সুস্মিতা কুণ্ডু
সবে সন্ধের ঝিমুনিটা এসেছিল, এমন সময় ‘চটাস চট্’ শব্দ আর মানুষের কথার আওয়াজে জোজোর তন্দ্রাটা কেটে যায়। লম্বা গলাটাকে আরও লম্বা করে, কান খাড়া করে, পাঁচিলের ওপার থেকে ভেসে আসা কথাগুলো শোনার চেষ্টা করে জোজো। দু’টো গলা, একটা খুব কর্কশ মোটামতন, আরেকটা মিহি ভীতু ভীতু। কর্কশ গলাটা কেমন যেন একটু চেনা চেনা লাগল জোজোর, কিন্তু ঠিক মনে করতে পারল না। ওর আর দোষ কী! সারাদিন কত মানুষ আসছে যাচ্ছে। উঁচু লোহার রডের বেড়ার ওপার থেকে সবাই জোজোদের দেখে, হাততালি দেয় বাচ্চারা, আনন্দে সবাই মেতে ওঠে। জোজোরও ভারী ভালো লাগে ক্ষুদে বন্ধুদের সাথে আলাপ করতে। আর যখন লোকজনের ভিড় কম থাকে তখন জোজো ওর লোহার বেড়ার ডানদিকে গলা বাড়িয়ে ভালুকমামা রবিচাঁদের কাছে গল্প শোনে। তবে কিনা রবিচাঁদমামু বড্ড আলসে। একটা গল্প বলে তো বাকি সারাদিনটা ঝিমোয় আর মাথা চুলকোয়। জোজো তখন আর উপায় না পেয়ে চলে যায় বেড়ার বাঁদিকপানে। ওখানে অনেকগুলো ইয়ার দোস্ত আছে ওর। টোপলা, বকুম, ভুচু, নৈনি... তবে ওরা খুব ফাজিল। মোট্টে কোনও ভালো জিনিস শিখতে চায় না। কলাটা আপেলটা খাবে গাছের ডাল থেকে উল্টোবাগে ঝুলতে ঝুলতে। জোজো কতবার বারণ করেছে, “অমন করে খাসনি, বিষম লাগবে!”
কিন্তু ওরা সে’কথা শুনলে তো। উল্টে বলবে,
-“জোজোদাদা তুমিই বরং সাবধানে গাছের পাতা চিবিও দেখি। যা লম্বা গলা তোমার! খাবারদাবারগুলো অত লম্বা গলা টপকে পেটে যেতে যেতে পথ হারিয়ে ফেলবে। তারপর বিষম খেয়ে, কেশে হেঁচে একশা হবে!”
এই বলে খিঁক খিঁক ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করে হাসবে। গা জ্বলে যায় জোজোর।
দাঁড়াও দাঁড়াও তোমরা এখনও বুঝতে পারোনি জোজো কে?
জোজো হ’ল গিয়ে একটা ছোট্ট জিরাফের ছানা। অবশ্য ছোট্ট বললাম বটে, কিন্তু জোজোর পা’গুলো আর গলাটা এতটাই লম্বা যে জোজো ভালুকমামারও মাথা ছাড়িয়ে আরও বিঘতখানেক টপকে গেছে। জোজো, জোজোর মা বাবা, রবিচাঁদ ভালুকমামা, টোপলা-বকুম-ভুচু-নৈনি লালমুখো বাঁদরের দল, এরা সবাই একসাথে থাকে মৌরিপুরের চিড়িয়াখানায়। শুধু কী ওরা! আরও আছে কুলোর মত কানওয়ালা হাতুভায়া, সাদায় কালোয় চকরাবকরা জেব্রা, নানা রঙের নানা বুলির পাখিরা, তার ওপর এসেছে নতুন সদস্য রুরু।
রুরুকে দেখতে এখন মৌরিপুর চিড়িয়াখানায় ভিড় উপচে পড়ছে। দারুণ গাবলু গুবলু দেখতে একটা বাঘের ছানা রুরু। মৌরিপুরের পাশেই বিশাল শাপলাগড় জঙ্গল। মাসখানেক আগেই কিছু চোরাশিকারী নাকি মেরে ফেলেছে রুরুর মাকে। তারপর ওকে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল একটা বাক্সের ভেতর বন্দী করে।
এমন সময় মৌরিপুরের কিছু লোকজন সামনে এসে পড়ায় ওরা বাক্সটা ফেলে দিয়ে পালিয়ে যায়। বাক্সের ভেতর নখ আঁচড়ানোর শব্দ পেয়ে সবাই তালা ভেঙ্গে রুরুকে উদ্ধার করে। কিন্তু অতটুকু ছানা তো আর যে সে সামলাতে পারবেনা তাছাড়া বন্যপ্রাণী বাড়িতে রাখাও নিয়মবিরুদ্ধ তাই ওরা রুরুকে মৌরিপুরের চিড়িয়াখানায় জমা করে দিয়ে গেছে। এত কথা অবশ্য জোজো বুধুয়াদাদার মুখেই শুনেছে।
বুধুয়াদাদাকে সব্বাই দাদা বলেই ডাকে, যদিও বুধুয়াদাদার একগাল সাদা দাড়ি মাথায় সাদা চুল। বুধুয়াদাদা এই চিড়িয়াখানার সবচেয়ে পুরনো কর্মী। সেই কোন ছোটোবেলা থেকে জন্তু জানোয়ারদের দেখাশোনা করে বুধুয়াদাদা। ওদের মনের কথাও বোঝে খানিকটা। জোজোরা সবাই ভালোবাসে বুধুয়াদাদাকে। রুরুর এই সব গল্প বুধুয়াদাদাই করছিল জোজোকে চান করাতে করাতে। তাই তো ও জানতে পেরেছে। বুধুয়াদাদাকে চানের সময় জলের ঝাপটায় ভেজাতে জোজোর খুব ভালো লাগে। কিন্ত কাল বুধুয়াদাদার বদলে ওই নতুন লোকটা জোজোকে চান করাতে এসেছিল। ওকে একদম পছন্দ হয়নি জোজোর। দিন পনেরো হল নিতাই মানে ঐ নতুন লোকটা মৌরিপুরের চিড়িয়াখানার কর্মী হয়ে এসেছে। বুধুদাদার আন্ডারে কাজ করছে। কিন্তু এই নিতাই লোকটা কেমন যেন, চোখদুটো দেখলে মনে হয় সবসময় কিছু বদ মতলব ভাঁজছে। কেউই ওকে তেমন পছন্দ করেনা।
ও হো! এবার মনে পড়েছে জোজোর! ওই কর্কশ মোটামতো গলাটা তো নিতাইয়ের। লোকটা এত কম কথা বলে যে জোজো প্রথমটায় বুঝতে পারেনি। কিন্তু এখন ও নিশ্চিত এটা নিতাইয়ের গলা। নিতাই মিহি গলার লোকটাকে বলছে,
-“এত রিস্ক নিয়ে মাটাকে সরিয়ে ছানাটাকে ধরে আনলাম, আর তোমার লোকেদের বোকামির জন্য শেষ অব্দি এই হ’ল। বাক্স ফেলে চম্পট দিল সব।
উফফ কী মশা রে বাবা! দেখা করার আর জায়গা পেলে না তুমি। এই আগাছার ঝোপে।”
মিহি গলার লোকটা উত্তর দিল,
-“এদিকটা নিরাপদ, কেউ আসে না। তোমাকে বলছি তো দ্বিগুণ টাকা দেব। কিন্তু ওই ছানাটা আমার চাই-ই চাই। গ্রামেগঞ্জের সার্কাসে এইসব জন্তু দেখালে প্রচুর টিকিট বিক্রি হয়। আর পশুর খেলা দেখানো সরকার বন্ধ করে দিয়েছে বলে এইসব দেখতে আরও বেশি করে লোক আসে। গ্রামের দিকে ধরা পড়ার ভয়ও কম। তোমাকে যে করে হোক ছানাটাকে বার করে আনতেই হবে!”
ফের নিতাইয়ের কর্কশ গলা জোজোর কানে আসে পাঁচিলের ওপার থেকে,
-“ওই হাঁদা বুধুয়াটার সাথে ভাব জমিয়েছি। কাল যখন সন্ধেবেলায় ছানাটাকে খাবার দিতে যাবে ওকে ভুলিয়েভালিয়ে একফাঁকে খাবারে কড়া ডোজের ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দেব। আমি তো বুধুয়ার ঘরেই শুই। ওর রাতের খাবারেও ঘুমের ওষুধ দিয়ে দেব। তারপর যখন অঘোরে ঘুমোবে ওর পকেট থেকে অফিসঘরের চাবি নিয়ে নেব। অফিসঘরেই থাকে জন্তুগুলোর খাঁচার চাবি। তোমার লোকেদের পাঁচিলের বাইরে রেডি থাকতে বোলো। আমি ঠিক ছানাটা পাচার করে দেব। তারপর চাবি ফেরৎ রেখে দেব আবার। সব দোষ পড়বে ব্যাটা বুদ্ধু বুধুয়ার ওপর।”
এই বলে বিটকেল গলায় হাসতে থাকে দু’জনই। জোজোর গা শিউরে ওঠে আতঙ্কে, কান লোমগুলো খাড়া হয়ে যায়। ওর বুঝতে বাকি থাকেনা যে ওরা রুরুকে চুরি করার মতলব আঁটছে। আর ঐ মিহিগলা লোকটা সার্কাসের কেউ হবে। সার্কাস কী সেটা জোজো শুনেছে রবিচাঁদমামার কাছে। মামা নাকি আগে সার্কাসেই ছিল। কিছু ভালোমানুষ মিলে, সার্কাসে পশুদের নিয়ে খেলা দেখানো বন্ধ করে দিতে তারপর এই চিড়িয়াখানায় আশ্রয় পেয়েছে। নিতাইও নির্ঘাৎ ঐ চোরাশিকারীদের দলে, এখানে কাজ নিয়েছে রুরুকে চুরি করবে বলে। কী বদমাইশ লোকগুলো! নাহ্ এদের শাস্তির ব্যবস্থা করতেই হবে।
পরেরদিন সকালেই, জোজো রবিচাঁদ ভালুকমামা আর টোপলা-বকুম-ভুচু-নৈনি লালমুখো বাঁদরের দলকে সবটা বলল। ওরা আবার ওদের পাশের খাঁচার সব জন্তুদের বলল। এইভাবে গোটা চিড়িয়াখানায় খবর ছড়িয়ে পড়ল। কিন্তু রুরু যেহেতু নতুন তাই ওকে একটু দূরের খাঁচায় রেখেছে চিড়িয়াখানার কাকুরা। ও তো জানতেও পারবেনা এই খবর। যদি ওই ঘুমের ওষুধওয়ালা খাবারটা খেয়ে নেয় বেচারা! একটা মতলব ঠাওরাতে হবে।
সব জন্তুরাই বিপদের কথা জানার পর থেকে আজ বড্ড চঞ্চল হয়ে আছে। বাঁদররা বেশি লাফঝাঁপ করছে, পাখিরা বেশি করে ডাকাডাকি করছে। যারা চিড়িয়াখানায় বেড়াতে এসেছে তারাও বেশ অবাক হয়ে গেছে ওদের দেখে। বিকেল চারটের পরই চিড়িয়াখানার গেট বন্ধ হয়ে গেল সেদিন, পশুপাখিদের অস্থিরতা দেখে। তাতে নিতাই একটু হকচকিয়ে গেলেও ভাবল ভালোই হ’ল। লোকজন যত কম হবে তত অকাজের সুবিধে। প্ল্যানমাফিক খাবারে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে, ফোনে সেই মিহি গলার লোকটাকে খবর দিয়ে রেডি হয়ে রইল নিতাই। আগের দিন সন্ধেয় চিড়িয়াখানার দেওয়ালের পেছনে আগাছার জঙ্গলে মশার কামড় খেয়ে দাঁড়িয়ে যা যা আলোচনা করেছিল, ঠিক সেইমতই সব এগোচ্ছে।
এদিকে বুধুয়াদাদাকে প্লাস্টিকের বালতিতে করে রুরুর খাঁচার দিকে খাওয়ার নিয়ে যেতে যেই দেখতে পেল জোজো, ওমনি বাঁদরদের খাঁচার দিকটায় গিয়ে অজ্ঞান হওয়ার ভান করে পড়ে গেল। বুধুয়া তো জোজোকে পড়ে যেতে দেখে দুদ্দাড় করে ছুটে এল। বালতিটা পাশে নামিয়ে লোহার রডের ফাঁক দিয়ে হাত গলিয়ে জোজোর গায়ে হাত বুলিয়ে বলতে লাগলো,
-“ই জোজো বাবুয়া! কা হুয়া তুমকো!”
আর সেই ফাঁকে টোপলা-বকুম-ভুচু-নৈনি মিলে গরাদের ফাঁক দিয়ে লেজ বাড়িয়ে ঘুমের ওষুধ মেশানো খাবারের বালতিটা উল্টে দেয়। জোজো চোখ পিটপিট করে সেটা দেখে নিয়ে, উঠে পড়ে। এদিকে বুধুয়া চেঁচায়,
-“আরে উ টোপলা উ ভুচুয়া! তুমলোগ ই কা কিয়া! ই বকুম ই নৈনি! বদমাশ কাঁহিকা! মুঝে ফিরসে রুরুয়াকে লিয়ে খানা আনতে হোবে!”
গজগজ করতে করতে বুধুয়া নতুন খাবার আনতে যায় রুরুর জন্য। জোজোরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচে।
এরপর রাতের অন্ধকার নেমে আসে। কিন্তু সব পশুরা আজ সতর্কভাবে জেগে। বুধুয়া তার ঘরে চলে যায়। একটু রাত বাড়লেই বুধুয়ার ঘর থেকে একটা চাদরমুড়ি দেওয়া ছায়ামূর্তি বেরিয়ে, অফিসঘরের দিকে যায়। তারপর সেখান থেকে বেরিয়ে রুরুর খাঁচার দিকে, হাতে একটা বস্তাজাতীয় কিছু। বুঝতে বাকি থাকে না যে ওটা নিতাই। অন্যদিকে বুধুয়ার ঘরের পেছনের পাঁচিলে ঝোলানো দড়ি বেয়ে নেমে আসে আরেকজন। এটা নির্ঘাৎ ওই মিহি গলার সার্কাসের লোকটা। দমবন্ধ করে অপেক্ষা করে সবাই। খানিকবাদেই ‘ঘেঁয়াও ঘ্যাঁক’ করে রুরুর গলা ভেসে আসে। ওমনি সব পশুপাখিরাও জোর গলায় চেঁচাতে ডাকতে ঝটরপটর আওয়াজ শুরু করে, ঠিক যেমনটি জোজো শিখিয়ে দিয়েছিল সবাইকে।
নিতাই আর তার স্যাঙাৎ আশা করেছিল রুরু ঘুমের ওষুধ মেশানো খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে থাকবে। এই ভেবে যেই না ওকে ধরতে গেছে রুরুও ঘ্যাঁক করে চেঁচিয়ে কামড় বসিয়ে দিয়েছে। যতই ছোট হোক আসলে তো বাঘেরই বাচ্চা। আর এদিকে জোজো অ্যান্ড কোম্পানিও প্রবল শোরগোল শুরু করেছে। চিড়িয়াখানার গেট থেকে ইয়াব্বড় রাইফেল হাতে দু’জন গার্ডকাকু ছুটে এল, যেখানে যত কর্মী ঘুমোচ্ছিল সবাই ছুটে এল। সকলে মিলে চেপ্পে ধরে নিতাই আর সার্কাসের শয়তান লোকটাকে হেঁইসা বলে দড়িতে বেঁধে দিল। বুধুয়াদাদা তো রেগে একশা!
-“বোদমাইশ নিতাই হামাকে জোরুর নিন্দ কি গোলি খিলা দিয়া থা। ইস লিয়ে চাবি চোরি করে নিলো হামার পোকেট থেকে সমঝ হি নাহি পায়ে হাম!”
তারপর কী হ’ল?
শয়তানরা সব জেলে গেল আর জোজোকে সব পশুপাখিরা ধন্য ধন্য করল। বুধুয়াদাদাও বুঝতে পেরেছিল রুরুকে বাঁচানোতে জোজোদেরই হাত আছে। তাই রবিচাঁদ ভালুকমামা পেল চাকভাঙা মধু, টোপলা-বকুম-ভুচু-নৈনি পেল একছড়া পাকা মর্তমান কলা আর জোজো পেল অনেক কচি কচি বাঁশপাতা। যাকে বলে ভোজ একেবারে।
(সমাপ্ত)

No comments:
Post a Comment