Showing posts with label গল্প. Show all posts
Showing posts with label গল্প. Show all posts

গল্প : সাদা মৌমাছির দেশে




সাদা মৌমাছির দেশে
সুস্মিতা কুণ্ডু

এক ছিল মৌমাছিদের দেশ। দেশ মানে এই মানুষদের দেশের মত এত্ত বড় দেশ নয়। মৌমাছিদের দেশ হল গিয়ে একটা ফুলে ফুলে ভরা বাগান। সেই বাগানের বড় একটা গাছে একটা পেটমোটা মৌচাক, তার ভেতরে একটা রানি মৌমাছি, আর অনেক অনেক এমনি এমনি মৌমাছি। লাল মৌমাছি, নীল মৌমাছি, হলুদ মৌমাছি, গোলাপী মৌমাছি... আরও কতরকমের মৌমাছি। তোমরা ভাবছ বুঝি, ‘হি হি হি! কী বুদ্ধু দ্যাখো! মৌমাছি যে শুধু হলদে হয় তাও জানেনা!’
হুঁহ্, জানি বাবা জানি! সঅঅঅব জানি। কিন্তু গপ্পো বলতে গেলে ও’রকম একটু আধটু বলতে হয়। বুঝলে? তারপর বাকিটা শোনো তো দেখি মন দিয়ে।

মৌমাছির সেই দেশের রানি হলেন মৌটুসি মৌমাছি। মৌটুসি মৌমাছির আগের রানি ছিলেন ভারি অলস। তিনি কোনও নিয়মকানুন মানতেন না, দেশে তাই বড় অরাজকতা ছিল। যে রঙের মৌমাছিরা দলে ভারি তারা সব ফুলের মধু খেয়ে ফুল নষ্ট করে দিত। তার ফলে অন্য মৌমাছিরা পর্যাপ্ত পরিমাণে মধু পেত না। কিন্তু নতুন রানি মৌটুসি মৌমাছি খুব কড়া। তিনি সারা দেশে নিয়ম করলেন, যে মৌমাছির গায়ে যা রঙ, সে শুধু সেই রঙের ফুলেরই মধু খাবে। যেমন ধরো লাল মৌমাছি খাবে শুধু লাল লাল ফুলের মধু... জবা, লাল গোলাপ, লাল চন্দ্রমল্লিকা এইসব। হলুদ মৌমাছি খাবে সূর্যমুখী, গাঁদা, কলকে, এইসব ফুলের মধু। এমনধারা বন্দোবস্ত আর কী...

মৌটুসি রানির দেশে ছিল একটিমাত্র সাদা মৌমাছি। নতুন আইনকানুনে ঝগড়াঝাটি বন্ধ হয়ে সবারই বেশ সুবিধে হলেও বিপদে পড়ল সাদা মৌমাছি। সাদা ফুল ঢের ঢের হয় বটে, জুঁই, বেলি, গন্ধরাজ... কিন্তু মুশকিল হল সকাল হলেই সব সাদা ফুল শুকিয়ে যায়। তখন তাদের ভেতর থেকে আর একটুকুনও মধু পাওয়া যায় না। এদিকে মৌমাছিরা তো রাতের বেলায় ঘুটঘুট্টি আঁধারে চোখে ভালো দেখতে পায় না। উড়তে গেলে গাছের গায়ে দুমদাম ধাক্কা খায়। তাই সাদা মৌমাছি বেচারা পড়ল ফাঁপরে। মৌটুসি রানিমা খুব রাগী, তাঁর কাছে গিয়ে নালিশ করার সাহস সাদা মৌমাছির নেই। তার ওপর আবার মৌটুসি রাণিমার দেশে নিয়মকানুন বড্ড আঁটোসাঁটো। নালিশ করেও কোনও লাভ হবেনা। মনের দুঃখে সাদা মৌমাছি তার দেশ ছেড়ে লাঠির ডগায় পৌঁটলা করে তার মধু খাওয়ার বাটিটা নিয়ে রওয়ানা দিল। যে দিকে চোখ যায় চলে যাবে।

সবার চোখের আড়ালে দেশ ছেড়ে বিদায় নিল সাদা মৌমাছি। উড়তে উড়তে পৌঁছল পাশের দেশে... মানে পাশের বাগানে। সেই বাগানেও নানা রঙের মৌমাছি বোঁওওও বোঁওওও করে নানা রঙের ফুলে উড়ে বেড়াচ্ছে। সাদা মৌমাছি চোখ বড়বড় করে দেখে, নীল অপরাজিতা ফুলে লাল মৌমাছি বসেছে, লাল রঙ্গন ফুলে হলুদ মৌমাছি বসেছে, হলুদ ঝিটিফুলে বেগনে মৌমাছি বসেছে। কী কাণ্ড! এদের দেশে বুঝি কোনও নিয়মকানুন নেই? কিন্তু কেউ মারপিটও তো করছে না! সবাই হাসি খুশি মুখে নেচে নেচে গেয়ে গেয়ে মধু খেয়ে বেড়াচ্ছে। এমনকি বেশ ক’টা সাদা মৌমাছিও নানা রঙের ফুলে বসে বসে মধু খাচ্ছে। মৌটুসি রানির দেশের সাদা মৌমাছি তো এর আগে অন্য সাদা মৌমাছি দেখেনি, তাই ভারি কৌতুহল হল।

সে গিয়ে নতুন দেশের একটা সাদা মৌমাছিকে ডেকে বলল,
-“হ্যাঁ ভাই শুনছ? বলছি কী তোমাদের এই দেশটার নামটা কী গো?”
সেই সাদা মৌমাছি তখন একটা কমলা রঙের গোলাপফুলের মধু খাচ্ছিল। সে উত্তর দিল,
-“আমাদের দেশের নাম মৌপরী রানির দেশ। তুমি কে গা? তোমায় তো আগে কখনও দেখিনি এখেনে।”
-“আমি মৌটুসি রানির দেশের একমাত্র সাদা মৌমাছি। কিন্তু সে দেশে আমি ভারি বিপদে পড়েছি, তাই দেশ ছেড়ে এখানে এসেছি।”
এই বলে ফোঁৎ ফোঁৎ করে কাঁদতে লাগলো মৌটুসি রানির দেশের সাদা মৌমাছি। মৌপরী রানির দেশের সাদা মৌমাছি তাকে খানিকটা কমলা মধু দিয়ে বলল,
-“আহা! আহা! ওমনি করে কাঁদতে আছে নাকি? নাও দেখি, এই মধুটুকুন গলায় ঢেলে শান্ত হয়ে গোলাপের পাপড়িতে বোসো। তারপর সব খুলে বলো দিকি আমায়।”

অনেকদিন পর পেটপুরে মধু খেতে খেতে মৌটুসি রানির দেশের সাদা মৌমাছি সব কথা খুলে বলল তার নতুন বন্ধুকে। মৌপরী রানির দেশের সাদা মৌমাছি সব শুনেটুনে বলল,
-“এ আবার কী একুশে আইন রে বাবা! লাল মৌমাছি শুধু লাল ফুলের মধু খাবে আর নীল মৌমাছি শুধু নীল ফুলের মধু খাবে। এদিকে সাদা মৌমাছি পেটে কিল মেরে বসে থাকবে। তোমাদের মৌটুসি রানির মাথায় একদম বুদ্ধিশুদ্ধি কিছুই নেই দেখছি। আমাদের মৌপরী রানিকে কেমন মাথা খাটিয়ে নিয়ম করেছেন!”
-“ও তোমাদের দেশেও নিয়ম আছে বুঝি? আমার তো দেখে মনে হচ্ছিল কোনও নিয়ম নেই, যে যেমন খুশি রঙের ফুল থেকে মধু খাচ্ছে।”
-“আছে রে বাবা আছে! সব নিয়ম আছে। রামধনুর সাতটা রঙ হয় জানো তো? বেগনে-নীল-আশমানি-সবুজ-হলুদ-কমলা-লাল। সেই রামধনুর রঙেই আমাদের দেশের সব মৌমাছির সাতটা দিনের খাবারের হিসেব বাঁধা। যেমন ধরো, এই আজ আমি কমলা ফুলের মধু খাচ্ছি, গতকাল খেয়েছিলুম হলুদ ফুলের মধু, আগামীকাল খাবো লাল ফুলের মধু, পরশু খাবো বেগনে, তরশু খাবো নীল, নরশু খাবো আশমানী...”
-“ওরে বাবা থামো থামো বন্ধু! আমার মাথা ঘুরছে এত রঙের মধু শুনে! আমদের দেশে একটা মৌমাছির তো একই রঙের ফুলের মধু খেয়েই সারাজীবন কেটে যায়!”
-“ইসস কী বাজে নিয়ম তোমাদের দেশে বাপু! নানারকম ফুলের মধু না খেলে নানারকম সোয়াদ পাবে কীকরে শুনি? এই যে লাল ফুলের মধু কেমন বাতাসার মত মিষ্টি, হলুদ ফুলের মধু ঝোলাগুড়ের মত, কমলা ফুলের মধু নলেন গুড়ের মত, সবজে ফুলের মধু রসগোল্লার রসের মত, বেগনে ফুলের মধু মিছরির মত...”
-“ফের আমার মাথা চক্কর কাটতে শুরু করেছে বন্ধু!”
-“থাক তবে আর শুনে কাজ নেই তোমার। তোমাকে বরং মৌপরী রানিমার কাছে নিয়ে যাই চলো। উনি ভারি বুদ্ধিমতী। উনিই বরং তোমার সমস্যার একটা উপায় বাতলাবেন।”

মৌটুসি রানির দেশের সাদা মৌমাছিকে নিয়ে মৌপরী রানির দেশের সাদা মৌমাছি গেল রানি মৌপরীর কাছে। রানি মৌপরী সব শুনেটুনে বললেন,
-“মৌটুসি তো আমারই ছোটো বোন। আসলে মৌটুসি বড্ড বদরাগী কিনা তাই রাগের মাথায় হুটপাট করে কড়া কড়া নিয়ম বানায় শুধু। কিন্তু ভালো করে দেশ চালাতে হলে, সবাইকে সুখে রাখতে হলে ঠাণ্ডা মাথায়, অনেক ভাবনা চিন্তা করে কাজ করতে হয়। সবার সুবিধে অসুবিধেই মাথায় রাখতে হয়ে। মৌটুসির দেশের সাদা মৌমাছি তুমি কিচ্ছুটি ভেবোনাকো। আমি গিয়ে বোনকে সব বুঝিয়ে বলে আসব’খন। তুমি বরং ততদিন আমার দেশের ফুলের মধু খেয়ে বন্ধুদের সাথে খেলে বেড়াও।”

তারপর? তারপর আর কী?
মৌটুসি রানির দেশের সাদা মৌমাছি তার নতুন বন্ধু মৌপরী রানির দেশের সাদা মৌমাছির সাথে নানারঙের ফুলে ঘুরে ঘুরে মধু খেয়ে বেড়াতে লাগলো।
এদিকে আমারও যে বড্ড মিষ্টি খেতে ইচ্ছে করছে। যাই দেখি, মায়ের হেঁশেলে নলেন গুড়ের নরম পাকের সন্দেশ আর ক’টা আছে নাকি খুঁজে আসি। তোমরাও বরং ততক্ষণ যে যার প্রিয় মিষ্টিগুলো একবার চেখে নাও দিকিনি।

(সমাপ্ত)

গল্প : কড়াইশুঁটির কচুরী

২৫শে জানুয়ারি,২০১৯-এর ‘আনন্দবাজার স্কুলে’ প্রকাশিত

🔹🔹কড়াইশুঁটির কচুরি🔹🔹
🔹🔹সুস্মিতা কুণ্ডু🔹🔹

॥১॥

ছোটো ছোটো আঙুলগুলো দিয়ে কড়াইশুঁটির খোসাটা ছাড়াতে থাকে কুট্টুস। বিদিশা পায়েসের পাত্রে হাতাটা ঘোরাতে ঘোরাতে নজর করে ছেলেকে। উল্টোদিক দিয়ে খোসাগুলো ছাড়াচ্ছে ছেলেটা। কড়াইশুঁটি পেছনের সরু দিকটায় চাপ দিলেই শুঁটিটা দু’ভাগ হয়ে ভেতরের গোল গোল সবুজ সবুজ কড়াইগুলো বেরিয়ে আসে ঝপ করে। কিন্তু কুট্টুস নখে করে সামনের শক্ত শিরার মত দিকটা খুঁটে খুঁটে শুঁটিটা খুলছে। বিদিশা ওকে বলতে গিয়েও থেমে গেল। বেশ মজা লাগছে কচি কচি হাতের সবুজ সবুজ কড়াইশুঁটির সাথে কুস্তিটা। ফিক্ করে হাসিটা আঁচলে মুছে নিল, কুট্টুস দেখতে পেলেই ‘মা হাসছো কেন? ও মা হাসছো কেন?’ বলে অস্থির করে তুলবে। আর এখন ওর প্রশ্নের বন্যায় উত্তরের বাঁধ দিতে বসলে, হয়ে গেল পায়েস! পায়েস পুড়ে সরভাজা হয়ে যাবে। 

কত রান্না বাকি এখনও! সবে আলুর দমটা হয়েছে। এখনও ছোলার ডাল, বেগুনভাজা, চাটনি হবে। কড়াইশুঁটিগুলো বেটে, তেল মশলা দিয়ে নেড়ে পুর বানাতে হবে, তবে তো কচুরি ভাজা হবে। ভেজানো ছোলার ডালটা প্রেসার কুকারে ঢেলে ঢাকনাটা বন্ধ করে গ্যাসের ওপর বসালো বিদিশা। আঁচটা একটু জোর করে দিলো। তাড়াতাড়ি গোটাচারেক সিটি দিয়ে নিতে হবে। একটু নারকেল কুঁচোতে হবে, নারকেল দেওয়া ছোলার ডাল কুট্টুসের খুব পছন্দের। বাকি কাজগুলো মাথার ভেতর একটার পর একটা সাজিয়ে নিতে লাগলো বিদিশা। এমন সময় হাঁটুর কাছে একটা গোঁত্তা লাগল। বিদিশা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে কুট্টুস হামাগুড়ি দিয়ে মায়ের পায়ের কাছে হাতড়াচ্ছে। 
-“কী করছিস বাবু? কত কাজ পড়ে এখনও আমার! আর তুই এখন হামাগুড়ি দিচ্ছিস কেন কুট্টুসোনা?”
-“মা তুমি একটু সরো তো দেখি, একটা কড়াইশুঁটি গড়গড়িয়ে এইদিকে গড়িয়ে চলে এল। আমি একটু খুঁজে বার করি তো!”
-“ওহ্ হো! একটাই কড়াইশুঁটি তো! থাক না বাবা ওটা। তুই অন্যগুলো ততক্ষণ ছাড়া দেখি সোনা।”

॥২॥

কুট্টুস ফের কড়াইশুঁটির ডাঁইয়ের কাছে ফেরত গিয়ে, ছাড়াতে শুরু করল। বড় জামবাটিটা একটু একটু করে ভরে উঠছে কড়াইশুঁটিতে। এমন সময়ে মালতী এসে ঢুকলো রান্নাঘরে। ঢুকেই হাঁ হাঁ করে উঠল,
-“ও কী বোদিমণি তুমি এত সক্কাল সক্কাল এত রান্না করচ ক্যানো গো? কেউ আসবে নাকি গো বাড়িতে? আমায় কই কাল কিচু বললেনি? আমি তাহলে আগে আগে এসে হাত লাগাতুম। আর ও কী! কুটুবাবু তুমি কড়াই ছাড়াচ্চো ক্যানো? যাও যাও পোড়তে বোসো!  কী সব কাণ্ড! মালতী কি মরে গেছে নাকি? অ বৌদিমণি, কুটুবাবুকে যেতে বলো দিকি পড়ার ঘরে।” 
বিদিশা পায়েসটা নামিয়ে, কড়াটা চাপায় বেগুনভাজার জন্য। 
-“মালতী, তোর কুটুবাবু আজ রান্নাঘর থেকে নড়বেনা, বুঝলি!”
কুট্টুস কড়াইশুঁটি ছাড়ানো থামিয়ে, মালতীকে ঠেলতে ঠেলতে রান্নাঘর থেকে বার করে ড্রয়িংরুমের দিকে নিয়ে চলল।
-“তুমি আজ রান্নাঘরে কিছুতেই আসবেনা! 
বাবাই ও বাবাই! মাতলীপিপিকে টি.ভি.-টা চালিয়ে দাও তো। 
মাতলীপিপি তুমি সোফা থেকে নড়বে না।”

কুট্টুস ছোটোবেলা থেকেই মালতীপিসি বলতে পারে না, বলে মাতলীপিপি। ওর ঠ্যালা খেয়ে মালতী সোফার সামনে মেঝেতে হাঁটু মুড়ে বসল।
-“ও দাদাবাবু! কুটুবাবুর কী হোলো বলো দিকিনি? আমায় এই সাতসক্কালে টিভি দেকতে বস্সে দিল। কতো কাজ পড়ে রয়েচে সোমসারের! বোদিমণি একা একা কত খাটচে!”
প্রমিত হেসে বলে,
-“কুটুবাবুকে সেই জন্ম থেকে বড় করছিস এখনও চিনলিনা মালতী! একবার ওর মাথায় কিছু ঢুকলে যতক্ষণ না সেটা করছে, ও ভবী ভোলবার নয়। তুই মিছে বাধা না দিয়ে ও যা বলছে তাই কর দিকিনি। আমি বরং একবার মোড়ের মাথার মিও আমোরে থেকে ঘুরে আসছি।”
-“দাদাবাবু ওই কেক-প্যাসটির দোকানটা তো? কী আনতে হবে আমায় বলো, তুমি ছুটির দিনে কেন আবার শুদুমুদু বেরোবে? ওই বাদামী রঙের প্যাসটি আনব তো? গেল রোববার কুটুবাবুর জন্মদিনে সব্বাই চেটেপুটে কেক খেয়েচিল। বাদামী প্যাসটিগুলো চকলেট দিয়ে বানায় না গো দাদাবাবু? ওইজন্য অত্ত ভালো খেতে। তবে দাদাবাবু কুটুকে বেশি চকলেট খেতে দিউনি, দাঁতের যন্তন্না হবে, পোকা হয়ে দাঁত ক্ষইবে। আর কুটুবাবুকে একটু বোকো তো, চকলেট খেয়ে মোট্টে দাঁত মাজতে চায়নে। বোদিমণি আর আমি তো বলে বলে সারা! যদি তোমার কথা শোনে তবু!”
-“মালতী তোকে কতবার বলেছি প্যাসটি নয়, পেস্ট্রি! আর কুট্টুস তোর কথা যদি না শোনে তবে আর কারোর কথাই শুনবেনা। এখন যা তোর বৌদিমণির কাছ থেকে একটা বড় ব্যাগ এনে দে দেখি! আমি বেরোই।”

॥৩॥

রান্নাঘর থেকে বিদিশার কানে আসে ওদের গলা, মনে মনে হাসে। আজকের দিনটার প্ল্যানিং যে গত রোববার কুট্টুসের জন্মদিনের দিন রাত্রেই হয়ে গেছে, তা তো আর মালতী জানেনা। জানলে হাঁ হাঁ করে মানা করত তখনই। সেদিন জন্মদিনের উৎসব মিটতে রাত্রে মা বাবার মাঝে শুয়ে শুয়ে কুট্টুস জিজ্ঞাসা করছিল,
-“মা তোমার জন্মদিন গরমকালে হয়, আমার তখন ইস্কুল ছুটি থাকে। বাবার জন্মদিন হয় পুজোর ছুটির সময়। আচ্ছা বিল্টুদাদার জন্মদিনও পুজোর ছুটিতেই হয় তাইনা? আর সেই পুচকি বোনুটার? মনে পড়েছে, বড়দিনের দিন। আচ্ছা বাবা আমাদের মাতলীপিপির কবে জন্মদিন?”
সেই প্রশ্নের উত্তরে বিদিশা বা প্রতীম কেউই দিয়ে উঠতে পারেননি। 

পরেরদিন সকালে কুট্টুস জিজ্ঞাসা করেছিল মালতীকে,
-“ও মাতলীপিপি তোমার কবে জন্মদিন গো?”
মালতী ঘর মুছতে মুছতে প্রথমে বেখেয়ালে উত্তর দিয়েছিল,
-“অ কুটুবাবু! কালই তো তোমার হেপি বাথডেট হল! কত বন্ধু এল, প্যাসটি এল, ফেলায়েড রাইস, চিল্লি চিকেন। আর সব ভুলে গেলে?”
-“আরে না গো না! আমার না। তোমার জন্মদিন কবে?”
-“আমার? আমার আবার জন্মদিন কী গো! ওই কেলাবের ছেলেগুলো ভোটার কার্ডে কী সব তুলে দিল যেন। বর্ষাকালের দিন একটা, শাবন না ভাদরো মাসের। এদিকে ছোটোবেলায় মা জন্মমাস ধরত তখন ঠাণ্ডার দিনে। কোনটে যে ঠিক, কেজানে। বড়বাবার থানে পুজো দিয়ে মা কপালে একটা সিঁদুরের টিপ লাগ্গে দিত, ব্যাস হয়ে গেল জন্মদিন। তবে জানো কুটুবাবু, যে বছর মা মরে গেল, সে বছরই মা আমায় জন্মদিনে কড়াইশুঁটির কচুরি, নতুন আলুর দম আর নলেন গুড়ের পায়েস করে খাইয়েছিল। কার বাড়ি থেকে চেয়েচিন্তে জুটিয়েছিল কিজানি বুড়ি। বুইতে পেরেছিল মনে হয়, সেটাই শেষ বছর।”
মাতলীপিপির চোখের কোলের চিকচিকটা নজর এড়ায়নি কুট্টুসের। অনেক কথা যা বড়রা বোঝেনা, ছোটোদের মনে তা খুব সহজে গেঁথে যায়। 

তারপর থেকেই সারা হপ্তা জুড়ে কুট্টুস তার মাতলীপিপির জন্মদিনের প্রস্তুতি নিয়েছে। আগামী রোববার জন্মদিন পালন হবে। বিদিশা আর প্রতিমও কুট্টুসের প্রস্তাবে মন প্রাণ ঢেলে সাড়া দিয়েছে। কুট্টুস হওয়ার কিছুদিন পরেই যখন খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিল বিদিশা তখন এই মালতীই তো রাতের পর রাত জেগে বুকে করে মানুষ করেছে কুট্টুসকে। আজ যেটা কুট্টুস ভেবেছে সেটা প্রতিমদেরই ভাবার কথা ছিল। কিন্তু নিয়মের মাইনের বাইরে পুজোর শাড়ি আর বোনাস ছাড়া কীই ভেবে উঠতে পারে বড়রা! 

॥৪॥

সামনে টিভি চললেও মালতীর মনে অন্য চিন্তাগুলো ঘুরপাক খেতে থাকে। বোদিমণি যে কী করছে রান্নাঘরে তখন থেকে, মালতীকে ঢুকতেও দেয়নি। দাদাবাবুও দোকান যেতে দিল না। মনটা কেমন লাগছে, মালতী কিছু কাজে ভুল করেনি তো? ওকে ছাড়িয়ে দেবে না তো? কাজ হয়ত অন্য বাড়িতে পেয়ে যাবে কিন্তু কুটুবাবুকে না দেখে কীকরে থাকবে মালতী! চোখদুটোয় জল ভরে আসে মালতীর।  

-“অ্যাই মালতী এই কাপড়টা ধর আর ও’ঘরে গিয়ে বদলে আয় দিকি। সকালে চান করে এসেছিস মনে হচ্ছে তো, চুল ভিজে এখনও। আর তাহলে চানের দরকার নেই, নতুন কাপড়টা পরে ঠাকুরঘরে একটা প্রণাম ঠুকে আয়।”
মালতী টিভি থেকে চোখ সরিয়ে, অবাক হয়ে বিদিশার বাড়িয়ে ধরা হাতের হলুদ তাঁতের শাড়িটার দিকে তাকায়। 
-“অ বোদিমণি! এসব কী গো? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছিনে গো!”
প্রমিত বেশ খানিকক্ষণ আগেই দোকান থেকে ঘুরে এসেছেন। বললেন,
-“তোমার আর বুঝে কাজ নেই! যা বলছে বৌদি তাই করো।”

কাপড় বদলে, ঠাকুরঘরে প্রণাম সেরে এসে মালতি দেখে ডাইনিং টেবলের ওপর একটা বাদামী চকলেট কেক সাজানো। তাতে গোঁজা একটা মোমবাতি জ্বলছে। পাশে কাঁসার থালা বাটিতে ফুলকো ফুলকো কড়াইশুঁটির কচুরী, নতুন আলুর দম আর সোনারঙের নলেন গুড়ের পায়েস। 
একগাল হেসে হাততালি দিয়ে তার আদরের কুটুবাবু গাইছে,
-“হ্যাপ্পি বার্থ ডে টু ইউ, হ্যাপ্পি বার্থ ডে টু ইউ, হ্যাপ্পি বার্থ ডে ডিয়ার মাতলীপিপি, হ্যাপ্পি বার্থ ডে টু ইউ!”
দাদাবাবু আর বোদিমণিও হাততালি দিচ্ছে। 
মালতীর চোখটা যে কেন আবার ঝাপসা হয়ে আসে! 

(সমাপ্ত)

গল্প : বাঁদরনাচ

বাঁদরনাচ
সুস্মিতা কুণ্ডু

ডাউন মেচেদা-হাওড়া লোকাল প্লাটফর্মে এসে দাঁড়াতেই হুড়মুড় করে ভেণ্ডার কামরা থেকে তিন চারটে পোঁটলা পুঁটলি সহ আলুথালু চেহারার একটা লোক নামল। নামল না বলে ধাক্কা মেরে নামানো হ’ল বলাই ভালো। আরও দু’চারটে লোক গুটি গুটি করে প্রায় সবক’টা কামরা থেকেই নামল। ভর দুপুরে প্লাটফর্ম আর ট্রেন দুটোই প্রায় ফাঁকা। আপিসটাইমের দৌড় ঘন্টা তিন চারেক আগেই শেষ হয়ে গেছে, ফের শুরু হবে আবার বিকেল পাঁচটা থেকে উল্টোদিকের ‘আপ’ গাড়িগুলো যাওয়ার প্লাটফর্মে।

হুড়মুড়িয়ে নামা লোকটা আস্তে আস্তে ধুলো ঝেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে হাতের পোঁটলাগুলো সব রাখল সিমেন্টের লাল লম্বা বেঞ্চটায়। আকাশী আর সাদায় চেক-কাটা একটা লুঙ্গি আর লাল রঙের নামী কোম্পানির লোগো দেওয়া একটা রংচটা ববলিং ওঠা গেঞ্জি। গালে খিমচি কেটে ধরা যাবে এমন নুন-মরিচ দাড়ি, উস্কোখুস্কো চুল মাথায়। লোকটা বেঞ্চের ওপর বসতেই একটা বাদামী আর গোলাপী ফুলকাটা ছিটের কাপড়ের পোঁটলা লাফিয়ে লোকটার ঘাড়ে উঠে পড়ল। তাই দেখে, সামনের চায়ের দোকানের ঝাঁপ বন্ধ করতে থাকা বাচ্ছা ছেলেটার হাত থেকে জংধরা তালাটা ঠং করে কংক্রিটের প্লাটফর্মে পড়ে গেল। আরও এদিক ওদিকের লোকজন বিস্ময়ে চেয়ে রইল লোকটার দিকে।

এ রামোঃ! পুঁটলি কোথায়? এ তো একটা বাঁদর! ওই তো, আরেকটা বাদামীর ওপর হলুদ চকরাবকরা পুঁটলিও নড়ছে।
দুটো বাঁদর, মানে একটা বাঁদর আর আরেকটা বাঁদরী। অন্তত ওদের বেশভূষা তাই বলছে। একটার পরনে গোলাপী ফুল ফুল ফ্রক, গলায় সস্তা পুঁতির মালা। অন্যটার অঙ্গে বছর তিনেকের কোনও বাচ্ছার হলুদ রঙের পুরনো শার্ট, আর একহাতে একটা প্লাস্টিকের সবুজ খেলনা ঘড়ি। লোকটা তার মানে বাঁদরের খেলা দেখায়। বাঁদরগুলো বড় বাধ্য, চেন বা দড়ি কিছু দিয়েই আটকানো নেই তবুও ওদের মালিকের পাশ ছেড়ে নড়ছেনা। শুধু দুটোতেই লোকটার ঘাড়ে উঠে বসে জুল জুল করে চায়ের দোকানের সামনের নোংরা ঝুড়িতে পড়ে থাকা বাপুজী কেকের মোড়কগুলোকে দেখছে।

-“কা রে জাকি বিটিয়া? কা রে শরফ? ভুক লাগি কা? রুক যা বিটুয়া তনিক। তোহ্ কা হাম লাড্ডু খিলাইবে, নাহি নাহি! কেকওয়া খিলাইবে।” কোলে নামিয়ে নিয়ে পোষ্য দুটোকে আপন মনে বলতে থাকে লোকটা, গায়ের বাদামী লোমে বিলি কাটতে কাটতে। অনেকদিন আগে একটা সিনেমা দেখেছিল বিনি টিকিটে হলে ঢুকে। একটা ভারী প্রভুভক্ত কুকুরের গল্প, ‘তেরি মেহেরবানিয়া’। তারপর কী কান্না কেঁদেছিল ওর পোষা ছোট্ট চুন্নু আর মুন্নুকে জড়িয়ে। নায়কটাকে খুব মনে ধরেছিল, তাই ওদের নাম বদলে সেদিনই রেখেছিল ‘জাকি’ আর ‘শরফ’। খেলা দেখাতে গিয়ে কেউ মজা করলে বলে, “নাম মে কা হ্যায় বাবুজী? যো আচ্ছা লাগা উসি নাম সে পুকারিয়ে, হামার জাকি অউর শরফ বদলেঙ্গে থোড়ে হি!”

“হোয়াটস্ ইন আ নেম” শেক্সপীয়র সাহেব, “হোয়াটস ইন আ নেম”। তোমার বাক্যি এতটা গভীরে ক’জন বোঝে গো।

পাশের সিমেন্টের বেঞ্চে আরেকটি পরিপাটি পরিবার ততক্ষণে এসে বসেছে, পরের ট্রেনের অপেক্ষায়। বিরক্তমুখের গম্ভীর বাবা, সম্ভবত আগের ট্রেনটি টার্গেট করেও মিস করার কারণেই, বারবার ঘড়ি দেখছেন। মা’টি গরমেও ভারী একটা জমকালো শাড়ি পরে গলদঘর্ম, সেইসাথে উটকো সোনার আভরণের উৎপাত তো আছেই। বছর ছয়েকের মেয়েটা ভারী মিষ্টি, পুটুর পুটুর করে একবার চায়ের দোকানের কাপ ডিশ ধোয়ার বাচ্ছা ছেলেটাকে দেখছে, আবার কখনও ‘জাকি’ আর ‘শরফ’ কে দেখছে। ভারী গম্ভীর সেই বাবাটি খানিকটা দূরে প্লাটফর্মের নাম লেখা গোল মত লোহার প্লেটটার নিচে লাগানো টাইমটেবিলটার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলেন।

এদিকে গুটি গুটি পায়ে চায়ের দোকানের ঝাঁপ ফেলে ছেলেটি এসে দাঁড়িয়েছে বাঁদরের মালিকের সামনে।
-“ইকটু বাঁদরলাচ দিখাবেনি চাচা?”
-“বাবুয়া ইকজনের জন্য খিলা দিখাব? লস হো যায়গা বেওসার”
-“আরে ফিরি-তে দেখবনি গো চাচা, এই কেক টা দিব তোমার বাঁদরগুলোকে।”

কী মনে করে হেসে ওঠে লোকটা, তারপর সামনে একটা প্লাস্টিক পাততে শুরু করে, বাঁদুর দুটোকে ওটায় নামিয়ে ঝোলা থেকে একটা ডুগডুগি বাজিয়ে শুরু করে...
-“তেরি মেহেরবানিয়া জনাব... আসুন আসুন খিলা দেখুন হিরো অউর হিরোইনের...জাকি শরফ... “
মণিবের আদেশমত নানা খেলা শুরু করে দুই পোষ্য। অপার বিস্ময়ে দেখে হাফপ্যান্ট পরা বছর আষ্টেকের আরেকটা খেটে খাওয়া মানুষ। খেলার মাঝে হাত বাড়িয়ে কেকটা দেয়, জাকি লাফিয়ে এসে কেকটা নেয় ছোট্ট কড়া পড়া মুঠোটা থেকে।

আরও একজোড়া কাজল পরা চোখও কিন্তু তার দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছে এদিকেই। তার মা ব্যস্ত ফোনে,
-“হ্যাঁ হ্যাঁ... ভেবোনা... বিকেলের আগেই পৌঁছব... লগ্ন তো সন্ধেয়... পার্লারের লোক এসে গেছে? আমার চুলটা কিন্তু...”
গোধূলী লগ্নে বিয়ে মনে হয়।

মায়ের অন্যমনষ্ক থাকার সুযোগে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসে কমলা ফ্রক। তন্ময় হয়ে হাফপ্যান্টওয়ালার পাশে দাঁড়িয়ে দেখে। এমন সময় একটা গ্যালপিং মেদিনীপুর লোকাল তীব্র হর্ণ বাজিয়ে গাঁক গাঁক তেড়ে আসে প্লাটফর্মের পাশে, ‘ডাউন’ লাইন ধরে। আওয়াজে চমকে গিয়ে ‘জাকি’ লাফ মেরে দেয় সামনের কমলা ফ্রকের গায়ে। ভয়ে চেঁচিয়ে ওঠে শিশুটি। ইতিমধ্যে টাইমটেবল দেখে তার বাবা এসে গেছে সামনাসামনি। তড়িঘড়ি ছুটে এসে মেয়ের গায়ের ওপর থেকে বাঁদরটাকে তুলে ধরে ছুঁড়ে দেয় অসম্ভব রাগে, প্লাটফর্মের অপরদিকের এক্সপ্রেস ট্রেন যাওয়ার লাইনটায়। প্লাটফর্মের কোনে মাথা ঠুকে নিচের লাইনে পড়ে জাকি। টাইমটেবলের লোকাল ট্রেনের লিস্টের বাইরের একটা দূরপাল্লার নীল দৈত্য ঝমঝম করে তখনই ছুটে চলে যায় ওর ওপর দিয়ে....

দোকানের ছেলেটি আকূল হয়ে দৌড়ে যায়। থ্রু এক্সপ্রেস ট্রেনটার পেরোনোর মিনিটখানেক সময়টুকু অনন্ত লাগে। মেয়েটি আরেকবার চিৎকার করে মুখ লুকোয় দু’হাতের চেটোয়। লোক জমা হয়ে গেছে ততক্ষণে। ছেলেটি এক লাফে লাইনে নেমে খানিকটা এগিয়ে যায়। দুচোখে জল নিয়ে তুলে আনে  গোলাপী বাদামী একটা ছিন্নভিন্ন দলাপাকানো শরীর...

স্তম্ভিত সকলে, ফোন রেখে মা ছুটে এসে কোলে তুলে নেয় মেয়েকে, চোখে তীব্র ঘৃণার দৃষ্টি স্বামীর দিকে। বাকি জনা কয়েক মানুষেরও চোখেও ভৎর্সনা। শুধু ‘জাকি’-র মালিকেরই চোখটা বোজা। কাঠের মত স্থির হয়ে গেছে তখনই, যখন জাকি-কে ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছিল মাঝের লাইনের ট্রেনটার সামনে।
প্লাটফর্মের দুদিকের লাইন দিয়ে দুটো ট্রেনের সবেগে ছুটে যাওয়া, তীব্র আওয়াজ, ঘটনার আকস্মিকতা, কিছুই টলাতে পারেনি আরেকটি ছোটো প্রাণীকে তার পারফর্মেন্স থেকে। “দ্য শো মাষ্ট গো অন”। ময়লা প্লাস্টিকটার ওপর দু’হাত অঞ্জলি করে দাঁড়িয়ে আছে ‘শরফ’, খেলা শেষের অভ্যাসের প্রাপ্যর আশায় বুঝি। চোখ খুলে অদ্ভুত দৃষ্টিতে সামনের ভদ্রলোকটির দিকে তাকিয়ে ‘জাকি’ আর ‘শরফ’-এর মালিক বলে ওঠে,
-“বাবুজী, খিলা দিখায়া, মেহেরবানি করকে কুছ...”

(সমাপ্ত)
(এখন কবিতার কাগজে প্রকাশিত)

গল্প: সবুজব্যাঙ আর চাঁদবাড়ি



সবুজব্যাঙ আর চাঁদবাড়ি
সুস্মিতা কুণ্ডু

-“তারপর তো সেদিন ভারী বৃষ্টি এলো। ঠানদিদির সব বিউলিডালের বড়িগুনো ছাদে কুলোয় পড়ে পড়ে ভিজে গেল। রাঙাপিসি তিনটে রঙবেরঙের ছাপা শাড়ি শুকোতে দিয়েছিল লাল রঙের নাইলনের দড়িতে। সব হাপুশুটি খেয়ে চান করে গেল। বলাই আর জগাই সুতোতে মাঞ্জা দেবে বলে বাগানের এমাথা থেকে ওমাথায় কাঠের খুঁটোয় সুতো বেঁধেছিল। সেগুনোও রক্ষে পেলুনি। বিন্তি ওর নতুন লাল মলাট দেওয়া ইতিহাস বইটা নিয়ে দুলে দুলে পড়া মুখস্থ করছিল। ঝমঝমিয়ে জল পড়ে বইয়ের পাতার রাজাগজাদের সব সর্দি লেগে গেল।”

এই অব্দি শুনে সবুজব্যাঙ গ্যাঙর গ্যাং করে বলল,
-“দাঁড়াও দাঁড়াও! কী সব যে বলো তুমি! বইয়ের ভেতরের রাজারানীদের আবার সর্দি হয় বুঝি?”

এই শুনে তো হলুদপাখি রেগে গিয়ে ক্যাঁচরম্যাঁচর করে বলল,
-“তবে কি আমি মিছে কথা কইচি তোমায়? অমন বললে আর শোনাবোই না তোমায় চাঁদবাড়ির গল্প!”

সবুজব্যাঙ তো ভারী দুঃখ পেয়ে তক্ষুনি সাধল,
-“না না মিতে! অমন বোলোনা। আমার ভুল হয়েছে! আমায় মাফ করে দাও এইবেলা! আর গপ্পো শোনাও লক্ষ্মীটি”

সবুজব্যাঙের চিরকালের ঠাঁই ওই চাঁদবাড়ির পেছনের এঁদো ডোবায়। ডোবার চারধারে এমন গাছপালা ঝোপঝাড় যে গোলবাড়ি থেকে হাসিকান্নার আওয়াজ উড়ে আসলেও, নজর যায়না বনবাদাড় পেরিয়ে। তার ওপর ওই বাদাড়ে আছে কালোকুলো সড়সড়ে সাপের ঘাঁটি। একবার যদি সবুজব্যাঙকে নাগালে পায় তাহলে ‘গ্যাঙর গ্যাং’ বলার আগেই টপাৎ করে গিলে নেবে। এদিকে বাঁশঝাড়ের ফাঁক দিয়ে ব্যাঙ দেখতে পায় ঐ বাড়ির মাথার ওপর দিয়েই রোজ চাঁদ ওঠে। সবুজব্যাঙের খুব ইচ্ছে ওই চাঁদবাড়িতে বসত করার। কিন্তু তা তো আর হয়না বেচারার তাই হলুদপাখির মুখে চাঁদবাড়ির গল্প শুনেই খুশি থাকে। 

হলুদপাখি সবুজব্যাঙের ভারী কাছের দোস্ত কিনা। সবুজ ব্যাঙের রঙীন ছাতুর তলায় দুই মিতায় থাকে। হলুদপাখি রাজ্য টহল দিয়ে এসে সেইসব গল্প শোনায় সবুজব্যাঙকে। আর সবুজব্যাঙ পোকাটা মাকড়টা ধরে কচুপাতায় চাপা দিয়ে রাখে। দু’জন মিলে সন্ধে নামলে ডিনার করে ছাতুর তলায় ঘুম দেয়। সবুজব্যাঙ নাক ডাকে ‘ঘোঁওওও ঘোঁৎ’ হলুদপাখি নাক ডাকে ‘সুঁইইই ফুৎ’। সবুজব্যাঙ স্বপ্ন দেখে সে চাঁদবাড়ির মাথায় উঠে বসে আছে। চাঁদটা হাতের কত কাছে। আকাশ থেকে চাঁদটা পেড়ে নিয়ে সবুজব্যাঙ পিঠে করে নিয়ে ইয়াব্বড়ো লাফ মারে। এসে পড়ে এঁদো ডোবার ধারে। তারপর চাঁদটাকে টাঙিয়ে দেয় তার রঙীন ছাতুর ভেতরে। কেমন সুন্দর সাদা আলোয় ভরে গেছে ছাতুর তলাটা। ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে হাত পা ছুঁড়ে আনন্দে নাচে সবুজব্যাঙ। 

এদিকে গোঁত্তা খেয়ে ঘুম ভেঙে যায় হলুদপাখির। কী জ্বালাতন! এই চাঁদপাগল সবুজব্যাঙকে নিয়ে এবার কী করে হলুদপাখি? নাহ্ আজই বিন্তির কাছে গিয়ে সব বলতে হবে। বিন্তির ভারী বুদ্ধি, ক্লাসে ফার্স্ট হয় বলে কথা। ও নির্ঘাৎ একটা সমাধান করে দেবে। 

বিকেলবেলায় বিন্তি ছাদে এক্কাদোক্কা খেলে। সেই সুযোগে হলুদপাখি উড়ে গিয়ে বসলো ছাদের টবে লাগানো নয়নতারা ফুলের গাছের ডালে। তারপর শুরু হ’ল গুরুগম্ভীর আলোচনা! 
-“কিচির মিচির চিকি মিকি”
-“তাই বুঝি? সবুজব্যাঙের এত্তো মন খারাপ?”
-“টিঁ টিঁ টুঁ টুঁ”
-“হুমমম! আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে হলুদপাখি। তুমি এখানে অপেক্ষা করো, আমি এক্ষুনি আসছি।”

এই বলে বিন্তি ছুট্টে গেল বলাই আর জগাইয়ের কাছে। ওদের একটা মজার খেলনা আছে। সাদা গোল বলের মত দেখতে। তার গায়ে একটা ছোটো কালো কাঁচ আটকানো আছে। সারাদিন যদি বলটাকে রোদ্দুরে রেখে দাও তাহলে ওই কালো কাঁচটা সূর্যের আলো শুষে জমা করে রাখে আর রাত হলে পরেই সেই জমা রোদ্দুর দিয়ে সাদা বলটা জ্বলজ্বল করে ঠিক আকাশের চাঁদের মত। বিন্তি ওদের কাছ থেকে খেলনাটা চেয়ে নিয়ে দৌড়ে ছাদে এসে হলুদপাখিকে দিয়ে বলল,
-“এই নাও হলুদপাখি। এটা সবুজব্যাঙের ছাতার নিচে রেখে দিও। রোজ সকালে রোদ্দুরে দেবে তাহলেই দেখবে রাত্রে কেমন চাঁদের মতো জ্বলজ্বল করবে। সবুজব্যাঙের তাহলে আর মন খারাপ করবে না।”
হলুদপাখি তো ভারী খুশি হয়ে একশবার ‘থ্যাংক ইউ থ্যাংক ইউ’ বলে, মুখে বলটা ঝুলিয়ে নিয়ে উড়ে গেলো। 

সবুজব্যাঙ তো এই উপহার পেয়ে আহ্লাদে আটখানা। দিনের বেলায় সাদা বলকে রোদ্দুর দেয় আর রাতের বেলায় ছাতার ভেতর আঁকশিতে ঝুলিয়ে দেয়। ছোট্ট চাঁদের আলোয় ওদের দুই মিতের ছাতুর ঘর ভেসে যায়। চাঁদবাড়িতে না যেতে পারলেও হলুদপাখি, বিন্তি আর বলাই-জগাইদের ভালোবাসায় ওর রঙীন ছাতুই এখন চাঁদবাড়ি হয়ে গেছে যে! 

(সমাপ্ত) 

গল্প: সবুজব্যাঙের রঙীন ছাতু


সবুজব্যাঙের রঙীন ছাতু
সুস্মিতা কুণ্ডু

সবুজব্যাঙের একটা ভারী সুন্দর রঙবেরঙা ছাতা ছিল। সবুজব্যাঙ ভালোবেসে ছাতাটার নাম দিয়েছিল ছাতু। ছাতুকে সবুজব্যাঙ খুব ভালোবাসত, সবসময় কাছে কাছে রাখত, পাহারা দিত, ধুয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে শুকিয়ে রাখত, কচুপাতা দিয়ে ঢেকে রাখত। গন্ধরাজফুলের গন্ধ মাখিয়ে দিত ছাতুর গায়ে। কতরকম রঙ ছাতুর গায়ে! লাল নীল বেগনে সবুজ হলদে কমলা! সবুজব্যাঙ তো দু’চোখ ভরে দেখে, আর গান ধরে,
-“গ্যাঙর গ্যাঙর গ্যাং
    আমি সবুজ ব্যাঙ,
    আমার রঙবেরঙা ছাতা
    ধিতাং ধিতাং ধিতা!”

কক্ষণও ছাতুকে চোখের আড়াল করেনা সবুজব্যাঙ। কবে থেকে যে ছাতু ওর কাছে আছে, কীকরেই বা ও ছাতুকে পেল কেউ জানেনা। কিন্তু যেখানেই দেখবে রঙবেরঙা ছাতু সেখানেই জানবে তার তলায় রয়েছে সবুজব্যাঙ। 

একদিন হয়েছে কী, আকাশে সূয্যিমামা উঠেছে। বেজায় রোদের তাপ। সবুজব্যাঙের খুব গরম লেগেছে। সবুজব্যাঙ একটা বড় পদ্মপাতা ডোবার জলে ভাসিয়ে তাতে চেপে, চোখে কুড়িয়ে পাওয়া প্লাস্টিকের সানগ্লাস পরে, ছাতুকে মাথায় দিয়ে এঁদো ডোবার জলে জিরিয়ে নিতে গেল। হোগলার ডাঁটি দিয়ে স্ট্র বানিয়ে মাঝে মাঝে চুমুক দিয়ে ডাবের খোলা থেকে মধুমেশানো জল খেতে লাগলো সুড়ুৎ সুড়ুৎ করে। 

দূর আকাশ থেকে সূয্যিমামা দেখতে পেলো সবুজব্যাঙের রঙবেরঙা ছাতু। সে বললে,
-“এ্যাই সবুজব্যাঙ! তোর ছাতাখানা আমার চাই!”
সবুজব্যাঙও জিভ উল্টে বললে,
-“কী আবদার! চাই বললেই মেলে নাকি? ও আমার ছাতা, আমি তোমায় কেন দেব শুনি?”
সূয্যিমামা রেগে গুরুগম্ভীর গলায় বললে,
-“তবে রে! দাঁড়া মজা দেখাচ্ছি!”
তারপর তো সূয্যিমামা দিলো রোদের তাপ বাড়িয়ে। কী তেজ! কী তাপ! এঁদো ডোবার সব জল চোঁচোঁ করে শুকিয়ে যেতে লাগল। কিন্তু সবুজব্যাঙের তাতে কচুটা! সে তার ছাতুর আড়ালে বসে বসে তালপাতার পাখায় করে দিব্যি বাতাস খেতে লাগল। ওদিকে তাপ বাড়াতে বাড়াতে সূয্যিমামার নিজেরই ঘাম বেরিয়ে কাহিল অবস্থা। শেষমেষ হাল ছেড়ে দিয়ে সূয্যিমামা বললে,
-“চাই না আমার তোর অমন পচা ছাতা!”

সূয্যিমামা তো চলে গেল আকাশপথে পশ্চিমদিকে। এমন সময় ডোবার ওপর দিয়ে যাচ্ছিল কালোকুলো বাদলমেঘ। বাদলমেঘেরও ছাতুকে দেখে ভারী লোভ হল। সে ভাবলে আমার তো কোনও রঙই নেই, যদি ঐ রঙবেরঙা ছাতাটা আমি মাথায় দিই নাজানি কত সুন্দর দেখতে লাগবে আমায়। এই বলে সে হাঁক পাড়ল,
-“এইয়ো সবুজ ব্যাঙ! শিগগির তোর ছাতাখানা আমায় দে!”
সবুজব্যাঙ ভেংচি কেটে বললে, 
-“ইল্লি নাকি? আমার ছাতু, আমি তোমায় কেন দেব হে বাপু? ভাগো হিঁয়াসে!”
এই শুনে বাদলমেঘ তো রেগে গুমগুম গর্জায় চমচম ঝলকায় আর ঝমঝম বর্ষায়। এঁদো ডোবা বৃষ্টির জলে উপচে গেল। কিন্তু সবুজব্যাঙও কী কম বুদ্ধি ধরে! সে করলে কী, ছাতুকে উল্টো করে ডিঙিনৌকার মত ভাসিয়ে তাইতে চেপে, পদ্মনাল দিয়ে দাঁড় বাইতে আর গান গাইতে লাগল। বাদলমেঘের তো জল ঝরিয়ে সব জল শেষ। গর্জে গলায় ব্যথা, ঝলকে চোখে ধাঁধা লেগে গেল। সে তো নাস্তানাবুদ হয়ে গড় ঠুকে বলল,
-“হার মানলুম সবুজব্যাঙ! তোর ছাতাতে আর নজর দেবনা বাপু।”

সবুজব্যাঙ তো মহানন্দে নেচে নেচে ঘুরে ঘুরে গান ধরতে যাবে এমন সময় একটা কান্নার আওয়াজ কানে এল। 
-“কে কাঁদে?”
একটা হলুদমাথা বাদামী গা পাখি ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে বললে,
-“আমার পোড়াকপাল তাই আমি কাঁদি গো! ঝড় বৃষ্টিতে আমাক বাসা ভেঙে গেছে। আমি এবার কোথায় যাই কী করি!”
সবুজব্যাঙ তো এই শুনে খুব কষ্ট পেল। সে বললে,
-“আহা গো! তুমি কিচ্ছু ভেবোনা! এই দ্যাখো, আমার কেমন রঙবেরঙা ছাতু আছে, ইয়াব্বড়। এর তলায় আমাদের দুই বন্ধুর দিব্যি দিন কেটে যাবে।”
হলুদমাথা বাদামী গা পাখি চোখের জল পালকে মুছে বলল, 
-“কিন্তু আমার তো কিছু নেই? আমি ভাড়া দেব কী করে?”
সবুজব্যাঙ হেসে বললে,
-“সূয্যিমামা, বাদলমেঘ ওরা আমার ছাতুকে কেড়ে নিতে চেয়েছিল, তাই আমি ওদের দিইনি। কিন্তু তুমি আমার বন্ধু, বিপদে পড়েছো। তাই তোমায় আমি বিনিভাড়াতেই থাকতে দেব আমার রঙবেরঙা ছাতুতে। তুমি বরং রোজ আমায় মিষ্টি গান শুনিও তাহলেই আমি খুশি!”

এই শুনে তো হলুদমাথা বাদামী গা পাখির আনন্দ আর বাঁধ মানেনা। সে মধুর সুরে গাইতে লাগল,
-“সূয্যিমামা, বাদলমেঘ
   কোরোনাকো মান,
   হিংসে নয় ভালোবাসাই
   বন্ধুত্বের দান। 

   মিলেমিশে থাকব সবাই
   রঙীন ছাতুর তলে,
   আজকে থেকে আমরা সবাই
   সবুজব্যাঙের দলে”

(সমাপ্ত)

গল্প : মৌবাবু



মৌবাবু
সুস্মিতা কুণ্ডু


॥১॥

-“মা মা মা! বলো না, আজ কী আঁকবে?”
মায়ের গলাটা ছোট্ট ছোট্ট হাতদুটো দিয়ে জড়িয়ে পিঠের ওপর দোল খেতে খেতে জিজ্ঞাসা করেন নিমোবাবু। 
মা তখন সবে সারা ঘর গুছিয়ে, জামাকাপড় ভাঁজ করে এসে খাটে বসেছেন নিমোবাবুকে ঘুম পাড়াতে। বাবুমশাইকে ঘুম পাড়িয়ে মা নিজেও একটু নিদ্রাদেবীর চরণে নিজেকে সঁপে দেবেন এই আশায় রয়েছেন। কিন্তু সে হওয়ার জো থাকলে তো! 
নিমোবাবুর বায়নায় অপটু হাতে রঙ তুলি পেন্সিল নিয়ে বসলেন মা। যে মা নাকি নিজের ছোটোবেলাতেও জীবনবিজ্ঞানের খাতায় ছবি আঁকতে গিয়ে একশবার পেন্সিলের শীষ ভাঙত, ইরেজার চেবাতো, সেই মা-ই এখন নিমোবাবুর ফেভরিট আঁকিয়ে! 

মায়ে-পোয়ে আগে বেশ খানিকক্ষণ জব্বর আলোচনা চললো কী আঁকা হবে তাই নিয়ে। মা বলে গাছ তো ছেলে বলে বাড়ি, মা বলে হাতি তো ছেলে বলে বাঘ! আসলে মা সেই ছবিগুলোই আঁকতে চান যেগুলো বেশ সহজ সহজ আর ঝপ করে একটা দু’টো রঙ ঘষলেই কাজ সারা হয়ে যাবে। কিন্তু বললেই তো আর হবে না! যতক্ষণ না নিমোবাবু মত দিচ্ছেন ততক্ষণ সাপ ব্যাঙ যা খুশি এঁকে দিলে মোটেও চলবেনা। তো শেষমেষ ঠিক হ’ল মা মৌমাছি আঁকবেন! যদিও নিমোবাবু বলেছিলেন ‘বাম্বল-বি’ আঁকতে, তবে মা আবার মৌমাছিই বেশি ভালোবাসেন কিনা। আর তাছাড়া দু’টোর মধ্যে পার্থক্যই বা কী বলো? একজন বাংলায় ‘বোঁওওও বোঁওওও’ করে গলা সাধে আর অন্যজনায় ইঞ্জিরিতে ‘বাজজজ্ বাজজজ্’ করে তান ধরে। ওই একই হ’ল! 

মা তো বেশ নিমোর বাবার আঁকার খাতা থেকে চেয়েচিন্তে জোগাড় করে আনা সাদা সাদা ঝকঝকে মোটা পাতায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে আঁকতে শুরু করলেন। বেশি মোছামুছি না করে বেশ একটানে মৌমাছির স্কেচ হয়ে যেতে মা বেজায় খুশি। তারপর দিলেন তাতে বেশটি করে ডোরারাটা হলদে কালো রঙ করে। বেশ একখান বাঘা মৌমাছি হয়েছে বটে। কিন্তু নিমোবাবুর মুখে ঠিক সেই হাজার ওয়াটের হাসিটার দেখা মিললনা তখনও। মা তো যারপরনাই চিন্তিত হয়ে ভাবলেন, বুঝি ফেলই করলেন পরীক্ষায়, ছেলেকে শুধোলেন,
-“কী রে? ভালো হয়নি আঁকাটা?”
নিমোবাবু ভ্রু কুঁচকে মাথা চুলকে ঠোঁট কামড়ে অনেক ভেবেটেবে বললেন,
-“আচ্ছা মা! বাম্বল বি-টা অত বড় আর ওর ডানাদু’টো অত ছোটো। ওর উড়তে অসুবিধে হবে না?”

মা দেখলেন সত্যি তো! ডানা দুইখান শরীরের চেয়ে একটু ছোটোই হয়েছে বটে। কিন্তু মাও কম যান না,
-“শোন নিমো! আমি বরং মৌমাছিটার ডানায় একটু ম্যাজিক আল্পনা এঁকে দিই তাহলে ছোটো হলেও অনেক ক্ষমতা হবে ওর! সাঁই সাঁই করে কেমন উড়বে দেখবি!”
ম্যাজিক শুনেই তো নিমোবাবু একপায়ে খাড়া।
-“হ্যাঁ মা, হ্যাঁ মা! তাই করে দাও! বেশ হবে! ‘ম্যাজিকাল বাম্বল বি’!”
মা ওমনি আকাশী ডানায় নীল রঙ দিয়ে দিলেন চাট্টি কলকা ফুলপাতাওয়ালা আল্পনা এঁকে! হুঁ হুঁ বাবা! ছোটোবেলায় ব্যাঙের পৌষ্টিকতন্ত্র আঁকতে গিয়ে মায়ের নিজের পৌষ্টিকতন্ত্রে 
ব্যথা হ’লে কী হবে, আল্পনা আঁকায় মা যাকে বলে একদম এক্সপার্ট। প্রতি বেস্পতিবার ঠাকুমাকে জ্বালাতন করে আলোচাল বাটা গোলা জলে তুলো ডুবিয়ে ঘরের দোরে দোরে কম আল্পনা দিয়েছেন নাকি ছোটেবেলায়! বলি সেই গুণ কাজে লাগবে কবে, অ্যাঁ! 
ডানার আল্পনা বেশ খোলতাই হয়েছে দেখে মায়ে পোয়ে একবার চোখে চোখে কথা হয়ে গেল। তারপরে মা ডবল উৎসাহ নিয়ে মৌমাছির গায়ের সব হলুদ রঙের ওপর কমলা আল্পনা দিতে শুরু করলেন, মুখ শুঁড় হুল কিছুই বাদ গেলোনা। ম্যাজিক যত বেশি হবে ততই ভালো তাই না? সোজাসাপটা মত বাপু নিমোবাবু আর তাঁর মায়ের। 

আল্পনাওয়ালা মৌমাছি বেশ রাজাগজা মৌমাছি টাইপের দেখতে হয়ে উঠেছেন। তাও নিমোবাবুর হাসিতে একটু যেন কয়েক ফোঁটা খুশি কম লাগলো মায়ের। 
-“হ্যাঁ রে বাবু, এখনও হ’ল না ঠিকমত বুঝি?”
-“উমমম্ ভালো হয়েছে মা কিন্তু এই কালো রঙটা কেমন যেন একটু বড্ড অন্ধকার লাগছে।”
-“কী যে বলিস না ক্ষেপু! কালো তো অন্ধকার হ’বেই!”
-“ও মা, ও মা! একটা ম্যাজিক করো না! কালোটাকে একটু আলো করে দাওনা।”
মা একটু ভেবে একটা উপায় বার করলেন। খেলনার বাক্স থেকে একটা রুপোলী গ্লিটারওয়ালা আঠার টিউব এনে কালো রঙের ওপর চকমকে ফোঁটা ফোঁটা লাগিয়ে দিলেন। 
ব্যাস!
কালোর অন্ধকার দূর হয়ে ঝকমকে আলোওয়ালা মৌমাছি থুক্কুড়ি বাম্বলবি সাদা কাগজে ঝলমল করতে লাগল। মায়ে-পোয়ে খুব আনন্দে ছবিখানা মাথার কাছে রেখে ‘ও সোনাব্যাঙ! ও কোলাব্যাঙ!’ গাইতে গাইতে ঘুমিয়ে পড়ল। 

॥২॥

বেশ নিশ্চিন্তে নিমোবাবুর পাশে ঘুমোচ্ছিলেন মা। এমন সময় একটা ‘গোঁওও গোঁওও’ আওয়াজে মায়ের ঘুমটা ভেঙে গেল। কী আওয়াজ! এই রে নিজের নাকডাকার আওয়াজে নিজেরই ঘুম ভেঙে গেল নাকি? তবে নিমোবাবুর বাবা যে বলে নাকি মায়ের নাক ডাকে তাহলে মিছে কথা কয় না তো বটে! এমন সময় ফের আওয়াজটা হ’ল। অ্যাঁ! জেগে জেগে তো আর কেউ নাক ডাকেনা! তবে তো নাক ডাকার শব্দ নয় এটা! আওয়াজটা ভালো করে শুনলেন মা! ‘বোঁওও বোঁওও’! নিমোবাবু তো ছোট্ট লাল পালবালিশটা জাপটে ধরে হাসি হাসি মুখে ঘুমোচ্ছেন। তবে?
এমন সময় খাটের মাথার দিকে চোখটা পড়তেই নজরে এলো, কাগজের ওপর আঁকা মৌমাছিটা। 

কী সাংঘাতিক কাণ্ড! ছবির মৌমাছিটা ডানা নাড়াচ্ছে আর ‘বোঁওওও বোঁওওও’ করে শব্দ তুলছে। মা আরেকবার চোখ রগড়ে নিয়ে তাকালেন। সত্যি সত্যিই নড়ছে যে! এ কী অশৈলী কাণ্ড রে বাবা! সকালের জলখাবারে আগেরদিন রাতের বাসী কচুরি খেয়ে পেট গরম হ’ল না তো? সাধে নিমোর বাবা বকে, বাসী খাবার পেটে পুরে উদ্ধার করার জন্য। মৌমাছিটা বলে উঠল,
-“কী গো! তুমি অমন হাঁ করে তাকিয়ে রইলে কেন বল দিকিনি? আগে কখনও মৌমাছি দ্যাকোনি নাকি?”
মা তো কোনও মতে ঢোক গিলেটিলে জবাব দিলেন, 
-“বা রে! না দেখলুম তো তোমায় আঁকলুম কী করে শুনি?”
মৌমাছি মুখ জিভ বার করে ভেংচি কেটে বলল,
-“আঁকার কথা আর বলুনি বাপু! নেহাতই নিমোবাবু ভারী ভালো ছেলে তাই এই আঁকাতেই খুশি হয়। নইলে ‘পরে...”

এবার মায়ের ভারী রাগ হ’ল! সাহস তো মন্দ নয় ঐ এক পুচকি মৌমাছির! 
-“কেন শুনি? কী খারাপ এঁকেছি তোমায় বাপু? মিছেই আমার বদনাম করছ। ভালো হবে না কিন্তু!”
-“মিছে! এই দ্যাকো গুনে, ক’টা পা এঁকেচো? এক গণ্ডা মোটে। আমার চারটে নয় ছ-ছ’টা পা আচে তা জানো?“
-“সে নয় দু’টো পা কম হয়েছে। তেমনি যে দস্তানা পরিয়ে দিয়েছি পায়ে আর কেমন ডানায় গোটা গায়ে কলকা আল্পনা করে দিয়েছি, তার বেলা? ও’রকম আর কারোর দেখেছো?”
-“ও আর এমন কী! ঢের ঢের দেকিচি! তুমি বুঝি প্রজাপতি দ্যাকোনি? তার ডানার নকশা দ্যাকোনি?”
মা ফের প্রতিবাদের চেষ্টা করেন,
-“আচ্ছা আচ্ছা প্রজাপতির গায়ে নাহয় নকশা আছে। কিন্তু এই যে গ্লিটার দিয়ে তোমায় এমন চকমকে ঝলমলে করে দিলুম? এমনটা আর দেখাতে পারবে?”
মৌমাছিও দমবার পাত্র নয়! সে বলে,
-“নাহ্! তুমি দেকচি কিচুই দ্যাকোনি! বলি জোনাকিপোকার নাম শুনেচো? তার গা থেকে কেমন আলো ছড়ায় দেখেচো? ঐ আকাশের তারার মত এক্কেবারে! দ্যাকো বাপু নালিশ করা আমার মোট্টে স্বভাব নয়কো! সে তুমি যা এঁকেচো এঁকেচো ওইতেই আমি কাজ চালিয়ে নেবখ’ন। কিন্তু একটা এমন মস্ত ভুল করেছো যে কী আর বলি!”

বেচারি মা ততক্ষণে কোনঠাসা হয়ে গেছেন। বেজায় দুঃখী হয়ে বললেন,
-“আবার কী ভুল করলুম?”
মৌমাছি বলল,
-“আমার ছবি তো আঁকলে কিন্তু আমি কী খাব সেটা ভাবলে কি? এদিকে আমার যে ক্ষিদেতে পেট জ্বলে যাচ্ছে।”
মা মস্ত একটা জিভ কেটে বললেন,
-“এই রে মস্ত বড় ভুল হয়ে গেছে! সত্যি সত্যি এটা আমার ভারী অন্যায় হয়েছে গো মৌবাবু। তুমি কী খাবে বলো দেখি। আমি নিমোর মধুর শিশি থেকে এক চামচ মধু এনে দেব তোমায়?”
মায়েরা আসলে কেউ না খেয়ে আছে শুনলে আর মোট্টে স্থির থাকতে পারেন না কিনা, তাই খুব চিন্তায় পড়ে গেলেন। এদিকে মৌমাছিও নতুন ডাকনাম ‘মৌবাবু’ পেয়ে খুব খুশি হয়েছে। সে নরম সুরে বললে,
-“না না ওমনি করে দিলে আমি তো খেতে পারব না গো! আমাকে যেমনি করে এঁকেছো তেমনি করেই আমার খাওয়ারও ব্যবস্থা করতে হবে। মাথা খাটিয়ে উপায় বার করতে হ’বে।”

মা একটু ভেবেই বললেন,
-“ইউরেকা! উপায় পেয়েছি!”
এই বলে রঙ তুলি আর কাগজটা টেনে নিয়ে ঝপাঝপ অনেএএএকগুলো নানা রঙের নানা আকারের ফুল এঁকে দিলেন পাতা জুড়ে। 
-“কী মৌবাবু? আর তো তোমার খাওয়ার অভাব হবে না? যত খুশি ফুলের মধু খেতে পারবে। কি এবার আমার আঁকায় খুশি তো?”
মৌবাবু তো মহানন্দে মা-কে,
-“ধন্যবাদ! থ্যাংক ইউ! শুক্রিয়া! মার্সে! আরিগাতো! গ্রাসিয়াস! স্পাসিবো!...”
বলতেই থাকলো! 

এতরকম ভাষায় থ্যাংক ইউ শুনতে শুনতে তো মায়ের বিষম লেগে ঘন ঘন হেঁচকি উঠতে শুরু করল। 
-“হিঁক হিঁক হিঁকহিঁক!”

॥৩॥

-“মা! ও মা! কী হ’ল তোমার? এই নাও জল খাও দেখি!”
নিমোবাবুর ধাক্কায় মায়ের ঘুম ভাঙে। 

ধড়মড়িয়ে উঠে বসে দেখেন ঘুমের মধ্যেই হেঁচকি তুলছিলেন, আর সেই আওয়াজে নিমোবাবুর ঘুম ভেঙে গেছে। তিনি মায়ের কষ্ট দেখে বিছানার পাশের টেবল থেকে জলের বোতল নিয়ে মায়ের পরিচর্যায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। 

জলটল খেয়ে মাথা থাবড়ে হেঁচকিটা একটু বন্ধ হ’তে মায়ের খুব জোর হাসি পেল। নিমোবাবুর সাথে মজার মজার খেলা খেলতে গিয়ে কী সব যে স্বপ্ন দেখেন! এমন সময় নিমোবাবু চেঁচিয়ে ওঠেন,
-“ও মা তুমি এগুলো কখন আঁকলে? জানো তো আমি স্বপ্ন দেখছিলাম, বাম্বলবি-টা আমায় এসে বলছে ওর খুব ক্ষিদে পেয়েছে। ওরা ফুলের মধু খায় তাই না মা? তাই তো তুমি ওর চারদিকে এত্ত ফুল এঁকে দিয়েছো! আমার লক্ষ্মী মা।”
মায়ের গলাটা জড়িয়ে ধরেন নিমোবাবু। 

আর মা! মা তখন পাতায় আঁকা মৌমাছিটার চেয়েও বড় বড় গোল্লা গোল্লা চোখ করে রঙবেরঙের ফুলের ছবিগুলোর দিকে চেয়ে রয়েছেন। 

এই ফাঁকে দু’জনের কেউ লক্ষ্যই করলনা, একটা বড়সড় মৌমাছি ‘বোঁওও বাজজজ্’ করতে করতে জানালা দিয়ে গোলাপের টবের দিকে উড়ে গেল। 


(সমাপ্ত)

গল্প : দুই যে ছিল দেশ



দুই যে ছিল দেশ
সুস্মিতা কুণ্ডু

আজ একটা অন্যরকম দেশের গল্প শোনাই এসো। একটা নয়, একসাথে দু’দুটো দেশের গল্প। এক ছিলো সূর্যের দেশ আর এক ছিলো চাঁদের দেশ। এক দেশ অষ্টপ্রহর সূর্যের আলোয় উজ্জ্বল সোনালী। অন্য দেশটা চাঁদের স্নিগ্ধ আলোয় মায়াবী রুপোলী। একটা সময় ছিলো যখন এই দুই দেশের রাজা-রাণী-প্রজা সকলের মধ্যে খুব বন্ধুত্ব ছিলো। আলোর দেশের লোকেরা বেড়াতে আসতো চাঁদনী দেশে আর চাঁদের দেশের লোকেরা যেতো রোদ্দুরমাখা দেশে। 

সবই ঠিক চলছিল কিন্তু হঠাৎই ঘটল বিপদ। একটা অতি তুচ্ছ কারণে বিবাদ শুরু হল দুই দেশের মধ্যে। এ দেশের লোকেরা ও দেশের লোকেদের বলে,
-“কী বিশ্রী তোমাদের দেশ! সারাদিন শুধু ফটফটে আলো। চারদিক তেতেপুড়ে গরম।”
অন্য দেশের লোকেরাও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়, তারাও বলল,
-“তোমরা অন্ধকারের লোক সব, আলোর মর্ম কী বুঝবে? ওই তো কালো ঘুটঘুটে দেশে বাস করো!”
কথায় কথা বাড়ে, ঝগড়া বাড়ে, অশান্তি বাড়ে। দুই দেশের বাসিন্দাদের মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়ে গেলো। আর সেই যে কথা বন্ধ হ’ল, যুগের পর যুগ আর কোনও সম্পর্কই রইলনা দুই দেশের। শুধু তাই নয়, দুই রাজা লম্বা পাঁচিল তুলে দিলো দুই দেশের সীমানা বরাবর। এত উঁচু পাঁচিল যে সেটা ডিঙ্গোনোর সাধ্য কারও নেই। দুই দেশের সীমানায় ছিল একটা বিশাল লম্বা প্রাচীন গাছ, ইয়া মোটা তার গুঁড়ি, ঝামড়ি ঝুমড়ি পাতায় ভরা। সেই গাছটা কাটতে দুই রাজার কারোরই মন চাইলনা। তাই দু’দিকের পাঁচিল এসে শেষ হ’ল বুড়ো গাছের দুই দিকে। রাজামশাইরা নির্দেশ দিলেন কেউ যেন ওই গাছে বেয়ে ওইপারে না যায়। যে যাবে তাকে কারাগারে বন্দী করা হবে। 

ধীরে ধীরে দিন যায়, রাত যায়, সপ্তাহ যায়, মাস যায়, বছর যায়, যুগ পেরিয়ে যায়। রাজার ছেলে রাজা হয়, তার ছেলে রাজা হয়। সূর্যের দেশের লোকেরা ভুলেই যায় যে চাঁদের দেশ বলেও কোনও দেশ ছিল। তারা শুধু জানে পাঁচিলের ও’পারে, বুড়ো বটগাছের ও’পারে যেতে নেই, ও’পারে বিপদ আছে। একই কাণ্ড চাঁদের দেশেও। ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরাও জানে যে পাঁচিলের ও’পারে যাওয়া নিষেধ, কিন্তু কেন সেটা আর কেউ জানেনা, ভাবেনা। 

অনেকগুলো বছর পর একদিন হঠাৎ সূর্যের দেশের একটা মিষ্টি মেয়ে, তার তিনকূলে কেউ নেই, তাকে বারণ করার কেউ নেই, খেলতে খেলতে ঘুরতে ঘুরতে হাজির হ’ল সেই উঁচু পাঁচিলের ধারে। দেখে লম্বা লম্বা ঝুরি নেমেছে পাঁচিলের সেই বুড়ো বটগাছ থেকে। সে মেয়ে ভারী মজা পায়, বলে,
-“বাহ্ রে বাহ্! এই গাছের ঝুরিতে আমি দোলনা টাঙিয়ে দুলব।”
যেমনি ভাবা তেমনি কাজ। গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে দোলনায় দোলে সে মেয়ে। সূর্য দেখে, আকাশ দেখে, পাখিদের সারি দিয়ে উড়ে যাওয়া দেখে। 

এমনই মজার কাণ্ড, চাঁদের দেশের এক ছেলে, তারও কোত্থাও কেউ নেই, মা বাপ আত্মীয় স্বজন কেউ না, সেও ঘুরতে ঘুরতে এসে হাজির হ’ল পাঁচিলের অন্য দিকে। ঝুরিওয়ালা বটগাছ দেখামাত্র আনন্দে লাফাতে লাফাতে, দোলনা বানিয়ে দোল খেতে শুরু করল। সে ছেলে চাঁদ দেখে, আকাশের ঝিকিমিকি তারা দেখে, টিমটিম জোনাকি দেখে।

রোজ তারা আসে সেই গাছে দোল খেতে, খেলা করতে। ছেলেটা রোজ শুনতে পায় ওইপার থেকে মিষ্টি সুরে গুনগুন করে ভেসে আসা গান। মনে মনে ভাবে,
-“সবাই যে তবে বলে ওইপারে বিপদ আছে। তাহলে এমন সুন্দর মিঠে গান কে গায়?”
বড্ড কৌতূহল হয় তার। একদিন আর থাকতে না পেরে ছেলেটা বুড়ো বটগাছ বেয়ে উঠে ওপারে যায়। চাঁদের মায়াবী আলোয় থাকা অভ্যাস তার, ওইপারে যাওয়ামাত্রই সূর্যের উজ্জ্বল আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যায়। ধীরে ধীরে আলো সয়ে এলে দেখে, ঠিক তারই মত একটা ছোট্ট মেয়ে বটগাছের ঝুরিতে দোলনা বেঁধে দোল খাচ্ছে আর গান গাইছে। ছেলেটার চোখে চোখ পড়তেই মেয়েটা গান থামিয়ে অবাক চোখে চেয়ে রইল। 

একটু ভয়টা কাটতে দু’জনে সেই যে বকবক করা শুরু করল, সে আর থামেনা। দু’জনই নিজের দেশের কথা অন্যজনকে শোনায়, অন্যজনের দেশের কথা অবাক হয়ে শোনে। মেয়েটার খুব ইচ্ছে করে চাঁদের দেশ দেখতে। একদিন ছেলেটার হাত ধরে গাছ বেয়ে ওপারে গিয়ে দেখে সেই দেশ। ঝকমকে আলোয় থাকতে অভ্যস্ত সে মেয়ের চাঁদের নরম সাদা আলোয় চোখ জুড়িয়ে যায়। মিটিমিটি তারাগুলোকে মুঠোয় ভরে নিতে মন চায়। 

এরপর থেকে মাঝেমধ্যেই ছেলেটা আসে সূর্যের দেশে আর মেয়েটাও যায় চাঁদের দেশে, কিন্তু লুকিয়ে লুকিয়ে। রাজামশাইরা জানতে পারলে যে কারাগারে বন্দী করবেন! কিন্তু এভাবে কী আর মন ভরে? তখন, দুই দোস্ত মিলে একটা মতলব ভাঁজল। চাঁদের দেশের ছেলে একটা ঝুড়িতে করে একরাশ সাদা সুগন্ধী রজনীগন্ধা ফুল, ফুটোওয়ালা ঢাকনা চাপা কাঁচের বয়ামে ভরে জোনাকি এনে দিলো। সেই সাথে দিলো তার নিজের হাতে আঁকা একফালি চাঁদ আর ঝিকিমিকি তারায় ভরা নীলচে কালো আকাশের একটা ছবি। সূর্যের দেশের মেয়েও ঝুড়িতে করে আনল হলুদবরণ সূর্যমুখী ফুল, লাল গোলাপ, পাকা আম, রসালো জাম, গন্ধে ম ম কাঁঠাল। দু’জনে ঝুড়িদু’টো অদলবদল করে নিয়ে গেল যে যার দেশের রাজার কাছে। 

তারা কিনা ছোটো ছোটো ছেলেমেয়ে তাই রাজপ্রাসাদের প্রহরীরা কেউ আটকালোনা তাদের। ভাবলো ছেলেমানুষ, রাজপ্রাসাদের জাঁকজমক দেখতে এসেছে বুঝি। সূর্যের দেশের মেয়ে সটান হাজির হল রাজদরবারে রাজা প্রতাপকিরণের সামনে। রাজা অবাক হয়ে বললেন,
-“কে তুমি? কী চাই তোমার?”
সে মেয়ে কোনও কথা না বলে শুধু ঝুড়িটা এগিয়ে দিল। সাদা ফুলের সুগন্ধে ভরে উঠল চারিদিক। রাজা আর সভাসদরা ঝুঁকে পড়ে দেখল সে ফুল। সূর্যের দেশের সব ফুল রঙিন কিনা, এমন সাদা স্নিগ্ধ ফুল দেখে তারা তো অবাক। কাঁচের বয়ামে রাখা জোনাকি দেখে তারা তো ভেবেই বসলো, সূর্যের গা থেকে বুঝি আলোর বিন্দু খসে পড়ে অমন টিমটিম করে জ্বলছে। তাদের দেশে তো রাতই হয়না, তাই জোনাকি দেখবে কেত্থেকে। রাজামশাই বিস্ময়ভরে জিজ্ঞাসা করলেন,
-“এ সব জিনিস তুমি কোথায় পেলে মা?”
মেয়েটা তখন তার দোস্তের আঁকা ছবিটা সামনে মেলে ধরে বললে,
-“এই যে, এই দেশে রাজামশাই।”
রাজা বললেন,
-“এমন সুন্দর স্নিগ্ধ মায়াবী দেশ আমি তো আগে কখনও দেখিনি। কোথায় এই দেশ? কীকরে যায় এই দেশে? আমায় পথ বলে দাও। আমিও যেতে চাই ওখানে।”
সে মেয়ে খিলখিলিয়ে হেসে বলল,
-“সে দেশ তো আমাদের দেশের পাশেই গো রাজামশাই। ওই উঁচু পাঁচিলের ওইপারে, বুড়ো বটগাছের ওইধারে।”
সভাশুদ্ধু লোক তো আঁতকে উঠলো! পাঁচিলের ওইপারে? বলে কী পুঁচকে মেয়েটা। সেই কোন পূর্বপুরুষদের আমল থেকে সবাই শুনে আসছে পাঁচিলের ওইপারে যাওয়া মানা, ওদিকে নাকি বিপদ আছে। অথচ এ বলে নাকি সেই দেশ এমন সুন্দর!

ওদিকে পাঁচিলের ওইপারের দেশেও একইরকম ঘটনা ঘটছে। চাঁদের দেশের ছেলেটা যেই না রাজা চন্দ্রভানুর কাছে ঝুড়ি খুলে সূর্যমুখীফুল, গোলাপফুল দেখিয়েছে, সবাই তো অবাক। সাদা ছাড়া এমন রঙিন ফুলও হয় বুঝি? আর ফলের ঝাঁপি খুলতে তো আর কথাই নেই। এমন সুস্বাদু আম জাম কাঁঠাল ওরা আগে কেউ কক্ষণও খায়নি। সবাই কনুই অব্দি রস চেটে ফল খেলো। চন্দ্রভানু বললেন,
-“হ্যাঁ রে ছেলে এমন রঙিন ফুল, এমন সুস্বাদু ফল তুই পেলি কোত্থেকে শুনি?”
সে ছেলে বলল,
-“কেন? পাঁচিলের ওপারে, ওই আলো ঝলমল দেশে।”
সবার তো মুখ হাঁ!
-“বলিস কী রে? ওইপারে তো সব আগুন উগরানো জন্তুদের বাস বলেই জানি! ওখানে এসব হয় নাকি?”
ছেলে ঠোঁট উল্টে বললো,
-“আগুন উগরানো না ছাই! আমার মত ছোটো ছেলে সেই দেশে গেলাম কীকরে তবে শুনি? একটু গরম দেশ বটে, আমাদের দেশের মতন এমন ঠাণ্ডা শীতল নয়। কিন্তু সে দেশেও ঢের ঢের মজা।”
সবাই তো এ ওর মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। তবে কি যুগ যুগ ধরে যা শুনে এসেছে ওরা সব ভুল, মিথ্যে? পাঁচিলের ওইপারে, বুড়ো বটগাছের ওধারে সত্যিই এক সুন্দর দেশ আছে? 

চাঁদের দেশের রাজা চন্দ্রভানুর মত একই প্রশ্ন সূর্যের দেশের রাজা প্রতাপকিরণ আর দুই দেশের বাকি সকলের মনেও। কিন্তু জানার উপায় কী? 
এগিয়ে এল সেই মেয়েটা আর ছেলেটা। যে যার দেশের রাজাদের নিয়ে এল পাঁচিলের কাছে দোলনাঝোলানো বুড়ো বটের সামনে। তারপর তরতরিয়ে দু’জন গাছের টঙে উঠে বসে খিলখিলিয়ে হেসে বলল,
-“কই গো রাজামশাইরা! সবাই হাজির। এবার একটু হেঁকে কথা বলে সব বিবাদ মিটিয়ে নাও দিকিনি।”
এই শুনে রাজা প্রতাপকিরণ গলাখাঁকারি দিয়ে শুরু করলেন,
-“অ্যাহেম অ্যাহেম! ওইপারের রাজামশাই শুনছেন? আমি সূর্যের দেশের রাজা প্রতাপকিরণ। আপনার দেশের ছবি দেখলুম। ভারী সুন্দর দেশ আপনার।”
ওদিক থেকে রাজা চন্দ্রভানু গদগদ হয়ে বললেন,
-“আমি চন্দ্রভানু, চাঁদের দেশের রাজা। আপনার দেশের ফুল দেখলে চক্ষু জুড়িয়ে যায়। আর ফল! সে তো অমৃত একেবারে।”

দুই রাজা একে অন্যের দেশের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে বকবর করে চললেন। এদিকে প্রজাদের কি আর তর সয়? তারা শাবল গাঁইতি এনে ঠকাঠক করে পাঁচিল ভাঙতে লেগে পড়ল। দেখতে দেখতে পাঁচিল ধুলোয় মিশে গেল। চাঁদের দেশ আর সূর্যের দেশের লোক একসাথে আনন্দে হইহই করে উঠল। কারোর মনেই নেই যে আদৌ কী কারণে দুই দেশের মাঝে বিভেদ জেগেছিল, কেন পাঁচিল উঠেছিল। কী-ই বা হ’বে ওসব তুচ্ছ জিনিস মনে করে! এখন বরং কত কী জানার আছে, দেখার আছে, শোনার আছে, একে অপরের দেশ সম্পর্কে। উৎসবের মরশুম নেমে এল দুই দেশে। 

আর সবচেয়ে খুশি হ’ল কারা জানো? সেই মেয়েটা আর ছেলেটা। ওরা এখন রোজ বিকেলে বুড়ো বটের ঝুরির দোলনায় নিশ্চিন্তে দোলে, গান গায় আর বকবক করে। 
যাহ্ ওদের নামগুলোই তো বলা হয়নি তোমাদের! থাক, আমি আর বলবো কেন? এখন তো সবার মুখে মুখে ওদেরই নাম। তোমরা নিজেরাই বরং চাঁদ-সূর্যের দেশে বেড়াতে গিয়ে শুনে নিও’খন। 

(সমাপ্ত)