মিলির একদিন




মিলির একদিন

সুস্মিতা কুণ্ডু
একটা ছিল বিশাল বড় দোকান, শহরের ঠিক মাঝখানটিতে। কী নেই সেই দোকানে! জামা কাপড়, বাসনকোসন, ঘরসাজানোর জিনিস, খাবারদাবার, ফলমূল আনাজপাতি, মশলা থেকে শুরু করে বই খাতা পেন রঙ ছোটোদের খেলনা, সব সঅঅঅব পাওয়া যায় সেই দোকানে। গোটা শহরের খোকাখুকুরা আসত তাদের মা বাবার হাত ধরে সেই দোকানে নানানরকম জিনিস কিনতে। সে বাবামায়েরা অবশ্য গোটা দোকান ঘুরে ঘুরে সংসারের হাজারখানা জিনিস কিনলেও ছোটোদের মনটা পড়ে থাকত দোকানের একটা বিশেষ কোণায়। যেখানটায় আছে রাজ্যের খেলনা। রঙচঙে বল, খেলনা গাড়ি, আর পুতুল! তাক জোড়া এত এত পুতুল। কোনটা তুলোর মত তুলতুলে, কোনটা কাঠের মত ঠকঠকে। কোনটার কালো চুল, কোনটার সোনালী চুল। কোনওটার চোখ নীল তো কোনওটার বাদামী। আর তাদের পরনের পোশাকের যে কত রকমারি সে আর কী বলি তোমাদের। ছোটো খোকাখুকুদের আলমারিতে যা জামা থাকে ঠিক সেরকমই সব ঝালর দেওয়া, রেশমের সূতোর নকশা তোলা, রঙবেরঙের বোতাম বসানো জামা পুতুল খোকাখুকুদের গায়ে।
দোকানের সেই জাদু ঝলমলে কোণটিতে বাকি সব পুতুলদের সাথে থাকত মিলি। এককালে মিলির মাথাজোড়া সোনালী চুল ছিল। তাইতে দুটো বিনুনি বাঁধা ছিল, বিনুনির ডগায় লাল ফিতে দিয়ে ফুল বানানো। মিলিকে শুইয়ে দিলে তার নীল চোখের পাতাটা বুজে যেত, আবার যেই না বসিয়ে দেওয়া চোখদুটো এমনি করে খুলে যেত যেন মনে হত ঘুম থেকে জেগে উঠল এই বুঝি! এমনকি মিলির হাত দু’খানি আর পা দু’খানি দিব্যি এদিক ওদিক ঘোরানোও যেত। আর মিলির জামাটার কথা যদি তোমরা শোনো তাহলে হয়ত ওরকমই একটা জামা তোমরাও চেয়ে বসবে। একটা আশমানি রঙ জামা তাইতে সাদা মেঘের মত ফুলকো ফুলকো ঝালর দেওয়া ছিল। দেখলে মনে হবে যেন শরতের নীল আকাশে পেঁজা তুলোর মত সাদা মেঘ ভাসছে। তবে এত কিছুর পরেও মিলির মনে ভারি দুঃখ। তার কারণ কী জানো?
এ সবই মিলির এককালে ছিল, এখন আর নেই। এখন মিলির সোনালী বিনুনীর চুলগুলো সব জটপাকানো। একটা বিনুনি থেকে তো লাল ফিতে খুলে কোথায় হারিয়েই গেছে। মিলির নীল চোখের পাতা এখন আর শুলেও বোজেনা, সবসময় খোলাই থাকে। আর মিলির সেই আশমানি রঙ জামার যা দশা হয়েছে সে দেখে তোমরা বুঝি কেঁদেই ফেলবে। শরতের আকাশ থেকে সে জামা এখন বাদলাদিনের কালো মেঘে ছাওয়া আকাশ হয়ে গেছে। সাদা ঝালর গুলোয় ময়লার পরত পড়েছে। দেখলেই বোঝা যাবে কেউ আর মিলির খেয়াল রাখে না।
রাখবেই বা কেন! দোকানে কত নামীদামী সাজানোগোজানো পুতুল। খোকাখুকুরাও তাদের নিয়েই হইচই করে। তাদের মা বাবারা পয়সা দিয়ে নতুন নতুন সেই পুতুল কিনে দেয় খোকাখুকুদের। সেই পুতুল হাতে নিয়ে নাচতে নাচতে গাইতে গাইতে বাড়ি যায়। মিলি পড়ে থাকে কাঠের তাকের এক কোণে। কখনও কখনও মিলি বিড়বিড় করে বলে,
-“এই বেশ ভালো হয়েছে। আমায় দেখতে পেলে হয়ত সব খোকাখুকুরা হাসাহাসিই করত বুঝি। তার চেয়ে আড়ালে আছি সেটাই ঠিক।”
মুখে তাই বললেও মিলি মনে মনে কি আর ব্যথা পেত না? খোকাখুকুদের বাড়িতে না জানি কত মজা! রোজ কেমন তাদের খেলার সাথী হওয়া যায়। মিছিমিছির চায়ের আসর, পুতুলের বিয়ে, সুপারহিরো সাজা, খোকাখুকুর মাবাবাদের মুখে ঘুমপাড়ানি গান শোনা, আরও কত কী! সে সব কি আর মিলির কপালে জুটবে কখনও! মিলি তাই পড়েই থাকে দোকানের আলো ঝলমলে কোণটির এক আঁধার তাকের তলায়।
এমনি করেই দিন যায়। তবে এক একটা দিন বুঝি একটু আলাদা রকমেরই হয়। সেই দিনগুলোতে আঁধার তাকের তলাতেও আলো পৌঁছয়। কীসের যেন একটা হাসি, কেমন যেন একটা খুশি খেলে বেড়ায় বাতাসে। গুনগুনিয়ে গান ভেসে আসে।
তেমনই একটা দিনে এক ছটপটে খোকন তার মাবাবার হাত ধরে এল সেই বিশাল বড় দোকানটাতে। তাকে নিয়ে তো মা বাবা জেরবার! একবার এদিকে ছোটে তো একবার ওদিকে লাফায়। দোকানের গড়গড়ানো সিঁড়ি দিয়ে দশবার ওঠে আর নামে। দৌড়োদৌড়ি করতে করতেই খোকনটা এসে থামল দোকানের ভেতর সেই সবথেকে বেশি আলো ঝলমলে কোণটায়। থমকে দাঁড়ায় খোকনটা একটুখানি। তারপর হামাগুড়ি দিয়ে কী যেন খোঁজে পুতুলের তাকের ঠিক তলাটায়। তারপর হাতে করে টেনে বার করে আনে সেটা। ও মা! এতো মিলি! খোকনটা মিলির লালফিতেওয়ালা সোনালী বিনুনিটা দেখতে পেয়েছিল বুঝি তাকের তলায় বেরিয়ে থাকতে।
মিলিকে হাতে নিয়েই ছটপটে খোকনটা যেন একটু চুপচাপটি হয়ে গেল। আহারে পুতুলটাকে কেউ দেখেনি! ওমনি করে তাকের তলায় মুড়েশুড়ে পড়েছিল। দ্যাখো দিকি জামাটাও কেমন নোংরা হয়ে গেছে। আর অন্য বিনুনিটার লাল ফিতেটাও গেছে হারিয়ে। ইসস ওর যদি একটা এমন পুচকুলি বোন থাকত তাহলে কিছুতেই কি তাকে এমন দুঃখটা পেতে দিত? চেয়ে দেখো দিকি একবার পুতুলটার নীল চোখদুটোয়। কত গভীর, কত মায়া মমতায় ভরা। ঠিক খোকনের মায়েরই মত। মায়ের চোখদুটো শুধু কালো, এই যা তফাৎ!
খোকনের চোখে জল টলটল করে। ধুলোমাখা পুতুলটাকে বুকে জড়িয়ে ছোটে মা বাবার দিকে। মা তখন দোকানদার কাকুকে দাম মেটানোর লাইনটায় পয়সা নিয়ে দাঁড়িয়ে আর বাবা পাশেই দুই হাতে বড় বড় দুইখান ব্যাগ ধরে হাঁসফাঁস করছে। খোকন শিগগির সেখানে গিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,
-“আমাকে এই পুতুলটা কিনে দেবে?”
মা সেই ধুলোমাখা ছেঁড়াখোঁড়া পুতুলটা দেখে চমকে বলে ওঠে,
-“এটা কোথায় পেলি? এ তো পুরনো পুতুল। দেখছিস না কেমন যেন ভাঙাচোরা হয়ে গেছে! তুই বরং অন্য কোনও পুতুল নয়তো ব্যাটবল বা ওই খেলনা গাড়িগুলোর একটা নিয়ে আয় সোনা, আমরা কিনে দেব।”
খোকন চোখ ছলছলিয়ে বলে,
-“না মা! আমার অন্য কোনও খেলনা চাই না! এই পুতুলটাই চাই।”
মা একটু রাগ করে বলে,
-“দোকানে এরকম বায়না করতে নেই!”
দোকানদার কাকু যে সামনে টেবিলটার ওইপারে বসেছিল সেও বলে,
-“এই পুতুলটা মনে হয় ভুল করে তাকে রয়ে গেছে। এটা তো বেচবার মত হালতে নেই। খোকাবাবু তুমি বরং অন্য কোনও খেলনা বেছে নাও।”
এদিকে মিলির ভয়ে যেন দমটা আটকে আসছে। এতদিন তাকের আঁধারে থেকে থেকে ওর মনের সব আশাই হারিয়ে গিয়েছিল যে কোনওদিন কোনও সত্যিকারের খোকাখুকুর খেলনার ঘরে ওর জায়গা হবে। আজ যখন এই খোকনটা ওর জামার ধুলোগুলো ঝেড়ে দিয়ে ওর জটপাকানো চুলগুলো ছাড়িয়ে দিল তখন মিলির যেন মনে হল এমনটা সত্যিই যদি হয়! খোকনটার কালো চোখদুটো কেমন ভালোবাসায় ভরা। এই খোকনটার বাড়িতেই মিলির জায়গা হবে তাহলে?
এখন যদি খোকনের মা আর দোকানের লোকটার জন্য মিলির আর যাওয়া না হয় খোকনের বাড়ি! ইসস এখন যদি মিলি চোখদুটো বুজে ফেলতে পারত!
দুরুদুরু বুকে মিলি ভাবতে থাকে এই বুঝি ওকে আবার ওই আঁধার তাকটার তলায় ফেলে এল কেউ!
এমন সময় কে যেন একটা মিলির হাতটা ধরে নেয়। খোকনের মত কচি হাত নয়, বড়দের হাত।
এ তো খোকনের বাবা! হাতের ভারি ব্যাগটা নামিয়ে খোকনের হাত থেকে মিলিকে নিজের হাতে নিয়েছে খোকনের বাবা। মিলির সব আশাই বোধ হয় শেষ।
মিলির নীল চোখদুটো খোলা থাকলেও চারিদিকে যেন আঁধার ঝেঁপে আসে বুঝি। এমন সময় কানে আসে খোকনের বাবার গলা,
-“দাদা আপনি পুতুলটার যা দাম সেই দামেই এটা প্যাক করে দিন। আমরা নেব পুতুলটা।”
মিলির নিজের কানকে ভরসা হয় না। কী শুনছে ও? ঠিক শুনছে কি?
ঘোর কাটতে কাটতেই মিলি দেখে খোকনের কোলে চেপে যেন কোথায় চলেছে। খোকনের মা খোকনের পাশে বসে হেসে বলছে,
-“তোরা বাপ ব্যাটায় পারিসও বটে! দোকানের লোকটাও ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে।”
খোকনের বাবা সামনে বসে হো হো করে হাসে আর বলে,
-“দ্যাখোই না। কেমন তেল দিয়ে খোকনের পুতুলের সব হাত পা সারিয়ে দেব। আর বেশটি করে সাবান দিলে ওই সোনালী চুল আর নীল জামাটা কেমন নতুনের মত ঝকঝক করবে দেখবে।”
খোকনের মা বলে,
-“থাক, ওই পুরনো জামাটা আর পরাতে হবে না! আমি বরং সেলাইয়ের মেশিনটা একবার চালিয়ে দেখি। একটা পুতুলের জামা কি আর বানাতে পারব না?”
খোকন কোলে বসা মিলিকে আলতো করে শুইয়ে দিয়ে বলে,
-“এখনও অনেকটা পথ বাড়ি যেতে বুঝলি? তুই একটু ঘুমো। আমি বরং একটা নাম ভাবি তোর, কেমন?”
খোকন জানল কী করে? সত্যিই তো মিলির খুব ঘুম পেয়েছে। একটু ঘুমিয়েই নেওয়া যাক বরং, মনের ওপর দিয়ে যা ধকল গেল। ঘুম থেকে উঠে খোকনকে নিজের নামটা বলে দিতে হবে, আর খোকনের নামটাও শুধিয়ে নিতে হবে। ভাবতে ভাবতেই রাজ্যের ঘুম নেমে আসে মিলির চোখে, এতদিন খুলে থাকা নীল চোখদুটো আপনা আপনিই বুজে আসে।
(সমাপ্ত)
🔹🔹🔹🔹
এই গপ্পোটার শেষে ক’টা কথা না বললেই নয়। ক্যাপ্টেন নিমোর একটা খুব প্রিয় গল্পের বই হল কোর্দুরয়। একটা ছোট্ট টেডি বেয়ারের গল্প। গল্পটা আমারও খুব মন টানে। সেই থেকেই গল্পটা লেখার ইচ্ছে হল। শুধু তাই নয়, ঠিক এই গল্পের মিলি পুতুলটার মত দেখতে একটা পুতুল ছোটোবেলায় বাবা কিনে দিয়েছিল। আমি তখন টু/থ্রি-তে পড়ি, একবার আমাদের বাড়িতে চুরি হল। চোর এটা ওটা সেটার সঙ্গে নিয়ে গেল আমার পুতুলটিকে। কী ভেবেছিল কিজানি। পুতুলের পেটে কী সোনাদানা পাবে ভেবেছিল কী জানি। যাই হোক জিনিস নিয়ে পালাবার পথে বাড়ির পেছনের মাঠে বেশ কিছু জিনিস আবার ফেলে দিয়ে গিয়েছিল। তার মধ্যে আমার পুতুলখানিও ছিল কিন্তু একটা পা ভাঙা অবস্থায়। হয়ত ওটা ভেঙে ভেতরে কিছু আছে নাকি চেক করেছিল। মা বহুকষ্টে ওটা আবার জুড়ে দিয়েছিল কিন্তু আগের মত আর ওটা ঘোরানো বাঁকানো যেত না। অনেক বড় বেলা অব্দি পুতুলটা আমাদের সঙ্গে সঙ্গে হেথাহোথা ঘুরেছে। মিলির এই গল্প তাই কোর্দুরয়, রাশিয়ান রূপকথার পুতুলের মত আমার সেই পুতুলটা আর যেখানে যত পুতুল আছে খোকাখুকুদের বাক্সে, তাদের জন্য।
🔹🔹🔹🔹
ছবি: আমি। ইন্টারনেটে এই ধরনের আঁকাগুলো খুব ভালো লাগছিল। তাই দেখে দেখে একটা চেষ্টা করলুম।
🔹🔹🔹🔹
এবার ছোটোদের টাস্কের পালা। কাজটা এটাই যে তোমরা সক্কলে তোমাদের সবচেয়ে প্রিয় খেলনার ছবি, আর কেন খেলনাটি তোমাদের প্রিয় সেই গপ্পো আমায় কমেন্টবক্সে জানিও কেমন?

No comments:

Post a Comment