নিংপিং আর দলবলের সমুদ্রযাত্রা
সুস্মিতা কুণ্ডু
(১)
নিংপিংয়ের জীবনটাই হল গিয়ে, ওই মা কী যেন বলে, হ্যাঁ ‘অ্যাডভেঞ্চুরা’! ওই জিনিসটিতে ভরা। সবসময়ই কিছু না কিছু একটা ঘটতেই থাকে। এই মায়ের ডানার তলায় লুকিয়ে টমেটোপোড়া খাচ্ছিল তো এই বিশাল নীল সমুদ্দুরে ভেসে চলেছে, ‘ম্যাজিক হর্স’ এর পেটের ভেতর ঢুকে। আরে না না ভয় পেওনা তোমরা। নিংপিংকে কোনও ম্যাজিক হর্স সত্যি সত্যি খেয়ে ফেলেনি। ‘ম্যাজিক হর্স’ তো নিংপিংদের জাহাজের নাম। মানে ওই ক্যাপ্টেন উডহেডদের যে দলদস্যু জাহাজটা ছিল, সেইটিকে মেইলিং এর বাবা, রাজামশাই কারিগর দিয়ে আরও শক্তপোক্ত বড় করে গড়ে দিয়েছেন। অতদূরের পথ পেরিয়ে অভিযানে যাবে বলে কথা নিংপিং আর তার দলবল। জাহাজের গায়ে হলুদ রঙ করা হয়েছে। আর জাহাজের সামনের কাঠে আগে যে দানবের মূর্তি খোদাই করা ছিল সেটা সরিয়ে একটা মিষ্টিমতো ইউনিকর্নের মুখ খোদাই করা হয়েছে। আর সেই জাহাজের নাম রেখেছে হম্পকম্প গোটালাট্টু। হম্পকম্প তো সি হর্স আর আজুল একশিংওয়ালা হর্স। তাই সব মিলিয়ে জাহাজের নাম হয়েছে ম্যাজিক হর্স। হম্পকম্পকে ওরা অ্যাডভেঞ্চুরাতে নিয়ে যাচ্ছেনা বলে ওর বেজায় মনখারাপ হয়েছিল কিন্তু নতুন জাহাজের নামকরণ করে খুব খুশি হয়েছে। মড়ার খুলির পতাকাটা সরিয়ে খুব সুন্দর একটা সাদা পতাকা ওড়ানো হয়েছে জাহাজের মাথায়। তাতে একটা বেগুনি লান হুয়া ফুলের ছবি আঁকা।
তাহলে শেষমেষ কে কে যাচ্ছে ম্যাজিক হর্সে চেপে ইউনিকর্নদের দ্বীপ তিয়েরা এর্মোসাতে? আজুল আর তার চার বন্ধুকে নিয়ে যাচ্ছে নিংপিং, ইভান-রেভেন দুই ভাইবোন, গোল্ডি, ক্যাপ্টেন উডহেড, রাঁধুনি ডামডাম, তোতা প্যাঁকাও, ফুফেং কাছিমদাদু। আর জাহাজের পিছুপিছু সাঁতরে যাবে নাইফটিথ হাঙর। অবশ্য রাজামশাই জাহাজের ডেকে একটা বিশাল বড় জলের গামলা বসিয়ে দিয়েছেন। যদি নাইফটিথ সাঁতরে হাঁপিয়ে পড়ে তবে নিংপিং ওকে জল থেকে এনে গামলায় একটু জিরেনের ব্যবস্থা করে দেবে। ফুফেং দাদুও ওই গামলায় একটু গা ভিজিয়ে নিতে পারবে। মেইলিং আর ওশিয়ানার যাওয়ার উপায় নেই, ওদের তো নিজের নিজের রাজ্য সামলানোর জন্য থাকতেই হবে।
(২)
অন্যমনস্ক হয়ে লাল টুকটুকে সূর্যটাকে নীল জল থেকে থেকে উঁকি মেরে উঠতে দেখছিল নিংপিং। এমন সময় ম্যাপটা হাতে নিয়ে ইভান এল। বলল,
-“নিংপিং তিনদিনের পথ আমরা পেরিয়ে এসেছি। এবার মনে হয় আসবে নীলঘূর্ণির এলাকা। ম্যাপটায় আরেকবার চোখ বুলিয়ে নিই চলো।”
ম্যাপটার দিকে তাকাল নিংপিং। বিবর্ণ হলুদ একটা পাতা। তাতে হিজিবিজি নানা আঁকিবুঁকি। বোঝার উপায় নেই যে ওটা একটা ম্যাপ। এমন সময় ক্যাপ্টেন উডহেড এসে হাজির ডেকে। কোমর থেকে দূরবীনটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
-“এটা দিয়ে দেখো।”
দূরবীনটা চোখে লাগিয়ে, কাঁচ লাগানো জায়গাটা গোল গোল করে ঘোরাতে ঘোরাতে ম্যাপের দিকে তাকাতেই ফুটে উঠল নানারকম অর্থবহ চিহ্ন।
হলুদ পাতাটার বেশিরভাগটাই নীল বর্ণের দেখতে লাগছে দূরবীনের ভেতর দিয়ে। তার মানে সমুদ্র! সেই নীলের এক কোণে একটা বড় লাল রঙের ক্রস দেওয়া। ওইটে হল ইউনিকর্নদের তিয়েরে এর্মোসা দ্বীপ। কিন্তু ওই লাল ক্রস অব্দি পৌঁছনোর আগে আরও অনেকগুলো গোল গোল চিহ্ন রয়েছে। ওগুলোই হল আসল বিপদ। ওইটি হল নীলঘূর্ণির ফাঁদ। সমুদ্রে একটা জায়গায় নানারকমের চোরাস্রোত আছে। তার মধ্যে এক একটা আবার ঘূর্ণির মত পাক খেয়ে চলেছে। কোনও প্রাণী যদি সেই ঘূর্ণির কবলে পড়ে তাহলে জলে পাক খেতে খেতে সলিল সমাধি ঘটবে, সে যত বড়ই হোক না কেন। আর যদি কোনও জাহাজ ভুল করে পড়ে ঘূর্ণির ফাঁদে তাহলে কাঠের জাহাজ টুকরো টুকরো হয়ে চূর্ণ হয়ে যাবে।
দূরবিনটা ম্যাপের ওপর থেকে সরিয়ে দূরের সমুদ্রের দিকে তাক করে ক্যাপ্টেন উডহেড। নীল জলের ঘূর্ণি, বিপদসংকেত! ফুফেং কাছিমদাদু জাহাজেই ছিল। বলে উঠল,
-“এই বিপদ থেকে বাঁচার একটাই উপায়। নিংপিং তুমি মাস্তুলের ডগায় একটা শক্ত দড়ি বেঁধে দড়ির অন্যপ্রান্ত তোমার পায়ে বেঁধে আকাশপথে উড়ে চলো। তোমাকে অনুসরণ করে উডহেড জাহাজ চালাবে। তুমি ওপর থেকে দেখে, ঘূর্ণি বাঁচিয়ে যেভাবে পথনির্দেশ করবে ঠিক সেই পথেই চলবে জাহাজ। হ্যাঁ তবে তার আগে নাইফটিথকে জল থেকে তুলে এনে এই গামলায় ছেড়ে দাও। নইলে ওই ঘূর্ণির প্রবল টানে ও ভেসে চলে যাবে।”
এমন সময় গোল্ডি ম্যাকমাফিন লেপ্রিকন বলে ওঠে,
-“আচ্ছা একটা জিনিস গোল্ডির মাথাতে কিছুতেই ঢুকছে না। এই উডহেড আর ডামডামরা তো আগেও ইউনিকর্ন দ্বীপে গেছে। তাহলে ওরা নিজেরাই জাহাজ চালিয়ে নিয়ে যেতে পারবেনা কেন? নাহ্ গোল্ডি তো কিছুই বুঝতে পারছেনা রকমসকম! গোল্ডির মনে হচ্ছে এই উডহেড আর ডামডাম নিগ্ঘাত বদমাইশি করছে। ওরা সোজাপথে নিয়ে গেলে নিংপিং বেচারাকে এতো খাটতে হত না!”
গোল্ডির এই এক মুদ্রাদোষ! ও নিজেকেও নাম ধরে সম্বোধন করে। ‘গোল্ডি এই, গোল্ডি তাই, গোল্ডি যাবে, গোল্ডি খাবে!”
যারা গোল্ডির এই স্বভাবের কথা জানেনা তারা তো বেজায় ধন্ধে পড়ে যায়। নিংপিংরাও আগে আগে গুলিয়ে ফেলত, এখন অবশ্য সবারই শুনে শুনে অভ্যেস হয়ে গেছে।
কিন্তু মুশকিল হল নতুন জলদস্যু সঙ্গীদের তো আর অভ্যেস হয়নি! গোল্ডির কথা শুনে ডামডাম টুফিঙ্গার রান্নাঘর থেকে ছুটে বাইরে এসে চেঁচিয়ে উঠল,
-“কে রে কে রে! কোন ব্যাটা গোল্ডি শুনি? আমাদের নামে বদনাম করচে! আজ তারই একদিন কী আমারই একদিন!”
এই শুনে তো গোল্ডি ম্যাকমাফিনও তেড়েফুঁড়ে এল,
-“বেশ করেছে গোল্ডি বলেছে! জলদস্যুদের দুষ্টুকাজের জন্যই তো আজুলদের এই দুরবস্থা। এখন নিংপিংকে এত বিপজ্জনক পথ দিয়ে জাহাজ টেনে নিয়ে যেতে হচ্ছে। আবার বলবে গোল্ডি জলদস্যুরা দুষ্টু!”
-“তবে রে! কই দেখি কোথায় সেই গোল্ডি! আজ হেস্তনেস্ত করতেই হবে! আমি চললুম গোল্ডিকে খুঁজতে, জাহাজের কোন কোণে সে লুকিয়ে আছে তাকে আমি খুঁজে বার করবই।”
ওদের এই ঝগড়ায় বাকিরা বেশ মজা পেতে লাগল। ডামডাম তো বুঝতেই পারছে না, ‘গোল্ডি’ বলতে গোল্ডি নিজেকেই বোঝাচ্ছে। এখন খুঁজে বেড়াক গোল্ডিকে জাহাজময়। গোল্ডিও খানিকটা ভড়কে গেছে যেই না ডামডাম দুমদুম করে পা ফেলে ‘গোল্ডি’ কে খুঁজতে গেছে।
-“গোল্ডি তো এখানে, ডামডাম তবে আবার কোথায় গেল গোল্ডিকে খুঁজতে? ভয় পেয়ে পালিয়েছে ব্যাটা নির্ঘাৎ! হুঁহ্ গোল্ডির সাথে লড়তে এসেছিল, ডামডাম ভীতুর ডিম। আজ থেকে ওকে আমি ডামডিম বলে ডাকব। নাকি ডিমডাম বলব? কোন নামটা ভালো হবে!”
ভাবতে ভাবতে গোল্ডি থেবড়ে বসে পড়ল।
(৩)
কিন্তু গোল্ডির প্রশ্নটা খুব একটা খারাপ ছিল না। ফুফেং দাদু ক্যাপ্টেন উডহেডকে বলল,
-“সত্যি তো বাপু উডহেড! তোমরা আগের বার কী করে গিয়েছিলে আজুলদের দ্বীপে।”
উডহেড বলল,
-“সবই ওই ব্ল্যাকআইয়ের প্ল্যান ছিল। তোমাদের বললাম না ও অনেক জাদু জানত! ওর কোমরের ওই কালো পুঁটুলিতে জাদুগুঁড়ো আছে। জাহাজের পালে, মাস্তুলে, আর সামনে ছড়িয়ে দিত সেই গুঁড়ো। তাহলেই জাহাজ আপনাআপনিই সব বিপদ কাটিয়ে পৌঁছে যেত ওই দ্বীপে।”
ফুফেং দাদু তখন বলল,
-আচ্ছা রেভেন আর ইভান একবার তোমাদের জাদুশক্তি প্রয়োগ করে দেখবে নাকি? তাতে যদি কাজ না হয় তবে আমরা আগের পরিকল্পনা মতই এগবো আমরা।”
রেভেন আর ইভান ওদের ঝুলি থেকে নানরকম পোশনমোশন গুঁড়োটুড়ো শেকড়বাকড় বার করে নানারকম চেষ্টা করতে থাকে। কিন্তু কোনও ম্যাজিকেই কোনও লাভ হয়না। আজুল বলে ওঠে,
-“আমার মনে হয় যেহেতু তিয়েরে-এরমোসা যাওয়ার পথের এই বাধাগুলো রাজা রুহান জাদুবলে সৃষ্টি করেছিলেন তাই অন্য কোনওরকম জাদুর মাধ্যমে রাজা রুহানের জাদুর জাল থেকে বেরোনো যাবেনা! একমাত্র ইউনিকর্ন ম্যাজিক দিয়েই সম্ভব। বদমাইশ জলদস্যু ব্ল্যাকআইকে নিশ্চয়ই কোনও বিশ্বাসঘাতক ইউনিকর্নই আমাদের দ্বীপে আসার ম্যাপ আর রানি রোজালিন্ডের জাদুঘরে রাখা শক্তিশালী ইউনিকর্ন ম্যাজিকডাস্ট দিয়েছে। তার মানে আমাদের দ্বীপে আমাদের সাথেই মিশে রয়েছে এক বিশ্বাসঘাতক! তার শয়তানির জন্যই আমাদের এই চারবন্ধুর এই দুরবস্থা! একবার পৌঁছই আমি রাজ্যে, খুঁজে বার করে চরম শাস্তি দেব বিশ্বাসঘাতকটাকে!”
রাগে কাঁপতে থাকে আজুল। ওর মাথার নীল শিংটা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
আজুলকে বুঝিয়ে সবাই শান্ত করতে লাগল। জাদুর সাহায্যে যেহেতু বিপদগুলো পেরনো যাবে না তাই ফুফেং দাদুর আগের নির্দেশমতই সব হল। সবাই ডেকের ওপর একরাশ উৎকণ্ঠা নিয়ে দাঁড়িয়ে। আকাশপথে নিংপিং দিকনির্দেশ করছে। ক্যাপ্টেন উডহেড শক্তহাতে হুইল ধরে জাহাজকে ঘূর্ণির প্রবল টান উপেক্ষা করে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। উডহেড এমনিতে একটু হাঁদা হলে কী হবে, জাহাজ চালানোয় ওর জুড়ি মেলা ভার! এতজনের প্রাণ উডহেডের হাতেই।
খুব সাবধানে সাবধানে ঘূর্ণিসঙ্কুল জায়গাটা পার হওয়ার পরেই নিংপিং নেমে এল জাহাজের ডেকে। উডহেড হাততালি বাজিয়ে চ্যাঁচাতে লাগল,
-“ঘুটঘুটে ঘূর্ণি, শয়তানের জাঁতাকল, আমাকে কিনা চ্যালেঞ্জ! আমি হলুম উডহেড বংশের জলদস্যু! সামান্য জলের ফাঁদে ভয় পাবো আমি!”
সবাই উডহেডের হাঁকডাক দেখে হেসে ফেললেও রেভেন গম্ভীরমুখে বলল,
-“বিপদ কিন্তু এখনও কাটেনি। নীলঘূর্নি তো পেরিয়ে এলাম, এবার সামনে আছে ডুবোপাহাড়ের সারি। জলের তলায় লুকনো সব পাহাড়। একটায় যদি জাহাজের ধাক্কা লাগে তাহলেই সব শেষ! জাহাজের একশটা টুকরো হয়ে যাবে একেবারে।”
আজুল তখনও গুম হয়ে চুপ করে বসে আছে। মনে মনে খুব চিন্তা করছে বেচারা। ক্যাপ্টেন উডহেড ওর দিকে এগিয়ে এসে বলল,
-“আজুল, আমরা খুব অন্যায় করেছি তোমাদের সাথে। যদিও ব্ল্যাকআইয়ের প্ররোচনা বা জাদুশক্তির ভয়ে আমি আর ডামডাম এই কাজ করেছি, কিন্তু দোষ তো দোষই। আমি ক্ষমা চাইছি তোমার কাছে। আমি সবরকম চেষ্টা করব তোমাদের পাঁচজনকে নিরাপদে তোমাদের দ্বীপে পৌঁছে দিতে আর ওই বিশ্বাসঘাতককে খুঁজে বার করতে। আমি বা ডামডাম কেউই সেই ইউনিকর্নটিকে চোখে দেখিনি, দেখলেও কতটা চিনতে পারতাম কিনা জানিনা। শিং, ঘাড় আর লেজের কেশরের রং ছাড়া তোমরা যে সবাই একরকম দেখতে।”
আজুলের বন্ধুরাও বলে ওরা কাউকে দেখার আগেই মিষ্টি একটা গন্ধের প্রভাবে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল, আর জ্ঞান ফেরে জাহাজের খোলে। ঠিক আজুলেরই মত। তাও ওদেরও কোনও ধারনা নেই বিশ্বাসঘাতক ইউনিকর্নটা কে!
এসব শুনে আজুল খুব মুষড়ে পড়ে, নিংপিং তখন বলে,
-“আগে নিরাপদে তিয়েরে এর্মোসা পৌঁছে তোমার বন্ধুদের সুস্থ করে তুলি চলো আজুল। তারপর সব রহস্যের সমাধান করব আমরা, তোমায় কথা দিলাম আজুল। এখন শুনলেনা রেভেন কী বলল? বিপদ এখনও কাটেনি। সামনেই আসছে ডুবোপাহাড়ের সারি! আগে ওটা পেরোই চলো!”
(৪)
ম্যাপটার ওপর দূরবীনের কাঁচের ভেতর দিয়ে চোখ রাখল ইভান। একটু আগের ফেলে আসা গোল গোল ঘূর্নিচিহ্নর একটু পরেই আছে নীল জলে বাদামী বাদামী পাহাড়ের চূড়ার ছবি। মানে ডুবোপাহাড়ের এলাকা।
ডুবোপাহাড়ে ভরা দুর্গম পথটুকু কী করে পার হবে সেই নিয়ে নামা জল্পনা কল্পনা চলছে তখন ডেকের ওপর বসালো বিশাল জলের গামলার ভেতর থেকে হাঙ্গর গ্রে নাইফটিথ বলে উঠল,
-“আমি হাঙ্গরদের সর্দার থাকতে আর কিস্যু চিন্তা নেই! নিংপিং দোস্ত তুমি আমায় একটু এই গামলা থেকে তুলে ঝপাং করে জলে ফেলে দাও দেখি! আমি পথ বাতলাব। আমার থেকে ভালো সাঁতারু আর এ তল্লাটে নেই।”
সবার বেশ মনঃপুত হল বুদ্ধিটা।
নিংপিং নাইফটিথকে জলে ছেড়ে দিয়ে উডহেডকে বলল জাহাজ চালাতে। ইভান আর রেভেন ঝুলি থেকে একটা লাল রঙের গুঁড়ো বার করে একটা ফুটো থলেতে বেঁধে নাইফটিথের গলায় ঝুলিয়ে দিল। ও যেমনি যেমনি সাঁতার কেটে যাবে ওমনি ওমনি লাল রঙটা জলে গুলে গিয়ে নিশানা দেবে। উডহেডের সেই রঙ দেখে জাহাজ চালাতে সুবিধে হবে।
শুরু হল পরের বিপত্তি টপকানোর পালা। জাহাজ এঁকেবেঁকে চলতে লাগল ডুবোপাহাড়ের ধাক্কা বাঁচিয়ে। কিছু পাহাড়ের তবু ডগাটুকু দেখা যায়, কিন্তু বেশিরভাগই জলের ঠিক তলাটায় ঘাপটি মেরে রয়েছে। একবার জাহাজের সাথে ঘষা লাগলেই সব শেষ। নাইফটিথ কখনও ডুবে কখনও ভেসে, ডুবোপাহাড়ের ফাঁক গলে জাহাজ আসার মত নিরাপদ রাস্তা দেখিয়ে চলেছে। বেশ অনেকটা পথ আসার পর অবশেষে থামল নাইফটিথ। হেঁকে বলল,
-“আর সামনে পাহাড় নেই! শুধু জল। ডুবোপাহাড়ের বিপদ কেটে গেছে।”
নিংপি শিগগির ওকে সাগর থেকে তুলে গামলার জলে এনে রাখল। বেচারা এত সাঁতরে অবসন্ন হয়ে পড়েছে। ডামডাম শিগগির রান্নাঘরে ছুটল ওর জন্য মাশরুমের স্যুপ বানাতে।
ফুফেং দাদু বলল,
-“সূর্য প্রায় ডুবুডুবু। রাতের অন্ধকারে আর বেশি এগোনো ঠিক হবে না। উডহেড তুমি জাহাজের গতি একদম কমিয়ে দিয়ে ভাসিয়ে রাখো। নর্থস্টারটাকে লক্ষ্য রেখে দিক ঠিক রাখো শুধু। কাল দিনের আলো ফুটলে আবার এগোনো যাবে কেমন? প্যাঁকাও আর রেভেন তোমরাও উড়ে গিয়ে মাস্তুলের মাথায় বসে থাকো। কোনওকিছু অস্বাভাবিক লাগলেই জাগাবে সবাইকে।”
ফুফেং দাদুর কথামত সবাই গেল একটু বিশ্রাম নিতে।
(৫)
সারাদিনের নানা উত্তেজনা আর সমুদ্রযাত্রার ধকলের পরে বেশ জোরেই ঘুমটা ধরে এসেছিল সকলের। ফুফেং দাদু আর নাইফটিথ গামলার জলে ভেসে ভেসে ঘুমোচ্ছিল। নিংপিংও গামলার পাশে গুটিশুটি মেরে শুয়েছিল। নিংপিং এর ডানার তলায় গোল্ডি আর ইভানও ঢুকে পড়েছিল। ওদিকে ডামডাম রান্নাঘরের মেঝেতে শুয়েই ভোঁস ভোঁস করে নাক ডাকছিল। ক্যাপ্টেন উডহেড জাহাজের হুইলের ওপর বারবার ঢুলে পড়ে গিয়ে মাথা ঠুকছিল। এমন সময় ‘প্যাঁ প্যাঁ ক্যাঁ ক্যাঁ’ করে প্যাঁকাও আর দাঁড়কাকরূপী রেভেন প্রবল আওয়াজ করতে করতে ঝটপট করে ডেকে নেমে এল। রেভেন মানুষের রূপ নিয়ে চিৎকার করতে লাগলো,
-“ঝড়! ঝড়! বিদ্যুৎ! বিদ্যুৎ!”
প্যাঁকাও-ও ধুয়ো ধরল,
-“মেঘ! মেঘ! বিট্টি বিট্টি!”
ধড়মড়িয়ে সবাই জেগে উঠে চেয়ে দেখে প্রকৃতির রূপই বদলে গেছে। একটু যে আকাশ কত তারা ঝিলমিল করছিল সব এখন কোথায় যেন লুকিয়ে পড়েছে। তার বদলে আকাশ ছেয়ে গেছে দৈত্যের মত বিশাল বিশাল কালচে ধূসর মেঘে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে শুরু হল প্রকৃতির ভয়ানক তাণ্ডব। থেকে থেকেই তারা ফোঁস ফোঁস করছে, গর্জন করছে, হুঙ্কার ছাড়ছে। সমুদ্রে জলও কম যায়না, ফুলে ফুলে ফুঁসে উঠতে শুরু করছে। এক একটা ঢেউ মেইলিংদের রাজপ্রাসাদের মিনারটার মত উঁচু মনে হচ্ছে। ঘূর্ণীর বিপদ, ডুবোপাহাড়ের আতঙ্ক সব কাটিয়ে এসে শেষে এই বিশাল ঝঞ্ঝাতেই সলিল সমাধি ঘটবে নাকি জাহাজের।
ইভান জাহাজের প্রচণ্ড দুলুনির মধ্যেই ম্যাপের পাতাটা বার করে, দূরবীনটা চোখে লাগিয়ে দেখতে শুরু করল। ঘূর্ণীর চিহ্ন, ডুবোপাহাড়ের চিহ্নের পর ম্যাপের ওপর আছে কালো মেঘ আর উত্তাল ঢেউয়ের চিহ্ন। তার মানে এটাও রাজা রুহানেরই সৃষ্টি করা কৃত্রিম ঝড়, ইউনিকর্ন দ্বীপে পৌঁছনো থেকে দুষ্টু লোকেদের আটকানোর জন্য। এই বাধাটা পেরোলে পরেই দেখা যাচ্ছে ইউনিকর্ন দ্বীপের চিহ্ন। শিংওয়ালা ঘোড়ার মাথার আকৃতির দ্বীপটা।
জাদুশক্তি দিয়ে এই ঝড় থামানো সম্ভব নয়। এদিকে একটার পর একটা ঢেউ আছড়ে পড়ছে জাহাজের গায়ে। কাগজের নৌকার মত যে কোনও সময় ডুবে যেতে পারে জাহাজ। কী উপায় কী উপায়!
এমন সময় ডামডাম কোত্থেকে এসে একটা বড় পিপে ভর্তি কী যেন একটা জলে ঢেলে দিল। সবাই হইহই করে উঠল, ‘কী করছ! কী করছ!’ গোল্ডি চ্যাঁচাতে লাগল,
-“আর গোল্ডি বাঁচবে না! গোল্ডি এবার মরেই যাবে! গোল্ডি মরে গেলে গোল্ডির সোনাভর্তি কলড্রন কী হবে! রামধনুর কী হবে!”
সোনাভর্তি কলড্রন শুনে ডামডাম থমকে দাঁড়াল,
-“অ্যাঁ! সোনা! কোথায় সেই গোল্ডি? কোথায়? আমার গোল্ডি চাই না আমার সোনা চাই।”
ডামডামকে এক ধমক দেয় ক্যাপ্টেন উডহেড,
-“এই উল্লুক ডামডাম! উজবুক নোনা ঘাম! আমরা এখন আর জলদস্যু নেই ভালো মানুষ হয়ে গেছি, সেটা ভুলে গেলি নাকি গোবরমাথা! ভাঙা ছাতা! যা করছিলি কর শিগ্গির।”
ডামডামকে বকুনি দেওয়ার পর সবার দিকে ফিরে উডহেড বলল,
-“চিন্তা কোরো না! ডামডাম সমুদ্রের জলে তেল ঢালছে। বহুদিন আগে আমরা একটা সওদাগরের জাহাজ লুট করেছিলাম। কিছুই পাইনি শুধু পিপের পর পিপে ভর্তি তেল ছাড়া। সেই তেলের পিপেই জাগাজের খোলের ভেতর পড়েছিল আমি ডামডামকে এনে ঢালতে বললুম।”
গোল্ডি ফের চ্যাঁচাতে লাগল,
-“অ্যাঁ! এখন সবাই ঝড়ের কবলে মরতে চলেছে আর এইটে তোমাদের জাহাজ সাফাই করার সময়? বলি তোমাদের কী ঘটে বুদ্ধিশুদ্ধি কিছুই নেই?”
ফুফেং দাদু গোল্ডিকে থামিয়ে বলে ওঠে,
-“না না! উডহেড ঠিক করেছে। আমিও শুনেছি উত্তাল ঢেউওয়ালা সমুদ্রে তেল ঢাললে সমুদ্র শান্ত হয়ে আসে। তেলের আস্তরণে ঢাকা পড়ে গেলে জল আর ফুঁসে ফুলে ফেঁপে উঠতে পারেনা। সবাই হাত লাগাও ঝটপট।”
ফুফেং দাদুর কথা শুনে ঝগড়া চেঁচামেচি থামিয়ে সবাই জাহাজের খোল থেকে তেলের পিপে এনে সমুদ্রে ঢালতে শুরু করল। যেমনি যেমনি তেল গড়িয়ে জলে পড়তে লাগল, জলের পাগলা নাচন একটু একটু করে শান্ত হয়ে আসতে লাগল। উডহেড অমনি ঝটপট জাহাজ চালিয়ে এগিয়ে যেতে শুরু করল।
এভাবে বেশ খানিকটা পথ অতিক্রম করার পর দেখা গেল আকাশের কালো মেঘ ছিঁড়ে নরম আলো আসছে। তার মানে এই ঝড় ঝঞ্ঝার ভেতরেই কখন সকাল হয়ে গেছে। জাহাজ যত এগোতে সাগল ততই সমুদ্র শান্ত হয়ে আসতে লাগল, মাথার ওপর নীল আকাশ দেখা দিতে লাগল। দূরের দিগন্তে লাল টুকটুক সূর্যটা লুকোচুরি খেলার মত মুখ বাড়িয়ে উঁকি দিতে শুরু করল। সেই ভোরের সূর্যের লাল আলোতে আরেকটা লম্বা কালো রঙের অংশ স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল। প্যাঁকাও মাস্তুলের ওপর থেকে চেঁচিয়ে উঠল,
-“আহোয় ক্যাপ্টেন! সামনে ডাঙ্গা!”
যত জাহাজ এগোতে লাগল তত পরিষ্কারভাবে দেখা যেতে লাগল। নীল জলের মাঝখানে জেগে ওঠা একটা সবুজ দ্বীপ।
আজুল ডেকের ওপর থেকে দূরের জেগে ওঠা ভূমিখণ্ডটার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,
-“তিয়েরে-এর্মোসা! আমাদের বাড়ি!”
ছবি : আমি
(ও হ্যাঁ! পরের পর্ব তো আসবে ঠিকই, তার আগে আমায় ট্রেজার ম্যাপ এঁকে দেখিও একটু ছোট্ট বন্ধুরা। খুব মজার কাজ কিন্তু এটা।)

No comments:
Post a Comment