মাছ মা আর তার তিন ছা
সুস্মিতা কুণ্ডু
একটা ছিল জল টলটল পুকুর। সেই পুকুরে বাস করত এক মাছ মা আর তার তিন ছা। তারা সারাদিন জলের ভেতর ছলছলায় কলকলায়। না না শুধু ওরাই নয়, পুকুরে ছিল আরও কত্তরকমের মাছ, শোল বোল রুই কাতলা, আছে চিংড়ি কাঁকড়া গুগলি শামুক।
সেই জল টলটল পুকুরে ফি রোববার একটা অদ্ভুত কাণ্ড হত। জলের ছাদ থেকে হঠাৎই টপাং করে সুতোয় বাঁধা নানারকম মজাদার খাবার এসে মাছেদের নাকের ডগায় ঝুলত। বোলতার ডিমের ডালনা, কেঁচোর কোর্মা, মধুরুটির মিঠাই। প্রথম প্রথম মাছেরা তো ভারি আহ্লাদে ছুটত সেই খাবার খেতে। কিন্তু... যেই না সেই সুস্বাদু খাবারে কামড় দেওয়া ওমনি হুশশশ! কোথায় যে হারিয়ে যেত সেই মাছ বেচারা, আর তাকে কেউ কোনওদিন খুঁজে পেত না।
এইরকম ভূতুড়ে কাণ্ড দেখে পুকুরের গণ্যিমান্যি মাছেরা বিধান দিলেন, যতই লোভনীয় খাবার আকাশ থেকে খসে পড়ুক কিছুতেই তাতে মুখ দেওয়া চলবে না। উঁহু! ভুল করেও না। সোজা লেজ ঘুরিয়ে পাখনা নেড়ে চলে যেতে হবে সেই তল্লাট থেকে।
কিন্তু মাছ মায়ের তিন ছায়ের বেজায় ইচ্ছে ওই ভালোমন্দ খাবারগুলো একটু চেখে দেখার। দুইবেলা পোকা মাকড়, শ্যাওলাদানা, পাঁক খেয়ে খেয়ে মুখের সোয়াদ এক্কেবারে নষ্ট হয়ে গেছে। এদিকে বাছাদের বায়না শুনে শুনে মাছ মা-ও জেরবার। কোন মায়েরই বা মনে সাধ না হয় একটু বাছাদের শখের জিনিস খাওয়াতে পরাতে!
অনেক ভেবে ভেবে মাছ মা একটা বুদ্ধি বার করল। ছানাদের বললে,
-“শোন বাছারা... আসছে রোববার তোদের মনের ইচ্ছে পূর্ণ হবে।”
ছানারা তো আনন্দে পুকুরের এমাথা থেকে ওমাথা সাঁতরে নিল। তারপর বলল,
-“মা তবে যে সবাই বলে আকাশ থেকে খাবার পড়লে খেতে নেই।”
মা হেসে বললে,
-“একটা মতলব এসেছে মাথায়। যদি সেটায় কাজ হয় তবে বাকি মাছেরাও বিপদে এড়িয়ে ভালোমন্দ খেতে পাবে চাট্টি।”
পরের রোববার মা আর তিন ছা তক্কে তক্কে রইল। যেই না ঝপাৎ করে জলের ছাদ থেকে খাবার বাঁধা সুতোটা পড়ল ওমনি মাছ মা টপাৎ করে হাতপাখনায় তুলে নিল একটা ফাঁকা ঝিনুকের খোল। তারপর সেটাকে সাঁড়াশির মত করে বাগিয়ে ধরে সুতোর মুখের মাছির মালপোয়াটা পেড়ে নিল কপাৎ করে! মাছিটা খসে পড়তে দেখা গেল সুতোর ডগায় একটা বাঁকানো আঁকশি লাগানো। খাবারটা নেওয়ামাত্রই এক ঝটকায় আঁকশি সহ সুতোটা জলের ছাদ ফুঁড়ে কে যেন টেনে নিল এক ঝটকায়।
ও হরি! এই তাহলে মাছেদের অদৃশ্য হওয়ার রহস্য। খাবার খেতে গিয়ে আঁকশি আটকাতো মাছের গলায়। তারপর সুতোয় টান পড়লেই মাছ জলের তলা থেকে অদৃশ্য হয়ে যেত জলের ছাদ ফুঁড়ে। কী ভয়ানক মাছধরা কল রে বাবা!
কিন্তু মা মাছও কম বুদ্ধি ধরে নাকি! এই ঝিনুকসাঁড়াশি দিয়ে দারুণ একটা উপায় করেছে সমস্যা সমাধানের। মাছেদের আর কোনও ক্ষতিই হবে না আর সুস্বাদু খাবারও মিলবে। জব্বর বোকা বানিয়েছে মাছ মা সুতোওয়ালাদের।
তারপর তো মা আর তিন ছা মিলে জমিয়ে টপাংটপ মাছির মালপোয়া খেয়ে ঢেকুর তুলল। ছানারা আহ্লাদে আটখানা নতুন মজাদার খাবার পেয়ে। এবার বাকি মাছেদের সবটা জানাতে হবে, আর বেশ কটা ঝিনুকের খোলও জোগাড় করতে হবে। আসছে রোববার পুকুরের সব মাছ মিলে জমিয়ে ভোজ হবে!
(শেষ)
সঙ্গের ছবিটা হয়ত অনেকেরই চেনা। আমাদের ছোটোবেলায় সোভিয়েত রাশিয়ার একটা ছবির বই ছিল।
‘ছবিতে ছবিতে গল্প’,
নিকোলাই রাদ্লভ
এটা সেই বইয়েরই একটা ছবি আর তাই থেকেই গপ্পো গড়লাম ছোটোদের জন্য। আবার একটা ছবি থেকে গল্প দেব শিগগিরই।

No comments:
Post a Comment