Showing posts with label #স_হ_জ_গ_ল_প. Show all posts
Showing posts with label #স_হ_জ_গ_ল_প. Show all posts

নিকপিক

 


নিকপিক

অনেক অনেক দিন আগে এক দূর দেশে একটা রোদ ঝলমলে সকাল হল। নীল রঙ মাখানো আকাশ তাইতে সাদা মেঘের দল হুটোপাটি করে সূয্যিমামার সাথে লুকোচুরি খেলছে। গাছের বাদামী ডালে সবুজ পাতারা বাতাসের ঝাপটায় লুটোপুটি করছে। সে এক ভারি মজার দিন। এমন দিনে কি কারোর মাটির তলায় ঢুকে বসে থাকতে ভালো লাগে? তাই সেদিন মোটু কেঁচো আর ছোটু কেঁচো মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে খুঁড়তে ওপরে বেরিয়ে এল শেষমেষ। যেই না বেরনো চোখে আলোর ঝিলিক লেগে তো চারিদিক ভোঁ ভাঁ করতে লাগল। মোটু আর ছোটু তো কিছু ঠাহর করতে না পেরে এদিক ওদিক কানামাছির মত চলে বেড়ায়। এটায় সেটায় পাথরে নুড়িতে গাছের ডালে হোঁচট লেগে ধাঁই ধপাধপ আছাড় খায়। এমন সময় কে যেন বলে উঠল, 

-“কে হে তোমরা গোমুখ্যু! আঁধার থেকে আলোয় এলে চোখে হাত চাপা দিতে হয় জানো না? দুম করে বলা নেই কওয়া নেই মাটি ফুঁড়ে বেরিয়েই ড্যাবড্যাব করে আকাশপানে চেয়ে রইলে যে বড়! এই যে আমি যখন খোলস থেকে বেরিয়ে টুকি করে চোখে সবসময় রোদচশমা পরে থাকি। বলি তোমাদের কি সেটুকুও মাথায় ঘিলু নেই?”

এত বকুনি শুনে তো মোটু আর ছোটুর চোখের ভোঁ ভাঁ কেটে গিয়ে কানে ঝিঁ ঝিঁ শুরু হয়ে গেল। কোনও মতে পিটপিট করে চোখ মেলে এদিক ওদিক ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল কে কথা কইছে। একটা আপেলগাছের গোড়ায় অনেকটা মোটু ছোটুর মতই দেখতে একজন তবে তার পিঠের ওপর ইয়া বড় একটা বাড়ি। কী মজাদার জিনিস রে বাবা! নিজের বাড়ি নিজের পিঠে করেই বইছে। মোটু ছোটু হেঁকে বলে, 
-“তা তুমিই বা কে হে বাপু! আগে তো কখনও আমাদের মাটির তলার পাড়ায় তোমায় দেখিনি? তুমি কি ওই বাড়ি ঘাড়ে করেই ঘুরে বেড়াও সবজায়গায়? 
তোমার ঘাড়ে ব্যথা হয় না? 
পিঠ কনকন করে না? 
কোমর টনটন করে না?”

সেই বকবকুনি বাড়িপিঠোটা বলে উঠল, 
-“সাধে কি তোমাদের গোমুখ্য বললাম? জানো না আমি শামুকমশাই! আর এইটে আমার বাড়ি বলো ঘর বলো খোলস বলো ঢাল বলো সবই! আসুক তো দেখি কোনও ব্যাঙ মুরগী ইঁদুর আমায় খুঁটে খেতে। দাঁতই ভেঙে যাবে, ঠোঁটই বেঁকে যাবে, জিভই আটকে যাবে। আর তোমাদেরকে তো পেলেই টপাটপ করে গিলে নেবে সবাই। ওইজন্যই তোমরা মাটির নিচে লুকিয়ে থাকো। আর আমি কেমন বুক ফুলিয়ে মাটির ওপর ঘুরে বেড়াই দেখো।”

আপেল গাছটার তলায় তিনজনে ঝগড়াঝাটি বেশ জোরদার জমে উঠেছে। মোটু ছোটু বলে খোলস জিনিসটা বেজায় বাজে, কোনও কাজের নয়। খামোখা পিঠের ওজন বাড়ানো। তার ওপর পিঠ চুলকোলে কী উপায়? 
ওদিকে শামুকমশাই জবাব দেয় যে খোলস ছাড়া মানুষ নাকি মানুষই নয় ইয়ে মানে কেঁচো নাকি শামুকই নয়। এই বলে পিঠের খোলস থেকে দুটো টাটকা বটপাতা বার করে কচরমচর করে চিবোতে লাগল শামুকমশাই। 
-“দেখলে আমার খোলসে দরকারে আমি খাবারদাবারও জমিয়ে রাখতে পারি!”

এমন সময় গাছের ওপর থেকে রিনরিনে সুরেলা গলায় কে যেন বলে উঠল, 
-“এই তোমরা তখন থেকে খালি ঝগড়াই করে চলেছো আমার বুঝি খিদে পায় না? দাও দেখি আমাকেও একটা বটপাতা শামুকমশাই। আগে সবাই পেটপুরে খেয়ে নিই তারপর নাহয় জমিয়ে ঝগড়াঝাটি করা যাবে। দাও দেখি ওই মোটু ছোটুকেও দু’টো করে পাতা।”
মোটু ছোটু আর শামুকমশাই ওপরপানে চোখ তুলে দেখে একটা সাতরঙা কেঁচোর মত কে যেন আপেলগাছের ডাল থেকে কথা কইছে। তার মাথায় আবার একটা লাল ফিতে ফুল বাঁধা। তিনজনেই হকচকিয়ে গেছে দেখে সেই সাতরঙা লালফিতেমাথা খিলখিলিয়ে হেসে বলে উঠল,
-“ও হো! আমার নামটাই তো বলিনি তোমাদের। আমি হলুম সাতরঙা শুঁয়োবতী। শামুকমশাইয়ের মত আমার খোলস নেই আর মোটু ছোটু কেঁচোভাইদের মত মাটির ভেতরও লুকোতে পারিনে তবে আমার গায়ে রোঁয়া আছে, তা জানো? কেউ ধরতে এলেই দেব পিঁকপিঁকপিঁকপিঁক করে ফুটিয়ে। তারপর এইসান চুলকোবে না ঠ্যালা বুঝবে!”

শুঁয়োবতীর কথা শুনে মোটু ছোটু আর শামুকমশাইও হেসে উঠল। 

শুঁয়োবতী ফের বলে উঠল, 
-“তবেই বোঝো! যে যেরকম সে সেরকমই ভালো! শামুকমশাই খোলসে ভালো আছে, মোটু ছোটু মাটির ভেতর দিব্যি রয়েছে, আর আমি রোঁয়ার চাদরে বেশটি আছি। তাই না?
চলো চলো আর বেশি কথা না বাড়িয়ে এই বেলা বরং চারজনায় নিকপিক করি।” 

মোটু ছোটু শামুকমশাই অবাক হয়ে বলে,
-“নিকপিকটা আবার কী জিনিস গো শুঁয়োবতী? আগে তো কখনও নাম শুনিনি!”
শুঁয়োবতী কুটুর কুটুর করে আপেলগাছের ডাল থেকে বড়সড় লাল টুকটুকু আপেলের গোড়াটা কামড়াতে কামড়াতে বলে, 
-“সবাই যখন যে যার খুশিমত খাবার এনে একজায়গায় বসে ভাগাভাগি করে খায় তাকেই বলে নিকপিক।”
শামুকমশাই হো হো করে হেসে বলে, 
-“ওটা নিকপিক নয় গো পিকনিক, পি ক নি ক!”
মোটু ছোটু কেঁচোভাইয়েরা হইহই করে বলে,
-“না না! নিকপিক পিকনিক পিকপিক ওসব কিস্যু নয়, ওটাকে তো আমরা চড়ুইভাতি বলি।”

শুঁয়োবতী এদিকে আপেলের গোড়াটা গাছ থেকে আলগা করে কেটে ধুপুস করে নিচের ঘাসের ওপর ফেলেছে। 
-“আরে বাবা যে নামেই ডাকো না কেন একসাথে খাওয়া আর মজা করাটাই আসল তো নাকি? শামুকমশাই তুমি আরো চারটিখানি কচি পাতা আনো দেখি!”
মোটু-ছোটুও বলে উঠল, 
-“আমরাই বা বাদ যাব কেন? শুধু কি বসে বসে খাবো নাকি? দাঁড়াও এখনই মাটির তলা থেকে মিঠে রসালো শিকড়বাকড় নিয়ে আসছি।” 

তারপর? 
তারপর আর কী! শামুকমশাই, মোটু ছোটু কেঁচোভাইয়েরা আর সাতরঙা শুঁয়োবতী চারজনায় মিলে লাল আপেল সবুজ পাতা আর মিঠে শেকড়বাকড় দিয়ে জমিয়ে নিকপিক করল। 

তুমিও চাইলে দূর দেশের সেই আপেলগাছের তলায় যেতে পারো ওদের সাথে নিকপিক করতে। যেদিনই ঝলমলে রোদ ওঠে সেদিনই ওরা নিকপিক করে কিনা। তবে নিজের খুশিমত খাবার নিতে ভুলো না যেন, নইলে আপেল বটপাতা আর শেকড়বাকড়ই চিবোতে হবে যে! 

(ছবি: আমি)

ভুটু আর টুটু

 


ভুটু আর টুটু

সুস্মিতা কুণ্ডু
তোমরা ভুটুকে চেনো না, আর টুটুকে তো চেনোই না। এ আমি হলফ করেই বলতে পারি। হ্যাঁ মানছি তোমরা জানো যে টুটু একটা হলদে পাখির ছানা আর ভুটু একটা গাবলুগুবলু ভেড়ার ছানা। তবে শুধু সেটুকু জানলে তো আর চিনবে না ওদের, তাই না? অবিশ্যি এতে তোমাদের একটুকুনও দোষ নেই। কাউকে চিনতে গেলে, জানতে গেলে, আগে তো তার সাথে খানিকটা মিশতে হয়, খেলতে হয়, মিলতে হয়, জুলতে হয়! আর মিলিজুলি করতে হলে তাদের বাড়ি যেতে হয়, নয় তো নিজের বাড়িতে ডাকতে হয় চানাচুর দিয়ে মুড়ি খেতে। মুশকিলটা তো ওখানেই! ভুটু-টুটুকে নাগালে পেলে তবেই না বাড়িতে ডাকবে। তবেই না কদবেলমাখা, কুলের চাটনি, আমের আচার জমিয়ে খাওয়া হবে। লুকোচুরি ধরাধরি খেলা হবে!
টুটু সারা দিনমান নীল আকাশের বুকে ফড়ফড়িয়ে ঘুরে বেড়ায়। তাকে একবার হাত নেড়ে ডাকতে গেলেই বলে,
-“আমার সময় নেইকো! পরে আসবো’খন।”
ব্যাস! এই না বলেই ডানা মেলে ফুড়ুৎ!
আর ভুটু? সে তো সকাল থেকে সাঁঝ সবজে ঘাসে বসে ঢুল ঢুল ঢুল ঘুম লাগায়। ডাকো দিকিনি একবার, কোনওমতে পিটপিট করে চোখটি খুলে বলবে,
-“কাল যাবো, আজ ঘুমোই?”
তারপরেই টপ করে আবার নাকটি ডাকতে শুরু করবে ‘ঘাঁআআ ফুশশশ, ঘাঁআআ ফুশশশ’ আওয়াজ তুলে।
এবার তোমরাই বলো দেখি এমন করলে ভাব হয়?
এমনি করে দিন যায় মাস যায় বছর যায়। টুটু ভুটু নিজেদের নিয়েই মেতে থাকে। কারোর সাথে তাদের খেলার সময় নেই। খেলুড়েরাও তাই আর টুটু ভুটুকে ডাকাডাকি করেনা। মিছে শোরগোল করে হবেটাই বা কী!
তবে হঠাৎই একদিন এমন একটা ঘটনা ঘটল যে টুটু ভুটু পড়ল বেজায় মুশকিলে। বিশেষ করে টুটু। টুটু কিনা ভারি ছটপটে। এক পলও সে এক জায়গায় চুপটি করে বসতে পারে না, শুধুই উড়ে বেড়ায়। এই গাছে ওই গাছে। এই ডালে ওই ডালে। এই বাগে সেই বাগে। এই করে করে টুটুর দিনরাতের ঘুমখানি একেবারেই জলে গিয়েছিল। ভোরে সূয্যিমামা ওঠার আগেই টুটু গাছের টঙের বাসাটি ছেড়ে সেই যে উড়তে বেরিয়ে যেত, ফিরত আঁধার নামলে।
এমনই উড়তে উড়তে সেদিন একটা ঝোড়ো বাতাস এত জোরে বইল যে টুটু ছিটকে গিয়ে পড়ল একটা ঝোপের ওপর। খুব বেশি চোট না লাগলেও টুটুর একটা ডানা বেশ জখম হল। কোনওমতে তো লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ি ফিরল টুটু। তবে উড়তে আর পারে না। বদ্যিমশাই বললেন কটা দিন উড়ে বেড়ানো ছেড়ে মাটিতেই হাঁটতে হবে টুটুকে। দিলেন পাঁচন খেতে। টুটুর তো মাথায় যেন আকাশটাই হুড়মুড়িয়ে ধসে পড়ল! এ কী ভয়ানক কথা। না উড়ে টুটু থাকবে কী করে!
টুটু তখন ছুটল ভুটুর কাছে। ছুটল মানে সত্যি সত্যিই ছুটল। ওড়া তো বারণ। ভুটুর কাছে পৌঁছে টুটু করুণ গলায় বলে উঠল,
-“অ ভুটু! বদ্যিমশাই যে মাটিতে হাঁটাহাঁটি করতে বলেছে! আমার এবার কী হবে?”
ভুটু আধেক শুনে আধেক না শুনে ঘুমজড়ানো গলায় বলে,
-“তা মাটি ঘাঁটাঘাঁটি করলে পালকগুনো একটু নোংরা হবে আর কী! বেশটি করে নেয়ে নিবি নাহয় তারপর।”
টুটু ফের বলে,
-“অ্যাঁ বলি নাইতে যাব কেন খামোকা! বলছি বদ্যিমশাই বিধেন দিলেন যে আমার ডানা মেলে ওড়া মানা! সেটার কী হবে?”
ভুটু বিশাল বড় কুমিরের হাঁ-এর মত হাই তুলে বলল,
-“ছানা খেলে যদি ওড়া মানা হয় তবে ক’দিন খাসনি বরং। তুই তো আবার উড়তে না পেলে হাঁপিয়ে ঝাঁপিয়ে একশা করবি।
এইবারে টুটু খচেমচে একশা হয়ে চেঁচাল,
-“এইয়ো ঘুমকাতুরে ভুটকো! বলি চোখের সাথে কানটাও বুজে ফেলেচিস ওই ঝামরিঝুমরি লোমে? বলছি ডানা মেলে ওড়া মানা আর উনি শুনছেন ছানা খেলে ওড়া মানা। হাঁটাহাঁটি আর ঘাঁটাঘাঁটিতে তফাৎটা কানে গেল না বুঝি?”
টুটুর সরু কিঁচকিঁচে গলায় কানে ছুঁচফোটানো চিৎকারের চোটে ভুটু আধবোজা চোখজোড়া এবার পুরোপুরিই খুলতে বাধ্য হল।
একটু মেজাজ করেই জবাব দিল,
-“কী হয়েছেটা কী সেটা বলবি তো! সেই থেকে একবার মশার মত পোঁ পোঁ করছে নয়তো সানাইয়ের মত প্যাঁ প্যাঁ করছে।”
ভুটু এমনিতে একদম ভালোমানুষ তবে ওই ওর ফুলকোফুলকো লোম নিয়ে কেউ কিছু বললে একটু আঁতে ঘা লেগে যায়।
শখের মধ্যে ভুটুর ওই দুটি-ই। ঘুমনো আর একটু ঝামরি ঝুমরি মেঘের মত নরম সাদা লোমগুলোর খেয়াল রাখা। খেজুরপাতার চিরুনি দিয়ে একটু আঁচড়ানো, একটু কাঁঠালিচাঁপা ফুলের সুবাস ছড়ানো। আর টুটু কিনা সেই আদরের জিনিসটাকেই অমনটি করে বললে। কার না রাগ হয় বলো দেখি!
টুটুও সেটা বুঝতে পেরে একটু সুর নরম করল। টুটুর কপালে যে সমস্যা জুটেছে তার জন্য তো আর ভুটু দায়ী নয়। তাই একটু করে পুরো ঘটনাটাই খুলে বলল টুটু। কেমন করে ডানায় চোট পেল আর বদ্যিমশাই-ই বা কী বললেন, সঅঅব কিছু।
ভুটু সব শুনেটুনে বুঝলে যে কেন টুটু এত উতলা হয়েছিল। বেচারি সারাদিন শুধু উড়তে ভালোবাসে আর তাকেই যদি হেঁটে চলে বেড়াতে হয় তাহলে মন তো খারাপ হবেই। ভুটু কী আর রাগ করে থাকতে পারে টুটুর ওপর!
ভুটু তখন বললে,
-“শোন টুটু একটা উপায় বলি। তুই বরং আমার মাথার ওপর চেপে বোস। তারপর বল কোথায় কোথায় যেতে চাস। আমি তোকে নাহয় একটু বেড়িয়ে আনব’খন হেথাহোথা। এ আর এমন কী কঠিণ কাজ!”
টুটুরও মনে হল মতলবটা খারাপ নয়। নেই মামার চেয়ে কানা মামাই ভালো। নিজে না উড়ে যেতে পারলেও ঘাড়ে চেপে বেড়ানোই সই।
তারপর বেশ ক’দিন টুটুকে মাথায় চাপিয়ে ভুটু ঘুরে বেড়াতে লাগল। তবে শুরুতে ব্যাপারটা যতটা সহজ মনে হয়েছিল ভুটুর, ক’দিন পর আর ততটা সহজ মোটেও লাগল না। টুটু একটু সময়ের জন্যও বসতে দেয় না। একবার বলে ‘এদিকে চলো’ তো একবার বলে ‘ওদিকে চলো’। একবার গাছের তলায় দৌড় করায় ভুটুকে তো একবার নদীর পাড়ে ছোটায়। ভুটু বেচারা একটু আলতুসি আরামে থাকতেই ভালোবাসে। তার কী আর এত দৌড়ঝাঁপ সয়! এদিকে টুটুকে না বলতেও বাধো বাধো ঠেকছে। যদি ভেবে বসে ভুটুটা একেবারেই কুঁড়ে আর আলসে। ক’দিন এইটুকু উপকার করতেও পেরে উঠছে না। ভুটুর তাহলে আর মানটা থাকে কী করে!
অনেক ভেবে ভুটু শেষমেষ একটা মতলব আঁটল। টুটুর যেমন ডানায় চোট লেগেছে, ভুটুরও যদি আচমকা পা মচকে যায় তাহলে তো আর হেঁটে বেড়াতে হয় না!
যেমনি ভাবা তেমনি কাজ। সেদিন টুটুকে মাথায় নিয়ে মাঠে ছুটতে ছুটতে হুট করেই মিছিমিছি হোঁচট লাগার ভাণ করে হুমড়ি খেয়ে পড়ল ভুটু। পড়েই চিৎকার জুড়ল,
-“আহা রে! উহু রে! টুটু রে! গেলুম রে! আমার পা-টা গেল রে! আর মনে হয় সারাজীবন হাঁটা হল না আমার। তোকেই বা কী করে মাথায় চাপিয়ে বেড়াতে পারব আর!”
এদিকে আচমকা যেই না ভুটু পড়ে গেছে মাটিতে টুটুও আরেকটু হলে পড়ার জোগাড় হয়েছিল ভুটুর মাথার ওপরটি থেকে। নেহাতই ঝটপটিয়ে ডানা মেলে উড়ে সামলে নিয়েছিল তাই!
এ কী এ কী! টুটু যে আবার উড়তে পারছে! কই ডানায় তো ব্যথা লাগছে না! বেশ কয়েকবার ডানা ঝাপটে ওপর নিচে ডাইনে বাঁয়ে উড়ে নেয় টুটু! ডানা বিলকুল ঠিক!
একপাক ঘুরে নেচে নিয়ে গান ধরে টুটু,
-“ তাইরে নাইরে নাই রে
ওরে ভুটু ভাই রে
আর যে ব্যথা নাই রে
খুশিতে গান গাই রে!”
ভুটুও টুটুর ডানা ঠিক হয়ে গেছে দেখে বেজায় খুশি আর অবাক দুটোই। হাত পা মেলে বসে বসে টুটুর নাচ দেখে। নিজেরও যে একটু নাচতে সাধ হয়নি তা বলব না তবে ভুটু এখন চোট লাগার ভান করেছে কিনা। নাচতে গেলেই টুটু বুঝে যাবে যে ভুটু মিছে কথা কইছিল। ছি ছি! সে ভারি বাজে ব্যাপার হবে। টুটু হয়ত বা মনে আঘাত পাবে ভুটুর মিছে কথা বলে পিছু ছাড়ানোর এই মতলব জানলে।
নাচা গানা শেষ হলে ‘পরে টুটু খেয়াল করে ভুটু পা ছড়িয়ে বসে ড্যাবড্যাবিয়ে চেয়ে আছে। টুটু মনে মনে জিভ কাটে। নিজের ডানা ঠিক হয়ে গেছে বলে এত লাফালাফি ওড়াউড়ি করছিল ওদিকে ভুটু বেচারার যে পায়ে চোট লেগে গেছে সেটা বেমালুম ভুলেই বসেছে! না জানি বেচারা কত ব্যথা পেল। আলতো করে উড়ে এসে ভুটুর মাথায় বসে টুটু বলে,
-“ভুটু ভাই, মন খারাপ করিসনে। যতদিন না তোর পা ঠিক হবে ততদিন আমি তোকে ছেড়ে কোথাও নড়ব না। একবারটি শুধু বদ্যিমশাইয়ে তেঁতো পাঁচন দাওয়াইটা নিয়ে আসি দাঁড়া তোর জন্য। তারপর যতদিন না তোর পা-টা সারবে ততদিন রোজ তোকে গান শোনাবো, তারপর মিঠে জাম এনে দেব...”
টুটু আরও অনেক কিছু বলে চলে তবে সে সব ভুটুর কানে আসে না। তার যে দু’চোখে ঘুম জড়িয়ে এসেছে। না জানি আবার কতদিন টুটুর সেবার ঠ্যালায় সাধের ঘুমটিকে বিদায় জানাতে হবে। পরের বার কিছুতেই আর এমন মিছে নাটক করবে না ভুটু। তার চেয়ে সত্যি কথা বলে দিলে ঝকমারি অনেক কম। ভাবতে ভাবতেই কখন চোখ লেগে যায় ভুটুর, নাকে বাজনা বাজে,
“ঘাঁআআ ফুশশশ... ঘাঁআআ ফুশশশ...”
(শেষ)
ছবি: আমি ইন্টারনেট থেকে দেখে দেখে 😁

মিলির একদিন




মিলির একদিন

সুস্মিতা কুণ্ডু
একটা ছিল বিশাল বড় দোকান, শহরের ঠিক মাঝখানটিতে। কী নেই সেই দোকানে! জামা কাপড়, বাসনকোসন, ঘরসাজানোর জিনিস, খাবারদাবার, ফলমূল আনাজপাতি, মশলা থেকে শুরু করে বই খাতা পেন রঙ ছোটোদের খেলনা, সব সঅঅঅব পাওয়া যায় সেই দোকানে। গোটা শহরের খোকাখুকুরা আসত তাদের মা বাবার হাত ধরে সেই দোকানে নানানরকম জিনিস কিনতে। সে বাবামায়েরা অবশ্য গোটা দোকান ঘুরে ঘুরে সংসারের হাজারখানা জিনিস কিনলেও ছোটোদের মনটা পড়ে থাকত দোকানের একটা বিশেষ কোণায়। যেখানটায় আছে রাজ্যের খেলনা। রঙচঙে বল, খেলনা গাড়ি, আর পুতুল! তাক জোড়া এত এত পুতুল। কোনটা তুলোর মত তুলতুলে, কোনটা কাঠের মত ঠকঠকে। কোনটার কালো চুল, কোনটার সোনালী চুল। কোনওটার চোখ নীল তো কোনওটার বাদামী। আর তাদের পরনের পোশাকের যে কত রকমারি সে আর কী বলি তোমাদের। ছোটো খোকাখুকুদের আলমারিতে যা জামা থাকে ঠিক সেরকমই সব ঝালর দেওয়া, রেশমের সূতোর নকশা তোলা, রঙবেরঙের বোতাম বসানো জামা পুতুল খোকাখুকুদের গায়ে।
দোকানের সেই জাদু ঝলমলে কোণটিতে বাকি সব পুতুলদের সাথে থাকত মিলি। এককালে মিলির মাথাজোড়া সোনালী চুল ছিল। তাইতে দুটো বিনুনি বাঁধা ছিল, বিনুনির ডগায় লাল ফিতে দিয়ে ফুল বানানো। মিলিকে শুইয়ে দিলে তার নীল চোখের পাতাটা বুজে যেত, আবার যেই না বসিয়ে দেওয়া চোখদুটো এমনি করে খুলে যেত যেন মনে হত ঘুম থেকে জেগে উঠল এই বুঝি! এমনকি মিলির হাত দু’খানি আর পা দু’খানি দিব্যি এদিক ওদিক ঘোরানোও যেত। আর মিলির জামাটার কথা যদি তোমরা শোনো তাহলে হয়ত ওরকমই একটা জামা তোমরাও চেয়ে বসবে। একটা আশমানি রঙ জামা তাইতে সাদা মেঘের মত ফুলকো ফুলকো ঝালর দেওয়া ছিল। দেখলে মনে হবে যেন শরতের নীল আকাশে পেঁজা তুলোর মত সাদা মেঘ ভাসছে। তবে এত কিছুর পরেও মিলির মনে ভারি দুঃখ। তার কারণ কী জানো?
এ সবই মিলির এককালে ছিল, এখন আর নেই। এখন মিলির সোনালী বিনুনীর চুলগুলো সব জটপাকানো। একটা বিনুনি থেকে তো লাল ফিতে খুলে কোথায় হারিয়েই গেছে। মিলির নীল চোখের পাতা এখন আর শুলেও বোজেনা, সবসময় খোলাই থাকে। আর মিলির সেই আশমানি রঙ জামার যা দশা হয়েছে সে দেখে তোমরা বুঝি কেঁদেই ফেলবে। শরতের আকাশ থেকে সে জামা এখন বাদলাদিনের কালো মেঘে ছাওয়া আকাশ হয়ে গেছে। সাদা ঝালর গুলোয় ময়লার পরত পড়েছে। দেখলেই বোঝা যাবে কেউ আর মিলির খেয়াল রাখে না।
রাখবেই বা কেন! দোকানে কত নামীদামী সাজানোগোজানো পুতুল। খোকাখুকুরাও তাদের নিয়েই হইচই করে। তাদের মা বাবারা পয়সা দিয়ে নতুন নতুন সেই পুতুল কিনে দেয় খোকাখুকুদের। সেই পুতুল হাতে নিয়ে নাচতে নাচতে গাইতে গাইতে বাড়ি যায়। মিলি পড়ে থাকে কাঠের তাকের এক কোণে। কখনও কখনও মিলি বিড়বিড় করে বলে,
-“এই বেশ ভালো হয়েছে। আমায় দেখতে পেলে হয়ত সব খোকাখুকুরা হাসাহাসিই করত বুঝি। তার চেয়ে আড়ালে আছি সেটাই ঠিক।”
মুখে তাই বললেও মিলি মনে মনে কি আর ব্যথা পেত না? খোকাখুকুদের বাড়িতে না জানি কত মজা! রোজ কেমন তাদের খেলার সাথী হওয়া যায়। মিছিমিছির চায়ের আসর, পুতুলের বিয়ে, সুপারহিরো সাজা, খোকাখুকুর মাবাবাদের মুখে ঘুমপাড়ানি গান শোনা, আরও কত কী! সে সব কি আর মিলির কপালে জুটবে কখনও! মিলি তাই পড়েই থাকে দোকানের আলো ঝলমলে কোণটির এক আঁধার তাকের তলায়।
এমনি করেই দিন যায়। তবে এক একটা দিন বুঝি একটু আলাদা রকমেরই হয়। সেই দিনগুলোতে আঁধার তাকের তলাতেও আলো পৌঁছয়। কীসের যেন একটা হাসি, কেমন যেন একটা খুশি খেলে বেড়ায় বাতাসে। গুনগুনিয়ে গান ভেসে আসে।
তেমনই একটা দিনে এক ছটপটে খোকন তার মাবাবার হাত ধরে এল সেই বিশাল বড় দোকানটাতে। তাকে নিয়ে তো মা বাবা জেরবার! একবার এদিকে ছোটে তো একবার ওদিকে লাফায়। দোকানের গড়গড়ানো সিঁড়ি দিয়ে দশবার ওঠে আর নামে। দৌড়োদৌড়ি করতে করতেই খোকনটা এসে থামল দোকানের ভেতর সেই সবথেকে বেশি আলো ঝলমলে কোণটায়। থমকে দাঁড়ায় খোকনটা একটুখানি। তারপর হামাগুড়ি দিয়ে কী যেন খোঁজে পুতুলের তাকের ঠিক তলাটায়। তারপর হাতে করে টেনে বার করে আনে সেটা। ও মা! এতো মিলি! খোকনটা মিলির লালফিতেওয়ালা সোনালী বিনুনিটা দেখতে পেয়েছিল বুঝি তাকের তলায় বেরিয়ে থাকতে।
মিলিকে হাতে নিয়েই ছটপটে খোকনটা যেন একটু চুপচাপটি হয়ে গেল। আহারে পুতুলটাকে কেউ দেখেনি! ওমনি করে তাকের তলায় মুড়েশুড়ে পড়েছিল। দ্যাখো দিকি জামাটাও কেমন নোংরা হয়ে গেছে। আর অন্য বিনুনিটার লাল ফিতেটাও গেছে হারিয়ে। ইসস ওর যদি একটা এমন পুচকুলি বোন থাকত তাহলে কিছুতেই কি তাকে এমন দুঃখটা পেতে দিত? চেয়ে দেখো দিকি একবার পুতুলটার নীল চোখদুটোয়। কত গভীর, কত মায়া মমতায় ভরা। ঠিক খোকনের মায়েরই মত। মায়ের চোখদুটো শুধু কালো, এই যা তফাৎ!
খোকনের চোখে জল টলটল করে। ধুলোমাখা পুতুলটাকে বুকে জড়িয়ে ছোটে মা বাবার দিকে। মা তখন দোকানদার কাকুকে দাম মেটানোর লাইনটায় পয়সা নিয়ে দাঁড়িয়ে আর বাবা পাশেই দুই হাতে বড় বড় দুইখান ব্যাগ ধরে হাঁসফাঁস করছে। খোকন শিগগির সেখানে গিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,
-“আমাকে এই পুতুলটা কিনে দেবে?”
মা সেই ধুলোমাখা ছেঁড়াখোঁড়া পুতুলটা দেখে চমকে বলে ওঠে,
-“এটা কোথায় পেলি? এ তো পুরনো পুতুল। দেখছিস না কেমন যেন ভাঙাচোরা হয়ে গেছে! তুই বরং অন্য কোনও পুতুল নয়তো ব্যাটবল বা ওই খেলনা গাড়িগুলোর একটা নিয়ে আয় সোনা, আমরা কিনে দেব।”
খোকন চোখ ছলছলিয়ে বলে,
-“না মা! আমার অন্য কোনও খেলনা চাই না! এই পুতুলটাই চাই।”
মা একটু রাগ করে বলে,
-“দোকানে এরকম বায়না করতে নেই!”
দোকানদার কাকু যে সামনে টেবিলটার ওইপারে বসেছিল সেও বলে,
-“এই পুতুলটা মনে হয় ভুল করে তাকে রয়ে গেছে। এটা তো বেচবার মত হালতে নেই। খোকাবাবু তুমি বরং অন্য কোনও খেলনা বেছে নাও।”
এদিকে মিলির ভয়ে যেন দমটা আটকে আসছে। এতদিন তাকের আঁধারে থেকে থেকে ওর মনের সব আশাই হারিয়ে গিয়েছিল যে কোনওদিন কোনও সত্যিকারের খোকাখুকুর খেলনার ঘরে ওর জায়গা হবে। আজ যখন এই খোকনটা ওর জামার ধুলোগুলো ঝেড়ে দিয়ে ওর জটপাকানো চুলগুলো ছাড়িয়ে দিল তখন মিলির যেন মনে হল এমনটা সত্যিই যদি হয়! খোকনটার কালো চোখদুটো কেমন ভালোবাসায় ভরা। এই খোকনটার বাড়িতেই মিলির জায়গা হবে তাহলে?
এখন যদি খোকনের মা আর দোকানের লোকটার জন্য মিলির আর যাওয়া না হয় খোকনের বাড়ি! ইসস এখন যদি মিলি চোখদুটো বুজে ফেলতে পারত!
দুরুদুরু বুকে মিলি ভাবতে থাকে এই বুঝি ওকে আবার ওই আঁধার তাকটার তলায় ফেলে এল কেউ!
এমন সময় কে যেন একটা মিলির হাতটা ধরে নেয়। খোকনের মত কচি হাত নয়, বড়দের হাত।
এ তো খোকনের বাবা! হাতের ভারি ব্যাগটা নামিয়ে খোকনের হাত থেকে মিলিকে নিজের হাতে নিয়েছে খোকনের বাবা। মিলির সব আশাই বোধ হয় শেষ।
মিলির নীল চোখদুটো খোলা থাকলেও চারিদিকে যেন আঁধার ঝেঁপে আসে বুঝি। এমন সময় কানে আসে খোকনের বাবার গলা,
-“দাদা আপনি পুতুলটার যা দাম সেই দামেই এটা প্যাক করে দিন। আমরা নেব পুতুলটা।”
মিলির নিজের কানকে ভরসা হয় না। কী শুনছে ও? ঠিক শুনছে কি?
ঘোর কাটতে কাটতেই মিলি দেখে খোকনের কোলে চেপে যেন কোথায় চলেছে। খোকনের মা খোকনের পাশে বসে হেসে বলছে,
-“তোরা বাপ ব্যাটায় পারিসও বটে! দোকানের লোকটাও ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে।”
খোকনের বাবা সামনে বসে হো হো করে হাসে আর বলে,
-“দ্যাখোই না। কেমন তেল দিয়ে খোকনের পুতুলের সব হাত পা সারিয়ে দেব। আর বেশটি করে সাবান দিলে ওই সোনালী চুল আর নীল জামাটা কেমন নতুনের মত ঝকঝক করবে দেখবে।”
খোকনের মা বলে,
-“থাক, ওই পুরনো জামাটা আর পরাতে হবে না! আমি বরং সেলাইয়ের মেশিনটা একবার চালিয়ে দেখি। একটা পুতুলের জামা কি আর বানাতে পারব না?”
খোকন কোলে বসা মিলিকে আলতো করে শুইয়ে দিয়ে বলে,
-“এখনও অনেকটা পথ বাড়ি যেতে বুঝলি? তুই একটু ঘুমো। আমি বরং একটা নাম ভাবি তোর, কেমন?”
খোকন জানল কী করে? সত্যিই তো মিলির খুব ঘুম পেয়েছে। একটু ঘুমিয়েই নেওয়া যাক বরং, মনের ওপর দিয়ে যা ধকল গেল। ঘুম থেকে উঠে খোকনকে নিজের নামটা বলে দিতে হবে, আর খোকনের নামটাও শুধিয়ে নিতে হবে। ভাবতে ভাবতেই রাজ্যের ঘুম নেমে আসে মিলির চোখে, এতদিন খুলে থাকা নীল চোখদুটো আপনা আপনিই বুজে আসে।
(সমাপ্ত)
🔹🔹🔹🔹
এই গপ্পোটার শেষে ক’টা কথা না বললেই নয়। ক্যাপ্টেন নিমোর একটা খুব প্রিয় গল্পের বই হল কোর্দুরয়। একটা ছোট্ট টেডি বেয়ারের গল্প। গল্পটা আমারও খুব মন টানে। সেই থেকেই গল্পটা লেখার ইচ্ছে হল। শুধু তাই নয়, ঠিক এই গল্পের মিলি পুতুলটার মত দেখতে একটা পুতুল ছোটোবেলায় বাবা কিনে দিয়েছিল। আমি তখন টু/থ্রি-তে পড়ি, একবার আমাদের বাড়িতে চুরি হল। চোর এটা ওটা সেটার সঙ্গে নিয়ে গেল আমার পুতুলটিকে। কী ভেবেছিল কিজানি। পুতুলের পেটে কী সোনাদানা পাবে ভেবেছিল কী জানি। যাই হোক জিনিস নিয়ে পালাবার পথে বাড়ির পেছনের মাঠে বেশ কিছু জিনিস আবার ফেলে দিয়ে গিয়েছিল। তার মধ্যে আমার পুতুলখানিও ছিল কিন্তু একটা পা ভাঙা অবস্থায়। হয়ত ওটা ভেঙে ভেতরে কিছু আছে নাকি চেক করেছিল। মা বহুকষ্টে ওটা আবার জুড়ে দিয়েছিল কিন্তু আগের মত আর ওটা ঘোরানো বাঁকানো যেত না। অনেক বড় বেলা অব্দি পুতুলটা আমাদের সঙ্গে সঙ্গে হেথাহোথা ঘুরেছে। মিলির এই গল্প তাই কোর্দুরয়, রাশিয়ান রূপকথার পুতুলের মত আমার সেই পুতুলটা আর যেখানে যত পুতুল আছে খোকাখুকুদের বাক্সে, তাদের জন্য।
🔹🔹🔹🔹
ছবি: আমি। ইন্টারনেটে এই ধরনের আঁকাগুলো খুব ভালো লাগছিল। তাই দেখে দেখে একটা চেষ্টা করলুম।
🔹🔹🔹🔹
এবার ছোটোদের টাস্কের পালা। কাজটা এটাই যে তোমরা সক্কলে তোমাদের সবচেয়ে প্রিয় খেলনার ছবি, আর কেন খেলনাটি তোমাদের প্রিয় সেই গপ্পো আমায় কমেন্টবক্সে জানিও কেমন?

মুরগি মা আর তার চার ছা

 



মুরগি মা আর তার চার ছা

সুস্মিতা_কুণ্ডু


এক ছিল সাদা মুরগি মা আর তার ছিল চার চারখানি হলদেরঙা ছা। ইনি মিনি মাইনি আর মো। চারটিতে সারাদিন ইতিউতি ঘুরে বেড়ায়, পোকা খুঁটে খায়। হেথা যায় হোথা যায় সেথা যায়, নাজানি কোথা কোথা যায়। মুরগি মা তো নাজেহাল। সংসারের সব কাজ সারবে নাকি ছানাদের খুঁজে বেড়াবে দিনভর।

শেষমেষ মুরগি মা ছানাদের ডেকে বললে,
-“শোন রে ইনি মিনি মাইনি মো। আজ থেকে তোরা একা একা নয়, আমার সাথেই খাবার খুঁজতে বেরোবি। সবসময় আমার চোখের সামনে সামনে থাকবি। ভুল করেও চোখের আড়াল হোসনেকো।”
ইনি মিনি মাইনি মো তো ইয়া বড় করে ঘাড় হেলায়।
তারপর গান গাইতে গাইতে মায়ের সামনে সামনে হাঁটা দেয়।
“রাম পাম পাম তারা রাম পাম পাম,
ইনি মিনি মাইনি মো আমাদের নাম,
তালে তালে হাঁটি ডান বাম ডান বাম,
সারাদিন করি দেখো কতশত কাম,
রাম পাম পাম তারা রাম পাম পাম।”
গান গাইতে গাইতে চোখ বুজে হাঁটা লাগায় চারজনায়। মুরগি মা-ও গানের তালে পা মিলিয়ে ঘাড় উঁচিয়ে ছানাদের পেছু পেছু চলে।
সবুজ মাঠে যেখানে মা আর তার চার ছা পোকা খুঁটে খেতে গিয়েছিল সেখানে পথের মাঝে পড়ে ছিল একটা পাইপ। না জানি কার বাড়ি থেকে নাকি গাড়ি থেকে খুলে পড়া কালিঝুলি মাখা পাইপ সেটা। গানের তালে বেখেয়ালে ইনি মিনি মাইনি মো সেই পাইপের ভেতরেই ঢুকে হাঁটতে শুরু করল। চোখ বুজে গান গাইছিল কিনা। পাইপের ভেতর দিয়ে হেঁটে হেঁটে শেষমেষ চারটে ছানা পাইপের অন্য মুখটা দিয়ে হেলতেদুলতে বেরিয়ে এল।
হায় রে হায়! ছানাদের গায়ের হলুদ পালক তো বেশটি করে তেলকালিঝুলি মেখে কালো কুচকুচে হয়ে গেছে।
ওদিকে মুরগি মা তো আর ছানাদের মত বহরে ছোটটি নয়। সে পাইপের ভেতর দিয়ে গলে যাওয়ার বদলে ওপর দিয়ে হেঁটে চলে গেল সোজা। খানিক পরে চোখ মেলে চেয়ে দেখে ছানারা কেউ কোথাও নেই, সব ভোঁ ভাঁ। কোথায় গেল ছানাপোনারা? আশেপাশে শুধু অন্য কাদের চারটে কালোরঙা মুরগিছানা চইচই করে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
এদিক চায় ওদিক চায় সেদিক দেখে।
‘কোঁকর কোঁ! কোঁকর কোঁ
ইনি মিনি মাইনি মো’
ডাক ছাড়ে। বাছাদের দেখা মেলে না।
কী করে মা মুরগি! কী করে!
এদিকে তো চার ছানা খুঁটে খেতে খেতে দেখে মা মুরগি হাপুস নয়নে কেঁদে চলেছে আর ওদের নাম ধরে ডাকছে। ছানারা তো ঘাবড়ে গিয়ে মায়ের পাশেই পা ছড়িয়ে বসে কাঁদতে শুরু করল। মা মুরগি ভাবে হলদে পশমের বলের মত ছানারা কই আর তেলকালি মাখা ছানারা ভাবে মা কেন কাঁদে।
এদিকে ছানাদের চোখের জলে একটু একটু করে তেলকালি ধুয়ে যেতে লাগল। খানিক পরে মা মুরগি কাঁদা থামিয়ে চোখ খুলে দেখে চার ছানা তো পাশেই বসে আছে! কী জাদু রে বাবা!
পাঁচজন মিলে ফের মজায় গান গাইতে চলল খাবার খুঁজতে...
“রাম পাম পাম তারা রাম পাম পাম,
ইনি মিনি মাইনি মো আমাদের নাম।”
(শেষ)
সঙ্গের ছবিটা হয়ত অনেকেরই চেনা। আমাদের ছোটোবেলায় সোভিয়েত রাশিয়ার একটা বই ছিল।
‘ছবিতে ছবিতে গল্প’,
ছবি: নিকোলাই রাদ্‌লভ
কথা: দ. হার্ম্‌স্‌, ন. গের্নেত, ন. দিলাক্‌তর্‌স্কায়া
অনুবাদ: ননী ভৌমিক
এটা সেই বইয়েরই একটা ছবি। প্রতিটা ছবি কথা বলে, একটা গল্প শোনায়। ক্যাপ্টেন নিমোর সঙ্গে বসে বসে গল্প গড়ছিলাম ছবি থেকে। সেটাই লিখলাম।
গল্পটা আবার যুক্তাক্ষর ছাড়া লেখা হয়ে গেছে। ছোটোদের পড়তে সুবিধে হবে আশা করি।
আবার একটা ছবি থেকে গল্প দেব শিগগিরই।

কাঠবিড়ালি কাঠবিড়ালি

 



#স_হ_জ_গ_ল_প
কাঠবিড়ালি কাঠবিড়ালি
সুস্মিতা কুণ্ডু

এক বটগাছের কোটরে একটা কাঠবিড়ালি থাকত। একদিন তার বড় সাধ গেল, কাঁচা নয় ভাজা বাদাম খাবে। বাদাম ভাজা কি মুখের কথা? উনুন চাই, আগুন চাই, কড়াই চাই, হাতা চাই, বালি চাই। এত ঝামেলা, তবুও কাঠবেড়ালি পিছু হঠল না। কাঠবিড়ালি গাঁয়ে গিয়ে হাজির হল। ভুলুদের বাড়ির দরজায় টোকা দিয়ে বললে, 
-“আমায় একটা উনুন দেবে? বাদাম ভাজব।”
ভুলুর মা বললে, 
-“সে নাহয় দেব বাছা তবে আগুন তো দিতে পারব না। আজ আমাদের সব কাঠকুটো শেষ হয়ে গেছে।”

কাঠবিড়ালি তখন গেল কাঠুরের বাড়ি। বলল, 
-“কাঠুরে ভায়া আমায় একটু কাঠকুটোর আগুন দেবে? বাদাম ভাজব।”
কাঠুরে বলল, 
-“সে তো দেব তবে হাতা-কড়াই আমি দিতে পারব না বাপু। আমার বৌ যে তাইতে খোকাখুকুর ভাত রাঁধছে।”

কাঠবিড়ালি তখন গেল কামারের বাড়ি। হেঁকেডেকে বলল, 
-“কামারভায়া আমায় একটা হাতা-কড়াই বানিয়ে দাও না গো, বাদাম ভাজব।”
কামার বলল, 
-“ওই তো কত কড়াই কত হাতা পড়ে রয়েছে আমার কামারশালায়। যেটা খুশি নিয়ে যাও না, কে মানা করেছে! তবে বালি আমার কাছে নেই, ও তোমাকে নিজেকেই খুঁজে আনতে হবে।”

কাঠবিড়ালি বালি খুঁজতে গেল নদীর চরে। গিয়ে বলল, 
-“ও নদী! তুমি কুলকুলিয়ে বয়ে যাও। আমার একটু উপকার করো ভাই। ক’ মুঠো বালি চাই যে আমার। বাদাম ভেজে খেতুম।”
কেউ সাড়া দিল না। 
কাঠবিড়ালি ফের হেঁকে শুধোয় একই কথা। 
তবুও কেউ সাড়া দিল না। 

নদীর পাড়ে চরছিল সাদা বক। সে হো হো করে হেসে বললে, 
-“কী বোকা কাঠবিড়ালি! খামোখা বসে বসে হাঁকডাক করছে। এই তো এত বালি ছড়িয়ে রয়েছে চারিদিকে। নিয়ে যাও না বাপু কত চাই তোমার।”
কাঠবিড়ালি ঝোলাভরে বালি তুলে নিল। বকের ওপর একটু রাগ হল বোকা বলেছে বলে তবে কেউ উপকার করলে তার ওপর মান করতে নেই। তাই আর কথা বাড়াল না।

কাঠবিড়ালি তো খুশিতে নাচতে নাচতে বালি হাতা কড়াই আগুন সব নিয়ে চলল ভুলুদের বাড়ি। ভুলুর মায়ের উনুনে বাদাম ভাজবে। সব মাল মশলা নিয়ে পৌঁছলে পর ভুলুর মা উনুনে আগুন দিয়ে তাইতে কড়াই বসিয়ে বালি ঢেলে হাতা দিয়ে, সব সাজিয়ে গুছিয়ে তয়ের করে দিল। তারপর বলল, 
-“হ্যাঁ গো কাঠবিড়ালি সবই তো আনলে। তবে বাদাম যে ভাজবে সেই বাদামটা কই?”
কাঠবিড়ালির তো মাথায় হাত! এটা ওটা সেটা জোগাড় করতে গিয়ে আসল জিনিসটাই তো আনতে ভুলে গেছে। এখন গাছে উঠে বাদাম পাড়ার মত সময় তো আর নেইকো। এবার কী উপায়? এত খাটুনি সবই বোধ হয় জলে গেল। 

এমন সময় সাদা বক তার ইয়া বড় ঠোঁটে একটা পুঁটুলি ঝুলিয়ে উড়তে উড়তে এসে হাজির হল। হাঁপাতে হাঁপাতে ভুলুদের বাড়ির দাওয়াতে বসে বললে, 
-“জানতুম এমনটাই হবে! তুমি যা হাঁদা কাঠবিড়ালি! এই নাও ধরো দেখি কাঁচা বাদাম। এবার ভেজে খাও যত খুশি।”
সবাই চেয়ে দেখে বকের পুঁটুলি ভরা কাঁচা বাদাম। ভুলুর মা তো ঝটপট বাদাম ভাজতে শুরু করল ফটফট আওয়াজ তুলে। কাঠবিড়ালি নেচে নেচে ঘুরে ঘুরে সেই বাদামভাজা বিলোলো ভুলুকে, কাঠুরে ভাইয়ের খোকাখুকুকে, কামারভায়াকে, সবাইকে। একা খাওয়ায় মজা কই? 

এদিকে সাদা বককে বাদামভাজা দিতে গেলে সে হাই তুলে বললে, 
-“আমার দাঁত কই যে বাদামভাজা খাব?”
কাঠবিড়ালি তখন শিগগির ভুলুর মায়ের হেঁশেল থেকে শিল নোড়া এনে আমকাঠের পিঁড়ি পেতে বসল, সাদা বককে বাদাম বেটে দিতে হবে তো! বকটা একটু বেশি বকবক করলে কী হবে, ভারি ভালোমানুষ যে। 

(ছবি: সুকান্ত)