বইপড়া
আমার আলতা জবা
সুস্মিতা কুণ্ডু
•••••••••••••••••••
সে হবে নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকের কথা। বাবা ইকনমিক্সের অধ্যাপক দাঁতন কলেজে। আমরা থাকতামও দাঁতনেই, মফস্বল এলাকা। অনেক কিছু আছে আবার অনেক কিছু নেইও। ক্লাস ফাইভ অব্দি আমার দাঁতনেই পড়াশোনা, বেড়ে ওঠা। মোটামুটি নিস্তরঙ্গ জীবন। তার মধ্যেই প্রবল হইহই শুরু হ’ত জানুয়ারি মাস নাগাদ। শীতের ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা মরশুমে শুরু হ’ত গ্রামীণ মেলা। নামেই গ্রামীণ মেলা আদতে আমার দেখা বড় বড় মেলাগুলোর চেয়েও সেরা মেলা। এই ২০১৮ সালের কলকাতা শহরের অনেক মেলাকেই সেই মেলা টক্কর দেবে। প্রথমবার চন্দননগরের আলো দেখেছিলাম সেই মেলাতে। মেলা হ’ত বাবাদের কলেজের বিশাআআআল বড় একটা মাঠে। আর সেই মেলার মাঠে আসার রাস্তাগুলোয় প্রায় মাইলখানেক দূর থেকে রাস্তার দুপাশে লাগানো থাকত চন্দননগরের আলোক স্তম্ভ, বানানো হ’ত বিশাল বড় বড় গেট। মেলায় রকমারি পশরা, যাত্রাপালা, পুতুল নাচের থিয়েটর, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মঞ্চ, মেরি গো রাউন্ড, ইয়া উঁচু নাগরদোলা, ম্যাজিক শো, মরণকুয়ো... হাঁপিয়ে গেলাম লিখতে লিখতে।
আপনারাও নিশ্চয়ই বই কথা কও পড়তে এসে মেলার গল্প শুনে অবাক হচ্ছেন, হাঁপিয়ে উঠছেন?
আসলে আজ যে বইটার কথা বলব তার সাথে এই মেলা আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে। জ্ঞান হওয়া ইস্তক আমি ওই গ্রামীণ মেলায় গেছি এবং অক্ষর পরিচয়ের পরই মেলার একটা জিনিস আমাকে নাগরদোলা, বুড়ির চুলের থেকেও বেশি টানত। সেটা হ’ল একটা বইয়ের দোকান, নাম সম্ভবত ছিল ‘ভস্তক’। বিভিন্ন রাশিয়ান বইয়ের বাংলা অনুবাদ বইগুলো পাওয়া যেত ওই দোকানে। ‘বিক্রি’ কথাটা ইচ্ছে করেই ব্যবহার করলাম না। শৈশব কি বিক্রি করার মত জিনিস? প্রতিটা বই অনবদ্য সুন্দর সব ছবিতে ভরা, যেন মায়াজগত। কখনও হাসায়, কখনও কাঁদায়। এ যেন এক অন্য মায়াজগত। যেটা আমাদের মফস্বল শহর থেকে অনেক অনেক দূরে, উড়োজাহাজে চেপে যেতে হয়। কিন্তু আমি যেন ওই বইয়ের কাগুজে পাতাকেই এরোপ্লেন বানিয়ে তাতে চেপে চলে যেতাম রাশিয়ার সেই স্তেপে, মস্কো শহরের বরফে মোড়া অলিগলিতে।
অনেক অনেক বইয়ের কথা লিখতে ইচ্ছে করছে, ‘সোনার চাবি কিংবা বুরাতিনোর কাণ্ডকারখানা’, ‘আনাড়ির কাণ্ডকারখানা’, ‘মণির পাহাড়’, ‘চুক আর গেক’, ‘সার্কাসের ছেলে’, ‘সোনার পেয়ালা’, ‘মাশা ও ভালুক’, ‘আলিওনুশকা বোন ও ইভানশুকা ভাই’, ‘উভচর মানুষ’, ‘কাশতানকা’, ‘স্তেপের আখ্যান’, ‘সিভকা বুর্কা’ .... নাম ফুরবে না হয়ত বলতে থাকলে। ননী ভৌমিক, অরুণ সোম, এঁদের অনুবাদ সব। বেশিরভাগই যতদূর মনে পড়ে রাদুগা প্রকাশন-এর।
আজ গল্প বলব ‘আলতা জবা’ বইটা নিয়ে। লিখেছেন সের্গেই আক্সাকভ(Sergey Aksakov) , বইয়ের অপূর্ব সুন্দর ছবিগুলো এঁকেছেন ইউলিয়া উসতিনভা, রাদুগা প্রকাশন, অনুবাদ করেছেন অরুণ সোম। আক্সাকভের লেখা ‘দ্য স্কারলেট ফ্লাওয়ার’ (The Scarlet Flower) বা ‘আলতা জবা’ বেসিকালি ‘বিউটি অ্যান্ড দ্য বিস্ট’-এর রাশিয়ান ভার্সন। ১৮৫৮ সালে বইটা পাবলিশ হয়। আক্সাকভ ইনসমনিয়ায় ভুগতেন ছোটোবেলায়, তখন তাঁর বাড়ির হাউসকিপার মিস্ পেলাজিয়া, এই উপকথা শোনাতেন তাঁকে। সেই স্মৃতি হাতড়েই লেখা এই গল্প।
বহুল প্রচলিত এই ‘বিউটি অ্যান্ড দ্য বিস্ট’-এর গল্পের সবচেয়ে পুরনো ভার্সনটি ফ্রেঞ্চ নভেলিস্ট গ্যাব্রিয়েলা সুজান বারবো ডি ভিলনুয়েভ (Gabrielle Suzanne Barbot de Villeneuve)-এর লেখা। সে গল্পের নাম ‘লা বেল এ লা বেত’ (La Belle et la Bête)(উচ্চারণগুলো একটু অন্যরকম হ’তে পারে)। প্রথম পাবলিশ হয় ১৭৪০ সালে। এই গল্পের দেশে দেশে বিভিন্ন লেখকের লেখা বিভিন্ন ভার্সন আছে এই গল্পের, তবে ডারহ্যাম এবং লিসবন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞদের মতে এই গল্পের উৎস প্রায় চার হাজার বছর আগের।
যাকগে, এসব তো গেল নানা মজার তথ্য, এবার আসল গল্পে আসি। আক্সাকভের ‘আলতা জবা’-র গল্প বলি। (স্পয়লার অ্যালার্ট! তবে এ গল্প সবারই জানা মোটামুটিভাবে, তাই আরেকবার বলেই দিই)
এক সওদাগর, তার তিনটি কন্যা। সওদাগর যাবে দূর দেশে সওদা করতে, যাওয়ার আগে মেয়েদের জিজ্ঞাসা করল তাদের কী উপহার চাই? বড়টি চাইল, মণিমাণিক্যখচিত সোনার মুকুট, মেজজন চাইল এমন জাদু আয়না যা দেখলে বয়স কমবে। সওদাগর মেয়েদের কথা দিল সাগরপারের রাণীদের থেকে সেই উপহার সংগ্রহ করে আনবে, সে তার অর্থবলের সাহায্যে। মুশকিল হ’ল ছোটমেয়েকে নিয়ে। সে চেয়ে বসল এমন এক ফুল যার চেয়ে সুন্দর ফুল আর সারা দুনিয়াতে নেই।
সওদাগর বানিজ্যে গিয়ে বড় দুই মেয়ের ফরমাইশ মত উপহার জোগাড় করল কিন্তু ছোটোমেয়ের জন্য সে ফুল কোথাও পায়না। অবশেষে ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হতোদ্যম হয়ে, ডাকাতদের হামলার শিকার হয়ে, সব খুইয়ে, শেষমেষ পৌঁছলেন এক অপূর্ব সুন্দর প্রাসাদের সামনে। বড় অদ্ভুত সে প্রাসাদ, কেউ কোত্থাও নেই তাও খাওয়া দাওয়া গান বাজনা সব এমনি এমনিই হয়ে চলেছে। ধন রত্নে ভরা সে প্রাসাদ কিন্তু জনমনিষ্যি নেই। কতরকম জাদুর কাণ্ডকারখানা ঘটে চলেছে সে প্রাসাদে। সওদাগর খেয়ে, ঘুমিয়ে আরাম করে সেই প্রাসাদের বাগানে ঘুরতে ঘুরতে দেখতে পেলেন এক অনিন্দ্যসুন্দর ফুল। নিঃসন্দেহে এটাই পৃথিবীর সেরা ফুল ‘আলতা জবা’।
মহানন্দে সে ফুল উপড়ে আনতেই ঘটল মহাসর্বনাশ। প্রাসাদের মালিক ভয়ঙ্কর জলদৈত্য এসে হাজির হ’ল। তার প্রাণপ্রিয় ফুল ছেঁড়ার জন্য হত্যা করতে চাইল সে সওদাগরকে। সওদাগর তখন ক্ষমা চেয়ে সব খুলে বলল দলদৈত্যকে। তাই শুনে জলদৈত্য বিধান দিল, সওদাগরের কোনও একটি মেয়েকে এসে এই প্রাসাদে থাকতে হবে নতুবা সে সওদাগরকে মেরে ফেলবে। এই বলে সওদাগরকে সে আলতা জবা ফুলটা এবং তার হাতের আংটিটা দিল। জলদৈত্যর আংটিটা ধারণ করা মাত্র সওদাগর পৌঁছল তার নিজের বাড়ি, সমস্ত ধনরত্নসহ। সওদাগর ফিরে আসতে তো মহা উৎসব শুরু হল। বড় দুই মেয়ে তাদের উপহার পেয়ে খুব খুশি কিন্তু ছোটো মেয়ে দেখল বাবার মুখ বড় ম্লান। মেয়েদেরকে সত্যিটা জানাতে বড় দুই মেয়ে অস্বীকার করল জলদৈত্যর কাছে। তাদের বক্তব্য, যে মেয়ের জন্য ফুল আনতে গিয়ে এই দুর্ঘটনা সেই যাবে জলদৈত্যর কাছে।
ছোটো মেয়েটি বাবাকে বাঁচানোর জন্য জলদৈত্যর দেওয়া সেই আংটি পরে হাজির হ’ল দলদৈত্যর প্রাসাদে। প্রথম প্রথম ভয় পেত মেয়েটি। জলদৈত্যর সাথে বাক্যালাপ হ’ত দেওয়ালে আগুন-আখরে ফুটে ওঠা লেখার মাধ্যমে। কিন্তু জলদৈত্যর আতিথেয়তায় মুগ্ধ হ’ল মেয়েটি। প্রাসাদে থাকতে থাকতে মেয়েটির ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব হয়ে গেল জলদৈত্যর সাথে। বেশ সুখেই দিন কাটে। একদিন মেয়েটির ইচ্ছে হ’ল বাবার সাথে বোনেদের সাথে দেখা করার। তিন দিন তিন রাত্রের সময় নিয়ে এল সে বাবার কাছে। তার থেকে এক মুহূর্তও যদি দেরী হয় ফিরতে প্রাসাদে, জলদৈত্যর মৃত্যু হবে। এদিকে দুই বড় বোন, ছোটো বোনের সুখের খবর শুনে হিংসেয় জ্বলে গেল। বোনের ফেরার সময় ছল চাতুরী করে দেরী করিয়ে দিন। এদিকে ছোটো মেয়েটি ফিরে এসে দেখে আলতা জবাট্কে আঁকড়ে ধরে জলদৈত্য মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে রয়েছে। কাঁদতে কাঁদতে মেয়েটি জানাল তার ভালোবাসার কথা জলদৈত্যকে। ওমনি হ’ল জাদু, জলদৈত্য ফিরে পেল তার আসল রূপ, রাজপুত্রের রূপ। এতদিন দুষ্ট এক মায়াবিনী জাদুতে এই অবস্থা ছিল। আজ প্রকৃত ভালোবাসা পেয়ে সব আবার আগের মত হ’ল।
এই হ’ল ছোট্ট করে ‘আলতা জবা’-র গল্প। সেই শিশু বয়সে গল্পের বইটার যেটা দারুণরকমের ভালো লেগেছিল সেটা হ’ল ছবিগুলো। এত মনোরম সুন্দর সব ছবি, নকশা, কলকা, দেখে যে কী ভালো লাগত। পোশাকগুলো দেখে মনে হ’ত আমারও যদি ওরকম থাকত! অনেকবার চেষ্টা করেছি আঁকার ছবিগুলো কিন্তু পেরে উঠিনি। আর একটি বলার মত বিষয় হ’ল গল্পের ভাষা! এত সুন্দর সহজ সরল সাবলীল অনুবাদ যে পড়তে বড় ভালো লাগবে ছোট্টদের।
তবে সবচেয়ে যেটা ভালো লেগেছিল গল্পের, সেটা হ’ল হ্যাপি এন্ডিং। হ্যাঁ! রূপকথার গল্পগুলোর শুরুর ওই ‘ওয়ানস আপন আ টাইম’ আর শেষের ‘অ্যান্ড দে লিভড হ্যাপিলী এভার আফটার’ বড় মন ভালো করে দেয়। ভালো করে ভেবে দেখলে, অনেকগুলো স্তর থাকে এই উপকথা লোককথাগুলোর মধ্যে। শৈশবে সেগুলো পরিষ্কার হয়না আমাদের কাছে, তবুও মনের মধ্যে গল্পের বক্তব্যটা গেঁথে যায়। অসুন্দরকেও ভালোবাসতে সম্মান করতে শিখতে হয় আমাদের। তার মধ্যেই লুকিয়ে আছে অনেক কিছু ভালো। পার্থিব সম্পদ দিয়েই সবকিছুর বিচার হয়না। রূপকথাগুলো সেটাই শেখায় শৈশবে, চারপাশটা আদতে সুন্দর, শিশুমনে এই ভরসাটা থাকা বড় দরকার।
আমার বা আমার মত আরও অনেক আশি এবং নব্বইয়ের দশকের ছেলেমেয়েদের মনে এই রাশিয়ান বইগুলো স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। আমি অন্তত এটুকু জানি আলমারি থেকে ধুলো ঝেড়ে বইগুলো বার করে আমি আমার সন্তানকে পড়াবো, শুনিয়ে ঘুম পাড়াবো। আমাদের একটুকরো ছেলেবেলা কাগজের পাতায় করে দিয়ে যাব ওদের।
(সমাপ্ত)
No comments:
Post a Comment