ভূতের নাম
সুস্মিতা কুণ্ডু
মস্ত আতান্তরে পড়েছে ভূতেদের সর্দার মামদো ঘটাংঘট আর তার পেত্নী বৌ খটখটি। মাথা চুলকে চুলকে খুলিতে গর্ত হয়ে যাওয়ার জোগাড়। শেষমেষ ওই মানুষদের থেকে ধার নিতে হবে?
ছ্যা ছ্যা! তাহলে যে ভূতসমাজে আর মুখ দেখানোর জো থাকবেনা। তোমরা নিশ্চয়ই ভাবছ ভূতেদের আবার বিপদ কী? তারাই তো মানুষদের নাস্তানাবুদ করে বিপদে ফেলতে ওস্তাদ। আর ভূতেরা মানুষের থেকে ধারই বা কী নেবে? আরে ভূতেদের কি টাকাপয়সা লাগে যে মানুষের মহাজনের থেকে চড়া সুদে ধার নিতে ছুটবে? রোসো! ব্যাপারটা একটু খুলেই বলি তাহলে।
ঘটাংঘট আর খটখটির তিনটি ছেলে। হাঁউ, মাঁউ আর খাঁউ। নামগুলো শুনে মজা লাগছে তো? ভুরভুরিয়ে হাসি বেরিয়ে আসছে তো? কিন্তু ওই নামের বাহার করতে গিয়েই তো বিপদে পড়েছে ঘটাংঘট আর খটখটি। হাঁউ মাঁউ খাঁউ তো মানুষদের ভয় দেখিয়ে উৎপাত করে, জন্তুজানোয়ারদের লেজ টেনে সব্বাইকে তিতিবিরক্ত করে বাবা মায়ের মুখ গর্বে উজ্জ্বল থুক্কুড়ি কালো করতে থাকে। এদিকে খটখটির মনে মনে বড় একটা মেয়ের শখ। নিজের হাতে পাঁক আর পোড়া হাঁড়ির কালি দিয়ে রূপটান লাগাবে মেয়েকে। মাকড়সার জাল দিয়ে চুল বেঁধে দেবে। গুগলি শামুকের চচ্চড়ি রাঁধতে শেখাবে মেয়েকে। আরও কত্ত কী করবে! ছেলে তিনটে তো দু’দণ্ড মায়ের কাছে বসেই না।
তা মানুষ হাজার ডেকে ভগবানের সাড়া না পেলেও ভূতেরা চট করে তাদের আরাধ্য দেবতা মানে অপদেবতা শয়তানের সাড়া পেয়ে যায়। খটখটির মনের সাধ পূর্ণ করে এক ছোট্ট দুষ্টু পেত্নীছানা এলো তার কোলে। ঘটাংঘট বললেন মেয়ের নাম তার দাদাদের নামের সাথে মিলিয়ে হোক ‘পাঁউ’। না মানে একটা ফুটফুটে ঘুটঘুটে ভূতের ছানার নাম তো আর ‘মানুষের গন্ধ পাঁউ’ রাখা যায় না, তাই শুধু ‘পাঁউ’। চার ভাইবোন বেশ একসাথে ভয় দেখাতে যাবে,
‘হাঁউ মাঁউ খাঁউ
মানুষের গন্ধ পাঁউ!’
কিন্তু বাদ সাধল খটখটি। খটখটি আসলে বেশ যাকে বলে ওই মডার্ণ পেত্নী। ভূতেদের ওই নেত্যকালী, আন্নাকালী, ক্ষ্যান্তমণি এইসব ধরনের নাম খটখটির পছন্দ নয়। নাম হতে হবে এমন যে ভূত ভূত ছোঁয়াও থাকবে আবার বেশ ইয়ে মানে আধুনিকও হবে। নাম শুনলেই যেন মানুষরা ভয়ে একেবারে ভির্মি খায় এমনধারা নাম হতে হবে। তবে না ভূত সমাজের মোড়ল বংশের মান থাকবে!
খটখটির নিজের নামের বেলায় তো আর কোনও হাত ছিল না! বাপ মা যা নাম রেখেছে তাই মেনে নিতে হয়েছে। কিন্তু নিজের মেয়ের বেলায় কারোর কথা শুনবেনা খটখটি! এমনকি স্বামী ঘটাংঘটের কথাও না। ছেলেদের বেলায় ঘটাংঘট খটখটির কথা শোনেনি এখন ও-ই বা পাত্তা দেবে কেন শুনি?
কিন্তু আধুনিক নাম দেব বললেই তো আর এত সহজে দেওয়া যায়না! ভূতেরা চিরকাল ওই ঘটাংঘট খটাংখট মার্কা নাম দিয়েই অভ্যস্ত। অনেক ভেবে ভেবে শেষে খটখটি গেল ব্রক্ষ্মদত্যি পণ্ডিতমশাইয়ের কাছে। পণ্ডিতমশায়ের অনেক জ্ঞান, নিশ্চয়ই একটা উপায় বাতলাতে পারবেন। খটখটির মনের সাধ শুনে ব্রক্ষ্মদত্যিমশাই খড়ম খটখটিয়ে, টিকি নাড়িয়ে, বললেন,
-“হুমম! মানুষরাও আজকাল অনেক অদ্ভুত কিম্ভুত নাম রাখে বটে। ওই যে কী বলে ডিসপ্যাঁচ নাকি ডিসকোরানি... গাবদাগোবদা মোটাসোটা বই হয়। মানুষরা শুনি তো ওই থেকেই খুঁজে খুঁজে ছেলেপিলের নাম রাখে। তোমরাও তাই করোগে বরং।”
খটখটি তো এই শুনে নাচতে নাচতে মহানন্দে বাড়ি এল। তারপর ঘটাংঘটকে বলল,
-“মানুষদের বাড়িতে বাড়িতে তোমার ভূতপিশাচ অনুচরদের পাঠাও। আমার ওই ডিসকোরানি চাই চাই চাই।”
খটখটির কথা অমান্যি করে এমন সাধ্যি ভূতসর্দার ঘটাংঘটেরও নেই। অগত্যা দিকে দিকে ভূত গেল। রাতের অন্ধকারে মানুষেরা যখন সবাই নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে তখন আলমারি থেকে, টেবিল থেকে, সবচেয়ে মোটা বইগুলো জানালা দিয়ে লম্বা লম্বা আঁকশি গলিয়ে, বস্তায় ভরে, তুলে আনতে লাগল ভূতের দল। এক রাতের ভেতরেই ঘটাংঘট আর খটখটির ঘর বইয়ে ভর্তি হয়ে গেল। খটখটি তো ভীষণ উত্তেজিত, মেয়ের একটা দারুণ নাম হবে বলে কথা! এদিকে উত্তেজনার বশে এটাই ভুলে গেছে সকলে যে ভূতেরা মানুষের লেখা পড়তে পারে না! কী কেলেঙ্কারী কাণ্ড! এই এত ডিসপ্যাঁচ জোগাড় করা তাহলে বৃথা? খটখটি তো মেয়ে কোলে ডাক ছেড়ে কাঁদতে শুরু করল। ঘটাংঘট আবার বউয়ের দুঃখ সইতে পারে না। ফের শরণাপন্ন হল মুশকিল আসান ব্রক্ষ্মদত্যির।
ব্রক্ষ্মদত্যি বললেন,
-“দ্যাকো বাপু, যখন পুরুতগিরি করতুম সব ওই মুখস্থ মন্ত্র পড়তুম। সংস্কৃত বাংলা কোনওটাই ছাই আমি না পড়তে পারতুম না লিখতে পারতুম! আর জীবদ্দশাতেই পড়াশোনা হল না তার এই প্রেতদশায় কি আর মানুষদের পুঁথি পড়তে পারি? ঘটাংঘট বাছা তুমি বরং এক কাজ কর। এত খেটে যখন মানুষদের বই জোগাড় করলেই তখল একটা গোটা মানুষকেই নাহয় ধরে আনো। সেই পড়ে পড়ে বলে দেবে’খন।”
ঘটাংঘট আর খটখটি বেশ পছন্দ হল বুদ্ধিটা। তিন ভাই হাঁউ-মাঁউ-খাঁউ গিয়ে ওমনি ফের হানা দিল মানুষদের পাড়ায়।
মানুষদের পাঠশালার মাষ্টারমশাই দীননাথ পোদ্দার মনের সুখে ছাত্র পিটিয়ে, পান্তা, আলুচচ্চড়ি আর মৌরলা মাছের টক দিয়ে ডিনার সেরে দিব্যি নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছিলেন। হঠাৎই ঘুমের মধ্যে অনুভব করলেন খাটশুদ্ধু হুশ্হুশ্ করে উড়ে চলেছেন। প্রথমে ভাবলেন পান্তা ভাত আর মাছের টক খেয়ে গ্যাস অম্বল হয়েছে বুঝি কিন্তু চোখ খুলতেই ভুল ভাঙল। মাথার ওপর টিনের চালের বদলে কালো আকাশ আর নীচে সারি সারি তালগাছের মাথা। দীননাথ পোদ্দারকে হাঁউ-মাঁউ-খাঁউ সোজা উড়িয়ে নিয়ে এল ভূতেদের আড্ডায়। দীননাথ ওড়া থামতে চোখ খুলে দেখেন তাঁকে ঘিরে গাদাগাদা ভূত আর মোটামোটা বই, ঠিক যেন ভূতেদের সাহিত্যসভা হচ্ছে আর তিনি যেন মধ্যমণি সভাপতি।
একটা বিকটদর্শন ভূত এসে দীননাথকে বলল,
-“এইয়ো মানুষ! আমি ভূতেদের সর্দার ঘটাংঘট। তোমাদের ওই মোটামোটা ডিসকোরানি পড়ে শিগগির আমার মেয়ের জন্য একটা নাম ঠিক করে দাও তো। নামটা ভৌতিকও হতে হবে আবার আধুনিকও হতে হবে। যদি তোমার দেওয়া নাম আমার গিন্নি খটখটির পছন্দ না হয় তাহলে ঘটাং করে তোমার ঘাড়টা মটকে দেব। আমার নাম এমনি এমনি ঘটাংঘট হয়নি, বুঝলে?”
সর্দার ঘটাংঘটের কথা শুনে আর তার পেত্নিগিন্নি খটখটিকে দেখে দীননাথ পণ্ডিতের সত্যিই ভয়ে দাঁতে দাঁত লেগে খটাখট আওয়াজ উঠতে লাগল। আর বাক্যব্যয় না করে সামনে থেকে একটা মোটা ডিক্সনারি টেনে নিয়ে নাম খুঁজতে শুরু করলেন। দীননাথ ভীতু হলেও মূর্খ নন। বিপদের সময় মাথা ঠাণ্ডা রাখতে জানেন।
এক এক করে যা চোখে পড়ছে বলতে থাকলেন। তাড়কা, শূর্পনখা, হিড়িম্বা... এমনকি কদলীবালা... সবরকমই চেষ্টা করলেন। কিন্তু ঘটাংঘট আর খটখটির কোনও নামই পছন্দ হয়না। বারবার বলে ‘এই বইটা নয়, ওই বইটায় দ্যাখো’। কিন্তু ওদের কে বোঝাবে যে সব ডিক্সনারিই সমান। শেষমেষ এ বই সে বই করতে করতে দীননাথ মাষ্টারের হাতে উঠে এল এক পিস কৃত্তিবাসী রামায়ণ। কোনও ব্যাটা মূর্খ ভূত বইয়ের মোটাসোটা চেহারা দেখে ডিক্সনারি ভেবে ভুল করে আঁকশি দিয়ে রামায়ণ টেনে এনে ভরেছে বস্তায়। এই সুযোগ দীননাথ পোদ্দারের। দীননাথ উচ্চৈঃস্বরে সুর করে রামায়ণ পড়তে শুরু করলেন। প্রথমটায় ভূতেরা বুঝতে না পারলেও খানিকবাদে রামায়ণ শুনে সবার বোঁ বোঁ করে মাথা ঘুরতে লাগল। ভির্মি খেয়ে পড়তে লাগল একে একে।
-“এই এই এ কী পড়ছ?”
বলে খটখটি যেই না দীননাথের হাত থেকে বইটা টেনে কাড়তে গেছে ওমনি কারেন্টের শক লাগার মত ছিটকে পড়ল দশ হাত দূরে। খটখটিকে পড়ে যেতে দেখে ঘটাংঘট যেই না বইটা ধরতে এল ওরও একই দশা হল। বাবা মার এই অবস্থা দেখে হাঁউ মাঁউ খাঁউ তিন ভাই এগিয়ে এল। বলাই বাহুল্য যে তাদেরও একই গতি হল। সব কঙ্কাল হাড়গোড়ে যেন ভূমিকম্পের মত ঝাঁকুনি লাগল। ঘটাংঘট মাটিতে পড়ে কাতরাতে কাতরাতে চেঁচাতে লাগল,
-“ওরে কে কোথায় আছিস এই অলুক্ষুনে বইসহ এই বজ্জাত মানুষটাকে শিগগির ফেরৎ দিয়ে আয়। নইলে আমাদের ভূতবংশ নির্বংশ করে ছাড়বে।”
খাটের ওপর রামায়ণ হাতে বসা অবস্থাতেই দীননাথ পোদ্দারকে ফের হুশহুশিয়ে উড়িয়ে ভূতের দল তার বাড়িতে রেখে এল। দীননাথ হাতের রামায়ণটাকে সশ্রদ্ধায় মাথায় ঠেকিয়ে, ঠাকুরের আসনের সামনে রেখে এলেন। এ যাত্রায় এই বইটাই প্রাণ বাঁচাল।
ওদিকে ঘটাংঘট একটু ধাতস্থ হয়ে উঠে গিন্নি খটখটিকে বললে,
-“মেয়ের নাম ওই পাঁউ-ই থাকবে! ফের যদি আধুনিক নামের বায়না করেছো...”
(সমাপ্ত)
No comments:
Post a Comment