Showing posts with label বড়গল্প. Show all posts
Showing posts with label বড়গল্প. Show all posts

গল্প : মণিময় দারোগা

🔸🔸 মণিময় দারোগা 🔸🔸
🔸🔸 সুস্মিতা কুণ্ডু 🔸🔸

🔹🔹(১)🔹🔹

এলেম আছে বটে মণি দারোগার! আশেপাশের পাঁচ-সাতটা গাঁয়ের লোক একবাক্যে তাঁর নামে সেলাম ঠোকে। মণি দারোগা যাকে বলে এক্কেরে নয়নের মণি সকলের। হ’বেন নাই বা কেন! যবে থেকে তিনি বটুকপুর থানার অফিসার-ইন-চার্জ হয়েছেন তবে থেকে এ তল্লাটে আর একটাও চুরি ডাকাতি হয়েছে বলে দেখাতে পারবে কেউ? গেরস্ত মানুষেরা দরজা জানালা হাট করে খুলে নিশ্চিন্তে নাক ডেকে ঘুমোন। একটা স্টিলের গেলাস কিংবা ছেঁড়া গামছাটুকুনও চুরি হয়না।

বটুকপুরের দোকানগুলোতেও আজকাল আর তালা চাবি বিক্রি হয়না। সেই সেবার মদন চাটুজ্জের সদ্য বিয়ে হওয়া ছোটোজামাই কী বিপদেই না পড়ল। অষ্টমঙ্গলায় মেয়ে বাপের বাড়ি এসেছে জোড়ে, সেখান থেকে সটান যাবে বর্ধমান। ফেরার দিন হ’ল চিত্তির। সাধারণত বড় বড় সুটকেস তো সব বাসের মাথাতেই তুলে দেয় কন্ডাকটার-রা। এদিকে সুটকেসের ছোট্ট পিচ্চি তালাটা গেছে ভেঙ্গে। দোকানে দোকানে ঘুরে মদন চাটুজ্জে তালা আর পায়না। শেষমেষ নতুন জামাইকে নারকেল দড়ি দিয়ে বাঁধা সুটকেস নিয়েই বর্ধমান যেতে হ’ল।

নিন্দুকে অবশ্য বলে মণিময় দারোগা তন্ত্রমন্ত্র জানেন, তাঁর নাকি পোষা ভূত আছে একগণ্ডা। সেই ভূতেরাই তো সব চোর ডাকুদের শায়েস্তা করে রাখে। যেমন মণিময় মুকুজ্জে দারোগা হয়ে আসার মাস খানেক পরের কথাটাই ধরুন না। রামাপদ চোর তার সিঁধকাঠিটি নিয়ে হরনাথ মল্লিকের গোয়াল ঘরের মাটির দেওয়ালে ঝুরঝুর করে মাটি খুঁড়তে শুরু করেছিল সবে। হরনাথ সম্পন্ন কৃষক, সম্ভ্রান্ত গৃহস্থ মানুষ। তিন চারটে জার্সি গরু পোষা রয়েছে, দাম কম নয় সেগুলোর। গোয়ালঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে বাড়ির মধ্যে চলে যাওয়ার পথ রয়েছে। রামাপদ তাই সিঁধ দিয়ে ভেতরে ঢুকে তারপর গরু নিয়ে গোয়ালঘরের দরজা খুলে পালানোর মতলব ভেঁজেছিল। কিন্তু যেই না আদ্ধেকটা শরীর ফুটো দিয়ে  গোয়ালের ভেতর গলিয়েছে ওমনি ওপাশ থেকে কে যেন কানের কাছে বলে উঠল,

-“ছ্যা ছ্যা রামাপদ শেষমেষ তুমি গরু চুরি করবে! তোমার বাবা কৃষ্ণপদ কত বড় চোর ছিলেন, জমিদারের গিন্নির গলার সীতাহার চুরি করে তোমার মা-কে উপহার দিয়েছিলেন। তোমার ঠাকুর্দা হরিপদ, ইংরেজ দারোগার কোমর থেকে পিস্তল চুরি করে শ্রীপতি ডাকাতকে দশটা মোহরের বিনিময়ে বেচে দিয়েছিলেন। এইসব নমস্য ব্যক্তিদের বংশধর হয়ে তুমি শেষটায় গরু চুরি করবে?”

আদ্ধেক শরীর নিয়ে ঝুলন্ত ত্রিশঙ্কু অবস্থায় কেউ যদি অমন কানের পাশে ফিসফিস করে, তাহলে অতি বড় ঠাণ্ডা মাথার চোরেরও পিলে চমকে যেতে বাধ্য! রামাপদ তো কোন ছার! ভয়ের চোটে চেঁচিয়ে উঠল,
-“ক্কে কে ওখানে? কে কথা কইল?”
কিন্তু শুকনো গলা দিয়ে ‘কে’-এর পর বাকিটা শুধু ফ্যাসফ্যাসে আওয়াজ বেরলো। তারপর শুরু হ’ল বেদম কাশি। এদিকে রাতদুপুরে ওরকম কাশি আর ফ্যাসফ্যাসে আওয়াজে ভড়কে গিয়ে গোয়ালঘরের কোমলি ধবলি আর হেবলি, তিন জার্সি গাই মিলে গলার ঘন্টা প্রবল বেগে নাড়িয়ে, পা দাপিয়ে সে এক মহা শোরগোল শুরু করল। তাদের ক্ষুরের ঠোকায় গোয়ালঘরের মেঝেয় পড়ে থাকা গোবর খানিক ছিটকে এসে পড়ল রামাপদর মাথায়। রামাপদ কোনওমতে হ্যাঁচোড় প্যাঁচোড় করে সিঁধের গর্তটা থেকে গোয়ালঘরের বেরোতে চেষ্টা করতে গেল। গা ভর্তি তেলের গুণে পিছলে খানিকটা বেরলেও মাটি লেগে গিয়ে তেলতেলে ভাবটা উবে গেল আর হেথাহোথা বেশ ভালোরকমই ছড়ে গেল, ছাল চামড়া উঠে গেল। সেই অবস্থাতেই কোনওমতে ছুটতে শুরু করল রামাপদ। যতই ছুটুক না কেন একটা বিটকেল ‘হাঃ হাঃ হাঃ’ করে অট্টহাসিও যেন ওর পেছন পেছন ছুটতে লাগল। বাড়িতে ঢুকেই দরজায় খিল এঁটে, কান অব্দি কাঁথামুড়ি দিয়ে, শুয়ে পড়ল। তারপর তো দিন আষ্টেক আর কাজেই বেরোতে পারেনি বেচারা। খালি মনে হত যেন সেই অট্টহাসিটা পেছনে তেড়ে আসছে।

🔹🔹(২)🔹🔹

শুধু কি রামাপদ চোর? মাধব ডাকাতও কি ভুক্তভোগী নয় নাকি? এমনিতে মাধব বেচারা ডাকাতির বিজনেসে বড় একটা নাম করতে পারেনি। তবে মাধবের ওপর পূর্বপুরুষদের নামের বোঝা ছিলনা, রামাপদ চোরের মত। মাধবের পূর্বপুরুষরা আবার কলকাতা শহরের সব এক একটা আস্ত গাঁটকাটা, পকেটমার। মাধবেরও হাতে খড়ি হয়েছিল পকেট কাটাতেই। হাতের আঙুলের ফাঁকে আধখানা ব্লেড রেখে নরম লাউয়ের ওপর কাপড় জড়িয়ে, তাইতে দিনের পর দিন প্র্যাকটিস করেছিল মাধব। লাউয়ের খোলায় একটা আঁচড়ও পড়ত না এমনই নিপুণ হাত হয়েছিল মাধবের।

তা একদিন শ্যালদা স্টেশনে মাধব গেল পৈতৃক ব্যবসায় হাতেখড়ি করতে। সব ঠিকঠাকই চলছিল কিন্তু নির্জনে লাউয়ের খোলায় মকশো করা আর ওই ভিড়ে ঠাসা স্টেশনে, হকারের ঠেলা, ঠেলাগাড়ির গুঁতো, কুলির ধাক্কা খেয়ে ব্লেড চালানো আরেক জিনিস। একজন নাদুসনুদুস শেঠজি টাইপের লোকের হাতের আঙ্গুলে বেশ চকমকে পাথর বসানো সোনার আংটি, গলায় হার দেখে, পকেটে মোটা মানিব্যাগ থাকবে এই আশায়, আঙুলের ফাঁকে ব্লেডটা বাগিয়ে ধরে এগিয়েছিল পা টিপে টিপে। এমন সময় পেছন থেকে এক কুলি এসে হুড়মুড়িয়ে পড়ল ঘাড়ে, মাধবও ওমনি ছিটকে শেঠজীর বদলে পাশের মুশকোমত ষণ্ডামার্কা একটা লোকের ঘাড়ে পড়ল। হাতের ব্লেডটায় খোঁচা লেগে লোকটার সার্টিনের শার্টটা “ফ্যাঁঅ্যাঁসস্” করে আর্তনাদ করে অনেকটা ফেঁসে গেল। জামা তো ফাঁসলই, সেই সাথে ফেঁসে গেল বেচারা মাধব। লোকটা ঘুরে কপাৎ করে চেপে ধরল মাধবকে। তারপর যা হওয়ার তাই হ’ল, জনতা জনার্দন উত্তম মধ্যম পিটিয়ে, হাতের সুখ করে নিল।

কোনওমতে পকেটমারদের আড্ডায় ফিরে আসার পর মাধবের জীবিকাতুতো ভাই বেরাদররা তো বটেই, এমনকি মাধবের নিজের বাপ-কাকা অব্দি বেজায় হাসি ঠাট্টা করল ওকে নিয়ে। ওর নামই দিয়ে দিল সবাই “তালকানা মেধো”। তখনই মেধো মানে মাধব প্রতিজ্ঞা করেছিল এই পকেটমারীর অপমানের লাইনে থাকবে না মোট্টে আর। না না তাই বলে সৎ পথে করে কম্মে খাবে এতটাও বড় শপথ করেনি। কথায় বলে না ‘মারি তো গণ্ডার/ লুটি তো ভাণ্ডার’, তাই মেধো ঠিক করল ডাকাতির দল খুলবে। হ্যাঁ! ওইটে ভারি সম্মানের কাজ, লোকের পিটুনি খাওয়ার চেয়ে লোককে পিটুনি দেওয়ার সুযোগ বেশি। রণ-পা পরে হাঁটাটাও বেশ জম্পেশ হবে। আর ওই ‘হারে রেরে রেরে’ করে মশাল বল্লম নিয়ে তেড়ে যাওয়াটার মধ্যেও একটা বেশ ইয়ে মানে বীর বীর ব্যাপার আছে।

কিন্তু কলকাতা শহরের বুকে ডাকাতদল করাটা একটু বাড়াবাড়িই হয়ে যাবে, মাধব ভুলবশতঃ মার খেলেও বুদ্ধি যে একেবারেই নেই তা নয়। তাই চলে এল পিসির বাড়ি বটুকপুরে। এখানে দু’চারটে ছিঁচকে চোরের সাথে দোস্তি করল। তাদের একটু কলকাত্তাইয়া চুরি ডাকাতি পকেটমারির গল্প শুনিয়ে বেশ একটু সমীহ আদায় করল। তারপর জনা চারেক চ্যালা হ’তেই ডাকাতদল খুলল। এদিকে ডাকাতদল খোলায় পিসি ভারী অসন্তুষ্ট হয়ে মাধবকে দিল ঘর থেকে বার করে। তা ভালোই হয়েছে, ডাকাতদলের সর্দার পিসির বাড়িতে থাকে, পিসির পান সেজে দেয়, পুকুর থেকে জল বয়ে এনে দেয়, প্রয়োজনে আলু পটল ঝিঙে কেটে দেয় এমনটা কেউ শুনেছে কখনও? তার চে’ জঙ্গলের মধ্যে পোড়ো মন্দিরে বাস করা বেশি ভালো।

🔹🔹(৩)🔹🔹

তা দলবল গড়ার পর মন্দ ডাকাতি হচ্ছিল না। বিশু গাইনের যাত্রাদলের তাঁবুতে হামলা করে বেশ কিছু জরি চুমকি বসানো রাজা মন্ত্রীর পোশাক বাগিয়েছিল। সেগুলো মাঝেসাঝেই অঙ্গে গলিয়ে বসে থাকে মাধব। বেশ কেষ্টবিষ্টু লাগে নিজেকে। তারপর সেবার দুর্গাপুজোর ভাসানের পরেরদিন চণ্ডীমণ্ডপে হামলা করে প্যাণ্ডেলের বাঁশ কাপড় ত্রিপল সব খুলে এনেছিল। যদিও মাধবের ডানহাত ভেনো একবার বলার চেষ্টা করেছিল, এইসব ডাকাতিগুলোর সাথে ছিঁচকে চুরির আর পার্থক্যটা কোথায়! কিন্তু মাধব তাকে এক হুঙ্কার দিয়ে চুপ করিয়ে দিয়েছিল।

এতবড় মূর্খ যে ডাকাতি আর ছিঁচকে চুরির মধ্যে তফাৎ বোঝে না হতভাগা। ইচ্ছে করে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে দল থেকে বার করে দেয়, কিন্তু নেহাতই দলের সবচেয়ে করিৎকর্মা ডাকাত ওই ভেনোটাই কিনা। আরে বাবা এই যে ডাকাতি করতে বেরনোর আগে স্নান করে শুদ্ধ বস্ত্র পরে মা কালীর ছ’ইঞ্চির বাঁধানো পটের সামনে যে বলি দেয়, এটা কোনও ছিঁচকে চোর করে? বলির ব্যাপারেও কত ফ্যাঁকড়া ভেনোর, বলে কিনা নরবলি না হোক নিদেনপক্ষে একটা পাঁঠাবলি হোক। মাধব কি মাংসের দোকানের কসাই নাকি যে পাঁঠা কাটবে। মাধব বিশুদ্ধ বৈষ্ণবমতে ডাকাত তাই সব্জি বলি দেয়। ঝিঙে চিচিঙে কুমড়ো আখ সব ওর হাতের কাঠারির এক কোপে দু’টুকরো হয়ে যায়।

যাকগে এভাবে মাধব আর মাধবের দলের বৈষ্ণবমতে নিরামিষ ডাকাতি ভালোই চলছিল কিন্তু গোল বাঁধল মণিময় দারোগা এখানে আসার কিছুদিন পরেই। অনেকদিন ধরেই মাধব ডাকাতির প্ল্যান ছকে রেখেছিল কালুরাম কলুর তেলের ঘানিতে। বেশ ক’টা জারিকেন ভর্তি সর্ষের তেল ডাকাতি করে আনতে পারলে কাজে দেবে। যদিও ভেনো এখানেও বাগড়া দিয়ে বলেছিল যে,
-“সর্ষের তেল কি ডাকাতি করার মত বস্তু?”
 মাধবও খেঁকিয়ে উত্তর দিয়েছিল,
-“কেন সর্ষের তেল কোন কাজে লাগেনা শুনি? রান্না করতে, গায়ে মাখতে, প্রদীপ জ্বালাতে...”
-“নাকে দিয়ে ঘুমোতে...” মাধবের কথার মাঝেই ফোড়ন কেটেছিল ভেনো।

মাধব এইসব ছোটোখাটো বাধাতে পাত্তা না দিয়ে বলির কাজে মন দিয়েছিল। স্নান টান সেরে শুদ্ধ পট্টবস্ত্র পরে কপালে ইয়া লম্বা সিঁদুরের তিলক কেটে বলির কাঠারি নিয়ে রেডি হয়েছে। সামনের বেদীতে একটা একটা করে সব সব্জী সাজানো।
‘ওম হুম হ্রিং ক্রিং ট্রিং’ বলে কাঠারিটা তুলেছে, ওমনি কে যেন বলে উঠল,
-“দেখিস মাধব, লাউ কাটতে গিয়ে যেন আবার কারোর জামা কেটে ফেলিসনি!”
মাধব তো ভয়ানক রকমের হতভম্ব হয়ে ইতিউতি দেখতে লাগল, সব্বার আগে দেখল ভেনোর দিকে। নাহ্! সে ব্যাটা তো চুপটি করে বসে বসে নখ কামড়াচ্ছে। বাকি দুই মক্কেল গজা আর ভজা বসে বসে ঝিমোচ্ছে সব্জির ঝুড়ি নিয়ে। এক একটা করে সব্জি এগিয়ে বেদীতে রাখে, আর মাধব ঘ্যাঁচ করে কাটে। বেদীতে একটা কুমড়ো রেখে বসেছিল দু’জন। মাধবের কাঠারি মাঝ আকাশে থেমে যেতে গজা-ভজা বলে উঠল,
-“কী হ’ল সদ্দার! কী হ’ল সদ্দার!”

মাধব নিজেকে সামলে নিয়ে ভাবল নিশ্চয়ই ভুল শুনেছে, বলল,
-“কিছু নয়! লাউটা সরিয়ে একটা আখ বসা দেখি।”

গজা-ভজা বলে উঠল,
-“লাউ কোথা সদ্দার? কুমড়ো তো! তোমার পিসির বাড়ির মাচা থেকেই তো তুলে আনলুম।”

-“অ্যাঁ কী সব্বোনাশ করেছিস! পিসি তো এবার আমাকেই কুমড়োর ছক্কা বানিয়ে ছেড়ে দেবে রে!”

মাধব দাঁত কিড়মিড় করে ফের কাঠারি তোলে, সামনে চেয়ে দেখে কুমড়ো কই? সবুজ চকচকে একটা লাউ সামনের বেদীতে। আর কানের কাছে ফিসফিসিনি আওয়াজ,
-“কাঠারি দিয়ে কাটবি মেধো নাকি আধখানা ব্লেড আনব?”

এইবার মাধব কাঠারি ফেলে এক লাফে বেদী থেকে তিন হাত দূরে সরে গেল। সেবারের মত বলি ক্যানসেল হয়ে গেল। মাধব ঘামতে ঘামতে পিসির বাড়ি গিয়ে জ্বর এসেছে বলে কম্বলমুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল, পিসির চ্যাঁচানি শুনতে শুনতে।
-“কোন অলপ্পেয়ে হতচ্ছাড়া ড্যাকরা অমন নধর কুমড়োখানা মাচা থেকে তুলে নিয়ে গেল! পোড়ারমুকো! ওই কুমড়ো তোর পেটে সইবে না অনামুখো!”

তারপর থেকেই আর ডাকাতি করতে বেরোতে সাহস হয় না মাধবের। মাধবের দলের আরেক চ্যালা বগলা হ’ল গিয়ে গুপ্তচর। বগলা খবর আনল নতুন দারোগা মণিময় নাকি ভূত পোষেন। আর সেই ভূত বগলদাবা করে নিয়েই নাকি তিনি বটুকপুরে এসেছেন। এই ভূতই নাকি বটুকপুরের সব চোর ডাকাতদের অবস্থা টাইট করে রেখেছে।এই খবর পাওয়ার পর ভেনো ভজা গজা অনেক করে বললেও খুব একটা লাভ হয়নি। মাধব কিছুতেই আর বলিও দেয়নি, ডাকাতিও করতে বেরোয়নি।

🔹🔹(৪)🔹🔹

রামাপদ, মাধব, মাধবের স্যাঙাতরা, আরও এদিক ওদিকে গাঁয়ের চোরেরা সব বেজায় নাজেহাল অবস্থায় দিন কাটাতে লাগল। যেই কেউ চুরিচামারি বা অন্যায় কোনও কাজ করতে যায় ওমনি কানের কাছে সেই ফিসফিস। ওদিকে মণিময় দারোগা দিনদিন একটার পর একটা পদক বাগাচ্ছেন পুলিশ বিভাগ থেকে ওঁর অসামান্য কর্মকাণ্ডর জন্য, আর ভুঁড়িটিও সেই সাথে বাগাচ্ছেন। একেই বলে ‘ঝড়ে কাক মরে, ফকিরের কেরামতি বাড়ে।”

এই চোর ডাকাতদের দলবলের মধ্যে ভেনো বেশ বুদ্ধি ধরে, আট ক্লাস অব্দি পড়ালেখা করেছে। ভেনো চুপিচুপি বগলাকে ডেকে বলল,
-“হ্যাঁরে ব্যাটা বগলা! তোর হঠাৎ কেন মনে হল যে মণিময় দারোগা ভূত পোষে? ভূত কি গরু না ছাগল? ভূত দুধ দেয় গোবর দেয় যে লোকে পুষবে? আর পুষবে বললেই হ’ল? ভূত পাবে কোথায়? সে কি হাটে বাজারে পাঁচ হাজারটাকায় জোড়া কিনতে মেলে? যদিও বা মেলে, সে ভূত মানুষের পোষ মানবে কেন? উল্টে মানুষেরই ঘাড় মটকে মেরে ফেলবে।”

ভেনোর এত প্রশ্নে বগলা বেজায় রেগে গিয়ে বলল,
-“ত্ ত্ তবে কী আমি মিছে বলচি? ওই তো সেদিন থ্ থ্ থানার হাবিলদার ম্ ম্ মাণিকলাল আর প্ প্ প্ পুরন্দর হাটে এসেছিল। আমিও তখন ঘুরঘুর করছিলুম হাটের এদিক ওদিক, যদি কিছু হ্ হ্ হাতসাফাই করতে পারি সেই মতলবে। এমন সময় দেখলুম ওরা নিজেদের মধ্যে ব্ ব্ বলাবলি করছে। ‘বড়সাহেবের পোষা ভ্ ভ্ ভূত আছে।’ আমি নিজের কানে আ আ আড়ি পেতে শুনলুম।”

বগলা তোতলাতে তোতলাতে যা বলল সেটা সবাই একবাক্যে বিশ্বাস করলেও ভেনোর মনে সন্দেহ জাগল। ভেনো স্থির করল সরেজমিনে তদন্ত করেই দেখবে। যেমনি ভাবা তেমনি কাজ। সন্ধেবেলায় সূয্যিমামা পাটে যেতেই একটা কালো চাদর মুড়ি দিয়ে ভেনো চলল মণিময় দারোগার বাড়ির দিকে। বেশ বড়সড় সাদা বাড়ি, সরকার বাহাদুরের টাকায় তৈরি, বটুকপুরের দারোগার জন্য। বাড়ির চারদিকে উঁচু বেড়া দেওয়া। তবে বেড়ার গায়ে একটা বাবলাগাছ রয়েছে, তার ডালপালাগুলো বেড়া টপকে বেশ ভেতরে বাড়ির জানালার সামনে অব্দি চলে গেছে। ভেনো বহুকষ্টে কাঁটা বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে একটা ডাল বেয়ে জানলার কাছে গিয়ে উঁকি মারল ঘরের ভেতর।

এই ঘরটা মনে হয় বৈঠকখানাই হবে। একটা মেহগনি কাঠের গোল টেবিলের ওপর ফুলদানি রাখা। একটা চেয়ার টেনে বসে আছেন মণিময় দারোগা। দারোগাগিন্নি একটা ট্রে-তে করে দু’কাপ চা এনে টেবলে রেখে, আরেকটা চেয়ার টেনে বসেন।
চা-টা খেতে গিয়ে দারোগাগিন্নি বলে ওঠেন,
-“এই যাহ্! বিস্কুটের কৌটাটা আনতে ভুলে গেলুম।”
মণিময় দারোগা হাঁকলেন,
-“সুখো, ওরে সুখময়! দে না বাবা বিস্কুটের কৌটোটা তাক থেকে পেড়ে এনে একটু।”
চোখ দুটো ছানাবড়ার মত করে ভেনো বাবলা গাছের ডালে বসে দেখল, একটা কৌটো হাওয়ায় উড়তে উড়তে এসে থামল মণি দারোগার মাথার কাছে, শূন্যে ভাসতে লাগল। আপনা আপনিই কৌটোর ঢাকনার প্যাঁচটা ঘুরে ঘুরে খুলে গেল। দুটো বিস্কুট বেরিয়ে এল কৌটোর ভেতর থেকে। সোজা ভেসে ভেসে দুলে দুলে ল্যান্ড করল মণি দারোগার প্লেটে। ফের দু’টো বিস্কুট একইভাবে উড়ে এসে জাঁকিয়ে বসল দারোগাগিন্নির প্লেটে। তারপর কৌটোর ঢাকনা বন্ধ হয়ে নিজে থেকেই যথাস্থানে চলে গেল। শুধু তাই নয়, ঘর ঝাড়ু দেওয়াও নিজে নিজেই করছে একটা মুড়ো ঝাঁটা। চা খাওয়া হ’তে টেবলের ওপরের কাপ প্লেটগুলোও ওই বিস্কুটের মত ভেসে ভেসে চলে গেল, রান্নাঘরের দিকে বোধ হয়।

কিন্তু এমন অশৈলী কাণ্ড দেখে ভেনো আর যথাস্থানে থাকতে পারল না। বাবলা গাছের কাঁটাভরা ডালে হাত পা ছিঁড়ে স্থানচ্যূত হয়ে পড়ল নিচের ঝোপে। ঝোপে পড়ামাত্র সর্বাঙ্গ জ্বলে উঠল, ভেনো হাড়ে হাড়ে মানে চামড়ায় চামড়ায় বুঝতে পারল বিছুটির ঝোপে পড়েছে। কিন্তু ঝড়ঝড় করে শব্দ হওয়াতে মণি দারোগা উঠে এসে জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বাজখাঁই হাঁক ছেড়েছেন,
-“কে রে ওখানে?”
তাই বিছুটির ঝোপের মধ্যেই চুপ করে ঘাপটি মেরে বসে রইল ভেনো। কিছুক্ষণ পরে মণি দারোগা জানালার কাছ থেকে সরে যেতে, কোনওক্রমে উঠে গা চুলকোতে চুলকোতে দৌড় লাগাল কষে।

🔹🔹(৫)🔹🔹

পৈতৃক প্রাণটা হাতে নিয়ে ফিরে তো এল ভেনো কিন্তু বুঝতে পারল যে সুখো ভূতের জন্যই ওদের এই দুরবস্থা। কাজেই ওদের চুরি ডাকাতির ব্যবসা নির্বিঘ্নে চালাতে গেলে মণিময় দারোগার পোষা সুখময় ভূতের একটা গতি করতে হবে। মাধবের একার দ্বারা কিছু হবে বলে মনে হয় না। এলাকার সমস্ত চোর ডাকাতকে এক করতে হবে। এত সহজে ঘাবড়ে হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্র ভেনো মস্তান নয়।
যেমন ভাবা তেমনি কাজ, চারপাশের এলাকার সব চোর ডাকাতদের জড়ো করে নিজের মতলবের কথা বলল ভেনো। মাধব দলের লিডার হ’লেও ভূতে বড্ড ভয় পায় তাই এ ব্যাপারে ভেনোর কর্তৃত্বই নির্বিবাদে মেনে নিল।

নির্দিষ্ট দিনে, বটুকপুরের জঙ্গলের পোড়ো মন্দিরে মাধব ডাকাতের আস্তানায় এসে হাজির হ’ল তান্ত্রিক ঘুটঘুটেশ্বর। অন্ধকারের মত কালো ঘুটঘুটে রঙ বলে তাঁর নাম ঘুটঘুটেশ্বর। তাঁর গুরু হ’লেন ফটফটেশ্বর, তিনি খড়ম ফটফটিয়ে হাঁটতেন কিনা। তাঁর গুরু হ’লেন কুটকুটেশ্বর। শোনা যায় যে তাঁর দাড়ি আর জটার এমন জঙ্গল ছিল মুখ আর মাথাময় যে সেখানে উকুন তো নস্যি, ছারপোকা, তেলেপোকাও বাস করত নাকি!
ভালোমত খোঁজখবর করেই তান্ত্রিক জোগাড় করেছে ভেনো। তান্ত্রিক এসেই হুঙ্কার ছেড়ে ডাকল,
-“নমোঃ গুরু ফটফটেশ্বর! নমোঃ তস্য গুরু কুটকুটেশ্বর! কোথায় তোদের দারোগার পোষা ভূত। এক্ষুনি তার দফা শেষ করব। বাঘে  ছুঁলে আঠেরো ঘা, পুলিশে ছুঁলে ছত্রিশ ঘা, ঘুটঘুটেশ্বর ছুঁলে ঘায়ের ওপর ঘা! মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা! গোদের ওপর বিষফোঁড়া!”

বলতে বলতে উত্তেজনায় পোড়ো মন্দিরের গায়ের বুড়ো অশ্বত্থগাছের শেকড়ে প্রায় হুমড়ি খেয়েই পড়ে যাচ্ছিলেন তান্ত্রিক মহাশয়। বগলা ছুটে গিয়ে ধরল তান্ত্রিকমহাশয়কে।
-“ঘ্ ঘ্ ঘ্ ঘুট্ ঘুট্...”
বগলার জিভের এই ঘ্যাচাং করে ব্রেক লেগে ঘটঘটাং চিৎকারে তান্ত্রিক মহাশয় আর্তনাদ করে উঠলেন,
-“ওগো মাগো ঘ্যাঁঘা ভূতে ধরলো গো...”
ভেনো জলদি ছুটে এসে সামাল দেয়,
-“তান্ত্রিক ঠাকুর, ও ঘ্যাঁঘা ভূত হ’তে যাবে কেন! ও তো বগলা!”
তান্ত্রিক নিজের ভুল বুঝতে পেরে ঝাঁঝিয়ে ওঠেন,
-“জানি হে ছোকরা! আমি আবার ভূত চিনব না?! কোথায় তোদের সুখো ভূত? তাকে ঝেড়ে যদি দুখোভূত না করে দিয়েছি, তবে আমার নামটাই বদলে দিস।”
এই বলে নানারকম বিটকেল বিটকেল জিনিস ঝোলা থেকে বার করে যজ্ঞের আয়োজন করতে থাকেন ঘুটঘুটেশ্বর। গিরগিটির চোখ, কাকের পালক, শেয়ালের লেজ, ব্যাঙের ঘিলু, দেখে গা গুলিয়ে ওঠে সকলের। ‘হ্রিম ক্লিম ফট্ ফটাস’ করে মন্ত্র পড়তে থাকে ঘুটঘুটেশ্বর।

ওদিকে ভেনোর প্ল্যানমতো ভজা আর গজা দৌড়ে যায় থানায়। ভর দুপুরবেলায় ভুঁড়ির ওপর চেপে বসে থাকা বেল্টটা আলগা করে, চেয়ারে পা তুলে মিহি সুরে নাকটা ডাকতে শুরু করেছিলেন মণিময়। দুপুরে গিন্নি চারতলা টিফিন ক্যারিয়ারে চর্ব্য চোষ্য ভরে সুখময়ের হাতে করে আকাশপথে পাঠিয়েছিলেন। খাওয়াটা একটু অপরিমিতই হয়ে গেছে। ঠিক এমন সময় হাঁউ মাঁউ করে ভজা আর গজা এসে আছড়ে পড়ল মণি দারোগার দুই হাঁটুর ওপর। মণিময় চমকে বিষম খেয়ে মাথা চাপড়াতে লাগলেন।
ভেনোর দেওয়া ট্রেনিং অনুযায়ী ভজা আর গজা পালা করে করে বলে চলল,
-“হুজুর মাই বাপ!”
-“হুজুর ধর্মাবতার!”
-“বটুকপুরের জঙ্গলে...”
-“পোড়ো মন্দিরে...”
-“এক বিটকেল কাপালিক এসেছে...”
-“নরবলি দেবে বলে আয়োজন করেছে...”
-“হুজুর আপনি বাঁচান!”
-“হুজুর আপনি রক্ষা করুন!”

‘কাপালিক’, ‘নরবলি’, এসব শুনে তো বেজায় ভড়কে গেলেন মণিময় দারোগা। বিড়বিড় করে জপতে থাকলেন,
-“বাবা সুখময়! বাছা একটু দ্যাখো দিকিনি! কীসব নরবলি কাপালিক বলছে! ওগুলো তো তোমার ডিপার্টমেন্ট কিনা।”

এদিকে জোরে জোরে ভজা আর গজাকে বললেন
-“ঠিক আছে ঠিক আছে! তোরা যা আমি এক্ষুনি ফোর্স নিয়ে যাচ্ছি।
পুরন্দর! মাণিকলাল! বন্দুক লে আও!”

ভজা আর গজা মুখ টিপে হাসতে হাসতে থানা থেকে বিদেয় হ’ল।

ওদিকে সুখময় তখন গিন্নিমার আজ্ঞামত আসনে ফোঁড় তোলা, শুকনো জামা কাপড় তুলে এনে ইস্ত্রি করা, ভাঁজ করা, বিকেলের জলখাবারের লুচির ময়দা মাখা, জল তোলা, সুপুরী কাটা, সব কাজ একসাথে করছিল। অবশ্য সুখময়ের এসব বাম হাতের তর্জনীর কাজ। শুধু ইশারা করলেই কাজ হ’তে থাকে আপনা আপনি। হাত লাগাতে হয়না, যন্ত্রপাতি এমনিই চলে নিজে থেকে। তাই গিন্নিমা ওকেই সব কাজ বুঝিয়ে দিয়ে দুপুরবেলায় একটু গড়িয়ে নেন। দারোগা মশাই স্মরণ করতেই সুখময়ের ধোঁয়ার টিকি খাড়া হয়ে উঠল! ছুটল... ইয়ে মানে উড়ল বটুকপুরের জঙ্গলের পোড়ো মন্দিরের কাপালিকের সন্ধানে।

🔹🔹(৬)🔹🔹

পোড়ো মন্দিরে ততক্ষণে বিশাল এক আগুন জ্বেলেছে ঘুটঘুটেশ্বর। তার চারপাশে ঘুরে ঘুরে নেত্য করে চলেছে আর মন্ত্র পড়ছে,
-“ওম দুম ফটাস! হিং ক্লিং চটাস! ফটফটায় পিড়িং! কুটকুটায় কিড়িং! ফট ফটাস! চট চটাস!”
ওই ফটাস আর চটাসগুলো অবশ্য মশা মারার শব্দ। কাপালিকের চারপাশে রামাপদ চোর, মাধব ডাকাত, ভেনো শাগরেদ, বগলা গুপ্তচর, ভজা-গজা, আশপাশের গাঁয়ের আরও খানক’তক চোর ডাকু, সব উৎসুক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তান্ত্রিক কেমন করে মণি দারোগার পোষা ভূতটাকে ধরে সেটা দেখবে বলে।

হঠাৎ একটা জোরে ঝড় উঠল মন্দিরকে ঘিরে। চারপাশের গাছের পাতা উড়ে এসে পড়তে লাগল যজ্ঞের আগুনের ওপর। ধুলোয় ঢেকে গেল চারদিক। চারপাশের ভিড় নিমেষে পাতলা হয়ে এল। সবাই পোড়ো মন্দিরের ভেতরে গিয়ে ঢুকল এক লাফে। ভাঙ্গা দেউলের মধ্যে যদি ঠাকুর আগলায় ভূতের হাত থেকে। ওদিকে ঘুটঘুটেশ্বর তান্ত্রিক মনে মনে বেজায় ভয় পেলেও মুখের জোরটা বহাল রাখে,
-“কে রে হতচ্ছাড়া মর্কট ভূত! শিগগির দেখা দে। নাহলে এক্ষুনি মন্তর পড়ে তোকে নিকেশ করে যমের দক্ষিণ দোরে পাঠাব। জানিস আমি কে? আমি ঘুটঘুটেশ্বর তান্ত্রিক, আমার গুরু ফটফটেশ্বর তান্ত্রিক, তস্য গুরু কুটকুটেশ্বর ... ”

উড়ন্ত ধুলোগুলো আস্তে আস্তে একটা জমাট অবয়ব ধরে। সেই ধুলোর মূর্তি হা হা করে হেসে বলে ওঠে,
-“ও ঘুটঘুটে তান্ত্রিক! সে সব তো বুঝলুম তুমি বিশাল তান্ত্রিক।
কিন্তু আমি ভূত না মর্কট সেটা তো ঠিক করে দ্যাখো আগে। আর মরা ভূতকে মেরে যমের বাড়ি পাঠাবে! আমার বোধ হচ্ছে তোমার মাথায় ঘিলুর কিঞ্চিৎ অভাব ঘটেছে, দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে এসেছে। দাঁড়াও আমিই তোমার ব্যবস্থা করি।”
এই বলে সেই ধুলোর মূর্তি মানে সুখো ভূত জোরসে ফুঁ দিল। ওমনি মাটিতে রাখা ব্যাঙের ঘিলু, গিরগিটির চোখগুলো সব উড়ে গিয়ে পড়ল ঘুটঘুটেশ্বরের মাথায়। সেসব মাখামাখি হয়ে একসা কাণ্ড! তান্ত্রিক তো রেগে লাল হয়ে আরও জোরে মন্ত্র পড়তে লাগল আর তাণ্ডব নৃত্য করতে লাগল। তখন সেই ধুলোর মূর্তি বেশটি করে গা ঝাড়া দিল। সব ধুলো ঝরে গিয়ে একটা ছাইরঙা ধোঁয়ায় গড়া মূর্তি বেরিয়ে এল। তার আবার মাথায় ধোঁয়ার টিকি, এটাই সুখময়ের আসল রূপ।

এবার সুখময় টিকটা টিং টিং করে নাড়াতেই কাকের পালকগুলো আর শেয়ালের লেজ উড়ে গিয়ে বেদম কাতুকুতু লাগাতে শুরু করল তান্ত্রিককে। সে ব্যাটা তো,
-“তবে রে! হা হা হি হি! দেখাচ্ছি মজা! উহুহু! ভুঁড়িতে নয় ভুঁড়িতে নয়! নচ্ছার ভূত! হো হো হো!”
এই বলে পরিত্রাহী চিৎকার করতে করতে তাণ্ডবনৃত্য ছেড়ে বাঁদরনাচ শুরু করল।
পোড়ো মন্দিরের ভেতর থেকে যত সব চোর ডাকাতের দল তো ভয়ে আধমরা হয়ে সুখো ভূতের হাতে ঘুটঘুটেশ্বরের এই দুর্দশা দেখতে লাগল। সুখো ওদের ভয় দেখানোর জন্য যেই একটু বিকট মূর্তি ধরে দাঁত খিঁচিয়ে তেড়ে গেল, ওমনি সবক’টা মিলে ‘বাবা গো মা গো’ করে পালাতে গিয়ে এমন ধাক্কাধাক্কি শুরু করল যে সেই পুরনো নড়বড়ে দেউলের দেওয়াল ভেঙ্গে হুড়মুড়িয়ে পড়ল ওদের ঘাড়ে।

ওদিকে মণি দারোগা সুখো ভূতকে স্মরণ করার খানিকক্ষণ পর ভাবল,
-“এতক্ষণে সুখো নিশ্চয়ই কাপালিক ব্যাটাকে জব্দ করে ফেলেছে। এবার তবে আমি নিশ্চিন্তে অকুস্থলে যেতে পারি।”
এই ভেবে পুরন্দর আর মাণিকলাল হাবিলদারকে সঙ্গে নিয়ে, ক’টা জংধরা গাদা বন্দুক নিয়ে রওয়ানা দিলেন।
বটুকপুরের জঙ্গলের পোড়ো মন্দিরে পৌঁছে দেখলেন এক বিকটদর্শন কাপালিক চিৎকার করে পাগলের মত নাচছে। শুধু তাই নয়, পোড়ো মন্দিরের দেওয়াল ভেঙ্গে পড়েছে আর তার তলায় একগাদা লোক চাপা পড়েছে। যে সে লোক নয়, এলাকার সব নাম করা চোর ডাকু। আর দেখলেন সুখময়ের ধোঁয়ার শরীরটা পাশের অশ্বত্থ গাছের ডালে বসে ধোঁয়ার ঠ্যাংদুটো দোলাচ্ছে।

তড়িঘড়ি চোর ডাকুগুলোকে আর সেই সাথে ফেরেব্বাজ তান্ত্রিককেও বেঁধে, থানায় নিয়ে গিয়ে সোওওজা হাজতে পুরলেন মণি দারোগা। সুখো ভূতের ভয়ে তাদের আর ট্যাঁ ফোঁ করারও ক্ষমতা ছিল না।

🔹🔹(৭)🔹🔹

এই ঘটনার পর বটুকপুর তো বটেই পুলিশের ওপর মহলেও সুখময় ভূতের কথা রাষ্ট্র হয়ে গেল। পুলিশের বড়কর্তারা ভাবলেন এবারে তো তবে মেডেল সুখময়কে দিতে হয়, মণিময় দারোগা কেন মিছে নাম কামাবেন। কিন্তু সমস্যা একটাই সুখময়ের ধোঁয়ার শরীরের হাওয়ার গলায় মেডেলটা ঝোলাবেন কীকরে। কেউ কেউ সমাধান জানাল, সুখময়ের জীবদ্দশার কোনও ছবি জোগাড় করে তাইতেই মেডেল ঝোলালে হয়। কিন্তু সে উপায়েও সমাধান হ’লনা। কারণ সুখময়ের মনেই নেই তার জীবদ্দশার কথা। মণিময় দারোগার বাড়ির বাগানে হঠাতই নিজেকে প্রেতদশাপ্রাপ্ত অবস্থায় আবিষ্কার করেছিল সুখময়, আর কিছুই মনে ছিলনা। কীভাবে মারা গেল, কী হয়েছিল, কোথায় বাড়ি, কিচ্ছু না! চোর ডাকাতের মুখ দেখে তাদের অতীত জেনে নিতে পারলেও সুখময় নিজের অতীত মনে করতে পারত না। কেজানে হয়ত নিজের মুখটা ধোঁয়াশা হয়ে গিয়ে, দেখতে পেত না, তাই হয়ত। গিন্নিমা প্রথমে বাড়িতে ভূতের আবির্ভাবে ভির্মি খেলেও পরে বেশ পোষা বেড়ালটির মত পোষ মানিয়ে নিয়েছিলেন সুখময়কে। ‘সুখময়’ নামটাও গিন্নিমারই দেওয়া, মণিময়ের সাথে মিলিয়ে।

অবশ্য যাকে মেডেল দেওয়ার জন্য এত চিন্তাভাবনা তার এই বিষয়ে কোনও মাথাব্যথা নেই। সুখো ভূত মাধবের পিসির বাড়ির খড়ের চালে বসে গান শুনতে ব্যস্ত। মাধবের পিসি ভাইপোর ডাকাতির জন্য ভিটেয় যে পাপ লেগেছে তাই শুদ্ধি করতে হরিনামের আসর বসিয়েছে। পিসির আবার ভূতে ভারী ভয় কি না।
“হরি দিন তো গেল ... সন্ধে হ’ল... পার করো আমারে!”
সুখময় চালে বসে তাল দিয়ে হরিনাম সংকীর্তন শুনতে থাকে আর ভাবতে থাকে নামগানের গুনে যদি প্রেতদশা থেকে উদ্ধার পায়। ব্যাটাচ্ছেলের এটাও মনে নেই যে ভূতেদের ‘হরিনাম’ শোনা মানা!

(সমাপ্ত)

(পরবাসিয়া পাঁচালীতে প্রকাশিত)

বড়গল্প : কিচিরমিচির


কিচিরমিচির
সুস্মিতা কুণ্ডু

আজ সেই কোন সক্কাল থেকে ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে। চারপাশটা কেমন যেন স্যাঁতস্যাঁতে। জানলার বাইরের একফালি আকাশটা গত দু’দিন ধরে বড্ড ঘোলাটে হয়ে আছে। ধুর! তিতলির একদম ভালো লাগে না এমনধারা বেরঙ আকাশ।
এর চে' ছোটমাসির গত বছরের জন্মদিনে দেওয়া আকাশি গাউনটার মত রঙের আকাশ বেশি পছন্দ ওর। জামাটায় যেমন সাদা সাদা গোলাপ ফুল বানানো ভেলভেটের, আকাশের গায়েও ওমনি সাদা সাদা ঝুমকো ঝুমকো মেঘ যখন ঘুরে বেড়ায়, অবাক চোখে চেয়ে থাকে ও। জানলার গ্রিলটায় মাথাটা চেপ্পে ধরে, মুঠোয় রডগুলো আঁকড়ে, বসে থাকে বিছানার ওপর ঘন্টার পর ঘন্টা।

বাবাই খাটটাকে জানলাটার গায়ে সরিয়ে দিয়েছে একদম, যাতে তিতলি জানলার সামনে বসলেই ওপরে আকাশ আর নিচে ওদের বাগানটা দেখতে পায়। বাগানে মা নিজের হাতে কতরকম ফুলের চারা লাগিয়েছিল ক'মাস আগে। নয়নতারা, বেলি, জুঁই, রঙ্গন, দোপাটি, আরও কত কী। তিতলি সবক'টার নাম জানেনা। প্রতি বছর নানা রকম মরশুমি ফুল লাগায় মা। শীতকালে গাঁদা, ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা সব লাগিয়েছিল। সেগুলো একবার ফুল হয়ে তারপর সব শুকিয়ে মরে গেছে। অন্যান্যবার মা বাবা আর রাঙাপিসি মিলে আগাছা পরিষ্কার করে দেয়। এবারে আর কেউ বাগানের দিকে নজরই করেনি। আগাছায় ভরে গেছে অনেক, শুকনো গাছগুলোও ফেলা হয়নি। রাঙাপিসি কতরকম সব্জি লাগাত, বেগুন, টমেটো, ঢ্যাঁড়স, উচ্ছে, এবারে কিচ্ছুটি লাগায়নি। সবাই যে কেন এত মনমরা হয়ে থাকে! একটুও ভালো লাগেনা তিতলির।

দুটো চড়ুই পাখি ক'দিন ধরে খুব তিতলিদের বাগানে আনাগোনা জুড়েছে। বাইরে যাওয়ার রাস্তাটা বাগানের মধ্যে দিয়েই। নুড়ি বিছানো পথটা তিতলিদের বাড়ির সদর দরজা থেকে শুরু করে বাগানের ভেতর দিয়ে গেছে রাস্তার ধারের গেটটায়। ওই সিমেন্টের থামওয়ালা লোহার দরজা লাগানো গেটটার মাথায় চড়ুইদুটো একবার বসে, আবার ফুড়ুৎ করে উড়ে যায়। তিতলি আগে ভাবত ওরা এমনিই খেলা করে বুঝি, কিন্তু দিন পনেরো আগে ওদের মুখে করে খড় কুটি আনতে দেখে মা'কে জিজ্ঞাসা করেছিল। মা বলেছিল ওরা নাকি বাসা তৈরি করবে।

***************

গেটের থামটায় তিতলিদেরও এই বাসার নামটা লেখা আছে, 'পদ্মালয়', সাথে বাবার মায়ের রাঙাপিসির আর ওর নামও আছে, সাদা শ্বেতপাথরের ওপর কালো কালো অক্ষরে। ঠিক তার নিচে একটা ছোট্ট খুপরি আছে। লেটার বক্স করার জন্য ছিল, কিন্তু আর বসানো হয়নি। ওদের বাড়িটায় অনেক কিছুই এরকম অসমাপ্ত, অসম্পূর্ণ পড়ে আছে। তাতেই খড়কুটো জমা করে বাসা বানাচ্ছে চড়ুইদুটো। ওদের বাসাটাও তিতলিদের বাসাটার মত, অসম্পূর্ণ।

তিতলির মায়ের অনেকদিনের স্বপ্ন একটা নিজের বাড়ির, আর একটা বাগানের। শহর থেকে দূরে তাই এই মফস্বলে একটু জায়গা কিনে বাড়ি বানাতে শুরু করেছিল বাবা। কিন্তু মাঝপথে সব থমকে গেল। দু’দিকের বিশাল খরচ সামলানো যে খুব শক্ত, সেটা তিতলির মত ছোট্ট মেয়েও বোঝে। বাড়িটায় এখনও রঙ হয়নি, প্লাস্টার হয়েই পড়ে আছে ভেতরে বাইরে। পাঁচিল আর গেটটা অবশ্য আগের জমির মালিকেরই দেওয়া ছিল, ওরা নতুন নেমপ্লেটটা বসিয়ে নিয়েছে। সিঁড়ির ওপরের ছাদটাও টিন দিয়ে ঢাকা। তিতলি ছোট্ট চিবুকটা হাতের ওপর রেখে ভাবতে থাকে, কবে যে আবার বাগানটায় যাবে!
নতুন জায়গায় এসে পুরোনো স্কুলের, পাড়ার বন্ধুদের জন্য বড্ড মন কেমন করছিল। এখানের স্কুলটায় সবে যেতে শুরু করেছিল, কিন্তু সে’রকম কোনও বন্ধু হওয়ার আগেই ও ঘরবন্দী হয়ে গেল।

কী পচা একটা অসুখ যে ওর হয়েছে! কিছুদিন ছাড়া ছাড়াই হসপিটালে যেতে হয়, ডাক্তার কাকু, সিস্টার দিদিরা সব ইঞ্জেকশন দেয়। আরও কীসব কঠিন কঠিন পরীক্ষা হয়। তিতলির বড় কষ্ট হয়। এদিকে নল ওদিকে পাইপ সব নিয়ে যেন নিজেকে কেমন ওই এলিয়েনদের মত দেখতে লাগে। আচ্ছা সিনেমায় দেখায়, এলিয়েনদের কত ক্ষমতা। একটা অমন এলিয়েন যদি তিতলি পেত, কী ভালোটাই না হ’ত। ওর সব রোগ এলিয়েন বন্ধু সারিয়ে দিত ম্যাজিক করে।
কিন্তু ওগুলো মনে হয় শুধু সিনেমায়, গল্পেই হয়। সত্যি সত্যি মানুষ মরেই যায়। যেমন ঠামাই চলে গেল। ঠামাই চলে যেতে ওই বাড়িটায় আর কারোর মন বসত না। রাঙাপিসিও সারাদিন মন কেমন করে ঘুরত, তাই তো ওরা এখানে চলে এল আরও। কিন্তু আসার মাসকয়েক পরেই তিতলির এই অসুখ ধরা পড়ল, সবাইকে এক নিমেষে ভাসিয়ে দিল চিন্তার সাগরে।

******************

দুপুরে আকাশ ভেঙ্গে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি এল। সে কী জলের ঝাট। তিতলির বিছানাটা জানালার ধারে, আরেকটু হলেই ভিজে ঢোল হয়ে যেত। বাবাই এসে শিগ্গির জানলাগুলো বন্ধ করে দিল। একটু আলতো করে বকে তিতলিকে বলল,
-“হ্যাঁ রে মেয়ে! বৃষ্টির জল আসছে ডাকবি তো গলা তুলে কাউকে।”
আজকাল তিতলিকে কেউ ঠিক করে বকেও না। কী কাণ্ড দেখো! তিতলি নাকি বকুনিও মিস করছে। সত্যি সত্যি ওর শরীর খারাপ করেছে।
আসলে বৃষ্টির ঝাট গায়ে এসে পড়লেও ও তখনও চড়ুইদুটোকে দেখেই চলেছিল। বড্ড ভিজে গেছে পাখিদুটো, তাও ওই সিমেন্টের থামের খোপটার মুখে কী যেন আড়াল করে বসে আছে। সেটাই উঁকিঝুঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করছিল ও, মানে যতটা ওই দেখা যায় আর কী জানলার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে।
নাহ্! ভালো করে কিছু বুঝতে পারা যাচ্ছেনা এতদূর থেকে।

-“অ্যাই তিতলি দুধ খাবি?”
রাঙাপিসির ডাকে মুখ ফিরিয়ে চাইল তিতলি। হাতে দুধের গ্লাসটা নিয়ে দাঁড়িয়ে।
তিতলি একগাল হেসে বলে,
-“এ্যাই রাঙাপিসি! এদিকে আয়, শোন শোন। দ্যাখ ওই থামে দুটো চড়ুই পাখি। কদ্দিন ধরে আসছে ওরা। দেখেছিস ওদের তুই?”
-“হ্যাঁ তো দেখেছি তো। ওরা তো বাসা গড়েছে ওই থামের ফোকরটায়। তুই জানিসনা তিতলি? ঐ যে রে যেখানটায় দাদা বলেছিল লাল একটা লেটারবক্স লাগাবে।”
-“তাআআআই রাঙাপিসি? কী মজা! বাসার ভেতর বাসা। কী দারুণ না?”
-“তাই তো! আমাদের বাসার ভেতর ওদের বাসা! এ্যাই জানিস জানিস, ওরা আবার ডিম পেড়েছে।”
-“চড়ুইপাখির ডিম!!! কেমন দেখতে রে রাঙাপিসি? আমায় বাগানে একবারটি নিয়ে যাবি দেখাতে রে?”
-“তোকে নিয়েই যাব তো। তিনটে কেমন ছাই ছাই রঙের ডিম। এই ছোট্ট ছোট্ট ঠিক মার্বেল গুলির মত।
এ্যাই তিতলি কদ্দিন মার্বেল খেলিসনি আমার সাথে।
হ্যাঁরে তুই কবে ঠিক হবি রে? এ বছর দেখ আমি একা একা একটাও গাছ লাগাতে পারিনি। দাদা বৌদিও সবসময় মন খারাপ করে থাকে। আমার মোট্টে ভাল্লাগেনা রে তিতলি।
তুই শিগ্গির সেরে যা তো, আমরা ফের এক্কা দোক্কা খেলব বাগানে।”

***********

তিতলির খুব মায়া হয় রাঙাপিসির জন্য। আহারে সত্যিই তো বড্ড একা হয়ে পড়েছে, ওর সঙ্গীটা। সবাই বলে রাঙাপিসি আর পাঁচজনের মত স্বাভাবিক নয়। নামেই রাঙাপিসির বয়স অনেক, আসলে রাঙাপিসি ওরই মত বাচ্চা। এই কারণেই নাকি রাঙাপিসির বে’থা হয়নি, ঠাকুমা বলত আর দুঃখ করত।
কিন্তু তিতলি রাঙাপিসিকে খুব ভালোবাসে। বড় হতে তিতলির একদম ভালো লাগে না। বাবার অফিস, মায়ের সংসারের কাজ, কত্তরকমের কঠিন কঠিন সমস্যা! নাহ্ নেহাতই যদি বড় হতে হয় তিতলি মোটেও ডাক্তার অ্যাস্ট্রোনট কিচ্ছু হতে চায় না। ও বড় হয়ে রাঙাপিসি হতে চায়, ওরকম বাচ্চাই থাকতে চায়।
-“অ্যাই তিতলি যাবি... যাবি? চড়ুই পাখির বাসা দেখতে? কী ভাবছিস অ্যাত্ত তখন থেকে?”
-“কিছু না রে রাঙাপিসি! কাল তো আমার ডাক্তারখানা যাওয়া। কীসব রিপোর্ট আসবে। তাই দেখে ডাক্তারকাকু বলবেন আমি সেরে যাব না মরে যাব।”
-“অ্যাই তিতলি তুই সত্যি সত্যি মরে যাবি রে? তুই মরে গেলে আমিও না মরে যাব। আমার একা একা বড় কষ্ট হয়। আমার তো তোর মত ইস্কুল নেই যে নতুন বন্ধু হবে। মা-ও আমায় না বলে দুম করে মরে গেল। এখন তুইও যদি মরে যাস...”

************

-“আহ্ ঠাকুরঝি ফের এসব উল্টোপাল্টা কথা বলছো তুমি। তোমার দাদা না মানা করেছে তোমায়। যাও দেখি, টেবিলে মুড়িমাখা আছে কাঁসীতে, ঝটপট খেয়ে নাও গিয়ে। নইলে একটু বোসো, আমি তিতলিকে ওষুধটা খাইয়ে তারপর তোমায় তরকারি মেখে ডেলা ডেলা করে খাইয়ে দেবখ’ন মুড়ি।”

-“মা! কাল আমার রিপোর্ট আসবে, না গো? মা আমি আবার আগের মত হব? স্কুলে যাব, বাগানে খেলব, সবরকম খাওয়ার খাব?”

-“হ্যাঁ রে মা! হবিই তো! এই দিনটার আশাতেই তো বসে আছি কবে থেকে রে মা। আমি যাই এখন, রাজ্যের কাজ পড়ে।”
চোখের জল লুকোতে রান্নাঘরের দিকে ছুটলেন অনুমিতা। কত মিথ্যে প্রবোধ দেবেন নিজেদের আর ওই একরত্তি মেয়েটাকে।
ডাক্তারবাবু কথাটা যে কানে ভাসছে।
-“এ ধরনের রোগ লাখে একটা সারে। তিতলি সেরে উঠলে সেটা মিরাক্যল হবে চিকিৎসা শাস্ত্রের মতে।”

মিরাক্যল কি হবে কাল? রিপোর্টগুলো কি মিথ্যে করে দেবে সেই অমোঘ ভবিতব্যকে?

হতাশ দুই মা বাবা ছলনাময়ী আশার প্রলোভনে বুক বাঁধে নতুন করে।

************

-“বড্ড ঝড় গেল কাল রাত্তিরে তাই না? উফ এতদিন পর জানো ঝড় বৃষ্টি রোদ এসব নিয়ে চিন্তা করার কথা মাথায় এল। নাহলে তিতলির চিন্তাতেই চব্বিশ ঘন্টা...”

-“আর ও’কথা ভেবনা অনু। বিপদের দিন কেটে গেছে। আজ যেমন ঝড় হয়ে মেঘ কেটে গেল তেমনি আমাদের জীবনের কালো মেঘও কেটে গিয়ে রোদ ঝলমলে সূর্য উঠেছে।”

-“জানো তো, আমার মনে হয় ভগবানই বুঝি কাল থেকে আমাদের মনের অবস্থা বুঝে প্রকৃতিকে এঁকেছেন। কাল থেকে মেঘের মতই আঁধার গুমোট হয়েছিল মনটা। তারপর সারাদিন বুকের মাঝে ঝড়। কী বলবেন ডাক্তারবাবু! আমাদের তিতলি সেরে যাবে তো?”

-“ঠিক বলেছ অনু। আজ বিকেলে যখন ডাক্তারবাবু আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘বিক্রমবাবু, মিরাক্যল ঘটেছে।’ আমি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলামনা। তারপর হসপিটাল থেরে বাইরে বেরিয়ে দেখি মেঘ কেটে গোধূলীর আলো ফুটেছে। আমাদের তিতলি বিপদ মুক্ত।”

বহুদিন পর সন্ধেবেলায় চায়ের কাপ হাতে এভাবে গল্প করতে বসল মনে হয় বিক্রম আর অনুমিতা, তিতলির বাবা-মা। তিতলির ঘর থেকে কচি গলার আওয়াজ আসে,
-“বাবাই, মা, আজ রাঙাপিসি আমার কাছে শোবে প্লিজ প্লিজ। আজ যে তোমরা বললে সব ঠিক হয়ে গেছে...”

ডাইনিং টেবল থেকে হেঁকে বিক্রম বলেন,
-“তাই হবে মা, তাই হবে। রাঙা আজ তোর কাছেই শোবে।”
-“তাহলে তো সারারাত গপ্পোই বেশি হবে ঘুমের চেয়ে।” ছদ্মরাগে বলেন অনুমিতা। যদিও গলার সুরে প্রচ্ছন্ন সম্মতিরই লক্ষণ।

**************

-“অ্যাই তিতলি আমার না ভারী আনন্দ হচ্ছে আজ। তুই আর আমায় ছেড়ে কোত্থাও যাবি না।”
আনন্দে তিতলিকে জড়িয়ে ধরে রাঙাপিসি। তিতলিও পিসিকে জড়িয়ে ধরে বলে,
-“না রে রাঙাপিসি। আমরা আবার আগের মত থাকবো। খেলব, গাইব, গাছ লাগাব। এই রাঙাপিসি আমাকে কাল সকালে চড়ুই পাখির বাসাটা আর ডিম দেখাতে নিয়ে যাবি রে?”

চড়ুই পাখিদের কথা শুনে নিমেষে মুখে আঁধার নেমে আসে রাঙাপিসির। কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে,
-“এ যাআআআহ্ তিতলি! তোকে তো বলাই হয়নি। আজ তো দুপুরে আমি তোদের জন্য কতক্ষণ অপেক্ষা করলাম। তারপর বাগানে একা একা গিয়ে বসে রইলাম। কী কাণ্ড দেখি জানিস? চড়ুইদুটো খুব কাঁদছে। ঝড়ে ওদের বাসা পড়ে গিয়ে তিনটে ডিমের একটা ভেঙ্গে গেছে। মোটে আর দুটো গোটা রয়েছে। আমি আবার ডিমশুদ্ধু বাসাটা ওই খোপটায় তুলে দিয়ে এলাম।”

রাঙাপিসির মুখে এ কথা শুনে তিতলি তো থ’। মনটা ভারী খারাপ হয়ে যায় তিতলির। মাথা নেড়ে বলে,
-“কী বলছিস রাঙাপিসি! ইসসস চড়ুই মা বাবাটার কত কষ্ট হচ্ছেরে। আমায় যখন ইঞ্জেকশন দেয়, ডাক্তারকাকু মাথা নেড়ে নেড়ে কীসব বলে, তখন মা বাবাইও কত কষ্ট পেত। চড়ুইরাও তো মা বাবা বল? ওদের না জানি মনে কত ব্যথা লেগেছে। আমি কাল সকালেই বাবাইকে বলব ওই দুটো ডিমসহ বাসাকে আমাদের বারান্দাটায় তুলে আনতে। তাহলে ওই ডিমগুলোর আর কিচ্ছু হবে না।”

***********

-“চড়ুই-বৌ, লক্ষ্মীটি আর কেঁদোনা অমন করে।”
-“কাঁদবো না গো? আমার অমন সুন্দর ছানাটা অকালে চলে গেল! ভগবান কী নেই? ঝড় পাঠিয়ে আমাদের খড়কুটোর বাসা ভেঙ্গে কী পেলেন উনি? আমার বাছার পেরাণটা নিয়ে কী লাভটা হ’ল ওঁর!”
-“এভাবে বোলো না চড়ুই-বৌ! ভগবান অত নিষ্ঠুর নয়।”
-“তুমি এখনও এই কথা বলবে, চড়ুই?”
-“হ্যাঁ গো বলব। তুমি তিতলির খবরটা শোনোনি বুঝি?”
-“না তো! আবার কোনও খারাপ খবর দিওনা তুমি। আমি সইতে পারব না।”
-“তিতলি সুস্থ হয়ে উঠেছে। আর এ নাকি জাদু, নইলে মানুষের ক্ষমতা ছিলনা তিতলিকে সারানোর।”
-“জাদু!”
-“হ্যাঁ গো চড়ুই-বৌ, হ্যাঁ। জাদু! স্বয়ং ঈশ্বর করেছেন। আমাদের যে ছানাটা অকালে চলে গেল, সে তো সত্যি সত্যি যায়নি। তার প্রাণটা ঈশ্বর তিতলির ভেতরে ভরে দিয়েছেন যে। এখন এই বাকি দুই ছানা, কিচির আর মিচির-এর মত তিতলিও আমাদেরই সন্তান গো।”
-“এমনটাও হয় গো? তুমি সত্যি বলছ?”
-“হয় না আবার? এই মাত্র তো তিতলির ঘরের জানলায় বসে শুনে এলুম, তিতলি ওর রাঙাপিসিকে বলছে, আমাদের বাসাটা ওদের ঘরের বারান্দায় তুলে নিয়ে গিয়ে রাখবে।”
-“ভগবান মঙ্গল করুক ওদের। কিচির মিচির আর তিতলি, তিন ভাইবোন একসাথেই বড় হোক তবে। হ্যাঁ গো আমায় একবার নিয়ে যাবে ঐ জানলাটায়, যেখান থেকে তিতলির কথা শোনো তুমি?”
-“কেন নিয়ে যাবোনা? চলো না চলো।”

***************

-“এই রাঙাপিসি ওঠ ওঠ, ওঠ না। সুয্যিমামা মাথায় উঠল যে। জানিস কাল রাত্রে কী অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছি।”
-“উমমম তিতলি, এই জন্য তোর কাছে শুই না। হাবিজাবি স্বপ্ন দেখবি আর আমায় তুলে দিবি।”
-“তুই শোন না। কাল স্বপ্নে দুটো চড়ুই পাখি, ওই যে রে যারা ওই বাগানের গেটটার থামের ফোকরে বাসা করেছে, তারা এই জানলাটায় এসেছিল।”

তিতলির কথা শুনে রাঙাপিসি বিছানায় উঠে বসল চোখ রগড়ে।
-“স্বপ্ন... চড়ুই...”
-“হ্যাঁ রে! তুই বললি না যে ঝড়ে ওদের ডিম নষ্ট হয়ে গেছে। আসল তা হয়নি। ওই ডিমের ছানাটার প্রাণটা ঠাকুর আমার মধ্যে ভরে দিয়েছেন। তাই তো আমার রোগ সেরে গেছে। ডাক্তারকাকু বললেন না মিরাক্যল!”
-“মিরাক্যল মানে কী রে তিতলি?”
ঢুলুঢুলু রাঙাপিসির গালটা টিপে দিয়ে তিতলি বলে,
-“তুই না কিচ্ছু জানিসনা! মিরাক্যল মানে ম্যাজিক... জাদু। ওই জাদু করেই ঠাকুর আমায় চড়ুই পাখির ছানার প্রাণটা দিয়ে দিয়েছেন। তাই তো চড়ুই মা আর চড়ুই বাবা আমার কাছে এসেছিল স্বপ্নে...”
খিলখিল করে হেসে রাঙাপিসি বলে ওঠে,
-“ওই দেখো, আমায় বোকা বলিস, আসলে তুই-ই একটা বোকা। স্বপ্ন হবে কেন? সত্যি সত্যি এসেছিল তো ওরা কাল রাত্রে। বলল, ওদের আরও দুটো ছানা, কিচির আর মিচির-এর মত তিতলি, তুইও ওদের ছানা।”
তিতলি অবাক হয়ে চিৎকার করে ওঠে,
-“হ্যাঁ হ্যাঁ কিচির মিচির, এই নামদুটোই তো বলেছিল। আমরা দু’জন কি তবে একই স্বপ্ন দেখলুম? না কি সত্যি সত্যিই এসেছিল ওরা?”

এমন সময় মা বাবা ঘরে ঢোকে। অনুমিতা বলে ওঠেন,
-“দুই মূর্তিতে সক্কাল সক্কাল কী কিচিরমিচির করছিস পাখির মত?”
বিক্রম বলেন,
-“আমাদেরও বল দেখি তোদের সব রহস্য গল্প।”

তিতলি আর রাঙাপিসি একে অপরের মুখ চেয়ে হেসে ওঠে। ঈশারায় বুঝি বা কিছু কথা হয়।
শ্ শ্ শ্... সব কথা বড়দের জানতে নেই...

(সমাপ্ত)

একপর্ণিকা ওয়েব ম্যাগাজিনে প্রকাশিত।

বড়গল্প : টালিসমেন

 টালিসমেন 
সুস্মিতা কুণ্ডু 
(ম্যাজিকল্যাম্পে প্রকাশিত)

(১)
ক’দিন ধরেই লাল টয়োটা ক্যামরিটা পার্কিং লটে দেখছে অ্যাবিগেইল। বেশ অনেকদিনই জায়গাটা খালি ছিল, হলুদ রঙের কালি দিয়ে লেখা 313 নম্বরটা দেখা যেত কংক্রিটের কালচে রুক্ষ্ম মেঝেটায়। দুদিকে হলুদ রঙের মোটা দুটো লাইন টেনে সীমা নির্দেশ করা। অ্যাবির হোণ্ডা সিটি-টা থাকে ঠিক ওর উল্টো দিকে 213 নম্বর স্লটটায়। যাদের দুটো করে গাড়ি আছে, একটা এই বেসমেন্ট-এর পার্কিং লটে রাখা থাকে, আরেকটা বাইরের খোলা জায়গায় বানানো পার্কিং লটে থাকে। অনেকেই চায় ভেতরের জায়গা থাকলে, সেখানে রাখতে। এরকম অবস্থায় এতদিন যে কেন খালি পড়েছিল জায়গাটা সেটাই আশ্চর্য। লাল গাড়িটা আগে বাইরে রাখা থাকতে দেখেছে কী না ঠিক মনে করতে পারল না। 

প্রায় ছ’মাস হ’ল এই নতুন ব্লুমন্ড অ্যাপার্টমেন্টটায় শিফট করেছে অ্যাবি। বেশ ভালই জায়গাটা, যদিও ভাড়াটা একটু বেশি আগের অ্যাপার্টমেন্টটার তুলনায়। খুব ভালো হয় যদি একটা রুমমেট পাওয়া যায়। কিন্তু এত ব্যস্ত থাকে যে, রুমমেটের সন্ধান আর করা হয় নি। রিসার্চের কাজে অস্বাভাবিক রকমের চাপ যাচ্ছে। তার ওপর টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্টের কাজও করতে হয়। সব মিলিয়ে দম ফেলার ফুরসৎ থাকে না। এই কমিউনিটির ম্যানেজমেন্ট অফিসে অনেকদিন আগেই বলে রেখেছে, সেরকম কেউ যদি রুম শেয়ার করে থাকতে ইচ্ছুক মেয়ে আসে, যেন অ্যাবিগেইলকে মেইল করে দেয় ওরা। কিন্তু এখনও কোনও খবর দিল না। ক্রেইগলিস্টে একটা অ্যাডভার্টাইজমেন্ট দিয়েছিল এখানে আসার কিছুদিন পরেই, সেও প্রায় মাসপাঁচেক হ’তে গেল, কোনও রেসপন্স আসেনি।

গাড়িটা রিভার্স করতে গেল অ্যাবি, গ্যারাজ থেকে বার করার জন্য। রিয়ার ভিউ মিররে উল্টোদিকের গাড়িটায় ফের চোখ গেল। এক মুহূর্তের জন্য শিউরে উঠল। ঐ গাড়িটার রিয়ার ভিউ মিররে এক জোড়া চোখ। তীব্র জিঘাংসা নিয়ে চেয়ে রয়েছে ওর দিকে। তড়িঘড়ি গাড়িটা ঘুরিয়ে, অটোমেটিক গ্যারাজ ডোরটা খুলতে না খুলতেই জোরে চালিয়ে বেরিয়ে গেল। এক পলক শুধু দেখল, একটা কালো রঙের পোশাক পরা কেউ গাড়িটার স্টিয়ারিং এর পেছনে বসেছিল। মাথাতেও কালো টুপি বা হুড জাতীয় কিছু ছিল, তাই মিররে শুধু জ্বলজ্বলে চোখদুটো ছাড়া সব অন্ধকার লাগছিল। মুখেও মনে হয় মাস্ক ছিল না কি কেজানে। 

(২)

আজ ইউনিভার্সিটিতে কোনো কাজেই মন বসল না। বারবার সকালের অদ্ভুত কাণ্ডটা মনে আসছে। হয়তো এমন হতে পারে ওই গাড়ির লোকটা গাড়ি বার করার জন্যই উঠে বসেছিল গাড়িতে। হয়তো অ্যাবি বেরনোর পরেই বেরিয়েছে। অনেক কিছু যুক্তি খোঁজার চেষ্টা করে ও। কিন্তু বারবার ওই দৃষ্টিটা মনে ভেসে উঠলেই যুক্তিগুলো কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে, কেনই বা কেউ অচেনা কারোর দিকে ওভাবে তাকাবে? 

সারা দিনটা লাইব্রেরিতে টুকটাক বই পড়েই কাটিয়ে দিল। ক’দিন পর  মিউজিয়ামে একটা বড় এগজিবিশন আছে। মাস তিনেক ধরে প্রস্তুতি চলছে তার। রিসার্চ এবং টি. এ.-র কাজ ছাড়াও আরেকটা কাজ করে ও উইকেণ্ডে। ডাউনটাউনে একটা মিউজিয়াম আছে। খুব বড় নয় আবার নেহাতই ছোটো নয়। ওখানে ও টাকার প্রয়োজনে কাজ করে না, করে নিজের আনন্দের জন্য। মিউজিয়াম ব্যাপারটা বেশিরভাগ মানুষের কাছে বোরিং হলেও অ্যাবির মত ইতিহাসের ছাত্রীর কাছে ভীষণই ইন্টারেস্টিং। ঘন্টার পর ঘন্টা কম্পিউটারে বসে, বিভিন্ন আর্টিফ্যাক্টগুলো নিয়ে পড়াশোনা করে। তাদের বৈশিষ্ট্য, কোন যুগের জিনিস, ঐতিহাসিক গুরুত্ব এসব সম্পর্কে নোটস লিখে, কিউরেটর মিঃ রিচার্ড বেনসন এর কাছে জমা দেয়। উনি সেগুলো মিউজিয়ামের অনলাইন রেকর্ডে তুলে রাখেন। 

আরেকটা কাজও অ্যাবি করে, মানে শিখতে শুরু করেছে সবে, অথেন্টিকেশন। সংগ্রহে থাকা বা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বিভিন্ন পারিবারিক অ্যান্টিক জিনিস অনেকেই মিউজিয়ামে দেয়, কেউ বিক্রিও করতে চায়। এই জিনিসগুলোর সত্যাসত্য যাচাই করার জন্য বিশেষ পড়াশোনার দরকার হয়, ট্রেনিং, প্র্যাকটিস সবই লাগে। কিছু ডিগ্রিও লাগে। ইতিহাস নিয়ে গবেষণায় খুব শিগ্গিরই থিসিস সাবমিট করতে চলেছে অ্যাবিগেইল, কাজেই ডিগ্রি ওর এমনিই আছে কিন্তু শুধু পুঁথিগত বিদ্যা সম্বল করে এ কাজ করা যায় না। আলাদা প্যাশন লাগে, ভালবাসা লাগে। মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষের নিজস্ব লোক আছে, যাঁরা অথেন্টিকেশনের কাজটা করে দেন। তাঁদেরই একজন ছিলেন মিস লিডিয়া। উনি বেশ হাতে ধরে যত্ন করে সব শেখাতে শুরু করেছিলেন অ্যাবিকে। ষাটোর্দ্ধ বয়স্কা একাকী মহিলা, অ্যাবির নতুন অ্যাপার্টমেন্ট যে কমিউনিটিতে, উনিও সেখানেই থাকতেন। 

এটাও আরেকটা কারণ ছিল অ্যাবির বেশি টাকা দিয়ে হ’লেও এই কমিউনিটিতে শিফট করার। ইউনিভার্সিটির কাজ সেরে অনেকদিনই ও যেত মিস লিডিয়ার বাড়ি আড্ডা মারতে। ওঁর হাতে বানানো কুকি আর অ্যাপল পাই খেতে খেতে, কফি মাগে চুমুক দিয়ে হাজারও গল্প শুনত অ্যাবি। কিন্তু মাসখানেক আগে মিস লিডিয়া হঠাতই ...

অ্যাবির যা রোজগার তাতে একটু বেশি ভাড়া দিতে ওর কোনও অসুবিধে হওয়ার কথা নয় কিন্তু সমস্যাটা হয় অন্যখানে। ওর আসলে অ্যান্টিক জিনিস কেনার ভীষণ শখ। একটা কিউরিও শপের খোঁজ কেউ দিলে হয়েছে একবার, সঙ্গে সঙ্গে ছুটবে সেখানে। আর নিজের পকেটের কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে রাজ্যের জিনিস কিনে আনবে। ওর লিভিং রুমে ডাঁই করা রয়েছে, অস্ট্রেলিয়ার অ্যাবঅরিজনালদের ট্রাইবাল অ্যান্টিক বুমেরাং,   ইণ্ডিয়ানদের অষ্টধাতুর নটরাজ মূর্তি, ইজিপ্টের শেয়ালদেবতা আনুবিসের প্রস্তরমূর্তি, চাইনিজ জেড পাথরের বুদ্ধমূর্তি, ফ্রেঞ্চ স্যান্ডেলিয়র, এল্ম কাঠের তৈরী জাপানিজ তান্সু, আফ্রিকান ভু-ডু পুতুল, ভেনেজিয়ান মাস্ক, আরও আরও কত কী!

(৩)

দিনের শুরুটা খুব একটা স্বস্তিকর না হ’লেও ধীরে ধীরে সকালের ঘটনাটা ভুলতে বসেছিল অ্যাবি। কিন্তু বিকেলে গ্যারেজে গাড়িটা ঢোকাতে গিয়ে ফের গা’টা ছমছম করে উঠল। নাহ্, লাল ক্যামরিটা নেই 313-তে। ঝটপট ব্যাকপ্যাকটা পাশের সিট থেকে তুলে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে স্যুইচ টিপে গাড়িটা রিমোট-লক করে লিফটের দিকে পা বাড়ালো। নিজের ফ্ল্যাটে ঢুকতে যেন খানিকটা শান্ত হ’ল মনটা। হঠাৎ লক্ষ্য করল ওর দরজার তলা দিয়ে কে যেন একটা সাদা একটা কাগজ গলিয়ে দিয়ে গেছে। খামের মুখটা ছিঁড়ে, কাগজটা বার করল। তাতে লেখা,

টালিসমেন-টা তার ন্যায্য উত্তরাধিকারীকে অবিলম্বে ফেরৎ না দেওয়ার শাস্তি মৃত্যু।”

লাল গাঢ় রঙে লেখা চিঠিটা, ইন ফ্যাক্ট কেমন যেন শুকনো রক্তের মত কালচে লাল রঙটা। অ্যাবি হাত থেকে ফেলে দিল চিঠিটা। সোফাটায় বসে হাঁপাতে লাগল খানিকটা। কে এই ধরনের রসিকতা করছে ওর সাথে, কেনই বা করছে? 


শাওয়ার কিউবিকলে ঢুকে মাথার ওপর ঠাণ্ডা জলের ফোয়ারা চালালো অ্যাবি। কেমন যেন অসুস্থ লাগছে। কী হচ্ছেটা কী ওর সাথে! পুলিশে জানাবে, না কি প্রপার্টি ম্যানেজারকে বলবে? কারণ এই অ্যাপার্টমেন্টগুলোর ভেতরে অবাধে যে কেউ ঢুকতে পারে না, হয় চাবি লাগে অথবা ফ্ল্যাটের কারোর সাথে দেখা করতে হলে সেই ফ্ল্যাট নম্বরের লাগোয়া স্যুইচ টিপে রিং করতে হয়। কেউ খুললে তবেই বাইরের লোক ঢুকতে পারবে। এমন কী মেলম্যানকেও বড় কিছু ডেলিভারিসহ ভেতরে আসতে গেলে একই নিয়মে আসতে হয়, অথবা বাইরের পোস্টবক্সে চিঠিচাপাটি ফেলতে হয়। এই চিঠিটা দরজার তলা দিয়ে কে দিল তবে? 
হঠাৎ করে শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত নেমে যায় অ্যাবির। 313 নম্বর ঘরটা ঠিক ওর মাথার ওপরে, সেই ফ্ল্যাটের বাসিন্দা, ওই প্রতিহিংসাপরায়ণ চোখদুটোর মালিকেরই কাজ নয় তো? 

——

নাইটগাউনটা গায়ে গলিয়ে, অ্যাবি লিভিংরুমে ওর পড়ার টেবলের ড্রয়ারগুলো হাঁটকাতে শুরু করে। 
এই তো! এই তো সেটা। 
কাঠের কারুকার্য করা বক্সটা ড্রয়ার থেকে তুলে আনে অ্যাবি। আলতো হাতে ঢাকনাটা খোলে। ভেতরে ভেলভেটে মোড়া প্রকোষ্ঠটায় একটা গোলাকৃতি কালচে পাথরের টুকরো। তার চারপাশটা সেই আদি অকৃত্রিম বহুমূল্য সোনালী ধাতুতে বাঁধানো এবং বিভিন্ন রঙয়ের ঝলমলে প্রস্তরখণ্ড খচিত। মাঝে একটা ছাপ, হ্যাঁ ছাপই যেটা ঐ ধাতুতে খাঁজ কেটে বানানো একটা পেন্টাক্যল। একটা সুষম বৃত্তের ভেতর আবদ্ধ একটা পঞ্চমুখী তারা, যার প্রতিটা শীর্ষবিন্দু স্পর্শ করে আছে বৃত্তের পরিধিকে, সমান সমান দূরত্বে।

(৪)

চিঠিটায় কী এরই কথা লেখা? হ্যাঁ এটা একটা টালিসমেন, যেটা প্রায় মাস ছয়েক আগে কিনেছিল ও, এই নতুন অ্যাপার্টমেন্টে শিফট করার পরে পরেই। কথায় কথায় একটা নতুন কিউরিও শপের সন্ধান দিয়েছিলেন ওকে মিস লিডিয়া  কথায কথায় একদিন উনিই বলেছিলেন,
-“ওহ অ্যাবি, ইউ মাস্ট ভিজিট দ্য কিউরিও শপ ইন রোজউড স্ট্রিট, ইন ডাউনটাউন। ইট হ্যাজ গট আ ফ্যাবিউলাস কালেকশন। সাম অফ দেম আর জাস্ট এক্স্যাক্ট রেপ্লিকা অফ দ্য ওরিজিনাল ওয়ানস।”

শোনামাত্র আর দেরি করেনি অ্যাবি, পরেরদিন বিকেলেই ছুটেছিল দোকানটায়। এক বিন্দুও বাড়িয়ে বলেননি মিস অ্যান, দোকানটা অ্যান্টিকের খনি। দোকানের মালিক মিঃ লি কিয়াং, অ্যাবি ইতিহাসের ছাত্রী শুনে বেশ আগ্রহভরে ওকে অনেক আইটেম দেখালেন। মিং ভাস থেকে শুরু করে, সিল  অফ সলোমন, ইজিপ্সিয়ন স্ক্যারাব, আরও কত কী! 
অ্যাবির আগ্রহ দেখে মিঃ কিয়াং ওকে বললেন,
-“ওয়েট ইয়ং লেডি, তোমার মত কাস্টমার রোজ রোজ আসে না। আই হ্যাভ দ্য পারফেক্ট থিং ফর ইউ।”
ছোট্ট একটা দরজার ক্রিস্টাল বিডেড কার্টেন এর ওপারে অদৃশ্য হয়ে গেল মিঃ কিয়াং এর শরীরটা। কিছুক্ষণ পর হাতে একটা সুদৃশ্য কাঠের বক্স নিয়ে ফের দোকানের ভেতর এলেন উনি। 
-“দিস ইজ আ ভেরি পাওয়ারফুল টালিসমেন। টালিসমেনকী জানো তো?”
-“অফকোর্স জানি। পাথর বা ধাতু দিয়ে গড়া ম্যাজিকাল অবজেক্ট। যেটা পরলে নাকি সৌভাগ্য আসে। লাকি চার্ম, আর কিছুই না।” উত্তর দিয়েছিল অ্যাবি। 

একটু হেসে বলেন মিঃ কিয়াং,
-“আরবিক শব্দ ‘টালসাম(talsam)’ থেকে এসেছে টালিসমেন(talismen) কথাটি। গ্রিক অভিধানেও এই শব্দটি আছে, ‘টেলেসমা(telesma)’, যার অর্থ হ’ল ’completion, religious rite’। মূল শব্দ ‘teleō’-তে যার অর্থ ‘I complete, perform a rite.’ অর্থাৎ ‘ধর্মীয় রীতি সম্পন্ন করলাম’।”

কিছুটা অধৈর্য হয়ে অ্যাবি বলে,
-“হ্যাঁ ও তো ইন্টারনেটেই লেখা আছে এসব কথা।”

একটা দুর্বোধ্য হাসি খেলে যায় মিঃ কিয়াং-এর ঠোঁটের কোণে। বলেন,
-“মোটের ওপর তাই হলেও ব্যাপারটা এত সাদামাটা নয়। আরও অনেক বেশি ক্ষমতা আছে এই ছোট্ট অ্যাম্যুলেট-টার।”
এই বলে বক্সটা খুলে ধরলেন অ্যাবির সামনে উনি। 

ওই বক্সটাই এই মুহূর্তে অ্যাবির হাতে। ভেতরের টালিসমেনটার গল্পটা বলেছিলেন ওকে মিঃ কিয়াং। টালিসমেনটা শুধু সৌভাগ্যই বহন করে আনে তাই নয়, এটার অধিকারী যে হয় সে নাম-যশ-খ্যাতির শিখরে পৌঁছয়, এমনই ক্ষমতা এই পাথরের টুকরোর। 

কিয়াং এর দোকান থেকে এটিই মাস ছয়েক আগে সেদিন ৫০০০ ডলারের মত চড়া দামে কিনে এনেছিল অ্যাবি। যদিও একটা ধাতব টুকরো কতটা ভাগ্য বদলাবে, সে নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ ছিল ওর। তবুও এমনই একটা খারাপ সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল যে নিজেকে আটকাতে পারল না। 

(৪)

এরপর সময়ের নিয়মে আরও মাস তিনেক কেটে যায়। টালিসমেনটার কথা প্রায় ভুলতেই বসেছিল ও। মিউজিয়ামের নানা আর্টিফ্যাক্ট ঘাঁটতে ঘাঁটতে, বেশ কিছু অকাল্ট স্টাডিজ এর প্রাচীন পাণ্ডুলিপি হাতে এসেছিল। টালিসমেন কীকরে বানাতে হয়, কীই বা তার নিয়মকানুন, কী জাদু করতে পারে এই ম্যাজিকাল বস্তুগুলো। তখন খুব একটা মন দিয়ে এগুলো দেখেনি, কিন্তু যখন পরে মিউজিয়ামে, বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন শতাব্দীর নানা ধরনের টালিসমেন নিয়ে এগজিবিশন এর প্রস্তুতি শুরু হ’ল তখন ফের ওই পুঁথিগুলো ঘাঁটতে শুরু করল অ্যাবি। 

প্রাচীন ভাষায় লেখা পুঁথিগুলোর সবটা না হলেও একটু একটু রহস্য উদ্ধার করতে পারছিল ও। এদের মধ্যে একটি পুঁথি ছিল অ্যানসিয়েন্ট ওয়েলশ ভাষায় লেখা, যার পাঠোদ্ধার করার জন্য অ্যাবি বইটা লুকিয়ে মিউজিয়ামের বাইরে এনেছিল এবং নিয়ে গেছিল মিস লিডিয়ার কাছে। 

“দ্য হারমেটিক অর্ডার অফ দ্য গোল্ডেন ডন” নামের একটি  সংস্থা লণ্ডনে মিস্টিক ফোর্সেস, সুপারন্যাচরাল পাওয়ার, অ্যালকেমি, ব্ল্যাক ম্যাজিক, এসবের চর্চা করত। উনবিংশ শতকের শেষদিকে আর বিংশ শতকের গোড়ার দিকটায় এদের এই অকাল্ট স্টাডিজ ভীষণ বিখ্যাত ছিল। শোনা যায় স্যার আর্থার কোনান ডয়েল, ব্রাম স্টোকার প্রমুখ এই সংস্থার সদস্য ছিলেন, যদিও এই দাবীর সত্যাসত্য নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। 

সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা তিনজনের মধ্যে অন্যতম, ডঃ রবার্ট উইলিয়াম উডম্যান,  সবচেয়ে কম প্রচারের আলোয় তিনিই এসেছিলেন। সম্ভবত এই কারণে, যে ‘গোল্ডেন ডন’-এর দ্বিতীয় ‘অর্ডার’ তৈরী হওয়ার আগেই তাঁর মৃত্য হয়, এবং তাঁর কোনো উত্তরসূরী নিয়োজিত হয়নি। ডঃ উডম্যানের সংগ্রহের থাকা এই পুঁথিটিই কোনওভাবে এসে পড়ে অ্যাবির লাইব্রেরিতে। 

এদিকে অদ্ভুতভাবে ওই টালিসমেনটা হাতে আসার পর একটু একটু করে ওর জীবনের সমস্যাগুলোও দূর হতে শুরু করছিল। বহুদিন ধরে আটকে থাকা থিসিসের কাজ গড়গড়িয়ে এগোতে থাকে। একটা ক্রনিক শারীরিক সমস্যা থেকে রেহাই পায়। দূরসম্পর্কের এক গ্র্যানির সম্পত্তির কিয়দংশ আকস্মিকভাবেই হাতে এসে পড়ে, ওর আর্থিক অবস্থার বেশ কিছুটা উন্নতি ঘটে। হয়ত পুরো ব্যাপারটাই কাকতালীয়, ওর কল্পনা, কিন্তু তবুও যেন কেন অ্যাবির মনে হতে থাকে, এসবের মূলে ওই ৫০০০ ডলার দিয়ে কেনা চাইনিজ অ্যান্টিক শপের টালিসমেনটা। 

——

পুঁথিটার অনেকটা অংশেরই অর্থ উদ্ধার করেন মিস লিডিয়া। মাসদেড়েক আগেই একদিন ওঁর অ্যাপার্টমেন্টে বসে ট্রানস্লেটেড কাগজগুলো অ্যাবির হাতে তুলে দেন তিনি। তখনও অব্দি মিস লিডিয়া জানতেন যে বইটি ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরি থেকে এনেছে অ্যাবি। অবাক হয়ে ওকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন,
-“এ পুঁথি লাইব্রেরিতে থাকা তো বেশ আশ্চর্যজনক ব্যাপার। সাধারণত মিউজিয়ামেই থাকে এসব!”
অ্যাবি এড়িয়ে গেছিল প্রসঙ্গটা, ওঁকে বলেনি যে বিনা অনুমতিতে মিউজিয়ামের প্রপার্টি ও বাইরে এনেছে। 

 সেইদিনটার কথা আজও মনে পড়ে অ্যাবির। বাড়িতে এসে রুদ্ধশ্বাসে পড়ছিল মিস অ্যানের অনুবাদ করা পাতাগুলো। কীভাবে তন্ত্রবিদ্যার সাধনার মাধ্যমে প্রকৃতির নানা শক্তিকে আবদ্ধ করা হয় টালিসমেনের ভেতর। নানা ধরনের রিচ্যুয়ালস-এর মধ্য দিয়ে বিভিন্ন স্পিরিট-কে ধরে রাখা হয় ওই টালিসমেনের ভেতর। কখনও তা সৎ উদ্দেশ্যে, কখনও বা অসৎ। সাধারণত যিনি প্রস্তুত করেন টালিসমেনটি তিনি নিজের জন্যই করেন। বংশানুক্রমে তাঁর রক্তের সম্পর্কের উত্তরপুরুষরাও এই টালিসমেন ধারণ করতে পারেন। একমাত্র তাদেরই অধিকার আছে ওই জাদুক্ষমতার অধিকারী হওয়ার। 

নোটসগুলো পড়তে পড়তে হঠাৎ একটা পাতায় চোখ আটকে যায় অ্যাবির। মিস লিডিয়ার হাতে আঁকা একটা আউটলাইন, খুব চেনা। সঙ্গে সঙ্গে আসল পুঁথির পাতাটা ওল্টায়। একটা ছবি, পেন্টাক্যল, ধাতব দামি রত্নখচিত। সেটা বসানো আরেকটা কালচে পাথরের টুকরোর ওপর। কালচে পাথরের ওপর খাঁজ কেটে একটা পেন্টাগ্রাম বানানো, তার ভেতর ধাতব ওই পেন্টাক্যলটা খাপে খাপে বসানো। তার মানে ওর কাছে যে টালিসমেনটা আছে সেটা গোটা টালিসমেনটা নয়, এর আরেকটা অংশও আছে। 

সঙ্গে সঙ্গে ঠিক করে নিয়েছিল অ্যাবি ওর পরবর্তী পদক্ষেপ। মিউজিয়ামে এগজিবিশনের জন্য আসা আর্টিফ্যাক্টগুলোর মধ্যে যে ওই পেন্টাক্যলটা ও দেখেছে তাতে ওর কোনো সন্দেহ ছিলনা। ওটা অ্যাবির চাই-ই, তবেই সম্পূর্ণ হবে ওর টালিসমেনটা, না জানি আরও কত সৌভাগ্য বয়ে আনবে ওর জন্য। যেন কোনও দুরাত্মা ভর করেছিল ওর ওপর। 

এগজিবিশনের জন্য বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা, বিভিন্ন লোকের দেওয়া আর্টিফ্যাক্টগুলো এনলিস্ট করার সময় অ্যাবি কম্পিউটারের হার্ড ডিস্ক থেকে উড়িয়ে দেয় একটি বিশেষ এন্ট্রি,  ওই ধাতব পেন্টাক্যলটির। তারপর মিস লিডিয়ার কাছে নিয়ে আসার নাম করে অন্য কতকগুলো আর্টিফ্যাক্ট দেখায় কিউরেটর মিঃ বেনসনকে। যেহেতু মিস লিডিয়া শারীরিক অসুস্থতার কারণে ক’দিন মিউজিয়ামে আসতে পারছেন না, তাই তাঁর কাছে অথেন্টিকেশনের নামে ওগুলো নিয়ে যেতে চায় অ্যাবি। ওর মিষ্টি ব্যবহার এবং শেখার আগ্রহ এগুলোর কারণে মিঃ বেনসন আর মিস লিডিয়া দুজনেই ওকে স্নেহ করতেন। তাই এভাবে আর্টিফ্যাক্ট সাধারণত বাইরে না পাঠানো হলেও, মিঃ বেনসন অমত করেননি। ওগুলোর সাথে মিশিয়েই ওই তালিকার বাইরের পেন্টাক্যলটাও নিয়ে আসে অ্যাবি। এবং মিস লিডিয়াকে ওটা বাদে বাকিগুলো দেখিয়ে ফেরৎ দিয়ে আসে মিউজিয়ামে। 

(৫)

চুরি করা ধাতব পেন্টাক্যলটা, অ্যাবির কাছে থাকা পাথরের বাকি অংশটার ওপর বসাতেই খাপে খাপে আটকে গেছিল একদম। এতদিনে সম্পূর্ণ হ’ল টালিসমেনটা। চোখদুটো ঝিকিয়ে উঠেছিল অ্যাবির। 

আজ এক এক করে সব মনে পড়ছে অ্যাবির। হাতে ধরা কাঠের কারুকার্য করা বক্সের মধ্যে থেকে টালিসমেনের পাথুরে অংশটা তুলে টেবলে রাখে। নিচের ভেলভেট মোড়া অংশটার এক কোণে হাতে করে চাপ দিতেই ‘খুট্’ করে একটা শব্দ হয়। নীল ভেলভেটটা তুলতেই তলায় আরেকটা ছোট প্রকোষ্ঠ, তার মধ্যে জ্বলজ্বল করছে রত্নখচিত ধাতব পঞ্চমুখী তারকাটি। একটা হলুদ সোনার চেনে লকেটের মত আটকানো। হাতে করে ওটা তুলে ঘুরিয়ে দেখতে থাকে অ্যাবি। এই টালিসমেনটার জন্যই কত কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে ওকে, টাকা খরচ থেকে শুরু করে মিউজিয়ামে চুরি, এমন কী...

 লাল রঙে লেখা চিঠিটা পেপার শ্রেডারে ঢুকিয়ে যন্ত্রটা চালু করে। একটা যান্ত্রিক আওয়াজের সাথে সাথে কুঁচি কুঁচি হয়ে যায় কাগজগুলো। চেনে আটকানো পেন্টাক্যলটা সযত্নে ফের লুকোনো প্রকোষ্ঠে রাখে, ভেলভেট চাপা দিয়ে টেবলের ওপর থেকে পাথুরে অংশটাও ভেতরে ঢোকায়। তারপর কাঠের বাক্স বন্ধ করে টেবলের ড্রয়ারটা টেনে তার মধ্যে রাখতে যায় অ্যাবি। হঠাৎ কী মনে করে ওটা ড্রয়ারে না রেখে হাতে নিয়ে লিভিং রুমের আলো বন্ধ করে বেডরুমে চলে যায়। 

আরও একজোড়া সতর্ক চোখও যে ওদিকে লিভিংরুম লাগোয়া বাইরের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে উইণ্ডো ব্লাইণ্ডসের ফাঁক দিয়ে এতক্ষণ দেখছিল অ্যাবিকে এবং ওর হাতে ধরা কাঠের বক্সটাকে, সেটা অ্যাবির অগোচরেই থেকে যায়। 
অ্যাবি চলে যেতে ছায়ামূর্তিটি ধীরে ধীরে, ওপরের ফ্লোরের ব্যালকনি থেকে ঝোলানো দড়িটা বেয়ে উঠে যায় তিনতলার বারান্দায়, তারপর কাঁচের দরজা সরিয়ে ঢুকে যায় ভেতরে, 313 নম্বর ফ্ল্যাটের ভেতরে। 

(৬)

পরেরদিন সকালে অ্যাবির একটু দেরিতেই ঘুম ভাঙ্গল। তড়িঘড়ি করে রেডি হতে লাগল ইউনিভার্সিটি যাওয়ার জন্য। এমন সময় ঘরের ডোর অ্যানসারিং মেশিনটা বেজে উঠল। স্যুইচটা টিপে অ্যাবি জিজ্ঞাসা করল,
-“হু’জ দ্যাট?”
একটা মেয়ের গলা ভেসে এল,
-“হাই! দিস ইজ মেলিসা। আয়্যাম হিয়ার বিকজ অফ ইওর অ্যাড ইন ক্রেইগলিস্ট।”
ও হো! ভুলেই গেছিল অ্যাবি অ্যাডভার্টাইজমেন্টটার কথা। রুমমেট চেয়ে বিজ্ঞাপন দিয়েছিল বটে মাস পাঁচেক আগে। 
ফের স্যুইচ টিপে বিল্ডিংয়ের বাইরের গেটটা খুলে অপেক্ষা করতে লাগল, মেয়েটির দোতলার 213 নম্বর ঘরে আসা অব্দি। 
যে সময় বিজ্ঞাপনটা দিয়েছিল তখন অবশ্য টাকার প্রয়োজন ছিল, তারপর টালিসমেনটার প্রভাবে অ্যাবি বেশ মোটা অঙ্কের অর্থের অধিকারিনী হয়েছে। কাজেই এই মুহূর্তে এই মেয়েটিকে বিদেয় করে দেওয়াটাই শ্রেয়। 
ঠিক দেড় মিনিটের মাথায় দরজায় মৃদু টোকা শুনে উঠে গিয়ে দরজাটা খুলে দিল। সামনে একটা লম্বা মেয়ে দাঁড়িয়ে, গায়ে ওভারকোট, চোখে সানগ্লাস। 

লিভিংরুমের সোফায় বসা মেয়েটাকে দেখে যেন কেমন অস্বস্তি বোধ হতে লাগল অ্যাবির। ওকে এই মুহূর্তে পত্রপাঠ রুমমেটের প্রয়োজন নেই বলে পথ দেখাতে পারলেই বাঁচে। কিন্তু মেয়েটি যেন একটু নাছোড়বান্দা।
বলতে লাগল এই মুহূর্তে একটা ঘরের ওর খুব দরকার, অন্তত মাস দুই তিনের জন্যও যদি অন্তত সাব-লিজ নিতে পারে অ্যাবির ২-বি. এইচ. কে. অ্যাপার্টমেন্টের এক্সট্রা বেডরুমটা। 

মাস দেড়েক আগে হ’লেও হয়ত অ্যাবি রাজি হয়ে যেত, প্রয়োজন না থাকলেও। কিন্তু এই মুহূর্তে অন্য কাউকে নিজের সঙ্গে রাখাটা একেবারেই নিরাপদ নয় অ্যাবির জন্য। 
মেয়েটা হঠাৎ একটা অদ্ভুত প্রস্তাব করল, 
-“তোমার ঘরটা দেখে মনে হচ্ছে তুমি অ্যান্টিক কালেক্ট করতে ভালোবাসো। যদি কিছু মনে না করো তোমায় একটা জিনিস দেখাতে চাই।”
এমন কথা শুনে না করে কী করে অ্যাবি! বলল,
-“হ্যাঁ! আমি এই নিয়ে একটু আধটু চর্চা করি বৈকি! তোমার কাছে কী ধরনের অ্যান্টিক আছে জানতে পারি কি মেলিসা?”

মেয়েটা একটু হেসে ওভারকোটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে একটা জিনিস বার করে হাতের তালুতে নিয়ে এগিয়ে ধরল অ্যাবির দিকে। জিনিসটা দেখামাত্র অ্যাবি সোফা থেকে ছিটকে উঠে পড়ল। 

-“এ এ এটা তোমার কাছে ক্ কীকরে...”
-“কেন? এটা তোমার কাছে থাকার কথা ছিল বুঝি মিস অ্যাবিগেইল স্পেন্সার?”
-“হ্যাঁ... মানে ন্ না... মানে...”
-“মানেটা আমি বলছি। ইউ আর আণ্ডার অ্যারেস্ট ফর থেফ্ট অফ ভ্যালুয়েবল প্রপার্টি অফ দ্য মিউজিয়ম অ্যাণ্ড...”
-“আমি চুরি করিনি... এটা তো অথেন্টিকেশনের জন্য...”
-“লেট মি ফিনিশ... অ্যাণ্ড মার্ডার অফ মিস লিডিয়া টাইলর।”

ধপ করে সোফায় বসে পড়ল অ্যাবি। সামনের মেয়েটির হাতের মুঠোয় ধরা টালিসমেনটা সামনের সেন্টার টেবলটায় রাখা। হ্যাঁ সেই টালিসমেনটা যেটা কাল রাত্রেই ও বেডরুমের লকারে নিয়ে গিয়ে রেখেছিল। মেলিসার এক হাতে ততক্ষণে উঠে এসেছে সার্ভিস রিভলবার অন্য হাতে পরিচয়পত্র, তাতে সোনালী ঝিলিক দিচ্ছে, ‘ফেডেরাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন’।

(৭)

এর পরের ঘটনা পুরোটাই ঘটল মিউজিয়মের কিউরেটর মিঃ বেনসনের সামনে, ওঁকে ফোন করে ডেকে আনা হয়েছে। 

বলতে শুরু করে মেলিসা, এফ. বি. আই. অফিসার,
-“আজ থেকে প্রায় মাস ছয়েক আগে মিস অ্যাবিগেইল স্পেন্সার 
ব্লুমন্ড অ্যাপার্টমেন্টস-এ ফ্ল্যাট ভাড়া নেন। অ্যাবি ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের ছাত্রী, রিসার্চও করছে। সেই সাথে স্থানীয় মিউজিয়মে পার্টটাইম কাজও করে। শখের অথেন্টিকেশন, সেই সূত্রেই অ্যাবির পরিচয় হয় মিঃ বেনসন এবং মিস লিডিয়ার সাথে।”
এই বলে একবার চেয়ারে হ্যাণ্ডকাফ পরে বসা অ্যাবির দিকে মুখটা ফেরায় মেলিসা। মিঃ বেনসনও একরাশ ভর্ৎসনার দৃষ্টিতে তাকিয়ে নতমস্তক অ্যাবির দিকে। ফের বলতে শুরু করে মেলিসা। 

-“মিস লিডিয়ার কাছে প্রায়সই যেত অ্যাবি। এবং ওঁর থেকে সন্ধান পেয়েই ওর সংগ্রহে আসে একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ টালিসমেনের অর্ধেক অংশ। এটা প্রায় ছ’মাস আগে, এই বিল্ডিং-এ শিফ্ট করার পরেরই ঘটনা। মাসতিনেক পর মিউজিয়মে হঠাতই অ্যাবির হাতে পড়ে একটি অমূল্য পুঁথি। যেটা বিনা অনুমতিতে লুকিয়ে বাইরে এনে মিস লিডিয়াকে দিয়ে অনুবাদ করায় অ্যাবি। মিঃ বেনসন যেহেতু মাঝেমাঝে মিস লিডিয়া শারীরিক কারণে মিউজিয়ম আসতে না পারলে অ্যাবিকে দিয়ে টুকটাক জিনিস ওঁর কাছে পাঠাতেন অথেন্টিকেশনের জন্য, তাই সন্দেহ করেননি অ্যাবিকে মিস লিডিয়া। পুঁথির অনুবাদ থেকে অ্যাবি জানতে পারে টালিসমেনটির গুরুত্ব, এবং এও জানতে পারে টালিসমেনটির আরেকটি অংশ মিউজিয়মেই এগজিবিশনের জন্য এসেছে। নিজের সাম্প্রতিক কিছু কাকতালীয় সৌভাগ্যে কুসংস্কারগ্রস্ত হয়ে অ্যাবি ভাবে সত্যিই টালিসমেনটির অতীন্দ্রিয় ক্ষমতা আছে। ফের চুরি করে পেন্টাক্যলটি।”

সারা ঘরে পিন পতনের নিস্তব্ধতা। মেলিসা, অ্যাবি, মিঃ বেনসন ছাড়াও আরও দুজন লোকাল পুলিশ ডিপার্টমেন্টের লোকও ঘরে উপস্থিত। সবাই শুনছে মেলিসার কথা। গলা ঝেড়ে আবার বলতে থাকে মেলিসা,

-“মাসখানেক আগেই হত্যাকাণ্ডটি ঘটায় অ্যাবি। 
পেন্টাক্যলটি খুঁজে না পেয়ে সন্দেহ হয় মিঃ বেনসনের, উনি মিস লিডিয়াকে ফোন করেন। মিঃ বেনসনের সাথে কথা হওয়ার পর মিস লিডিয়া সম্ভবত বুঝতে পেরেছিলেন অ্যাবি কিছু খারাপ একটা কাজ করছে। ওঁর ইনট্যুশন হয়ত বলে সামথিং ইজ রং। আর তাই উনি হয়ত কনফ্রন্ট করেন অ্যাবিকে। তখনই অ্যাবি সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলে। কী তাই তো অ্যাবি?”

যার উদ্দেশ্যে বলা সে মাথা নাড়তে নাড়তে বলে,
-“সৌভাগ্য না ছাই, ওই টালিসমেনটা শয়তানের গয়না। ওটা সম্পূর্ণ হওয়ার পরই আমার ওপরেও শয়তান ভর করে। নাহলে আমি কীকরে মিস লিডিয়াকে...”
মুখে চাপা দিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে অ্যাবি। 

মেলিসা বলে, 
-“বাকিটা কি আমি বলব না তুমি বলবে? মিথ্যে বলে বা লুকিয়ে কোনও লাভ নেই। তুমি সবকিছু বড় যত্নে করলেও একটা জিনিস তোমার আয়ত্বে ছিল না। মিস লিডিয়ার ফ্ল্যাটের উল্টোদিকের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা লুকাস, ইটালির ত্রিয়েস্তে শহরের বাসিন্দা। তুমি যখন ভোরবেলায় সব সাক্ষ্যপ্রমাণ লোপাট করে ফিরে যাচ্ছিলে, তখন ও ফ্ল্যাট থেকে বেরোতে যাচ্ছিল, ভোরের ফ্লাইট ধরে ইটালিতে ছুটিতে বাড়ি ফিরবে বলে। বেরোনোর মুহূর্তে নিজের ঘরের দরজার আই-হোল দিয়ে ও তোমায় দেখে মিস লিডিয়ার ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ করে বেরোতে, এবং দরজার বাইরের হাতলের ওপর থেকে রুমাল দিয়ে নিজের হাতের ছাপ মুছতে। নিয়মিত মিস্ লিডিয়ার ফ্ল্যাটে যেহেতু তুমি যাতায়াত করতে লুকাস তোমায় চিনত। কিন্তু দিন কুড়ির জন্য দেশে ফিরে যাওয়ায় ও জানতে পারেনি যে মিস লিডিয়ার মৃত্যু হয়েছে। ফিরে এসে সেটা জানামাত্র ও যোগাযোগ করে লোকাল পুলিশ স্টেশনে, এবং তারপর আমার কাছে ও স্টেটমেন্টও দিয়েছে। কাজেই...”

(৮)

কাঁপা কাঁপা গলায় অ্যাবি শুরু করে,
-“মিস লিডিয়া আমায় সরাসরি প্রশ্ন করেন যে পুঁথিটা আমি না জানিয়ে এনেছিলাম কী না! এরপর পেন্টাক্যলটার কথাও জিজ্ঞাসা করেন। আমি ওঁর সামনে তখনকার মত নিজের দোষ স্বীকার করি। উনি আমাকে বলেন ওগুলো মিউজিয়ামে ফেরত দিতে আর ভবিষ্যতে এরকম কিছু না করতে। তাহলে উনি মিঃ বেনসন বা পুলিশ কাউকে কিছু বলবেন না।”
মাথা নীচু করে বলে চলে অ্যাবি,
-“তখনই ঠিক করে নিয়েছিলাম ওঁকে সরাতে হবে পথ থেকে। 
মিস লিডিয়ার ইনসমনিয়া ছিল, মাঝেমাঝে তাই প্রেসক্রাইবড ঘুমের ওষুধ খেতেন। আমার ওঁর বাড়িতে অবারিত দ্বার ছিল। টয়লেটে যাওয়ার নাম করে আমি কাঁচের আয়নার পেছনের মেডিসিন ক্যাবিনেট থেকে বার করে আনি ঘুমের ওষুধের শিশি। মিস লিডিয়া যেহেতু নিয়মিত ওষুধ খেতেন না তাই ওষুধটা খুঁজে না পেলে বিশেষ বিচলিত হওয়ার কথা নয়, বা নিজের ভুলোমনের কারণেই হারিয়েছেন ভাববেন। এটা খুব সহজেই আঁচ করতে পারি। তারপর মিস লিডিয়ার অন্যমনস্কতার সুযোগে, গল্প করতে করতে, ওঁর হট চকলেটের মধ্যে মিশিয়ে দিই একমুঠো ঘুমের ওষুধ। আমি জানতাম প্রতি রাত্রে উনি শোয়ার আগে হট চকলেট খান। উনি আমাকে এতটাই বিশ্বাস করতেন যে ফ্ল্যাটের একটা চাবিও আমার কাছে দিয়ে রেখেছিলেন। ভোর রাত্রে ফের ঢুকি ওঁর ঘরে, হট চকলেটের গ্লাসটা ধুয়ে রেখে দিই। জলের গ্লাসের পাশে খালি ঘুমের ওষুধের শিশিটা রেখে দিয়ে, সতর্কভাবে নিজের সমস্ত হাতের ছাপ মুছে দিয়ে চলে আসি। আর চাবিটাও রেখে দিয়ে এসেছিলাম, যাতে সন্দেহের তির আমার দিকে না আসে। এই সমস্ত প্ল্যান ওইদিন করার যে কারণ ছিল, সেটা হ’ল মিস লিডিয়ার অ্যাপার্টমেন্টের সিকিওরিটি ক্যামেরাগুলোর রিপ্লেসমেন্ট চলছিল গত দুদিন ধরে। তাই বিল্ডিং এ আমার আসা বা যাওয়ার কোনও রেকর্ড হবেনা ভেবেছিলাম। কিন্তু লুকাস...”

রাগতঃ কণ্ঠে মিঃ বেনসন বলেন,
-“পাপ কখনও চাপা দেওয়া যায় না অ্যাবি, ছিঃ! এত মেধাবী ছাত্রী তুমি। তোমার ভেতর কত সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু তুমি এভাবে মিথ্যে কুসংস্কারের ফাঁদে পা দিয়ে সর্বনাশ ডেকে আনলে। একটা পাথরের টুকরো বা একটা ধাতুর টুকরো তোমার ভাগ্য বদলায়নি, বদলাতে পারে না। তুমি নিজেই এর জন্য দায়ী।”

মেলিসা বলে, 
-“যদিও আপাতদৃষ্টিতে মিস লিডিয়া একাকীত্বের ডিপ্রেশনে আত্মহত্যা করেছেন বলে মনে হবে ঘটনাটা, তাও অনেকগুলো খোলা সূত্র থাকায় লোকাল পি. ডি. হোমিসাইডের মামলা দায়ের করে। কিন্তু ফাইনালি এটা ইনভেস্টিগেট করে এফ. বি. আই। তার কারণ মিস লিডিয়া বহুবার বিভিন্ন প্রাচীন ভাষার তথ্য অনুবাদে সাহায্য করেছেন সরকারকে, যেগুলো ক্লাসিফায়েড ডক্যুমেন্ট মানে, কনফিডেন্সিয়াল ইনফর্মেশন বহন করে। কাজেই ওঁর খুন হওয়ারও অনেক গোপন কারণ থাকতে পারত। 

কিন্তু ফাইনালি তদন্তে মিস অ্যাবিগেইল দোষী প্রমাণিত হবেন এটা আমরাও এক্সপেক্ট করিনি।”

-“সন্দেহটা মিঃ বেনসনেরই হয় শুরুতে কারণ মিস লিডিয়া অ্যাবির মিউজিয়ম থেকে পুঁথি চুরির ঘটনাটা ওঁকে জানান। তারপর মিঃ বেনসনও লক্ষ্য করেন পেন্টাক্যলটা মিসিং। যদিও কম্পিউটারের সব তথ্য অ্যাবি উড়িয়ে দিয়েছিল কিন্তু ও জানত না যে উনি পেপার ফাইলেও রেকর্ড রাখেন। সেটাই অ্যাবির কাল হ’ল।”

(৯)

দ্য প্রাইম সাসপেক্ট অফ মিস লিডিয়া টাইলর মার্ডার কেস অ্যান্ড  থেফ্ট অফ প্রাইসলেস মিউজিয়ম আর্টিফ্যাক্টস, মিস অ্যাবিগেইল স্পেন্সারকে লাল নীল আলো জ্বলা পুলিশের গাড়িতে তুলে দেয় মেলিসা। এবার যা করার কোর্ট করবে। 

ব্লুমণ্ড অ্যাপার্টমেন্টের অ্যাবির 213 নম্বর রুমটা “ডু নট ক্রস” লেখা হলুদ টেপের পুলিশ লাইন দিয়ে ঘিরে দেয়। তারপর উঠে যায় তিনতলার 313 নম্বর ঘরে। ব্যালকনিতে কুণ্ডলি পাকিয়ে রাখা দড়িটা তুলে ঘরে এনে রাখে। জিপলক প্লাস্টিক ব্যাগের মধ্যে রাখা টালিসমেনটা ওভারকোটের পকেট থেকে বার করে টেবিলে রাখে, প্লাস্টিকটার গায়ে স্টিকার লাগানো এভিডেন্স।  
তারপর অন্য পকেট থেকে আরেকটা ছোট কাপড়ের থলি বার করে, তার মধ্যেও রাখা একদম এক রকমের আরেকটা টালিসমেন। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে ওটা। বহুদিন ধরে পাগলের মত খুঁজেছে এটাকে। বিভিন্ন অ্যান্টিক শপ থেকে শুরু করে সমস্ত নামী অনামী মিউজিয়ম, সব জায়গায়। অনেক কাঠখড় পুড়িয়েছে। অ্যাবিকে ধরা নয়, এই টালিসমেনটাকে ধরাই ওর আসল উদ্দেশ্য ছিল। ওটাকে এভিডেন্সের ব্যাগের টালিসমেনটার সাথে বদলে দেয়। 

দুটোর মধ্যে একটাই তফাৎ, অ্যাবির কাছে যে টালিসমেনটা ছিল, যেটা এই মুহূর্তে মেলিসার পকেটের কাপড়ের থলিতে আছে, তার পেন্টাক্যলটার এক কোণে খোদাই করা একটা নাম, যার ইংরাজি হরফে অনুবাদ করলে দাঁড়ায় P. Davies. 
মেলিসা ডেভিস-এর গ্রেট গ্রেট গ্রেট গ্র্যাণ্ডফাদার, প্যাট্রিক ডেভিস। 

লিফটে করে নীচে নেমে, লাল টয়োটা ক্যামরিটায় বসে মেলিসা। পাশের সিটে ছুঁড়ে দেয় এভিডেন্সের জিপলক ব্যাগটা, এটার আর অথেন্টিকেশন হবে না, বহু এভিডেন্সের তলায় চাপা পড়ে থাকবে কোনও লকারে। মিঃ বেনসনও আর ফেরৎ চাননা অভিশপ্ত টালিসমেনটা।
আর যেটায় মেলিসার বংশানুক্রমিক অধিকার, সেটা ওর ওভারকোটের পকেটে সুরক্ষিত আছে। সানগ্লাসটা চোখ থেকে খুলে ড্যাশবোর্ডে রেখে তাকায় রিয়ারভিউ মিররে। ঠিক সেই জ্বলন্ত একজোড়া চোখ ভেসে ওঠে স্ফটিক স্বচ্ছ আয়নায়, যে দুটো অ্যাবি ক’দিন আগেই দেখেছিল উল্টোদিকের গাড়িতে বসে। 

(সমাপ্ত)