গল্প : কড়াইশুঁটির কচুরী

২৫শে জানুয়ারি,২০১৯-এর ‘আনন্দবাজার স্কুলে’ প্রকাশিত

🔹🔹কড়াইশুঁটির কচুরি🔹🔹
🔹🔹সুস্মিতা কুণ্ডু🔹🔹

॥১॥

ছোটো ছোটো আঙুলগুলো দিয়ে কড়াইশুঁটির খোসাটা ছাড়াতে থাকে কুট্টুস। বিদিশা পায়েসের পাত্রে হাতাটা ঘোরাতে ঘোরাতে নজর করে ছেলেকে। উল্টোদিক দিয়ে খোসাগুলো ছাড়াচ্ছে ছেলেটা। কড়াইশুঁটি পেছনের সরু দিকটায় চাপ দিলেই শুঁটিটা দু’ভাগ হয়ে ভেতরের গোল গোল সবুজ সবুজ কড়াইগুলো বেরিয়ে আসে ঝপ করে। কিন্তু কুট্টুস নখে করে সামনের শক্ত শিরার মত দিকটা খুঁটে খুঁটে শুঁটিটা খুলছে। বিদিশা ওকে বলতে গিয়েও থেমে গেল। বেশ মজা লাগছে কচি কচি হাতের সবুজ সবুজ কড়াইশুঁটির সাথে কুস্তিটা। ফিক্ করে হাসিটা আঁচলে মুছে নিল, কুট্টুস দেখতে পেলেই ‘মা হাসছো কেন? ও মা হাসছো কেন?’ বলে অস্থির করে তুলবে। আর এখন ওর প্রশ্নের বন্যায় উত্তরের বাঁধ দিতে বসলে, হয়ে গেল পায়েস! পায়েস পুড়ে সরভাজা হয়ে যাবে। 

কত রান্না বাকি এখনও! সবে আলুর দমটা হয়েছে। এখনও ছোলার ডাল, বেগুনভাজা, চাটনি হবে। কড়াইশুঁটিগুলো বেটে, তেল মশলা দিয়ে নেড়ে পুর বানাতে হবে, তবে তো কচুরি ভাজা হবে। ভেজানো ছোলার ডালটা প্রেসার কুকারে ঢেলে ঢাকনাটা বন্ধ করে গ্যাসের ওপর বসালো বিদিশা। আঁচটা একটু জোর করে দিলো। তাড়াতাড়ি গোটাচারেক সিটি দিয়ে নিতে হবে। একটু নারকেল কুঁচোতে হবে, নারকেল দেওয়া ছোলার ডাল কুট্টুসের খুব পছন্দের। বাকি কাজগুলো মাথার ভেতর একটার পর একটা সাজিয়ে নিতে লাগলো বিদিশা। এমন সময় হাঁটুর কাছে একটা গোঁত্তা লাগল। বিদিশা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে কুট্টুস হামাগুড়ি দিয়ে মায়ের পায়ের কাছে হাতড়াচ্ছে। 
-“কী করছিস বাবু? কত কাজ পড়ে এখনও আমার! আর তুই এখন হামাগুড়ি দিচ্ছিস কেন কুট্টুসোনা?”
-“মা তুমি একটু সরো তো দেখি, একটা কড়াইশুঁটি গড়গড়িয়ে এইদিকে গড়িয়ে চলে এল। আমি একটু খুঁজে বার করি তো!”
-“ওহ্ হো! একটাই কড়াইশুঁটি তো! থাক না বাবা ওটা। তুই অন্যগুলো ততক্ষণ ছাড়া দেখি সোনা।”

॥২॥

কুট্টুস ফের কড়াইশুঁটির ডাঁইয়ের কাছে ফেরত গিয়ে, ছাড়াতে শুরু করল। বড় জামবাটিটা একটু একটু করে ভরে উঠছে কড়াইশুঁটিতে। এমন সময়ে মালতী এসে ঢুকলো রান্নাঘরে। ঢুকেই হাঁ হাঁ করে উঠল,
-“ও কী বোদিমণি তুমি এত সক্কাল সক্কাল এত রান্না করচ ক্যানো গো? কেউ আসবে নাকি গো বাড়িতে? আমায় কই কাল কিচু বললেনি? আমি তাহলে আগে আগে এসে হাত লাগাতুম। আর ও কী! কুটুবাবু তুমি কড়াই ছাড়াচ্চো ক্যানো? যাও যাও পোড়তে বোসো!  কী সব কাণ্ড! মালতী কি মরে গেছে নাকি? অ বৌদিমণি, কুটুবাবুকে যেতে বলো দিকি পড়ার ঘরে।” 
বিদিশা পায়েসটা নামিয়ে, কড়াটা চাপায় বেগুনভাজার জন্য। 
-“মালতী, তোর কুটুবাবু আজ রান্নাঘর থেকে নড়বেনা, বুঝলি!”
কুট্টুস কড়াইশুঁটি ছাড়ানো থামিয়ে, মালতীকে ঠেলতে ঠেলতে রান্নাঘর থেকে বার করে ড্রয়িংরুমের দিকে নিয়ে চলল।
-“তুমি আজ রান্নাঘরে কিছুতেই আসবেনা! 
বাবাই ও বাবাই! মাতলীপিপিকে টি.ভি.-টা চালিয়ে দাও তো। 
মাতলীপিপি তুমি সোফা থেকে নড়বে না।”

কুট্টুস ছোটোবেলা থেকেই মালতীপিসি বলতে পারে না, বলে মাতলীপিপি। ওর ঠ্যালা খেয়ে মালতী সোফার সামনে মেঝেতে হাঁটু মুড়ে বসল।
-“ও দাদাবাবু! কুটুবাবুর কী হোলো বলো দিকিনি? আমায় এই সাতসক্কালে টিভি দেকতে বস্সে দিল। কতো কাজ পড়ে রয়েচে সোমসারের! বোদিমণি একা একা কত খাটচে!”
প্রমিত হেসে বলে,
-“কুটুবাবুকে সেই জন্ম থেকে বড় করছিস এখনও চিনলিনা মালতী! একবার ওর মাথায় কিছু ঢুকলে যতক্ষণ না সেটা করছে, ও ভবী ভোলবার নয়। তুই মিছে বাধা না দিয়ে ও যা বলছে তাই কর দিকিনি। আমি বরং একবার মোড়ের মাথার মিও আমোরে থেকে ঘুরে আসছি।”
-“দাদাবাবু ওই কেক-প্যাসটির দোকানটা তো? কী আনতে হবে আমায় বলো, তুমি ছুটির দিনে কেন আবার শুদুমুদু বেরোবে? ওই বাদামী রঙের প্যাসটি আনব তো? গেল রোববার কুটুবাবুর জন্মদিনে সব্বাই চেটেপুটে কেক খেয়েচিল। বাদামী প্যাসটিগুলো চকলেট দিয়ে বানায় না গো দাদাবাবু? ওইজন্য অত্ত ভালো খেতে। তবে দাদাবাবু কুটুকে বেশি চকলেট খেতে দিউনি, দাঁতের যন্তন্না হবে, পোকা হয়ে দাঁত ক্ষইবে। আর কুটুবাবুকে একটু বোকো তো, চকলেট খেয়ে মোট্টে দাঁত মাজতে চায়নে। বোদিমণি আর আমি তো বলে বলে সারা! যদি তোমার কথা শোনে তবু!”
-“মালতী তোকে কতবার বলেছি প্যাসটি নয়, পেস্ট্রি! আর কুট্টুস তোর কথা যদি না শোনে তবে আর কারোর কথাই শুনবেনা। এখন যা তোর বৌদিমণির কাছ থেকে একটা বড় ব্যাগ এনে দে দেখি! আমি বেরোই।”

॥৩॥

রান্নাঘর থেকে বিদিশার কানে আসে ওদের গলা, মনে মনে হাসে। আজকের দিনটার প্ল্যানিং যে গত রোববার কুট্টুসের জন্মদিনের দিন রাত্রেই হয়ে গেছে, তা তো আর মালতী জানেনা। জানলে হাঁ হাঁ করে মানা করত তখনই। সেদিন জন্মদিনের উৎসব মিটতে রাত্রে মা বাবার মাঝে শুয়ে শুয়ে কুট্টুস জিজ্ঞাসা করছিল,
-“মা তোমার জন্মদিন গরমকালে হয়, আমার তখন ইস্কুল ছুটি থাকে। বাবার জন্মদিন হয় পুজোর ছুটির সময়। আচ্ছা বিল্টুদাদার জন্মদিনও পুজোর ছুটিতেই হয় তাইনা? আর সেই পুচকি বোনুটার? মনে পড়েছে, বড়দিনের দিন। আচ্ছা বাবা আমাদের মাতলীপিপির কবে জন্মদিন?”
সেই প্রশ্নের উত্তরে বিদিশা বা প্রতীম কেউই দিয়ে উঠতে পারেননি। 

পরেরদিন সকালে কুট্টুস জিজ্ঞাসা করেছিল মালতীকে,
-“ও মাতলীপিপি তোমার কবে জন্মদিন গো?”
মালতী ঘর মুছতে মুছতে প্রথমে বেখেয়ালে উত্তর দিয়েছিল,
-“অ কুটুবাবু! কালই তো তোমার হেপি বাথডেট হল! কত বন্ধু এল, প্যাসটি এল, ফেলায়েড রাইস, চিল্লি চিকেন। আর সব ভুলে গেলে?”
-“আরে না গো না! আমার না। তোমার জন্মদিন কবে?”
-“আমার? আমার আবার জন্মদিন কী গো! ওই কেলাবের ছেলেগুলো ভোটার কার্ডে কী সব তুলে দিল যেন। বর্ষাকালের দিন একটা, শাবন না ভাদরো মাসের। এদিকে ছোটোবেলায় মা জন্মমাস ধরত তখন ঠাণ্ডার দিনে। কোনটে যে ঠিক, কেজানে। বড়বাবার থানে পুজো দিয়ে মা কপালে একটা সিঁদুরের টিপ লাগ্গে দিত, ব্যাস হয়ে গেল জন্মদিন। তবে জানো কুটুবাবু, যে বছর মা মরে গেল, সে বছরই মা আমায় জন্মদিনে কড়াইশুঁটির কচুরি, নতুন আলুর দম আর নলেন গুড়ের পায়েস করে খাইয়েছিল। কার বাড়ি থেকে চেয়েচিন্তে জুটিয়েছিল কিজানি বুড়ি। বুইতে পেরেছিল মনে হয়, সেটাই শেষ বছর।”
মাতলীপিপির চোখের কোলের চিকচিকটা নজর এড়ায়নি কুট্টুসের। অনেক কথা যা বড়রা বোঝেনা, ছোটোদের মনে তা খুব সহজে গেঁথে যায়। 

তারপর থেকেই সারা হপ্তা জুড়ে কুট্টুস তার মাতলীপিপির জন্মদিনের প্রস্তুতি নিয়েছে। আগামী রোববার জন্মদিন পালন হবে। বিদিশা আর প্রতিমও কুট্টুসের প্রস্তাবে মন প্রাণ ঢেলে সাড়া দিয়েছে। কুট্টুস হওয়ার কিছুদিন পরেই যখন খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিল বিদিশা তখন এই মালতীই তো রাতের পর রাত জেগে বুকে করে মানুষ করেছে কুট্টুসকে। আজ যেটা কুট্টুস ভেবেছে সেটা প্রতিমদেরই ভাবার কথা ছিল। কিন্তু নিয়মের মাইনের বাইরে পুজোর শাড়ি আর বোনাস ছাড়া কীই ভেবে উঠতে পারে বড়রা! 

॥৪॥

সামনে টিভি চললেও মালতীর মনে অন্য চিন্তাগুলো ঘুরপাক খেতে থাকে। বোদিমণি যে কী করছে রান্নাঘরে তখন থেকে, মালতীকে ঢুকতেও দেয়নি। দাদাবাবুও দোকান যেতে দিল না। মনটা কেমন লাগছে, মালতী কিছু কাজে ভুল করেনি তো? ওকে ছাড়িয়ে দেবে না তো? কাজ হয়ত অন্য বাড়িতে পেয়ে যাবে কিন্তু কুটুবাবুকে না দেখে কীকরে থাকবে মালতী! চোখদুটোয় জল ভরে আসে মালতীর।  

-“অ্যাই মালতী এই কাপড়টা ধর আর ও’ঘরে গিয়ে বদলে আয় দিকি। সকালে চান করে এসেছিস মনে হচ্ছে তো, চুল ভিজে এখনও। আর তাহলে চানের দরকার নেই, নতুন কাপড়টা পরে ঠাকুরঘরে একটা প্রণাম ঠুকে আয়।”
মালতী টিভি থেকে চোখ সরিয়ে, অবাক হয়ে বিদিশার বাড়িয়ে ধরা হাতের হলুদ তাঁতের শাড়িটার দিকে তাকায়। 
-“অ বোদিমণি! এসব কী গো? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছিনে গো!”
প্রমিত বেশ খানিকক্ষণ আগেই দোকান থেকে ঘুরে এসেছেন। বললেন,
-“তোমার আর বুঝে কাজ নেই! যা বলছে বৌদি তাই করো।”

কাপড় বদলে, ঠাকুরঘরে প্রণাম সেরে এসে মালতি দেখে ডাইনিং টেবলের ওপর একটা বাদামী চকলেট কেক সাজানো। তাতে গোঁজা একটা মোমবাতি জ্বলছে। পাশে কাঁসার থালা বাটিতে ফুলকো ফুলকো কড়াইশুঁটির কচুরী, নতুন আলুর দম আর সোনারঙের নলেন গুড়ের পায়েস। 
একগাল হেসে হাততালি দিয়ে তার আদরের কুটুবাবু গাইছে,
-“হ্যাপ্পি বার্থ ডে টু ইউ, হ্যাপ্পি বার্থ ডে টু ইউ, হ্যাপ্পি বার্থ ডে ডিয়ার মাতলীপিপি, হ্যাপ্পি বার্থ ডে টু ইউ!”
দাদাবাবু আর বোদিমণিও হাততালি দিচ্ছে। 
মালতীর চোখটা যে কেন আবার ঝাপসা হয়ে আসে! 

(সমাপ্ত)

বড়গল্প : কিচিরমিচির


কিচিরমিচির
সুস্মিতা কুণ্ডু

আজ সেই কোন সক্কাল থেকে ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে। চারপাশটা কেমন যেন স্যাঁতস্যাঁতে। জানলার বাইরের একফালি আকাশটা গত দু’দিন ধরে বড্ড ঘোলাটে হয়ে আছে। ধুর! তিতলির একদম ভালো লাগে না এমনধারা বেরঙ আকাশ।
এর চে' ছোটমাসির গত বছরের জন্মদিনে দেওয়া আকাশি গাউনটার মত রঙের আকাশ বেশি পছন্দ ওর। জামাটায় যেমন সাদা সাদা গোলাপ ফুল বানানো ভেলভেটের, আকাশের গায়েও ওমনি সাদা সাদা ঝুমকো ঝুমকো মেঘ যখন ঘুরে বেড়ায়, অবাক চোখে চেয়ে থাকে ও। জানলার গ্রিলটায় মাথাটা চেপ্পে ধরে, মুঠোয় রডগুলো আঁকড়ে, বসে থাকে বিছানার ওপর ঘন্টার পর ঘন্টা।

বাবাই খাটটাকে জানলাটার গায়ে সরিয়ে দিয়েছে একদম, যাতে তিতলি জানলার সামনে বসলেই ওপরে আকাশ আর নিচে ওদের বাগানটা দেখতে পায়। বাগানে মা নিজের হাতে কতরকম ফুলের চারা লাগিয়েছিল ক'মাস আগে। নয়নতারা, বেলি, জুঁই, রঙ্গন, দোপাটি, আরও কত কী। তিতলি সবক'টার নাম জানেনা। প্রতি বছর নানা রকম মরশুমি ফুল লাগায় মা। শীতকালে গাঁদা, ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা সব লাগিয়েছিল। সেগুলো একবার ফুল হয়ে তারপর সব শুকিয়ে মরে গেছে। অন্যান্যবার মা বাবা আর রাঙাপিসি মিলে আগাছা পরিষ্কার করে দেয়। এবারে আর কেউ বাগানের দিকে নজরই করেনি। আগাছায় ভরে গেছে অনেক, শুকনো গাছগুলোও ফেলা হয়নি। রাঙাপিসি কতরকম সব্জি লাগাত, বেগুন, টমেটো, ঢ্যাঁড়স, উচ্ছে, এবারে কিচ্ছুটি লাগায়নি। সবাই যে কেন এত মনমরা হয়ে থাকে! একটুও ভালো লাগেনা তিতলির।

দুটো চড়ুই পাখি ক'দিন ধরে খুব তিতলিদের বাগানে আনাগোনা জুড়েছে। বাইরে যাওয়ার রাস্তাটা বাগানের মধ্যে দিয়েই। নুড়ি বিছানো পথটা তিতলিদের বাড়ির সদর দরজা থেকে শুরু করে বাগানের ভেতর দিয়ে গেছে রাস্তার ধারের গেটটায়। ওই সিমেন্টের থামওয়ালা লোহার দরজা লাগানো গেটটার মাথায় চড়ুইদুটো একবার বসে, আবার ফুড়ুৎ করে উড়ে যায়। তিতলি আগে ভাবত ওরা এমনিই খেলা করে বুঝি, কিন্তু দিন পনেরো আগে ওদের মুখে করে খড় কুটি আনতে দেখে মা'কে জিজ্ঞাসা করেছিল। মা বলেছিল ওরা নাকি বাসা তৈরি করবে।

***************

গেটের থামটায় তিতলিদেরও এই বাসার নামটা লেখা আছে, 'পদ্মালয়', সাথে বাবার মায়ের রাঙাপিসির আর ওর নামও আছে, সাদা শ্বেতপাথরের ওপর কালো কালো অক্ষরে। ঠিক তার নিচে একটা ছোট্ট খুপরি আছে। লেটার বক্স করার জন্য ছিল, কিন্তু আর বসানো হয়নি। ওদের বাড়িটায় অনেক কিছুই এরকম অসমাপ্ত, অসম্পূর্ণ পড়ে আছে। তাতেই খড়কুটো জমা করে বাসা বানাচ্ছে চড়ুইদুটো। ওদের বাসাটাও তিতলিদের বাসাটার মত, অসম্পূর্ণ।

তিতলির মায়ের অনেকদিনের স্বপ্ন একটা নিজের বাড়ির, আর একটা বাগানের। শহর থেকে দূরে তাই এই মফস্বলে একটু জায়গা কিনে বাড়ি বানাতে শুরু করেছিল বাবা। কিন্তু মাঝপথে সব থমকে গেল। দু’দিকের বিশাল খরচ সামলানো যে খুব শক্ত, সেটা তিতলির মত ছোট্ট মেয়েও বোঝে। বাড়িটায় এখনও রঙ হয়নি, প্লাস্টার হয়েই পড়ে আছে ভেতরে বাইরে। পাঁচিল আর গেটটা অবশ্য আগের জমির মালিকেরই দেওয়া ছিল, ওরা নতুন নেমপ্লেটটা বসিয়ে নিয়েছে। সিঁড়ির ওপরের ছাদটাও টিন দিয়ে ঢাকা। তিতলি ছোট্ট চিবুকটা হাতের ওপর রেখে ভাবতে থাকে, কবে যে আবার বাগানটায় যাবে!
নতুন জায়গায় এসে পুরোনো স্কুলের, পাড়ার বন্ধুদের জন্য বড্ড মন কেমন করছিল। এখানের স্কুলটায় সবে যেতে শুরু করেছিল, কিন্তু সে’রকম কোনও বন্ধু হওয়ার আগেই ও ঘরবন্দী হয়ে গেল।

কী পচা একটা অসুখ যে ওর হয়েছে! কিছুদিন ছাড়া ছাড়াই হসপিটালে যেতে হয়, ডাক্তার কাকু, সিস্টার দিদিরা সব ইঞ্জেকশন দেয়। আরও কীসব কঠিন কঠিন পরীক্ষা হয়। তিতলির বড় কষ্ট হয়। এদিকে নল ওদিকে পাইপ সব নিয়ে যেন নিজেকে কেমন ওই এলিয়েনদের মত দেখতে লাগে। আচ্ছা সিনেমায় দেখায়, এলিয়েনদের কত ক্ষমতা। একটা অমন এলিয়েন যদি তিতলি পেত, কী ভালোটাই না হ’ত। ওর সব রোগ এলিয়েন বন্ধু সারিয়ে দিত ম্যাজিক করে।
কিন্তু ওগুলো মনে হয় শুধু সিনেমায়, গল্পেই হয়। সত্যি সত্যি মানুষ মরেই যায়। যেমন ঠামাই চলে গেল। ঠামাই চলে যেতে ওই বাড়িটায় আর কারোর মন বসত না। রাঙাপিসিও সারাদিন মন কেমন করে ঘুরত, তাই তো ওরা এখানে চলে এল আরও। কিন্তু আসার মাসকয়েক পরেই তিতলির এই অসুখ ধরা পড়ল, সবাইকে এক নিমেষে ভাসিয়ে দিল চিন্তার সাগরে।

******************

দুপুরে আকাশ ভেঙ্গে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি এল। সে কী জলের ঝাট। তিতলির বিছানাটা জানালার ধারে, আরেকটু হলেই ভিজে ঢোল হয়ে যেত। বাবাই এসে শিগ্গির জানলাগুলো বন্ধ করে দিল। একটু আলতো করে বকে তিতলিকে বলল,
-“হ্যাঁ রে মেয়ে! বৃষ্টির জল আসছে ডাকবি তো গলা তুলে কাউকে।”
আজকাল তিতলিকে কেউ ঠিক করে বকেও না। কী কাণ্ড দেখো! তিতলি নাকি বকুনিও মিস করছে। সত্যি সত্যি ওর শরীর খারাপ করেছে।
আসলে বৃষ্টির ঝাট গায়ে এসে পড়লেও ও তখনও চড়ুইদুটোকে দেখেই চলেছিল। বড্ড ভিজে গেছে পাখিদুটো, তাও ওই সিমেন্টের থামের খোপটার মুখে কী যেন আড়াল করে বসে আছে। সেটাই উঁকিঝুঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করছিল ও, মানে যতটা ওই দেখা যায় আর কী জানলার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে।
নাহ্! ভালো করে কিছু বুঝতে পারা যাচ্ছেনা এতদূর থেকে।

-“অ্যাই তিতলি দুধ খাবি?”
রাঙাপিসির ডাকে মুখ ফিরিয়ে চাইল তিতলি। হাতে দুধের গ্লাসটা নিয়ে দাঁড়িয়ে।
তিতলি একগাল হেসে বলে,
-“এ্যাই রাঙাপিসি! এদিকে আয়, শোন শোন। দ্যাখ ওই থামে দুটো চড়ুই পাখি। কদ্দিন ধরে আসছে ওরা। দেখেছিস ওদের তুই?”
-“হ্যাঁ তো দেখেছি তো। ওরা তো বাসা গড়েছে ওই থামের ফোকরটায়। তুই জানিসনা তিতলি? ঐ যে রে যেখানটায় দাদা বলেছিল লাল একটা লেটারবক্স লাগাবে।”
-“তাআআআই রাঙাপিসি? কী মজা! বাসার ভেতর বাসা। কী দারুণ না?”
-“তাই তো! আমাদের বাসার ভেতর ওদের বাসা! এ্যাই জানিস জানিস, ওরা আবার ডিম পেড়েছে।”
-“চড়ুইপাখির ডিম!!! কেমন দেখতে রে রাঙাপিসি? আমায় বাগানে একবারটি নিয়ে যাবি দেখাতে রে?”
-“তোকে নিয়েই যাব তো। তিনটে কেমন ছাই ছাই রঙের ডিম। এই ছোট্ট ছোট্ট ঠিক মার্বেল গুলির মত।
এ্যাই তিতলি কদ্দিন মার্বেল খেলিসনি আমার সাথে।
হ্যাঁরে তুই কবে ঠিক হবি রে? এ বছর দেখ আমি একা একা একটাও গাছ লাগাতে পারিনি। দাদা বৌদিও সবসময় মন খারাপ করে থাকে। আমার মোট্টে ভাল্লাগেনা রে তিতলি।
তুই শিগ্গির সেরে যা তো, আমরা ফের এক্কা দোক্কা খেলব বাগানে।”

***********

তিতলির খুব মায়া হয় রাঙাপিসির জন্য। আহারে সত্যিই তো বড্ড একা হয়ে পড়েছে, ওর সঙ্গীটা। সবাই বলে রাঙাপিসি আর পাঁচজনের মত স্বাভাবিক নয়। নামেই রাঙাপিসির বয়স অনেক, আসলে রাঙাপিসি ওরই মত বাচ্চা। এই কারণেই নাকি রাঙাপিসির বে’থা হয়নি, ঠাকুমা বলত আর দুঃখ করত।
কিন্তু তিতলি রাঙাপিসিকে খুব ভালোবাসে। বড় হতে তিতলির একদম ভালো লাগে না। বাবার অফিস, মায়ের সংসারের কাজ, কত্তরকমের কঠিন কঠিন সমস্যা! নাহ্ নেহাতই যদি বড় হতে হয় তিতলি মোটেও ডাক্তার অ্যাস্ট্রোনট কিচ্ছু হতে চায় না। ও বড় হয়ে রাঙাপিসি হতে চায়, ওরকম বাচ্চাই থাকতে চায়।
-“অ্যাই তিতলি যাবি... যাবি? চড়ুই পাখির বাসা দেখতে? কী ভাবছিস অ্যাত্ত তখন থেকে?”
-“কিছু না রে রাঙাপিসি! কাল তো আমার ডাক্তারখানা যাওয়া। কীসব রিপোর্ট আসবে। তাই দেখে ডাক্তারকাকু বলবেন আমি সেরে যাব না মরে যাব।”
-“অ্যাই তিতলি তুই সত্যি সত্যি মরে যাবি রে? তুই মরে গেলে আমিও না মরে যাব। আমার একা একা বড় কষ্ট হয়। আমার তো তোর মত ইস্কুল নেই যে নতুন বন্ধু হবে। মা-ও আমায় না বলে দুম করে মরে গেল। এখন তুইও যদি মরে যাস...”

************

-“আহ্ ঠাকুরঝি ফের এসব উল্টোপাল্টা কথা বলছো তুমি। তোমার দাদা না মানা করেছে তোমায়। যাও দেখি, টেবিলে মুড়িমাখা আছে কাঁসীতে, ঝটপট খেয়ে নাও গিয়ে। নইলে একটু বোসো, আমি তিতলিকে ওষুধটা খাইয়ে তারপর তোমায় তরকারি মেখে ডেলা ডেলা করে খাইয়ে দেবখ’ন মুড়ি।”

-“মা! কাল আমার রিপোর্ট আসবে, না গো? মা আমি আবার আগের মত হব? স্কুলে যাব, বাগানে খেলব, সবরকম খাওয়ার খাব?”

-“হ্যাঁ রে মা! হবিই তো! এই দিনটার আশাতেই তো বসে আছি কবে থেকে রে মা। আমি যাই এখন, রাজ্যের কাজ পড়ে।”
চোখের জল লুকোতে রান্নাঘরের দিকে ছুটলেন অনুমিতা। কত মিথ্যে প্রবোধ দেবেন নিজেদের আর ওই একরত্তি মেয়েটাকে।
ডাক্তারবাবু কথাটা যে কানে ভাসছে।
-“এ ধরনের রোগ লাখে একটা সারে। তিতলি সেরে উঠলে সেটা মিরাক্যল হবে চিকিৎসা শাস্ত্রের মতে।”

মিরাক্যল কি হবে কাল? রিপোর্টগুলো কি মিথ্যে করে দেবে সেই অমোঘ ভবিতব্যকে?

হতাশ দুই মা বাবা ছলনাময়ী আশার প্রলোভনে বুক বাঁধে নতুন করে।

************

-“বড্ড ঝড় গেল কাল রাত্তিরে তাই না? উফ এতদিন পর জানো ঝড় বৃষ্টি রোদ এসব নিয়ে চিন্তা করার কথা মাথায় এল। নাহলে তিতলির চিন্তাতেই চব্বিশ ঘন্টা...”

-“আর ও’কথা ভেবনা অনু। বিপদের দিন কেটে গেছে। আজ যেমন ঝড় হয়ে মেঘ কেটে গেল তেমনি আমাদের জীবনের কালো মেঘও কেটে গিয়ে রোদ ঝলমলে সূর্য উঠেছে।”

-“জানো তো, আমার মনে হয় ভগবানই বুঝি কাল থেকে আমাদের মনের অবস্থা বুঝে প্রকৃতিকে এঁকেছেন। কাল থেকে মেঘের মতই আঁধার গুমোট হয়েছিল মনটা। তারপর সারাদিন বুকের মাঝে ঝড়। কী বলবেন ডাক্তারবাবু! আমাদের তিতলি সেরে যাবে তো?”

-“ঠিক বলেছ অনু। আজ বিকেলে যখন ডাক্তারবাবু আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘বিক্রমবাবু, মিরাক্যল ঘটেছে।’ আমি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলামনা। তারপর হসপিটাল থেরে বাইরে বেরিয়ে দেখি মেঘ কেটে গোধূলীর আলো ফুটেছে। আমাদের তিতলি বিপদ মুক্ত।”

বহুদিন পর সন্ধেবেলায় চায়ের কাপ হাতে এভাবে গল্প করতে বসল মনে হয় বিক্রম আর অনুমিতা, তিতলির বাবা-মা। তিতলির ঘর থেকে কচি গলার আওয়াজ আসে,
-“বাবাই, মা, আজ রাঙাপিসি আমার কাছে শোবে প্লিজ প্লিজ। আজ যে তোমরা বললে সব ঠিক হয়ে গেছে...”

ডাইনিং টেবল থেকে হেঁকে বিক্রম বলেন,
-“তাই হবে মা, তাই হবে। রাঙা আজ তোর কাছেই শোবে।”
-“তাহলে তো সারারাত গপ্পোই বেশি হবে ঘুমের চেয়ে।” ছদ্মরাগে বলেন অনুমিতা। যদিও গলার সুরে প্রচ্ছন্ন সম্মতিরই লক্ষণ।

**************

-“অ্যাই তিতলি আমার না ভারী আনন্দ হচ্ছে আজ। তুই আর আমায় ছেড়ে কোত্থাও যাবি না।”
আনন্দে তিতলিকে জড়িয়ে ধরে রাঙাপিসি। তিতলিও পিসিকে জড়িয়ে ধরে বলে,
-“না রে রাঙাপিসি। আমরা আবার আগের মত থাকবো। খেলব, গাইব, গাছ লাগাব। এই রাঙাপিসি আমাকে কাল সকালে চড়ুই পাখির বাসাটা আর ডিম দেখাতে নিয়ে যাবি রে?”

চড়ুই পাখিদের কথা শুনে নিমেষে মুখে আঁধার নেমে আসে রাঙাপিসির। কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে,
-“এ যাআআআহ্ তিতলি! তোকে তো বলাই হয়নি। আজ তো দুপুরে আমি তোদের জন্য কতক্ষণ অপেক্ষা করলাম। তারপর বাগানে একা একা গিয়ে বসে রইলাম। কী কাণ্ড দেখি জানিস? চড়ুইদুটো খুব কাঁদছে। ঝড়ে ওদের বাসা পড়ে গিয়ে তিনটে ডিমের একটা ভেঙ্গে গেছে। মোটে আর দুটো গোটা রয়েছে। আমি আবার ডিমশুদ্ধু বাসাটা ওই খোপটায় তুলে দিয়ে এলাম।”

রাঙাপিসির মুখে এ কথা শুনে তিতলি তো থ’। মনটা ভারী খারাপ হয়ে যায় তিতলির। মাথা নেড়ে বলে,
-“কী বলছিস রাঙাপিসি! ইসসস চড়ুই মা বাবাটার কত কষ্ট হচ্ছেরে। আমায় যখন ইঞ্জেকশন দেয়, ডাক্তারকাকু মাথা নেড়ে নেড়ে কীসব বলে, তখন মা বাবাইও কত কষ্ট পেত। চড়ুইরাও তো মা বাবা বল? ওদের না জানি মনে কত ব্যথা লেগেছে। আমি কাল সকালেই বাবাইকে বলব ওই দুটো ডিমসহ বাসাকে আমাদের বারান্দাটায় তুলে আনতে। তাহলে ওই ডিমগুলোর আর কিচ্ছু হবে না।”

***********

-“চড়ুই-বৌ, লক্ষ্মীটি আর কেঁদোনা অমন করে।”
-“কাঁদবো না গো? আমার অমন সুন্দর ছানাটা অকালে চলে গেল! ভগবান কী নেই? ঝড় পাঠিয়ে আমাদের খড়কুটোর বাসা ভেঙ্গে কী পেলেন উনি? আমার বাছার পেরাণটা নিয়ে কী লাভটা হ’ল ওঁর!”
-“এভাবে বোলো না চড়ুই-বৌ! ভগবান অত নিষ্ঠুর নয়।”
-“তুমি এখনও এই কথা বলবে, চড়ুই?”
-“হ্যাঁ গো বলব। তুমি তিতলির খবরটা শোনোনি বুঝি?”
-“না তো! আবার কোনও খারাপ খবর দিওনা তুমি। আমি সইতে পারব না।”
-“তিতলি সুস্থ হয়ে উঠেছে। আর এ নাকি জাদু, নইলে মানুষের ক্ষমতা ছিলনা তিতলিকে সারানোর।”
-“জাদু!”
-“হ্যাঁ গো চড়ুই-বৌ, হ্যাঁ। জাদু! স্বয়ং ঈশ্বর করেছেন। আমাদের যে ছানাটা অকালে চলে গেল, সে তো সত্যি সত্যি যায়নি। তার প্রাণটা ঈশ্বর তিতলির ভেতরে ভরে দিয়েছেন যে। এখন এই বাকি দুই ছানা, কিচির আর মিচির-এর মত তিতলিও আমাদেরই সন্তান গো।”
-“এমনটাও হয় গো? তুমি সত্যি বলছ?”
-“হয় না আবার? এই মাত্র তো তিতলির ঘরের জানলায় বসে শুনে এলুম, তিতলি ওর রাঙাপিসিকে বলছে, আমাদের বাসাটা ওদের ঘরের বারান্দায় তুলে নিয়ে গিয়ে রাখবে।”
-“ভগবান মঙ্গল করুক ওদের। কিচির মিচির আর তিতলি, তিন ভাইবোন একসাথেই বড় হোক তবে। হ্যাঁ গো আমায় একবার নিয়ে যাবে ঐ জানলাটায়, যেখান থেকে তিতলির কথা শোনো তুমি?”
-“কেন নিয়ে যাবোনা? চলো না চলো।”

***************

-“এই রাঙাপিসি ওঠ ওঠ, ওঠ না। সুয্যিমামা মাথায় উঠল যে। জানিস কাল রাত্রে কী অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছি।”
-“উমমম তিতলি, এই জন্য তোর কাছে শুই না। হাবিজাবি স্বপ্ন দেখবি আর আমায় তুলে দিবি।”
-“তুই শোন না। কাল স্বপ্নে দুটো চড়ুই পাখি, ওই যে রে যারা ওই বাগানের গেটটার থামের ফোকরে বাসা করেছে, তারা এই জানলাটায় এসেছিল।”

তিতলির কথা শুনে রাঙাপিসি বিছানায় উঠে বসল চোখ রগড়ে।
-“স্বপ্ন... চড়ুই...”
-“হ্যাঁ রে! তুই বললি না যে ঝড়ে ওদের ডিম নষ্ট হয়ে গেছে। আসল তা হয়নি। ওই ডিমের ছানাটার প্রাণটা ঠাকুর আমার মধ্যে ভরে দিয়েছেন। তাই তো আমার রোগ সেরে গেছে। ডাক্তারকাকু বললেন না মিরাক্যল!”
-“মিরাক্যল মানে কী রে তিতলি?”
ঢুলুঢুলু রাঙাপিসির গালটা টিপে দিয়ে তিতলি বলে,
-“তুই না কিচ্ছু জানিসনা! মিরাক্যল মানে ম্যাজিক... জাদু। ওই জাদু করেই ঠাকুর আমায় চড়ুই পাখির ছানার প্রাণটা দিয়ে দিয়েছেন। তাই তো চড়ুই মা আর চড়ুই বাবা আমার কাছে এসেছিল স্বপ্নে...”
খিলখিল করে হেসে রাঙাপিসি বলে ওঠে,
-“ওই দেখো, আমায় বোকা বলিস, আসলে তুই-ই একটা বোকা। স্বপ্ন হবে কেন? সত্যি সত্যি এসেছিল তো ওরা কাল রাত্রে। বলল, ওদের আরও দুটো ছানা, কিচির আর মিচির-এর মত তিতলি, তুইও ওদের ছানা।”
তিতলি অবাক হয়ে চিৎকার করে ওঠে,
-“হ্যাঁ হ্যাঁ কিচির মিচির, এই নামদুটোই তো বলেছিল। আমরা দু’জন কি তবে একই স্বপ্ন দেখলুম? না কি সত্যি সত্যিই এসেছিল ওরা?”

এমন সময় মা বাবা ঘরে ঢোকে। অনুমিতা বলে ওঠেন,
-“দুই মূর্তিতে সক্কাল সক্কাল কী কিচিরমিচির করছিস পাখির মত?”
বিক্রম বলেন,
-“আমাদেরও বল দেখি তোদের সব রহস্য গল্প।”

তিতলি আর রাঙাপিসি একে অপরের মুখ চেয়ে হেসে ওঠে। ঈশারায় বুঝি বা কিছু কথা হয়।
শ্ শ্ শ্... সব কথা বড়দের জানতে নেই...

(সমাপ্ত)

একপর্ণিকা ওয়েব ম্যাগাজিনে প্রকাশিত।

গল্প : বাঁদরনাচ

বাঁদরনাচ
সুস্মিতা কুণ্ডু

ডাউন মেচেদা-হাওড়া লোকাল প্লাটফর্মে এসে দাঁড়াতেই হুড়মুড় করে ভেণ্ডার কামরা থেকে তিন চারটে পোঁটলা পুঁটলি সহ আলুথালু চেহারার একটা লোক নামল। নামল না বলে ধাক্কা মেরে নামানো হ’ল বলাই ভালো। আরও দু’চারটে লোক গুটি গুটি করে প্রায় সবক’টা কামরা থেকেই নামল। ভর দুপুরে প্লাটফর্ম আর ট্রেন দুটোই প্রায় ফাঁকা। আপিসটাইমের দৌড় ঘন্টা তিন চারেক আগেই শেষ হয়ে গেছে, ফের শুরু হবে আবার বিকেল পাঁচটা থেকে উল্টোদিকের ‘আপ’ গাড়িগুলো যাওয়ার প্লাটফর্মে।

হুড়মুড়িয়ে নামা লোকটা আস্তে আস্তে ধুলো ঝেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে হাতের পোঁটলাগুলো সব রাখল সিমেন্টের লাল লম্বা বেঞ্চটায়। আকাশী আর সাদায় চেক-কাটা একটা লুঙ্গি আর লাল রঙের নামী কোম্পানির লোগো দেওয়া একটা রংচটা ববলিং ওঠা গেঞ্জি। গালে খিমচি কেটে ধরা যাবে এমন নুন-মরিচ দাড়ি, উস্কোখুস্কো চুল মাথায়। লোকটা বেঞ্চের ওপর বসতেই একটা বাদামী আর গোলাপী ফুলকাটা ছিটের কাপড়ের পোঁটলা লাফিয়ে লোকটার ঘাড়ে উঠে পড়ল। তাই দেখে, সামনের চায়ের দোকানের ঝাঁপ বন্ধ করতে থাকা বাচ্ছা ছেলেটার হাত থেকে জংধরা তালাটা ঠং করে কংক্রিটের প্লাটফর্মে পড়ে গেল। আরও এদিক ওদিকের লোকজন বিস্ময়ে চেয়ে রইল লোকটার দিকে।

এ রামোঃ! পুঁটলি কোথায়? এ তো একটা বাঁদর! ওই তো, আরেকটা বাদামীর ওপর হলুদ চকরাবকরা পুঁটলিও নড়ছে।
দুটো বাঁদর, মানে একটা বাঁদর আর আরেকটা বাঁদরী। অন্তত ওদের বেশভূষা তাই বলছে। একটার পরনে গোলাপী ফুল ফুল ফ্রক, গলায় সস্তা পুঁতির মালা। অন্যটার অঙ্গে বছর তিনেকের কোনও বাচ্ছার হলুদ রঙের পুরনো শার্ট, আর একহাতে একটা প্লাস্টিকের সবুজ খেলনা ঘড়ি। লোকটা তার মানে বাঁদরের খেলা দেখায়। বাঁদরগুলো বড় বাধ্য, চেন বা দড়ি কিছু দিয়েই আটকানো নেই তবুও ওদের মালিকের পাশ ছেড়ে নড়ছেনা। শুধু দুটোতেই লোকটার ঘাড়ে উঠে বসে জুল জুল করে চায়ের দোকানের সামনের নোংরা ঝুড়িতে পড়ে থাকা বাপুজী কেকের মোড়কগুলোকে দেখছে।

-“কা রে জাকি বিটিয়া? কা রে শরফ? ভুক লাগি কা? রুক যা বিটুয়া তনিক। তোহ্ কা হাম লাড্ডু খিলাইবে, নাহি নাহি! কেকওয়া খিলাইবে।” কোলে নামিয়ে নিয়ে পোষ্য দুটোকে আপন মনে বলতে থাকে লোকটা, গায়ের বাদামী লোমে বিলি কাটতে কাটতে। অনেকদিন আগে একটা সিনেমা দেখেছিল বিনি টিকিটে হলে ঢুকে। একটা ভারী প্রভুভক্ত কুকুরের গল্প, ‘তেরি মেহেরবানিয়া’। তারপর কী কান্না কেঁদেছিল ওর পোষা ছোট্ট চুন্নু আর মুন্নুকে জড়িয়ে। নায়কটাকে খুব মনে ধরেছিল, তাই ওদের নাম বদলে সেদিনই রেখেছিল ‘জাকি’ আর ‘শরফ’। খেলা দেখাতে গিয়ে কেউ মজা করলে বলে, “নাম মে কা হ্যায় বাবুজী? যো আচ্ছা লাগা উসি নাম সে পুকারিয়ে, হামার জাকি অউর শরফ বদলেঙ্গে থোড়ে হি!”

“হোয়াটস্ ইন আ নেম” শেক্সপীয়র সাহেব, “হোয়াটস ইন আ নেম”। তোমার বাক্যি এতটা গভীরে ক’জন বোঝে গো।

পাশের সিমেন্টের বেঞ্চে আরেকটি পরিপাটি পরিবার ততক্ষণে এসে বসেছে, পরের ট্রেনের অপেক্ষায়। বিরক্তমুখের গম্ভীর বাবা, সম্ভবত আগের ট্রেনটি টার্গেট করেও মিস করার কারণেই, বারবার ঘড়ি দেখছেন। মা’টি গরমেও ভারী একটা জমকালো শাড়ি পরে গলদঘর্ম, সেইসাথে উটকো সোনার আভরণের উৎপাত তো আছেই। বছর ছয়েকের মেয়েটা ভারী মিষ্টি, পুটুর পুটুর করে একবার চায়ের দোকানের কাপ ডিশ ধোয়ার বাচ্ছা ছেলেটাকে দেখছে, আবার কখনও ‘জাকি’ আর ‘শরফ’ কে দেখছে। ভারী গম্ভীর সেই বাবাটি খানিকটা দূরে প্লাটফর্মের নাম লেখা গোল মত লোহার প্লেটটার নিচে লাগানো টাইমটেবিলটার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলেন।

এদিকে গুটি গুটি পায়ে চায়ের দোকানের ঝাঁপ ফেলে ছেলেটি এসে দাঁড়িয়েছে বাঁদরের মালিকের সামনে।
-“ইকটু বাঁদরলাচ দিখাবেনি চাচা?”
-“বাবুয়া ইকজনের জন্য খিলা দিখাব? লস হো যায়গা বেওসার”
-“আরে ফিরি-তে দেখবনি গো চাচা, এই কেক টা দিব তোমার বাঁদরগুলোকে।”

কী মনে করে হেসে ওঠে লোকটা, তারপর সামনে একটা প্লাস্টিক পাততে শুরু করে, বাঁদুর দুটোকে ওটায় নামিয়ে ঝোলা থেকে একটা ডুগডুগি বাজিয়ে শুরু করে...
-“তেরি মেহেরবানিয়া জনাব... আসুন আসুন খিলা দেখুন হিরো অউর হিরোইনের...জাকি শরফ... “
মণিবের আদেশমত নানা খেলা শুরু করে দুই পোষ্য। অপার বিস্ময়ে দেখে হাফপ্যান্ট পরা বছর আষ্টেকের আরেকটা খেটে খাওয়া মানুষ। খেলার মাঝে হাত বাড়িয়ে কেকটা দেয়, জাকি লাফিয়ে এসে কেকটা নেয় ছোট্ট কড়া পড়া মুঠোটা থেকে।

আরও একজোড়া কাজল পরা চোখও কিন্তু তার দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছে এদিকেই। তার মা ব্যস্ত ফোনে,
-“হ্যাঁ হ্যাঁ... ভেবোনা... বিকেলের আগেই পৌঁছব... লগ্ন তো সন্ধেয়... পার্লারের লোক এসে গেছে? আমার চুলটা কিন্তু...”
গোধূলী লগ্নে বিয়ে মনে হয়।

মায়ের অন্যমনষ্ক থাকার সুযোগে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসে কমলা ফ্রক। তন্ময় হয়ে হাফপ্যান্টওয়ালার পাশে দাঁড়িয়ে দেখে। এমন সময় একটা গ্যালপিং মেদিনীপুর লোকাল তীব্র হর্ণ বাজিয়ে গাঁক গাঁক তেড়ে আসে প্লাটফর্মের পাশে, ‘ডাউন’ লাইন ধরে। আওয়াজে চমকে গিয়ে ‘জাকি’ লাফ মেরে দেয় সামনের কমলা ফ্রকের গায়ে। ভয়ে চেঁচিয়ে ওঠে শিশুটি। ইতিমধ্যে টাইমটেবল দেখে তার বাবা এসে গেছে সামনাসামনি। তড়িঘড়ি ছুটে এসে মেয়ের গায়ের ওপর থেকে বাঁদরটাকে তুলে ধরে ছুঁড়ে দেয় অসম্ভব রাগে, প্লাটফর্মের অপরদিকের এক্সপ্রেস ট্রেন যাওয়ার লাইনটায়। প্লাটফর্মের কোনে মাথা ঠুকে নিচের লাইনে পড়ে জাকি। টাইমটেবলের লোকাল ট্রেনের লিস্টের বাইরের একটা দূরপাল্লার নীল দৈত্য ঝমঝম করে তখনই ছুটে চলে যায় ওর ওপর দিয়ে....

দোকানের ছেলেটি আকূল হয়ে দৌড়ে যায়। থ্রু এক্সপ্রেস ট্রেনটার পেরোনোর মিনিটখানেক সময়টুকু অনন্ত লাগে। মেয়েটি আরেকবার চিৎকার করে মুখ লুকোয় দু’হাতের চেটোয়। লোক জমা হয়ে গেছে ততক্ষণে। ছেলেটি এক লাফে লাইনে নেমে খানিকটা এগিয়ে যায়। দুচোখে জল নিয়ে তুলে আনে  গোলাপী বাদামী একটা ছিন্নভিন্ন দলাপাকানো শরীর...

স্তম্ভিত সকলে, ফোন রেখে মা ছুটে এসে কোলে তুলে নেয় মেয়েকে, চোখে তীব্র ঘৃণার দৃষ্টি স্বামীর দিকে। বাকি জনা কয়েক মানুষেরও চোখেও ভৎর্সনা। শুধু ‘জাকি’-র মালিকেরই চোখটা বোজা। কাঠের মত স্থির হয়ে গেছে তখনই, যখন জাকি-কে ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছিল মাঝের লাইনের ট্রেনটার সামনে।
প্লাটফর্মের দুদিকের লাইন দিয়ে দুটো ট্রেনের সবেগে ছুটে যাওয়া, তীব্র আওয়াজ, ঘটনার আকস্মিকতা, কিছুই টলাতে পারেনি আরেকটি ছোটো প্রাণীকে তার পারফর্মেন্স থেকে। “দ্য শো মাষ্ট গো অন”। ময়লা প্লাস্টিকটার ওপর দু’হাত অঞ্জলি করে দাঁড়িয়ে আছে ‘শরফ’, খেলা শেষের অভ্যাসের প্রাপ্যর আশায় বুঝি। চোখ খুলে অদ্ভুত দৃষ্টিতে সামনের ভদ্রলোকটির দিকে তাকিয়ে ‘জাকি’ আর ‘শরফ’-এর মালিক বলে ওঠে,
-“বাবুজী, খিলা দিখায়া, মেহেরবানি করকে কুছ...”

(সমাপ্ত)
(এখন কবিতার কাগজে প্রকাশিত)

ছোটোগল্প : ছাতার মাথা


ছাতার মাথা
সুস্মিতা কুণ্ডু

ছাতাটা হাওয়ায় ভেসে ভেসে, মাটিতে গড়িয়ে গড়িয়ে লুটোপুটি খেয়ে বেড়াচ্ছিল। অবশেষে একটা  শুকনো গাছের তলায় এসে একদণ্ড জিরেন নিতে বসল। একটা আলাভোলা লোকও সেই গাছের তলায় জিরোচ্ছিল। ছাতাটা দেখে ভাবল,
-“বাহ্ রে! এটাকে বগলদাবা করি। বৃষ্টি ব্যাটাচ্ছেলে আমাকে সময়ে অসময়ে ভিজিয়ে হাপুশুটি করতে পারবে না আর।”
আলাভোলা পাগলা লোকটা ছাতাটা মাথায় দিয়ে আনন্দে নাচতে নাচতে চলল গ্রামে। গ্রামে ছিল একটা ধূর্ত লোক। তার ছিল একটা হরেক কিসিমের জিনিসের দোকান। সে শক্তপোক্ত ছাতাটা পাগলাটার মাথায় দেখে ভাবলে,
-“বাহ্ রে! একে ঠকিয়ে ছাতাটা নিয়ে নিতে পারলে বেশ শতখানেক টাকায় বেচে দেওয়া যাবে তো!”
যেমনি ভাবা তেমনি কাজ।
-“এই পাগলা! ক্যাডবেরি খাবি? তবে ছাতাখানা দে!”
আলাভোলা পাগলা তো ক্যাডবেরির লোভে ছাতাটা ধূর্ত দোকানদারকে দিয়ে দিল। তারপর দু’টো সস্তার লজেঞ্চুস নিয়ে সেগুলোকেই ক্যাডবেরি ভেবে খেতে খেতে চলে গেল। ছাতার খুব রাগ হল। ইসস! সরল লোকটাকে দুষ্টু দোকানদারটা কেমন ঠকিয়ে দিল!

এদিকে ধূর্ত দোকানদারের দোকানে এল ছোট্ট খুকি আর তার মা। ছোট্ট খুকি থাকে শহরে, তার মামার বাড়ির গ্রামে এসেছে বেড়াতে। রোদে রোদে মাঠেঘাটে ঘুরতে বড় কষ্ট হয় তাই খুকির মা দু-দু’শো টাকা দিয়ে সেই হরেক কিসিমের জিনিসের দোকান থেকে মেয়েকে ছাতাটা কিনে দিল। ছাতা তো বদমাইশ দোকানদারের হাত থেকে রেহাই পেয়ে খুব আনন্দ পেল। ছোট্ট খুকিও ছাতাকে খুব ভালোবেসে ফেলল। ছাতা নিয়ে খায়, ছাতা নিয়ে খেলে, ছাতা নিয়ে ঘুমোয়। দিন দুই বাদেই ছোট্ট খুকি ফিরে যাবে শহরে, ছাতাও সঙ্গে যাবে। ছাতার তো সে কী আনন্দ! শহর দেখবে বলে কথা! কিন্তু খুকির মা বললে,
-“ইসস এই গাঁয়ের এত বড় হ্যান্ডেলওয়ালা ছাতা কি শহরে চলে নাকি? তোকে বরং রঙবেরঙের ফোল্ডিং ছাতা কিনে দেব নিউ মার্কেট থেকে, খুকি। ওই ছাতা আর ঘাড়ে করে নিয়ে যাসনি। ওটা বরং কাউকে দিয়ে দে।”

ছোট্ট খুকি আর কী করে! মামাবাড়ির জমিজিরেত দেখাশোনা করে ভাদুকাকু। ভাদুকাকুর ছেলে হাঁদু, খুকির ভারি দোস্ত। খুকি তাকেই ছাতাটা দিয়ে দিল। হাঁদু তো নতুন ছাতা পেয়ে জব্বর খুশি। উল্টে দেখে পাল্টে দেখে, মাথায় দিয়ে দেখে। শেষমেষ বাড়িতে নিয়ে গিয়ে গোয়ালঘরের আটচালার বাঁশের বাতায় গুঁজে রেখে দিল। আর উপায়ই বা কী? হাঁদুর ওপরে আরও এক দাদা, এক দিদি আর নীচে একজোড়া ভাইবোন। সব মিলিয়ে পঞ্চপাণ্ডব, খাঁদু, হাঁদু, নাদু, ক্ষেন্তি, পান্তি। তারা যদি একবার ছাতার সন্ধান পায়, তাহলে হয়ে গেল! কিন্তু ভাইবোনদের হাত থেকে ছাতাকে বাঁচালেও শেষরক্ষে হল কই!
ছাতা বেচারা বাঁশের বাতায় গোঁজা হয়ে নিজের মন্দ কপালের কথা ভাবছিল, এমন সময় ‘কিঁইচ কিঁইচ!’
মরেছে! একটা গাবদা ছুঁচো!

ব্যাটাচ্ছেলে ছুঁচো কটরকটর করে ছাতার গায়ে দিল চাট্টি ছ্যাঁদা করে। ছাতা তো আর চিৎকার করে কাঁদতে পারে না, মুখ বুজে সহ্য করতে লাগল সব। পরের দিন সকালে হাঁদুর বাবা ভাদুকাকু গোয়ালের বুঁচু গাইকে জাবনা দিতে গিয়ে দেখল কী যেন সব কালো কালো টুকরো টুকরো গরুর ডাবায় পড়ে আছে। ওপরে তাকিয়ে দেখে একটা ছেঁড়া ছাতা। গজগজ করতে করতে ছাতাটাকে নিয়ে কোন চুলোয় ফেলে দিয়ে এলো ভাদুকাকু।

ছাতা আবার সেই  গাছের তলাতেই ফেরৎ এলো। মাটিতে পড়ে পড়ে কাঁদতে লাগল। এমন সময় সেই গাছের তলায় এলো আলাভোলা পাগলাটা। ছাতার তো ওকে দেখে খুব মজা হল। আলাভোলা নিশ্চয়ই ওকে যত্নআত্তি করবে। এদিকে ছাতাটাকে দেখে আলাভোলা ভাবলো,
-“আরেহ্! এটা সেই ছাতাটা না? কিন্তু কেমন বিতিকিচ্ছিরি দশা হয়েছে। এটা আর কোনও কাজে লাগবে না।”
আলাভোলা পাগলার এই ব্যবহারে ছাতা আরও কষ্ট পেল। আঁধারে লুকিয়ে কাঁদতে লাগলো। ছাতার কষ্ট কেউ না বুঝলেও গাছের ফুল আর মাঠের জোনাকিরা বুঝল। তারা দলে দলে ছাতাকে ঘিরে ধরল। ফুলে মোড়া, টিমটিম জোনাকআলো জ্বলা ছাতাকে তো এবার দারুণ সুন্দর দেখাতে লাগল।

আলাভোলা তখন হাত বাড়িয়ে যেই ছাতাকে কুড়োতে গেল ওমনি দমকা বাতাস এসে ছাতাকে উড়িয়ে নিয়ে গেল। অমন সুন্দর দেখতে ছাতাখানা আকাশে উড়ে যেতে লাগল। আলাভোলাও পেছন পেছন ছুটল। ছাতা উড়ল গ্রামের ওপর দিয়ে, পিছু নিল হরেক কিসিমের জিনিসের দোকানের সেই ধূর্ত মালিক। ছাতা ধরা দেয় না। ছাতা উড়ল বড়রাস্তার দিকে। শহরে যাওয়ার বাস ধরবে বলে দাঁড়িয়েছিল ছোট্ট খুকি আর তার মা। ছাতাকে দেখে বাস ফেলে ছুটল পেছন পেছন। ছাতা ধরা দিল না। একে একে ভাদুকাকু, হাঁদু, খাঁদু, নাদু, ক্ষেন্তি, পান্তি সবাই ছুটল। কিন্তু ছাতা কারোর কাছে ধরা দিলনা। ফুলে মোড়া, জোনাকজ্বলা ছাতা আপন খেয়ালে হাওয়ার দোলে ভেসেই চলল, ভেসেই চলল...

(সমাপ্ত)
ছবি: আমি 🙂