মৌবাবু
সুস্মিতা কুণ্ডু
॥১॥
-“মা মা মা! বলো না, আজ কী আঁকবে?”
মায়ের গলাটা ছোট্ট ছোট্ট হাতদুটো দিয়ে জড়িয়ে পিঠের ওপর দোল খেতে খেতে জিজ্ঞাসা করেন নিমোবাবু।
মা তখন সবে সারা ঘর গুছিয়ে, জামাকাপড় ভাঁজ করে এসে খাটে বসেছেন নিমোবাবুকে ঘুম পাড়াতে। বাবুমশাইকে ঘুম পাড়িয়ে মা নিজেও একটু নিদ্রাদেবীর চরণে নিজেকে সঁপে দেবেন এই আশায় রয়েছেন। কিন্তু সে হওয়ার জো থাকলে তো!
নিমোবাবুর বায়নায় অপটু হাতে রঙ তুলি পেন্সিল নিয়ে বসলেন মা। যে মা নাকি নিজের ছোটোবেলাতেও জীবনবিজ্ঞানের খাতায় ছবি আঁকতে গিয়ে একশবার পেন্সিলের শীষ ভাঙত, ইরেজার চেবাতো, সেই মা-ই এখন নিমোবাবুর ফেভরিট আঁকিয়ে!
মায়ে-পোয়ে আগে বেশ খানিকক্ষণ জব্বর আলোচনা চললো কী আঁকা হবে তাই নিয়ে। মা বলে গাছ তো ছেলে বলে বাড়ি, মা বলে হাতি তো ছেলে বলে বাঘ! আসলে মা সেই ছবিগুলোই আঁকতে চান যেগুলো বেশ সহজ সহজ আর ঝপ করে একটা দু’টো রঙ ঘষলেই কাজ সারা হয়ে যাবে। কিন্তু বললেই তো আর হবে না! যতক্ষণ না নিমোবাবু মত দিচ্ছেন ততক্ষণ সাপ ব্যাঙ যা খুশি এঁকে দিলে মোটেও চলবেনা। তো শেষমেষ ঠিক হ’ল মা মৌমাছি আঁকবেন! যদিও নিমোবাবু বলেছিলেন ‘বাম্বল-বি’ আঁকতে, তবে মা আবার মৌমাছিই বেশি ভালোবাসেন কিনা। আর তাছাড়া দু’টোর মধ্যে পার্থক্যই বা কী বলো? একজন বাংলায় ‘বোঁওওও বোঁওওও’ করে গলা সাধে আর অন্যজনায় ইঞ্জিরিতে ‘বাজজজ্ বাজজজ্’ করে তান ধরে। ওই একই হ’ল!
মা তো বেশ নিমোর বাবার আঁকার খাতা থেকে চেয়েচিন্তে জোগাড় করে আনা সাদা সাদা ঝকঝকে মোটা পাতায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে আঁকতে শুরু করলেন। বেশি মোছামুছি না করে বেশ একটানে মৌমাছির স্কেচ হয়ে যেতে মা বেজায় খুশি। তারপর দিলেন তাতে বেশটি করে ডোরারাটা হলদে কালো রঙ করে। বেশ একখান বাঘা মৌমাছি হয়েছে বটে। কিন্তু নিমোবাবুর মুখে ঠিক সেই হাজার ওয়াটের হাসিটার দেখা মিললনা তখনও। মা তো যারপরনাই চিন্তিত হয়ে ভাবলেন, বুঝি ফেলই করলেন পরীক্ষায়, ছেলেকে শুধোলেন,
-“কী রে? ভালো হয়নি আঁকাটা?”
নিমোবাবু ভ্রু কুঁচকে মাথা চুলকে ঠোঁট কামড়ে অনেক ভেবেটেবে বললেন,
-“আচ্ছা মা! বাম্বল বি-টা অত বড় আর ওর ডানাদু’টো অত ছোটো। ওর উড়তে অসুবিধে হবে না?”
মা দেখলেন সত্যি তো! ডানা দুইখান শরীরের চেয়ে একটু ছোটোই হয়েছে বটে। কিন্তু মাও কম যান না,
-“শোন নিমো! আমি বরং মৌমাছিটার ডানায় একটু ম্যাজিক আল্পনা এঁকে দিই তাহলে ছোটো হলেও অনেক ক্ষমতা হবে ওর! সাঁই সাঁই করে কেমন উড়বে দেখবি!”
ম্যাজিক শুনেই তো নিমোবাবু একপায়ে খাড়া।
-“হ্যাঁ মা, হ্যাঁ মা! তাই করে দাও! বেশ হবে! ‘ম্যাজিকাল বাম্বল বি’!”
মা ওমনি আকাশী ডানায় নীল রঙ দিয়ে দিলেন চাট্টি কলকা ফুলপাতাওয়ালা আল্পনা এঁকে! হুঁ হুঁ বাবা! ছোটোবেলায় ব্যাঙের পৌষ্টিকতন্ত্র আঁকতে গিয়ে মায়ের নিজের পৌষ্টিকতন্ত্রে
ব্যথা হ’লে কী হবে, আল্পনা আঁকায় মা যাকে বলে একদম এক্সপার্ট। প্রতি বেস্পতিবার ঠাকুমাকে জ্বালাতন করে আলোচাল বাটা গোলা জলে তুলো ডুবিয়ে ঘরের দোরে দোরে কম আল্পনা দিয়েছেন নাকি ছোটেবেলায়! বলি সেই গুণ কাজে লাগবে কবে, অ্যাঁ!
ডানার আল্পনা বেশ খোলতাই হয়েছে দেখে মায়ে পোয়ে একবার চোখে চোখে কথা হয়ে গেল। তারপরে মা ডবল উৎসাহ নিয়ে মৌমাছির গায়ের সব হলুদ রঙের ওপর কমলা আল্পনা দিতে শুরু করলেন, মুখ শুঁড় হুল কিছুই বাদ গেলোনা। ম্যাজিক যত বেশি হবে ততই ভালো তাই না? সোজাসাপটা মত বাপু নিমোবাবু আর তাঁর মায়ের।
আল্পনাওয়ালা মৌমাছি বেশ রাজাগজা মৌমাছি টাইপের দেখতে হয়ে উঠেছেন। তাও নিমোবাবুর হাসিতে একটু যেন কয়েক ফোঁটা খুশি কম লাগলো মায়ের।
-“হ্যাঁ রে বাবু, এখনও হ’ল না ঠিকমত বুঝি?”
-“উমমম্ ভালো হয়েছে মা কিন্তু এই কালো রঙটা কেমন যেন একটু বড্ড অন্ধকার লাগছে।”
-“কী যে বলিস না ক্ষেপু! কালো তো অন্ধকার হ’বেই!”
-“ও মা, ও মা! একটা ম্যাজিক করো না! কালোটাকে একটু আলো করে দাওনা।”
মা একটু ভেবে একটা উপায় বার করলেন। খেলনার বাক্স থেকে একটা রুপোলী গ্লিটারওয়ালা আঠার টিউব এনে কালো রঙের ওপর চকমকে ফোঁটা ফোঁটা লাগিয়ে দিলেন।
ব্যাস!
কালোর অন্ধকার দূর হয়ে ঝকমকে আলোওয়ালা মৌমাছি থুক্কুড়ি বাম্বলবি সাদা কাগজে ঝলমল করতে লাগল। মায়ে-পোয়ে খুব আনন্দে ছবিখানা মাথার কাছে রেখে ‘ও সোনাব্যাঙ! ও কোলাব্যাঙ!’ গাইতে গাইতে ঘুমিয়ে পড়ল।
॥২॥
বেশ নিশ্চিন্তে নিমোবাবুর পাশে ঘুমোচ্ছিলেন মা। এমন সময় একটা ‘গোঁওও গোঁওও’ আওয়াজে মায়ের ঘুমটা ভেঙে গেল। কী আওয়াজ! এই রে নিজের নাকডাকার আওয়াজে নিজেরই ঘুম ভেঙে গেল নাকি? তবে নিমোবাবুর বাবা যে বলে নাকি মায়ের নাক ডাকে তাহলে মিছে কথা কয় না তো বটে! এমন সময় ফের আওয়াজটা হ’ল। অ্যাঁ! জেগে জেগে তো আর কেউ নাক ডাকেনা! তবে তো নাক ডাকার শব্দ নয় এটা! আওয়াজটা ভালো করে শুনলেন মা! ‘বোঁওও বোঁওও’! নিমোবাবু তো ছোট্ট লাল পালবালিশটা জাপটে ধরে হাসি হাসি মুখে ঘুমোচ্ছেন। তবে?
এমন সময় খাটের মাথার দিকে চোখটা পড়তেই নজরে এলো, কাগজের ওপর আঁকা মৌমাছিটা।
কী সাংঘাতিক কাণ্ড! ছবির মৌমাছিটা ডানা নাড়াচ্ছে আর ‘বোঁওওও বোঁওওও’ করে শব্দ তুলছে। মা আরেকবার চোখ রগড়ে নিয়ে তাকালেন। সত্যি সত্যিই নড়ছে যে! এ কী অশৈলী কাণ্ড রে বাবা! সকালের জলখাবারে আগেরদিন রাতের বাসী কচুরি খেয়ে পেট গরম হ’ল না তো? সাধে নিমোর বাবা বকে, বাসী খাবার পেটে পুরে উদ্ধার করার জন্য। মৌমাছিটা বলে উঠল,
-“কী গো! তুমি অমন হাঁ করে তাকিয়ে রইলে কেন বল দিকিনি? আগে কখনও মৌমাছি দ্যাকোনি নাকি?”
মা তো কোনও মতে ঢোক গিলেটিলে জবাব দিলেন,
-“বা রে! না দেখলুম তো তোমায় আঁকলুম কী করে শুনি?”
মৌমাছি মুখ জিভ বার করে ভেংচি কেটে বলল,
-“আঁকার কথা আর বলুনি বাপু! নেহাতই নিমোবাবু ভারী ভালো ছেলে তাই এই আঁকাতেই খুশি হয়। নইলে ‘পরে...”
এবার মায়ের ভারী রাগ হ’ল! সাহস তো মন্দ নয় ঐ এক পুচকি মৌমাছির!
-“কেন শুনি? কী খারাপ এঁকেছি তোমায় বাপু? মিছেই আমার বদনাম করছ। ভালো হবে না কিন্তু!”
-“মিছে! এই দ্যাকো গুনে, ক’টা পা এঁকেচো? এক গণ্ডা মোটে। আমার চারটে নয় ছ-ছ’টা পা আচে তা জানো?“
-“সে নয় দু’টো পা কম হয়েছে। তেমনি যে দস্তানা পরিয়ে দিয়েছি পায়ে আর কেমন ডানায় গোটা গায়ে কলকা আল্পনা করে দিয়েছি, তার বেলা? ও’রকম আর কারোর দেখেছো?”
-“ও আর এমন কী! ঢের ঢের দেকিচি! তুমি বুঝি প্রজাপতি দ্যাকোনি? তার ডানার নকশা দ্যাকোনি?”
মা ফের প্রতিবাদের চেষ্টা করেন,
-“আচ্ছা আচ্ছা প্রজাপতির গায়ে নাহয় নকশা আছে। কিন্তু এই যে গ্লিটার দিয়ে তোমায় এমন চকমকে ঝলমলে করে দিলুম? এমনটা আর দেখাতে পারবে?”
মৌমাছিও দমবার পাত্র নয়! সে বলে,
-“নাহ্! তুমি দেকচি কিচুই দ্যাকোনি! বলি জোনাকিপোকার নাম শুনেচো? তার গা থেকে কেমন আলো ছড়ায় দেখেচো? ঐ আকাশের তারার মত এক্কেবারে! দ্যাকো বাপু নালিশ করা আমার মোট্টে স্বভাব নয়কো! সে তুমি যা এঁকেচো এঁকেচো ওইতেই আমি কাজ চালিয়ে নেবখ’ন। কিন্তু একটা এমন মস্ত ভুল করেছো যে কী আর বলি!”
বেচারি মা ততক্ষণে কোনঠাসা হয়ে গেছেন। বেজায় দুঃখী হয়ে বললেন,
-“আবার কী ভুল করলুম?”
মৌমাছি বলল,
-“আমার ছবি তো আঁকলে কিন্তু আমি কী খাব সেটা ভাবলে কি? এদিকে আমার যে ক্ষিদেতে পেট জ্বলে যাচ্ছে।”
মা মস্ত একটা জিভ কেটে বললেন,
-“এই রে মস্ত বড় ভুল হয়ে গেছে! সত্যি সত্যি এটা আমার ভারী অন্যায় হয়েছে গো মৌবাবু। তুমি কী খাবে বলো দেখি। আমি নিমোর মধুর শিশি থেকে এক চামচ মধু এনে দেব তোমায়?”
মায়েরা আসলে কেউ না খেয়ে আছে শুনলে আর মোট্টে স্থির থাকতে পারেন না কিনা, তাই খুব চিন্তায় পড়ে গেলেন। এদিকে মৌমাছিও নতুন ডাকনাম ‘মৌবাবু’ পেয়ে খুব খুশি হয়েছে। সে নরম সুরে বললে,
-“না না ওমনি করে দিলে আমি তো খেতে পারব না গো! আমাকে যেমনি করে এঁকেছো তেমনি করেই আমার খাওয়ারও ব্যবস্থা করতে হবে। মাথা খাটিয়ে উপায় বার করতে হ’বে।”
মা একটু ভেবেই বললেন,
-“ইউরেকা! উপায় পেয়েছি!”
এই বলে রঙ তুলি আর কাগজটা টেনে নিয়ে ঝপাঝপ অনেএএএকগুলো নানা রঙের নানা আকারের ফুল এঁকে দিলেন পাতা জুড়ে।
-“কী মৌবাবু? আর তো তোমার খাওয়ার অভাব হবে না? যত খুশি ফুলের মধু খেতে পারবে। কি এবার আমার আঁকায় খুশি তো?”
মৌবাবু তো মহানন্দে মা-কে,
-“ধন্যবাদ! থ্যাংক ইউ! শুক্রিয়া! মার্সে! আরিগাতো! গ্রাসিয়াস! স্পাসিবো!...”
বলতেই থাকলো!
এতরকম ভাষায় থ্যাংক ইউ শুনতে শুনতে তো মায়ের বিষম লেগে ঘন ঘন হেঁচকি উঠতে শুরু করল।
-“হিঁক হিঁক হিঁকহিঁক!”
॥৩॥
-“মা! ও মা! কী হ’ল তোমার? এই নাও জল খাও দেখি!”
নিমোবাবুর ধাক্কায় মায়ের ঘুম ভাঙে।
ধড়মড়িয়ে উঠে বসে দেখেন ঘুমের মধ্যেই হেঁচকি তুলছিলেন, আর সেই আওয়াজে নিমোবাবুর ঘুম ভেঙে গেছে। তিনি মায়ের কষ্ট দেখে বিছানার পাশের টেবল থেকে জলের বোতল নিয়ে মায়ের পরিচর্যায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।
জলটল খেয়ে মাথা থাবড়ে হেঁচকিটা একটু বন্ধ হ’তে মায়ের খুব জোর হাসি পেল। নিমোবাবুর সাথে মজার মজার খেলা খেলতে গিয়ে কী সব যে স্বপ্ন দেখেন! এমন সময় নিমোবাবু চেঁচিয়ে ওঠেন,
-“ও মা তুমি এগুলো কখন আঁকলে? জানো তো আমি স্বপ্ন দেখছিলাম, বাম্বলবি-টা আমায় এসে বলছে ওর খুব ক্ষিদে পেয়েছে। ওরা ফুলের মধু খায় তাই না মা? তাই তো তুমি ওর চারদিকে এত্ত ফুল এঁকে দিয়েছো! আমার লক্ষ্মী মা।”
মায়ের গলাটা জড়িয়ে ধরেন নিমোবাবু।
আর মা! মা তখন পাতায় আঁকা মৌমাছিটার চেয়েও বড় বড় গোল্লা গোল্লা চোখ করে রঙবেরঙের ফুলের ছবিগুলোর দিকে চেয়ে রয়েছেন।
এই ফাঁকে দু’জনের কেউ লক্ষ্যই করলনা, একটা বড়সড় মৌমাছি ‘বোঁওও বাজজজ্’ করতে করতে জানালা দিয়ে গোলাপের টবের দিকে উড়ে গেল।
(সমাপ্ত)

No comments:
Post a Comment