সুস্মিতা কুণ্ডু
তারপর তো নিংপিং ড্রাগন আর মেই লিং রাজকন্যের মধ্যে ভারী বন্ধুত্ব হয়ে গেল। তারা রোজ বিকেলে কোনওদিন যায় সাগরপাড়ে ফু ফেং কাছিমের কাছে গল্প শুনতে। কোনওদিন বা যায় পাহাড়ের চূড়ায় বেগুনী লান হুয়া ফুলের বাগানে খেলতে। আবার কোনওদিন যে যার মায়ের কোলে শুয়ে আদর খায়। মায়ের আদর তাদের কপালে বড্ড কম জুটেছিল কি না! তাই এখন মায়েদের একবার কাছে পেলে আর ছাড়তে মন চায় না। কম তো ভোগায়নি বদমাইশ হুয়াং সুও ওদের পরিবারদের।
ও হো! তোমাদের তো নিংপিং আর মেই লিং এর সাথে আলাপই করানো হয়নি। সেই যে একটা ছোট্ট ড্রাগনছানার গল্প বলেছিলাম, যার সব আত্মীয় স্বজনদের বন্দী করে রেখেছিল দুষ্টু জাদুকর হুয়াং সুও, সেই ড্রাগনছানাই হল নিংপিং। হুয়াং সুও শুধু ড্রাগনদেরই নয়, বন্দী করেছিল রাজকুমারী মেই লিং এর মা বাবাকেও। নিংপিং তার কাছিমদাদু ফু ফেং এর পরামর্শমত হুয়াং সুওকে হারিয়ে সবাইকে মুক্ত করেছিল। সেই থেকে নিংপিং আর মেই লিং এর ভারী বন্ধুত্ব। এখন তো মেই লিং এর বাবাই ফের রাজত্ব সামলান তাই সে তার ড্রাগনবন্ধুর সাথে বেরিয়ে পড়ে বেড়ু বেড়ু করতে।
একদিন বিকেলে কী হয়েছে নিংপিং এর মা ওকে টমেটো আর বেল পেপার পুড়িয়ে তাতে মরিচ ছড়িয়ে খেতে দিয়েছে। বাইরে কালো মেঘ ঘনিয়ে বৃষ্টি নেমেছে, এমন সময় টমেটোপোড়া খেতে নিংপিং খুব ভালোবাসে। এত বৃষ্টিতে আর মেই লিং এর সাথে খেলতে যাওয়া হ’বে না বুঝি। তাই মায়ের গায়ে হেলান দিয়ে মায়ের ইয়াব্বড় পাখনার তলায় গুটিশুটি মেরে ঢুকে নিংপিং গল্প শুনছিল। ধীরে ধীরে বৃষ্টি থেমে গেল, আকাশের বুক থেকে মেঘ সরে গেল। ওরা মায়ে পোয়ে গুহার বাইরে এসে নীল আকাশের দিকে চাইল। আকাশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত অব্দি রঙিন সাতরঙা তুলি বুলিয়ে দিয়েছে যেন কেউ।
-“মা মা দেখো! রামধনু!”
আনন্দে একপাক উড়ে নেয় নিংপিং।
মা হেসে বলে,
-“জানিস রামধনুর গোড়ায় কে থাকে? লেপ্রিকন! সে মাটিতে লুকিয়ে রাখে তার সোনা ভর্তি কলড্রন। তার ভেতর থেকেই বেরিয়ে আসে রামধনু।”
নিংপিং অবাক হয়ে বলে,
-“ক্ কী? লেরপি... লেপরি... লেপ্রিকন! আর কল... করল... কলড্রন! এগুলো কী! কীসব কঠিন কঠিন নাম বলছ মা তুমি! এগুলো বলতেই তো আমার দাঁত ভেঙে যাবে আর সবাই তখন আমায় ফোকলা নিংপিং ড্রাগন বলবে, হি হি হি!”
মা বলে,
-“দূর পাগল! লেপ্রিকন হল একধরনের ছোট্ট সবুজ মানুষ। ওদের কাছে কলড্রন মানে ঘড়া থাকে। তাইতে সোনা বোঝাই করা থাকে। আর কেউ যদি লেপ্রিকনকে ধরতে পারে তাহলে লেপ্রিকন তার উইশ মানে ইচ্ছেপূরণ করে। বুঝলি?”
নিংপিং তো ভারী মজা পায় এই গল্প শুনে। ঝটপট উড়ে পাড়ি দেয় বন্ধু মেই লিং এর কাছে। মেই লিংও রাজপ্রাসাদের বাগানে দাঁড়িয়ে রামধনু দেখছিল। নিংপিং শিগগির মেই লিং এর কাছে লেপ্রিকনের গল্প বলল।
-“মেই লিং যাবে নাকি ঐ রামধনুর গোড়ায়? লেপ্রিকন দেখতে। আমি দেখেছি, আমাদের গুহাটা যে পাহাড়ে তার থেকে আরও বিশখানা পাহাড়চুড়ো দূরে, সবচেয়ে উঁচু নীলরঙা পাহাড়চুড়ো থেকে শুরু হয়েছে রামধনুটা, তারপর জঙ্গলে গাছের মাথায় মিলিয়ে গেছে। যাবে তো চল, নইলে রামধনু মিলিয়ে গেলে আর লেপ্রিকনকে দেখতে পাবো না।”
মেই লিং তো অ্যাডভেঞ্চারের নামে একপায়ে খাড়া। বলল,
-“চলো চলো, বেশি দেরি করলে রামধনু মিলিয়ে যাবে যে! সমুদ্রের তীর থেকে ফু ফেং কাছিমদাদুকেও নিয়ে যাব তবে।”
মেই লিংকে পিঠে নিয়ে উড়ল নিংপিং। প্রথমে গেল সাগরের ধারে, ডাকল গলা ছেড়ে দু’জনেই,
-“ফু ফেং দাদুউউউ!”
ফু ফেং কাছিম জলের ভেতর থেকে গলা তুলে সাড়া দিল,
-“কী ব্যাপার? এত ডাকাডাকি হাঁকাহাঁকি কেন? আমি এখন খুব ব্যস্ত! এখন বাপু খেলাধুলো করতে পারব না তোমাদের সাথে। গল্পও শোনাতে পারব না। আমি চললুম, সব সামলে আবার আসব।”
এই বলে আবার টপাং করে জলে ডুবে গেল।
এদিকে ফু ফেং দাদুর অপেক্ষা করতে গেলে রামধনু মিলিয়ে যাবে। তখন রাশি রাশি পাহাড়চুড়োর আর জঙ্গলের কোনখানে রামধনুর গোড়াটা, কীকরে খুঁজবে ওরা? তাই নিংপিং আর মেই লিং, ফু ফেং দাদুকে ছাড়াই রওয়ানা দিল।
প্রথমে যেটা মনে হচ্ছিল, ওই পাহাড়ের মাথা থেকে রামধনু উঠেছে, কাছে গিয়ে দেখা গেল ওই পাহাড় নয়, সেই পাহাড়ের মাথায়। সেই পাহাড়ে পৌঁছে দেখে গেল সেই পাহাড়ও নয়, আরওওও দূরেরর ওওই পাহাড়ের মাথায় উঠেছে রামধনু। এই করে করে অনেকটা দূরে গিয়ে অবশেষে পেল রামধনু পাহাড়। সবুজ ঘাসের মখমলি চাদর বিছানো পাহাড়ের মাথায়। কতরকমের ফুল ফুটে আছে গাছে ঘাসে লতায়। অন্য সব পাহাড়ের মাথা ঠাণ্ডা সাদা বরফে মোড়া কিন্তু রামধনু পাহাড়ে যেন চিরবসন্ত।
এমন সময় চোখে পড়ল একটা লোক, সে মেই লিং এর থেকেও বেঁটে। পরণে সবুজ কোট, সবুজ প্যান্টুলুন। মাথায় সবুজ টুপি, পায়ে শুঁড়তোলা সবুজ জুতো। গালে লাল দাড়ি। একটা ইয়াব্বড় ছাইরঙা কলড্রনের চারদিকে ঘুরে ঘুরে তুড়ুক তুড়ুক করে নাচছে। আর কলড্রনের ভেতর সোনালী কয়েন ঝকমক করছে। সেই সোনার কয়েন বোঝাই কলড্রন থেকে বেগুনী-নীল-আকাশি-সবুজ-হলুদ- কমলা-লাল সাতরঙা রশ্মি বেরিয়ে আকাশের বুক আল্পনা এঁকে মেঘের ভেতর দিয়ে টুকি করে জঙ্গলে গিয়ে লুকিয় পড়েছে। বেঁটে লোকটা সুর করে গান ধরেছে,
“আমি গোল্ডি ম্যাকমাফিন
লাকি লেপ্রিকন,
ঘড়া বোঝাই সোনা আমার
সাতটি রাজার ধন।
রেনবো পাহাড় আমার বাড়ি
নাচি আর গাই,
আমায় যদি ধরতে পারো
দেখবে মজা ভাই।”
নিংপিং আর মেই লিং টুকটুক করে গোল্ডি ম্যাকমাফিনের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ওদের দেখে গোল্ডি লেপ্রিকন তো বেজায় চমকে গেল। ভাবল বুঝি ওর সোনা চুরি করতে এসেছে। শিগগির কলড্রনটাকে আঁকড়ে ধরে চিৎকার করতে লাগল,
-“গোল্ডির সোনা! এগুলো গোল্ডির সোনা! গোল্ডি কাউকে দেবেনা সোনা!”
মেই লিং মিষ্টি গলায় বলল,
-“আহা! ভয় পেও না! আমরা তোমার সোনা নিতে আসিনি। তোমার নাম গোল্ডি বুঝি?”
গোল্ডি কলড্রন আঁকড়ানো অবস্থাতেই বলল,
-“আমি গোল্ডি ম্যাকমাফিন লেপ্রিকন। গোল্ডি সোনা ভালোবাসে আর মাফিন খেতে ভালোবাসে। এই রেইনবো পাহাড়ে থাকে গোল্ডি। তোমরা কি দুষ্টু লোক? সোনা চুরি করতে এসেছো? গোল্ডিকে বন্দী করে বর চাইতে এসেছো?”
এবার নিংপিং চটে গিয়ে বলে,
-“তখন থেকে খামোখা সোনা সোনা করছ কেন বল দিকি? মেই লিং রাজকন্যে, ওর সোনার দরকার নেই। আর আমি নিংপিং ড্রাগন। আমি আগুনে ফুঁ দিলে লোহা এমনিই সোনা হয়ে যায়। আমরা তোমার সোনা নিয়ে করবটা কী? আর কী বললে ওই বর না টর! ওসব ও আমাদের চাইনে। আমরা তো অ্যাড... অ্যাড... অ্যাডভেঞ্চুরা করতে এসেছি।”
মেই লিং শুধরে দিয়ে বলল,
-“হ্যাঁ! অ্যাডভেঞ্চার করতে এসেছি। রামধনুর গোড়ায় কেমন সবুজ লেপ্রিকন থাকে সোনার ঘড়া নিয়ে শুধু সেটাই দেখতে এসেছি। বুঝলে গোল্ডি ম্যাকমাফিন?”
গোল্ডি খুব অবাক হয়ে বলল,
-“তার মানে তোমরা গোল্ডিকে ধরবে না? বাঁধবে না? বরও চাইবে না? সোনাও নেবে না? তোমরা কী ভালোওওও!! ভ্যাঁ অ্যাঁ... ভ্যাঁ অ্যাঁ... ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ...”
গোল্ডি তো আনন্দের চোটে কাঁদতে বসে গেল। মেই লিং আর নিংপিং ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলল,
-“আরে আরে কাঁদছ কেন? তোমার সাথে লোকজন বুঝি ওরকম বদমাইশি করে? আমরা ওরকম নই গো। হুয়াং সুও ওরকম বদমাইশ ছিল। আমাদের দুজনের পরিবারকেই বন্দী করে খুব কষ্ট দিয়েছিল। তাই আমরা তোমার কষ্টটা বুঝতে পারছি। তুমি এই পাহাড়ে একা একা থাকো, তোমার তো কোনও বন্ধু নেই। আমরা তোমার বন্ধু হতে পারি কি?”
গোল্ডি কান্না থামিয়ে, সবুজ জামার হাতায় চোখ মুছে বলল,
-“একশোবার একশোবার। এই রেনবো পাহাড়ে একা একা থাকতে গোল্ডির খুব মনখারাপ করে কিন্তু লোকজন গোল্ডিকে বেঁধে শুধু বর চায়। বলে এই দাও ওই দাও। কিন্তু গোল্ডির বর দেওয়ার ক্ষমতাই নেই। অন্য লেপ্রিকনরা তাই গোল্ডিকে ভালোবাসে না, হাসি ঠাট্টা করে।”
মেই লিং এগিয়ে গিয়ে গোল্ডির কাঁধে হাত দিয়ে বলল,
-“আমাদের সোনাও চাই না আর কোনও বরও চাই না। উল্টে আমরা তোমায় মাফিন খাওয়াবো। তুমি মাফিন খেতে ভালোবাসো তাই না? আমার মা দারুণ ইয়াম্মি ব্লুবেরি মাফিন বানায়। যাবে নাকি আমাদের সাথে?”
গোল্ডি লেপ্রিকন হাততালি দিয়ে নেচে উঠল।
-“নিংপিং গোল্ডিকে পিঠে চাপাবে?”
নিংপিং বলল,
-“হ্যাঁ তো!”
-“কিন্তু এই সোনার ঘড়া কী হবে?”
মেই লিং বলল,
-“কলড্রনটার মুখটা চাপা দিয়ে দাও তাহলেই রামধনু বন্ধ হয়ে যাবে। আর কেউ খুঁজে পাবেনা তোমার ঘড়া। আর যখনই আমাদের সাথে দেখা করতে ইচ্ছে করবে ঘড়ার মুখ খুলে রামধনু সংকেত দেবে আকাশে। আমরা চলে আসব তোমার কাছে।”
গোল্ডি ম্যাকমাফিন ফের নাচতে শুরু করল,
-“তাহলে আর দেরি কীসের? শিগগির চলো। মাফিন খাওয়ার জন্য গোল্ডির জিভে জল আসছে যে।”
মেই লিং আর নিং পিং এরও কি আর জিভে জল আসেনি? তিনজন মিলে চটজলদি রওয়ানা হ’ল মেই লিং দের রাজপ্রাসাদের দিকে।
আজ থেকে নিংপিং ড্রাগন, রাজকন্যে মেই লিং আর গোল্ডি ম্যাকমাফিন লেপ্রিকন হ’ল তিন বন্ধু। ওদের অ্যাডভেঞ্চুরা থুক্কুড়ি অ্যাডভেঞ্চারে তোমরা সবাইও যোগ দিও, কেমন? অবশ্য তার আগে পেটটি ভরে মাফিন খেয়ে নিতে ভুলো না কিন্তু।
(সমাপ্ত)
ছবি: সুকান্ত
************
মেই লিং এর প্রথম গল্প যদি পড়তে চাও বন্ধুরা, তাহলে এই লিংকে এসো।

No comments:
Post a Comment