চ্যাপ্টার ৯ : ইউনিকর্ন দ্বীপে নিংপিং

 



ইউনিকর্ন দ্বীপে নিংপিং 

সুস্মিতা কুণ্ডু

 

(১)

 

শান্ত নীল জলের ওপর দিয়ে হেলতে দুলতে নিংপিংদের জাহাজ ‘ম্যাজিক হর্স’ এসে ভিড়ল তিয়েরে-এর্মোসা দ্বীপের তীরে। ইউনিকর্নদের দ্বীপ তিয়েরে এর্মোসা,  স্বপ্নের মত সুন্দর দ্বীপ তিয়েরে এর্মোসা। রাজা রুহানের মায়াজালে ঘেরা এই দ্বীপে বছরের পর বছর নির্বিঘ্নে নিশ্চিন্তে বাস করে এসেছে  জাদুক্ষমতাসম্পন্ন একশৃঙ্গ ঘোড়া, ইউনিকর্নরা। কিন্তু কেন ওরা আশ্রয় নিয়েছিল এত দূরে সমুদ্রের মাঝের এই দ্বীপে? সে জন্য দায়ী শুধুমাত্র মানুষের লোভ! ইউনিকর্নদের শিং কেটে নিত মানুষেরা, জাদুশক্তি লাভ করার উদ্দেশ্যে। মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিত নিরীহ প্রাণীগুলোকে। তাই শেষমেষ ওরা বাধ্য হয়েছিল, মূল ভূ-খণ্ড থেকে অনেক দূরে এই দ্বীপে আশ্রয় নিতে। বাধ্য হয়েছিল মায়াজালের আড়ালে নিজেদের লুকিয়ে ফেলতে। বাইরের দুনিয়ার থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এই দ্বীপ। এখানে নিয়মকানুন আলাদা, ফুল ফল গাছপালা সবই আলাদা একটু। 

 

জাহাজ তীরে ভিড়িয়ে লোহার ভারি নোঙরটা ঘর্ঘর করে জলের ভেতর নামায় উডহেড। এক এক করে নেমে আসে সকলে। নিংপিং, ইভান, রেভেন, গোল্ডি, উডহেড, ডামডাম, প্যাঁকাও, ফুফেং দাদু এবং আজুল আর তার চার বন্ধুরা। নাইফটিথকে নিংপিং আগেই জলের ভেতর নামিয়ে দিয়েছিল, ও তো আর ডাঙ্গায় আসতে পারবেনা। জল থেকেই জাহাজটার ওপর নজর রাখবে। একটু দূরেই দেখা যাচ্ছে ঘন সবুজ গাছের সারি। সবাই এগিয়ে যায় জঙ্গলের দিকে। কিন্তু এত ঘন দুর্ভেদ্য জঙ্গল কোথায় যে তার ভেতর দিয়ে পথ, কী করে যাবে সবাই। নিংপিং তাকাল আজুলের দিকে, উত্তরের আশায়। আজুল একটু এগিয়ে এসে মাথাটা নীচু করে শিংটা ছোঁয়ালো সামনে পড়ে থাকা একটা বড় পাথরের খণ্ডের ওপর। ওমনি জঙ্গলের একটা জায়গায় গাছপালা হাল্কা হাওয়ায় দোল খাওয়ার মত নড়তে লাগল। 

 

আজুল বলল, 

-“এই যে বন্ধুরা এদিকে। ইউনিকর্নদের বসতি জঙ্গলের এই প্রবেশপথ দিয়ে যাওয়া যাবে। আসলে অনেকগুলি সুরক্ষাকবচের আড়ালে লুকনো আমাদের এই ইউনিকর্নদের রাজ্য। এই যে পাথরখণ্ডটায় আমি শিং ছোঁয়ালাম, ওটা ভালো করে লক্ষ করে দেখো। ওর গায়ে একটা বিশেষ চিহ্ন আছে। দুটো ডানার চিহ্ন, আর তার ওপর একটা লম্বা শিংয়ের চিহ্ন। এই চিহ্নটায় আমার মাথার শিংটা ছোঁয়াতে তবেই জঙ্গলের ভেতর সঠিক পথের দেখা মিলল। দেখো এই বালির তীর বরাবর বেশ ক’টা এরকম পাথর ছড়ানো আছে, যেগুলোকে বলতে পারো তালা। আর সেই তালা খোলার একমাত্র চাবি আমাদের এই শিং। যদি ভুল করেও কেউ এই দ্বীপে এসে যায় তাহলেও যেন ইউনিকর্নদের সন্ধান না পায় তাই রাজা রুহান এই ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। সাধারণ যে কারোর কাছে এই দ্বীপ দুর্ভেদ্য জঙ্গলে ভরা মনে হবে। আসলে কিন্তু  ইউনিকর্ন শৃঙ্গ ওই পাথরে স্পর্শ করলে তবেই পৌঁছনো যাবে আমাদের রাজ্যে। অর্থাৎ কিনা ইউনিকর্নরা নিজেরা ছাড়া আর কেউই সন্ধান পাবেনা এই স্বর্গরাজ্যের। জনি ব্ল্যাকআই জলদস্যুকে এই পথের সন্ধান নিশ্চয়ই কোনও বিশ্বাসঘাতক ইউনিকর্নই দিয়েছিল।”

নিংপিংরা চেয়ে দেখল, সত্যিই তো সমুদ্রের তীরে জঙ্গলের গায়ে নানা রকম আকারের বড় বড় পাথর ছড়ানো আছে। রাজা রুহান সত্যি সবদিক দিয়েই ইউনিকর্নদের সুরক্ষিত করার চেষ্টা করেছিলেন। 

 

আর বেশি সময় নষ্ট না করে সকলে রওয়ানা হল আজুলের দেখানো পথ ধরে। জঙ্গলটায় ঢোকার পর আর তত গভীর দুর্ভেদ্য মনে হচ্ছেনা জঙ্গলটা। যত এগোচ্ছে তত গাছপালার সংখ্যা কমে কমে আসছে। বেশ কিছুটা চলার পর ওরা এসে দাঁড়াল জঙ্গল পেরিয়ে এসে দাঁড়াল বিস্তীর্ণ একটা এলাকার সামনে। সেই জায়গা যেন স্বপ্নের মত সুন্দর। সবুজ ঘাসে ঢাকা বিশাল বিশাল মাঠ, ছোট ছোট টিলা থেকে ঝরঝর করে ঝরে পড়ছে ঝর্ণার জল। সেই ঝর্ণার জল জমছে নীল জলাশয়ে। কতরকমের ফুলে ফুলে ঢাকা চারদিক। বড় বড় গাছে লোভনীয় সুস্বাদু রসালো ফল ঝুলছে। পাখির ডাক, মৌমাছির গুনগুন, সুরে মেতে চারদিক। প্রজাপতির ডানায় ডানায় রঙের মেলা... আর ইউনিকর্ন... শয়ে শয়ে ইউনিকর্ন। 

 

সকলেরই সাদা শরীর। আলাদা শুধু লেজ শিং আর কেশরের রঙ। কারোর নীল, কারোর বা সবুজ। হলুদ, কমলা, বেগুনী... কোন রংটা নেই? মুগ্ধ হয়ে সবাই দেখতে থাকে। গোটা দ্বীপের চারদিক জঙ্গলে ঘেরা। সেই জঙ্গলের বলয় টপকে ভেতরে ঢুকতে পারলে তবেই দেখা মিলবে এই ইউনিকর্ন রাজ্যের। আজুল আর তার বন্ধুরা নিজের রাজ্যে ফিরে আনন্দে ছুটে গেল। যেখানে যত ইউনিকর্নরা খেলা করছিল, গাছের ফল খাচ্ছিল সব ছুটে এল ওদের দেখে। ওরা তো ধরেই নিয়েছিল যে আজুলরা চিরতরে হারিয়ে গেছে। ওদের ফিরে পেয়ে সবাই তাই আনন্দে আত্মহারা। 

 

কিন্তু ওদের দিকে এসে পেছনে যেই নিংপিং আর তার দলবলকে  দেখতে পেল ওমনি সবাই থমকে দাঁড়িয়ে গেল। ইউনিকর্ন দ্বীপে অন্য কোনও প্রাণী তারা আগে দেখেনি। সামনের পা দুটোর ক্ষুর ঠুকে ধুলো উড়িয়ে, নাক দিয়ে ফোঁস ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে, মাথা নামিয়ে শিং উঁচিয়ে আক্রমণের ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে পড়ল সবাই। আজুল তড়িঘড়ি বলে উঠল, 

-“ভয় পেও না, ভয় পেও না। ওরা শত্রু নয় বন্ধু। ওরাই তো আমাদের উদ্ধার করে আবার ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে আমাদের দ্বীপে। এই হল নিংপিং ড্রাগন, এই হল ইভান-রেভেন জাদুকর ভাইবোন, গোল্ডি ম্যাকমাফিন লেপ্রিকন, ফুফেং কাছিমদাদু, উডহেড আর ডামডাম জলদস্যু... ইয়ে মানে নাবিক, আর প্যাঁকাও তোতা।”

 

আজুলের কথা শুনে ইউনিকর্নরা একটু শান্ত হল। অল্প কথায় ওদের বুঝিয়ে বলল যে ঠিক কী ঘটেছিল ওর সাথে আর বাকি চারজন ইউনিকর্নদের সাথে। আজুল সবটা বলার পর নিংপিং বলল

-“আমাদের হাতে আর বেশি সময় নেই। শিগ্গির তোমাদের এই চার বন্ধুকে রানিমার কাছে নিয়ে যেতে হবে। একমাত্র উনিই পারবেন শিংগুলো জোড়া লাগিয়ে ওদের বিপদের হাত থেকে বাঁচাতে।”

 

আর সময় নষ্ট না করে সবাই চলল দূরের টিলাটা লক্ষ্য করে। টিলাটার বেশ কাছাকাছি পৌঁছে দেখল একটা সুন্দর গোল গোল সাদা নুড়ি বিছোনো পথ চলে গেছে টিলাটাকে বেড় দিয়ে পেছনের দিকে। সেই পথ ধরে আরেকটু এগোতেই সামনে দেখা দিল একটা সুন্দর রাজপ্রাসাদ। সূর্যের আলোয় ঝলমল করছে প্রাসাদটা। মস্ত বড় তোরণ, তোরণের দুপাশে দুটি ইউনিকর্নের মূর্তি, সামনের পা দু’টো শূন্যে ভাসিয়ে লাফানোর ভঙ্গীতে। আজুলের পেছু পেছু সেই তোরণ পেরিয়ে ওরা ঢুকলো। প্রবেশ করল বড়সড় একটা রাজদরবারে। আজুল ছুটে এগিয়ে গেল ঘরটার অন্যপ্রান্তের দিকে। নিংপিংরা অবাক হয়ে দেখল আরেকটি ইউনিকর্ন, তার কেশর লেজ আর শিং রামধনুর রঙের। সারা শরীর হালকা একটা আলোয় উদ্ভাসিত। আরও অবাক হয়ে ওরা দেখল, এই ইউনিকর্নটার ডানা আছে। বড় বড় ডানা মেলে আজুলকে ঘিরে ধরল সেই ইউনিকর্নটি। ইনিই তাহলে রানিমা আইরিস, আজুলের মা। আজুল তাঁকে হড়বড়িয়ে সব কথা বলতে শুরু করল, সেই মাফিনচুরির মাধ্যমে নিংপিংদের সাথে আলাপ হওয়া থেকে শুরু করে, বদমাইশ ব্ল্যাকআইয়ের কথা, সমস্তটা। 

 

আজুলের সব ঘটনা বলা শেষ হলে পরে, নিংপিং একটু এগিয়ে গিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানাল রানিমাকে। ওর দেখাদেখি বাকি বন্ধুরাও তাই করল। রানিমা এগিয়ে এলেন ওদের দিকে। কী স্নিগ্ধ সাতরঙের আলো একটা বিচ্ছুরিত হচ্ছে সারা শরীর থেকে। মিষ্টি গলায় বললেন,

-“তোমাদের যে কী বলে ধন্যবাদ জানাই নিংপিং। আজুল আর আমাদের দ্বীপের আরও চার সদস্যকে তোমরা ফিরিয়ে দিলে আমাদের কাছে। তোমাদের সাহসিকতা আর ভালো মনের জন্যই সম্ভব হল এটা।”

নিংপিং লজ্জা পেয়ে বলল,

-“এটা তো আমাদের কর্তব্য রানিমা। আপনি বরং শিগগির এই চার বন্ধুর শিং জোড়া লাগিয়ে দিন জাদু করে। ওদের সুস্থ দেখে, আমরা নিশ্চিন্তে বাড়ি ফিরে যাই তবে।”

এই বলে গোল্ডিকে ইশারা করল নিংপিং। গোল্ডি ওর ঝোলা থেকে চারটে কাটা শিং বার করে রাখল সকলের সামনে।  চারজন ইউনিকর্ন এগিয়ে এল। রানিমা নিজের রামধনুরঙা শিং নিচু করে ঠেকালেন চারটে কাটা শিংএর ওপর। কাটা শিংএর টুকরোগুলো জরির মত গুঁড়ো গুঁড়ো উজ্জ্বল আলোককণায় ভাসতে ভাসতে গিয়ে স্পর্শ করল ইউনিকর্নদের কপালে ঠিক সেই জায়গাটা যেখান থেকে শিংগুলো কেটে নেওয়া হয়েছিল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে শিংগুলো এমনভাবে জোড়া লেগে গেল যেন কখনও কোনও আঘাতই লাগেনি। 

সবাই আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠল।

 

রানিমা তারপর বললেন,

-“নিংপিং আর বন্ধুরা, তোমাদের সবাইকে আমাদের তিয়েরে-এর্মোসা দ্বীপের অতিথি হওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। কদিনের ভেতরেই আমাদের রাজ্যের নতুন শাসক নির্বাচনের জন্য প্রতিযোগিতা ঘোষনা করব আমি। সেই অনুষ্ঠান শেষ হওয়া অব্দি তোমরা থাকো, আমার অনুরোধ। এখানে ঘুরে বেড়াও আনন্দ করো, তারপর আমি নিজে তোমাদের ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করব। ”

আজুলও বলে উঠল,

-“হ্যাঁ হ্যাঁ! তোমরা থাকো তাহলে আমিও মনের জোর পাবো।”

নিংপিংএর দলবল তো বেজায় খুশি হল এরকম নিমন্ত্রণ পেয়ে। ধন্যবাদ জানাল কানিমাকে। 

 

কিন্তু খেয়াল করেনি কখন সভাগৃহে আরেকটা ইউনিকর্ন এসেছে। রানিমার নিমন্ত্রণ শুনে সে এগিয়ে এসে বলল,

-“এই নতুন লোকেরা আজুল আর বাকি চারজনকে উদ্ধার করেছে, খুব ভালো কথা। কিন্তু আমাদের দ্বীপে কখনও ইউনিকর্ন ছাড়া অন্য কোনও প্রাণী পা রাখেনি। এতজন অজানা অচেনা অতিথিকে আমাদের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতার অনুষ্ঠানে সামিল করা কি ঠিক হবে?”

সবাই ফিরে তাকাল ইউনিকর্নটার দিকে। আর বাকি পাঁচটা ইউনিকর্নের মতই দেখতে, লেজ কেশর আর শিং গাঢ় সবুজ বর্ণের। আর সেই সাথে গলায় একটা বড় সবুজ পাথর বসানো লকেট। যেটা ওকে অন্য ইউনিকর্নদের থেকে একটু আলাদা করে রেখেছে।

আজুল প্রতিবাদ করে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই রানিমা আইরিস বললেন, 

-“ভেরদো, তোমার চিন্তাটা আমি বুঝতে পারছি কিন্তু যে অসমসাহসী বন্ধুরা রাজা রুহানের তৈরি করা মায়াজালের সাথে যুদ্ধ করে আমাদেরই সঙ্গীদের ফিরিয়ে দিল আবার আমাদের মাঝে, তাদেরকে আমি অবিশ্বাসের কিছু দেখছিনা। তুমি বরং শিগগির গিয়ে প্রতিযোগিতার সমস্ত আয়োজন শুরু কর। আজুল তুমি নতুন বন্ধুদের ইউনিকর্ন দ্বীপটা ভালো করে ঘুরিয়ে দেখাও। আর হ্যাঁ, রাজপ্রাসাদের অতিথি মহলে ওদের থাকার ব্যবস্থা করো, কেমন?”

এই বলে রানিমা চলে গেলেন।

 

রানিমার কথার উত্তরে আজুল আর ভেরদো বলে সবুজ ইউনিকর্নটা দু’জনেই ঘাড় ঝোঁকালো। কিন্তু ভেরদোর চোখমুখ দেখে মনে হল না রানিমার সিদ্ধান্তে বিশেষ খুশি হয়েছে। সন্দেহের চোখে ওদের দেখতে দেখতে ঘাড় বাঁকিয়ে চলে গেল সেও। আজুল এগিয়ে এসে বলল,

-“তোমরা ভেরদোর কথায় কিছু মনে কোরো না। ও আমাদের রাজ্যের প্রধান উপদেষ্টা। রাজ্যের সব ভালোমন্দ দেখার ব্যাপারে ও রানিমাকে অনেক সাহায্য করে। ও একটু রাগী, চট করে কাউকে বিশেষ পছন্দ করেনা। আসলে ভেরদো রাজা রুহানের বংশধর তো, তাই বেশ অহংকারী।”

গোল্ডি বলে ওঠে,

-“ও রাজার বংশধর হলে কী হবে রাজা তো নয়! তোমাদের এখানে তো কীসব অন্য নিয়মকানুন হয় বলেছিলে না?”

 

আজুল বলে,

-“হ্যাঁ! আমাদের এখানে বংশানুক্রমে রাজা বা রানি নির্বাচন হয়না। এই যে প্রতিযোগিতার কথা রানিমা বললেন, এই প্রতিযোগিতাই নির্ধারন করে দেয় কে পরবর্তী রাজা বা রানি হবেন।এই প্রতিযোগিতায় যে কেউ অংশগ্রহণ করতে পারে। তিন রকমের পরীক্ষা হয়। এক হয় দৈহিক শক্তির পরীক্ষা, দুই হল বুদ্ধিমত্তার, আর তিন নম্বর পরীক্ষাটা ঠিক কী কেউ আগে থেকে জানেনা সেটা। এই তিন পরীক্ষায় যে সফল হবে সেই হবে পরবর্তী রাজা বা রানি। রানিমা আইরিস নিজের সমস্ত জাদুক্ষমতা প্রদান করবেন। এই রাজপ্রাসাদ, পুঁথিঘর, চিরবসন্তের উদ্যান, সব কিছুর দায়িত্ব তখন তার।”

 

পুঁথিঘর আর উদ্যান শুনে তো ইভান আর রেভেন লাফিয়ে উঠল আনন্দে। ওরা তো নানা বই পড়তে আর জড়িবুটির গাছপালা খুঁজতে খুব ভালোবাসে কিনা। মেই লিং এর রাজপ্রাসাদেও সারাদিন দুটিতে ওই করতে থাকে তো! 

-“আমরা পুঁথিঘর দেখব! আমরা বাগান দেখব!”

আজুল হেসে বলে,

-“ঠিক আছে তোমাদের পুঁথিঘরে পাঠিয়ে দেব’খন কাউকে দিয়ে। আগামী কয়েকটা দিন আসলে আমাকে অনেকটা প্রস্তুতি নিতে হবে প্রতিযোগিতার জন্য। এই সময়টায় তোমরা সকলে আমাদের তিয়েরে-এর্মোসা দ্বীপটা ঘুরে বেড়িয়ে দেখো। আর এই নাও রানিমার দেওয়া বিশেষ ইউনিকর্নের শিং আর ডানার চিহ্নওয়ালা প্রতীকি লকেট। দ্বীপের যেখানেই যাও না কেন এই লকেটটা গলায় পরে থাকবে। তাহলেই সবাই বুঝবে তোমরা রানিমার বিশেষ অতিথি। কেউ বাধা দেবে না তোমাদের। বুঝতেই পারছো তো এই দ্বীপ রুহান রাজার জাদুতে ঘেরা তাই বহিরাগত কাউকে এখানের ইউনিকর্নরা চেনে না জানে না উল্টে ভয় পেয়ে যেতে পারে।” 


নিংপিং, ইভান, রেভেন, ফুফেং কাছিমদাদু, উডহেড, ডামডাম সক্কলে লকেটগুলো চটপট গলায় পরে ফেলল। প্যাঁকাও নিজের গলায় লকেটটা পরে আরেকটা লকেট ঠোঁটে করে আঁকড়ে ধরে নিয়ে উড়ে গেল রাজপ্রাসাদের পেছনের সরোবরে। ও হ্যাঁ বলতে ভুলে গেছি। রানিমা নাইফটিথ হাঙরকে জাদুবলে সমুদ্রে তীর থেকে এনে এখানে রেখেছেন। সে বেচারা নইলে একা একা মন খারাপ করে বসেছিল যে। 


এত সুন্দর দ্বীপটা ঘুরে ঘুরে দেখতেই দু’দিন কোথা দিয়ে যেন কেটে গেল। ইভান আর রেভেন অবিশ্যি ওদিকে বইঘরেই আর বাগানেই বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছে। ইউনিকর্ন রাজ্যের পুঁথিঘরে যে কতরকমের বই ঠাসা! সেসব বই দুনিয়ার অন্য কোথাও মেলে না। পুঁথিঘর যেমন আশ্চর্যের, তেমনি বাগানটিও দুষ্প্রাপ্য সব গাছগাছড়ায় ভরা।  নাইফটিথ তো ইউনিকর্ন সরোবরে মনের সুখে ঘা ভাসিয়ে ঘুমোয়। ফু-ফেং দাদু মাঝেমাঝেই রানিমা রোজালিণ্ডের সাথে নানারকম রাজ্যশাসনে বিষয়ে আলোচনা করে। ডামডাম টুফিঙ্গার তো সোজা গিয়ে ঢুকেছে ইউনিকর্নদের রান্নাঘরে। সেখানে তো ইউনিকর্ন রাঁধুনিরা শিংয়ের জাদু দিয়ে ফল কাটে, আনাজ কাটে, মশলা বাটে, মাফিন বানায়। তাই দেখে ডামডাম রেগে লাল। বলে,

-“এমনি করে রান্নায় সোয়াদ হয় কখনও? যদ্দিন আমরা এখানে আছি তদ্দিন বাপু আমিই রান্নাবান্নাটা করে নেব।”

ওদিকে লংবিয়ার্ড উডহেড প্যাঁকাওকে হুকুম করে করে বেচারার প্রাণ ওষ্ঠাগত করে ছাড়ছে। 


নিংপিং টুকটাক প্রতিযোগিতার প্রস্তুতিতে হাত লাগানোর চেষ্টা করেছিল। সেও মোটামুটি শেষের পথে। প্রতিযোগিতার তিনটে ধাপ। গায়ের জোরের পরীক্ষা, বুদ্ধির জোরের পরীক্ষা। কিন্তু তৃতীয় পরীক্ষাটি কী তা কেউ জানেনা। জানেন শুধু রানিমা। 


তবে খুব শিগগিরই সব অপেক্ষার অবসান ঘটতে চলেছে। রাত পোহালেই প্রতিযোগিতা শুরু।


ছবি : ক্যাসেলের ছবিটা ক্যাপ্টেন নিমো এঁকেছেন। বাকিটা আমি। 

No comments:

Post a Comment