চ্যাপ্টার ৫ : নিংপিং, ইভান আর তিয়াংঝু পাহাড়ের ঝুয়াংরা



নিংপিং, ইভান আর তিয়াংঝু পাহাড়ের ঝুয়াংরা

সুস্মিতা কুণ্ডু


(১)


সেই যে হেকেটি ডাইনিবুড়িকে জব্দ করে, রাজকন্যে মেই লিং এর হাতে ইভান-রেভেন ভাইবোনের দায়িত্ব দিয়ে নিজের গুহাবাড়িতে ফিরে এল নিংপিং, তারপর থেকে সবকিছুই বেশ শান্ত ছিল, ঢিমেতালে জীবন চলছিল। সকালে সাগরতীরে ফু-ফেং কাছিমদাদুর কাছে গপ্পো শোনা, দুষ্টু ঘোড়ামাছ হম্পকম্প গোটালাট্টু আর গ্রে নাইফটিথ হাঙরের সাথে খানিকটা হুটোপুটি। তারপর মারমেড রাজকন্যে ওশিয়ানার মিষ্টি গান শুনে প্রাণ জুড়োনো। দুপুরে মায়ের কাছে ফিরে একটু টমেটো পোড়া খেয়েই বিকেলে ছুট রাজকন্যে মেই লিং এর প্রাসাদে। যাওয়ার আগে রেইনবো পাহাড় থেকে গোল্ডি ম্যাকমাফিন লেপ্রিকর্ণকে পিঠে চাপিয়ে নিতে ভোলেনা নিংপিং। মেই লিং এর রাজপ্রাসাদে কত্তরকম খেলা। কখনও বা ইভান আর রেভেন ভাইবোন তাদের নতুন নতুন আবিষ্কার করা জাদুর খেলা দেখায়। কখনও মেই লিং এক মা, মানে খোদ রাণীমার হাতে বানানো ব্লুবেরি মাফিন খায় চেটেপুটে। 


সেইদিন হল কী, বিকেলবেলায় খেলাধুলোর পর বেজায় খিদে পেয়েছে নিংপিং আর তার দলবলের। ব্লুবেরি মাফিন খাবে বলে সবাই হইহই করছে। কিন্তু রানিমা সোনার ট্রে-তে করে সাজিয়ে আনলেন হলুদ রঙের বানানা মাফিন। বানানা মাফিনও খেতে ভারি সুস্বাদু কিন্তু নিংপিংদের আবার ব্লুবেরিটাই বেশি পছন্দের কিনা। সবাই বায়না ধরতে রানিমা তখন দুঃখু দুঃখু মুখে বললেন, 

-“বাগানের সব ব্লুবেরি যে শেষ হয়ে গেছে বাছারা, মাফিন কীকরে বানাই?”

সত্যিই তো! সবাই খুব চিন্তায় পড়ল। নিংপিং তখন বলল, 

-“কুছ পরোয়া নেহী! আমি শুনেছি তিয়াংঝু পাহাড়ের কোলে ব্লুবেরির ঝোপে সারাবছর নাকি থোকা থোকা নীল নীল ব্লুবেরি ফলে থাকে। আমি নিয়ে আসবো এক বস্তা ব্লুবেরি।”


তাই ঠিক হল তবে। পরের দিন সক্কাল সক্কাল নিংপিং রওয়ানা দিল তিয়াংঝু পাহাড়ের উদ্দেশ্যে। তিয়াংঝু পাহাড় মেইলিং-দের রাজ্যের একদম পূবপ্রান্তে। এতটা পথ একা একা যেতে ক্লান্ত লাগবে তাই ইভান বলল, 

-“হেকেটি ডাইনি যখন আমাকে বিড়াল বানিয়ে বন্দী করে রেখেছিল তখন বেশ কিছু জাদুবিদ্যা দেখে দেখে শিখেছিলাম। আর এখন মেইলিং দিদির রাজপ্রাসাদের গ্রন্থাগারে হরেকরকমের বই পড়ি আমি আর আমার বোন রেভেন। সেইসব বই পড়ে পড়ে অনেকরকম জড়িবুটি দিয়ে চিকিৎসাবিদ্যাও শিখছি আমরা। বন্ধু নিংপিং আমাকেও তোমার সাথে নিয়ে চলো। বলা যায় না যদি কোনও কাজে আসি। আর যদি কোনও সাহায্যে নাও আসি, দুজনায় গল্প করতে করতে সময় কেটে যাবে। যদি উপকারী জড়িবুটি তিয়াংঝু পাহাড়ে মেলে, সেটাও সংগ্রহ করা হবে।”

নিংপিং এই শুনে বলল,

-“তা মন্দ বলোনি বন্ধু। চলো তবে আমার পিঠে ঝটপট উঠে বোসো দেখি!”

নিংপিং আর ইভান তো শোঁওওও করে উড়ে গেল তিয়াংঝু পাহাড়ের দিকে। বন্ধুরা সবাই রইল অপেক্ষায়।


(২)


বেশ অনেকটা সময় ওড়ার পর দূর থেকে দেখা গেল মেঘে ঢাকা তিয়াংঝু পাহাড়ের চুড়োটা। নিংপিং ইভানকে বললো,

-“শক্ত করে ধরে বোসো বন্ধু। আমরা নীচে নামব, ঐ পাহাড়ের পাদদেশে।”

তিয়াংঝু পাহাড়ের পাদদেশে বাস করে ঝুয়াং উপজাতির লোকেরা। তাদের কাজই হল সারাবছর নানারকমের বেরি চাষ করা। নীল ব্লুবেরি, লাল স্ট্রবেরি, কালো ব্ল্যাকবেরি, গোলাপী র‍্যাস্পবেরি... নিংপিং বলল,

-“আমি একমাত্র রাতের অন্ধকারেই গ্রামে যেতে পারব। ঝুয়াংরা যদি আমাকে দেখতে পেয়ে যায় হয়তো ভয় পেয়ে যেতে পারে। ইভান তুমিই বরং গ্রামের ভেতরে গিয়ে ব্লুবেরি তুলে আনো। আমি এই পাথরের টিলাটার আড়ালে লুকিয়ে থাকি।”


নিংপিংয়ের কথামতো ইভান চললো গ্রামের ভেতর। গ্রামের একদম মাঝখানে ঝুয়াংদের বাড়ি আর চারপাশে বেরির ক্ষেত। কিন্তু একটাও বেরির ঝোপে কোনও বেরি নেই। ইভান এদিক ওদিক চারদিক খুঁজলো, কিন্তু নাহ্! কোত্থাও কোনওরকম বেরিরই চিহ্ন নেই, ব্লুবেরি তো দূরের কথা। ইভান এদিক ওদিক খুঁজতে খুঁজতে হাজির হল গ্রামের মাঝে। কিন্তু সেখানে গিয়ে তো হতবাক ইভান। ঝুয়াংদের ছোট্ট ছোট্ট খড়ে ছাওয়া কুঁড়েঘরগুলোর কেমন যেন নিঃঝুম, কোনও মানুষের কোলাহল তো দূর ফিসফাস শব্দও নেই। ঝুয়াংদের বেরি তোলার বেতের ঝুঁড়িগুলো ছড়িয়েছিটিয়ে পড়ে আছে। ইভানের তো ভারি চিন্তা হল। সাহস করে একটা কুঁড়ের ভেতর উঁকি দিল ইভান। এটাসেটা জিনিসপত্র হেথাহোথা গড়াগড়ি যাচ্ছে আর ঘরের পাতার বিছানায়, মাটির মেঝেয় শুয়ে আছে মানুষ। মড়ার মত ঘুমে আচ্ছন্ন তারা। ইভান বারবার জোর গলায় তাদের ডাকতে লাগল, গায়ে ঠ্যালা দিল কিন্তু কেউ চোখ মেললনা। আরও ক’টা কুঁড়েঘরে ছুটে গিয়ে দেখল ইভান। সবার এক অবস্থা।


শেষমেষ কী করবে ঠিক করতে না পেরে ইভান ফিরে এল নিংপিংয়ের কাছে। সবটা শুনে নিংপিং পড়ল চিন্তায়। গোটা গ্রামশুদ্ধু লোক এ কেমন কালঘুমের কবলে পড়ল রে বাবা? কিছুতেই এটা স্বাভাবিক ব্যাপার হতে পারে না। নির্ঘাৎ কোনও না কোনও মায়াবী শক্তির কাজ এটা। 

ইভান বলল, 

-“আমার ঝুলিতে অনেক জাদুটোটকা আর ওষুধপত্র আছে। একবার চেষ্টা করব ওদের জাগানোর?”


নিংপিং ইভানকে বলল, 

-“গ্রামবাসীদের জাগানোর চেষ্টা করে লাভ নেই। সমস্যার আসল সূত্রটা খুঁজতে হবে। কী ঘটেছে না জেনে জাদু করতে গেলে যদি হিতে বিপরীত হয়? তুমি আমার পিঠে উঠে বোসো। একবার চারপাশটা ঘুরে দেখি চলো। আমার মন বলছে তিয়াংঝু পাহাড়েই লুকিয়ে আছে ঝুয়াংদের এই অদ্ভুত অবস্থার রহস্য।”

ইভানকে পিঠে নিয়ে নিংপিং উড়ে গেল আকাশের বুকে। ঝুয়াংদের গ্রামের চারপাশে চক্কর কেটে দেখতে থাকল পাখির চোখে। তারপর উড়ে গেল তিয়াংঝু পাহাড়ের দিকে। আরও আরও উঁচুতে উড়ে গেল নিংপিং। হঠাৎই ইভান চিৎকার করল,

-“ওই দ্যাখো!”


(৩)


পাহাড়ের যে দিকে ঝুয়াংদের গ্রাম তার উল্টোদিকে প্রায় চুড়োর কাছাকাছি একটা গুহা। গুহার সামনে বেশ খানিকটা খাঁজের মত সমতল জায়গা। সেখানে অনেকগুলো ছোটো ছোটো সবুজ ছোপ। নিংপিং ডানাদু’টো ভাঁজ করে শোঁওও করে নীচের দিকে উড়ে গেল। সমতল জায়গাটায় নামল, ইভানও পিঠ থেকে নামল। চারপাশের সবুজ ঝোপগুলো সত্যিসত্যিই বেরির ঝোপ। তাতে বেরি ফলেও আছে কিন্তু অদ্ভুতদর্শন বেরি। সবক’টা গাছের ফলই নীল রঙের। কোনও গাছের বেরি স্ট্রবেরির আকৃতির, কোনওটা বা র‍্যাস্পবেরির আবার কোনওটা বা ব্লুবেরির। কিন্তু সব নীল রঙের। নিংপিং আর ইভান তো হতবাক। এ আবার কী? 


এদিক সেদিক উঁকিঝুঁকি দিয়ে দেখতে দেখতে ইভান প্রায় গুহার সামনে পৌঁছে গেল। একটা ব্লুবেরি তুলে নিয়ে ঘুরিয়েফিরিয়ে দেখতে লাগল। বাকি বেরিগুলো তো কেমন অদ্ভুত দেখতে লাগছে, একমাত্র এটাই স্বাভাবিক লাগছে। ভাবতে ভাবতে যেই না একটা ব্লুবেরি মুখে পুরেছে ওমনি গুহার ভেতর থেকে একটা লোক চিৎকার করতে করতে ছুটে বেরিয়ে এল,

-“ওটা খেও না! ওটা খেও না!”

ইভান চমকে গিয়ে থুঃ থুঃ করে মুখ থেকে ফেলে দিল ব্লুবেরিটা। লোকটা বাইরে এসে ফের বলে উঠল,

-“ওটা বিষাক্ত ফল! ওটা খেলেই তুমি কালঘুমে তলিয়ে যাবে।”

ইভান বলল,

-“বাপ রে কী সাংঘাতিক! কিন্তু দেখতে তো একদম ব্লুবেরির মত। ভাগ্যিস তুমি বললে! কিন্তু... তুমি কে? এই পাহাড়ের ওপরে কী করছ? তুমি কি ঝুয়াংদের গ্রামের লোক?”

ইভানের এতগুলো প্রশ্নের উত্তরে লোকটা কিছু একটা উত্তর দেওয়ার জন্য মুখটা সবে খুলতে যাচ্ছিল এমন সময় একটু আড়ালে দাঁড়ানো নিংপিং ড্রাগনকে দেখে ভয়ে ভির্মি খাওয়ার জোগাড় হল। ইভান শিগগির লোকটাকে ধরে বলে উঠল,

-“আরে ভয় পেওনা ভয় পেওনা! ও নিংপিং ড্রাগনছানা, আমার বন্ধু। নিংপিং খুব ভালো মানুষ... মানে ভালো ড্রাগন আর কী। ও তোমার কোনও ক্ষতি করবে না। আমরা দু’জন এই তিয়াংঝু পাহাড়ে এসেছিলাম ব্লুবেরির সন্ধানে। কিন্তু পাহাড়ের কোলে ঝুয়াংদের গ্রামে গিয়ে দেখি ব্লুবেরি তো কোত্থাও নেই-ই উল্টে গ্রামবাসী সবাই কালঘুমে আচ্ছন্ন। তারই কারণ খুঁজতে আমরা এই পাহাড়ের চুড়োয় এসেছি।”


ইভানের সব কথা শুনে লোকটার ভয় কাটল। শান্ত হয়ে বসে বলতে শুরু করল সব কথা। 

-“আমার নাম লিউ জিয়াং। আমি ঝুয়াংদের গ্রামেরই দলপতি। বরাবরই খুব শান্ত জীবন ছিল আমাদের। এই তিয়াংঝু পাহাড়ের কোলে নানারকম বেরি চাষ করে আর সেই বেরি নানা জায়গার হাটেবাজারে বিক্রি করে আমাদের দিব্যি সুখে কেটে যেত দিন। কিন্তু একদিন হঠাৎই রাতের অন্ধকারে এক পাঁচমাথাওয়ালা ভয়ঙ্কর সাপ ‘ইয়েন জিং সুও’ এলো আমাদের গ্রামে। সমস্ত বেরি গাছের গোড়ায় ঢেলে দিল বিষ। আমদের দলের সবাই ভুল করে সেই বেরি খেয়ে তলিয়ে গেল গভীর ঘুমে। আমি তখন গ্রামে ছিলাম না তাই আমার কোনও ক্ষতি হ’লনা কিন্তু সেই পাঁচমাথাওয়ালা সাপ ‘ইয়েন জিং সুও’ এই পাহাড়ের গুহায় বন্দী করল আমাকে। ভয় দেখালো যদি আমি পালানোর চেষ্টা করি তাহলে আমার গ্রামের সকলকে মেরে ফেলবে। আমাকে বাধ্য করল এই পাহাড়ের গুহার সামনে বেরির ফলন করতে। এই গাছগুলোর গোড়ায় বিষ ঢেলে দেয় ওই ভয়ঙ্কর ‘ইয়েন জিং সুও’। তারপর সেই ফলের বীজ ছড়িয়ে দেয় সারা তিয়াংঝু পাহাড়ে। আমাদের সুন্দর তিয়াংঝু পাহাড় একটু একটু করে বিষপাহাড়ে পরিণত হচ্ছে। বদমাইশ ‘ইয়েন জিং সুও’ এখন পাহাড়ে বিষাক্ত বীজ ছড়াতেই গেছে। তোমরা এই সুযোগে শিগগির পালাও নইলে ও ফিরে এলে তোমাদের শেষ করে দেবে।”


নিংপিং বলল,

-“তুমি ভয় পেওনা লিউ জিয়াং। ‘ইয়েন জিং সুও’ যত বড় বিষধর আর ভয়ঙ্কর সাপই হোক না কেন, আমিও আগুন ছুঁড়ে ঠিক জব্দ করে ফেলব ওকে।”

ইভানও সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,

-“হ্যাঁ লিউ জিয়াং! তুমি তো নিংপিংকে চেনোনা। নিংপিং আমাদের সুপারহিরো। কত শত বদমাইশকে কব্জা করেছে জানো? হেকেটি ডাইনি তার শয়তান অনুচর হুয়াং সুওকে বন্দী করেছে, এমনকি দুষ্টু গ্রে নাইফটিথ হাঙ্গরও এখন নিংপিংয়ের বন্ধু হয়ে গেছে। একবার আসতে দাও তোমার পাঁচমুণ্ডু বিষরাজকে! নিংপিং কী করে দ্যাখো শুধু!”


(৪)


ওদের এইসব কথার মাঝেই হঠাৎ ভীষণ জোরে ‘সড় সড় সড়’ শব্দ উঠল, ঠিক যেন ঝড় উঠেছে। লিউ জিয়াং চমকে উঠে ইভানের হাতটা ধরে টেনে গুহার ভেতরদিকে নিয়ে গেল। নিংপিং ঝটপট পেছন ফিরেই দেখে একটা বিশাল লাল কালো চাকা চাকা দাগকাটা সাপ পাঁচ পাঁচটা ফণা তুলে ওর ঠিক পেছনেই এসে পড়েছে। যে কোনও মুহূর্তে একটা উদ্যত ফণা আছড়ে পড়তে পারে ওর এর উপর। নিংপিং গুহামুখটা আড়াল করে দাঁড়ালো যাতে সাপটা গুহার ভেতরের ইভান আর লিউ জিয়াংয়ের ওপর হামলা না করতে পারে। নিংপিং মুখ থেকে আগুন ছুঁড়ল ইয়েন জিং সুওর একটা মাথা লক্ষ্য করে। অতবড় সাপটা বিদ্যুৎগতিতে দু’টো মাথা দু’দিকে সরিয়ে নিল, নিংপিংয়ের ছোঁড়া আগুনের গোলাটা মাঝখান দিয়ে বেরিয়ে গেল। নিংপিং আরও কয়েকবার আগুন ছুঁড়ল কিন্তু প্রতিবারই সাপটা ঠিক মাথা হেলিয়ে কাটিয়ে গেল। বেশ কঠিন প্রতিপক্ষের পাল্লায় নিংপিং বুঝতে পারছে। এদিকে গুহার মুখটা ছেড়ে নিংপিং উড়েও যেতে পারছেনা যে আকাশপথে আক্রমণ করবে। নিংপিং সরলেই ইভান আর লিউ জিয়াং অসুরক্ষিত হয়ে পড়বে। 


নিংপিং নিজের বড় বড় ডানা দু’টোকে ঝাপটে ধুলোর ঝড় তুলল, যাতে সাপটার চোখে ধুলো ঢুকে আর দেখতে না পায়। কিন্তু সাপটা অদ্ভুতভাবে মাথা দোলাতে দোলাতে নিংপিংয়ের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। নিংপিংয়ের কেমন যেন ঘোর লেগে যেতে থাকে। ডানাদু’টো ভারী হয়ে আসে, নিস্তেজ হয়ে পড়ে। ইয়েন জিং সুও সম্মোহন করছে! নিংপিংয়ের দু’চোখে ঘুম নেমে আসে। ধপাস করে পড়ে যায়। ওমনি সঙ্গে সঙ্গে ইয়েন জিং সুওর ফণা নেমে আসে নিংপিংয়ের শরীর লক্ষ্য করে। ইভান আর লিউ জিয়াং চিৎকার করে বেরিয়ে আসে গুহা থেকে কিন্তু ততক্ষণে ইভানের শরীরের কঠিন ড্রাগনস্কেল ভেদ করে বসে গেছে ইয়েন জিং সুওর দু’টো ধারালো বিষদাঁত।  


ইভান এতক্ষণ চুপ করে বসে ছিলনা গুহায়। তার ঝোলা থেকে বার করেছিল বেগুনি পোশনে ভরা কাঁচের বোতল। হেকেটি ডাইনির কাছে শেখা জাদুবিদ্যায় তৈরি সেই বড় থেকে ছোটো করার জাদু পোশন। শয়তান ইয়েন জিং সুও নিংপিংকে আক্রমণ করার পরেই আশা করেনি আরও কেউ ওকে ফিরে আক্রমণ করবে। কিছু বোঝার আগেই ইভান বোতলশুদ্ধু বেগুনি পোশন ছুঁড়ে মারল ওর আগে। সঙ্গে সঙ্গে ইয়েন জিং সুওর বিশাল পাঁচপাঁচটা ফণাওয়ালা শরীরটা ছোটো হতে হতে একটা কেঁচোর আকারের হয়ে গেল। ইভান ওমনি একটা ফাঁকা কাঁচের বোতলে ভরে নিল ক্ষুদ্রাকৃতি ইয়েন জিং সুওকে। কাঁচের বোতলে ফণা ঠুকে ঠুকে হাজার বিষ ঝেড়েও সে কাঁচ ভাঙতে পারলনা সে। শিশিটা ঝোলায় ভরে নিল ইভান। 


এদিকে নিংপিংয়ের সারা শরীর ততক্ষণে বিষের প্রভাবে নীল হয়ে গেছে। ইভান ছুটে এসে ওকে পরীক্ষা করে বলল, 

-“আমি নিংপিংয়ের শরীর থেকে বিষ দূর করে ওকে বাঁচানোর একটা উপায়ের কথা জানি, বইয়ে পড়েছি। কিন্তু সেই জড়িবুটিটা তৈরি করার সব উপকরণও আছে আমার কাছে, কিন্তু মুশকিল হল ওষুধটা ব্লুবেরির রসে মিশিয়ে খেতে হবে। নাহলে কোনও ফল হবে না। কিন্তু ব্লুবেরি তো কোত্থাও নেই! যা ছিল তাদের সবগুলোকেই তো ইয়েন জিং সুও বিষাক্ত করে দিয়েছে। এবার তাহলে কী হবে?”

লিউ জিয়াং বলে উঠল,

-“কিচ্ছু চিন্তা কোরো না। আমি ইয়েন জিং সুওর নজর এড়িয়ে, সব জাতের বেরির গাছ একটা করে বাঁচিয়ে রেখেছি এই গুহার পেছনের একটা লুকনো জায়গায়, বিষাক্ত হতে দিইনি। তাতে ব্লুবেরি ধরেছে বেশ কিছু। আমি এক্ষুনি আনছি।” 


(৫)


ইভান আর লিউ জিয়াং মিলে ব্লুবেরির রসে মেশানো ওষুধ খাইয়ে জ্ঞান ফিরেয়ে আনল নিংপিংয়ের। ইভান নিংপিংকে কাঁচের বোতলে বন্দী কেঁচো আকৃতির ইয়েন জিং সুওকে দেখিয়ে বলল,

-“এই দ্যাখো নিংপিং! হেকেটি ডাইনির পোশন একটা ভালো কাজে লাগল।”

নিংপিং ইভানকে জড়িয়ে ধরে বলে উঠলো,

-“ভাগ্যিস তোমায় সঙ্গে নিয়ে এসেছিলাম ইভান! তাই তো তুমি আমাদের বাঁচালে। এই তিয়াংঝু পাহাড় অভিযানের হিরো তুমিই!”

ইভান হেসে উঠল। 

নিংপিং লিউ জিয়াংকে বলল,

-“চলো ইভান আর তুমি আমার পিঠে উঠে বোসো। তোমায় তোমার গ্রামে পৌঁছে দিই। ইভানের জড়িবুটি ওষুধ দিয়ে তোমার গ্রামের সকলকে সুস্থ করে আমরা আবার ফিরে যাব আমাদের বাড়িতে, আমাদের আত্মীয় বল্ধুদের কাছে। আর এই শয়তান ইয়েন জিং সুওকে বন্দী”

লিয়াং জিউ মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানিয়ে বলল, 

-“নিংপিং আর ইভান! তোমাদের দু’জনের প্রতি আমরা সমস্ত ঝুয়াং উপজাতি কৃতজ্ঞ থাকব। আর নতুন করে ব্লুবেরির ফলন হলেই তোমাদের সকলের জন্য আমরা ঝুঁড়িভর্তি করে ব্লুবেরি পাঠাবো আমরা।”


আনন্দে একপাক ঘুরে নিয়ে নিংপিং উড়ে চলল তিয়াংঝু পাহাড়ের পাদদেশে ঝুয়াংদের গ্রামে। অনেক কাজ বাকি। সব সেরে বন্ধুদের কাছে শিগগির ফিরে গিয়ে আজকের গল্পটা শোনাতে হবে তো! 


(পরের চ্যাপ্টারে আবার দেখা হবে...) 


ছবি : আমি

No comments:

Post a Comment