সুস্মিতা কুণ্ডু
-“তারপর তো সেদিন ভারী বৃষ্টি এলো। ঠানদিদির সব বিউলিডালের বড়িগুনো ছাদে কুলোয় পড়ে পড়ে ভিজে গেল। রাঙাপিসি তিনটে রঙবেরঙের ছাপা শাড়ি শুকোতে দিয়েছিল লাল রঙের নাইলনের দড়িতে। সব হাপুশুটি খেয়ে চান করে গেল। বলাই আর জগাই সুতোতে মাঞ্জা দেবে বলে বাগানের এমাথা থেকে ওমাথায় কাঠের খুঁটোয় সুতো বেঁধেছিল। সেগুনোও রক্ষে পেলুনি। বিন্তি ওর নতুন লাল মলাট দেওয়া ইতিহাস বইটা নিয়ে দুলে দুলে পড়া মুখস্থ করছিল। ঝমঝমিয়ে জল পড়ে বইয়ের পাতার রাজাগজাদের সব সর্দি লেগে গেল।”
এই অব্দি শুনে সবুজব্যাঙ গ্যাঙর গ্যাং করে বলল,
-“দাঁড়াও দাঁড়াও! কী সব যে বলো তুমি! বইয়ের ভেতরের রাজারানীদের আবার সর্দি হয় বুঝি?”
এই শুনে তো হলুদপাখি রেগে গিয়ে ক্যাঁচরম্যাঁচর করে বলল,
-“তবে কি আমি মিছে কথা কইচি তোমায়? অমন বললে আর শোনাবোই না তোমায় চাঁদবাড়ির গল্প!”
সবুজব্যাঙ তো ভারী দুঃখ পেয়ে তক্ষুনি সাধল,
-“না না মিতে! অমন বোলোনা। আমার ভুল হয়েছে! আমায় মাফ করে দাও এইবেলা! আর গপ্পো শোনাও লক্ষ্মীটি”
সবুজব্যাঙের চিরকালের ঠাঁই ওই চাঁদবাড়ির পেছনের এঁদো ডোবায়। ডোবার চারধারে এমন গাছপালা ঝোপঝাড় যে গোলবাড়ি থেকে হাসিকান্নার আওয়াজ উড়ে আসলেও, নজর যায়না বনবাদাড় পেরিয়ে। তার ওপর ওই বাদাড়ে আছে কালোকুলো সড়সড়ে সাপের ঘাঁটি। একবার যদি সবুজব্যাঙকে নাগালে পায় তাহলে ‘গ্যাঙর গ্যাং’ বলার আগেই টপাৎ করে গিলে নেবে। এদিকে বাঁশঝাড়ের ফাঁক দিয়ে ব্যাঙ দেখতে পায় ঐ বাড়ির মাথার ওপর দিয়েই রোজ চাঁদ ওঠে। সবুজব্যাঙের খুব ইচ্ছে ওই চাঁদবাড়িতে বসত করার। কিন্তু তা তো আর হয়না বেচারার তাই হলুদপাখির মুখে চাঁদবাড়ির গল্প শুনেই খুশি থাকে।
হলুদপাখি সবুজব্যাঙের ভারী কাছের দোস্ত কিনা। সবুজ ব্যাঙের রঙীন ছাতুর তলায় দুই মিতায় থাকে। হলুদপাখি রাজ্য টহল দিয়ে এসে সেইসব গল্প শোনায় সবুজব্যাঙকে। আর সবুজব্যাঙ পোকাটা মাকড়টা ধরে কচুপাতায় চাপা দিয়ে রাখে। দু’জন মিলে সন্ধে নামলে ডিনার করে ছাতুর তলায় ঘুম দেয়। সবুজব্যাঙ নাক ডাকে ‘ঘোঁওওও ঘোঁৎ’ হলুদপাখি নাক ডাকে ‘সুঁইইই ফুৎ’। সবুজব্যাঙ স্বপ্ন দেখে সে চাঁদবাড়ির মাথায় উঠে বসে আছে। চাঁদটা হাতের কত কাছে। আকাশ থেকে চাঁদটা পেড়ে নিয়ে সবুজব্যাঙ পিঠে করে নিয়ে ইয়াব্বড়ো লাফ মারে। এসে পড়ে এঁদো ডোবার ধারে। তারপর চাঁদটাকে টাঙিয়ে দেয় তার রঙীন ছাতুর ভেতরে। কেমন সুন্দর সাদা আলোয় ভরে গেছে ছাতুর তলাটা। ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে হাত পা ছুঁড়ে আনন্দে নাচে সবুজব্যাঙ।
এদিকে গোঁত্তা খেয়ে ঘুম ভেঙে যায় হলুদপাখির। কী জ্বালাতন! এই চাঁদপাগল সবুজব্যাঙকে নিয়ে এবার কী করে হলুদপাখি? নাহ্ আজই বিন্তির কাছে গিয়ে সব বলতে হবে। বিন্তির ভারী বুদ্ধি, ক্লাসে ফার্স্ট হয় বলে কথা। ও নির্ঘাৎ একটা সমাধান করে দেবে।
বিকেলবেলায় বিন্তি ছাদে এক্কাদোক্কা খেলে। সেই সুযোগে হলুদপাখি উড়ে গিয়ে বসলো ছাদের টবে লাগানো নয়নতারা ফুলের গাছের ডালে। তারপর শুরু হ’ল গুরুগম্ভীর আলোচনা!
-“কিচির মিচির চিকি মিকি”
-“তাই বুঝি? সবুজব্যাঙের এত্তো মন খারাপ?”
-“টিঁ টিঁ টুঁ টুঁ”
-“হুমমম! আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে হলুদপাখি। তুমি এখানে অপেক্ষা করো, আমি এক্ষুনি আসছি।”
এই বলে বিন্তি ছুট্টে গেল বলাই আর জগাইয়ের কাছে। ওদের একটা মজার খেলনা আছে। সাদা গোল বলের মত দেখতে। তার গায়ে একটা ছোটো কালো কাঁচ আটকানো আছে। সারাদিন যদি বলটাকে রোদ্দুরে রেখে দাও তাহলে ওই কালো কাঁচটা সূর্যের আলো শুষে জমা করে রাখে আর রাত হলে পরেই সেই জমা রোদ্দুর দিয়ে সাদা বলটা জ্বলজ্বল করে ঠিক আকাশের চাঁদের মত। বিন্তি ওদের কাছ থেকে খেলনাটা চেয়ে নিয়ে দৌড়ে ছাদে এসে হলুদপাখিকে দিয়ে বলল,
-“এই নাও হলুদপাখি। এটা সবুজব্যাঙের ছাতার নিচে রেখে দিও। রোজ সকালে রোদ্দুরে দেবে তাহলেই দেখবে রাত্রে কেমন চাঁদের মতো জ্বলজ্বল করবে। সবুজব্যাঙের তাহলে আর মন খারাপ করবে না।”
হলুদপাখি তো ভারী খুশি হয়ে একশবার ‘থ্যাংক ইউ থ্যাংক ইউ’ বলে, মুখে বলটা ঝুলিয়ে নিয়ে উড়ে গেলো।
সবুজব্যাঙ তো এই উপহার পেয়ে আহ্লাদে আটখানা। দিনের বেলায় সাদা বলকে রোদ্দুর দেয় আর রাতের বেলায় ছাতার ভেতর আঁকশিতে ঝুলিয়ে দেয়। ছোট্ট চাঁদের আলোয় ওদের দুই মিতের ছাতুর ঘর ভেসে যায়। চাঁদবাড়িতে না যেতে পারলেও হলুদপাখি, বিন্তি আর বলাই-জগাইদের ভালোবাসায় ওর রঙীন ছাতুই এখন চাঁদবাড়ি হয়ে গেছে যে!
(সমাপ্ত)

No comments:
Post a Comment