ভুটু আর টুটু

 


ভুটু আর টুটু

সুস্মিতা কুণ্ডু
তোমরা ভুটুকে চেনো না, আর টুটুকে তো চেনোই না। এ আমি হলফ করেই বলতে পারি। হ্যাঁ মানছি তোমরা জানো যে টুটু একটা হলদে পাখির ছানা আর ভুটু একটা গাবলুগুবলু ভেড়ার ছানা। তবে শুধু সেটুকু জানলে তো আর চিনবে না ওদের, তাই না? অবিশ্যি এতে তোমাদের একটুকুনও দোষ নেই। কাউকে চিনতে গেলে, জানতে গেলে, আগে তো তার সাথে খানিকটা মিশতে হয়, খেলতে হয়, মিলতে হয়, জুলতে হয়! আর মিলিজুলি করতে হলে তাদের বাড়ি যেতে হয়, নয় তো নিজের বাড়িতে ডাকতে হয় চানাচুর দিয়ে মুড়ি খেতে। মুশকিলটা তো ওখানেই! ভুটু-টুটুকে নাগালে পেলে তবেই না বাড়িতে ডাকবে। তবেই না কদবেলমাখা, কুলের চাটনি, আমের আচার জমিয়ে খাওয়া হবে। লুকোচুরি ধরাধরি খেলা হবে!
টুটু সারা দিনমান নীল আকাশের বুকে ফড়ফড়িয়ে ঘুরে বেড়ায়। তাকে একবার হাত নেড়ে ডাকতে গেলেই বলে,
-“আমার সময় নেইকো! পরে আসবো’খন।”
ব্যাস! এই না বলেই ডানা মেলে ফুড়ুৎ!
আর ভুটু? সে তো সকাল থেকে সাঁঝ সবজে ঘাসে বসে ঢুল ঢুল ঢুল ঘুম লাগায়। ডাকো দিকিনি একবার, কোনওমতে পিটপিট করে চোখটি খুলে বলবে,
-“কাল যাবো, আজ ঘুমোই?”
তারপরেই টপ করে আবার নাকটি ডাকতে শুরু করবে ‘ঘাঁআআ ফুশশশ, ঘাঁআআ ফুশশশ’ আওয়াজ তুলে।
এবার তোমরাই বলো দেখি এমন করলে ভাব হয়?
এমনি করে দিন যায় মাস যায় বছর যায়। টুটু ভুটু নিজেদের নিয়েই মেতে থাকে। কারোর সাথে তাদের খেলার সময় নেই। খেলুড়েরাও তাই আর টুটু ভুটুকে ডাকাডাকি করেনা। মিছে শোরগোল করে হবেটাই বা কী!
তবে হঠাৎই একদিন এমন একটা ঘটনা ঘটল যে টুটু ভুটু পড়ল বেজায় মুশকিলে। বিশেষ করে টুটু। টুটু কিনা ভারি ছটপটে। এক পলও সে এক জায়গায় চুপটি করে বসতে পারে না, শুধুই উড়ে বেড়ায়। এই গাছে ওই গাছে। এই ডালে ওই ডালে। এই বাগে সেই বাগে। এই করে করে টুটুর দিনরাতের ঘুমখানি একেবারেই জলে গিয়েছিল। ভোরে সূয্যিমামা ওঠার আগেই টুটু গাছের টঙের বাসাটি ছেড়ে সেই যে উড়তে বেরিয়ে যেত, ফিরত আঁধার নামলে।
এমনই উড়তে উড়তে সেদিন একটা ঝোড়ো বাতাস এত জোরে বইল যে টুটু ছিটকে গিয়ে পড়ল একটা ঝোপের ওপর। খুব বেশি চোট না লাগলেও টুটুর একটা ডানা বেশ জখম হল। কোনওমতে তো লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ি ফিরল টুটু। তবে উড়তে আর পারে না। বদ্যিমশাই বললেন কটা দিন উড়ে বেড়ানো ছেড়ে মাটিতেই হাঁটতে হবে টুটুকে। দিলেন পাঁচন খেতে। টুটুর তো মাথায় যেন আকাশটাই হুড়মুড়িয়ে ধসে পড়ল! এ কী ভয়ানক কথা। না উড়ে টুটু থাকবে কী করে!
টুটু তখন ছুটল ভুটুর কাছে। ছুটল মানে সত্যি সত্যিই ছুটল। ওড়া তো বারণ। ভুটুর কাছে পৌঁছে টুটু করুণ গলায় বলে উঠল,
-“অ ভুটু! বদ্যিমশাই যে মাটিতে হাঁটাহাঁটি করতে বলেছে! আমার এবার কী হবে?”
ভুটু আধেক শুনে আধেক না শুনে ঘুমজড়ানো গলায় বলে,
-“তা মাটি ঘাঁটাঘাঁটি করলে পালকগুনো একটু নোংরা হবে আর কী! বেশটি করে নেয়ে নিবি নাহয় তারপর।”
টুটু ফের বলে,
-“অ্যাঁ বলি নাইতে যাব কেন খামোকা! বলছি বদ্যিমশাই বিধেন দিলেন যে আমার ডানা মেলে ওড়া মানা! সেটার কী হবে?”
ভুটু বিশাল বড় কুমিরের হাঁ-এর মত হাই তুলে বলল,
-“ছানা খেলে যদি ওড়া মানা হয় তবে ক’দিন খাসনি বরং। তুই তো আবার উড়তে না পেলে হাঁপিয়ে ঝাঁপিয়ে একশা করবি।
এইবারে টুটু খচেমচে একশা হয়ে চেঁচাল,
-“এইয়ো ঘুমকাতুরে ভুটকো! বলি চোখের সাথে কানটাও বুজে ফেলেচিস ওই ঝামরিঝুমরি লোমে? বলছি ডানা মেলে ওড়া মানা আর উনি শুনছেন ছানা খেলে ওড়া মানা। হাঁটাহাঁটি আর ঘাঁটাঘাঁটিতে তফাৎটা কানে গেল না বুঝি?”
টুটুর সরু কিঁচকিঁচে গলায় কানে ছুঁচফোটানো চিৎকারের চোটে ভুটু আধবোজা চোখজোড়া এবার পুরোপুরিই খুলতে বাধ্য হল।
একটু মেজাজ করেই জবাব দিল,
-“কী হয়েছেটা কী সেটা বলবি তো! সেই থেকে একবার মশার মত পোঁ পোঁ করছে নয়তো সানাইয়ের মত প্যাঁ প্যাঁ করছে।”
ভুটু এমনিতে একদম ভালোমানুষ তবে ওই ওর ফুলকোফুলকো লোম নিয়ে কেউ কিছু বললে একটু আঁতে ঘা লেগে যায়।
শখের মধ্যে ভুটুর ওই দুটি-ই। ঘুমনো আর একটু ঝামরি ঝুমরি মেঘের মত নরম সাদা লোমগুলোর খেয়াল রাখা। খেজুরপাতার চিরুনি দিয়ে একটু আঁচড়ানো, একটু কাঁঠালিচাঁপা ফুলের সুবাস ছড়ানো। আর টুটু কিনা সেই আদরের জিনিসটাকেই অমনটি করে বললে। কার না রাগ হয় বলো দেখি!
টুটুও সেটা বুঝতে পেরে একটু সুর নরম করল। টুটুর কপালে যে সমস্যা জুটেছে তার জন্য তো আর ভুটু দায়ী নয়। তাই একটু করে পুরো ঘটনাটাই খুলে বলল টুটু। কেমন করে ডানায় চোট পেল আর বদ্যিমশাই-ই বা কী বললেন, সঅঅব কিছু।
ভুটু সব শুনেটুনে বুঝলে যে কেন টুটু এত উতলা হয়েছিল। বেচারি সারাদিন শুধু উড়তে ভালোবাসে আর তাকেই যদি হেঁটে চলে বেড়াতে হয় তাহলে মন তো খারাপ হবেই। ভুটু কী আর রাগ করে থাকতে পারে টুটুর ওপর!
ভুটু তখন বললে,
-“শোন টুটু একটা উপায় বলি। তুই বরং আমার মাথার ওপর চেপে বোস। তারপর বল কোথায় কোথায় যেতে চাস। আমি তোকে নাহয় একটু বেড়িয়ে আনব’খন হেথাহোথা। এ আর এমন কী কঠিণ কাজ!”
টুটুরও মনে হল মতলবটা খারাপ নয়। নেই মামার চেয়ে কানা মামাই ভালো। নিজে না উড়ে যেতে পারলেও ঘাড়ে চেপে বেড়ানোই সই।
তারপর বেশ ক’দিন টুটুকে মাথায় চাপিয়ে ভুটু ঘুরে বেড়াতে লাগল। তবে শুরুতে ব্যাপারটা যতটা সহজ মনে হয়েছিল ভুটুর, ক’দিন পর আর ততটা সহজ মোটেও লাগল না। টুটু একটু সময়ের জন্যও বসতে দেয় না। একবার বলে ‘এদিকে চলো’ তো একবার বলে ‘ওদিকে চলো’। একবার গাছের তলায় দৌড় করায় ভুটুকে তো একবার নদীর পাড়ে ছোটায়। ভুটু বেচারা একটু আলতুসি আরামে থাকতেই ভালোবাসে। তার কী আর এত দৌড়ঝাঁপ সয়! এদিকে টুটুকে না বলতেও বাধো বাধো ঠেকছে। যদি ভেবে বসে ভুটুটা একেবারেই কুঁড়ে আর আলসে। ক’দিন এইটুকু উপকার করতেও পেরে উঠছে না। ভুটুর তাহলে আর মানটা থাকে কী করে!
অনেক ভেবে ভুটু শেষমেষ একটা মতলব আঁটল। টুটুর যেমন ডানায় চোট লেগেছে, ভুটুরও যদি আচমকা পা মচকে যায় তাহলে তো আর হেঁটে বেড়াতে হয় না!
যেমনি ভাবা তেমনি কাজ। সেদিন টুটুকে মাথায় নিয়ে মাঠে ছুটতে ছুটতে হুট করেই মিছিমিছি হোঁচট লাগার ভাণ করে হুমড়ি খেয়ে পড়ল ভুটু। পড়েই চিৎকার জুড়ল,
-“আহা রে! উহু রে! টুটু রে! গেলুম রে! আমার পা-টা গেল রে! আর মনে হয় সারাজীবন হাঁটা হল না আমার। তোকেই বা কী করে মাথায় চাপিয়ে বেড়াতে পারব আর!”
এদিকে আচমকা যেই না ভুটু পড়ে গেছে মাটিতে টুটুও আরেকটু হলে পড়ার জোগাড় হয়েছিল ভুটুর মাথার ওপরটি থেকে। নেহাতই ঝটপটিয়ে ডানা মেলে উড়ে সামলে নিয়েছিল তাই!
এ কী এ কী! টুটু যে আবার উড়তে পারছে! কই ডানায় তো ব্যথা লাগছে না! বেশ কয়েকবার ডানা ঝাপটে ওপর নিচে ডাইনে বাঁয়ে উড়ে নেয় টুটু! ডানা বিলকুল ঠিক!
একপাক ঘুরে নেচে নিয়ে গান ধরে টুটু,
-“ তাইরে নাইরে নাই রে
ওরে ভুটু ভাই রে
আর যে ব্যথা নাই রে
খুশিতে গান গাই রে!”
ভুটুও টুটুর ডানা ঠিক হয়ে গেছে দেখে বেজায় খুশি আর অবাক দুটোই। হাত পা মেলে বসে বসে টুটুর নাচ দেখে। নিজেরও যে একটু নাচতে সাধ হয়নি তা বলব না তবে ভুটু এখন চোট লাগার ভান করেছে কিনা। নাচতে গেলেই টুটু বুঝে যাবে যে ভুটু মিছে কথা কইছিল। ছি ছি! সে ভারি বাজে ব্যাপার হবে। টুটু হয়ত বা মনে আঘাত পাবে ভুটুর মিছে কথা বলে পিছু ছাড়ানোর এই মতলব জানলে।
নাচা গানা শেষ হলে ‘পরে টুটু খেয়াল করে ভুটু পা ছড়িয়ে বসে ড্যাবড্যাবিয়ে চেয়ে আছে। টুটু মনে মনে জিভ কাটে। নিজের ডানা ঠিক হয়ে গেছে বলে এত লাফালাফি ওড়াউড়ি করছিল ওদিকে ভুটু বেচারার যে পায়ে চোট লেগে গেছে সেটা বেমালুম ভুলেই বসেছে! না জানি বেচারা কত ব্যথা পেল। আলতো করে উড়ে এসে ভুটুর মাথায় বসে টুটু বলে,
-“ভুটু ভাই, মন খারাপ করিসনে। যতদিন না তোর পা ঠিক হবে ততদিন আমি তোকে ছেড়ে কোথাও নড়ব না। একবারটি শুধু বদ্যিমশাইয়ে তেঁতো পাঁচন দাওয়াইটা নিয়ে আসি দাঁড়া তোর জন্য। তারপর যতদিন না তোর পা-টা সারবে ততদিন রোজ তোকে গান শোনাবো, তারপর মিঠে জাম এনে দেব...”
টুটু আরও অনেক কিছু বলে চলে তবে সে সব ভুটুর কানে আসে না। তার যে দু’চোখে ঘুম জড়িয়ে এসেছে। না জানি আবার কতদিন টুটুর সেবার ঠ্যালায় সাধের ঘুমটিকে বিদায় জানাতে হবে। পরের বার কিছুতেই আর এমন মিছে নাটক করবে না ভুটু। তার চেয়ে সত্যি কথা বলে দিলে ঝকমারি অনেক কম। ভাবতে ভাবতেই কখন চোখ লেগে যায় ভুটুর, নাকে বাজনা বাজে,
“ঘাঁআআ ফুশশশ... ঘাঁআআ ফুশশশ...”
(শেষ)
ছবি: আমি ইন্টারনেট থেকে দেখে দেখে 😁

No comments:

Post a Comment