সুস্মিতা কুণ্ডু
মলুয়া একটা ছোট্ট তুলতুলে ঝাপুস ঝুপুস নীলবর্ণ মেঘের ছানা। আকাশের বুকে সাঁতরে বেড়ানোই তার সারাদিনের কাজ। একদিন হয়েছে কী, আপন মনে ভেসে বেড়াতে বেড়াতে মলুয়া চলে গেল অনেক অনেক দূরে, অচেনা অজানা এক মেঘের দেশে। সেখানে সব বিশাল বিশাল কালো কালো মেঘ, ঠিক যেন দত্যি দানো, সব ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের মুখগুলো ভার, তাদের গায়ে বিকট শব্দ করে আর আলো ছিটকে বিজলী চমকাচ্ছে। মলুয়া তো সাংঘাতিক রকমের ভয় পেয়ে গেল। বাড়ি ফিরে যাওয়ার পথটুকুনও তাদের শুধোতে বুক কাঁপছে।
বুকে সাহস এনে মলুয়া একটা ওরই মধ্যে ছোট্ট আকারের ঘন কালো মেঘকে জিজ্ঞাসা করল,
-"হ্যাঁ ভাই, আমি মলুয়া। ভুল করে আমি তোমাদের রাজ্যে এসে পড়েছি। আমার রাজ্যে ফেরার পথটা একটু বলে দাও না গো!”
সে রাগী মেঘ গম্ভীর মুখ করে বলল,
-“তোমার রাজ্য আমি কেমনি করে চিনব? যদি বলো কেমন দেখতে সে রাজ্য, তবে চেষ্টা করে দেখতে পারি।”
-“আমার রাজ্য? সে ভারী সুন্দর! লাল নীল হলুদ সবুজ কত রকমের রঙিন মেঘ সেখানে ঘুরে বেড়ায়। রামধনু ওঠে এই প্রান্ত থেকে ওই প্রান্ত অব্দি। আমরা সব খেলুড়ে সাথীরা সেই রামধনুর ওপর দিয়ে এক্কাদোক্কা খেলি। দিনের বেলা সূয্যিমামা বড় বড় মেঘের আড়ালে লুকিয়ে টুকি দিয়ে লুকোচুরি খেলে আমাদের সাথে। আর রাতের বেলা চাঁদমামার সাদা আলোয় গা ডুবিয়ে আমরা গপ্পো শুনি। তারারা সব মিটমিট করে গুনগুনিয়ে গান শোনায়...”
এই শুনে রাগী মেঘ অবাক হয়ে বলে উঠলো,
-“থামো থামো! এসব আবার হয় নাকি? আমি তো জ্ঞান হয়ে ইস্তক দেখছি এ রাজ্যে সব কালো কালো ধূসর ধূসর মেঘ। আর কোনও রঙই নেই তা ছাড়া। আর চাঁদ সূর্য তারারা কেউ আসেনা আমাদের রাজ্যে খেলা করতে, গল্প বলতে, গান শোনাতে। আমরা সবসময় তাই হয় মনখারাপ করে ঝরঝর করে কাঁদি, নয়ত রেগে গুড়গুড় শব্দ করে গর্জাই। এ তুমি কেমন রাজ্যের কথা শোনালে?”
মলুয়া বলল,
-“তাই বলি তোমাদের রাজ্য এমনধারা বেরং কেন! আরে বাপু মনে খুশি থাকলে তবে না চোখে মুখে রঙ লাগবে? শুধু যদি মুষড়ে থাকো, রেগে থাকো তবে তো ধূসরই হবে। শোনো আমি বলি কী করতে হবে, চলো দেখি একটু কুমির ডাঙ্গা খেলবে আমার সাথে। তারপর দেখো কী হয়! ও হ্যাঁ তোমার নামটা তো বললে না!”
রাগী মেঘ বলল,
-“আমার নাম ঢোলকম্বল গর্জনবালা। তোমার নাম কী?”
মলুয়া বলল,
-“ইসসস কী কঠিন নামটা তোমার। আমি তোমার নতুন নাম দিলুম পালকপাখি উড়নবালা। আর আমার নাম হ’ল গিয়ে মেঘমখমল হাসিখুশি। সবাই আমায় মলুয়া বলেই ডাকে। তুমিও তাই ডেকো। আর আমি তোমায় ডাকব পলুয়া বলে। এবার আমায় ধরো দেখি কেমন পারো!
কুমির তোর জলকে নেমেছি!”
এই বলে ছুট লাগাল মলুয়া, আর তার পেছনে ছুটল পলুয়া।
বেশ খানিকক্ষণ ছুটোছুটির পর, পলুয়া ধরে ফেলল মলুয়াকে,
-“কী মজা কী মজা তোমায় ধরে ফেলেছি। এবার তুমি চোর দাও।”
বলে নাচতে লাগল পলুয়া।
মলুয়া তখন খিলখিলিয়ে হেসে উঠল।
-“সে নাহয় দেবো বাপু! তার আগে নিজের পানে একবারটি চেয়ে দেখো দিকিনি!”
পলুয়া চেয়ে দেখে এ কী ম্যাজিক! তার গায়ের কালো রঙ মুছে গিয়ে ভেতর থেকে লাল রঙ বেরিয়ে এসেছে। মলুয়া ফের হাততালি দিয়ে বলল,
-“দেখলে তো? বলেছিলাম কিনা আসল রঙ ফিরে পাবে? এবার বিশ্বেস হল? নাও এবার জোর গলায় গান ধরো দেখি আমার সাথে। তোমার রাজ্যের সকলের কান অব্দি যেন যায় সে গান!”
এই বলে মলুয়া গান ধরল, আর তার সুরে সুর মেলালো পলুয়া।
“বর্ষা বাদল গেল ঘুচে,
কালো ধূসর গেল মুছে।
আজকে হেথা রঙের মেলা,
করব শুধু গান আর খেলা।
করল জাদু মেঘ মলুয়া,
সঙ্গে জুটে মিতে পলুয়া।
মন যদি তোর থাকে খুশি
রঙ ছড়াবে রাশি রাশি।”
যতদূর গানের সুর ছড়ালো, গম্ভীর রাগী মেঘেরা সব কান খাড়া করে শুনতে লাগল। মনে একটা কেমন যেন অচেনা অজানা আনন্দ হতে লাগল তাদের। পলুয়া আর মলুয়া অবাক চোখে দেখতে লাগল, এক এক করে সব মেঘেদের গায়ে বিদ্যুৎ চমকানো বন্ধ হচ্ছে। গুরুগুরু গর্জনও আর শোনা যাচ্ছেন। মেঘেদের কালো ধূসর গায়ের রঙ ছাপিয়ে একটু একটু করে নানা লাল নীল বেগনে হলুদ সবুজ কত্ত রঙ ফুটে উঠছে।
মলুয়া বলল,
-“বন্ধু পলুয়া, ওই দেখো। রঙ ফিরে আসছে তোমার রাজ্যে। এবার তবে আমার কাজ শেষ। ঐ দূরে দেখো রামধনু। ওটা বেয়ে চলে গেলেই আমি আমার রাজ্যে পৌঁছে যাব। তারপর সূয্যিমামা চাঁদমামা আর তারাদের খবর দেব আমার বন্ধুর রাজ্যে আসতে, খেলা করতে, গান-গল্প শোনাতে। তুমি কিন্তু গান শোনাতে থেকো তোমার রাজ্যের মেঘেদের। ওদের শিখিও কেমন করে রাগ-দুঃখ না করে আনন্দে থাকতে হয়। কেমন? আমি তবে যাই এবার বন্ধু পালকপাখি উড়নবালা?”
পলুয়া কোলাকুলি করে মলুয়াকে বলল,
-“ভাগ্যিস তুমি পথ হারিয়ে এসেছিলে আমাদের রাজ্যে। তাই তো আমরা রঙ ফিরে পেলাম। আবার এসো কিন্তু বন্ধু মেঘমখমল হাসিখুশি!”
(সমাপ্ত)

No comments:
Post a Comment