Showing posts with label ছোটোগল্প. Show all posts
Showing posts with label ছোটোগল্প. Show all posts

ভূতের নাম

 ভূতের নাম

সুস্মিতা কুণ্ডু

মস্ত আতান্তরে পড়েছে ভূতেদের সর্দার মামদো ঘটাংঘট আর তার পেত্নী বৌ খটখটি। মাথা চুলকে চুলকে খুলিতে গর্ত হয়ে যাওয়ার জোগাড়। শেষমেষ ওই মানুষদের থেকে ধার নিতে হবে?
ছ্যা ছ্যা! তাহলে যে ভূতসমাজে আর মুখ দেখানোর জো থাকবেনা। তোমরা নিশ্চয়ই ভাবছ ভূতেদের আবার বিপদ কী? তারাই তো মানুষদের নাস্তানাবুদ করে বিপদে ফেলতে ওস্তাদ। আর ভূতেরা মানুষের থেকে ধারই বা কী নেবে? আরে ভূতেদের কি টাকাপয়সা লাগে যে মানুষের মহাজনের থেকে চড়া সুদে ধার নিতে ছুটবে? রোসো! ব্যাপারটা একটু খুলেই বলি তাহলে।
ঘটাংঘট আর খটখটির তিনটি ছেলে। হাঁউ, মাঁউ আর খাঁউ। নামগুলো শুনে মজা লাগছে তো? ভুরভুরিয়ে হাসি বেরিয়ে আসছে তো? কিন্তু ওই নামের বাহার করতে গিয়েই তো বিপদে পড়েছে ঘটাংঘট আর খটখটি। হাঁউ মাঁউ খাঁউ তো মানুষদের ভয় দেখিয়ে উৎপাত করে, জন্তুজানোয়ারদের লেজ টেনে সব্বাইকে তিতিবিরক্ত করে বাবা মায়ের মুখ গর্বে উজ্জ্বল থুক্কুড়ি কালো করতে থাকে। এদিকে খটখটির মনে মনে বড় একটা মেয়ের শখ। নিজের হাতে পাঁক আর পোড়া হাঁড়ির কালি দিয়ে রূপটান লাগাবে মেয়েকে। মাকড়সার জাল দিয়ে চুল বেঁধে দেবে। গুগলি শামুকের চচ্চড়ি রাঁধতে শেখাবে মেয়েকে। আরও কত্ত কী করবে! ছেলে তিনটে তো দু’দণ্ড মায়ের কাছে বসেই না।
তা মানুষ হাজার ডেকে ভগবানের সাড়া না পেলেও ভূতেরা চট করে তাদের আরাধ্য দেবতা মানে অপদেবতা শয়তানের সাড়া পেয়ে যায়। খটখটির মনের সাধ পূর্ণ করে এক ছোট্ট দুষ্টু পেত্নীছানা এলো তার কোলে। ঘটাংঘট বললেন মেয়ের নাম তার দাদাদের নামের সাথে মিলিয়ে হোক ‘পাঁউ’। না মানে একটা ফুটফুটে ঘুটঘুটে ভূতের ছানার নাম তো আর ‘মানুষের গন্ধ পাঁউ’ রাখা যায় না, তাই শুধু ‘পাঁউ’। চার ভাইবোন বেশ একসাথে ভয় দেখাতে যাবে,
‘হাঁউ মাঁউ খাঁউ
মানুষের গন্ধ পাঁউ!’
কিন্তু বাদ সাধল খটখটি। খটখটি আসলে বেশ যাকে বলে ওই মডার্ণ পেত্নী। ভূতেদের ওই নেত্যকালী, আন্নাকালী, ক্ষ্যান্তমণি এইসব ধরনের নাম খটখটির পছন্দ নয়। নাম হতে হবে এমন যে ভূত ভূত ছোঁয়াও থাকবে আবার বেশ ইয়ে মানে আধুনিকও হবে। নাম শুনলেই যেন মানুষরা ভয়ে একেবারে ভির্মি খায় এমনধারা নাম হতে হবে। তবে না ভূত সমাজের মোড়ল বংশের মান থাকবে!
খটখটির নিজের নামের বেলায় তো আর কোনও হাত ছিল না! বাপ মা যা নাম রেখেছে তাই মেনে নিতে হয়েছে। কিন্তু নিজের মেয়ের বেলায় কারোর কথা শুনবেনা খটখটি! এমনকি স্বামী ঘটাংঘটের কথাও না। ছেলেদের বেলায় ঘটাংঘট খটখটির কথা শোনেনি এখন ও-ই বা পাত্তা দেবে কেন শুনি?
কিন্তু আধুনিক নাম দেব বললেই তো আর এত সহজে দেওয়া যায়না! ভূতেরা চিরকাল ওই ঘটাংঘট খটাংখট মার্কা নাম দিয়েই অভ্যস্ত। অনেক ভেবে ভেবে শেষে খটখটি গেল ব্রক্ষ্মদত্যি পণ্ডিতমশাইয়ের কাছে। পণ্ডিতমশায়ের অনেক জ্ঞান, নিশ্চয়ই একটা উপায় বাতলাতে পারবেন। খটখটির মনের সাধ শুনে ব্রক্ষ্মদত্যিমশাই খড়ম খটখটিয়ে, টিকি নাড়িয়ে, বললেন,
-“হুমম! মানুষরাও আজকাল অনেক অদ্ভুত কিম্ভুত নাম রাখে বটে। ওই যে কী বলে ডিসপ্যাঁচ নাকি ডিসকোরানি... গাবদাগোবদা মোটাসোটা বই হয়। মানুষরা শুনি তো ওই থেকেই খুঁজে খুঁজে ছেলেপিলের নাম রাখে। তোমরাও তাই করোগে বরং।”
খটখটি তো এই শুনে নাচতে নাচতে মহানন্দে বাড়ি এল। তারপর ঘটাংঘটকে বলল,
-“মানুষদের বাড়িতে বাড়িতে তোমার ভূতপিশাচ অনুচরদের পাঠাও। আমার ওই ডিসকোরানি চাই চাই চাই।”
খটখটির কথা অমান্যি করে এমন সাধ্যি ভূতসর্দার ঘটাংঘটেরও নেই। অগত্যা দিকে দিকে ভূত গেল। রাতের অন্ধকারে মানুষেরা যখন সবাই নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে তখন আলমারি থেকে, টেবিল থেকে, সবচেয়ে মোটা বইগুলো জানালা দিয়ে লম্বা লম্বা আঁকশি গলিয়ে, বস্তায় ভরে, তুলে আনতে লাগল ভূতের দল। এক রাতের ভেতরেই ঘটাংঘট আর খটখটির ঘর বইয়ে ভর্তি হয়ে গেল। খটখটি তো ভীষণ উত্তেজিত, মেয়ের একটা দারুণ নাম হবে বলে কথা! এদিকে উত্তেজনার বশে এটাই ভুলে গেছে সকলে যে ভূতেরা মানুষের লেখা পড়তে পারে না! কী কেলেঙ্কারী কাণ্ড! এই এত ডিসপ্যাঁচ জোগাড় করা তাহলে বৃথা? খটখটি তো মেয়ে কোলে ডাক ছেড়ে কাঁদতে শুরু করল। ঘটাংঘট আবার বউয়ের দুঃখ সইতে পারে না। ফের শরণাপন্ন হল মুশকিল আসান ব্রক্ষ্মদত্যির।
ব্রক্ষ্মদত্যি বললেন,
-“দ্যাকো বাপু, যখন পুরুতগিরি করতুম সব ওই মুখস্থ মন্ত্র পড়তুম। সংস্কৃত বাংলা কোনওটাই ছাই আমি না পড়তে পারতুম না লিখতে পারতুম! আর জীবদ্দশাতেই পড়াশোনা হল না তার এই প্রেতদশায় কি আর মানুষদের পুঁথি পড়তে পারি? ঘটাংঘট বাছা তুমি বরং এক কাজ কর। এত খেটে যখন মানুষদের বই জোগাড় করলেই তখল একটা গোটা মানুষকেই নাহয় ধরে আনো। সেই পড়ে পড়ে বলে দেবে’খন।”
ঘটাংঘট আর খটখটি বেশ পছন্দ হল বুদ্ধিটা। তিন ভাই হাঁউ-মাঁউ-খাঁউ গিয়ে ওমনি ফের হানা দিল মানুষদের পাড়ায়।
মানুষদের পাঠশালার মাষ্টারমশাই দীননাথ পোদ্দার মনের সুখে ছাত্র পিটিয়ে, পান্তা, আলুচচ্চড়ি আর মৌরলা মাছের টক দিয়ে ডিনার সেরে দিব্যি নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছিলেন। হঠাৎই ঘুমের মধ্যে অনুভব করলেন খাটশুদ্ধু হুশ্হুশ্ করে উড়ে চলেছেন। প্রথমে ভাবলেন পান্তা ভাত আর মাছের টক খেয়ে গ্যাস অম্বল হয়েছে বুঝি কিন্তু চোখ খুলতেই ভুল ভাঙল। মাথার ওপর টিনের চালের বদলে কালো আকাশ আর নীচে সারি সারি তালগাছের মাথা। দীননাথ পোদ্দারকে হাঁউ-মাঁউ-খাঁউ সোজা উড়িয়ে নিয়ে এল ভূতেদের আড্ডায়। দীননাথ ওড়া থামতে চোখ খুলে দেখেন তাঁকে ঘিরে গাদাগাদা ভূত আর মোটামোটা বই, ঠিক যেন ভূতেদের সাহিত্যসভা হচ্ছে আর তিনি যেন মধ্যমণি সভাপতি।
একটা বিকটদর্শন ভূত এসে দীননাথকে বলল,
-“এইয়ো মানুষ! আমি ভূতেদের সর্দার ঘটাংঘট। তোমাদের ওই মোটামোটা ডিসকোরানি পড়ে শিগগির আমার মেয়ের জন্য একটা নাম ঠিক করে দাও তো। নামটা ভৌতিকও হতে হবে আবার আধুনিকও হতে হবে। যদি তোমার দেওয়া নাম আমার গিন্নি খটখটির পছন্দ না হয় তাহলে ঘটাং করে তোমার ঘাড়টা মটকে দেব। আমার নাম এমনি এমনি ঘটাংঘট হয়নি, বুঝলে?”
সর্দার ঘটাংঘটের কথা শুনে আর তার পেত্নিগিন্নি খটখটিকে দেখে দীননাথ পণ্ডিতের সত্যিই ভয়ে দাঁতে দাঁত লেগে খটাখট আওয়াজ উঠতে লাগল। আর বাক্যব্যয় না করে সামনে থেকে একটা মোটা ডিক্সনারি টেনে নিয়ে নাম খুঁজতে শুরু করলেন। দীননাথ ভীতু হলেও মূর্খ নন। বিপদের সময় মাথা ঠাণ্ডা রাখতে জানেন।
এক এক করে যা চোখে পড়ছে বলতে থাকলেন। তাড়কা, শূর্পনখা, হিড়িম্বা... এমনকি কদলীবালা... সবরকমই চেষ্টা করলেন। কিন্তু ঘটাংঘট আর খটখটির কোনও নামই পছন্দ হয়না। বারবার বলে ‘এই বইটা নয়, ওই বইটায় দ্যাখো’। কিন্তু ওদের কে বোঝাবে যে সব ডিক্সনারিই সমান। শেষমেষ এ বই সে বই করতে করতে দীননাথ মাষ্টারের হাতে উঠে এল এক পিস কৃত্তিবাসী রামায়ণ। কোনও ব্যাটা মূর্খ ভূত বইয়ের মোটাসোটা চেহারা দেখে ডিক্সনারি ভেবে ভুল করে আঁকশি দিয়ে রামায়ণ টেনে এনে ভরেছে বস্তায়। এই সুযোগ দীননাথ পোদ্দারের। দীননাথ উচ্চৈঃস্বরে সুর করে রামায়ণ পড়তে শুরু করলেন। প্রথমটায় ভূতেরা বুঝতে না পারলেও খানিকবাদে রামায়ণ শুনে সবার বোঁ বোঁ করে মাথা ঘুরতে লাগল। ভির্মি খেয়ে পড়তে লাগল একে একে।
-“এই এই এ কী পড়ছ?”
বলে খটখটি যেই না দীননাথের হাত থেকে বইটা টেনে কাড়তে গেছে ওমনি কারেন্টের শক লাগার মত ছিটকে পড়ল দশ হাত দূরে। খটখটিকে পড়ে যেতে দেখে ঘটাংঘট যেই না বইটা ধরতে এল ওরও একই দশা হল। বাবা মার এই অবস্থা দেখে হাঁউ মাঁউ খাঁউ তিন ভাই এগিয়ে এল। বলাই বাহুল্য যে তাদেরও একই গতি হল। সব কঙ্কাল হাড়গোড়ে যেন ভূমিকম্পের মত ঝাঁকুনি লাগল। ঘটাংঘট মাটিতে পড়ে কাতরাতে কাতরাতে চেঁচাতে লাগল,
-“ওরে কে কোথায় আছিস এই অলুক্ষুনে বইসহ এই বজ্জাত মানুষটাকে শিগগির ফেরৎ দিয়ে আয়। নইলে আমাদের ভূতবংশ নির্বংশ করে ছাড়বে।”
খাটের ওপর রামায়ণ হাতে বসা অবস্থাতেই দীননাথ পোদ্দারকে ফের হুশহুশিয়ে উড়িয়ে ভূতের দল তার বাড়িতে রেখে এল। দীননাথ হাতের রামায়ণটাকে সশ্রদ্ধায় মাথায় ঠেকিয়ে, ঠাকুরের আসনের সামনে রেখে এলেন। এ যাত্রায় এই বইটাই প্রাণ বাঁচাল।
ওদিকে ঘটাংঘট একটু ধাতস্থ হয়ে উঠে গিন্নি খটখটিকে বললে,
-“মেয়ের নাম ওই পাঁউ-ই থাকবে! ফের যদি আধুনিক নামের বায়না করেছো...”
(সমাপ্ত)

মজারুর মজার বুদ্ধি

 

মজারুর মজার বুদ্ধি
সুস্মিতা কুণ্ডু


এক ছিল সজারু। তার কী নাম ছিল জানো? মজারু। তবে তার নাম মজারু হলে কী হবে সে মোট্টে মজা করার সুযোগ পেত না। আসলে সজারুদের গায়ে অনেক খোঁচা খোঁচা কাঁটা হয় কিনা, তাই যার সাথেই মজারু খেলতে যায় সেই ভয় পেয়ে পালায়। কেউ ওর আশেপাশে ঘেঁসে না। ধরাধরি খেলতে গেলে যদি একে অপরকে ছুঁতেই না পারো, খেলবেটা কী করে শুনি? কুমির ডাঙ্গা খেলতে গেলেও সেই একই বিপদ। সত্যিই তো খুব মুশকিল একসাথে খেলাধুলো করা।
মজারুর ভারি মন খারাপ।
সেদিন বিকেলে তাই একা একাই মাঠের এক কোণে ঝোপের আড়ে চুপটি করে বসেছিল। বাকিরা খেলছে, মজারু আনমনা। এমন সময় আকাশ ধীরে ধীরে কালো হয়ে এল। টিপ টপ টিপ টপ করে এক দু-ফোঁটা বৃষ্টি পড়তে শুরু করল। সবাই মাঠ ছেড়ে যে যার বাসায়, গাছের কোটরে, মাটির গর্তে, ছুটে পালাল। এদিকে মজারুর তো খেয়ালই নেই শুরুতে। যতক্ষণে নজর করল ততক্ষণে ঝমঝমিয়ে জল ঝরছে আকাশের গা থেকে।
কী করে কী করে!
একটা বড়সড় গাছের পাতা তুলে চাপা দিল মাথায় গায়ে। খানিক পরে ‘কড় ক্কড় ক্কড়াৎ’! যেই না মেঘ গর্জাল চমকে উঠে মজারুরও গায়ের কাঁটাগুলোও খাড়া খাড়া হয়ে গেল। ওমনি গায়ের ওপরের পাতাটা ছিঁড়েখুঁড়ে একশা। মজারু ঝটপট অন্য একটা পাতা নিয়ে মাথায় আড়াল দিল। একটু পরেই ফের ‘ক্কড় ক্কড়াৎ’, আর পাতাও ফের ‘ফড় ফড়াৎ’।
বৃষ্টির জলে ভিজে হাপুশুটি হলেও, এই দেখে হঠাৎই মজারুর মাথায় একটা মজার বুদ্ধি গজাল।
পরের দিন বিকেলে যখন সব খেলুড়ে মাঠে খেলতে হাজির মজারুও উপস্থিত হল সেথায়। সবাই হইহই করে উঠল,
-“আমরা বাপু তোমায় দলে নিতে পারব না। তাহলে খেলাধুলো ছেড়ে গায়ে ব্যাণ্ডেজ বেঁধে কোটরেই বসে থাকতে হবে আমাদের।”
মজারু একটুও না ঘাবড়ে বললে,
-“আমি এমন একটা খেলার বুদ্ধি করেছি যে তোমরাই আমায় দলে নেওয়ার জন্য টানাটানি করবে।”
সবার একটু কৌতূহল হল, তারা বললে,
-“কী এমন খেলা শুনি?”
মজারু বলল,
-“চলো দেখি গাছ থেকে ফল পেড়ে লোফালুফি খেলি। তোমরা ছোঁড়ো আমি লুফে নেব। যদি একটাও ফলও মাটিতে পড়ে তোমরা জিতবে।”
বন্ধুরা বলল,
-“বটে! তোর এইটুকুটুকু হাতদুটো দিয়ে সব লুফতে পারবি? চল তো দেখি!”
তারপর যে কী মজার কাণ্ড হল কী বলি তোমাদের। সকলে মিলে যতই ফল ছোঁড়ে, মজারু হাতে করে লোফার বদলে লাফিয়েঝাঁপিয়ে গায়ের কাঁটাগুলো সোজা করে সেগুলো গেঁথে নেয়। এক এক করে মজারুর গোটা গায়ের কাঁটা পেয়ারা, জাম, জামরুল, লিচু, কলা সবেতে ভরে উঠল। একটা ফলও মাটিতে পড়ল না।
সবাই তো নতুন রকমের এই মজার খেলার আনন্দে লুটোপুটি! শুধু কি তাই? খেলা শেষ হতে মজারুর পিঠের কাঁটা থেকে একটা একটা করে ফল খুলে নিয়ে খাওয়াতেও কম মজা নাকি?
মজারু মিটমিট করে হেসে বললে,
-“কী আমি জিতলুম তো?”
বন্ধুরা আর কী করে উত্তর দেয়? সবাই যে কচরমচর করে মুখভর্তি ফল চিবোতেই ব্যস্ত!
(সমাপ্ত)
নিমোবাবু হেজহগ আর পরক্যুপাইনের তফাৎ বাপকে হাত পা নেড়ে খুব বোঝাচ্ছিলেন। সেই থেকেই বাপ ব্যাটা ছবি এঁকেছে। আমি গপ্পো লিখেছি। ও হ্যাঁ গপ্পোটা নিমোবাবু আর মা মিলে ইংরেজিতে ট্রানস্লেটও করেছেন বেশ কিছুটা। পুরোটা শেষ করে পোস্ট করব।


কাঠবেড়ালিছানার অ্যাডভেঞ্চার

 


কাঠবেড়ালিছানার অ্যাডভেঞ্চার
সুস্মিতা কুণ্ডু

এক বনে থাকত একটা কাঠবেড়ালির ছানা। বাদামি রঙের পশমের মত লোম গায়ে, ইয়া ফুলো ফুলো ঝামরি ঝুমরি বাদামি লেজ একটা। কী বললে কাঠবেড়ালি অমন দেখতে হয়না? কাঠবেড়ালি ছোট্ট ছোট্ট সাদায় কালোয় দাগকাটা পিঠে, ধূসর রঙের হয়। হুম হয়ই তো। কাঠবেড়ালি এরকমও হয় আবার ওরকমও হয়। জঙ্গলে কতরকম পশুপাখি থাকে, সমুদ্রে কতরকম মাছ থাকে তাদের সবাইকে কি আর আমরা চিনি?
আমাদের আজকের গপ্পো এই বাদামি কাঠবেড়ালির ছানাকে নিয়েই। সে এক ভারি দুষ্টু কাঠবেড়ালি। পাইন গাছের কোটরে থাকে মা বাবার সঙ্গে। দুপুরবেলায় যেই না মা একটু দুই চোখের পাতা এক করেছে ওমনি দুষ্টু কাঠবেড়ালি কোটর থেকে এক লাফে বেরিয়ে ভোঁকাট্টা। কোথায় পালায় কাঠবেড়ালি? কোথায় আবার! এই কাছেপিঠে হেথাহোথা। কখনও যায় এ পাশের কোটরে লুকনো বাদাম খেতে, কখনও ও পাশের গাছের ঢুলঢুলুনি প্যাঁচাকে জ্বালাতন করতে, কখনও আবার গাছের গোড়ার ঝোপে লুকনো খরগোশছানাদের ডেকে ডেকে ঘুম থেকে তোলে।
সেদিন খরগোশগিন্নি খুব নালিশ করেছে কাঠবেড়ালির মায়ের কাছে এই নিয়ে। তাই আর খরগোশছানাদের জ্বালাতন না করে চুপিচুপি গাছ থেকে নেমে কাঠবেড়ালি গেল একটু দূরদিকে। এক লাফ দুই লাফ তিন লাফ গুণতে গুণতে প্রায় শতখানেক লাফ দিয়ে অনেকটা পথ পেরিয়ে গেল। এমনিতে গুনে গুনে পঞ্চাশটা লাফের থেকে বেশি দূরে যায় না কক্ষণও। বাড়ি ফিরতে পারবে তো! একটু বুক ঢিপঢিপ করে। তারপরেই সামনে দেখে কী সুন্দর গোলাপি গোলাপি ফুলে ঢাকা গাছ। যতদূর চোখ যায় ততদূর। মাটিতে গোলাপি ফুলের পাপড়ি বিছিয়ে। কাঠবেড়ালি তো মনের আনন্দে গড়াগড়ি দেয় পাপড়ির বিছানায়।
হঠাৎ একটা নীল প্রজাপতি এসে বলে কাঠবেড়ালির নাকের ডগায়। মাথা নাড়িয়ে ওড়ায় তাকে, সে ফের এসে বসে নাকে। ফের ওড়ায়, ফের এসে বসে। এতো মহাজ্বালা। লেজ দিয়ে একটা ঝাপটা মারে নাকে, প্রজাপতি তার আগেই উড়ে পালায়। কাঠবেড়ালির খামোখা নাকে লোম ঢুকে সাড়ে উনিশটা হাঁচি হয়। শেষ হাঁচিটা বেরোতে গিয়েও বেরোয়নি কিনা। হাঁচি থামতেই প্রজাপতিও এসে হাজির। এতো মহা নাছোড়বান্দা প্রজাপতি। চাদ্দিকে এতো এতো ফুল ফুটে আছে তাইতে না বসে কেন নাকে এসে বসা বাপু!
কিন্তু বারবার প্রজাপতিটা ওরকম করায় কাঠবেড়ালির একটু সন্দেহ হল এবার। ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখল প্রজাপতিকে তারপর প্রজাপতি যেদিকপানে উড়ল কাঠবেড়ালিও সেদিকপানে লাফ দিল। কিন্তু ধরতে পারল না। প্রজাপতি ফের উড়ল, কাঠবেড়ালি ফের লাফালো। এমনি করে বেশ অনেকদূর যাওয়ার পর প্রজাপতিটা শাঁ করে উড়ে গিয়ে বসল একটা উঁচু গাছের ডালে। কাঠবেড়ালি মনে মনে বেজায় হাসল। গাছ বাইতে সে যে কত দড় তা তো আর প্রজাপতি জানেনা।
তরতরিয়ে গাছ বেয়ে উঠে যে ডালটায় প্রজাপতি বসেছিল সেইটেয় গিয়ে দেখে, ও মা! এতো একটা রবিন পাখির বাসা। সেই বাসায় দুটো কুট্টি কুট্টি রবিন পাখির ছানা। তাদের না গজিয়েছে গায়ে লোম, না ফুটেছে চোখ। প্রজাপতিটা এসে বাসাটার গায়ে বসেছে। ছানাদুটো যেন থরথরিয়ে কাঁপছে। আহা রে! ভারি ঠাণ্ডা লেগেছে বুঝি। মুখটা হাঁ করে চিঁচিঁ করে ডাকছেও তো। তার মানে খিদেও পেয়েছে ওদের। কী মুশকিল। কাঠবেড়ালির ছানা এখন কী করে! শুধু কী তাই! নিচের দিকে তাকিয়ে দেখে একটা দুষ্টু সাপও গাছের গোড়ার গর্ত থেকে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। এতো তিনদিক দিয়ে বিপদ।
প্রজাপতিটা মনে হয় ওই জন্যই কাঠবেড়ালির ছানাকে এত ডাকাডাকি করার চেষ্টা করছিল। কী করে কী করে! ভালো করে চারদিকে তাকিয়ে দেখে যে গাছটায় পাখির বাসাটা সেটা একটা ওক গাছ। চারদিকে ডালে ডালে ধরে আছে একর্ন, ওক গাছের ফল। কাঠবেড়ালির ছানার বেজায় প্রিয় খাবার। হুম! একটা বুদ্ধি এসেছে মাথায়। ওকনাট মানে একর্নের খোলা তো বেশ শক্তপোক্তও হয়। তাহলে...
যেমনি ভাবা তেমনি কাজ। একটা একটা করে একর্ন ছেঁড়ে আর ঢিপঢাপ করে ছোঁড়ে সাপটার দিকে। সাপটা খানিকক্ষণ পরেই উঁকিঝুঁকি মারা বন্ধ করে ঝটপট পালাল গাছের তলা ছেড়ে। কাঠবেড়ালির ছানা তুড়ুক লেজটি তুলে একপাক নেচে নিল। প্রজাপতিও ডানা নেড়ে একপাক উড়ে নিল। কিন্তু পাখির ছানারা এখনও চিঁচিঁ করে কেঁদেই চলেছে। কাঠবেড়ালি শিগগির একটা ফলের দাঁতে করে খোলা ভেঙে ভেতরের বীজটা চিবিয়ে নরম করে দিল পাখির ছানাদের মুখে। কয়েকবার দেওয়ার পরেই পাখির ছানাদের পেট ভরে গেল। ওই তো অতটুকুটুকু পেট।
যাকগে দুটো সমস্যার তো সমাধান হল। এবার রইল বাকি এক। ছানারা তো এখনও শীতে কাঁপছে। প্রজাপতি উড়ে এসে বসল কাঠবেড়ালির ঝামরি ঝুমরি লেজের ওপর। তাই তো! এটা মাথায় আসেনি এতক্ষণ! বাসার পাশে বসে লেজটা পাখির ছানাদের গায়ে চাপা দিল আলতো করে। তারপর কখন যেন গুটিশুটি দিয়ে নিজেও ঘুমিয়ে পড়ল। প্রজাপতি ডানা মুড়ে এসে বসল কাঠবেড়ালির ছানার মাথার ওপর। এবারে কিন্তু তাকে আর তাড়ালো না কাঠবেড়ালি।
ঘুম ভাঙল পাখিছানার মা বাবার কিচিরমিচির ডাকে। ওরা তো প্রথমে ভয়ই পেয়ে গিয়েছিল। বাসার পাশে কাঠবেড়ালির ছানাকে দেখে। তারপর সবটা শুনে তো কাঠবেড়ালি ছানাকে এত্ত এত্ত চুমো দিল রবিন মা। যদিও পাখির শক্ত ঠোঁটের চুমোগুলোয় একটু মাথায় ব্যথাই লাগছিল কাঠবেড়ালি ছানার তাও কিছু বলল না। ও কি আর ছোটোটি আছে! আজ কত বড় কাজ করল বল দেখি একটা।
কিন্তু মুশকিল হল এবার বাড়ি ফিরবে কী করে কাঠবেড়ালির ছানা। এতটা দূরে তো আগে কখনও আসেনি। তাই মনেই পড়ছে না কোন পথে এসেছে। এমন সময় প্রজাপতি ফের ওড়ে নাকের ডগায়। চিন্তা কী! প্রজাপতির পিছু পিছু চলল কাঠবেড়ালিছানা আর রবিন মা। রবিন বাবা রইল বাসায় ছানাদের পাহারায়।
এদিকে কাঠবেড়ালির মা ঘুম ভেঙে কোটরের বাইরে ডাক শুনে এসে দেখে রবিন মা আর কাঠবেড়ালির ছানা। প্রজাপতিকে অবশ্য দেখতে পায়নি, সে কাঠবেড়ালির লেজের আড়ালে লুকিয়েছিল। প্রথমে তো মা ভেবেছিল রবিনগিন্নি বুঝি কোনও নালিশ করতে এসেছে খরগোশগিন্নির মত। কিন্তু যখন পুরো ঘটনাটা শুনল তখন তো অবাক। সেই দুষ্টু ছানাটা নাকি এত বড় কাণ্ড করেছে একটা। ইতিউতি গাছের কোটর থেকে সব্বাই বেরিয়ে কাঠবেড়ালি ছানা আর প্রজাপতির বীরত্বের গল্প শুনে হাততালি দিল এত এত। এমনকি খরগোশগিন্নিও তার ছানাদের বলল,
-“সারা দুপুর পড়ে পড়ে না ঘুমিয়ে একটু কাঠবেড়ালিদাদার থেকে শিখতে পারিস তো কিছু, নাকি?”
(সমাপ্ত)
আজ গল্পের শেষে কটা মজার কথা বলি? বলেছিলুম না শুরুতেই এই দুনিয়ায় পশুপাখি গাছপালা যে কত্তরকমের হয় তার কোনও ঠিকঠিকানা নেই। একটা ছোট্ট উদাহরণ দিই শোনো তবে।
গোটা বিশ্বে কতরকম প্রজাতির কাঠবেড়ালি হয় জানো? প্রায় ২৮৫!
আরও শুনবে?
রবিন পাখিরও প্রায় ৬৫ টা প্রজাতি আছে।
শুধু পশুপাখি! গাছেরাও কতরকমের হয়! পাইন গাছের প্রায় ১২৬-টা আর ওকগাছের প্রায় ৬০০-টা প্রজাতি হয়।
এই শুনেই যদি তোমরা অবাক হও, তাহলে এবার যেটা বলব সেটা শোনার আগে বাপু একটু শক্ত হয়ে বোসো। সারা বিশ্বে প্রায় ১৭৫০০ রকমের প্রজাপতি দেখতে পাওয়া যায়! বোঝো!
তাহলেই ভেবে দেখো আমাদের এই পৃথিবীটা কতরকম আশ্চয্যিতেই না ভরে রয়েছে।
(তথ্যে কোথাও ভুল থাকলে ঠিক করে দিও বন্ধুরা)


রংমিলান্তি রাজ্য

 






রংমিলান্তি রাজ্য


সুস্মিতা কুণ্ডু
এক ছিল আজবগজব রাজ্য। রংমিলান্তি রাজ্য। সেই রাজ্যে ছিল সাত-সাতখানা গ্রাম। বেগনে গ্রাম, নীল গ্রাম, আকাশি গ্রাম, সবুজ গ্রাম, হলুদ গ্রাম, কমলা গ্রাম আর লাল গ্রাম। ভাবছ বুঝি এমনধারা নাম আবার কোন গ্রামের হয়? কোন রাজ্যেই বা আছে সেই গ্রামগুলো? জানি ভারি কৌতূহল হচ্ছে। কৌতূহল হওয়ারই কথা। না হলেই বরং অবাক কাণ্ড। তাহলে শোনো বলি।
রংমিলান্তি রাজ্যে কারা বাস করে জানো? রঙপেন্সিলরা মানে ক্রেয়নরা। বেগনে গাঁয়ে থাকে বেগুনি ক্রেয়নরা, নীল গাঁয়ে নীল, লাল গাঁয়ে লাল... বুঝতেই পারছ ক্রেয়নদের রঙেই তাদের গাঁয়েরও নাম। যখন আকাশের নীল রঙ ফিকে হয়ে আশে তখন রাজামশাই খবর পাঠান নীল গাঁয়ে। লাল গোলাপ ফোটার সময় হলে খবর যায় লাল গাঁয়ে। গাছের পাতা গজায় যখন সবুজ গাঁয়ে দৌড়য় রাজামশাইয়ের পেয়াদা।
রাজামশাইয়ে রাজমহলের পাশেই আছে বিশাল বড় একটা ক্রেয়ন বানানোর কারখানা। সেখানে একশ কারিগর রোজ রঙপেন্সিল গড়ে। সেই রঙপেন্সিল গড়ার মোম আসে রাজবাড়ির পেছনবাগের জঙ্গলের মৌচাক থেকে। মোম দিয়ে পেন্সিলের দেহ গড়া হলে তাকে পাঠানো হয় রংরেজের বাড়ি। রংরেজ কিন্তু যে সে রংরেজ নয়। সে হল গিয়ে রামধনুর দেশের কারিগর। রামধনুর সাত রঙ থেকে সে সাতটি শিশিবোতলে ভরে নিয়ে আসে রঙ। তারপর ইয়াব্বড় সাতটা জালায় জল ভরে একফোঁটা করে রামধনুর রঙ মেশায়। তাইতে যেই না টপাৎ করে ডুব দেয় রঙপেন্সিলগুলো ওমনি সেই রঙে রঙিন হয়ে যায়।
তারপর সেই রঙিন ক্রেয়নগুলোকে কারখানার কারিগররা জামায় মুড়ে, টুপি পরিয়ে, গায়ে লিখে দেয় বেগুনি, নীল, আকাশি, সবুজ, হলুদ, কমলা, লাল। ব্যাস! তখনই ঠিক হয়ে যায় তারা কে কোন গ্রামে বাস করবে। এবার তাদের নিয়মমত যার যেখানে রঙ করার কথা ঠিক তেমনটিই করে চলে জীবনভর। তারপর ক্ষইতে ক্ষইতে যখন এত্তটুকুনটি হয়ে যায় তখন ক্রেয়নদের ফেরৎ পাঠানো হয় রাজামশাইয়ের সেই কারখানায়। তাদের ছাঁচে ঢেলে আবার নতুন করে গড়ে তোলে কারিগররা। রংরেজের রঙের জালায় চুবে রঙিন হয়ে ফের নিজের গ্রামে নিজের কাজে ফিরে যায়।
এই নিয়মেই দিব্যি চলছিল রংমিলান্তি রাজ্য। কিন্তু হঠাৎই একদিন তাল কাটল লাল গাঁয়েতে। এক নতুন ক্রেয়ন, লালু, রাজামশাইয়ের কারখানা থেকে এসে উপস্থিত হল সেই গাঁয়ে। গাঁয়ের প্রথামত নতুন ক্রেয়ন এলেই তাকে অভ্যর্থনা করা হয়, উৎসব হয়। তারপর গাঁয়ের মোড়ল লালপ্রতাপের বাড়ির সাদা দেওয়ালে গিয়ে নিজের নামটা লিখতে হয় নতুন সদস্যকে। গলদটা ধরা পড়ল সেখানেই। লালে লালে ভরা দেওয়ালে হঠাৎই আঁচড় পড়ল নীল রঙের। কী হল কী হল? সবাই তো আশ্চর্য। মুখে বোল ফোটে না। লালু মানে নতুন ক্রেয়নটি নিজেও অবাক। সবাই চোখ বড় বড় করে চায় তার দিকে। ওই তো লাল জামা, লাল টুপি, গায়ে লেখা ‘লাল’ তাহলে আঁচড় কী করে নীল পড়ল।
উঁহু এমনটি তো হতেই পারে না। সবাই হইহই করে উঠল,
-“ওকে আরও বেশি করে রঙ করা অভ্যেস করতে হবে! লাল রঙটা নিশ্চয়ই ওর অনেকটা ভেতর দিকে রয়ে গেছে। ক্ষইতে ক্ষইতে তবে আসল রঙ ফুটবে।”
-“একশটা গোলাপে লাল রঙ করতে হবে রোজ!”
-“শুধু লাল রঙের স্বপ্ন দেখতে হবে!”
-“লাল আপেল, লাল স্ট্রবেরির রস খেতে হবে দুইবেলা!”
-“নীল আকাশের দিকে ভুলেও তাকানো চলবে না!”
এতজনের এতরকম মত শুনে তো কানমাথা ভোঁভোঁ করতে লাগল লালুর। কী করে বেচারা এখন।
লালু ক’দিন তাই করে চলল যেমনটি সবাই বলল। গোলাপে মাথা ঘষে ঘষে তো মাথা বোঁ বোঁ করে ঘুরতে লাগল। ভয়েতে চেয়েও দেখেনা গোলাপে কী রঙ হল! শুধু লাল স্ট্রবেরি আর লাল আপেল খেয়ে খেয়ে মুখ বিস্বাদ হয়ে গেল। আকাশের দিকে পাছে চেয়ে ফেলে সেই আতঙ্কে মাথা নিচু করে থাকতে থাকতে ঘাড় কনকনিয়ে গেল। হাজার কষ্ট হলেও মনে মনে আশা নিশ্চয়ই সব ঠিক হবে এবার। ক’দিন পর মোড়লের বাড়ি ফের ডাক পড়ল। দুরুদুরু বক্ষে গিয়ে সেই দেওয়ালে যেই নাম লিখতে গেল, একই কাণ্ড ঘটল। নীল বড় বড় অক্ষরে লেখা হল ‘লালু’।
এবার তো আর অপেক্ষা করা চলে না। এমন বিপদের খবর রাজামশাইকে জানাতেই হয়। রাজামশাইকে জানানোমাত্র পেয়াদা এসে নিয়ে গেল লালুকে। কী এমন কাণ্ড হল কারখানায় যে লাল জামা পরা, লাল টুপি পরা, গায়ে লাল লেখা ক্রেয়নে নীল রঙ হয়! লালুকে পাঠানো হল রংরেজের কাছে। রংরেজ চোখে চশমা এঁটে লালুকে ডাইনে বাঁয়ে ঘুরে ফিরে দেখে। একবার এদিকে দাগ টানতে বলে, একবার ওদিকে আঁচড় কাটতে বলে। কিন্তু সব জায়গাতেই লালের বদলে নীল আঁচড় পড়ে। রংরেজ তো হতবাক। এত বছর ধরে মোমের পেন্সিলে রামধনুর রঙ লাগাচ্ছে, এমনটা তো কখনও হয়নি। তাহলে কি কারিগরদের গড়তেই কিছু ভুল হয়েছে? মোমের সঙ্গে কি মিশে গেছে অন্য কিছু!
লালুর গাঁয়ের মোড়ল এল, কারিগররা এল, এলেন খোদ রাজামশাই। সবাই মিলে বলল,
-“লালুর মাথাটাই খারাপ হয়েছে!”
-“লালুর অসুখ করেছে নির্ঘাৎ, বদ্যি ডাকো!”
-“লালুকে ফের লাল রঙের জালায় চোবানো হোক!”
-“লালুকে কেটে দেখা হোক ওর ভেতরটাও নীল নাকি লাল!”
লালু কোনওমতে বলার চেষ্টা করল,
-“আচ্ছা আমার গায়ে লাল লেখা বলেই কি আমার রঙ লাল হতে হবে? যদি আমি নীল রঙেরই হই, তাতে অসুবিধেটা কোথায়?”
সবাই তো হাঁ হাঁ করে উঠল,
-“এ আবার কেমন অনাছিস্টির কথা বাপু। রংরেজ শুরুতে যাকে যে রঙে রাঙিয়েছে, যে রঙের পোশাক কারিগর পরিয়েছে, গায়ে যে রঙ লেখা আছে, সেটা আবার বদল হয় নাকি! ওসব চলবেনা। তুমি লাল! লাল! লাল!
লাল রঙ তোমায় করতেই হবে।”
-“রংরেজ ওকে ফের লাল রঙে ডোবাও!”
আদেশ দিলেন স্বয়ং রাজামশাই।
যেমন বলা তেমনি কাজ। সবাই মিলে লালুকে ফেলে দিল গিয়ে লাল রঙের জালায়। জালা থেকে উঠলে পেয়াদা তাকে নিয়ে গিয়ে সাদা দেওয়ালে দাগ কাটতে বলল। দাগ কাটতেই সবাই দেখল লালুর গায়ের নীল রঙ আর জালার লাল রঙ মিশে বেগুনি দাগ পড়ল। শিগগির ঘষে ঘসে বেগুনি রঙ শেষ করে, রংরেজ লালুকে ফের চোবালো হলুদ রঙের জালায়। এবার নীলে আর হলুদে মিলে দাগ পড়ল সবুজ! রংরেজের মাথায় হাত। রংরেজ নানা রঙের জালায় লালুকে ডোবায় আর নতুন নতুন রঙ তৈরি হতে শুরু হয়। লালু একটু একটু করে ক্ষইতে থাকে।
অবশেষে যখন আর একটুখানি অবশিষ্ট আছে তখন লালু কোনওক্রমে চিৎকার করে,
-“এবার থামো!”
সবাই চমকে দেখে দেওয়ালের দিকে। কতরকম রঙের দাগে দাগে দেওয়ালটা ভরে উঠেছে। লালু করুণ সুরে বলে,
-“রাজামশাই কেন এত রঙের বাছবিচার? যা কিছু সুন্দর সেটাকে ভালোবাসলেই তো হয়? লাল গোলাপের বদলে নীল বা হলদে গোলাপে ক্ষতি কি? নীল আকাশে মাঝে মাঝে লাল বেগুনি কমলার রঙ ধরলে মন্দ কী? গাছের পাতা সারা বছর সবুজ না থেকে যদি মাঝেসাঝে হলুদ, কমলা, লালে বদলে যায় ভালো হয় না?”
সবাই মনে মনে ভাবল তাই তো! মন্দ কী! রাজামশাই কারিগরদের বললেন তক্ষুনি লালুকে নতুন করে ছাঁচে ফেলে গড়ে আনতে। আর এবার ও নিজেই স্থির করবে রামধনুর কোন রঙে সাজবে। ওদিকে রংরেজবুড়োও বেজায় খুশি। সে রাজামশাইকে বলে,
-“রাজামশাই আমায় আরও অনেকগুলো জালা বানিয়ে দিন তো বড় বড়। আমি রঙে রঙ মিশিয়ে নতুন রঙ বানাবো! সাতটা নয় সাতশো রঙে ভরব দুনিয়াটাকে”
তারপর?
তারপর কী হল সেটা তোমাদের চারদিকের দুনিয়াটা দেখলেই বুঝতে পারবে। আর লালু? লালু তো এখন আর লাল বা নীল নেই। তার গায়ে সাতশ রঙের মেলা। লালু তাই নিজেই নিজের নাম দিয়েছে, শ্রী ঝলমলচন্দ্র রঙবাহার।
(সমাপ্ত)
ছবি: আমি
ক্যাপ্টেন নিমো অনলাইন ক্লাসে একটি গপ্পের বই পড়েছিলেন। সেইটে আমাকে শোনাচ্ছিলেন পরে এসে। এই আইডিয়াটা সেখান থেকেই এল। ☺️

ঝুমকোতারার বন্ধুরা



#colorpencilonpaper by Sukanta Mondal
(কত্তা এঁকেচেন বলে দাবী করলেও আসলে ছানা আঁকতে দিয়েচেন তাই আঁকতে পেরেচেন কিনা! তাই ছানার দাবীতে তার নামটিও খোদাই করেছেন ছানার বাপ।)

#ঝুমকোতারার_বন্ধুরা
#সুস্মিতা_কুণ্ডু

তারপর তো ঝুমকোতারার ভারি মন আনচান করতে লাগল, একটু দূরেই সব খেলুড়েরা গোল হয়ে ‘আনি মানি জানি না’ খেলছে ঘুরে ঘুরে। ও-ই বা কতক্ষণ লুক্কে থাকে! আবার যেতেও কিন্তুকিন্তু লাগছে, যদি ওকে না নেয় দলে? ও যে সবার চে’ বড় আলাদা। সেইজন্যই বুঝি ওরা কখনও ওকে খেলতে ডাকেনা।

অনেক ভেবে শেষমেষ মনে মনে ‘আভি নেহি তো কভি নেহি’ বলে ঝুমকো এগিয়ে গেল খেলুড়েদের দিকে। ওকে দেখে সব্বাই খেলা থামিয়ে বড় বড় চোখ করে চেয়ে রইল। ঝুমকোতারা বললে,
-“হ্যাঁ গা! আমায় তোমরা খেলতে নেবে?”
কমলি ভমলি টমলি সমস্বরে বললে,
-“ত্ তুমি সত্যি সত্যিকারের আমাদের সাথে খেলবে?”
ঝুমকোতারা এট্টু ভরসা পেয়ে বলে,
-“কেন খেলবো না? তোমরা দলে নিলেই দিব্যি খেলব!”
ওরা বলে,
-“তুমি কত্ত সুন্দর! কত রঙ তোমার গায়ে! লাল নীল বেগনে সবুজ! আর আমাদের তো সেই একঘেঁয়ে কমলা! তোমার বুঝি ভারি গুমোর, এমনটা ভেবেই তো আমরা তোমায় কখনও ডাকতে সাহস পাইনি। তুমি তবে আমাদের দলের রানি হবে এসো!”

ঝুমকোতারা তো বেজায় অবাক হয়ে বলে,
-“দ্যাখো কাণ্ড! আমি ভাবি, আমি তোমাদের মত কমলা নই বলে বুঝি তোমরা আমায় দলে নাও না! আমরা সবাই কী বোকা! আজ থেকে আমরা সক্কলে তাহলে দোস্ত হ’লুম! কেউ রানি নয়, কেউ রাজা নয়, কেউ দাসী নয়, কেউ প্রজা নয়!”

তাপ্পর ঝুমকোতারা, কমলি ভমলি টমলি সব্বাই মিলে পাখনা নেড়ে সাঁতরে খেলতে শুরু করল। আমারও খুব ইচ্ছে করছিল ওদের সাথে খেলতে কিন্তু কী করব? আমি তো আর জলের তলায় থাকতে পারিনে!

ছবি: সুকান্ত

ছোটোগল্প : ছাতার মাথা


ছাতার মাথা
সুস্মিতা কুণ্ডু

ছাতাটা হাওয়ায় ভেসে ভেসে, মাটিতে গড়িয়ে গড়িয়ে লুটোপুটি খেয়ে বেড়াচ্ছিল। অবশেষে একটা  শুকনো গাছের তলায় এসে একদণ্ড জিরেন নিতে বসল। একটা আলাভোলা লোকও সেই গাছের তলায় জিরোচ্ছিল। ছাতাটা দেখে ভাবল,
-“বাহ্ রে! এটাকে বগলদাবা করি। বৃষ্টি ব্যাটাচ্ছেলে আমাকে সময়ে অসময়ে ভিজিয়ে হাপুশুটি করতে পারবে না আর।”
আলাভোলা পাগলা লোকটা ছাতাটা মাথায় দিয়ে আনন্দে নাচতে নাচতে চলল গ্রামে। গ্রামে ছিল একটা ধূর্ত লোক। তার ছিল একটা হরেক কিসিমের জিনিসের দোকান। সে শক্তপোক্ত ছাতাটা পাগলাটার মাথায় দেখে ভাবলে,
-“বাহ্ রে! একে ঠকিয়ে ছাতাটা নিয়ে নিতে পারলে বেশ শতখানেক টাকায় বেচে দেওয়া যাবে তো!”
যেমনি ভাবা তেমনি কাজ।
-“এই পাগলা! ক্যাডবেরি খাবি? তবে ছাতাখানা দে!”
আলাভোলা পাগলা তো ক্যাডবেরির লোভে ছাতাটা ধূর্ত দোকানদারকে দিয়ে দিল। তারপর দু’টো সস্তার লজেঞ্চুস নিয়ে সেগুলোকেই ক্যাডবেরি ভেবে খেতে খেতে চলে গেল। ছাতার খুব রাগ হল। ইসস! সরল লোকটাকে দুষ্টু দোকানদারটা কেমন ঠকিয়ে দিল!

এদিকে ধূর্ত দোকানদারের দোকানে এল ছোট্ট খুকি আর তার মা। ছোট্ট খুকি থাকে শহরে, তার মামার বাড়ির গ্রামে এসেছে বেড়াতে। রোদে রোদে মাঠেঘাটে ঘুরতে বড় কষ্ট হয় তাই খুকির মা দু-দু’শো টাকা দিয়ে সেই হরেক কিসিমের জিনিসের দোকান থেকে মেয়েকে ছাতাটা কিনে দিল। ছাতা তো বদমাইশ দোকানদারের হাত থেকে রেহাই পেয়ে খুব আনন্দ পেল। ছোট্ট খুকিও ছাতাকে খুব ভালোবেসে ফেলল। ছাতা নিয়ে খায়, ছাতা নিয়ে খেলে, ছাতা নিয়ে ঘুমোয়। দিন দুই বাদেই ছোট্ট খুকি ফিরে যাবে শহরে, ছাতাও সঙ্গে যাবে। ছাতার তো সে কী আনন্দ! শহর দেখবে বলে কথা! কিন্তু খুকির মা বললে,
-“ইসস এই গাঁয়ের এত বড় হ্যান্ডেলওয়ালা ছাতা কি শহরে চলে নাকি? তোকে বরং রঙবেরঙের ফোল্ডিং ছাতা কিনে দেব নিউ মার্কেট থেকে, খুকি। ওই ছাতা আর ঘাড়ে করে নিয়ে যাসনি। ওটা বরং কাউকে দিয়ে দে।”

ছোট্ট খুকি আর কী করে! মামাবাড়ির জমিজিরেত দেখাশোনা করে ভাদুকাকু। ভাদুকাকুর ছেলে হাঁদু, খুকির ভারি দোস্ত। খুকি তাকেই ছাতাটা দিয়ে দিল। হাঁদু তো নতুন ছাতা পেয়ে জব্বর খুশি। উল্টে দেখে পাল্টে দেখে, মাথায় দিয়ে দেখে। শেষমেষ বাড়িতে নিয়ে গিয়ে গোয়ালঘরের আটচালার বাঁশের বাতায় গুঁজে রেখে দিল। আর উপায়ই বা কী? হাঁদুর ওপরে আরও এক দাদা, এক দিদি আর নীচে একজোড়া ভাইবোন। সব মিলিয়ে পঞ্চপাণ্ডব, খাঁদু, হাঁদু, নাদু, ক্ষেন্তি, পান্তি। তারা যদি একবার ছাতার সন্ধান পায়, তাহলে হয়ে গেল! কিন্তু ভাইবোনদের হাত থেকে ছাতাকে বাঁচালেও শেষরক্ষে হল কই!
ছাতা বেচারা বাঁশের বাতায় গোঁজা হয়ে নিজের মন্দ কপালের কথা ভাবছিল, এমন সময় ‘কিঁইচ কিঁইচ!’
মরেছে! একটা গাবদা ছুঁচো!

ব্যাটাচ্ছেলে ছুঁচো কটরকটর করে ছাতার গায়ে দিল চাট্টি ছ্যাঁদা করে। ছাতা তো আর চিৎকার করে কাঁদতে পারে না, মুখ বুজে সহ্য করতে লাগল সব। পরের দিন সকালে হাঁদুর বাবা ভাদুকাকু গোয়ালের বুঁচু গাইকে জাবনা দিতে গিয়ে দেখল কী যেন সব কালো কালো টুকরো টুকরো গরুর ডাবায় পড়ে আছে। ওপরে তাকিয়ে দেখে একটা ছেঁড়া ছাতা। গজগজ করতে করতে ছাতাটাকে নিয়ে কোন চুলোয় ফেলে দিয়ে এলো ভাদুকাকু।

ছাতা আবার সেই  গাছের তলাতেই ফেরৎ এলো। মাটিতে পড়ে পড়ে কাঁদতে লাগল। এমন সময় সেই গাছের তলায় এলো আলাভোলা পাগলাটা। ছাতার তো ওকে দেখে খুব মজা হল। আলাভোলা নিশ্চয়ই ওকে যত্নআত্তি করবে। এদিকে ছাতাটাকে দেখে আলাভোলা ভাবলো,
-“আরেহ্! এটা সেই ছাতাটা না? কিন্তু কেমন বিতিকিচ্ছিরি দশা হয়েছে। এটা আর কোনও কাজে লাগবে না।”
আলাভোলা পাগলার এই ব্যবহারে ছাতা আরও কষ্ট পেল। আঁধারে লুকিয়ে কাঁদতে লাগলো। ছাতার কষ্ট কেউ না বুঝলেও গাছের ফুল আর মাঠের জোনাকিরা বুঝল। তারা দলে দলে ছাতাকে ঘিরে ধরল। ফুলে মোড়া, টিমটিম জোনাকআলো জ্বলা ছাতাকে তো এবার দারুণ সুন্দর দেখাতে লাগল।

আলাভোলা তখন হাত বাড়িয়ে যেই ছাতাকে কুড়োতে গেল ওমনি দমকা বাতাস এসে ছাতাকে উড়িয়ে নিয়ে গেল। অমন সুন্দর দেখতে ছাতাখানা আকাশে উড়ে যেতে লাগল। আলাভোলাও পেছন পেছন ছুটল। ছাতা উড়ল গ্রামের ওপর দিয়ে, পিছু নিল হরেক কিসিমের জিনিসের দোকানের সেই ধূর্ত মালিক। ছাতা ধরা দেয় না। ছাতা উড়ল বড়রাস্তার দিকে। শহরে যাওয়ার বাস ধরবে বলে দাঁড়িয়েছিল ছোট্ট খুকি আর তার মা। ছাতাকে দেখে বাস ফেলে ছুটল পেছন পেছন। ছাতা ধরা দিল না। একে একে ভাদুকাকু, হাঁদু, খাঁদু, নাদু, ক্ষেন্তি, পান্তি সবাই ছুটল। কিন্তু ছাতা কারোর কাছে ধরা দিলনা। ফুলে মোড়া, জোনাকজ্বলা ছাতা আপন খেয়ালে হাওয়ার দোলে ভেসেই চলল, ভেসেই চলল...

(সমাপ্ত)
ছবি: আমি 🙂

গল্প: পোলকা নাচন


পোলকা নাচন
সুস্মিতা কুণ্ডু

এক জঙ্গলে এক জাদুকরী বুড়ি থাকত। না না জাদুকরী মানে কিন্তু সে দুষ্টু ডাইনিবুড়িদের মত মোটেও ছিল না। জাদুকরী বুড়ি ভারী ভালো মানুষ ছিল। লোকজনের বিপদে আপদে সাহায্য করত, পশুপাখিদের ভালোবাসত। তবে তার একটা অদ্ভুত অভ্যাস ছিল। বুড়ি তার জাদু দিয়ে সবকিছুতে পোলকা ডট করে দিত। পোলকা ডট কী জিনিস জানো না বুঝি? তাহলে তো তোমাকে বুড়ির জঙ্গলে যেতেই হবে। 

জঙ্গলের ভেতর গিয়ে যেই দেখবে সবুজ সবুজ গাছের পাতা সব গোল্লা গোল্লা, গোল গোল নুড়িঢালা পথের ধারে লাল লাল মাশরুমে সাদা সাদা বুটি, হলুদ ফুলে বেগুনী বুটি, তখনই বুঝবে বুড়ির বাড়ি আর বেশি দূরে নয়কো। বাড়িটাও বড় মজাদার। চিমনীওয়ালা হলুদ কমলা বাড়ির গায়ে বাদামি গোলাপী গোল্লা। বাড়ির মাথায় ওড়ে আকাশী মেঘ, তার গায়েতেও বুড়ি নীল নীল গোল্লা করে দিয়েছে। 

বেশ সুখেই কাটছিল বুড়ির দিন। বুড়ির ধূসর সাদা চুল, বুড়ি গোলাপী নীল ফ্রকে পোলকা ডট এঁকে বনেই খেলে বেড়ায়, ঘুরে ঘুরে নেচে বেড়ায়। আসলে হয়েছে কী, বুড়ির বয়সের কোনও গাছপাথর না থাকলে কী হবে, মনে মনে তো বুড়ি ছোট্ট মেয়েটিই। তাই ওকে দেখতেও বাচ্চা মেয়েদের মত। 

একদিন বুড়ির বাড়িতে এল একটা ম্যাঁও বিল্লি। ম্যাঁও বিল্লির গায়ের রঙ বুড়ির চুলের মতই ধূসর, আর ঝামরি ঝুমরি। বুড়ি ভাবল, 
-‘বেশ রে বেশ! একে তবে আমি পুষ্যি করব। আয় দিকি ম্যাঁও বিল্লি তোর গায়ে চাট্টি কালো গোল্লা করে দিই জাদু করে।”
ম্যাঁও বিল্লি রেগে ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
-“ওটি হচ্ছেনেকো! আমার গায়ে ওইসব পোলকা ডট মোলকা ডট করা চলবেনেকো। তাহলে আমি এক লাফে পগার পার হয়ে যাব।”
বুড়ি বলল,
-“বটে! তবে আয় তোর পায়ে পোলকা নাচন জাদু করে দিই।”
ম্যাঁও বলে,
-“তা তুমি করতে পারো, শুধু আমায় জ্বালাতন করবেনাকো আর রোজ সকাল বিকেল দুধ ভাত আলুসেদ্ধ খেতে দেবে।”

বুড়ি হেসে বলল,
-“তাই হবে গো তাই!”
এই বলে ম্যাঁও বিল্লির পায়ে দিল পোলকা নাচন জাদু করে। বিল্লি যেখানে গিয়ে পোলকা নাচন শুরু করে লেজ দুলিয়ে বোঁ বোঁ করে ঘুরে ঘুরে ওমনি সেখানে বিল্লির পায়ের ছাপে নানা রঙের গোল্লা ফুটে ওঠে। সে ভারী মজাদার ব্যাপার। বিল্লিও খুব মজা পেল। আর সব লোক মিলে বিল্লির নতুন নাম দিল ‘পোলকা বিল্লি’।

আর আমাদের জাদুকরী বুড়িও খুব খুশি হ’ল। তার পুষ্যি বিল্লির গায়ে পোলকা ডট না থাকলে কী হবে, নামে তো পোলকা রইল। ‘আহা! বাহা! কী মজা!’ এই বলে বুড়ি আর বিল্লি হাত ধরে পোলকা নাচন শুরু করে দিল। 

(সমাপ্ত) 

গল্প : হ্যাপি ফ্রেন্ডশিপ ডে



হ্যাপি ফ্রেন্ডশিপ ডে
সুস্মিতা কুণ্ডু

তার নাম হ’ল গিয়ে পাঁচকমলি বেগনেরাণী। এমনধারা নাম কেন শুধোও যদি তবে বলব, তার গায়ের রঙটা হ’ল বেগুনের মত বেগুনী আর রয়েছে পাঁচ পাঁচটা কমলা রঙের ঝুমকো। না না কানে পরার ঝুমকো দুল নয় রে বাবা, একি মানুষের ছা নাকি? এ তো ফুল! একটা দুষ্টু মিষ্টি হাসিখুশি ফুল। পুকুরপাড়ে শনশনানি হাওয়ায় মাথা দোলায়। জলের পেটে আকাশের, মেঘের ছায়া দেখে খিলখিলিয়ে হাসে। কিন্তু সবকিছুর মধ্যেও একটা কষ্ট বড্ড মনে বাজে পাঁচকমলির। ওর দু’টো সবজে পাতা আছে, কিন্তু পা নেই। পাপড়ি আছে, ডানা নেই। চলে, ফিরে, উড়ে, এদিক সেদিক যেতে পারেনা। এদিকে পাঁচকমলির বড় সাধ এই পুকুরপাড়ের বাইরের দুনিয়াটা কেমন সেটা জানার। ও শুধু ভাবে আর দোলে, দোলে আর ভাবে। 

এমন সময় এক দিন, পাঁচকমলির দেখা হ’ল বাহারেপাখা ঝিলিমিলির সাথে। বাহারেপাখা হল গিয়ে একটা ঝটফটে ফড়ফড়ানি প্রজাপতি। চারিদিকে ওর বাহারী পাখা মেলে উড়ে বেড়ায়, খুশি ছড়ায় মুঠোমুঠো। তো হয়েছেটা কী, বাহারেপাখাকে একটা ইয়াব্বড় বাজপাখি তাড়া করেছে। সে বেচারা তো প্রাণপনে উড়তে উড়তে এসে পৌঁছল পাঁচকমলির পুকুরপাড়ে। বাহারেপাখার বিপদ দেখে পাঁচকমলি হেঁকে বলল,
-“তুমি শিগগির এসে আমার পাপড়ির ভেতর ঢুকে পড়ো, আমি তোমায় লুকিয়ে রাখব বাজপাখির থেকে।”
বাহারেপাখা তাই করল, পাঁচকমলি তার বেগনে পাপড়ি মুড়ে লুকিয়ে রাখল বাহারেপাখাকে। আর বাজপাখি তো খুঁজে খুঁজে ফিরে গেল, বোকা বনে গিয়ে। 

তখন বাহারেপাখা বেরিয়ে এসে পাঁচকমলিকে বলল,
-“থ্যাংক ইউ সোওও মাচ। তুমি আমার প্রাণ বাঁচালে, বিনিময়ে আমি কী করতে পারি বলো?”
পাঁচকমলি বলল, 
-“আমার কিছু চাইনে গো। তুমি তো বাহারি পাখা মেলে হেথা হোথা যাও। আমি তো পুকুরপাড় ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাইনে। আমাকে দেশবিদেশের গপ্পো শোনাবে?”
বাহারেপাখা তো ভারী খুশি হয়ে বলল,
-“নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই শোনাবো। আজ থেকে যে আমরা বন্ধু হলুম।”

সেই থেকে পাঁচকমলি বেগনেরাণী ফুল আর বাহারেপাখা ঝিলিমিলি প্রজাপতি হ’ল প্রাণের বন্ধু। আর তারা সক্কলকে বলল,
-“হ্যাপ্পি ফ্রেন্ডশিপ ডে”

(সমাপ্ত)

গল্প : মলুয়া আর পলুয়া




মলুয়া আর পলুয়া
সুস্মিতা কুণ্ডু

মলুয়া একটা ছোট্ট তুলতুলে ঝাপুস ঝুপুস নীলবর্ণ মেঘের ছানা। আকাশের বুকে সাঁতরে বেড়ানোই তার সারাদিনের কাজ। একদিন হয়েছে কী, আপন মনে ভেসে বেড়াতে বেড়াতে মলুয়া চলে গেল অনেক অনেক দূরে, অচেনা অজানা এক মেঘের দেশে। সেখানে সব বিশাল বিশাল কালো কালো মেঘ, ঠিক যেন দত্যি দানো, সব ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের মুখগুলো ভার, তাদের গায়ে বিকট শব্দ করে আর আলো ছিটকে বিজলী চমকাচ্ছে। মলুয়া তো সাংঘাতিক রকমের ভয় পেয়ে গেল। বাড়ি ফিরে যাওয়ার পথটুকুনও তাদের শুধোতে বুক কাঁপছে। 

বুকে সাহস এনে মলুয়া একটা ওরই মধ্যে ছোট্ট আকারের ঘন কালো মেঘকে জিজ্ঞাসা করল,
-"হ্যাঁ ভাই, আমি মলুয়া। ভুল করে আমি তোমাদের রাজ্যে এসে পড়েছি। আমার রাজ্যে ফেরার পথটা একটু বলে দাও না গো!”
সে রাগী মেঘ গম্ভীর মুখ করে বলল,
-“তোমার রাজ্য আমি কেমনি করে চিনব? যদি বলো কেমন দেখতে সে রাজ্য, তবে চেষ্টা করে দেখতে পারি।”
-“আমার রাজ্য? সে ভারী সুন্দর! লাল নীল হলুদ সবুজ কত রকমের রঙিন মেঘ সেখানে ঘুরে বেড়ায়। রামধনু ওঠে এই প্রান্ত থেকে ওই প্রান্ত অব্দি। আমরা সব খেলুড়ে সাথীরা সেই রামধনুর ওপর দিয়ে এক্কাদোক্কা খেলি। দিনের বেলা সূয্যিমামা বড় বড় মেঘের আড়ালে লুকিয়ে টুকি দিয়ে লুকোচুরি খেলে আমাদের সাথে। আর রাতের বেলা চাঁদমামার সাদা আলোয় গা ডুবিয়ে আমরা গপ্পো শুনি। তারারা সব মিটমিট করে গুনগুনিয়ে গান শোনায়...”

এই শুনে রাগী মেঘ অবাক হয়ে বলে উঠলো,
-“থামো থামো! এসব আবার হয় নাকি? আমি তো জ্ঞান হয়ে ইস্তক দেখছি এ রাজ্যে সব কালো কালো ধূসর ধূসর মেঘ। আর কোনও রঙই নেই তা ছাড়া। আর চাঁদ সূর্য তারারা কেউ আসেনা আমাদের রাজ্যে খেলা করতে, গল্প বলতে, গান শোনাতে। আমরা সবসময় তাই হয় মনখারাপ করে ঝরঝর করে কাঁদি, নয়ত রেগে গুড়গুড় শব্দ করে গর্জাই। এ তুমি কেমন রাজ্যের কথা শোনালে?”

মলুয়া বলল,
-“তাই বলি তোমাদের রাজ্য এমনধারা বেরং কেন! আরে বাপু মনে খুশি থাকলে তবে না চোখে মুখে রঙ লাগবে? শুধু যদি মুষড়ে থাকো, রেগে থাকো তবে তো ধূসরই হবে। শোনো আমি বলি কী করতে হবে, চলো দেখি একটু কুমির ডাঙ্গা খেলবে আমার সাথে। তারপর দেখো কী হয়! ও হ্যাঁ তোমার নামটা তো বললে না!”

রাগী মেঘ বলল,
-“আমার নাম ঢোলকম্বল গর্জনবালা। তোমার নাম কী?”
মলুয়া বলল,
-“ইসসস কী কঠিন নামটা তোমার। আমি তোমার নতুন নাম দিলুম পালকপাখি উড়নবালা। আর আমার নাম হ’ল গিয়ে মেঘমখমল হাসিখুশি। সবাই আমায় মলুয়া বলেই ডাকে। তুমিও তাই ডেকো। আর আমি তোমায় ডাকব পলুয়া বলে। এবার আমায় ধরো দেখি কেমন পারো! 
কুমির তোর জলকে নেমেছি!”
এই বলে ছুট লাগাল মলুয়া, আর তার পেছনে ছুটল পলুয়া। 

বেশ খানিকক্ষণ ছুটোছুটির পর, পলুয়া ধরে ফেলল মলুয়াকে, 
-“কী মজা কী মজা তোমায় ধরে ফেলেছি। এবার তুমি চোর দাও।”
বলে নাচতে লাগল পলুয়া।
মলুয়া তখন খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। 
-“সে নাহয় দেবো বাপু! তার আগে নিজের পানে একবারটি চেয়ে দেখো দিকিনি!”
পলুয়া চেয়ে দেখে এ কী ম্যাজিক! তার গায়ের কালো রঙ মুছে গিয়ে ভেতর থেকে লাল রঙ বেরিয়ে এসেছে। মলুয়া ফের হাততালি দিয়ে বলল,
-“দেখলে তো? বলেছিলাম কিনা আসল রঙ ফিরে পাবে? এবার বিশ্বেস হল? নাও এবার জোর গলায় গান ধরো দেখি আমার সাথে। তোমার রাজ্যের সকলের কান অব্দি যেন যায় সে গান!”

এই বলে মলুয়া গান ধরল, আর তার সুরে সুর মেলালো পলুয়া।

“বর্ষা বাদল গেল ঘুচে,
কালো ধূসর গেল মুছে।
আজকে হেথা রঙের মেলা,
করব শুধু গান আর খেলা।

করল জাদু মেঘ মলুয়া,
সঙ্গে জুটে মিতে পলুয়া।
মন যদি তোর থাকে খুশি
রঙ ছড়াবে রাশি রাশি।”

যতদূর গানের সুর ছড়ালো, গম্ভীর রাগী মেঘেরা সব কান খাড়া করে শুনতে লাগল। মনে একটা কেমন যেন অচেনা অজানা আনন্দ হতে লাগল তাদের। পলুয়া আর মলুয়া অবাক চোখে দেখতে লাগল, এক এক করে সব মেঘেদের গায়ে বিদ্যুৎ চমকানো বন্ধ হচ্ছে। গুরুগুরু গর্জনও আর শোনা যাচ্ছেন। মেঘেদের কালো ধূসর গায়ের রঙ ছাপিয়ে একটু একটু করে নানা লাল নীল বেগনে হলুদ সবুজ কত্ত রঙ ফুটে উঠছে। 
মলুয়া বলল,
-“বন্ধু পলুয়া, ওই দেখো। রঙ ফিরে আসছে তোমার রাজ্যে। এবার তবে আমার কাজ শেষ। ঐ দূরে দেখো রামধনু। ওটা বেয়ে চলে গেলেই আমি আমার রাজ্যে পৌঁছে যাব। তারপর সূয্যিমামা চাঁদমামা আর তারাদের খবর দেব আমার বন্ধুর রাজ্যে আসতে, খেলা করতে, গান-গল্প শোনাতে। তুমি কিন্তু গান শোনাতে থেকো তোমার রাজ্যের মেঘেদের। ওদের শিখিও কেমন করে রাগ-দুঃখ না করে আনন্দে থাকতে হয়। কেমন? আমি তবে যাই এবার বন্ধু পালকপাখি উড়নবালা?”
পলুয়া কোলাকুলি করে মলুয়াকে বলল, 
-“ভাগ্যিস তুমি পথ হারিয়ে এসেছিলে আমাদের রাজ্যে। তাই তো আমরা রঙ ফিরে পেলাম। আবার এসো কিন্তু বন্ধু মেঘমখমল হাসিখুশি!”

(সমাপ্ত)

গল্প : কল্পকথা

কল্পকথা
সুস্মিতা কুণ্ডু

পিকাই নীল সাইকেলটা, মিঠির লাল সাইকেলের পাশে রেখে ছুটেছুটে ঢুকল লাইব্রেরিতে। নির্ঘাৎ বকুনি কপালে আছে। মিঠি পিকাইয়ের বেস্ট ফ্রেণ্ড হলে কী হবে, বড্ড শাসন করে ওকে। 

বড় দরজাটার ও’পারে উঁকি মেরে দেখে, দূরের কোণের টেবলটায় দু’হাতের তালুতে থুতনি রেখে, মিঠি একটা বইয়ে ডুবে রয়েছে। চুপিচুপি এসে পিকাই একটা সাই-ফাই থ্রিলার নিয়ে, উল্টোদিকের চেয়ারে বসে পড়ে। মিঠি ওমনি কটমট করে তাকিয়ে, চেয়ারটা ঠেলে উঠে দাঁড়ায়। কাউন্টারে লাইব্রেরিকাকুর জাবদা খাতায় সই করে, বইটা নিয়ে বাইরে চলে যায়। 
-“উফফ খুব জোর রেগে গেছে পাগলিটা!”
পিকাইও অগত্যা ওর বইটা সই করে নিয়ে, ছোটে। 

বেরিয়ে দেখে, মিঠি দেবদারু গাছের তলায় সিমেন্টের বেদীতে বসে বইটা পড়ছে। পিকাই সামনে গিয়ে কানটা ধরে বলে,
-“সরি সরি সরি,
   আর হ’বে না দেরি!”
বলেই হঠাৎ হিহি করে হাসতে শুরু করে দেয়। 

-“কী হ’ল শুনি? অমন খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসছিস কেন? এক তো দেরি করে এলি। তিনদিনের মধ্যে স্কুলের বুক রিভিউ প্রজেক্টটা জমা দিতে হ’বে। আর এদিকে এখনও বই-ই বাছা হ’ল না আমাদের। তোকে পার্টনার করাটাই ভুল হয়েছে আমার!”

-“তুই ‘ঠাকুরমার ঝুলি’-র  রিভিউ করবি? ক্লাস নাইনে পড়ি আমরা, ভুলে গেলি নাকি?”

-“কেন মন্দ কী? ছোটোবেলার সেই বই নিয়েই যদি লিখি?”

-“ধুর! ওসব রাজা রাণি রাক্ষস খোক্কস পড়লে বুদ্ধি ভোঁতা হয়। এই দ্যাখ সাই-ফাই থ্রিলার! কল্পবিজ্ঞান, রহস্য... রিভিউ করলে এর ওপর করব।”

-“জানিস, আমার জাঠতুতো দিদি ফিজিক্সে পি.এইচ.ডি করছে। ওর আলমারিগুলো সবরকমের বইয়ে ঠাসা, ফ্যান্টাসিও। রূপকথা পড়লে বুদ্ধি ভোঁতা হয়নারে হাঁদা! 

-“ইউরেকা! আইডিয়া! 
আমরা এই দু’টো ধারার একটা তুলনামূলক রিভিউ প্রজেক্ট করব। চল, বাড়ি গিয়ে বসি।”

আরও খানিকটা তর্ক আলোচনা করতে করতে, নীল স্পেসশিপ আর লাল পক্ষীরাজ, রাস্তা ধরে পাশাপাশি এগিয়ে চলে। 

••সমাপ্ত••