গল্প : রাজকন্যেদের গপ্পো



রাজকন্যেদের গপ্পো
সুস্মিতা কুণ্ডু

রাজা রণবিজয় মনে একরাশ উৎকণ্ঠা নিয়ে, আঁতুড়ঘরের বাইরে, এমাথা থেকে ওমাথা পায়চারী করেই চলেছেন। আজ রাজকার্যেও মন বসেনি, শিকারেও যাননি, মন্ত্রীমশাই এর সাথে পাশার ঘুঁটি সাজিয়েও বসেননি। আশায় বুক বেঁধে অপেক্ষা করে চলেছেন শুধু, এই বুঝি সুখবর এল। এই বুঝি সাতরাজার ধন এক মাণিক, তাঁর বংশপ্রদীপ, রাজপুত্তুর জন্ম নিল। চার চারটে কন্যসন্তানের জন্মের পর রাজা রণবিজয় অত্যন্ত দুঃখী হয়ে পড়েছিলেন। এত বড় এই সোনার রাজ্য, বিজয়নগর। রাজপুত্র না জন্মালে সে রাজ্য রক্ষা করবে কে? এবারে তাই অনেক যজ্ঞ, জলপড়া, মানত, সমস্ত কিছু করে রাজা ভারী আশায় আছেন। এইবার বুঝি সদয় হবেন ঈশ্বর। 

হঠাৎ আঁতুড়ঘরের ভেতর থেকে সদ্যজাত শিশুর কান্নার আওয়াজ ভেসে এল। নাহ্!  কান্না শুনে কি কখনো বোঝা যায়, ছেলে না মেয়ে? কিছুক্ষণ পর ধাই’মা বেরিয়ে এসে খবর দিল,

“কন্যে এল রাজপ্রাসাদে, আলো করে মায়ের কোল
রঙটি যে তার সোনার মত, মধুর মত মুখের বোল।
স্বর্ণলতা, পুষ্পলতা, মাধবীলতা, তরুলতা, চার বোন
তাদের কোলে ছোট্ট পরী, আশালতা ভরাবে মন।”

কিন্তু রাজামশাই-এর মন মোটেও ভরল না। কোনোক্রমে গজমুক্তার হারের ছড়াটা গলা থেকে খুলে বাম হাতে করে ধাইমার হাতে ফেলে দিয়ে, দরবারের উদ্দেশ্য প্রস্থান করলেন। 
এত যজ্ঞ করেও যখন পুত্রসন্তান লাভ হ’ল না তখন রাজ্যপাট রেখেই বা কী হবে! রাজামশাই নির্দেশ দিলেন সেনাপতিমশাইকে,
-“সাজাও সপ্তডিঙ্গা, শ্বেত অশ্ব, স্বর্ণ রথ, লোক লস্কর, দেশভ্রমণে যাব।”

দরবারের সকলের অনুরোধ, রাণীমাসহ চারকন্যের কান্না, নবজাতিকার নিষ্পাপ কোমল হাসির শব্দ, কিছুতেই তাঁর মন টলল না। আশালতার মুখদর্শনও করলেন না রণবিজয়, রওয়ানা দিলেন অনির্দিষ্টকালের অগস্ত্যযাত্রায়। একটা একটা দিন পার হয়, মাসের পর মাস যায়, বছর গড়ায়, রাজামশাই আর ফেরেন না। পাঁচবোন শশীকলার মত বড় হয় ধীরে ধীরে। রাণীমা মেয়েদের শুধু অন্দরমহলের শিক্ষাতেই সীমাবদ্ধ রাখেননি। বিভিন্ন শিল্পকলার সাথে সাথে তারা যুদ্ধবিদ্যাও শেখে। নৃত্য সঙ্গীত অভ্যাসের সাথে সাথে তারা কূটনীতিরও চর্চা করে। 

কিন্তু সবকিছুর মাঝেও একটা শূন্যতা যেন সকলের হৃদয়ে কাঁটার মত গেঁথে থাকে। যতই গুণবতী হোক, রাজকন্যারা কি রাজ্যের দায়িত্ব নিতে পারবেন? ভিন্ দেশের রাজপুত্রদের সাথে 
বিবাহ হলেই তো তাঁরা সেই রাজ্যের যুবরাণী হয়ে চলে যাবেন। রাজামশাইও সেই যে সপ্তডিঙ্গা লোকলস্কর নিয়ে গেলেন, আর একটা মানুষও ঘরে ফিরল না। বারে বারে দিকে দিকে লোক পাঠিয়েও তাঁদের কোনো সংবাদ পাওয়া যায়নি। রাজ্যের লোক ক্রমে ক্রমে অসহিষ্ণু হয়ে উঠতে লাগলেন। 

রাজকন্যেদেরও মনে প্রশ্নের ঢেউ। সব সখীদের বাবা রয়েছেন, কিন্তু ওদের বাবা, খোদ রাজ্যের রাজামশাই, তাঁর স্নেহের হাত কেন নেই কন্যেদের মাথায়। রাণীমাকে শুধোয় পাঁচ কন্যে,

“মা গো মা, এবার বলো
বাবা মোদের কোথা’ গেল?
পাঁচ কন্যে, সারা রাজ্য
অপেক্ষাতেই কেঁদে ম’ল”

রাণীমার মুখে কথা সরে না, উত্তর জোগায় না। তিনি নিজেও তো দিন রাত খুঁজেছেন রাজামশাইকে। রাজ্য সামলানো, মেয়েদের সকল রকমের শিক্ষায় পটু করে তোলা, সবকিছুর পর বড় ক্লান্ত রাণীমা। মায়ের কষ্ট দেখে মেয়েরা মনে মনে শপথ করে, বাবাকে ফিরিয়ে আনবেই। রাজ্য পরিক্রমার নামে, সকলের অগোচরে তারা প্রচেষ্টা চালাতে থাকে রাজামশাই সম্পর্কে সংবাদ সংগ্রহ করার। কিন্তু বছর পনেরো আগের সেই দুঃস্বপ্নের দিনটার সম্পর্কে কেউই বিশেষ সন্ধান দিতে পারে না। রাজ্যের বহু মায়ের কোল খালি করে অনেক মানুষই রাজার সঙ্গী হয়েছিলেন। এমনই এক বৃদ্ধ গ্রামবাসী অবশেষে আশার আলো দেখাল রাজকন্যেদের। অতি বৃদ্ধ এই মানুষটি বাস করেন রাজ্যের একপ্রান্তে। শান্ত সৌম্য এই বৃদ্ধ অসীম জ্ঞানের অধিকারী। শুভ ক্ষমতার ধারক এক সাধক। তাঁর একমাত্র দৌহিত্র্য সেই পনেরো বছর আগে নিরুদ্দেশের পথে পাড়ি দিয়েছে, রাজামশাই-এর সাথে। 

এ যাবৎ তিনি বহু গণনা সাধনা করেও নাতির সন্ধান পাননি। তবে এটুকুন জানতে পেরেছেন সকলে জীবিত আছে। এবার একমাত্র উপায় বাকী রয়েছে, অন্ধকারের শক্তির উপাসনা। আলোকের শক্তির সীমার বাইরে নিশ্চয়ই কোথাও রাজামশাই ও বাকী সকলরা আছেন। সেই ঠিকানা বলতে পারবে একমাত্র আঁধারের উপাসক। 
কন্যেরা সমস্বরে বলে ওঠেন,
-“তবে কী আর কোনো উপায় নেই দাদাঠাকুর, সকলকে ফেরাবার?”
-“আছে মা! কিন্তু সে বড় ভয়ঙ্কর উপায়। বহুবছর আগে এই রাজ্যে এক আঁধারের উপাসক থাকত। আমার পিতা এবং রাজামশাই এর ঠাকুর্দা মিলে তাকে রাজ্য থেকে বিতাড়িত করে সারা রাজ্য ঘিরে জাদুর বন্ধন দিয়ে দেন। রাজ্যের সীমানার বাইরের এক দুর্গম জঙ্গলে সে তান্ত্রিক আজও আছে। আমি এই জাদুবন্ধন তাই এখনও রক্ষা করে চলেছি। আমার পরে এটা করার কথা আমার দৌহিত্র্যর, কিন্তু সে তো...
একমাত্র ঐ তান্ত্রিকই পারে রাজামশাই, আমার নাতি, এবং বাকী সকলের সন্ধান জানাতে। আমি এ তথ্য বুকে লুকিয়ে রেখেছি, কারণ গণনা করে জেনেছি এ রাজ্যের কারোর এই দুঃসাধ্য সাধনের ক্ষমতা নেই। একমাত্র রাজরক্তের বাহকেরই ক্ষমতা রয়েছে ...”
-“তবে আমরাই যাব সেই তান্ত্রিকের কাছে।”
-“সে যে বড় কঠিন কাজ মা, তোমরা কী পারবে?”
-“কেন পারব না? আমরা মেয়ে বলে? তুমি শুধু পথ বাতলে দাও দাদাঠাকুর।”

অবশেষে পথের হদিশ নিয়ে পাঁচ বোন চলল অভিযানে। 

“বাহুতে মোদের অসীম বল
বুকেতে জ্বলে দাবানল,
এক করে দিই জল আর স্থল
ফিরিয়ে আনি বাবাকে, চল”

রাজ্যের সীমানা পেরিয়ে আরও বেশ কিছুটা পথ চলার পর এসে পৌঁছল ওরা এক গহীন জঙ্গলের ধারে। সামনে একটা ভাঙাচোরা নোংরা অট্টালিকা। বহুদিনের অযত্নের ফলে আগাছায় ভর্তি। কটু গন্ধে ভারী হয়ে আছে বাড়িটার চারিদিক। মনুষ্য বসবাসের অযোগ্য। এধারে ওধারে মরা পশু, এমনকী মানুষের হাড়গোড়   কঙ্কাল খুলি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। পাঁচ বোনের বুক একটু কেঁপে উঠল। শক্ত করে একে অপরের হাত ধরল। ওমনি এক নিমেষে সব ভয় যেন কোথায় চলে গেল। 
অট্টালিকায় প্রবেশ করে এদিক ওদিক বেশ খানিকক্ষণ খোঁজাখুঁজি করল। এমন সময় একটা সিঁড়ি চোখে পড়ল, যেটা পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে চলে গেছে মাটির গভীরে। তার তলা থেকে ক্ষীণ একটা আলোর আভা ভেসে আসছে। পাঁচ বোন একে একে সেই পাতালপুরীর গর্ভগৃহে নামল। সামনে একটা নরমুণ্ড দিয়ে তৈরী সিংহাসনে বিকটদর্শন এক তান্ত্রিক বসে। তার বেশভূষা দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে আঁধারের উপাসক। 

রাজকন্যেদের দেখে অট্টহাস্য করে সে বলে উঠলো, 
-“আগে ওই বুড়ো সাধককে বল রাজ্যের চারপাশের বাঁধন খুলতে, তবেই সন্ধান পাবি তোদের বাবার!”

বড় কন্যে স্বর্ণলতা বলে উঠল,
-“না তা সম্ভব নয়! আপনি তার বদলে যত খুশি সোনা রত্ন হীরে মাণিক নিন। শুধু কীভাবে বাবাকে ফিরে পাব সেটা বলে দিন।”
-“হুমম .. সোনা! সোনা চাইনে তবে স্বর্ণলতা চাই। কী রাজকন্যে, তান্ত্রিককে বিবাহ করবে নাকি? তবেই দেব রাজার সন্ধান।”

চার বোন তো দিদিকে রক্ষা করতে হাঁ হাঁ করে উঠলো। কিন্তু স্বর্ণলতা নিরুপায় হয়ে দেখলো এছাড়া বাবাকে উদ্ধার করার আর কোনো রাস্তা নেই। চিরকাল পাঁচবোন সর্বগুণে পারদর্শী হওয়া সত্ত্বেও ব্রাত্য হয়ে থেকেছে। কখনো পিতৃহীন বলে করুণার পাত্রী হয়েছে, কখনও বা রাজা রণবিজয়ের রাজ্যত্যাগের কারণ হিসাবে দোষের ভাগী হয়েছে।আজ আর ব্যর্থতার মুখ দেখতে চায় না। সবার বড় বোন হিসাবে এই আত্মত্যাগ তাই রাজকন্যা স্বর্ণলতাকে করতেই হবে। 
শয়তান তান্ত্রিকের প্রস্তাবে সম্মত হল স্বর্ণ। তান্ত্রিক তখন কঙ্কালের করোটির ওপর বসানো স্ফটিকের গোলকে স্বর্ণলতার হাতটা রেখে, তার চারধারে ঘুরে ঘুরে বিকৃত সুরে মন্ত্র পড়তে লাগল। 

“তিন তুড়কি, চার চরকি, 
চকমক কর জাদু গোলকি।
লাগ লাগ লাগ, লাগ ভেলকি
রাজার খবর বল তো দেকি!”

ধীরে ধীরে স্ফটিকের গোলকে আলো ফুটে উঠল, রাজা রণবিজয়ের ছবি ভেসে এল। ইসসস কী দশা হয়েছে রাজামশাই-এর। রোগা জিরজিরে শরীর, বুক অব্দি লম্বা দাড়ি, ছেঁড়াখোঁড়া আলখাল্লা পরনে, লম্বা শিকলে একটা পা বাঁধা, হাতদুটোতেও বেড়ী, একটা পাথরের ঘরে বন্দী। একমাত্র কপালে তিলকের মত বংশচিহ্ন দেখে বোঝা যাচ্ছে উনি রাজা রণবিজয়। মেয়েদের চোখ বেয়ে জলের ধারা নামল।
-“তান্ত্রিক, বলে দাও ওই পাথুরে কারাগারের পথ। কীভাবে ওখানে পৌঁছব? কী করেই বা উদ্ধার করব বাবাকে?”

  “কানাবুড়ির বন, ঐ দেখা যায় দূরে,
   জাদুগাছের কাঠে, ভেলাটি নাও গড়ে,
   ভাসাও সেই তরী, মায়াসাগরের জলে,
   বিষদ্বীপের পাষাণদূর্গে, বন্দী এক’শ তলে।”

আঁধার তান্ত্রিকের থেকে উপায় জেনে, চোখের জলে স্বর্ণলতা দিদিকে বিদায় জানিয়ে বাকি চার বোন মিলে চলল কানাবুড়ির জঙ্গলের দিকে। জঙ্গলের ভেতর ঢুকে এদিক ওদিক খুঁজতে লাগল, কোথায়ই বা কানাবুড়ি আর কোথায়ই বা জাদুগাছ। হঠাৎ দূরে জঙ্গলের মাঝে বেশ খানিকটা ফাঁকা জায়গায় নজর গেল চার বোনের। দৌড়ে সেইদিকে গিয়ে দেখল, একটা আদ্যিকালের নুয়ে পড়া ঝুরিওয়ালা গাছ। পাতাগুলো ভারী অদ্ভূতদর্শন, এমন পাতাওয়ালা গাছ তারা না চোখে দেখেছে না পুঁথিতে পড়েছে। গাছটার ত্রিসীমানার মধ্যে একটা ঘাসও গজায়নি। একটা পাখপাখালীর বাসা নেই সেই গাছের ডালে। একটা কাঠবেড়ালীও ঠাঁই নেয়নি গাছের কোটরে। 

এই গাছই নির্ঘাৎ সেই জাদুগাছ। চার বোন হাতের তরবারিকেই কুঠারের মত বাগিয়ে নিয়ে কোপ বসাতে গেল গাছের ডালে। কিন্তু এ তো যেমন তেমন গাছ নয় যে সাধারণ তরবারির আঘাতে ছিন্ন হবে। গাছের একটি পাতাও বৃন্তচ্যুত হ’লনা। হঠাৎ গাছের গুঁড়ির বড় মত কোটর থেকে একরাশ ধোঁয়া বেরিয়ে এল। বোনেরা তো সেই ধোঁয়ার জ্বালায় তরবারি ফেলে চোখ রগড়াতে লাগল।খানিক বাদে চোখ মেলে দেখে একটা কুঁজওয়ালা বুড়ি থুত্থুড়ি মানুষ তাদের সামনে দাঁড়িয়ে। কিন্তু তাকে কী মানুষ বলা যায়? একটাই মাত্র চোখ তার, ঠিক কপালের মাঝখানটায়। সাংঘাতিক খ্যানখ্যানে গলায় সে বলল,

“ক্যা ব়্যা ছুঁড়ি, আপদগুলো 
গাছের গায়ে কোপ বসালো,
জানিস নে এটা জাদুর গাছ?
সবক’টাকে মারবো আজ”

মেয়েরা বলে,

“কানাবুড়ি লো কানাবুড়ি
ভুল হ’ল মোদের, থুক্কুড়ি।
মোরা, বন্দী রাজার কন্যে,
এলাম জাদু কাঠের জন্যে।”

-“উঁউউউ, জাদু গাছের ডাল চাই! কী নজরানা এনেচিস শুনি?

-“কী নজরানা চাই বলো। সোনা রুপো হীরে মোতি! যা চাইবে তাই দেব। তুমি শুধু জাদু গাছের ডাল দাও। নইলে ভেলা বাঁধব কী করে আর মায়াসাগর পাড়ি দিয়ে বাবাকে বাঁচাবই বা কেমন করে!”

-“হীরে মোতি! ওসব আমার জাদুগাছের ডাল ঝাঁকালেই পড়ে। এমন জিনিস চাই আমার যা অন্য কারোর নেই। আমার রাজকন্যে বাঁদী চাই। থাক তোদের একজন দাসী হয়ে আমার গাছকোটরে। তবেই পাবি ডাল।”

এবার এগিয়ে এল মেজবোন পুষ্পলতা। 
-“আমি থাকব তোমার দাসী হয়ে। তার বদলে দাও তুমি আমার বোনেদের জাদুকাঠ। উদ্ধার করবে ওরা আমাদের বাবাকে। নাহলে  স্বর্ণদিদির বলিদান যে বৃথা যাবে।”

কানাবুড়ি পিঠে ওই বিশাল কুঁজ নিয়ে একপাক নেচে নিল তারপর বিড়বিড় করতে লাগল,

 “ফট ফট ফট, জাদুর কুঠার
  মট মট মট, কাট দেখি ডাল
  ঝটপট চাই, দাসী যে আমার
  কাজ করাব, পাড়ব যে গাল।”

যেই না বলা ওমনি একটা কাঠঠোকরা পাখি কোথা থেকে উড়ে এসে ঠক ঠক ঠক করে চক্ষের নিমেষে অনেকগুলো ডাল কেটে মাটিতে ফেলে দিল। গাছের কাটা ডালগুলো মাটি স্পর্শ করা মাত্রই ফের নতুন ডাল গজিয়ে গাছ আবার যেমন কে তেমন হয়ে গেল। আর পুষ্পলতাকে নিয়ে কানাবুড়িও গাছের কোটরে অদৃশ্য হয়ে গেল। 

তিন বোন তখন তাদের স্বর্ণদিদি আর পুষ্পদিদির আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে, মনকে শক্ত করে, ভেলা গড়তে শুরু করল। জাদুগাছের কাঠ আর ঝুরি দিয়ে একটা শক্তপোক্ত ভেলা বানিয়ে সেই ভেলে ঘাড়ে নিয়ে তিনজনে হাঁটা দিল। জঙ্গলের অপর প্রান্তে আছে মায়াসাগর। মায়াসাগরে ভেলা ভাসিয়ে পৌঁছতে হবে বিষদ্বীপে, যেখানে পাষাণদূর্গে বন্দী আছেন রাজা রণবিজয়। 

মায়াসাগরের সামনে দাঁড়িয়ে অবাক তিনবোন। জলের রঙ ঘোরতর রক্তবর্ণ। এই সাগরে নৌকা ভাসাতে বুকের পাটা চাই বটে। রাজামশাই এর সপ্তডিঙ্গার সলিল সমাধি ঘটেছে এই সাগরেরই গর্ভে। কিন্তু এত লোক লস্কর, সবাই কি মারা গেছে জলে ডুবে? এ প্রশ্নের উত্তর মিলবে একমাত্র বিষদ্বীপে। 

তিনবোনে ভেলা ভাসিয়ে দিয়ে, তাইতে চেপে বসে, দাঁড় বাইতে শুরু করল। বেশ কিছুটা যাওয়ার পর কানাবুড়ির জঙ্গলটা দিগন্তরেখা থেকে মিলিয়ে গেল। চারদিকে শুধু লাল জল। কোনদিকে নৌকো বাইবে আঁচ করে উঠতে পারছেনা বোনেরা, এমন সময় প্রবল এক ধাক্কায় দুলে উঠল নৌকাটা। চারদিকের জল তোলপাড়। সাগরের অতল গহ্বর থেকে নতুন কোন বিভীষিকা ধেয়ে আসছে ভেলার তিন অসম সাহসী যাত্রীদের দিকে কে জানে! সাধারণ কাঠের নাও হ’লে কখন সমুদ্রের তলায় ঠাঁই হ’ত, একমাত্র জাদুগাছের কাঠের ভেলা বলেই ভেসে রয়েছে। 

ধীরে ধীরে জলের তলা থেকে উঠে এল বিকট সেই দানব। আটটা শুঁড়, শুঁড়ে বিষ ভরা থলি, বিশাল মাথা, মাথায় হাজার চোখ। আর একটা আকাশ থেকে পাতালব্যাপী একটা মুখগহ্বর। তিন বোন আতঙ্কে তরবারি হাতে অপেক্ষা করতে থাকে কখন সেই দানব তার মৃত্যুর গ্রাসে টেনে নেবে ওদের। এমন সময় আকাশে ওদের মাথার ওপর দিয়ে সই কাঠঠোকরা পাখিটা উড়তে উড়তে মানুষের গলায় বলে ওঠে,

“মায়াসাগরে দানবের বাস
 জাগায় বুকেতে মরণ ত্রাস,
 একজন হ’লে দানোর গ্রাস 
 বাকি দু’জনের বাঁচার আশ।”

তরুলতা, আর আশালতাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই তরবারিটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে, মাধবীলতা সোজা ঝাঁপ মারলো সেই জলরাক্ষসের উন্মুক্ত সুবিশাল মুখগহ্বরে। সেই দানোও কালবিলম্ব না করে মাধবীলতাকে গিলে নিয়ে জলের গভীরে ডুব দিল। সাগরের লাল জল তৎক্ষণাৎ শান্ত হয়ে গেল। দুই বোন তখন দিশাহীন, হতবাক, শোকস্তব্ধ। তিন তিনজন দিদিকে হারিয়ে কীভাবে উদ্ধার করবে বাবাকে সেই ভেবে আকূল হ’ল। এমন সময় মাথার অনেকটা ওপরে পাক খেতে থাকল সেই কাঠঠোকরা পাখি। যেন ওদের দিকনির্দেশ করছে। 
দাঁড় বেয়ে অনুসরণ করতে লাগল ওরা সেই পাখিকে। বেশ কিছুক্ষণ পর দিকচক্রবালে একটা কালো ফুটকির মত স্থলভাগ  দেখা গেল। আকাশের দিকে চেয়ে দেখল পাখিটা আর নেই। 

ধীরে ধীরে ভেলাটাকে দ্বীপের গায়ে ভেড়াল দুই বোন। সমস্ত সমুদ্রতটটাই কালো পাথরে ঢাকা। গাছপালার বিশেষ চিহ্ন নেই। দূরে দ্বীপের মাঝ বরাবর দেখা যাচ্ছে একটা দূর্গ, তাতে চার চারটে আকাশছোঁয়া মিনার। বহু কষ্টে ক্লান্ত শরীরকে টানতে টানতে সেই দূর্গটার পাদদেশে পৌঁছল তরুলতা আর আশালতা। সামনের বাঁদিকের মিনারটা সবচেয়ে উঁচু। ঐটেই তবে সেই এক’শ তলা মিনার যাতে বন্দী আছে রাজা রণবিজয়। 
কিন্তু হায়! সেই দূর্গে প্রবেশ করবে কেমন করে! তার চারপাশে বেড় দেওয়া একটা চওড়া পরিখা, আর তাতে চরে বেড়াচ্ছে বিকটদর্শন সব জীব। কিছুটা কুমীরের মত শরীরের সামনের দিকটা, আর বাকিটা সাপের মত লম্বা লেজ। তাদের ভয়াল ভয়ঙ্কর দাঁতের সারি, সেই দাঁতের গোড়ায় আবার বিষের থলি, সাক্ষাৎ মৃত্যুর রূপ। পরিখার ধার বরাবর ঘুরে ঘুরে দেখল দুই বোন একমাত্র একটা জায়গাতেই বেশি কিছু পাথরের মনুষ্যমূর্তি তাদের হাতগুলো পেতে দাঁড়িয়ে আছে। পরিখার তলা অব্দি প্রোথিত সেই মূর্তিগুলো। দুই বোন মূর্তিগুলোর হাতে পা রেখে রেখে এগোতে শুরু করল। চারপাশে প্রদক্ষিণ করছে সেই বীভৎস জীবগুলো। পা ফস্কালেই, ওদের কামড়ে মৃত্যু অনিবার্য। শেষ মূর্তিটা অব্দি পৌঁছে, থামতে বাধ্য হ’ল ওরা। সামনে আর মুর্তি নেই, এদিকে আর একটা পা রাখার জায়গা থাকলেই পেরিয়ে ওইপারে যাওয়া যায়। 

আচমকা মাথার ওপর ডানা ঝাপটানোর আওয়াজে চোখ তুলে দেখে, সেই কাঠঠোকরাটা। ফের সে বলে উঠল,

“মন্ত্রঃপূত জলে ভরা
 মৃত্যপুরীর পরিখা,
 শরীর জমে পাষাণ হবে
 যেই পড়বে জলে পা”

শুনে আর দু’বোনের বুঝতে বাকি রইল না এবার কি কর্তব্য। তরুলতা বলল,

“আশালতা বোন আমার
তোর হাতেই রইল ভার,
পাষাণ হয়ে হব সোপান
বাবাকে তুই ফিরিয়ে আন।”

পরিখার জলে পা দেওয়ামাত্র তরুলতাও ঐ রকম একটা পাষাণমূর্তির রূপ নিল। তার পাথর হয়ে যাওয়া হাতে ভর রেখে উল্টোদিকের পাড়ে পৌঁছল আশালতা। না এবার আর ওর চোখে একটা ফোঁটাও জল নেই। মন শক্ত, সংকল্প দৃঢ়। চার দিদির বলিদান এভাবে তো মিথ্যা হতে দেওয়া যায় না। এক পা এক পা করে ও রওনা দেয়, সবচেয়ে উঁচু ঐ একশতলার মিনারটার দিকে। 

দূর্গের দ্বার সম্পূর্ণ উন্মুক্ত। এ দূর্গ যে খোদ শয়তানের অনুচরের অন্ধকারের রাজ্য। তার বোধহয় স্বপ্নেও মনে হয়নি যে এই দূর্গে আশালতার মত কোনো কিশোরী কোনওদিন পা রাখতে পারবে। 
সমস্ত মানুষকে ধরে এনে বন্দী করে তাদের প্রাণবায়ুকে শোষণ করাটাই তার কাজ। কালো ধোঁয়ার মত দেহ শয়তানের এই অনুচরের। তার এই দূর্গে প্রবেশ করার ক্ষমতা কোনো দেবদূতেরও নেই। আশালতা পা টিপে টিপে ঢুকলো দূর্গে। কেউ কোত্থাও নেই। দম নিয়ে শুরু করল সিঁড়ি বেয়ে উঠতে। মিনারের প্রতিটা তলায় একটা করে ছোটো কুঠুরি। সম্ভবত তাইতেও কেউ না কেউ  বন্দী আছেন। আশালতা বারবার ধাক্কা দিয়েও দরজা খুলতে পারল না। 

অনেকটা সিঁড়ি ভেঙ্গে ওঠার পর, অবশেষে পৌঁছল সেই এক’শ তলার কুঠুরীতে, যেখানে বন্দী বিজয়নগরের রাজা রণবিজয়। কিন্তু কারাগারের দরজা খুলবে কী করে? আশালতা চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এমন সময় মিনারের বড় একটা ফোকর গলে সেই কাঠঠোকরা পাখিটি এসে ছণাৎ করে একটা চাবির গোছা ফেলল আশালতার সামনে। ঝটপট চাবিটা হাতে নিয়ে আশালতা লোহার দরজার তালা খুলল। ভেতরে শেকলে বাঁধা জীর্ণ শীর্ণ একটা কঙ্কালসার চেহারার মানুষ, যেমনটা তান্ত্রিক তার জাদু গোলকে দেখেছিয়েছিল। একছুটে সেই মানুষটার কাছে গিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরে আকুল স্বরে ডেকে উঠল আশালতা,

“বাবা, বাবা আমি তোমার ছোটো মেয়ে আশালতা, তোমায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসেছি।” 

কিন্তু সে মানুষটি যে কালো জাদুতে আচ্ছন্ন, কোনও কথারই উত্তর করলেন না তিনি। দূর্গের নির্বাক পাথরগুলোর মতই তাঁর দশা হয়েছে। 

এদিকে বাবার সম্বিৎ ফেরাতে ব্যস্ত আশালতা লক্ষ্যই করলনা কখন দূর্গের কোন গুপ্তস্থল থেকে একরাশ কালো ধোঁয়া বেরিয়ে, ধীরে ধীরে ওর পেছনে এসে জমাট বাঁধছে, একটা অবয়ব গড়ে উঠছে। কালো ঐ ছায়াময় অবয়ব উদ্যত হয়েছে আশালতাকে গ্রাস করতে, শোষণ করতে ওর জীবনীশক্তিকে। রণবিজয়ের ঘোলাটে দৃষ্টিতে ফুটে ওঠে আতঙ্ক, যখন দেখতে পান আশালতার প্রায় ঘাড়ের ওপরে এসে পড়া দৈত্যাকৃতি ঐ মিশকালো মৃত্যুর ছায়া। বাবার চোখদুটোতে ভয় দেখে তড়িঘড়ি পেছন ফিরে তাকায় আশালতা।  বিস্ফারিত চোখে দেখে ভয়ঙ্কর সেই আদিম আতঙ্ক। পিছতে গিয়ে পড়ে যায় ও, আস্তে আস্তে কালো অন্ধকারে ঢেকে যায় আশালতা। ঝটপটিয়ে কাঠঠোকরা পাখিটাও ঝাঁপ দেয় সেই অন্ধকারে। রাজা রণবিজয়ের গলা চিরে আর্তনাদ বেরিয়ে আসে।

মুহূর্তের জন্য যেন সবকিছু স্তব্ধ হয়ে যায়। তারপরেই তীব্র একটা আলোর রেখা ছিটকে বেরিয়ে আসে সেই অন্ধকারের ভেতর থেকে, তারপর আরেকটা, আরও একটা। মনে হচ্ছে যেন কেউ আলোর তরবারি চালিয়ে অন্ধকার অশরীরি দেহটাকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। আস্তে আস্তে ভীষণ আলোর জ্যোতিতে মিনারের একশতলার ক্ষুদ্র কারাগৃহটা আলোকিত হয়ে উঠল। রাজা রণবিজয় চোখ বুজে ফেললেন। খানিক পরে চোখ খুলে দেখলেন সামনে সৌম্যদর্শন এক মানুষ বসে, তার কোলে এক সংজ্ঞাহীন কিশোরীর মাথা। ঝনঝন করে হাতের শেকলটা খুলে গেছে। কিশোরীর মুখটা বড্ড চেনা লাগছে। ধীরে ধীরে সব মনে পড়ছে। কিশোরীটির মুখটি ঠিক বিজয়নগরের রাণীমার মত। এই কী তবে সেই মেয়ে যার মুখদর্শনও না করে দেশত্যাগ করেছিলেন এবং দুর্ভাগ্যের শুরু হয়েছিল ওঁর জীবনে। 

মেয়েটির মাথায় হাত রেখে ডাকলেন,
-“তুমি কে মা?”

সেই মানুষটি উত্তর করল,
-“রাজামশাই আমি আপনার রাজ্যের সাধকঠাকুরের দৌহিত্র্য অপরাজেয়। আপনি যখন যাত্রা শুরু করেন তখন অমঙ্গল আশঙ্কা করে আমার দাদামশাই আমাকে আপনাদের সাথে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু এই শয়তানের অনুচরের হাত থেকে আমি আপনাকে রক্ষা করতে পারিনি। উল্টে আমাকেই এক কাঠঠোকরা পাখিতে পরিণত করেছিল সে। আঁধার তান্ত্রিক, কানাবুড়ি এরা সব ওরই সৃষ্টি করা পিশাচ। তারা আমার প্রভু হয়েছিল এতদিন। কিন্তু আমার মধ্যে শুভ জাদুর ক্ষমতা তারা পুরোপুরি বশ করতে পারেনি। তাই প্রতি পদে কিছুটা হলেও আমি সাহায্য করতে পেরেছি আপনার মেয়েদের। আপনার বাকি চার মেয়ের আত্মত্যাগ, বলিদানের মাহাত্ম্যতেই আজ শয়তানের বিনাশ হল। এই আলোর জ্যোতি তাদেরই আত্মত্যাগের শক্তি, যা ধারন করেছিল আপনার সর্বকনিষ্ঠ কন্যা। শয়তানের সাধ্য কী যে তার ক্ষতি করে, উল্টে নিজেই নিকেশ হ’ল।”

-“আমার বাকি চার মেয়ে কে তাহলে কি ফিরে পাব না আর বাবা?”

-“চলুন আগে মিনারের বাইরে, সব দেখবেন। এই তো আশালতাও জেগে উঠেছে।”

অপরাজেয় আর আশালতার কাঁধে ভর দিয়ে ধীরে ধীরে মিনার থেকে নেমে দূর্গের বাইরে আসেন রণবিজয়। স্বর্ণলতা, পুষ্পলতা, মাধবীলতা, তরুলতা, চার মেয়ে ছুটে আসে, জড়িয়ে ধরে বোন আশালতা আর বাবাকে। 

-“দিদিরা, তোমরা কী করে ছাড়া পেলে?” উচ্ছ্বাসে বলে ওঠে আশালতা।

-“শয়তান নিকেশ হওয়ার সাথে সাথে সমস্ত মায়াজালের কুপ্রভাব নষ্ট হয়েছে। ঐ দেখুন মায়াসাগরের রক্তবর্ণের জল ফের নির্মল হয়েছে। পরিখার সব বিকটদর্শন প্রাণী রঙিন মাছ হয়েছে। কালো পাথরগুলো সব পুনরায় মনুষ্যশরীর ফিরে পেয়েছে। শয়তানের দূর্গ আলো ঝলমল প্রাসাদে পরিণত হয়েছে। কানাবুড়ির বন ফুলে ফলে ভরে উঠেছে, তান্ত্রিকের ডেরা ধ্বংস হয়েছে। এতদিন বিভিন্ন রাজ্যের রাজামশাইদের বন্দী করে রাখত এই দুষ্টের দল, যাতে তাঁদের উদ্ধার করতে আরও আরও মানুষ আসে এবং তাদের জীবনীশক্তি শোষণ করে এরা অমর হয়ে থাকতে পারে। আজ সেই রাজারাও মিনারের বন্দীদশা থেকে মুক্তি পেয়েছেন।” -বলে ওঠেন অপরাজেয়।

রাজা রণবিজয় হারানো লোকলস্কর, অপরাজেয় আর পাঁচ মেয়েকে বুকে নিয়ে ফিরে গেলেন বিজয়নগর রাজ্যে। পঞ্চকন্যার নামে রাজ্যে জয়ধ্বনি উঠলো চারিদিকে। রাণীমা বহুকাল পর চোখে জল মুখে হাসি নিয়ে বরণ করলেন রাজাকে আর তাঁর অসমসাহসী কন্যাদেরকে। রাজ্যে শুরু হ’ল মহা উৎসব। শুধু কি তাই? বহু রাজা, রাজকুমার সেই উৎসবে এলেন শুধু রাজকন্যাদের পানিপ্রার্থনা করার জন্য। 
কিন্তু রাজা রণবিজয় বললেন,

“কন্যারা মোর পুত্রসম, চিনতে করেছি ভুল
 এরাই আমার বংশপ্রদীপ, এরাই আমার রাজকূল
 পাঁচকন্যে মিলেজুলে করবে রাজার কার্য
 স্বয়ম্বর আর বিবাহ, ওদের ইচ্ছা শিরোধার্য।”

— সমাপ্ত —

ছড়া : ডিড্ডিমগড়ের হাম্পটি

ডিড্ডিমগড়ের হাম্পটি
সুস্মিতা কুণ্ডু

এক যে ছিল মজার দেশ, নামটা ডিড্ডিমগড়
সেইখানেতে বাস করে কারা, কাদেরই বা ঘর?

বলছি বলছি একটু রোসো, তাড়ার আছে কী?
ডিমের দেশের গল্প এবার, কইতে এসেছি।

আজব দেশের রাজা রাণী, কোটাল এবং মন্ত্রী,
এক একটা যে আস্ত ডিম্ব, প্রজা মালী সান্ত্রী!

সবাই ডিম গোটা গোটা, আছে চোখ নাক কান 
পটর পটর কয় যে কথা, আছে মুখ একখান  

ইয়া বড় গড়গড়ে ডিম, লিকলিকে হাত পা
দেশটা জুড়ে চলে বেড়ায়, ‘গড়গড়গড় ধাঁ’

ডিড্ডিমগড়ে ভারী মজা, বাঁধনহারা ভাই 
‘সেদ্ধ খাব, ভেজে খাব’, হুমকি সেথা নাই?

এমন দেশে একটা শুধু, নিয়ম লেখা আইনে
আর যা করো লাফিওনা কেউ, বাঁয়ে এবং ডাইনে।

হাঁটো ঘোরো চেঁচাও গাও, যতখুশি করা মজা
দড়াম করে লাফাও যদি, মিলবে চরম সাজা। 

দুম দুমা দুম মারামারি, ধাঁই ধপাধপ ধাক্কা
এসব যদি ভুলেও করো, মারবে সেপাই গাঁট্টা

ডিড্ডিমগড়ের ডিমেরা সব, বাধ্য প্রজা ভারী
খোলসগুলো ভাঙার ভয়ে, খেলার সাথে আড়ি। 

কিন্তু ছিল একটি যে ডিম, ভারী মজার নামটি
সবাই তাকে বেজায় বকে, ডাকে ‘দুষ্টু হাম্পটি’!

দুপুরবেলায় সবাই যখন, ঘুমোয় নাকটি ডেকে
হাম্পটি পালায় দরজা খুলে, ধরবে কে আর তাকে। 

রাজপ্রাসাদের মস্ত পাঁচিল, হাম্পটি যে যায় সেথায়
দড়ি ধরে দেওয়াল বেয়ে, বসল চড়ে মাথায়। 

ডিগবাজি খায় ঐ উঁচুতে, লাফায় দাড়ুম দুড়ুম
তাই না দেখে জানলা থেকে, রাজার আক্কেল গুড়ুম। 

হাম্পটি নাচে ধেই ধেই ধেই, পাঁচিল কাঁপে থরথর
শ্যাওলা ছিল ইঁটের মাথায়, ‘গেল গেল ধর ধর!’

পড়ল হাম্পটি পা পিছলে, ‘সড়াৎ! ধপাস! ফট্!’
যেই না ঠেকল মাটিতে গা, ভাঙল খোলস ‘মট্!’

সাদা মতন খোলসখানায়, ইয়াব্বড় হ’ল গর্ত
রাজা চেঁচান প্রাসাদ থেকে, “শিগ্গির ওকে ধর তো।”

ঘোড়ায় টানা গাড়ি নিয়ে, রাজার সৈন্য ছোটে 
এমনধারা খবর শুনে, মেলা যে লোক জোটে।

আলতো করে হাম্পটিকে সব, তুলল গাড়ির ভেতর
জুড়িগাড়ি হাঁকিয়ে ঘোড়া, ছুটল প্রাসাদ চত্বর।

বদ্যি এল হাকিম এল, এল গুণীন তান্ত্রিক
কেউ পারেনা জুড়তে তবু, হাম্পটিকে যে ঠিকঠিক।

ভাবনা বেজায় রাজার মাথায়, “কী করি, কী করি!
হাম্পটির ওই ফাটা মাথা, কী দিয়ে যে জুড়ি!”

“তাইতো বলি সবটি সময়, বড়দের কথা মানবে
নইলে ‘পরে হাম্পটির মত, বিপদে পড়ে কাঁদবে।”

কেঁদে কেঁদে হাম্পটি বলে, “ভুল হবে না আর।
“লক্ষ্মী হব শান্ত রব, মাফ করে দাও এইবার।”

রাজা তখন নিজে হাতে, রত্নকোষটি খুলে
স্বর্ণকারকে বললেন ডেকে, “যা লাগে নাও তুলে।”

“গলিয়ে সোনা ছাঁচ বানিয়ে, জোড়ো হাম্পটির মাথা”
ঘাড় নাড়িয়ে স্যাঁকরামশাই, রাজাকে দিল কথা।

সাদা খোলসে সোনা দিয়ে, বুজল মাথার ফুটো
হাম্পটি হ’ল বেজায় খুশি, প্রণাম ঠোকে দু’টো।

“রাজামশাই এবার থেকে, হ’ব আমি শান্ত
নইলে এমন বিপদ হবে, কে বা সেটা জানত”

ডিড্ডিমগড়ে খুশির জোয়ার, ‘রাজামশাইয়ের জয়!’
হাম্পটি এবং ডিমেরা সব, মনের সুখেই রয়।

(“Humpty Dumpty sat on a wall...” নার্সারি রাইমটির ছায়া অবলম্বনে।)

ছড়া : পেটুক শুঁয়োপোকা


পেটুক শুঁয়োপোকা
সুস্মিতা কুণ্ডু

সবুজ সবুজ পাতার ‘পরে একটা ডিম সাদা,
মিষ্টি চুমোয় ঘুম ভাঙালো আকাশের ঐ চাঁদা।

রবিবারে সুয্যিমামা বলল তাকে ‘হ্যালো!’
অমনি ডিমের ভেতর থেকে শুঁয়ো বাইরে এল।

বেরিয়ে বলে ‘বড্ড খিদে, জিভেতে জলে আসে’,
লটরপটর চলল শুঁয়ো খাওয়ারের তল্লাশে।

সোমবার খেল একটি আপেল টুকটুকে লাল,
এঁকে বেঁকে শুঁয়ো চলে, কেমন মজার চাল।

মঙ্গলবার সকাল বেলায় পেল খিদে জব্বর,
দুইখান খেল ন্যাশপাতি, চিবিয়ে কচরমচর।

বুধবারেতে তবুও পেটে দৌড় লাগায় ছুঁচো,
খান তিনেক পেয়ারা খেল করে কুঁচো কুঁচো।

বৃহস্পতি বারেতে ভাই খিদেয় পাকায় নাড়ি,
চার চারটে কলা খেয়ে হ’ল আরাম ভারী।

শুক্রবারে তবুও পেটে জ্বলছে আগুন হুহু,
পাঁচটা কমলালেবুর কমে ভরবেনা পেট, উঁহু।

পাঁচদিন ধরে খেয়েও শুঁয়ো বলে ‘আরও চাই’।
শনিবারে হ’ল মহাভোজ, এস মেনুটা শোনাই।

একখানা কাপকেক আর আইসক্রিম কোণ,
এই দুইখান দিয়ে শুঁয়ো করলো উদ্বোধন।

তারপরেতে পড়ল পাতে ছানাটা একদলা,
তরমুজের রইল পড়ে শুধু বীজ আর খোলা। 

সসেজ খেয়ে তুলল ঢেঁকুর তৃপ্তি করে বেজায়,
জানত না কো এত্ত মজা ললিপপটি চাটায়।

শেষপাতেতে রইল চটপটা আমের আচার
ক্যাডবেরিটা খেয়ে শুঁয়োর ইচ্ছে হ’ল নাচার। 

নাচতে গিয়ে পেটটা ধরে শুঁয়ো গড়ায় ধুলোয়
“উহ্ আহ্! মলুম গেলুম! আমি পেটের ব্যথায়।”

ছ’দিন ধরে ভোজটি খেয়ে এবার কেমন সাজা,
রবিবার ফের চিবিয়ে খেল একটি পাতা তাজা।

সবুজ পাতা খেয়ে গায়েব পেটেব্যথা বেবাক,
নিজের পানে চেয়ে শুঁয়ো হ’ল ভারী অবাক।

সপ্তাহকাল খেয়ে শুঁয়ো বেজায় হয়েছে মোটা,
নিজের গায়ের চারিধারে বুনল বাড়ি গোটা।

রেশম সুতোয় বোনা বাসা ‘কোকুন’ যে তার নাম,
ওরই ভেতর হপ্তাদুয়েক শুঁয়োর চলবে যত কাম।

দিন পনেরো কেটে গেল, সবাই অপেক্ষাতে বসে, 
এই বুঝি শুঁয়ো বাইরে আসে, গালভর্তি হেসে।

হঠাৎ জাদুর কাণ্ড দেখে, অবাক সবাই অতি!
কোকুন কেটে বেরিয়ে এল মস্ত প্রজাপতি। 

ডানায় যে তার রামধনু রঙ ঝিকিমিকি করে।
প্রকৃতিমায়ের জাদুতে শুঁয়ো, প্রজাপতিরূপ ধরে। 


(সমাপ্ত)

“The very hungry caterpillar” (by Eric Carle)
-এর ছায়া অবলম্বনে। 

ছড়া : দুষ্টু খুকু


দুষ্টু খুকু
সুস্মিতা কুণ্ডু


দুষ্টু খুকু ভোরের বেলায়
সুয্যিমামার সাথী,
চোখ রগড়ে উঠে বসে
যেই না পোহায় রাতি।

দুষ্টু খুকু সকাল বেলায়
বই খাতাটি ফেলে,
বাগানজুড়ে ছুটোছুটি
বেড়ায় শুধু খেলে।

দুষ্টু খুকু দুপুর বেলায়
দে’ ছুট মাঠের পার,
মা একটু তন্দ্রা গেলেই
ধরবে কে গো আর।

দুষ্টু খুকু বিকেল বেলায়
পাড়তে গিয়ে আম,
লগ বগা বগ গাছ বাইতে
ঝরল মাথার ঘাম।

দুষ্টু খুকু সন্ধে বেলায়
মায়ের পাশে বসে,
টপ টপা টপ লেখে জোখে
জটিল আঁকটি কষে।

দুষ্টু খুকু রাতের বেলায়
শুনে ধুপধাপ শব্দ,
খাটের ওপর একলা বসে
হয়েছে ভারী জব্দ।

দুষ্টু খুকু নয়কো ভীতু
চুপিচুপি খুলে দোর,
বাইরে এসে দেখল শেষে
ঘরে ঢুকেছে চোর।

দুষ্টু খুকু লুকিয়ে দেখে
চোর ব্যাটাদের কাণ্ড,
একটা চোর বেজায় ঢ্যাঙা
একটা মুশকো ষণ্ড।

দুষ্টু খুকু পা টিপটিপ
চোরের পিছে ধায়,
চোর দুখানা কপাট খুলে
ঠাকুরঘরে  যায়।

দুষ্টু খুকু পেছন থেকে
শেকলটি দেয় এঁটে,
দুই বাবাজী আটকা পড়ে
ঢ্যাঙা আর বেঁটে।

দুষ্টু খুকু জোরসে ডাকে
“শিগ্গিরি সব এসো!
চোর ধরেছি ঠাকুরঘরে
পুলিশ ডাকি রোসো।”

দুষ্টু খুকুর সাহস দেখে
অবাক পাড়ার লোক
ধন্য ধন্য করল সবাই
খুকুর জয় হোক। 

মন্ত্রী এসে মেডেল দিল
মিছিল সারা গাঁয়ে,
সাবাস খুকু সাবাস সোনা
ধন্যি দস্যি মেয়ে।


••(ইচ্ছামতীতে প্রকাশিত)••