বইপড়া
ঠাকুরমার ঝুলি
সুস্মিতা কুণ্ডু
••••••••••••••••••
বই রিভিউ করতে বসে প্রথমেই যেটা মনে এল, সেটা হ’ল কোন বইটার সম্পর্কে আলোচনা করব। বেশ কিছুকাল এই প্রবাসে বাংলা বই এবং সময় দুটোরই অভাবে চট করে মাথায় বই-এর নাম এলেও তার কাহিনীপ্রবাহ ধোঁয়াশা হয়ে আছে। সেক্ষেত্রে স্মরণে আসে একটাই বই যেটা আক্ষরিক অর্থেই হাজারবার পড়েছি। শ্রী দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার প্রণীত “ঠাকুরমার ঝুলি”। বইটির প্রথম প্রকাশ ১০০ বছরেরও আগে, ১৯০৭ সালে। ওঁর লেখা এবং সংগৃহীত রূপকথাগুলো যা আগে গ্রামবাংলার প্রৌঢ়-প্রৌঢ়া মানুষদের মুখে মুখে ফিরত সেগুলোই শ্রী দীনেশচন্দ্র সেনের সহায়তায় প্রকাশিত হয় “ভট্টাচার্য এ্যাণ্ড সন্স” থেকে। বইয়ের ছবিগুলোও শ্রী দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার মহাশয়েরই আঁকা।
এই বইটির মুখবন্ধ লেখেন স্বয়ং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং লক্ষণীয় ব্যপার এটাই যে, তিনি প্রবলভাবে আক্ষেপ করেছেন বর্তমানে শিশুরা “বিলাতী Fairy Tales”-এর প্রতিই বেশি অনুরক্ত এবং বর্তমানের ঠাকুমা দিদিমারাও আগের মত গল্প বলতে পটু নন।
লক্ষ্য করুন এই ‘বর্তমান’ কিন্তু এক’শ দশ বছর আগের ‘বর্তমান’, কিন্তু এই ২০১৭ সালেও একই আক্ষেপ আমাদের কণ্ঠেও শোনা যায়। পড়ুক না শিশুরা যত খুশি হ্যারি পটার বা
পার্সি জ্যাকসন। কিন্তু সেই সাথে ডালিমকুমার, দেড়-আঙ্গুলে,
বুদ্ধু-ভুতুমেদের অভিযানও পড়ুক না।
বদমাইশ উইচ-দের সাথে পাল্লা দিক না আমাদের লালকমল নীলকমলের রাক্ষসীরাণি, শীত আর বসন্তর দুষ্টু সৎমা সুয়োরাণী, কুচক্রী কাঁকনমালারা।
আর রাপানজেল, বেল, স্নো হোয়াইট, এইসব প্রিন্সেসদের থেকে আমাদের কিরণমালা, সুখু, এরা সব কোন অংশে কম যায় শুনি?
ব্যাঙ্গমা ব্যাঙ্গমীর পিঠে চেপে তেপান্তরের মাঠ পেরোতে কে না চায়! বা যদি ওই সাত সমুদ্দুর তেরো নদী পেরোনো যেত পক্ষীরাজের পিঠে চেপে, কী মজাটাই না হ’ত। যদি সেই ঘুমন্তপুরীর সোনার কাঠি রূপার কাঠিগুলো একবার পাওয়া যেত হাতে!
বড় সুন্দর সহজ সরল ভাষায় উপস্থাপিত গল্প কয়টি। পড়তে বসলে মনে হয় যেন দিদিমা বা ঠাকুমার নরম কোলে শুয়ে গপ্পো শুনছি। চোখে ঘুমের চাদর নেমে আসছে তাও অবাক চোখ বড়বড় করে দেখছি পক্ষীরাজে সওয়ার রাজপুত্তুরকে। কখনও বা তরোয়াল নিয়ে হামলা করছি রাক্ষস খোক্কসদের ওপর। গল্পের মাঝে মাঝে ছন্দের দোলা দেওয়া ছড়াগুলো যেন আরও মনোগ্রাহী।
অনেক অভিভাবক মনে করেন আগডুম বাগডুম এইসব রূপকথা পড়লে শিশুর মনে বিজ্ঞানচেতনার উন্মেষ হবে না। কিন্তু এটা সর্বৈব ভুল ধারণা। এই বই শিশুকে শেখাবে কল্পনাপ্রবণ হতে, যা ভবিষ্যতে তাকে নতুন ভাবে ভাবতে, নতুন চোখে দেখতে শেখাবে।
পরিশেষে বলি,
“আমার কথাটি ফুরা’ল
নটে গাছটি মুড়া’ল”
__________________________
No comments:
Post a Comment