নিংপিং আর আজুল দ্য ব্লু ইউনিকর্ন
সুস্মিতা কুণ্ডু
(১)
সেদিন সকালে নিংপিং সবে ঘুমচোখ খুলেছে কী না খুলেছে, ‘ক্কা ক্কা’ আওয়াজে চমকে উঠে তড়িঘড়ি গুহার বাইরে এসে দেখে সামনের পাইন গাছের ডালে রেভেন বসে। কী বললে? রেভেন কে? আরে রেভেন গো রেভেন! ইভানের ছোটো বোন। অ্যাঁ! ইভানকেও চেনোনা?
ইভান আর রেভেন! সেই দুটি ভাইবোন যাদেরকে শয়তান জাদুকরী হেকেটি কালো বেড়াল আর দাঁড়কাক বানিয়ে রেখেছিল গো। ইভান আর রেভেনকে আমাদের সুপারহিরো নিংপিং উদ্ধার করে আনে আর তারপর তাদের ভাইবোনের মত আদরযত্ন করে নিজের প্রাসাদে রাখে রাজকন্যে মেই লিং। না না তারা এখন আর বেড়াল আর দাঁড়কাক অবতারে মোটেই নেই। ডাইনিবুড়ির জাদু পোশন ব্যবহার করে তারা অনেক আগেই মানুষের ছানা হয়ে গেছে ফের।
অনেকদিন ডাইনিবুড়ির সাথে থাকার ফলে ওর থেকে দুই ভাইবোন অনেক জাদুবিদ্যা শিখে ফেলেছিল। তাই মাঝে মাঝে সেইসব বিদ্যে ঝালিয়ে নেয়। নীল রঙের ম্যাজিক পোশন গায়ে ঢেলে রেভেন তাই প্রায়সই ফের কাকের রূপ নিয়ে হেথাহোথা উড়ে বেড়ায়। কখনও কখনও মেই-লিং এর রাজপ্রাসাদ থেকে উড়ে চলে আসে নিংপিং এর পাহাড়ের গুহায়।
সক্কাল সক্কাল রেভেনকে দেখে নিংপিং আন্দাজ করতে লাগলো নির্ঘাৎ রাজপ্রাসাদ থেকে নেমন্তন্ন এসেছে। রেভেন মানুষের রূপ ধরে বলল,
-“এইয়ো নিংপিং! আর কত ঘুমোবে শুনি? আজ কী আছে জানো? পিকনিক!”
নিংপিং মস্ত বড় হাই তুলে বলে,
-“পিকপিক? সেটা কী?”
রেভেন খিলখিলিয়ে হেসে বলে,
-“সাধে মেইলিং দিদি তোমায় হাঁদা বলে! পিকপিক নয় গো পিকনিক!”
-“ওই হল রে বাবা! তা কী হবে শুনি পিকপিকে... ইয়ে মানে পিকনিকে?”
রেভেন বলল,
-“ওই যে তুমি আর ইভানদাদা মিলে তিয়াংঝু পাহাড়ে গিয়েছিলে ব্লুবেরি আনতে, মনে আছে? যেখানে বদমাইশ পাঁচমুণ্ডু সাপ ইয়েন জিং সুও ঝুয়াংদের গ্রামের সবাইকে বিষওয়ালা ব্লুবেরি খাইয়ে কালঘুম পাড়িয়ে রেখেছিল। তুমি আর দাদা মিলে সাপটাকে কেঁচো বানিয়ে সবাইকে বাঁচালে...”
-“হ্যাঁ রে বাবা সঅঅঅব মনে আছে! এবার আসল কথাটা বলো দেখি! আমার এদিকে আবার বেজায় ক্ষিদে পেয়েছে!”
-“উফফ নিংপিং! পুরো কথাটা তো শুনবে নাকি? তোমার সেই তিয়াংঝু পাহাড়ের ঝুয়াং বন্ধুরা ঝুড়িভর্তি করে ব্লুবেরি দিয়ে গেছে রাজপ্রাসাদে। আর মেইলিংয়ের মা রানিমা তাই দিয়ে অনেএএএক মাফিন বানিয়েছেন। এবার মেই লিং ঠিক করেছে মাফিন নিয়ে আমরা যাব সমুদ্রের ধারে, ওশিয়ানা জলপরী, ফু-ফেং কাছিমদাদু, গোটালাট্টু ঘোড়ামাছ, গ্রে নাইফটিথ হাঙ্গর সক্কলের সাথে জমিয়ে পিকনিক হবে। ও হ্যাঁ! তুমি গোল্ডি ম্যাকমাফিন লেপ্রিকনকে নিয়ে চলে এসো জলদি জলদি কিন্তু। আমাকে এবার যেতে হবে! ঢের ঢের কাজ পড়ে আছে। পিকনিকের জন্য কত্ত জোগাড় করতে হবে জানো? মাটিতে পাতার পশমের জাজিম, থালা বাটি চামচ, রোদ আটকানোর লাল নীল ছাতা, সমুদ্রের বালিতে খেলাধুলো করার লাল বল... আরও কত কী! আমি চললুউউউউম!”
এই বলে রেভেন ফের দাঁড়কাকের রূপ নিয়ে ডানা ঝটপটিয়ে উড়ে চলে গেল।
(২)
নিংপিং আনন্দে নাচতে নাচতে চটপট রেডি হয়ে গেল। পিকনিক! কী মজা! শোঁওওও করে উড়ে রেইনবো পাহাড়ে গিয়ে হাজির হল গোল্ডি ম্যাকমাফিনের কাছে। গোল্ডি তো পিকনিকের নাম শুনেই আহ্লাদে আটখানা, তার ওপর আবার ব্লুবেরি মাফিন! গোল্ডির প্রিয় খাবার! সে তো ধেই ধেই করে নাচতেই শুরু করল।
-“গোল্ডি খাবে ইয়াম্মি মাফিন,
তাক ধিনাধিন তুম তানানা
একটা নয় দু’টো নয়,
বড় বড় আট ন’খানা!”
তারপর নিংপিং এর পিঠে চেপে সোজা চললো মেই লিং এর রাজপ্রাসাদে। পৌঁছে দেখে সবাই রেডি হয়ে ওদের অপেক্ষাতেই বসে রয়েছে। হইহই করে পুরো দল রওয়ানা হল সমুদ্রের তীরে। রেভেন অবশ্য উৎসাহের চোটে আগেভাগেই এসে খবর দিয়ে দিয়েছে জলরাজ্যের বন্ধুদের। কাছিমদাদু, গোটালাট্টু, ওশিয়ানা, নাইফটিথ সব্বাই জলের তলা থেকে গলা বাড়িয়ে হাসি হাসি মুখে চেয়ে আছে।
আর কী! শুরু হ’ল হইহল্লা পিকনিক!
বেশ খানিকক্ষণ পেটপুরে খাওয়াদাওয়ার পর সবাই চলল খেলাধুলো করতে। নিংপিংয়ের আবার ভরপেট খেয়ে একটুখানি গড়িয়ে না নিলে আলিস্যি লাগে। একটা বড় দেখে পাথরের গায়ে একটু হেলান দিয়ে বেশ জুত করে বসল ও। দূরে বালিতে, জলেতে সবাই হুড়োহুড়ি করছে। নিংপিং আধবোজা চোখের ফাঁক দিয়ে সব দেখতে লাগল। বেশ কিছুটা সময় কাটার পর নিংপিং-এর চোখে পড়ল অদ্ভুত একটা জিনিস। একটু দূরেই পাতা সবুজ জাজিমটার ওপরে বেতের ঝুড়িতে তখনও বেশ অনেকগুলো মাফিন অবশিষ্ট ছিল। হঠাৎই ঝুড়ি থেকে একটা মাফিন ধীরে ধীরে হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে নাচতে নাচতে চলল একটা বড়সড় ঝাঁকড়ামত ঝোপের দিকে। ঝোপটার মাথার ওপর গিয়ে মাফিনটা টপাং করে আবার ঝোপের ভেতর পড়ে গেল। এই না দেখে তো নিংপিং এর আধবোজা চোখদু’টো গোল্লা গোল্লা বড় হয়ে গেল! চোখ রগড়ে প্রথমেই তাকালো ইভান আর রেভেনের দিকে, ওরা কোনও ম্যাজিক করছে নাকি! কিন্তু না তো! ওরা তো দিব্যি খেলা করছে জলের ধারে অন্যদের সঙ্গে। একটু পরেই আবার একটা মাফিন হেলতে দুলতে উড়ে উড়ে চলে গেল ওই ঝোপটার আড়ালে। এক এক করে পাঁচ পাঁচটা মাফিন চলে যাওয়ার পর নিংপিং আর বসে বসে দেখতে পারল না। নিঃশব্দে ডানা মেলে উড়ে অনেকটা উঁচু আকাশে গেল। ওপর থেকে নজর করতে লাগল কী হচ্ছে।
ঝোপটার ওপরে গিয়ে দেখল ঝোপের আড়ালে একটা ঘোড়া কচরমচর করে মাফিন খেয়ে চলেছে। ঘোড়াটার সারা শরীরটা সাদা শুধু ঘাড়ের কেশর আর চামরের মত লেজের লোমগুলো
নীল রঙের। আর একটু নিচের দিকে নেমে এসে নিংপিং দেখল, ঘোড়াটা ঠিক ঘোড়া নয়, মাথায় আবার শিং আছে। গরু ছাগলদের মত একজোড়া শিং নয়, মোটে একটা তাও আবার কপালের ঠিক মাঝখানটায়। নীল রঙের শিং, সুর্যের আলো পড়ে কেমন মত জ্বলজ্বল করছে। ওমা! যেই না ঘোড়াটা মাথা নামিয়ে ওর শিংটাকে নাড়ালো ওমনি দূর থেকে একটা মাফিন হাওয়ায় ভেসে ওর দিকে আসতে লাগল। ম্যাজিক! তার মানে ঘোড়াটার শিংয়ে ম্যাজিক আছে। এ আবার কেমনধারা ঘোড়া! হেকেটি ডাইনি বা হুয়াং সুও জাদুকরের মত শয়তান নয় তো? কিন্তু ঘোড়াটাকে দেখে নিংপিং এর বদমাইশ মনে হল না। বেচারার ক্ষিদে পেয়েছে। দেখে মনে হচ্ছে নেহাতই ছেলেমানুষ ঘোড়া। নিংপিং আরও খানিকটা নিচে নেমে এল ডানা ঝাপটে। এবার কিন্তু ঘোড়াটা নিংপিংএর ডানার শব্দ পেয়ে চমকে উঠে এদিক ওদিক তাকাতে শুরু করে। নিংপিং লুকিয়ে পড়ার আগেই ওকে দেখতে পেয়ে ঘোড়াটা। এতবড় উড়ন্ত সবুজ রঙের একটা জীব দেখে বেজায় ঘাবড়ে গিয়ে পালানোর চেষ্টা করে।
নিংপিং লক্ষ্য করে ঘোড়াটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ছুটছে। সামনের একটা পায়ে সম্ভবত চোট লেগেছে। নিংপিং তাড়াতাড়ি উড়ে গিয়ে ওর রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে বলে ওঠে,
-“ভয় পেও না ভয় পেও না জাদু ঘোড়ার ছানা। আমি নিংপিং ড্রাগন। আমায় দেখতে এত বড় হলে কী হবে আসলে আমি তোমার মতই ছোট্ট। আমি তোমার কোনও ক্ষতি করব না। ওই দেখো না আমার কত্ত বন্ধু। সবাই সমুদ্রের ধারে খেলা করছে। আমরা এখানে মাফিন পিকনিক করতে এসেছিলাম। তুমি বুঝি মাফিন খেতে ভালোবাসো? চলো আমার সাথে আরও মাফিন খেতে দেব তোমায়। আর তোমার পায়ে তো দেখছি চোটও লেগেছে! চলো আমাদের ইভান আর রেভেন খুব ভালো ওষুধপাতি জানে! ঠিক তোমায় সারিয়ে দেবে।”
নিংপিংএর মুখে এত কথা শুনে বুঝি জাদুঘোড়াটার একটু ভরসা হল। আর ছুটে পালানোর চেষ্টা করল না। নিংপিং এর পিছু পিছু হাঁটা দিল সমুদ্রের দিকে যে দিকে বাকি সবাই খেলা করছে।
(৩)
নিংপিং আর এক শিংওয়ালা একটা সাদা ঘোড়াকে হেঁটে হেঁটে আসতে দেখে সব বন্ধুরা অবাক হয়ে খেলা থামিয়ে চেয়ে রইল।
ওরা দু’জন আসতেই সবাই হইহই করে উঠল! এরকম প্রাণী ওরা আগে দেখেনি। সাধারণ ঘোড়া দেখেছে কিন্তু একশিংওয়ালা ঘোড়া...
-“এটা কে গো নিংপিং?”
-“এরকম কোনও জীব তো আগে দেখিনি!”
-“এই তোমার নাম কী?”
-“তোমার মাথার শিংটা কেমন সুন্দর নীল আকাশের মত! আমায় একটু ছুঁতে দেবে?”
-“গোল্ডিকে তোমার পিঠে চাপতে দেবে?”
নানা জন নানা কথা বলে ধেয়ে আসে কৌতুহলে। জাদুঘোড়া তো ভয় পেয়ে লুকিয়ে পড়ে নিংপিং এর বিশাল দেহটার আড়ালে।
এমন সময় ফুফেং কাছিম দাদু বলে ওঠে,
-“থামো থামো সবাই! এ তো একটা ইউনিকর্ন। এরা তো বহুযুগ আগে এই রাজ্য থেকে হারিয়ে গিয়েছিল। কেউ দেখেনি ওদের বহুকাল। আমার দাদু একবার একটা ইউনিকর্ন দেখেছিল বলে গল্পে করেছিল বটে আমাদের ছোটোবেলায়। দাদু বলেছিল অনেকদিন আগে নাকি ইউনিকর্নরা বাস করত এই রাজ্যে। তাদের ঘোড়ার মত শরীর, সাদা রঙ। কিন্তু মাথায় একটা করে শিং। শিং, লেজ আর ঘাড়ের কেশর এক রঙের হত। কারোর লাল, কারোর নীল। গোলাপি সবুজ হলুদ আরও নানা রঙের হত নাকি। ওদের শিংয়ে থাকত জাদু। কিন্তু কালে কালে ইউনিকর্নদের জাদুক্ষমতার ওপর মানুষদের লোভ জন্মালো। যেহেতু ওদের জাদুশক্তি ছিল শিংয়ের ভেতর, তাই মানুষরা নানা কায়দায় ইউনিকর্নের শিকার করে তাদের শিংটা কেটে নিত। অনেক অনেক সোনার বিনিময়ে বিক্রি করত সেই শিং!”
ফুফেং দাদু এই অব্দি যেই না বলেছে অমনি নিংপিং এর পেছন থেকে জাদুঘোড়া থুক্কুড়ি ইউনিকর্নটা বেরিয়ে এসে বলে উঠল,
-“মানুষরা খুব খারাপ! ওরা জানেওনা যে আমাদের শরীর থেকে শিং কেটে নিলে শিং এর জাদুক্ষমতা কমে যায় আর ক’দিন পর একেবারেই নষ্ট হয়ে যায়। আর এদিকে শিং কেটে নিলে পরে ইউনিকর্নরা আর বেশিদিন বাঁচে না। শিংয়ের জাদু যে মুহূর্তে শেষ হয় সেই মুহূর্তেই মারা যায় ইউনিকর্নটাও। কী লাভ হবে তখন শিংটা নিয়ে? শুধুমুধু আমাদের কষ্ট দেয়, মেরে ফেলে। ওইজন্যই তো আমরা এই রাজ্য ছেড়ে অনেক অনেক দূরের দ্বীপে মানুষদের নাগালের বাইরে গিয়ে ইউনিকর্নদের রাজ্য গড়ে তুলেছি।’
বলেই জিভ কেটে ফেলে ইউনিকর্ন।
ফুফেং দাদু বলেন,
-“ওইজন্যই তাহলে আর ইউনিকর্নদের দেখা যায় না। কিন্তু বাপু সব মানুষ তো মোটেই খারাপ নয়। হ্যাঁ হেকেটি, হুয়াং সুও এদের মত দুষ্টু লোক আছে বটে কিন্তু তার থেকে ঢের ঢের ভালো লোকও আছে। এই যে আমাদের মেই লিং, ইভান রেভেন সব্বাই কত্ত ভালো। আর মানুষ ছাড়া এই যে আমরা এত্ত প্রাণীরা আছি, আমাদের মধ্যেও তো ভালো মন্দ আছে। ইয়ান সুও পাঁচমাথা সাপ দুষ্টু। গ্রে নাইফটিথ হাঙ্গর আগে কত্ত দুষ্টু ছিল, ওশিয়ানা রাজকন্যেকে বন্দী করেছিল কিন্তু সেও তো বন্ধু পেয়ে এখন কেমন লক্ষ্মীছেলে হয়ে গেছে। তাই বলছি, সবাইকে খারাপ ভেবোনা।
আচ্ছা তোমার সঙ্গে এতক্ষণ কথা বলছি অথচ তোমার নামটাই জানা হয়নি। কী নাম তোমার? আর তোমাদের লুকোনো দ্বীপ থেকে এখানে এলে কীকরে? তোমার পায়ে চোট লাগলই বা কীকরে?”
(৪)
এত প্রশ্ন শুনে নীল ইউনিকর্ন বললো,
-“দাঁড়াও দাঁড়াও বলছি। তোমাদেরকে সত্যি সত্যিই ভালো বলে বোধ হচ্ছে। তোমাদের সব খুলেই বলি তবে। আমরা সব ইউনিকর্নরা এখান থেকে অনেক অনেক দূরে নীল সমুদ্রের মাঝে স্বপ্নের মত সুন্দর একটা দ্বীপে থাকি। আমাদের দ্বীপের নাম তিয়েরে-এর্মসা। আমাদের রানিমা হলেন আইরিস। আমি রানিমা আইরিসের একমাত্র ছেলে, আমার নাম আজুল। বহুযুগ আগে যখন মানুষরা শিংয়ের জাদুর লোভে আমাদের ইউনিকর্নদের শিকার করে প্রায় শেষ করে এনেছে তখন ইউনিকর্নদের রাজা ছিলেন রুহান। তিনি অবশিষ্ট ইউনিকর্নদের নিয়ে পালিয়ে যান। সব ইউনিকর্নদের একত্র করে সমুদ্রের মাঝে একটা দ্বীপে বসবাসের ব্যবস্থা করলেন তিনি। নিজের জাদুশক্তির সাহায্যে মেঘ দিয়ে ঢেকে দিলেন সেই দ্বীপ। শুধু তাই নয় দ্বীপের চারদিকে সৃষ্টি করলেন উঁচু উঁচু পাহাড়, আর ডুবোপাহাড়। যাতে কখনোই কোনও মানুষের পা ওই দ্বীপে না পড়ে।”
এই অব্দি শুনে নিংপিং বলল,
-“আচ্ছা ইউনিকর্নদের এত জাদুশক্তি তাহলে পালাতে গেল কেন?”
আজুল বলল,
-“সব ইউনিকর্ন তো এত ক্ষমতাশালী হয় না। একমাত্র ইউনিকর্নদের রাজা বা রানিই শুধুমাত্র এত ক্ষমতার অধিকারী হন আর তাঁদের ডানাও থাকে। রাজা রুহান ক্ষমতাধর ছিলেন কিন্তু তাঁর একার পক্ষে সবসময় সব ইউনিকর্নকে বাঁচানো সম্ভব ছিলোনা। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে মানুষের জগৎ থেকে অনেক দূরে লুকিয়ে পড়াটাই ইউনিকর্নদের সুরক্ষার একমাত্র পথ।”
ডানার কথা শুনে নিংপিং আরও কৌতুহলী হ’ল,
-“আচ্ছা তুমিও তো ইউনিকর্নদের রানির ছেলে, তার মানে রাজপুত্র, পরে রাজা হবে। তাহলে তোমার কেন ডানা নেই?”
আজুল হেসে বলল,
-“আমদের রাজা বা রানি ওরকম ভাবে হয় না। রাজা বা রানির সন্তান হলেই যে সেও রাজ্যশাসনের ভার পাবে তেমনটি নয়। আমার মায়ের যখন রানি থাকার মেয়াদ ফুরোবে তখন এক প্রতিযোগিতার আয়োজন হবে ইউনিকর্ন রাজ্যে। সেই প্রতিযোগিতায় যে জিতবে, তাকে রানিমা নিজের সমস্ত জাদুশক্তি প্রদান করবেন। সেই বিজয়ী ইউনিকর্ন তখন পাবে তার ডানা, অপার জাদুক্ষমতা এবং সেইসাথে হবে ইউনিকর্ন দ্বীপের শাসক।”
ফুফেং কাছিমদাদু এবার বললে,
-“সে তো বুঝলাম কিন্তু তোমার ডানা নেই তাহলে তুমি এতদূরে এলে কীকরে?”
আজুল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
-“নিজের ইচ্ছেয় আমি তিয়েরা-এর্মোসা ছেড়ে আসিনি গো বন্ধুরা। বেশ কিছুদিন ধরেই আমাদের শান্তির রাজ্যে নানা উপদ্রব হচ্ছিল। হঠাৎ হঠাৎ এক একটা ইউনিকর্ন নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছিল। চার চারজন ইউনিকর্ন এভাবে নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার পর রানিমা আইরিস আমায় দায়িত্ব দিলেন খুঁজে বার করার যে কেন এমন হচ্ছে, কারাই বা এমন করছে? ওই চারজন ইউনিকর্ন গেল কোথায়? সেই তদন্ত করতে গিয়ে একদিন আমি আমাদের দ্বীপের সমুদ্রের কিনারায় রাতের পর রাত লুকিয়ে লক্ষ্য রাখছিলাম বাইরের কেউ আসছে কিনা আমাদের দ্বীপে। এমনই এক রাতে দেখলাম একটা কংকাল চিহ্ন দেওয়া পতাকা লাগানো জাহাজ মায়ামেঘের জাদু অতিক্রম করে, পাহাড়ের ঘেরাটোপ পেরিয়ে এসে নোঙর ফেলল দ্বীপের তীরে। তিনজন ভয়ঙ্করমত মানুষ নেমে দ্বীপের ভেতরের দিকে গেল। তার কিছুক্ষণ পরে দেখলাম একটা ইউনিকর্নকে বেঁধে নিয়ে এসে জাহাজে তুলল। ইউনিকর্নটা সম্ভবত অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল তাই জাদু করতে পারেনি কিছু। আমার একার ক্ষমতায় তিনজন মানুষকে আটকানো সম্ভব ছিলোনা, আমার জাদুশক্তি তো আর খুব বেশি নয়! আমি তাই তড়িঘড়ি রানিমার কাছে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করলাম, একমাত্র উনিই পারেন এদের আটকাতে। কিন্তু কী থেকে কী হ’ল হঠাৎ নাকে এমন একটা গন্ধ এল যে আমি মাথা ঘুরে পড়ে গেলাম। তারপর যখন জ্ঞান ফিরল দেখি জাহাজের খোলের মধ্যে একটা কুঠুরিতে বন্দী আমি। পাগুলো একসাথে বাঁধা। আমি কোনওমতে একটা লোহার টুকরো কুড়িয়ে সেটা দিয়ে ঘষে পায়ের বাঁধনটা কাটলাম। লোহার ঘষা লেগে আমার পাটাও কেটে গেল খানিকটা। আস্তে আস্তে খোলের ফোকর দিয়ে উঁকি মেরে দেখলাম সমুদ্রে ভেসে চলেছে জাহাজ। আমার পালানোর কোনও উপায় নেই। জাহাজের টঙে একটা লোক বসে চোখে লম্বা একটা নল লাগিয়ে কীসব দেখছে, আর একটা লোক জাহাজের ওপর ইয়াব্বড় একটা চাকা এদিকওদিক ঘোরাচ্ছে, তার কাঁধে একটা লাল মাথা সবুজ রঙের পাখি। আরেকটা লোক জাহাজের পাটাতনে বসে ঢুলছে। গভীর রাতে জাহাজ একটা ডাঙ্গায় ভিড়তে লোক তিনটে সেই আগের বন্দী ইউনিকর্নটাকে নিয়ে কোথায় চলে গেল। ওকে অন্য কুঠুরিতে রেখেছিল বুঝি। লোকগুলো চলে যেতেই আমি বেরিয়ে এসে পালালাম। আমাকে যে করেই হোক ফিরতে হবে আমার রাজ্যে। রানিমাকে সব জানাতে হবে, উদ্ধার করতে হবে আমার ইউনিকর্ন বন্ধুদের।”
এই অব্দি বলে উত্তেজনায় হাঁপাতে লাগল আজুল।
(৫)
আজুলের কাহিনী শুনে নিংপিংরা সবাই খুব দুশ্চিন্তায় পড়ল। আহারে! বেচারা নিরীহ ইউনিকর্নদের কী দুর্দশা! মেই লিং খুব চিন্তিত হয়ে বলল,
-“আমাদের রাজ্য এরকম ঘোর অনাচার পাপ কাজ হচ্ছে! এর একটা বিহিত আমি করবই। আমি এক্ষুনি লোক পাঠাচ্ছি রাজ্যের বন্দরে, মড়ার খুলি চিহ্নের পতাকাওয়ালা কোন জাহাজ ভিড়েছে এসে। ওই শয়তানগুলোকে ধরতেই হবে।”
এইবারে গ্রে নাইফটিথ হাঙ্গর বলে উঠল,
-“উঁহু! বন্দরে ওই জাহাজের সন্ধান পাবে বলে মনে হয় না। জাহাজটার যেরকম বর্ণনা শুনলাম তাই থেকে মনে হচ্ছে ওটা আমি এক দু’বার দেখেছি সমুদ্রে। ওটা কিন্তু বন্দরের দিকে যায়না। সমুদ্রের কিছুটা অংশ খাঁড়ির মত আকার নিয়ে ঢুকে গেছে এক জায়গায়। সেখানে বালির চড়ায় অনেক ঝোপঝাড় হয়ে আছে। ওই দিকে যায়, ওরা নির্ঘাৎ ওখানেই জাহাজ ভেড়ায়। অসৎ উদ্দেশ্যে আসে তো!”
নিংপিং বলে,
-“জাহাজের বদমাইশগুলোকে ধরে আজুলের হারানো বন্ধুদের উদ্ধার করে ওদের নিজেদের দ্বীপে ফেরৎ পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে শিগগিরই। আচ্ছা! আজুল তুমি তো জাহাজে বন্দী হয়ে এখানে এসেছো, তুমি কী ফেরার পথ চিনতে পারবে?”
আজুল ঘাড় নেড়ে বলল,
-“উঁহু’ আমি তো চিনতেই পারবো না, আর তোমরাও হাজার চেষ্টা করে খুঁজে পাবেনা। একমাত্র একটা বিশেষ ম্যাজিক ম্যাপ থাকলে তবেই খুঁজে পাওয়া যাবে তিয়েরা-এর্মোসা দ্বীপ। আমার মনে হয় ওই বদমাইশ লোকগুলোর কাছে সেইরকম কোনও ম্যাজিক ম্যাপ আছে।”
নিংপিং বলে,
-“তবে আর দেরি কীসের? নাইফটিথ তুমি বরং জলপথে আমাদের ওই খাঁড়ির দিকের পথ দেখাও, আমি আকাশ পথে তোমার পিছু পিছু আসি।”
জলপথে গ্রে নাইফটিথ হাঙ্গর চলল সাঁতরে, তার সাথে চলল ফুফেং কাছিমদাদু। আকাশপথে চলল নিংপিং আর রেভেন চলল কাকের রূপ ধরে। মেই লিং রাজকন্যে, গোল্ডি ম্যাকমাফিন লেপ্রিকন আর ইভান সমুদ্রতটেই রইল, আজুলের সঙ্গে। আজুলের পায়ে চোট লেগেছে কিনা, ওর দেখাশোনা করতে হবে তো। জলপরী রাজকন্যে ওশিয়ানা, আর হম্পকম্প গোটালাট্টু ঘোড়ামাছও রইল ওদের সঙ্গে। বেশি লোক নিয়ে জলদস্যুদের ধরতে গেলে ওরা টের পেয়ে গিয়ে যদি চম্পট দেয়। সকলে উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষায় রইল নিংপিংদের।
পারবে কি নিংপিংরা ভয়ঙ্কর জলদস্যুদের হারিয়ে, বন্দী ইউনিকর্নদের মুক্ত করতে?
(জানতে পারবে পরের চ্যাপ্টারে...)
ছবি : আমি ইন্টারনেটে দেখে দেখে।

No comments:
Post a Comment