সবুজব্যাঙের রঙীন ছাতু
সুস্মিতা কুণ্ডু
সবুজব্যাঙের একটা ভারী সুন্দর রঙবেরঙা ছাতা ছিল। সবুজব্যাঙ ভালোবেসে ছাতাটার নাম দিয়েছিল ছাতু। ছাতুকে সবুজব্যাঙ খুব ভালোবাসত, সবসময় কাছে কাছে রাখত, পাহারা দিত, ধুয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে শুকিয়ে রাখত, কচুপাতা দিয়ে ঢেকে রাখত। গন্ধরাজফুলের গন্ধ মাখিয়ে দিত ছাতুর গায়ে। কতরকম রঙ ছাতুর গায়ে! লাল নীল বেগনে সবুজ হলদে কমলা! সবুজব্যাঙ তো দু’চোখ ভরে দেখে, আর গান ধরে,
-“গ্যাঙর গ্যাঙর গ্যাং
আমি সবুজ ব্যাঙ,
আমার রঙবেরঙা ছাতা
ধিতাং ধিতাং ধিতা!”
কক্ষণও ছাতুকে চোখের আড়াল করেনা সবুজব্যাঙ। কবে থেকে যে ছাতু ওর কাছে আছে, কীকরেই বা ও ছাতুকে পেল কেউ জানেনা। কিন্তু যেখানেই দেখবে রঙবেরঙা ছাতু সেখানেই জানবে তার তলায় রয়েছে সবুজব্যাঙ।
একদিন হয়েছে কী, আকাশে সূয্যিমামা উঠেছে। বেজায় রোদের তাপ। সবুজব্যাঙের খুব গরম লেগেছে। সবুজব্যাঙ একটা বড় পদ্মপাতা ডোবার জলে ভাসিয়ে তাতে চেপে, চোখে কুড়িয়ে পাওয়া প্লাস্টিকের সানগ্লাস পরে, ছাতুকে মাথায় দিয়ে এঁদো ডোবার জলে জিরিয়ে নিতে গেল। হোগলার ডাঁটি দিয়ে স্ট্র বানিয়ে মাঝে মাঝে চুমুক দিয়ে ডাবের খোলা থেকে মধুমেশানো জল খেতে লাগলো সুড়ুৎ সুড়ুৎ করে।
দূর আকাশ থেকে সূয্যিমামা দেখতে পেলো সবুজব্যাঙের রঙবেরঙা ছাতু। সে বললে,
-“এ্যাই সবুজব্যাঙ! তোর ছাতাখানা আমার চাই!”
সবুজব্যাঙও জিভ উল্টে বললে,
-“কী আবদার! চাই বললেই মেলে নাকি? ও আমার ছাতা, আমি তোমায় কেন দেব শুনি?”
সূয্যিমামা রেগে গুরুগম্ভীর গলায় বললে,
-“তবে রে! দাঁড়া মজা দেখাচ্ছি!”
তারপর তো সূয্যিমামা দিলো রোদের তাপ বাড়িয়ে। কী তেজ! কী তাপ! এঁদো ডোবার সব জল চোঁচোঁ করে শুকিয়ে যেতে লাগল। কিন্তু সবুজব্যাঙের তাতে কচুটা! সে তার ছাতুর আড়ালে বসে বসে তালপাতার পাখায় করে দিব্যি বাতাস খেতে লাগল। ওদিকে তাপ বাড়াতে বাড়াতে সূয্যিমামার নিজেরই ঘাম বেরিয়ে কাহিল অবস্থা। শেষমেষ হাল ছেড়ে দিয়ে সূয্যিমামা বললে,
-“চাই না আমার তোর অমন পচা ছাতা!”
সূয্যিমামা তো চলে গেল আকাশপথে পশ্চিমদিকে। এমন সময় ডোবার ওপর দিয়ে যাচ্ছিল কালোকুলো বাদলমেঘ। বাদলমেঘেরও ছাতুকে দেখে ভারী লোভ হল। সে ভাবলে আমার তো কোনও রঙই নেই, যদি ঐ রঙবেরঙা ছাতাটা আমি মাথায় দিই নাজানি কত সুন্দর দেখতে লাগবে আমায়। এই বলে সে হাঁক পাড়ল,
-“এইয়ো সবুজ ব্যাঙ! শিগগির তোর ছাতাখানা আমায় দে!”
সবুজব্যাঙ ভেংচি কেটে বললে,
-“ইল্লি নাকি? আমার ছাতু, আমি তোমায় কেন দেব হে বাপু? ভাগো হিঁয়াসে!”
এই শুনে বাদলমেঘ তো রেগে গুমগুম গর্জায় চমচম ঝলকায় আর ঝমঝম বর্ষায়। এঁদো ডোবা বৃষ্টির জলে উপচে গেল। কিন্তু সবুজব্যাঙও কী কম বুদ্ধি ধরে! সে করলে কী, ছাতুকে উল্টো করে ডিঙিনৌকার মত ভাসিয়ে তাইতে চেপে, পদ্মনাল দিয়ে দাঁড় বাইতে আর গান গাইতে লাগল। বাদলমেঘের তো জল ঝরিয়ে সব জল শেষ। গর্জে গলায় ব্যথা, ঝলকে চোখে ধাঁধা লেগে গেল। সে তো নাস্তানাবুদ হয়ে গড় ঠুকে বলল,
-“হার মানলুম সবুজব্যাঙ! তোর ছাতাতে আর নজর দেবনা বাপু।”
সবুজব্যাঙ তো মহানন্দে নেচে নেচে ঘুরে ঘুরে গান ধরতে যাবে এমন সময় একটা কান্নার আওয়াজ কানে এল।
-“কে কাঁদে?”
একটা হলুদমাথা বাদামী গা পাখি ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে বললে,
-“আমার পোড়াকপাল তাই আমি কাঁদি গো! ঝড় বৃষ্টিতে আমাক বাসা ভেঙে গেছে। আমি এবার কোথায় যাই কী করি!”
সবুজব্যাঙ তো এই শুনে খুব কষ্ট পেল। সে বললে,
-“আহা গো! তুমি কিচ্ছু ভেবোনা! এই দ্যাখো, আমার কেমন রঙবেরঙা ছাতু আছে, ইয়াব্বড়। এর তলায় আমাদের দুই বন্ধুর দিব্যি দিন কেটে যাবে।”
হলুদমাথা বাদামী গা পাখি চোখের জল পালকে মুছে বলল,
-“কিন্তু আমার তো কিছু নেই? আমি ভাড়া দেব কী করে?”
সবুজব্যাঙ হেসে বললে,
-“সূয্যিমামা, বাদলমেঘ ওরা আমার ছাতুকে কেড়ে নিতে চেয়েছিল, তাই আমি ওদের দিইনি। কিন্তু তুমি আমার বন্ধু, বিপদে পড়েছো। তাই তোমায় আমি বিনিভাড়াতেই থাকতে দেব আমার রঙবেরঙা ছাতুতে। তুমি বরং রোজ আমায় মিষ্টি গান শুনিও তাহলেই আমি খুশি!”
এই শুনে তো হলুদমাথা বাদামী গা পাখির আনন্দ আর বাঁধ মানেনা। সে মধুর সুরে গাইতে লাগল,
-“সূয্যিমামা, বাদলমেঘ
কোরোনাকো মান,
হিংসে নয় ভালোবাসাই
বন্ধুত্বের দান।
মিলেমিশে থাকব সবাই
রঙীন ছাতুর তলে,
আজকে থেকে আমরা সবাই
সবুজব্যাঙের দলে”
(সমাপ্ত)

No comments:
Post a Comment