চ্যাপ্টার ৭ : নিংপিং, আজুল আর দস্যুদল


নিংপিং, আজুল আর দস্যুদল 

সুস্মিতা কুণ্ডু


(১)


 নিংপিং একটা ছোট্ট ড্রাগনছানা হলে কী হবে, একটা বড় সত্যি কথা নিংপিং তার এই এত্তগুলো অ্যাডভেঞ্চুরা করার অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝেছে। বন্ধুকে কথা দিলে সেই কথা রাখতে হবে নইলে বন্ধুত্বের দামটা আর কী রইল বলো তো? 


বেচারা আজুল, তিয়েরে-এর্মোসা দ্বীপের ইউনিকর্ন। জলদস্যুদের হাতে বন্দী হয়ে এসে পৌঁছেছে নিংপিংদের রাজ্যে। আজুল কোনওমতে জলদস্যুদের কবল থেকে পালালেও, ওর চার বন্ধু এখনও বন্দী আছে জলদস্যু জাহাজে। কপালফেরে নিংপিংরা যখন সমুদ্রের ধারে সকলে পিকনিক করছিল তখনই কাকতালীয়ভাবে নিংপিংদের সঙ্গে দেখা হয়ে যায় আজুলের। আজুলের মুখে সবটা শুনে নিংপিং আর তার দলবল কি চুপ করে বসে থাকতে পারে? তোমরাই বলো! সঙ্গেসঙ্গে ওরা তৈরি হল জলদস্যুদের উচিত শিক্ষা দিয়ে বন্দী ইউনিকর্নদের মুক্ত করার জন্য। এদিকে আজুল চোট পেয়েছে সাংঘাতিক। ওকে তাই ইভান, রাজকন্যে মেই লিং, ওশিয়ানা জলপরী, হম্পকম্প গোটালাট্টু ঘোড়ামাছ আর গোল্ডি ম্যাকমাফিনের তত্ত্বাবধানে রেখে নিংপিং চলল বন্দী চার ইউনিকর্নদের উদ্ধার করতে। সঙ্গে গ্রে নাইফটিথ হাঙর, ফু ফেং কাছিমদাদু আর ইভানের বোন রেভেন। 


আজুল জলদস্যু জাহাজটার যেরকম বর্ণনা দিয়েছিল সেইরকম দেখতে জাহাজ বন্দরে কেউ না দেখলেও নাইফটিথ হাঙর বললে যে সমুদ্রের জল যেখানে খাঁড়ির মত ঢুকে এসেছে সেই দিকপানেই অমন জলদস্যু জাহাজ দেখেছে সে তাই ওর দেখানো পথেই এগোলো নিংপিংরা।  


অনেকটা যাওয়ার পর দেখা গেল একটা নির্জন মত জায়গা, যেখানে সমুদ্রেরই কিছুটা অংশ বেশ খানিকটা ডাঙ্গার ভেতর ঢুকে এসেছে। অনেক ঝোপঝাড় আর গাছপালায় বেশ ঢাকা মত এলাকা। কাছাকাছি কোনও মনুষ্যবসতি নেই। চট করে লোকের চোখে পড়বেনা এরকম একটা জায়গায় নোঙর করা একটা বেশ শক্তপোক্ত জাহাজ। জাহাজটা কালো রঙের মজবুত কাঠের তৈরি। জাহাজের মুখের কাছে একটা দানবের শরীরের অর্দ্ধেকটা অংশ কাঠে খোদাই করা। ধূসর পালগুলো গোটানো আর মাস্তুলের পতাকাটাও নামানো তবে কালো পতাকার ফাঁক দিয়ে সাদা কঙ্কালের ছবির কিছুটা দেখা যাচ্ছে নিঃসন্দেহে এটাই সেই জাহাজ, জলদস্যুদের জাহাজ। 


জাহাজের ডেকের ওপর একটা হুমদোহামদো লোক বসে বসে পেঁয়াজ কাটছে আর হাপুস নয়নে কাঁদছে, লোকটার মাথায় একটা কালো ফেট্টি বাঁধা। নিংপিং আর রেভেন গাছের আড়ালে লুকিয়ে লক্ষ্য করতে লাগল। ওদিকে নাইফটিথ আর বাকিরাও জাহাজের একেবারে পেছনে গিয়ে জলের তলা থেকে নজর করতে লাগল। এতটা সবুজ বরণ গা আর লালটুকটুক মাথাওয়ালা বড়সড় চেহারার পাখি জাহাজের রাঠের রেলিং এর ওপর বসে কর্কশ গলায় ডাকছে আর বলছে,

-“ক্যাঁ ক্যাঁ! ঘোড়ার পচা ডিম, বেবুনের মাথার উকুন! ক্যাঁ ক্যাঁ! হাঙরমাছের স্যুপ রাঁধ! কাছিমের চচ্চড়ি রাঁধ!”

এই শুনে তো জলের তলায় নাইফটিথ আর ফুফেং দাদু ঢোক গিলে এ ওর মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। 

যে লোকটা পেঁয়াজ কাটছিল সে রেগে তেড়েফুঁড়ে উঠে বলল, 

-“এই বজ্জাত প্যাঁকাও! ফের যদি ক্যাঁ ক্যাঁ করবি তাহলে তোকেই কেটেকুটে ঘন্ট রেঁধে ফেলব। সদ্দার! ও সদ্দার! তোমার এই বেয়াদব পাখি আমায় রান্না করতে দিচ্ছেনা! পরে যেন বোলোনা খাবার আনতে দেরি হল কেন!”

ও তার মানে এই লোকটা জলদস্যুদের রাঁধুনি। লোকটার বকুনি শুনে পাখিটা আরও উড়ে মাস্তুলের ডগায় বসে তারস্বরে চেঁচাতে লাগল, 

-“ডামডাম ডামডাম

   খায়দায় হুমহাম,

   মোটে দুটো ফিঙ্গার

   দুমদাম মারমার!”


এত হইহট্টগোল শুনে জাহাজের খোলের কেবিন থেকে বেরিয়ে এল আরও দু’টো লোক। একটা লোকের ইয়া লম্বা ঝাঁকড়া চুল আর দাড়ি, দাড়ির ডগায় আবার বিনুনি করা। মাথায় একটা বাহারী টুপি, কোমরে ইয়ালম্বা খাপসহ একটা তরোয়াল। গলায় সাদা ঝালরওয়ালা জামা পরে আছে। আর অন্য লোকটার পরিষ্কার করে ছাঁটা চুলদাড়ি। বাঁ চোখে কালো চোখঢাকা ফেট্টি বাঁধা। অন্য চোখের দৃষ্টিটা একদম একটা পাক্কা শয়তানের মত। সরু গোঁফের ডগাদু’টো মোম দিয়ে পাকানো। এরও কোমরে একটা তরোয়াল কিন্তু সেটা চ্যাপ্টা নয়, কেমন সরু গোল মত আর মুখটা তীক্ষ্ন। 

বাহারীটুপি লোকটা আসতেই পাখিটা মাস্তুলের ডগা থেকে উড়ে নেমে এসে ওর কাঁধে বসল। লোকটা বলে উঠল, 

-“কী রে প্যাঁকাও ফের জ্বালাতন করছিস ডামডামকে? আর এই যে ডামডাম! বাসি টুনা মাছের কানকো, শেয়ালের ল্যাজের লোম, ট্রোলের নাকের সর্দি! রান্নার নামে কান্না হচ্ছে!”

-“সদ্দার আমি তো রান্নাই করছিলুম এই প্যাঁকাও বজ্জাতটাই তো...”

তার মানে এই বাহারটুপি লম্বাদাড়ি লোকটা এই জলদস্যুদের দলের সর্দার, ফিসফিসিয়ে নিংপিং বলল রেভেনকে। 


এদিকে একচোখো লোকটা বিরক্তির সুরে বলে উঠল, 

-“থামো সবাই! এরা নাকি সব জলদস্যু! জলদস্যুর নামে অপবাদ সব! যে যার কাজ করো শিগগির! এই বুদ্ধু টুফিঙ্গার, খাবার যদি ভালো না হয়েছে তোমার বাকি দুটো ফিঙ্গার ঘ্যাচাংফু করে দেব। ডামডাম নোফিঙ্গার হয়ে যাবে তখন!”

লোকটার ধমক শুনে রাঁধুনিটা ভয়ে চুপচাপ চলে গেল পেঁয়াজ কাটতে ফের। বাহারিটুপি লোকটা রাগ দেখিয়ে বলল, 

-“দ্যাখো বাপু তুমি জাহাজের ফার্স্টমেট, জনি ব্ল্যাকআই! সেই মতোই থাকো! এই জাহাজ আমার বাবা রেডবিয়ার্ডের লুকিয়ে রাখা গুপ্তধনের শেষ সোনাটুকু দিয়ে কেনা। তাই আমি এই জাহাজের সর্দার, ক্যাপ্টেন লংবিয়ার্ড উডহেড! আমাকে মান্যিগন্যি না করলে কিন্তু তোমার হাত বেঁধে কাঠের তক্তার ওপর দিয়ে হাঁটিয়ে মাঝসমুদ্রে হাঙরের ঝাঁকের ভেতর ফেলে দেব। বুঝলে বেগুনপোড়ার জিভ কুটকুট, সমুদ্দুরের গন্ধ শ্যাওলা, লাল কাঁকড়ার...”

ব্ল্যাকআই ভেঙিয়ে উঠলো,

-“লাল কাঁকড়ার নীল ডিম, নীল টিয়ার লাল মাথা! ওই একটা কাজই তো পারো তোমরা উডহেড বংশের লোকেরা! অদ্ভুত কিম্ভুত গালাগালি দিতে। যেমন নাম তেমন কাজ, নীরেট মাথা গবেট যতসব। আবার ক্যাপ্টেন হয়েছে! যাও নিজের কেবিনে গিয়ে দাড়িতে বিনুনি পাকাও! যত কাজের কাজ তো আমাকেই করতে হয়।”

ক্যাপ্টেন লংবিয়ার্ড রেডউড গজগজ করতে লাগল,

-“লাল কাঁকড়ার নীল ডিম, নীল টিয়ার লাল মাথা! এটা আবার গালাগালি হল নাকি!”


জলদস্যুরা সব জাহাজের ভেতরে চলে যেতে, নিংপিং আর রেভেন চুপিচুপি গেল নাইফটিথ আর ফুফেং দাদুর কাছে। 


(২)


ফুফেং দাদু বলল,

-“আমরাও জাহাজের পেছনে লুকিয়ে সব শুনেছি। যা বুঝলাম এই জলদস্যু জাহাজের ক্যাপ্টেন হল ওই লংবিয়ার্ড উডহেড। ও ব্যাটা বেজায় বোকা। বিটকেল গালি দেওয়া ছাড়া আর কিছুই পারেনা। ওর কোমরের তরোয়ালখানা জীবনে চালিয়েছে কিনা সন্দেহ। ডামডাম টুফিঙ্গার জাহাজের রাঁধুনি, এই মক্কেলও হাঁদারাম। আমি লক্ষ্য করে দেখলুম ওর বাঁহাতে দুটো মোটে আঙুল ওইজন্যই ওর নাম টুফিঙ্গার মনে হয়। এরা দু’জনই মাথামোটা, আসল শয়তানি বুদ্ধি মনে হয় ওই একচোখো জনি ব্ল্যাকআই নামের ফার্স্টমেটটার। দেখলে না সবাইকে কেমন চোখ রাঙিয়ে মেজাজ দেখাল!”

-“তাহলে আমাদের এখন কী করা উচিত ফুফেং দাদু? হামলা করি নাকি?” 

বাকি তিনজন সমস্বরে বলল।

-“হুম! রেভেন আগে ওই প্যাঁকাও নামের টিয়াপাখিটাকে তাড়া করে একটু দূরে নিয়ে যাও। নাহলে ও চেঁচিয়ে বাকিদের সতর্ক করে দেবে! তারপর নিংপিং মুখ দিয়ে আগুন ছুঁড়ে ওদের ভয় দেখাও, ওরা ভয়ে জলে ঝাঁপ দিলে নাইফটিথ আর আমি ওদের কব্জা করব। আর যদি ডাঙ্গায় লাফায় তবে নিংপিং ওদের ধরবে।”

সবারই বেশ মনঃপুত হল বুদ্ধিটা। 


ফুফেং কাছিমদাদুর প্ল্যান মাফিক লড়াই শুরু করল নিংপিংএর দলবল। রেভেন ‘ক্কা ক্কা’ করে তাড়া লাগালো প্যাঁকাওকে। কিন্তু প্যাঁকাও জলদস্যু তোতা বলে কথা, সে কী আর দাঁড়কাক দেখে ভয় পাওয়ার বান্দা! সেও উল্টে তাড়া করল রেভেন কে ‘ক্যাঁও ক্যাঁও’ করে। রেভেন তো ভয়ের চোটে উড়ল জঙ্গলপানে। প্যাঁকাও ধাওয়া করল। ব্যাপারটা উল্টো হয়ে গেলেও প্যাঁকাওকে জাহাজ থেকে সরানোর উদ্দেশ্যটা সফল হল মোটামুটি। পাখিদের আওয়াজে সেই দুই আঙ্গুলে বোকা রাঁধুনি জাহাজের ডেকে বেরিয়ে এল। ওকে বেরিয়ে আসতে দেখে নিংপিং উড়ে গিয়ে অল্প করে ছোটোমত একটা আগুনের গোলা ছুঁড়ল তাক করে। ডামডাম তো একে ড্রাগন তায় আগুন দেখে তারস্বরে চেঁচাতে শুরু করল, 

-“বাঁচাও বাঁচাও! ইয়াব্বড় দানো আমায় আগুনে পুড়িয়ে তন্দুরি করে খেয়ে নিলো গোওওওও!” 

ততক্ষণে ডামডামের মাথার ফেট্টিতে আগুন লেগে গেছে। ডামডাম ঝাঁপ দিলো জলে। ওমনি কপাৎ করে পড়ল নাইফটিথ হাঙ্গরের খপ্পরে। ক্যাপ্টেন উডহেড আর ব্ল্যাকআইও বেরিয়ে এসেছে ডেকে। সামনেই নিংপিংকে দেখে ঘাবড়ে একশা। উডহেড চোখে চাপা দিয়ে বসে পড়ে কাঁপতে লাগল, বিড়বিড় করতে লাগল, 

-“অক্টোপাসের আটটা শুঁড়ের সুড়সুড়ির দিব্যি, নীলতিমির হাঁচির দিব্যি, আর কক্ষণও জলদস্যু হব না। জাহাজ বেচে দিয়ে একটা খামার কিনব, সেখানে গমচাষ করব।”


একমাত্র শয়তান ব্ল্যাকআই কোমরে ঝোলানো একটা কালো ছোটো পুঁটুলি থেকে একটা কী গুঁড়ো মতন বার করে নিংপিং এর দিকে ছুঁড়ে দিল। নিংপিং এর চোখে গুঁড়োটা এসে পড়তেই ওর সামনের সব কিছু অন্ধকার লাগতে শুরু করল, ও আর উড়তে না পেরে জাহাজের ডেকে নেমে এল। সেই সুযোগে বদমাইশটা কোমর থেকে তরবারি বার করে আঘাত করতে ছুটল ওকে। এদিকে প্যাঁকাও জঙ্গলের ভেতর পথ গুলিয়ে দিয়ে রেভেন ততক্ষণে আবার ফিরে এসেছে সমুদ্রের ধারে। চটজলদি মানুষের রূপ নিয়েই একটা মন্ত্র পড়ল। ওমনি ব্ল্যাকআই তার উদ্যত তরবারি হাতে পাথরের মূর্তির মত স্থির হয়ে গেল। আর নড়াচড়া করতে পারল না। ততক্ষণে নিংপিংএর চোখটাও ঠিক হয়ে এসেছে। 


তারপর সকলে মিলে ব্ল্যাকআই, উডহেড আর জল থেকে তুলে  ডামডামকে মাস্তুলের কাঠের সাথে পিছমোড়া করে বাঁধল। প্যাঁকাও-ও ফিরে এসেছিল তাকেও একটা ফুটোওয়ালা কাঠের বাক্সের ভেতর বন্দী করা হল। 


(৩)


বেশ ধমক টমক দিয়ে ভয় দেখাতে, ক্যাপ্টেন উডহেড ভেউভেউ করে কেঁদে বলল,

-“সব ওই ব্যাটা ব্ল্যাকআইয়ের দোষ। আমি নিরীহ ইউনিকর্নদের ধরতে চাইনি। ধরা তো দূর আমি এরকম কোনও প্রাণী চোখেও দেখিনি। এই ব্যাটা কোত্থেকে একটা ম্যাপ জোগাড় করে আনল। বলল ম্যাপে নাকি জাদু আছে, এমন এমন সব দ্বীপের সন্ধান আছে যেখানে কেউ যেতে পারেনা। আর সেই সব দ্বীপে নাকি রাশিরাশি গুপ্তধন। ওর ফাঁদে পা দিয়ে সেই দ্বীপে গেলুম আমরা কয়েকবার। সে কী সাংঘাতিক পথ রে বাবা! ডুবোপাহাড়, ঝঞ্ঝা, ঘূর্ণি আরও কত কী। সেই সব বাঁচিয়ে সেখানে পৌঁছে দেখি সে দ্বীপে মানুষ নেই, সোনাদানাও নেই! আছে শুধু এক শিংওয়ালা ঘোড়া। ব্ল্যাকআই বলল সেই শিংয়ে নাকি জাদু আছে। ওই শিং কেটে মানুষদের রাজ্য চোরাকারবারিদের বিক্রি করলে অনেক অনেক সোনাদানা হীরেজহরত পাওয়া যাবে।”


রেভেন রেগে আগুন হয়ে বলল, 

-“এত সুন্দর নিরীহ প্রাণীগুলোকে মারতে তোমাদের হাত কাঁপল না শয়তানের দল!”

ডামডাম বলে উঠল, 

-“না না আমরা মারিনি ওদের। ওই ব্ল্যাকআই মারতে চেয়েছিল কিন্তু আমি আর ক্যাপ্টেন মারতে দিইনি। আমরা শুধু ওদের শিং কেটে নিয়ে একটা আস্তাবলে ওদের লুকিয়ে রেখেছি।”

ক্যাপ্টেন রেডউড বলল,

-“আমি তোমাদের সেই আস্তাবলের পথ বলে দেব। কাটা শিংগুলো সব ওই ব্ল্যাকআইয়ের কেবিনে লুকনো আছে। ওর কাছ থেকে কেড়ে নাও তোমরা। আমাদের ছেড়ে দাও আর কক্ষণও আমরা এরকম পাপ কাজ করব না।”


সবাই এতক্ষণ রেডউড আর ডামডামের কথাই শুনছিল, লক্ষ্য করেনি যে কখন ব্ল্যাকআই তার হাতের বাঁধন নিঃশব্দে খুলে পালানোর তোড়জোড় করছে। প্যাঁকাও ওর বাক্সের মধ্যে থেকে চেঁচিয়ে উঠল,

-“বদমাইশটা পালালো! ক্যাঁঅ্যাঁঅ্যাঁ ক্যাঁঅ্যাঁঅ্যাঁ!”

সবাই তখন ওকে ধরতে যেতেই ফের সেই কোমরের থলি থেকে একটা ডিমের মত জিনিস কাঠের ওপর দুম করে ছুঁড়ে মারল। সঙ্গে সঙ্গে ডিমটা ফেটে কালো ধোঁয়া বেরতে শুরু করল গলগল করে। ধোঁয়া সরতেই দেখল ব্ল্যাকআই আর নেই সেখানে! 


ক্যাপ্টেন উডহেড বলল,

-“ও ব্যাটা অনেক জাদুটাদুও জানে। ওইজন্যই তো আমরা বেশি ওর মুখের ওপর কথা বলতে সাহস পেতামনা। ওর পেছনে ছুটে লাভ নেই, ওকে ধরতে পারবেনা তোমরা।”


ফুফেং কাছিমদাদু সব দেখেশুনে বলল,

-“দেখো বাপু এই ক্যাপ্টেন আর এই বোকা রাঁধুনিটা মন্দ মানুষ নয়। তোতাপাখিটাও ভালো লোক। যা বুঝছি ওই ব্ল্যাকআইটাই যত নষ্টের গোড়া। ওকে নাহয় পরে ধরা যাবে। আগে চলো ইউনিকর্নদের উদ্ধার করি। নাজানি বেচারিরা কী অবস্থায় আছে। রেভেন তুমি উড়ে গিয়ে মেইলিং আর গোল্ডিকে নিয়ে এসো।”


(৪)


ক্যাপ্টেন লংবিয়ার্ড উডহেডের বলে দেওয়া আস্তাবলের ঠিকানায় গিয়ে চার চারটে ইউনিকর্নকে উদ্ধার করল মেইলিং আর নিংপিং। আর এদিকে জাহাজে ব্ল্যাকআইয়ের কেবিনের একটা লুকনো খুপরি থেকে রেভেন আর গোল্ডি খুঁজে বার করল চারখানা কাটা ইউনিকর্নের শিং। শুধু তাই নয়, পেল একটা অদ্ভুত কাগজের টুকরো। হলদেটে হয়ে আসা একটা পাতা। দেখেই বোঝা যাচ্ছে কোনও প্রাচীন পুঁথি থেকে ছিঁড়ে নেওয়া হয়েছে। 


জাহাজে করে সবাইকে নিয়ে ওরা ফিরে এল সমুদ্রতটে যেখানে বেচারা আজুল অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে আছে, সঙ্গে আছে ওশিয়ানা, হম্পকম্প আর রেভেন। আজুলকে দেখে চারজন ইউনিকর্ন আনন্দে ছুটে গেল। আজুলও খুব খুশি ওদের দেখে, বলল,

-“তোমরা চিন্তা কোরোনা, আমার এই নতুন বন্ধুরা তোমাদের শিংগুলোও উদ্ধার করে এনেছে। সময়ের মধ্যে যদি আমরা দ্বীপে ফিরে যেতে পারি তাহলে রানিমা আইরিস জাদু করে ফের তোমাদের কাটা শিং জুড়ে দিতে পারবেন। তোমাদের আর প্রাণ হারানোর ভয় থাকবেনা।”


নিংপিং বলল, 

-“আমাদের সামনে বড় কাজ! এই পাঁচ ইউনিকর্নকে তাদের তিয়েরা-এর্মোসা দ্বীপে ফিরিয়ে দিয়ে আসতে হবে। ব্ল্যাকআইয়ের গুপ্ত ভান্ডার থেকে একটা কাগজ পেয়েছি। ওটাই সম্ভবত ইউনিকর্ন দ্বীপে যাওয়ার ম্যাপ। এই ম্যাপের পাঠোদ্ধার করতে হবে আগে। ইভান-রেভেন তোমরা দুই ভাইবোন তোমাদের জাদুশক্তি দিয়ে আর পুরনো পুঁথি ঘেঁটে উদ্ধার করতে পারবে ম্যাপে কী আছে?”


ওরা উত্তর দেওয়ার আগেই ক্যাপ্টেন লংবিয়ার্ড উডহেড বলে উঠল,

-“আমি পারব। মানে আমি ঠিক পারব না কিন্তু আমার এই যে দূরবীনটা আছে, এর একটা বিশেষ কাঁচ আছে। ওটা লাগালে যেকোনও ভাষার লেখা, ম্যাজিক দিয়ে লেখা পড়া যায়। এটা আমার কাছ থেকে ব্ল্যাকআই নিয়ে নিয়েছিল। পালাবার সময় এটা নিতে ভুলে গেছে ব্যাটা টিকটিকির কাটা ল্যাজ, গিরগিটির জিভের আঠা।”

-“তুমি আমাদের সাহায্য করবে?” 

অবিশ্বাসের সুরে বলে আজুল। 

-“হ্যাঁ অবশ্যই করব। আমার জাহাজে করেই তোমাদের ফিরিয়ে দিয়ে আসব তোমাদের দ্বীপে। বড় অন্যায় করে ফেলেছি আমি। সেটার প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে তো!”

ডামডাম টুফিঙ্গার বলে,

-“সদ্দার যেখানে আমিও সেখানে! আমিও ওই পায়েসক্ষীর করব!”

প্যাঁকাও ক্যাঁও ক্যাঁও করে বলে,

-“হাঁদা ডামডাম

  ভোঁদা ডামডাম!”

সবারই হাসি পেয়ে যায়। কিন্তু হাসলে চলবে না, সামনে অনেক বড় কাজ। 


ঠিক হল, জাহাজে চেপে আজুলসহ পাঁচ ইউনিকর্নকে নিয়ে যাবে নিংপিং, রেভেন, ইভান আর গোল্ডি। জলপথে যাবে নাইফটিথ আর ফুফেং দাদু, অবশ্য ফুফেং দাদু জাহাজেও চাপতে পারে সাঁতরে সাঁতরে হাঁপিয়ে গেলে। যেমন নিংপিং আর রেভেন আকাশপথেও চাইলে পাড়ি দিতে পারে মাঝেমধ্যে। আর যাচ্ছে, ক্যাপ্টেন লংবিয়ার্ড উডহেডআর রাঁধুনি ডামডাম টুফিঙ্গার, ওদের ছাড়া আর কেউ তো জাহাজ চালাতে পারবেও না। এবং অবশ্যই যাবে প্যাঁকাও তোতাপাখি, ওর সাথে রেভেনের খুব ভাব হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। 


রাজকন্য মেই লিং আর জলপরী ওশিয়ানা যেতে চাইলেও উপায় নেই, ওদের তো নিজের নিজের রাজ্যের দেখাশোনাও করতে হবে! ঘোড়ামাছ হম্পকম্প যাবে বলে লম্ফঝম্প করলেও ওকে নেওয়া হল না। ওই পুচকে প্রাণীকে অতদূরে অভিযানে নিয়ে যাওয়াটা কি ঠিক? তোমরাই বলো। হম্পকম্প গোটালাট্টুর অবশ্য খুব অভিমান হয়েছে, তাই ওর রাগ ভাঙানোর জন্য ওকে বলা হয়েছে জলদস্যু জাহাজটার নতুন একটা নাম দিতে। কী নাম দিল জাহাজটার হম্পকম্প বলো তো?


 উঁহু এখনই বলব না, 

সেটা জানার জন্য তো আরেকটু অপেক্ষা করতে হবে বন্ধুরা!


ছবি: আমি

No comments:

Post a Comment