার বেরোবে এই বাগান থেকে। ভেবে ভেবে কোনও কূলকিনারা মেলে না। শেষমেষ পিটার হতাশ হয়ে কাঁদতে শুরু করল। 


বেশ খানিকক্ষণ কান্নাকাটি করার পর পিটার নরম তালুতে চোখদুটো মুছে উঠে দাঁড়াল। নাহ্! এভাবে পড়ে পড়ে কাঁদলে বাড়ি ফিরবে কীকরে। মনকে শক্ত করে সোজা হাঁটা দিল বাগানের মাঝ বরাবর এ মাথা থেকে ও মাথা। কিন্তু যত হাঁটে তত ধাঁধার ফাঁদে পড়ে, বেরনোর আর পথ পায় না। 


শেষমেষ গিয়ে পৌঁছল একটা ছোট্টমতন জলাশয়ের সামনে। এই জলাশয় থেকেই ঝারিতে জল ভরে গাছে জল দেন মিস্টার ম্যাকগ্রেগর। একটা দুধসাদা বেড়াল সেই জলাশয়ের পাড়ে বসে জলের ভেতর সাঁতার কাটতে থাকা একটা সোনালী গোল্ড ফিশকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখছিল। বেড়ালটা একেবারে পাথরের মত স্থির হয়ে বসেছিল, কোনও নড়নচড়নই নেই। এক আধবার লেজের ডগাটা যদি না নাড়ত তাহলে বোঝাই যেত না যে একটা জ্যান্ত বেড়াল বসে আছে। মনে হত যেন একটা মূর্তি রাখা আছে। 


পিটার ভাবল এই বেড়ালকে না ঘাঁটিয়ে মানে মানে কেটে পড়াই ভালো। বেড়ালরা যে খরগোশদের বিশেষ বন্ধু কখনোই নয় সে কথা পিটার আগেই শুনেছে ওর খুড়তুতো ভাই বেঞ্জামিনের মুখে। 


পিটার আর উপায় না পেয়ে সেই ঢেয়োঢাকনার ঘরটার দিকেই হাঁটা লাগাল। কিন্তু হঠাৎ আশপাশ থেকেই একটা বিকট ‘খচ খচ খচাৎ’ আওয়াজ কানে এল। পিটার তড়িঘড়ি গিয়ে লুকলো একটা ঝোপের তলায়। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর আর কিছু ঘটল না দেখে পিটার ঝোপের তলা থেকে বেরিয়ে এল। সামনেই ছিল একটা হাতে করে ঠেলে নিয়ে যাওয়ার তিনচাকার ঠ্যালাগাড়ি। পিটার সেইটের গা বেয়ে উঠে ভেতর সেঁধিয়ে গিয়ে তারপর গলা বাড়িয়ে উঁকি মেরে এদিকওদিক দেখতে লাগল। প্রথমেই চোখে পড়ল মিস্টার ম্যাকগ্রেগর সামনের ক্ষেতে লম্বা হাতওয়ালা একটা নিড়ানি দিয়ে পেঁয়াজ তুলছেন জমি থেকে। পিটারের দিকে পেছন ফিরে আছে লোকটা এটাই নিশ্চিন্তি। ওই বিটকেল আওয়াজটা তাহলে এখান থেকেই আসছিল। 


কী করা যায়, কী করা যায়, ভাবতে ভাবতে পিটারের চোখে পড়ল মিস্টার ম্যাকগ্রেগরের ঠিক উল্টোদিকেই সেই গেটটা, যেটার তলা দিয়ে পিটার গলে বাগানে এসেছিল। 


এই তো! শেষমেষ মুক্তির পথ পাওয়া গেছে। পিটার এক্কেবারে নিঃশব্দে পা টিপে টিপে নেমে এল ঠেলাগাড়িটা থেকে। তারপর সমস্ত শক্তি জড়ো করে প্রাণপণে ছুট লাগাল। ছোট রে পা, ছোট! হাঁটু, কই দেখি তোর জোর! কালো আঙুরের ঝোপের পেছনের সরু সোজা পথটা ধরে ছুট! ছুট! 


মিস্টার ম্যাকগ্রেগর যতক্ষণে পিটারকে দেখতে পেলেন পিটার ততক্ষণে হুই মোড়টা টপকে গেটের তলা দিয়ে পিছলে বেরিয়ে গেছে। অবশেষে! বাগানের বাইরের জঙ্গলটায় এসে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল পিটার। 


মিস্টার ম্যাকগ্রেগর পিটারকে ধরতে না পেরে রাগে গরগর করতে করতে ওর ছোট্ট নীল জ্যাকেটটা আর জুতোজোড়াটা খড়ের কাকতাড়ুয়ার গায়ে গলিয়ে দিলেন। কাক তাড়ানোর কাজে আসুক অন্তত এগুলো। 


পিটার একবারটির জন্যও আর দৌড় থামাল না, পেছন ফিরেও চাইল না যতক্ষণ না সেই বিশাল ফার গাছটার তলায় নিজেদের গর্তে এসে পৌঁছল। 


এতক্ষণ ধরে যা চলল এবং এতটা পথ দৌড়নোর ধকলে পিটার এক্কেবারে ক্লান্ত হয়ে গর্তের ভেতর নরম বালির মেঝেয় ধপাস করে শুয়ে পড়ল চোখদুটো বুজে। পিটারের মা মিসেস ব়্যাবিট রান্নায় ব্যস্ত ছিলেন। এই অবস্থায় পিটারকে দেখে মনে মনে ভাবলেন, দুষ্টুটা আবার কোথায় নিজের জামাকাপড় হারিয়ে এল কে জানে! গত দু-হপ্তায় এই নিয়ে দু-দুটো জ্যাকেট আর জুতো খুইয়ে বাড়ি এল পিটার। 


তারপর কী হল? 

তারপর কী হল সে দুঃখের কথা আর কী বলি তোমাদের। শুধু এটুকু বলতে পারি যে পিটারের সন্ধেটা মোটেই ভালো কাটল না। 


খরগোশ মা এসে পিটারকে বিছানায় শুইয়ে দিল। তারপর বয়ামে রাখা কয়েকটা শুকনো হলুদ সাদা ক্যামোমাইল ফুল চিনামাটির টি-পটে জলের সঙ্গে বেশটি করে ফুটিয়ে ক্যামোমাইল টি বানালেন মা। বললেন, 

-“শোওয়ার আগে শুধু এক বড় চামচ ক্যামোমাইল টি আর কিচ্ছু না, ব্যাস! তাহলেই জব্বর ঘুম হবে আর সকালে উঠে এক্কেবারে ঠিক হয়ে যাবি পিটার।”


ওদিকে ফ্লপসি মপসি আর কটন-টেল কিন্তু দিব্যি পাঁউরুটি, দুধ আর ব্ল্যাকবেরি দিয়ে জমিয়ে রাতের খাওয়া সেরে, ঢেঁকুর তুলল। 


(সমাপ্ত)