Oishik and Tinkerbell

 








Oishik and Tinkerbell

(রেখায় মা, রঙে আর গপ্পে ছা, ফোড়ন কাটায় ফের মা)
Once upon a time there was a little boy named Oishik. Oishik had friends like Sid, Kush, Arin, Gwen, Naomi, Nicolas, Eshan, Srithik, Clark, Elijah, Aizah, Lincon, Michaela, Elizabeth, AJ, Emma.
( মোট্টে এই ক’জনা বন্ধু!)
Oishik’s friends saw a dot.
What is that dot? It glows!
Oishik said,
[gasp] A fairy!
What is her name?
Ummm... Tinkerbell.
[gasp] It’s green. Yes it is Tinkerbell.
(চুপিচুপি বলি এই ব্র্যাকেটে গাস্প-টিকে আমি উচ্চারণ করে পড়ে ফেলেছিলুম বলে তিনি শেখালেন ওটা পড়ে নয় অ্যাক্টো করে দেখাতে হয়!)
Oishik was very clever and smart than any of his friends. But he loves non fiction and a little bit of fiction.
‘Hello’ said Tinkerbell.
Oishik saw Laverna.
Help!
(লাভার্না-কে না চিনতে পারলে কোনও দোষ নেই, উনি একটি কার্টুন বার্বি মুভির খলনায়িকা এবং ক্যাপ্টেন নিমোর বেশিরভাগ গল্পের পার্মানেন্ট ভিলেইন।)
Oishik went to his locater. He took all his powers.
(লোকেটর কোন শক্তিপুঞ্জের ঠিকানা আমি জানিনে। ক্যাপ্টেন নিমোর সব শক্তি ওইখেন থেকেই আসে। লোকেটরকে লোকেট করতে পারলে আমার বড় সুবিধে হত। বেশ মোবাইল চার্জ দেওয়ার মত একটু এনার্জি সঞ্চয় করে নিতুম।)
‘Clank smash crunch wham boom bam smack bang wham tabanga crushinga boom!’
and Laverna promised she will never come again.
(বন্ধুরা এখানে ভয়ানক যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি একটু নজর করবেন। এমন লড়াইয়ের পর বেচারা লাভার্নার লক্ষ্মীমেয়ে না হয়ে আর উপায় আছে!)
The End.

ভূতের নাম

 ভূতের নাম

সুস্মিতা কুণ্ডু

মস্ত আতান্তরে পড়েছে ভূতেদের সর্দার মামদো ঘটাংঘট আর তার পেত্নী বৌ খটখটি। মাথা চুলকে চুলকে খুলিতে গর্ত হয়ে যাওয়ার জোগাড়। শেষমেষ ওই মানুষদের থেকে ধার নিতে হবে?
ছ্যা ছ্যা! তাহলে যে ভূতসমাজে আর মুখ দেখানোর জো থাকবেনা। তোমরা নিশ্চয়ই ভাবছ ভূতেদের আবার বিপদ কী? তারাই তো মানুষদের নাস্তানাবুদ করে বিপদে ফেলতে ওস্তাদ। আর ভূতেরা মানুষের থেকে ধারই বা কী নেবে? আরে ভূতেদের কি টাকাপয়সা লাগে যে মানুষের মহাজনের থেকে চড়া সুদে ধার নিতে ছুটবে? রোসো! ব্যাপারটা একটু খুলেই বলি তাহলে।
ঘটাংঘট আর খটখটির তিনটি ছেলে। হাঁউ, মাঁউ আর খাঁউ। নামগুলো শুনে মজা লাগছে তো? ভুরভুরিয়ে হাসি বেরিয়ে আসছে তো? কিন্তু ওই নামের বাহার করতে গিয়েই তো বিপদে পড়েছে ঘটাংঘট আর খটখটি। হাঁউ মাঁউ খাঁউ তো মানুষদের ভয় দেখিয়ে উৎপাত করে, জন্তুজানোয়ারদের লেজ টেনে সব্বাইকে তিতিবিরক্ত করে বাবা মায়ের মুখ গর্বে উজ্জ্বল থুক্কুড়ি কালো করতে থাকে। এদিকে খটখটির মনে মনে বড় একটা মেয়ের শখ। নিজের হাতে পাঁক আর পোড়া হাঁড়ির কালি দিয়ে রূপটান লাগাবে মেয়েকে। মাকড়সার জাল দিয়ে চুল বেঁধে দেবে। গুগলি শামুকের চচ্চড়ি রাঁধতে শেখাবে মেয়েকে। আরও কত্ত কী করবে! ছেলে তিনটে তো দু’দণ্ড মায়ের কাছে বসেই না।
তা মানুষ হাজার ডেকে ভগবানের সাড়া না পেলেও ভূতেরা চট করে তাদের আরাধ্য দেবতা মানে অপদেবতা শয়তানের সাড়া পেয়ে যায়। খটখটির মনের সাধ পূর্ণ করে এক ছোট্ট দুষ্টু পেত্নীছানা এলো তার কোলে। ঘটাংঘট বললেন মেয়ের নাম তার দাদাদের নামের সাথে মিলিয়ে হোক ‘পাঁউ’। না মানে একটা ফুটফুটে ঘুটঘুটে ভূতের ছানার নাম তো আর ‘মানুষের গন্ধ পাঁউ’ রাখা যায় না, তাই শুধু ‘পাঁউ’। চার ভাইবোন বেশ একসাথে ভয় দেখাতে যাবে,
‘হাঁউ মাঁউ খাঁউ
মানুষের গন্ধ পাঁউ!’
কিন্তু বাদ সাধল খটখটি। খটখটি আসলে বেশ যাকে বলে ওই মডার্ণ পেত্নী। ভূতেদের ওই নেত্যকালী, আন্নাকালী, ক্ষ্যান্তমণি এইসব ধরনের নাম খটখটির পছন্দ নয়। নাম হতে হবে এমন যে ভূত ভূত ছোঁয়াও থাকবে আবার বেশ ইয়ে মানে আধুনিকও হবে। নাম শুনলেই যেন মানুষরা ভয়ে একেবারে ভির্মি খায় এমনধারা নাম হতে হবে। তবে না ভূত সমাজের মোড়ল বংশের মান থাকবে!
খটখটির নিজের নামের বেলায় তো আর কোনও হাত ছিল না! বাপ মা যা নাম রেখেছে তাই মেনে নিতে হয়েছে। কিন্তু নিজের মেয়ের বেলায় কারোর কথা শুনবেনা খটখটি! এমনকি স্বামী ঘটাংঘটের কথাও না। ছেলেদের বেলায় ঘটাংঘট খটখটির কথা শোনেনি এখন ও-ই বা পাত্তা দেবে কেন শুনি?
কিন্তু আধুনিক নাম দেব বললেই তো আর এত সহজে দেওয়া যায়না! ভূতেরা চিরকাল ওই ঘটাংঘট খটাংখট মার্কা নাম দিয়েই অভ্যস্ত। অনেক ভেবে ভেবে শেষে খটখটি গেল ব্রক্ষ্মদত্যি পণ্ডিতমশাইয়ের কাছে। পণ্ডিতমশায়ের অনেক জ্ঞান, নিশ্চয়ই একটা উপায় বাতলাতে পারবেন। খটখটির মনের সাধ শুনে ব্রক্ষ্মদত্যিমশাই খড়ম খটখটিয়ে, টিকি নাড়িয়ে, বললেন,
-“হুমম! মানুষরাও আজকাল অনেক অদ্ভুত কিম্ভুত নাম রাখে বটে। ওই যে কী বলে ডিসপ্যাঁচ নাকি ডিসকোরানি... গাবদাগোবদা মোটাসোটা বই হয়। মানুষরা শুনি তো ওই থেকেই খুঁজে খুঁজে ছেলেপিলের নাম রাখে। তোমরাও তাই করোগে বরং।”
খটখটি তো এই শুনে নাচতে নাচতে মহানন্দে বাড়ি এল। তারপর ঘটাংঘটকে বলল,
-“মানুষদের বাড়িতে বাড়িতে তোমার ভূতপিশাচ অনুচরদের পাঠাও। আমার ওই ডিসকোরানি চাই চাই চাই।”
খটখটির কথা অমান্যি করে এমন সাধ্যি ভূতসর্দার ঘটাংঘটেরও নেই। অগত্যা দিকে দিকে ভূত গেল। রাতের অন্ধকারে মানুষেরা যখন সবাই নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে তখন আলমারি থেকে, টেবিল থেকে, সবচেয়ে মোটা বইগুলো জানালা দিয়ে লম্বা লম্বা আঁকশি গলিয়ে, বস্তায় ভরে, তুলে আনতে লাগল ভূতের দল। এক রাতের ভেতরেই ঘটাংঘট আর খটখটির ঘর বইয়ে ভর্তি হয়ে গেল। খটখটি তো ভীষণ উত্তেজিত, মেয়ের একটা দারুণ নাম হবে বলে কথা! এদিকে উত্তেজনার বশে এটাই ভুলে গেছে সকলে যে ভূতেরা মানুষের লেখা পড়তে পারে না! কী কেলেঙ্কারী কাণ্ড! এই এত ডিসপ্যাঁচ জোগাড় করা তাহলে বৃথা? খটখটি তো মেয়ে কোলে ডাক ছেড়ে কাঁদতে শুরু করল। ঘটাংঘট আবার বউয়ের দুঃখ সইতে পারে না। ফের শরণাপন্ন হল মুশকিল আসান ব্রক্ষ্মদত্যির।
ব্রক্ষ্মদত্যি বললেন,
-“দ্যাকো বাপু, যখন পুরুতগিরি করতুম সব ওই মুখস্থ মন্ত্র পড়তুম। সংস্কৃত বাংলা কোনওটাই ছাই আমি না পড়তে পারতুম না লিখতে পারতুম! আর জীবদ্দশাতেই পড়াশোনা হল না তার এই প্রেতদশায় কি আর মানুষদের পুঁথি পড়তে পারি? ঘটাংঘট বাছা তুমি বরং এক কাজ কর। এত খেটে যখন মানুষদের বই জোগাড় করলেই তখল একটা গোটা মানুষকেই নাহয় ধরে আনো। সেই পড়ে পড়ে বলে দেবে’খন।”
ঘটাংঘট আর খটখটি বেশ পছন্দ হল বুদ্ধিটা। তিন ভাই হাঁউ-মাঁউ-খাঁউ গিয়ে ওমনি ফের হানা দিল মানুষদের পাড়ায়।
মানুষদের পাঠশালার মাষ্টারমশাই দীননাথ পোদ্দার মনের সুখে ছাত্র পিটিয়ে, পান্তা, আলুচচ্চড়ি আর মৌরলা মাছের টক দিয়ে ডিনার সেরে দিব্যি নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছিলেন। হঠাৎই ঘুমের মধ্যে অনুভব করলেন খাটশুদ্ধু হুশ্হুশ্ করে উড়ে চলেছেন। প্রথমে ভাবলেন পান্তা ভাত আর মাছের টক খেয়ে গ্যাস অম্বল হয়েছে বুঝি কিন্তু চোখ খুলতেই ভুল ভাঙল। মাথার ওপর টিনের চালের বদলে কালো আকাশ আর নীচে সারি সারি তালগাছের মাথা। দীননাথ পোদ্দারকে হাঁউ-মাঁউ-খাঁউ সোজা উড়িয়ে নিয়ে এল ভূতেদের আড্ডায়। দীননাথ ওড়া থামতে চোখ খুলে দেখেন তাঁকে ঘিরে গাদাগাদা ভূত আর মোটামোটা বই, ঠিক যেন ভূতেদের সাহিত্যসভা হচ্ছে আর তিনি যেন মধ্যমণি সভাপতি।
একটা বিকটদর্শন ভূত এসে দীননাথকে বলল,
-“এইয়ো মানুষ! আমি ভূতেদের সর্দার ঘটাংঘট। তোমাদের ওই মোটামোটা ডিসকোরানি পড়ে শিগগির আমার মেয়ের জন্য একটা নাম ঠিক করে দাও তো। নামটা ভৌতিকও হতে হবে আবার আধুনিকও হতে হবে। যদি তোমার দেওয়া নাম আমার গিন্নি খটখটির পছন্দ না হয় তাহলে ঘটাং করে তোমার ঘাড়টা মটকে দেব। আমার নাম এমনি এমনি ঘটাংঘট হয়নি, বুঝলে?”
সর্দার ঘটাংঘটের কথা শুনে আর তার পেত্নিগিন্নি খটখটিকে দেখে দীননাথ পণ্ডিতের সত্যিই ভয়ে দাঁতে দাঁত লেগে খটাখট আওয়াজ উঠতে লাগল। আর বাক্যব্যয় না করে সামনে থেকে একটা মোটা ডিক্সনারি টেনে নিয়ে নাম খুঁজতে শুরু করলেন। দীননাথ ভীতু হলেও মূর্খ নন। বিপদের সময় মাথা ঠাণ্ডা রাখতে জানেন।
এক এক করে যা চোখে পড়ছে বলতে থাকলেন। তাড়কা, শূর্পনখা, হিড়িম্বা... এমনকি কদলীবালা... সবরকমই চেষ্টা করলেন। কিন্তু ঘটাংঘট আর খটখটির কোনও নামই পছন্দ হয়না। বারবার বলে ‘এই বইটা নয়, ওই বইটায় দ্যাখো’। কিন্তু ওদের কে বোঝাবে যে সব ডিক্সনারিই সমান। শেষমেষ এ বই সে বই করতে করতে দীননাথ মাষ্টারের হাতে উঠে এল এক পিস কৃত্তিবাসী রামায়ণ। কোনও ব্যাটা মূর্খ ভূত বইয়ের মোটাসোটা চেহারা দেখে ডিক্সনারি ভেবে ভুল করে আঁকশি দিয়ে রামায়ণ টেনে এনে ভরেছে বস্তায়। এই সুযোগ দীননাথ পোদ্দারের। দীননাথ উচ্চৈঃস্বরে সুর করে রামায়ণ পড়তে শুরু করলেন। প্রথমটায় ভূতেরা বুঝতে না পারলেও খানিকবাদে রামায়ণ শুনে সবার বোঁ বোঁ করে মাথা ঘুরতে লাগল। ভির্মি খেয়ে পড়তে লাগল একে একে।
-“এই এই এ কী পড়ছ?”
বলে খটখটি যেই না দীননাথের হাত থেকে বইটা টেনে কাড়তে গেছে ওমনি কারেন্টের শক লাগার মত ছিটকে পড়ল দশ হাত দূরে। খটখটিকে পড়ে যেতে দেখে ঘটাংঘট যেই না বইটা ধরতে এল ওরও একই দশা হল। বাবা মার এই অবস্থা দেখে হাঁউ মাঁউ খাঁউ তিন ভাই এগিয়ে এল। বলাই বাহুল্য যে তাদেরও একই গতি হল। সব কঙ্কাল হাড়গোড়ে যেন ভূমিকম্পের মত ঝাঁকুনি লাগল। ঘটাংঘট মাটিতে পড়ে কাতরাতে কাতরাতে চেঁচাতে লাগল,
-“ওরে কে কোথায় আছিস এই অলুক্ষুনে বইসহ এই বজ্জাত মানুষটাকে শিগগির ফেরৎ দিয়ে আয়। নইলে আমাদের ভূতবংশ নির্বংশ করে ছাড়বে।”
খাটের ওপর রামায়ণ হাতে বসা অবস্থাতেই দীননাথ পোদ্দারকে ফের হুশহুশিয়ে উড়িয়ে ভূতের দল তার বাড়িতে রেখে এল। দীননাথ হাতের রামায়ণটাকে সশ্রদ্ধায় মাথায় ঠেকিয়ে, ঠাকুরের আসনের সামনে রেখে এলেন। এ যাত্রায় এই বইটাই প্রাণ বাঁচাল।
ওদিকে ঘটাংঘট একটু ধাতস্থ হয়ে উঠে গিন্নি খটখটিকে বললে,
-“মেয়ের নাম ওই পাঁউ-ই থাকবে! ফের যদি আধুনিক নামের বায়না করেছো...”
(সমাপ্ত)

Oishik Goes To Spaceland

 












The cow and the soup

 





অনেকদিন ক্যাপ্টেন নিমোর গল্প পোষ্ট করা হয়নি। অনেকগুলো গল্প জমে আছে। আজ একটা গজব গরুর গল্প শোনাই। গল্পের গরু গাছে ওঠে তো শুনেছ সবাই কিন্তু গরু পাহাড়েও চড়ে সেটা জান কি? শুধু তাই নয়, ঠাণ্ডা লাগলে সে গরু কী করে বলো তো?

The cow and the soup
———————————
Once upon a time there was a cow.
His name was Cowy.
He saw a mountain.
He was hiking on it.
ACHOO ACHHO!
He was feeling sick.
His Dad gave him chicken soup.
Until it was empty he felt better.
The End.
সঙ্গের ছবিটি রঙ করেছেন তিনি, রেখা টেনেছি আমি।

ভুটু আর টুটু

 


ভুটু আর টুটু

সুস্মিতা কুণ্ডু
তোমরা ভুটুকে চেনো না, আর টুটুকে তো চেনোই না। এ আমি হলফ করেই বলতে পারি। হ্যাঁ মানছি তোমরা জানো যে টুটু একটা হলদে পাখির ছানা আর ভুটু একটা গাবলুগুবলু ভেড়ার ছানা। তবে শুধু সেটুকু জানলে তো আর চিনবে না ওদের, তাই না? অবিশ্যি এতে তোমাদের একটুকুনও দোষ নেই। কাউকে চিনতে গেলে, জানতে গেলে, আগে তো তার সাথে খানিকটা মিশতে হয়, খেলতে হয়, মিলতে হয়, জুলতে হয়! আর মিলিজুলি করতে হলে তাদের বাড়ি যেতে হয়, নয় তো নিজের বাড়িতে ডাকতে হয় চানাচুর দিয়ে মুড়ি খেতে। মুশকিলটা তো ওখানেই! ভুটু-টুটুকে নাগালে পেলে তবেই না বাড়িতে ডাকবে। তবেই না কদবেলমাখা, কুলের চাটনি, আমের আচার জমিয়ে খাওয়া হবে। লুকোচুরি ধরাধরি খেলা হবে!
টুটু সারা দিনমান নীল আকাশের বুকে ফড়ফড়িয়ে ঘুরে বেড়ায়। তাকে একবার হাত নেড়ে ডাকতে গেলেই বলে,
-“আমার সময় নেইকো! পরে আসবো’খন।”
ব্যাস! এই না বলেই ডানা মেলে ফুড়ুৎ!
আর ভুটু? সে তো সকাল থেকে সাঁঝ সবজে ঘাসে বসে ঢুল ঢুল ঢুল ঘুম লাগায়। ডাকো দিকিনি একবার, কোনওমতে পিটপিট করে চোখটি খুলে বলবে,
-“কাল যাবো, আজ ঘুমোই?”
তারপরেই টপ করে আবার নাকটি ডাকতে শুরু করবে ‘ঘাঁআআ ফুশশশ, ঘাঁআআ ফুশশশ’ আওয়াজ তুলে।
এবার তোমরাই বলো দেখি এমন করলে ভাব হয়?
এমনি করে দিন যায় মাস যায় বছর যায়। টুটু ভুটু নিজেদের নিয়েই মেতে থাকে। কারোর সাথে তাদের খেলার সময় নেই। খেলুড়েরাও তাই আর টুটু ভুটুকে ডাকাডাকি করেনা। মিছে শোরগোল করে হবেটাই বা কী!
তবে হঠাৎই একদিন এমন একটা ঘটনা ঘটল যে টুটু ভুটু পড়ল বেজায় মুশকিলে। বিশেষ করে টুটু। টুটু কিনা ভারি ছটপটে। এক পলও সে এক জায়গায় চুপটি করে বসতে পারে না, শুধুই উড়ে বেড়ায়। এই গাছে ওই গাছে। এই ডালে ওই ডালে। এই বাগে সেই বাগে। এই করে করে টুটুর দিনরাতের ঘুমখানি একেবারেই জলে গিয়েছিল। ভোরে সূয্যিমামা ওঠার আগেই টুটু গাছের টঙের বাসাটি ছেড়ে সেই যে উড়তে বেরিয়ে যেত, ফিরত আঁধার নামলে।
এমনই উড়তে উড়তে সেদিন একটা ঝোড়ো বাতাস এত জোরে বইল যে টুটু ছিটকে গিয়ে পড়ল একটা ঝোপের ওপর। খুব বেশি চোট না লাগলেও টুটুর একটা ডানা বেশ জখম হল। কোনওমতে তো লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ি ফিরল টুটু। তবে উড়তে আর পারে না। বদ্যিমশাই বললেন কটা দিন উড়ে বেড়ানো ছেড়ে মাটিতেই হাঁটতে হবে টুটুকে। দিলেন পাঁচন খেতে। টুটুর তো মাথায় যেন আকাশটাই হুড়মুড়িয়ে ধসে পড়ল! এ কী ভয়ানক কথা। না উড়ে টুটু থাকবে কী করে!
টুটু তখন ছুটল ভুটুর কাছে। ছুটল মানে সত্যি সত্যিই ছুটল। ওড়া তো বারণ। ভুটুর কাছে পৌঁছে টুটু করুণ গলায় বলে উঠল,
-“অ ভুটু! বদ্যিমশাই যে মাটিতে হাঁটাহাঁটি করতে বলেছে! আমার এবার কী হবে?”
ভুটু আধেক শুনে আধেক না শুনে ঘুমজড়ানো গলায় বলে,
-“তা মাটি ঘাঁটাঘাঁটি করলে পালকগুনো একটু নোংরা হবে আর কী! বেশটি করে নেয়ে নিবি নাহয় তারপর।”
টুটু ফের বলে,
-“অ্যাঁ বলি নাইতে যাব কেন খামোকা! বলছি বদ্যিমশাই বিধেন দিলেন যে আমার ডানা মেলে ওড়া মানা! সেটার কী হবে?”
ভুটু বিশাল বড় কুমিরের হাঁ-এর মত হাই তুলে বলল,
-“ছানা খেলে যদি ওড়া মানা হয় তবে ক’দিন খাসনি বরং। তুই তো আবার উড়তে না পেলে হাঁপিয়ে ঝাঁপিয়ে একশা করবি।
এইবারে টুটু খচেমচে একশা হয়ে চেঁচাল,
-“এইয়ো ঘুমকাতুরে ভুটকো! বলি চোখের সাথে কানটাও বুজে ফেলেচিস ওই ঝামরিঝুমরি লোমে? বলছি ডানা মেলে ওড়া মানা আর উনি শুনছেন ছানা খেলে ওড়া মানা। হাঁটাহাঁটি আর ঘাঁটাঘাঁটিতে তফাৎটা কানে গেল না বুঝি?”
টুটুর সরু কিঁচকিঁচে গলায় কানে ছুঁচফোটানো চিৎকারের চোটে ভুটু আধবোজা চোখজোড়া এবার পুরোপুরিই খুলতে বাধ্য হল।
একটু মেজাজ করেই জবাব দিল,
-“কী হয়েছেটা কী সেটা বলবি তো! সেই থেকে একবার মশার মত পোঁ পোঁ করছে নয়তো সানাইয়ের মত প্যাঁ প্যাঁ করছে।”
ভুটু এমনিতে একদম ভালোমানুষ তবে ওই ওর ফুলকোফুলকো লোম নিয়ে কেউ কিছু বললে একটু আঁতে ঘা লেগে যায়।
শখের মধ্যে ভুটুর ওই দুটি-ই। ঘুমনো আর একটু ঝামরি ঝুমরি মেঘের মত নরম সাদা লোমগুলোর খেয়াল রাখা। খেজুরপাতার চিরুনি দিয়ে একটু আঁচড়ানো, একটু কাঁঠালিচাঁপা ফুলের সুবাস ছড়ানো। আর টুটু কিনা সেই আদরের জিনিসটাকেই অমনটি করে বললে। কার না রাগ হয় বলো দেখি!
টুটুও সেটা বুঝতে পেরে একটু সুর নরম করল। টুটুর কপালে যে সমস্যা জুটেছে তার জন্য তো আর ভুটু দায়ী নয়। তাই একটু করে পুরো ঘটনাটাই খুলে বলল টুটু। কেমন করে ডানায় চোট পেল আর বদ্যিমশাই-ই বা কী বললেন, সঅঅব কিছু।
ভুটু সব শুনেটুনে বুঝলে যে কেন টুটু এত উতলা হয়েছিল। বেচারি সারাদিন শুধু উড়তে ভালোবাসে আর তাকেই যদি হেঁটে চলে বেড়াতে হয় তাহলে মন তো খারাপ হবেই। ভুটু কী আর রাগ করে থাকতে পারে টুটুর ওপর!
ভুটু তখন বললে,
-“শোন টুটু একটা উপায় বলি। তুই বরং আমার মাথার ওপর চেপে বোস। তারপর বল কোথায় কোথায় যেতে চাস। আমি তোকে নাহয় একটু বেড়িয়ে আনব’খন হেথাহোথা। এ আর এমন কী কঠিণ কাজ!”
টুটুরও মনে হল মতলবটা খারাপ নয়। নেই মামার চেয়ে কানা মামাই ভালো। নিজে না উড়ে যেতে পারলেও ঘাড়ে চেপে বেড়ানোই সই।
তারপর বেশ ক’দিন টুটুকে মাথায় চাপিয়ে ভুটু ঘুরে বেড়াতে লাগল। তবে শুরুতে ব্যাপারটা যতটা সহজ মনে হয়েছিল ভুটুর, ক’দিন পর আর ততটা সহজ মোটেও লাগল না। টুটু একটু সময়ের জন্যও বসতে দেয় না। একবার বলে ‘এদিকে চলো’ তো একবার বলে ‘ওদিকে চলো’। একবার গাছের তলায় দৌড় করায় ভুটুকে তো একবার নদীর পাড়ে ছোটায়। ভুটু বেচারা একটু আলতুসি আরামে থাকতেই ভালোবাসে। তার কী আর এত দৌড়ঝাঁপ সয়! এদিকে টুটুকে না বলতেও বাধো বাধো ঠেকছে। যদি ভেবে বসে ভুটুটা একেবারেই কুঁড়ে আর আলসে। ক’দিন এইটুকু উপকার করতেও পেরে উঠছে না। ভুটুর তাহলে আর মানটা থাকে কী করে!
অনেক ভেবে ভুটু শেষমেষ একটা মতলব আঁটল। টুটুর যেমন ডানায় চোট লেগেছে, ভুটুরও যদি আচমকা পা মচকে যায় তাহলে তো আর হেঁটে বেড়াতে হয় না!
যেমনি ভাবা তেমনি কাজ। সেদিন টুটুকে মাথায় নিয়ে মাঠে ছুটতে ছুটতে হুট করেই মিছিমিছি হোঁচট লাগার ভাণ করে হুমড়ি খেয়ে পড়ল ভুটু। পড়েই চিৎকার জুড়ল,
-“আহা রে! উহু রে! টুটু রে! গেলুম রে! আমার পা-টা গেল রে! আর মনে হয় সারাজীবন হাঁটা হল না আমার। তোকেই বা কী করে মাথায় চাপিয়ে বেড়াতে পারব আর!”
এদিকে আচমকা যেই না ভুটু পড়ে গেছে মাটিতে টুটুও আরেকটু হলে পড়ার জোগাড় হয়েছিল ভুটুর মাথার ওপরটি থেকে। নেহাতই ঝটপটিয়ে ডানা মেলে উড়ে সামলে নিয়েছিল তাই!
এ কী এ কী! টুটু যে আবার উড়তে পারছে! কই ডানায় তো ব্যথা লাগছে না! বেশ কয়েকবার ডানা ঝাপটে ওপর নিচে ডাইনে বাঁয়ে উড়ে নেয় টুটু! ডানা বিলকুল ঠিক!
একপাক ঘুরে নেচে নিয়ে গান ধরে টুটু,
-“ তাইরে নাইরে নাই রে
ওরে ভুটু ভাই রে
আর যে ব্যথা নাই রে
খুশিতে গান গাই রে!”
ভুটুও টুটুর ডানা ঠিক হয়ে গেছে দেখে বেজায় খুশি আর অবাক দুটোই। হাত পা মেলে বসে বসে টুটুর নাচ দেখে। নিজেরও যে একটু নাচতে সাধ হয়নি তা বলব না তবে ভুটু এখন চোট লাগার ভান করেছে কিনা। নাচতে গেলেই টুটু বুঝে যাবে যে ভুটু মিছে কথা কইছিল। ছি ছি! সে ভারি বাজে ব্যাপার হবে। টুটু হয়ত বা মনে আঘাত পাবে ভুটুর মিছে কথা বলে পিছু ছাড়ানোর এই মতলব জানলে।
নাচা গানা শেষ হলে ‘পরে টুটু খেয়াল করে ভুটু পা ছড়িয়ে বসে ড্যাবড্যাবিয়ে চেয়ে আছে। টুটু মনে মনে জিভ কাটে। নিজের ডানা ঠিক হয়ে গেছে বলে এত লাফালাফি ওড়াউড়ি করছিল ওদিকে ভুটু বেচারার যে পায়ে চোট লেগে গেছে সেটা বেমালুম ভুলেই বসেছে! না জানি বেচারা কত ব্যথা পেল। আলতো করে উড়ে এসে ভুটুর মাথায় বসে টুটু বলে,
-“ভুটু ভাই, মন খারাপ করিসনে। যতদিন না তোর পা ঠিক হবে ততদিন আমি তোকে ছেড়ে কোথাও নড়ব না। একবারটি শুধু বদ্যিমশাইয়ে তেঁতো পাঁচন দাওয়াইটা নিয়ে আসি দাঁড়া তোর জন্য। তারপর যতদিন না তোর পা-টা সারবে ততদিন রোজ তোকে গান শোনাবো, তারপর মিঠে জাম এনে দেব...”
টুটু আরও অনেক কিছু বলে চলে তবে সে সব ভুটুর কানে আসে না। তার যে দু’চোখে ঘুম জড়িয়ে এসেছে। না জানি আবার কতদিন টুটুর সেবার ঠ্যালায় সাধের ঘুমটিকে বিদায় জানাতে হবে। পরের বার কিছুতেই আর এমন মিছে নাটক করবে না ভুটু। তার চেয়ে সত্যি কথা বলে দিলে ঝকমারি অনেক কম। ভাবতে ভাবতেই কখন চোখ লেগে যায় ভুটুর, নাকে বাজনা বাজে,
“ঘাঁআআ ফুশশশ... ঘাঁআআ ফুশশশ...”
(শেষ)
ছবি: আমি ইন্টারনেট থেকে দেখে দেখে 😁

লালকমল, নীলকমল, রাক্ষুসী, ওগর, ডাইনোসর এবং নিমো



লালকমল, নীলকমল, রাক্ষুসী, ওগর, ডাইনোসর এবং নিমো
অথবা
এক সাংঘাতিক গপ্পো।
🔹🔹🔹🔹
গৌরচন্দ্রিকা: আমাদের বাড়িতে, ছোটোবেলায় একটা ভীষণ সুন্দর গানে গানে ভরা লালকমল নীলকমল, বুদ্ধু ভূতুমের গল্পের ক্যাসেট ছিল। রোজ একবার সেটা টেপ রেকর্ডারে শুনতামই! গানগুলো আজও মনে আছে, মাঝেমাঝে গুনগুনও করি। সেদিন ছানাকে সেইটেই শোনালুম আর বাংলা ইংরিজি মিশিয়ে গপ্পোটিও বোঝালুম। তারই ফল পেলুম আজ সকালে। অবশ্যই ছানার নিজের স্টাইলে। আমার টিকাটিপ্পনীসহ দিলুম ছানার হাতে লেখা সেই গপ্পো।
🔹🔹🔹🔹🔹
Lal komol and Neil komol
🔹🔹🔹🔹🔹
One day Lal komol and Neil colmol saw Nemo.
(বানানটা একটু নজর করবেন বন্ধুরা)
But then a green monster came in back.
Oishik warned out,
“Watch out!”
But they did’nt listen.
(উত্তেজনায় ‘ টি হেথাহোথা হয়েই যেতে পারে, ভাবনাটা বুঝুন বন্ধুরা। আর নিমোবাবু নিজে যেন কত কথা শোনেন!)
When they did not, they were eaten.
That will happen.
(লেখক এইখেনে নিজের মাকে কপি করছেন। ‘কথা না শুনলে এমনটাই হয়’ মন্ত্র যে মা সারাদিন জপ করেন সেইটেই তিনিও বেচারা লালকমল নীল কলমল-কে আঙুল তুলে বলেছেন।)
Oishik tried to smash the eggs.
CRACK! (এচ্চেয়ে বড় করে ডিমফাটানোর শব্দ লিখতে পারবুনি। নিচের ছবিতে দেখে নিও বাপু)
It like broke into a 100 pieces.
(হেথায় like এর ব্যবহার কিন্তু লাইক অর্থে হয় নাই। তিনি আজকাল কথা বলার সময় কেতদারি করে মাঝেমাঝে ‘লাইক’ বলে থাকেন।)
২ Ogres
(২ বলতে উনি চ্যাপ্টার ২ বোঝাতে চেয়েছেন। পণ্ডিতমানুষরা ঠিকই বুঝতে পারবেন কিন্তু লেখকের বাবার ভরসা হয়নি তাই চ্যাপ্টার লিখে দিয়েছেন। গল্পের ওপর এমনি করে কলম চালানোয় লেখক যারপরনাই রাগান্বিত হয়েছেন)
(ও হ্যাঁ, খোক্কস মানে Ogres বলা হয়েছে লেখককে)
The Ogres decided to have a fight with dinos.
(লালকমল নীলকমল নিমো ডাইনো খোক্কস... এখনও যদি মাথা না গুলিয়ে থাকে নিজ দায়িত্বে পরের পার্ট পড়ুন বন্ধুরা।)
Oishik chose Zuul to fight with the Ogres cause it has the strongest tail club to flatten the Ogres.
(আমারই মত যাঁরা অভিজ্ঞ paleontologist ছানার হতভাগ্য অভিভাবক তাদের জন্য Zuul নামক তৃণভোজী ডাইনো প্রজাতি সম্পর্কিত তথ্য কমেন্টবক্সে দিলুম।)
Thud!
It’s club flattened the ogres at once!
(জুল তো লেজ দিয়ে খোক্কসদের পিটিয়ে চিঁড়েচ্যাপ্টা করে দিল। এবার কী হল? এখনও সাহস থাকলে এগোন)
3 Rakushi (চ্যাপ্টার ৩ বুইতে পেরেচেন লিচ্চয়)
Rakushi also decided to fight. Oishik chose Giganotosaurus. (এই ভদ্রলোকের তথ্যর জন্য কমেন্টবক্স পিলিজ)
Rakushi was swelled. His legs can not move.
(উত্তেজনায় হিজ হার সব গুইলে গেছে)
Giganotosaurus cracked 2 leg-bones of Rakushi.
“Durbol aau!”
(রাক্ষুসী বেজায় ‘দুর্বল’ বাংলায় চেঁচাতে শুরু করেছে গো শেষমেষ)
also the hand.
(হাতও গেল। এমন সাংঘাতিক মারপিট আমি নিজেও কোনও গপ্পে লিখতে পারিনি বাপু। আমি সকলকে জেলে ভরেই ছেড়ে দিই)
Euoplocephalus slammed her head.
“Oh amar koshto hoiche”
(এবার আমার ‘কষ্ট হইচে’ বেচারি রাক্ষুসীর জন্য)
Therizinosaurus ripped Rakhusi but then Rakhusi was eaten.
(চার চারটে ডাইনোর সঙ্গে লড়াইয়ে কখনও এঁটে উঠতে পারে রাক্ষুসী! যেমন অজিত কুসুমকে খেইচিলি, এবার ঠ্যালা বোঝ! গপ্পো শ্যাষ!)
রাক্ষুসীখেকো ডাইনোদের ছবি কমেন্টবক্সে।


মিলির একদিন




মিলির একদিন

সুস্মিতা কুণ্ডু
একটা ছিল বিশাল বড় দোকান, শহরের ঠিক মাঝখানটিতে। কী নেই সেই দোকানে! জামা কাপড়, বাসনকোসন, ঘরসাজানোর জিনিস, খাবারদাবার, ফলমূল আনাজপাতি, মশলা থেকে শুরু করে বই খাতা পেন রঙ ছোটোদের খেলনা, সব সঅঅঅব পাওয়া যায় সেই দোকানে। গোটা শহরের খোকাখুকুরা আসত তাদের মা বাবার হাত ধরে সেই দোকানে নানানরকম জিনিস কিনতে। সে বাবামায়েরা অবশ্য গোটা দোকান ঘুরে ঘুরে সংসারের হাজারখানা জিনিস কিনলেও ছোটোদের মনটা পড়ে থাকত দোকানের একটা বিশেষ কোণায়। যেখানটায় আছে রাজ্যের খেলনা। রঙচঙে বল, খেলনা গাড়ি, আর পুতুল! তাক জোড়া এত এত পুতুল। কোনটা তুলোর মত তুলতুলে, কোনটা কাঠের মত ঠকঠকে। কোনটার কালো চুল, কোনটার সোনালী চুল। কোনওটার চোখ নীল তো কোনওটার বাদামী। আর তাদের পরনের পোশাকের যে কত রকমারি সে আর কী বলি তোমাদের। ছোটো খোকাখুকুদের আলমারিতে যা জামা থাকে ঠিক সেরকমই সব ঝালর দেওয়া, রেশমের সূতোর নকশা তোলা, রঙবেরঙের বোতাম বসানো জামা পুতুল খোকাখুকুদের গায়ে।
দোকানের সেই জাদু ঝলমলে কোণটিতে বাকি সব পুতুলদের সাথে থাকত মিলি। এককালে মিলির মাথাজোড়া সোনালী চুল ছিল। তাইতে দুটো বিনুনি বাঁধা ছিল, বিনুনির ডগায় লাল ফিতে দিয়ে ফুল বানানো। মিলিকে শুইয়ে দিলে তার নীল চোখের পাতাটা বুজে যেত, আবার যেই না বসিয়ে দেওয়া চোখদুটো এমনি করে খুলে যেত যেন মনে হত ঘুম থেকে জেগে উঠল এই বুঝি! এমনকি মিলির হাত দু’খানি আর পা দু’খানি দিব্যি এদিক ওদিক ঘোরানোও যেত। আর মিলির জামাটার কথা যদি তোমরা শোনো তাহলে হয়ত ওরকমই একটা জামা তোমরাও চেয়ে বসবে। একটা আশমানি রঙ জামা তাইতে সাদা মেঘের মত ফুলকো ফুলকো ঝালর দেওয়া ছিল। দেখলে মনে হবে যেন শরতের নীল আকাশে পেঁজা তুলোর মত সাদা মেঘ ভাসছে। তবে এত কিছুর পরেও মিলির মনে ভারি দুঃখ। তার কারণ কী জানো?
এ সবই মিলির এককালে ছিল, এখন আর নেই। এখন মিলির সোনালী বিনুনীর চুলগুলো সব জটপাকানো। একটা বিনুনি থেকে তো লাল ফিতে খুলে কোথায় হারিয়েই গেছে। মিলির নীল চোখের পাতা এখন আর শুলেও বোজেনা, সবসময় খোলাই থাকে। আর মিলির সেই আশমানি রঙ জামার যা দশা হয়েছে সে দেখে তোমরা বুঝি কেঁদেই ফেলবে। শরতের আকাশ থেকে সে জামা এখন বাদলাদিনের কালো মেঘে ছাওয়া আকাশ হয়ে গেছে। সাদা ঝালর গুলোয় ময়লার পরত পড়েছে। দেখলেই বোঝা যাবে কেউ আর মিলির খেয়াল রাখে না।
রাখবেই বা কেন! দোকানে কত নামীদামী সাজানোগোজানো পুতুল। খোকাখুকুরাও তাদের নিয়েই হইচই করে। তাদের মা বাবারা পয়সা দিয়ে নতুন নতুন সেই পুতুল কিনে দেয় খোকাখুকুদের। সেই পুতুল হাতে নিয়ে নাচতে নাচতে গাইতে গাইতে বাড়ি যায়। মিলি পড়ে থাকে কাঠের তাকের এক কোণে। কখনও কখনও মিলি বিড়বিড় করে বলে,
-“এই বেশ ভালো হয়েছে। আমায় দেখতে পেলে হয়ত সব খোকাখুকুরা হাসাহাসিই করত বুঝি। তার চেয়ে আড়ালে আছি সেটাই ঠিক।”
মুখে তাই বললেও মিলি মনে মনে কি আর ব্যথা পেত না? খোকাখুকুদের বাড়িতে না জানি কত মজা! রোজ কেমন তাদের খেলার সাথী হওয়া যায়। মিছিমিছির চায়ের আসর, পুতুলের বিয়ে, সুপারহিরো সাজা, খোকাখুকুর মাবাবাদের মুখে ঘুমপাড়ানি গান শোনা, আরও কত কী! সে সব কি আর মিলির কপালে জুটবে কখনও! মিলি তাই পড়েই থাকে দোকানের আলো ঝলমলে কোণটির এক আঁধার তাকের তলায়।
এমনি করেই দিন যায়। তবে এক একটা দিন বুঝি একটু আলাদা রকমেরই হয়। সেই দিনগুলোতে আঁধার তাকের তলাতেও আলো পৌঁছয়। কীসের যেন একটা হাসি, কেমন যেন একটা খুশি খেলে বেড়ায় বাতাসে। গুনগুনিয়ে গান ভেসে আসে।
তেমনই একটা দিনে এক ছটপটে খোকন তার মাবাবার হাত ধরে এল সেই বিশাল বড় দোকানটাতে। তাকে নিয়ে তো মা বাবা জেরবার! একবার এদিকে ছোটে তো একবার ওদিকে লাফায়। দোকানের গড়গড়ানো সিঁড়ি দিয়ে দশবার ওঠে আর নামে। দৌড়োদৌড়ি করতে করতেই খোকনটা এসে থামল দোকানের ভেতর সেই সবথেকে বেশি আলো ঝলমলে কোণটায়। থমকে দাঁড়ায় খোকনটা একটুখানি। তারপর হামাগুড়ি দিয়ে কী যেন খোঁজে পুতুলের তাকের ঠিক তলাটায়। তারপর হাতে করে টেনে বার করে আনে সেটা। ও মা! এতো মিলি! খোকনটা মিলির লালফিতেওয়ালা সোনালী বিনুনিটা দেখতে পেয়েছিল বুঝি তাকের তলায় বেরিয়ে থাকতে।
মিলিকে হাতে নিয়েই ছটপটে খোকনটা যেন একটু চুপচাপটি হয়ে গেল। আহারে পুতুলটাকে কেউ দেখেনি! ওমনি করে তাকের তলায় মুড়েশুড়ে পড়েছিল। দ্যাখো দিকি জামাটাও কেমন নোংরা হয়ে গেছে। আর অন্য বিনুনিটার লাল ফিতেটাও গেছে হারিয়ে। ইসস ওর যদি একটা এমন পুচকুলি বোন থাকত তাহলে কিছুতেই কি তাকে এমন দুঃখটা পেতে দিত? চেয়ে দেখো দিকি একবার পুতুলটার নীল চোখদুটোয়। কত গভীর, কত মায়া মমতায় ভরা। ঠিক খোকনের মায়েরই মত। মায়ের চোখদুটো শুধু কালো, এই যা তফাৎ!
খোকনের চোখে জল টলটল করে। ধুলোমাখা পুতুলটাকে বুকে জড়িয়ে ছোটে মা বাবার দিকে। মা তখন দোকানদার কাকুকে দাম মেটানোর লাইনটায় পয়সা নিয়ে দাঁড়িয়ে আর বাবা পাশেই দুই হাতে বড় বড় দুইখান ব্যাগ ধরে হাঁসফাঁস করছে। খোকন শিগগির সেখানে গিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,
-“আমাকে এই পুতুলটা কিনে দেবে?”
মা সেই ধুলোমাখা ছেঁড়াখোঁড়া পুতুলটা দেখে চমকে বলে ওঠে,
-“এটা কোথায় পেলি? এ তো পুরনো পুতুল। দেখছিস না কেমন যেন ভাঙাচোরা হয়ে গেছে! তুই বরং অন্য কোনও পুতুল নয়তো ব্যাটবল বা ওই খেলনা গাড়িগুলোর একটা নিয়ে আয় সোনা, আমরা কিনে দেব।”
খোকন চোখ ছলছলিয়ে বলে,
-“না মা! আমার অন্য কোনও খেলনা চাই না! এই পুতুলটাই চাই।”
মা একটু রাগ করে বলে,
-“দোকানে এরকম বায়না করতে নেই!”
দোকানদার কাকু যে সামনে টেবিলটার ওইপারে বসেছিল সেও বলে,
-“এই পুতুলটা মনে হয় ভুল করে তাকে রয়ে গেছে। এটা তো বেচবার মত হালতে নেই। খোকাবাবু তুমি বরং অন্য কোনও খেলনা বেছে নাও।”
এদিকে মিলির ভয়ে যেন দমটা আটকে আসছে। এতদিন তাকের আঁধারে থেকে থেকে ওর মনের সব আশাই হারিয়ে গিয়েছিল যে কোনওদিন কোনও সত্যিকারের খোকাখুকুর খেলনার ঘরে ওর জায়গা হবে। আজ যখন এই খোকনটা ওর জামার ধুলোগুলো ঝেড়ে দিয়ে ওর জটপাকানো চুলগুলো ছাড়িয়ে দিল তখন মিলির যেন মনে হল এমনটা সত্যিই যদি হয়! খোকনটার কালো চোখদুটো কেমন ভালোবাসায় ভরা। এই খোকনটার বাড়িতেই মিলির জায়গা হবে তাহলে?
এখন যদি খোকনের মা আর দোকানের লোকটার জন্য মিলির আর যাওয়া না হয় খোকনের বাড়ি! ইসস এখন যদি মিলি চোখদুটো বুজে ফেলতে পারত!
দুরুদুরু বুকে মিলি ভাবতে থাকে এই বুঝি ওকে আবার ওই আঁধার তাকটার তলায় ফেলে এল কেউ!
এমন সময় কে যেন একটা মিলির হাতটা ধরে নেয়। খোকনের মত কচি হাত নয়, বড়দের হাত।
এ তো খোকনের বাবা! হাতের ভারি ব্যাগটা নামিয়ে খোকনের হাত থেকে মিলিকে নিজের হাতে নিয়েছে খোকনের বাবা। মিলির সব আশাই বোধ হয় শেষ।
মিলির নীল চোখদুটো খোলা থাকলেও চারিদিকে যেন আঁধার ঝেঁপে আসে বুঝি। এমন সময় কানে আসে খোকনের বাবার গলা,
-“দাদা আপনি পুতুলটার যা দাম সেই দামেই এটা প্যাক করে দিন। আমরা নেব পুতুলটা।”
মিলির নিজের কানকে ভরসা হয় না। কী শুনছে ও? ঠিক শুনছে কি?
ঘোর কাটতে কাটতেই মিলি দেখে খোকনের কোলে চেপে যেন কোথায় চলেছে। খোকনের মা খোকনের পাশে বসে হেসে বলছে,
-“তোরা বাপ ব্যাটায় পারিসও বটে! দোকানের লোকটাও ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে।”
খোকনের বাবা সামনে বসে হো হো করে হাসে আর বলে,
-“দ্যাখোই না। কেমন তেল দিয়ে খোকনের পুতুলের সব হাত পা সারিয়ে দেব। আর বেশটি করে সাবান দিলে ওই সোনালী চুল আর নীল জামাটা কেমন নতুনের মত ঝকঝক করবে দেখবে।”
খোকনের মা বলে,
-“থাক, ওই পুরনো জামাটা আর পরাতে হবে না! আমি বরং সেলাইয়ের মেশিনটা একবার চালিয়ে দেখি। একটা পুতুলের জামা কি আর বানাতে পারব না?”
খোকন কোলে বসা মিলিকে আলতো করে শুইয়ে দিয়ে বলে,
-“এখনও অনেকটা পথ বাড়ি যেতে বুঝলি? তুই একটু ঘুমো। আমি বরং একটা নাম ভাবি তোর, কেমন?”
খোকন জানল কী করে? সত্যিই তো মিলির খুব ঘুম পেয়েছে। একটু ঘুমিয়েই নেওয়া যাক বরং, মনের ওপর দিয়ে যা ধকল গেল। ঘুম থেকে উঠে খোকনকে নিজের নামটা বলে দিতে হবে, আর খোকনের নামটাও শুধিয়ে নিতে হবে। ভাবতে ভাবতেই রাজ্যের ঘুম নেমে আসে মিলির চোখে, এতদিন খুলে থাকা নীল চোখদুটো আপনা আপনিই বুজে আসে।
(সমাপ্ত)
🔹🔹🔹🔹
এই গপ্পোটার শেষে ক’টা কথা না বললেই নয়। ক্যাপ্টেন নিমোর একটা খুব প্রিয় গল্পের বই হল কোর্দুরয়। একটা ছোট্ট টেডি বেয়ারের গল্প। গল্পটা আমারও খুব মন টানে। সেই থেকেই গল্পটা লেখার ইচ্ছে হল। শুধু তাই নয়, ঠিক এই গল্পের মিলি পুতুলটার মত দেখতে একটা পুতুল ছোটোবেলায় বাবা কিনে দিয়েছিল। আমি তখন টু/থ্রি-তে পড়ি, একবার আমাদের বাড়িতে চুরি হল। চোর এটা ওটা সেটার সঙ্গে নিয়ে গেল আমার পুতুলটিকে। কী ভেবেছিল কিজানি। পুতুলের পেটে কী সোনাদানা পাবে ভেবেছিল কী জানি। যাই হোক জিনিস নিয়ে পালাবার পথে বাড়ির পেছনের মাঠে বেশ কিছু জিনিস আবার ফেলে দিয়ে গিয়েছিল। তার মধ্যে আমার পুতুলখানিও ছিল কিন্তু একটা পা ভাঙা অবস্থায়। হয়ত ওটা ভেঙে ভেতরে কিছু আছে নাকি চেক করেছিল। মা বহুকষ্টে ওটা আবার জুড়ে দিয়েছিল কিন্তু আগের মত আর ওটা ঘোরানো বাঁকানো যেত না। অনেক বড় বেলা অব্দি পুতুলটা আমাদের সঙ্গে সঙ্গে হেথাহোথা ঘুরেছে। মিলির এই গল্প তাই কোর্দুরয়, রাশিয়ান রূপকথার পুতুলের মত আমার সেই পুতুলটা আর যেখানে যত পুতুল আছে খোকাখুকুদের বাক্সে, তাদের জন্য।
🔹🔹🔹🔹
ছবি: আমি। ইন্টারনেটে এই ধরনের আঁকাগুলো খুব ভালো লাগছিল। তাই দেখে দেখে একটা চেষ্টা করলুম।
🔹🔹🔹🔹
এবার ছোটোদের টাস্কের পালা। কাজটা এটাই যে তোমরা সক্কলে তোমাদের সবচেয়ে প্রিয় খেলনার ছবি, আর কেন খেলনাটি তোমাদের প্রিয় সেই গপ্পো আমায় কমেন্টবক্সে জানিও কেমন?

স্পাইনোসরাস!

 

স্পাইনোসরাস!
ছবি দেখেই বোঝা যাচ্ছে নামকরণের কারণ নিশ্চয়ই। ক্যাপ্টেন নিমো লিখে দিতে বলেছেন, স্পাইনোসরাস সবচে’ বড় কার্নিভোরাস ডাইনো, হ্যাঁ টি-রেক্সের চেয়েও বড়।
মিঃ স্পাইনো এত বড়টি হলেও বাঙালিবাবুর মত মাছ খেতেই বেজায় পছন্দ করেন। ছবিতে তাই ক্যাপ্টেন একটা আস্ত মাছসহ পুকুরই এঁকে দিয়েছেন স্পাইনোর জন্য।
ক্যাপ্টেন আরও বলেছেন স্পাইনোসরাস ক্রেটেশ্যাস যুগের ডাইনো এবং বর্তমানের যেখানটা নর্থ আফ্রিকা সেইখানে বাস করতেন।
লম্বায় ৫০ ফিটের ওপর, ওজন গোটা কুড়ি টন।
মুখখানি কুমিরের মত আর পিঠের ওই ‘সেল’। সব নিয়ে দিব্যি সাঁতার কাটতেন কিন্তু স্পাইনোসরাস মশাই।

ঘুমন্তপুরীর গল্প

 





আমাদের ছোটোবেলার প্রিয় ‘ঠাকুরমার ঝুলি’-র গল্প ‘ঘুমন্ত পুরী’ ক’দিন আগে পড়ে শুনিয়েছি ছোট্ট বন্ধুদের। সেই গল্পের শেষ যেখানে হয়েছে, এই গল্পের শুরু সেখানে। নিজের মত করে লেখার চেষ্টা করেছি। বন্ধুরা পড়ে ভালোমন্দ মতামত জানালে খুব আনন্দ পাব। যারা আগে পড়েছো তারাও আরেকবার পড়তে পারো চাইলে ☺️
ঘুমন্তপুরীর গল্প
সুস্মিতা কুণ্ডু
তারপর তো সেই এক দেশের রাজপুত্র আর ঘুমন্তপুরীর রাজকন্যে দুইজনায় সুখে ঘরসংসার করতে লাগল। তাদের হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়া, মরাইঠাসা ধান, পুকুরভরা মাছ, মাঠজোড়া সব্জি আর বাগানভর্তি ফল। এদিকে রাজপুত্রর মা বাবা খুশি, ছেলে কত্তদিন পর বিদেশভ্রমণ সেরে, টুকটুকে রাজকন্যে নিয়ে বাড়ি ফিরেছে। ওদিকে ঘুমন্তপুরীর রাজা রানির মনে আনন্দ। দূরদেশ থেকে রাজপুত্তুর এসে সবাইকে উদ্ধার করেছে মরণঘুমের কবল থেকে। কতদিনের ঘুম ভেঙে সারা রাজ্য জেগেছে। নিঝুম রাজ্যের অলিগলিতে এখন মানুষের আনাগোনা। গাছের ডালে ডালে পাখপাখালির কলকাকলি। থিরথির বাতাস কাঁপন তোলে পাতায় পাতায়। যে দিকেই চাও সব প্রাণবন্ত খুশমন্ত। কতদিনের না বলা কথা, না ছড়ানো সুর, সব জমেছিল। এখন সবাই আনন্দে বাঁধনহারা হয়েছে।
রাজকন্যে আর রাজপুত্র পদ্মসায়রের শ্বেতপাথরে বাঁধানো ঘাটে পাশাপাশি বসে বসে সুখদুঃখের গল্প করেন। সুখের গল্পই বেশি করেন। তবে মাঝেমাঝে পুরনো দিনের দুঃখের কথাও আলোচনা করেন বৈ কী। কী বললে? রাজকন্যে রাজপুত্রের নাম কী? আহা! এই হয়েছে মুশকিল। আমাদের সময় বাপু আমরা রাজপুত্তুর আর রাজকন্যে নাম দিয়েই গোটা গপ্প শুনে লেপমুড়ি দিয়ে ঘুমের জগতে পাড়ি দিতুম। তোমাদের এখনের সব কচিকাঁচার দলকে গপ্পো শোনানো বেজায় কঠিন কাজ। দাঁড়াও তবু চেষ্টা করি মনে করার সবকিছু।
হ্যাঁ! হয়েছে, মনে পড়েছে। রাজকন্যের নাম কমলিনী আর রাজপুত্রের নাম শতদল। রাজকন্যে কমলিনী হল গিয়ে ঘুমন্তপুরীর রাজকন্যে আর রাজপুত্র শতদল হল সেই এক দূরদেশের রাজপুত্তুর। ও বাবা! সেই দূরদেশের নামও জানা চাই? ঘুমন্তপুরীর আসল নামটিও শোনা চাই? না শুনে তো তোমরা থামার মানুষ নও। রাজপুত্তুরের সেই দেশের নামটি হল শঙ্খনগর আর ঘুমন্তপুরীর আসল নাম ছিল পদ্মপুরী। ছিল বললুম তার কারণ হল দুষ্টু দৈত্য পদ্মপুরীর সব মানুষকে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়ার পর থেকে সবাই পদ্মপুরীকে ঘুমন্তপুরী নামেই চেনে কিনা। ও হ্যাঁ, দুষ্টু দৈত্যর নাম তন্দ্রাসুর। জানি তোমরা জিগ্গেস করবেই করবে, তাই আগেভাগেই বলে দিলুম।
তন্দ্রাসুর করেছিল কী, পদ্মপুরীর রাজা রানি মন্ত্রী সান্ত্রী সেপাই কোটাল প্রজা দাসদাসী এমনকি হাতিশালের হাতি ঘোড়াশালের ঘোড়া সক্কলকে রুপোর কাঠি ছুঁইয়ে ঘুম পাড়িয়ে পাথরের মত করে দিয়েছিল। সে রুপোর কাঠির এমন মায়াজাল যে তারা যে যার জায়গায় যেমনটি দাঁড়িয়ে তেমনটিই দিনের পর দিন দাঁড়িয়ে রইল। যেমনি করে বসেছিল তেমনি করেই বসে রইল। কেউ নড়েওনা চড়েওনা। হাজার ডাকলেও মাথা ঘোরায় না, চোখের পলক ফেলে না, টুঁ শব্দটিও করে না। সবার থেকে কষ্টে ছিলেন রাজকন্যে কমলিনী। রাজকন্যেকে দুষ্টু তন্দ্রাসুর একটা পদ্মফুলের ভেতর লুকিয়ে রেখেছিল। শুকনো ডাঙ্গায়, হীরের নালে সোনার পদ্ম, সেই পদ্মে লুকনো রাজকন্যে। তাঁর শুধু মুখটুকু দেখা যায়, বাকি সমস্ত শরীরটা পদ্মের ভেতর অদৃশ্য।
বহু দিন এভাবে কেটে গেলে ‘পরে সেই ঘুমন্ত পদ্মপুরীতে এসে পৌঁছল রাজপুত্র শতদল। পুরী তো তখন বন জঙ্গলে ঢাকা পড়ে গেছে। পড়বে না-ই বা কেন! সারা রাজ্য তো ঘুমন্ত, কে সাফ করবে রাজপ্রাসাদ কে-ই বা ছাঁটবে আগাছা। রাজপুত্র শতদল দেশভ্রমণে বেরিয়ে কত শত রাজ্য, কত শত দেশ, কত শত নদী পর্বত পেরিয়ে এসে পৌঁছেছে পদ্মপুরীতে। কিন্তু এসে তো হতবাক এমন কাণ্ড দেখে। সারা রাজপুরী ঘুতে ঘুরতে শেষে সোনার পদ্মে লুকনো রাজকন্যের দেখা পেল রাজপুত্র কিন্তু রাজকন্যেকে মায়াজাল থেকে কিছুতেই উদ্ধার করতে পারল না। আরও কত দিন কত রাত বয়ে গেল। অবশেষে একদিন সোনার পদ্মে জেগে থাকা রাজকন্যের মুখটির দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে রাজপুত্রর চোখে পড়ল একটা সোনার কাঠি, আর একটা রুপোর কাঠি। সেগুলো হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে সোনার কাঠিটা ভুল করে রাজকন্যের মাথায় ছুঁতেই জেগে উঠল রাজকন্যা। সোনার পদ্মর ভেতর থেকে বেরিয়ে এল রাজকন্যা কমলিনী। শুধু কি তাই? জেগে উঠল সারা রাজ্য। তারপর? তারপর আর কী? হইহুল্লোড় হল, উৎসব হল, রাজপুত্র শতদলের সাথে রাজকন্যে কমলিনীর ‘বে হল।
রাজপুত্র পদ্মপুরীর রাজকন্যেকে নিয়ে ফিরে এলেন নিজের রাজ্য শঙ্খনগরে। সেখানে তো রাজা আর রানি ছেলের চিন্তায় কেঁদে কেঁদে শয্যা নিয়েছেন। সোনার কাঠির ছোঁয়ায় সুস্থ হলেন তাঁরাও। রাজ্যজুড়ে খুশির বান ডাকল। তারপর থেকে তো সবকিছুই ঠিক চলছিল। কিন্তু...
🌼🌼🌼🌼
কিন্তু হাসিখুশি কি আর চিরকাল স্থায়ী হয়? না না রাজপুত্র শতদল রাজকন্যে কমলিনী তাঁদের মা বাবারা দুই রাজ্যের প্রজারা সকলেই শান্তিতে দিন কাটাচ্ছিল। শুধু একজনেরই মনে কোনও শান্তি ছিল না। সে রাগে ফুঁসছিল, নানারকম বদ মতলব আঁটছিল, শাপশাপান্ত করছিল। কে আবার? সেই দুষ্টু দৈত্য তন্দ্রাসুর। পুরোটা তাহলে বুঝিয়ে বলি, কেমন।
দুষ্টু দৈত্য তো মাসের পর মাস বছরের পর বছর যুগের পর যুগ ধরে ভোঁসভোঁসিয়ে ঘুমোচ্ছিল। যুগ কি জানোনা বুঝি? বারো বছরে হল গিয়ে এক যুগ। তাহলেই বোঝো কতদিন ধরে তন্দ্রাসুর ঘুমোচ্ছিল। তন্দ্রাসুর অবশ্য ঘুমন্তপুরীর মানুষদের মত পাথর হয়ে একটানা মোটেও ঘুমতো না। ও তো আর রুপোর কাঠির ছোঁয়ায় ঘুমোয় না, ঘুমোয় আলসেমি করে। বছরের পর বছর পড়ে পড়ে নাক ডেকে ঘুমোয়, তারপর শুধু একবার জাগে খাওয়ার দিন। যেদিন জাগে সেদিন এই এত্ত এত্ত থালাভর্তি ভাত ডাল তরিতরকারি মাছ মাংস ডিম, বাপরে বাপ সে কী মহা আয়োজন। তন্দ্রাসুরের ছিল দুই চ্যালা, হ্যাঁকোসুর আর ঢ্যাঁকোসুর। তারাই সারাবেলা ধরে রান্নাবান্না করে তন্দ্রাসুরকে ঘুম থেকে ডেকে তোলে। তন্দ্রাসুর ভরপেট খেয়ে আবার হাই তুলে ঘুমিয়ে পড়ে।
তো সেদিন তন্দ্রাসুর ঘুম থেকে উঠেই প্রতিবারেরই মত আগে হ্যাঁকোসুর আর ঢ্যাঁকোসুরকে চাট্টি চড়চাপাটি দিয়ে দাঁত খিঁচিয়ে ধমকায়,
-“ক্যানো রে ব্যাটা হ্যাঁকোঢ্যাঁকো? আমার ঘুম ভাঙালি ক্যানো! আয় তোদেরকেই আজ টপ করে গিলে ফেলবো জল দিয়ে।”
হ্যাঁকোঢ্যাঁকো ভয়াসুরের হুঙ্কার শুনে জালার মত আকারের জল খাওয়ার ঘটিটা লুকিয়ে দিয়ে কাঁচুমাঁচু স্বরে হাত কচলে বলে,
-“রান্না কত্তে হইল দেরি
করব মোরা কী?
তপ্ত ভাতে নুন লেবু আর
খাঁটি গাওয়া ঘি!”
তন্দ্রাসুর আরও রেগে বলে,
-“ঘি এর নিকুচি, মাছ মাংস রেঁধেছিস নাকি বল শিগগির, নইলে...”
হ্যাঁকোঢ্যাঁকো আঁতকে ফের সমস্বরে বলে ওঠে,
-“মাছ কেটেছি আঁশবঁটিতে
ডিম করেছি সেদ্ধ,
রগরগে ঝাল মাংস কষা
নাল ঝরতে বাধ্য!”
এবার তন্দ্রাসুর খানিকটা খুশি খুশি হয়।
ইয়াব্বড় পাথরের বারকোশে রাজ্যের খাবার নিয়ে হালুম হুলুম করে খায়, গপাগপ করে খায়। হ্যাঁকো আর ঢ্যাঁকো শুধু জুলজুল করে চেয়েই থাকে। ওদের কপালে কি আর এসব ভালোমন্দ জুটবে? ওই রান্নার সময় গন্ধ শুঁকে আদ্দেক পেট ভরাও আর তন্দ্রাসুরের খাওয়া শেষ হলে পড়ে থাকা মাংসের হাড়, মাছের কাঁটা দিয়ে বাকি পেটটুকু ভরাও। আরা বাকি যতদিন তন্দ্রাসুর ঘুমোয় হ্যাঁকোঢ্যাঁকো পোকামাকড় ঘাসপাতা সাপ ব্যাঙ ইঁদুর যা পায় তাই খেয়ে পেট ভরায়।
আসলে দৈত্যদের দুনিয়াতেও নানারকম নিয়মকানুন আছে। যেমন যে দৈত্যদের অনেক জাদুক্ষমতা থাকে, দেখতে বড়সড় হয় তারাই দৈত্যরাজ্যের সর্বেসর্বা হয়। আর কিছু দৈত্য আছে যারা আকারে ছোটোখাটো, বিশেষ কোনও জাদুশক্তি নেই তাদের কাজই হল গিয়ে বড় দৈত্যদের সেবা, যত্নআত্তি করা। তন্দ্রাসুর এমনই এক ক্ষমতাশালী দৈত্য আর হ্যাঁকোসুর ঢ্যাঁকোসুরের মনিব। দৈত্যরাজ্যের সব বড় দৈত্যদেরই একটা না একটা করে বিশেষ জাদুওয়ালা শক্তিশালী হাতিয়ার থাকে। যেমন তন্দ্রাসুরের ছিল সোনার কাঠি আর রুপোর কাঠি। রুপোর কাঠির ছোঁয়ায় সে ঘুম পাড়িয়ে দিত পারত যেকোনও প্রাণীকে। যে সে ঘুম নয়, কালঘুম। রুপোর কাঠি যাকে একবার ছুঁতো সে প্রায় পাথরই হয়ে যেত। বছরের পর বছর এক অবস্থায় তলিয়ে থাকত কালঘুমে। একমাত্র সোনার কাঠি ছোঁয়ালেই ভাঙত সে মরণঘুম। সেই জাদুতেই তো রাজকন্যে কমলিনীর রাজ্য পদ্মপুরীকে ঘুমন্তপুরী বানিয়ে দিয়েছিল তন্দ্রাসুর।
যাই হোক, দৈত্যরাজ্য নিয়ে আরও কথা বলবখন তার আগে আসল ঘটনাটা বলি। তন্দ্রাসুর তো ভালোমন্দ খেয়েই চলেছে, কড়মড়িয়ে মাছের মুড়ো চেবায়, মড়মড়িয়ে মাংসের হাড় গুঁড়োয়, ওদিকে হ্যাঁকোসুর ঢ্যাঁকোসুর জিভের জল মুখের মধ্যেই সুড়ুৎ করে টেনে নেয়। এমন সময়ই ঘটল বিপত্তি...
হঠাৎই প্রবল জোরে ‘আঁউউউ মরে গেলুম! বাবা গো মা গো দৈত্যরাজামশাই গো!’ বলে চিৎকার করে উঠল তন্দ্রাসুর। হলটা কী রে বাবা? ঘাবড়ে গেছে হ্যাঁকো ঢ্যাঁকোও। থুঃ থুঃ করে মুখের খাবার বাইরে ফেলল তন্দ্রাসুর। দুই চ্যালার বুক ঢিপঢিপ, মাথা টিপটিপ, খাবারে কি ঝাল কম হয়েছে? মিষ্টি বেশি হয়েছে? সোয়াদ হয়নি নাকি? তন্দ্রাসুর তো এক গরাসে গিলে ফেলবে তাহলে চ্যালাদের।
🌼🌼🌼🌼
কিন্তু না, ওসব কিছুই না। থুঃ করে ওগরানো খাবারের ভেতর একটা মস্তবড় দাঁত, হ্যাঁকো ঢ্যাঁকোর হাতের বুড়ো আঙুলের সমান বড় সাদা চকচকে একটা দাঁত। সেকী! তন্দ্রাসুরের দাঁত উপড়ে গেছে সামান্য মাংসের হাড় চিবোতে গিয়ে? কী লজ্জা! তন্দ্রাসুর তো মুখের ভেতর আঙুল ঢুকিয়ে উহ্ আহ্ করতে করতে ফের জোরে কঁকিয়ে উঠল।
-“পাশের দাঁতটাও নড়ছে যে রে হ্যাঁকো ঢ্যাঁকো!”
তাই তো!
এমন সময় হ্যাঁকো তন্দ্রাসুরের কাছটিতে গিয়ে নজর করে বলে,
-“এ কী হুজুর! আপনার কানের পাশের ওই জটপাকানো চুলের গোছাটা কেমন যেন সাদাটে লাগছে!”
ঢ্যাঁকো আরেকটু এগিয়ে গিয়ে বলে,
-“তাই তো রে হ্যাঁকো, হুজুরের চোখের তলাতেও কেমন কালি কালি লাগছে, এমন সুন্দর সবুজ চামড়া কেমন যেন পচা শ্যাওলা পড়া ঝুলে যাওয়া দেখতে লাগছে!”
তন্দ্রাসুর মনে মনে ভড়কে গেলেও হুঙ্কার ছেড়ে বলল,
-“কী সব বাজে বকছিস উজবুক কোথাকারের। শিগগির আয়না নিয়ে আয়।”
দৈত্যদের ঘরে কি আর আয়না থাকে? হ্যাঁকো ঢ্যাঁকো একটা বড়সড় জলভরা পাথরের পাত্র টানতে টানতে নিয়ে এল। তন্দ্রাসুর তাই দেখে খেঁকিয়ে বলল,
-“এইটে আয়না হল? এটা আমার জাদু জলাধার জানিসনে হাঁদার দল? এটায় করে আমি সেই ঘুমন্তরাজ্যটার, কী যেন নাম, পদ্মনগর নাকি পদ্মপুরী, সেখানকার খবর পাই।”
হ্যাঁকোঢ্যাঁকো লম্বা করে জিভ কেটে বলে,
-“তাই তো তাই তো! এতে তো সেই ঘুমন্ত পদ্মপুরীর দিঘির জল ভরা আছে। সেই দেশের হালচালের দিকে নজর রাখার জন্য। বড্ড ভুল হয়ে গেছে হুজুর!”
তন্দ্রাসুর গজগজ করতে করতে ওই জাদু জলাধারের দিকেই তাকিয়ে নিজের ছায়াটা দেখে। ডাইনে বাঁয়ে ওপরে নিচে মুণ্ডু ঘুরিয়ে দেখে বেশ চিন্তায় পড়ে যায়। ব্যাপারটা কীরকম হল? জলআয়নায় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে বয়স বেড়ে গেছে তন্দ্রাসুরের। চুলে পাক ধরেছে, এ কীকরে সম্ভব? দাঁতগুলো নড়বড় করছে, মুখের চামড়ায় কত ভাঁজ। তাছাড়া ভেতরে ভেতরেও কেমন যেন একটা দুর্বল বোধ হচ্ছে। এত খাবারদাবার খেয়ে যেন কেমন অম্বল অম্বল বোধ হচ্ছে। ভাবতে ভাবতেই ইয়াব্বড় একটা চোঁয়া ঢেঁকুর উঠল। বিশাল সে ‘হেউউউউঘোঁৎ’ আওয়াজে তন্দ্রাসুরের তন্দ্রাপুরী কেঁপে উঠল, পায়ের তলার পাথর দুলে উঠল। হ্যাঁকোঢ্যাঁকো এ ওর ঘাড় ধরে টাল সামলালো।
তন্দ্রাসুর ডান হাতের তর্জনী জাদু জলাধারের মধ্যে ডুবিয়ে একবার বাঁয়ে একবার ডাইনে একবার ওপরে একবার নিচে করে জলের ভেতর আঁকচেরা কাটল। ওমনি পাথরের পাত্রের জলটা গোল গোল ঘুরতে ঘুরতে স্ফটিকের আয়নার মত স্বচ্ছ হয়ে উঠল। ধীরে ধীরে তাতে ফুটে উঠল পদ্মপুরী রাজ্যের রাজপ্রাসাদের সভাঘরের দৃশ্য। রাজকন্যে কমলিনীর মা বাবা মানে রাজামশাই আর রানিমা সোনার সিংহাসনে বসে রাজ্যশাসন করছেন। চারিদিকে সভাসদরা বসে আছে। সেপাই সান্ত্রীরা দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে। রাজপুরী গমগম করছে। কোথায় সেই পাথর বনে যাওয়া ঘুমন্ত মানুষে ভরা থমথমে রাজপুরী? ঘুমন্তপুরী ফের পদ্মপুরী হয়ে উঠেছে। তন্দ্রাসুর অস্থির হয়ে বারবার জাদু জলাধারে আঙুল চালিয়ে ঘুমন্তপুরীর চারিদিকের দৃশ্য দেখার চেষ্টা করে। নাহ্ গোটা রাজ্যে কোত্থাও আর তন্দ্রাসুরের রুপোর কাঠির জাদুর প্রভাব নেই। এমনকি রাজপ্রাসাদের যে ঘরটিতে রাজকন্যে কমলিনীকে হীরের ডাঁটে সোনার পদ্মের ভেতর বন্দী করে রেখেছিল তন্দ্রাসুর সেই ঘরটিও অন্যরকম হয়ে গেছে। রাজকন্যে তো আর নেই-ই সেখানে, তার সাথে রুপোর কাঠি আর সোনার কাঠিও গায়েব। আছে শুধু তাঁর একটা বিশাল বড় তৈলচিত্র। কিন্তু রাজকন্যের পাশে দাঁড়িয়ে আছে ছবিতে, ওটি কে? এ তো একটা রাজপুত্তুর!
🌼🌼🌼🌼
এবার বেশ চিন্তায় পড়ে যায় তন্দ্রাসুর। ঘুমন্তপুরী জেগে উঠেছে, রাজকন্যার সাথে রাজপুত্র, রুপোর কাঠি সোনার কাঠি গায়েব। তাহলে কী তন্দ্রাসুরের করা মায়াজাল কেটে দিয়েছে কেউ? ওই ছবির রাজপুত্র?
নিশ্চয়ই তাই হয়েছে! তাই তো তন্দ্রাসুরের বয়স হুট করে এমন বেড়ে গেছে। তোমরা বুঝি ভাবছ বয়স বেড়েছে সে আর নতুন কথা কী? বয়স তো সবারই বাড়ে, চুল তো সবারই পাকে, দাঁত তো সবারই পড়ে, এমনটাই তো হয় দুনিয়ায়। এতে আর হাল্লাগুল্লা করার কী আছে রে বাবা! উঁহু! দৈত্যদের মায়াদুনিয়ায় সবকিছুই অন্যরকম। বলেইছিলুম না দৈত্যদের বিশেষ একটা করে ক্ষমতা থাকে। তন্দ্রাসুরের ছিল রুপোর কঠি সোনার কাঠি। রুপোর কাঠি ছুঁইয়ে তন্দ্রাসুর যাদের কালঘুমের গ্রাসে পাঠিয়ে দিত তাদের বাকি আয়ুটুকুনি তন্দ্রাসুরের হয়ে যেত। এইভাবেই পদ্মপুরীর মত দিকে দিকে নানা রাজ্যের মানুষদের রুপোর কাঠি ছুঁইয়ে ঘুম পাড়িয়ে তাদের আয়ু চুরি করে বছরের পর বছর তন্দ্রাসুর একটুও না বুড়ো হয়ে দিব্যি খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে দিন কাটাত। এক রাজ্যের সকলের আয়ু বেঁচে নেওয়ার পর সেই মানুষগুলো চিরতরে পাথর হয়ে যেত। তখন তন্দ্রাসুর আবার হামলা করত নতুন কোনও রাজ্যে আর আবার রাজ্যশুদ্ধু লোককে ঘুম পাড়িয়ে তাদের আয়ু নিজের করে নিত।
কিন্তু তন্দ্রাসুর যখন নিশ্চিন্তে নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছিল আর মাঝে মাঝে ঘুম থেকে উঠে চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয় গিলছিল তখনও রাজপুত্র শতদল এসে রাজকন্যে সারা ঘুমন্তপুরীর ঘুম ভাঙিয়ে রাজকন্যে কমলিনীকে বিপদ থেকে রক্ষা।
তন্দ্রাসুর হাঁকপাঁক করে পদ্মপুরীর জলভরা জাদুপাত্রের স্ফটিক আয়নায় গোটা পদ্মপুরীর আনাচেকানাচে দেখলে খুঁজে কিন্তু নাহ্! রুপোর কাঠি সোনার কাঠির দেখা মিলল না। কিন্তু ওগুলো তো চাই-ই চাই নাহলে তন্দ্রাসুর যে নতুন আয়ু চুরি করতে পারবে না, ক্রমশ বুড়িয়েই যেতে থাকবে।
হ্যাঁকো ঢ্যাঁকো মিনমিন করে বলে,
-“হুজুর ওই জলের পাত্তরে আরেকটু জল ঢেলে দেব? জলটা কম কম লাগছে তাই মনে হয় ঠিকঠাক দেখা যাচ্ছেনা।”
তন্দ্রাসুর বেজায় ক্ষেপে চেঁচিয়ে বললে,
-“গাধার দল! ওতে যে সে জল ঢাললে হবে নাকি? যে রাজ্যের খবর চাই সেই রাজ্যের জলাশয়ের জল ঢালতে হবে ওইতে! আমার রুপোর কাঠি সোনার কাঠি ওই ঘুমন্তপুরীতে নেই। রাজকন্যাও নেই। সব সব নির্ঘাৎ ওই ছবির রাজপুত্রটার কাণ্ড। তোরা দুই আপদ এক্ষুনি বিদেয় ‘হ! খুঁজে আয় কোন দেশের রাজপুত্র এসে ঘুম ভাঙালো ঘুমন্তপুরীর! তার কাছেই আছে সোনার কাঠি, রুপোর কাঠি আর রাজকন্যাও। এবার আমি সেই রাজপুত্রের রাজ্যকেই মরণঘুম পাড়াব।
দাঁড়িয়ে রইলি কেন শুনি? শিগগির যা! কাঠি না পেলে তোদের একটাও হাড়গোড় আস্ত রাখব না বলে দিলাম!”
🌼🌼🌼🌼
হ্যাঁকো ঢ্যাঁকো তো আর কোনওদিকে না চেয়ে পাঁই পাঁই করে দৌড় লাগাল। রাজপুত্রর সন্ধান না পেলে কপালে ঢের দুঃখ আছে। দিনের পর দিন সকাল দুপুর বিকেল রাত্তির হেঁটে হেঁটে কত রাজ্য ঘুরে বেড়াল হ্যাঁকো কিন্তু রাজপুত্রর সন্ধান আর মেলে না। শেষমেষ এক দূরের রাজ্যের একপ্রান্তে এসে পৌঁছল দুজনায়। বেজায় ক্লান্ত হয়ে একটা গাছতলায় বসে হ্যাঁকোবললে,
-“শোন রে ঢ্যাঁকো ভাই
কপালে যে সুখ নাই,
সেই রাজপুত্তুর চাই,
কোথায় দেখা পাই?”
ঢ্যাঁকো দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
-“পড়ব যে মুশকিলে
খোঁজ যদি না মেলে,
তন্দ্রাসুরের কিলে,
হাড়পাঁজরা ঢিলে।”
হ্যাঁকো বলে,
-“আচ্ছা হুজুর বলে আমরা নাকি বুদ্ধু, কিন্তু আমার তো মনে হয় হুজুরই বুদ্ধু। সোনার কাঠি রুপোর কাঠিটা খামোখা রাজকন্যের মাথার কাছে ফেলে রেখে আসতে গেল শুনি? যদি ওটা আমাদের দৈত্যপুরীতেই ফেরৎ নিয়ে চলে আসত তাহলে কোথাকার কে রাজপুত্র কি পারত ঘুমন্তপুরীর সকলের ঘুম ভাঙাতে?”
ঢ্যাঁকো তখন দাঁত খিঁচিয়ে বলে,
-“হুজুর ঠিকই বলে। তুই আস্ত একটা গাধা তো বটেই, তোর জন্য আমিও হুজুরের চোখে হাঁদা হয়ে গেছি। ওরে বুদ্ধু কাউকে ঘুম পাড়িয়ে তার আয়ু চুরি করতে হলে ওটাই নিয়ম, জাদুকাঠি দুটোকে ওখেনেই রেখে আসতে হবে। দৈত্যপুঁথিতে নাকি এমন কথাই লেখা আছে ছোটোবেলায় শুনিসনি?”
হ্যাঁকো যদিও রেগে ঝগড়া করতে যাচ্ছিল কিন্তু দৈত্যপুঁথির কথা শুনে চুপ করে গেল।
এমন সময় দূর থেকে পুঁউউউ পুঁউউউ করে শাঁখ বাজানোর আওয়াজ ভেসে আসতে লাগল। শাঁখের আওয়াজ আবার হ্যাঁকোঢ্যাঁকোর বেজায় কান কটকট করে, পেট ভুটভাট করে, তারা কিনা অসুর, মানুষ তো আর নয়। শাঁখের আওয়াজ, ঢাকের আওয়াজ এসব ওদের সহ্য হয় না।
তা বহুকষ্টে কানে হাতচাপা দিয়ে বসেছিল দুইজনায়। এমন সময় দেখল একদল মানুষ হনহন করে কোথায় যেন চলেছে। মনে হচ্ছে যেন শাঁখের আওয়াজটা যেদিক থেকে আসছে সেদিকপানেই চলেছে। হ্যাঁকো একটু এগিয়ে গিয়ে শুধলো,
-“এইয়ো মানুষের দল, কোথায় যাচ্ছো সব?”
কিন্তু হ্যাঁকোর কথার উত্তর দেবে কী, হ্যাঁকোর মাথার শিংদুটো দেখেই সব মানুষজন ভয়ে ছুটে পালাল।
বেশ কয়েকবার শুধোতে গিয়ে একই কাণ্ড ঘটল। তখন ঢ্যাঁকো বললে,
-“নাহ্ এভাবে হবে না। শিং দেখেই ভিতু মানুষের দল লেজ গুটিয়ে ছুটছে, কথা কইবে কী!”
হ্যাঁকো মাথা চুলকে বলল,
-“কিন্তু মানুষের তো লেজ নেই রে ঢ্যাঁকো!”
ঢ্যাঁকো কটমটয়ে তাকায়, দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলে,
-“সাধে কি হুজুর তোকে পেটায়!’
হ্যাঁকোও ক্ষেপে গিয়ে বলে,
-“তোকেও তো পেটায়, বড় বড় কথা বলছিস যে ভারি!”
ঝটাপটি হুটোপুটি করে মারামারি লেগে গেল দু’জনের।
বেশ কিছুক্ষণ মারামারি করে ধুলো ঝেড়ে উঠে দাঁড়ানোর পর দেখল আরেকদল মানুষ আসছে দূর থেকে। ঢ্যাঁকো শিগগির পুঁটুলি থেকে একটা কাপড়ের টুকরো বার করে মাথায় কাপড়ের মত জড়িয়ে নিল। আসলে এই হ্যাঁকোঢ্যাঁকোর মত নিচুদরের দৈত্যরা তন্দ্রাসুরের মত অত বড়সড় চেহারার হয় না। মাথার শিংদুটো শুধু বাদ দিলে অনেকটা বড় সড় মোটা সোটা সাইজের মানুষ বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। যাই হোক, অল্প করে ছদ্মবেশ নিয়ে ঢ্যাঁকো সামনে এসে পড়া মানুষের দলটাকে নরমসুরে জিগ্গেস করল,
-“হ্যাঁ গো ভালোমানুষের পো! বলি যাচ্ছো কোথায় দল বেঁধে সব!”
মানুষগুলো এবার আর ভয় পায়না ঢ্যাঁকোকে দেখে। উত্তর দেয়,
-“সে কী গো! কারা তোমরা? এই রাজ্যে বাস নয় বুঝি? এত বড় উৎসবের খবর জানো না।”
ঢ্যাঁকো একটু কাঁচুমাঁচুভাব করে বলে,
-“আমরা বিদেশি পথিক, কী করে জানব বল দিকিনি। তোমরাই একটু বলে দাও।”
-“আমাদের রাজ্যের রাজপুত্র গো, সেই যে তিনি দেশভ্রমণে গিয়েছিলেন কত বছর আগে। গেলেন তো গেলেন আর ফেরেন না। কেঁদে কেঁদে রাজামশাই অন্ধ হলেন, রানিমা শয্যা নিলেন। রাজপুত্র আর ফেরেন না। তারপর অনেক অপেক্ষা পুজোআচ্চা মানত করার পর একদিন শেষমেষ তিনি ফিরলেন। শুধু কি ফিরলেন! পদ্মকলির মত সুন্দর এক রাজকন্যেকে ‘বে করে ফিরলেন। রাজ্যে তো আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। রাজপুত্র আর রাজকন্যেকে দেশের নতুন রাজা আর রানি ঘোষণা করা হল। সেই থেকে প্রতিবছর এই দিনটাতে রাজপুত্র আর রাজকন্যার দেশে ফেরার বর্ষপূর্তি উদ্যাযাপণ করা হয়...”
গ্রামবাসী বকবক করে চলে। এদিকে হ্যাঁকো তখন ঢ্যাঁকোর কানে ফিসফিস করে,
-“দূর বাবা এই সব রাজ্যের আজেবাজে বকবক কেন শুনছিস? চল না এদের কাছে কী খাবারদাহার আছে কেড়ে খাই, বড্ড খিদে পেয়েছে যে!”
ঢ্যাঁকো একটা রাম চিমটি কাটে হ্যাঁকোর গায়ে, তারপর গ্রামবাসীর উদ্দেশ্যে বলে,
-“তা কী নাম তোমাদের এই রাজ্যের গো? আর নতুন রাজার শ্বশুরবাড়ির রাজ্যটারই বা কী নাম?”
গ্রামবাসী মহা উৎসাহে বলে চলে,
-“আমাদের রাজ্যের নাম হল গিয়ে শঙ্খনগর। আর নতুন রাজা হলেন শতদল। তিনি বিয়ে করে আনলেন পদ্মপুরীর রাজকন্যে, আমাদের নতুন রানি কমলিনীকে। আমাদের নতুন রাজা কত্ত বীরপুরুষ জানো? পদ্মপুরী রাজ্যে তো সবাই কালঘুমে পাথর হয়েছিল। আমাদের রাজপুত্র শতদল দেশভ্রমণে গিয়েই তো সেই ঘুমন্তপুরীর পৌঁছলেন। সে কী কাণ্ড বলি শোনো তবে!”
🌼🌼🌼🌼
ব্যাস! ব্যাস! কাণ্ড শুনে আর কাজ নেই। হ্যাঁকো ঢ্যাঁকোর যা বোঝার বোঝা হয়ে গেছে! এই তবে সেই ছবির রাজপুত্রের রাজ্য। এক্ষুনি ফিরে গিয়ে খবর দিতে হবে তন্দ্রাসুরকে। শিগগির মাথার পাগড়ি খুলে শিংজোড়া বার করে স্বরূপ ধারণ কল। তারপর মানুষদের দলটাকে ভয় দেখিয়ে তাড়া করল। মানুষগুলো তো হঠাৎ করে চোখের সামনে শিংওয়ালা বামন দৈত্য দেখে ‘বাবাগো মাগো বাঁচাও গো’ বলে দৌড় দিল উর্দ্ধশ্বাসে। এদিকে হ্যাঁকোঢ্যাঁকো মতলব ভাঁজতে শুরু করল।
হ্যাঁকো বলে,
-“চল চল ঢ্যাঁকো! শিগগির হুজুরকে খবর দিই গিয়ে।”
-“তোর সবেতেই তাড়া। এমন একটা সুযোগ! এটা কাজে লাগাতে হবে যাতে হুজুর আমাদের একটু সম্মানের চোখে দেখেন এবার থেকে। রোজ রোজ পড়ে পড়ে এত মার খেতে ভাল্লাগে নাকি!”
-“তবে? কী করব আমরা!”
-“ওই রুপোর কাঠি সোনার কাঠি আমরাই উদ্ধার করি চল। যদি তন্দ্রাসুরকে ওগুলো এনে দিতে পারি...
আমরা হুজুরের মত এত শক্তিধর না হলেও চাট্টি মানুষ সেপাই প্যায়দার সাথে লড়তে পারব না?”
ঢ্যাঁকোর এরকম দুঃসাহসী প্রস্তাবে হ্যাঁকো ভয় পেলেও লোভ সামলাতে পারে না। মান সম্মান পাওয়ার তারও লোভ বড় কম নয় কিনা। এদিকে ভয়ও ষোলো আনা। লড়াই করা কি মুখের কথা!
বিস্তর আলোচনা, ঝগড়াঝাটি, মারামারির পর দুজন স্থির করল যে হ্যাঁকো ফিরে যাবে তন্দ্রাসুরকে খবর দিতে আর ঢ্যাঁকো যাবে শঙ্খনগরের রাজপ্রাসাদে জাদুকাঠি উদ্ধার করতে। সেইমত দুইজনায় গেল দুইদিকে।
ঢ্যাঁকো শঙ্খ আর ঢাকের ধ্বনি অনুসরণ করে চলল রাজবাড়ির উদ্দেশে। ফের মাথার শিংদুটোকে কাপড় দিয়ে জড়িয়ে চাপা দিয়ে নিল। দলে দলে লোক মস্ত বড় সিংদরজা দিয়ে ঢুকছে। দুখানা হাতির মূর্তি দুইপাশে দাঁড় করানো। তাদের শুঁড় থেকে ফোয়ারা ছুটছে। কী সব গন্ধওয়ালা জল পড়ছে, ম্যাগো! এত ফুলের গন্ধে গা গুলোয় ঢ্যাঁকোর। কোনওমতে নাকে চাপা দিয়ে ঢুকে পড়ে বিশাল রাজপ্রাসাদ চত্বরে। কত লোক, কত সেপাই, কত সান্ত্রী, লোকলস্কর, হাতি ঘোড়া। ঢ্যাঁকো তো এরকম সব জিনিস আগে কখনও দেখেনি তাই মনে মনে বেশ ঘাবড়ে গেছে। তারওপর ভয়ও আছে যদি ওর আসল রূপটা দেখে ফেলে কেউ!
কথায় বলে যেখানে বাঘের ভয় সেখানে সন্ধে হয়। ঢ্যাঁকোরও হল তাই। সেই যে মানুষের দলটার সাথে দেখা হয়েছিল গাছতলায় দুম করে ঢ্যাঁকো পড়ে গেল তাদেরই সামনে। যে মানুষটা সব খবর দিয়েছিল সেই ঢ্যাঁকোকে দেখে চেঁচিয়ে উঠল,
-“রাক্ষস! খোক্কস! বাঁচাও! সব্বাইকে খেয়ে ফেলবে!”
তখনও সুযোগ ছিল, ফিরে পালালেই পারত ঢ্যাঁকো। কিন্তু দৈত্যকূলের আবার একটু অহংকার বেশি সে বড় দৈত্যই হোক বা বামন দৈত্যই হোক। ওদেরকে রাক্ষস খোক্কস বললে বড্ড গায়ে লাগে। ঢ্যাঁকো ওমনি মাথার কাপড়টা সরিয়ে বলতে শুরু করল,
-“আহা! তুমি তো আচ্ছা হযবরল মানুষ হে! আমাকে দু-দুবার দেখেও চিনতে পারলে না যে আমি বামন দৈত্য। রাক্ষসদের মাথার মাঝে একখানা শিং থাকে আমাদের মত দুটো নয়। রাক্ষসদের তিনটে চোখ থাকে, তার একখানা কপালে। রাক্ষসদের মাথায় লম্বা লম্বা চুল থাকে। আর খোক্কস? ওরা ব্যাটা তো কোনওকালে চান করে না তাই গায়ে গন্ধ, ভীতুর দল সব। ওরা সব কাঁচা খাবার খায়, আমরা রেঁধেবেড়ে খাই। আমাদের দৈত্য হুজুররা পুঁথি পড়তে পারে, রাক্ষসরা তে সব মুখ্যুর দল। আমরা দৈত্যরা রাক্ষসদের মোটেও সহ্য করতে পারিনে। ফের যদি আমাকে রাক্ষস খোক্কস বলেছো...”
এই এত কথা বলতে বলতেই একদল পেয়াজা এসে আশেপাশে জমা হয়ে গেছে। ঢ্যাঁকোর মাথার ঢাকনাটা সরে শিংদুখানি বেরিয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষ বামন দৈত্যকে ভয় পেলেও রাজপেয়াদাদের হাতে লাঠি বল্লম বর্শা, তারা কেন ভয় পাবে? তারা ঝপাঝপ ঢ্যাঁকোকে একটা বস্তার মধ্যে ভরে দু’চারখানা লাঠির ঘা দিয়ে বন্দী করল। তারপর নিয়ে গেল রাজদরবারে, যেখানে আছেন নতুন রাজা শতদল আর নতুন রানিমা কমলিনী। ওঁরাই এই বামন দৈত্যর বিচার করবেন!
🌼🌼🌼🌼
ঢ্যাঁকোকে বন্দী করে, তারপর জেরা করে সব কিছু জানতে পারলেন শতদল এবং কমলিনী। সেই ভয়ঙ্কর তন্দ্রাসুর আবার দুঃস্বপ্নের মত হানা দিতে আসছে। রাজ্যশুদ্ধু লোক আতঙ্কে থরোথরো, ভয়ে মরোমরো। এবার বোধহয় দৈত্য পদ্মপুরীকে যেমন ঘুমন্তপুরী বানিয়ে দিয়েছিল তেমন শঙ্খনগরকেও ঘুমন্তনগর বানিয়ে দেবে! নতুন রাজা তাঁর প্রজাদের এভাবে চঞ্চল হতে দেখে বড় দুশ্চিন্তায় পড়লেন। এমন সময় রানি কমলিনী বললেন,
-“তোমরা একটুও ভয় পেও না, আমরা তো আছি।”
রাজকন্যের কথায় সবাই কিছুটা আশ্বস্ত হল।
সেদিন রাতের বেলায় বিশ্রামকক্ষে শতদল একরাশ চিন্তা নিয়ে স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলেন,
-“কী উপায় এখন হবে বলো তো কমলিনী। প্রজাদের ভরসা তো দিলাম আমরা কিন্তু তন্দ্রাসুর দৈত্যকে আটকানো কি সহজ কর্ম? যতই ওর কাছে সোনার কাঠি রুপোর কাঠি না থাকুক, দৈত্যদের শুনি অনেক ক্ষমতা। ও ঠিক জাদুকাঠিগুলো আবার আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে সবাইকে কালঘুম পাড়িয়ে দেবে।”
রানি বললেন,
-“আমাদের দৈত্যর মত ক্ষমতা না থাকুক বুদ্ধি আর সাহস আছে তো? তাই দিয়েই ওকে হারাব। আগের বার তন্দ্রাসুর অতর্কিতে আক্রমণ করেছিল আমার রাজ্য পদ্মপুরী তাই আমরা কোনও প্রতিরোধ করতে পারিনি কিন্তু এবার ওই বামন দৈত্য ঢ্যাঁকোসুর আমাদের কব্জায় তাই আগেভাগেই সতর্ক হব আমরা। ঢ্যাঁকোসুরের কথা অনুযায়ী আরেকটা বামন দৈত্য হ্যাঁকোসুর গেছে তন্দ্রাসুরকে আমাদের রাজ্যের খবর দিয়ে ডেকে আনতে। তার মানে আমাদের হাতে এখনও কিছুটা সময় আছে।”
শতদল আর কমলিনী নানারকম পরিকল্পনা করতে থাকে তন্দ্রাসুরকে পরাস্ত করার। এমন সময় কোত্থেকে ছোট্ট দুটি ফুটফুটে শিশু শঙ্খকুমার আর শঙ্খকুমারী ছুটে আসে। শঙ্খকুমারী আর শঙ্খকুমারীকে চিনলেনা বুঝি তোমরা? ইসস্‌ আমারই ভুল। আমি তো ওদের কথা বলতেই ভুলে গেছি তোমাদের। ওরা দুটি হল গিয়ে নতুন রাজা শতদল আর নতুন রানি কমলিনীর দুই যমজ পুত্র আর কন্যে। নাজানি রাজপ্রাসাদের কোন আনাচকানাচ থেকে ফিসফাস শুনেছে যে দুষ্টু দৈত্য আসছে শঙ্খনগরে হামলা করতে। মা বাবার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে শুধোয়,
-“ও মা! ও বাবা! বলো না! কী বিপদ আমাদের রাজ্যে? সেই দুষ্টু দৈত্যটা যে মাকে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছিল সে নাকি আবার আসছে? এবার কী হবে?”
কমলিনী তাদের কোলে তুলে নিয়ে বলেন,
-“তোমরা চিন্তা কোরোনা বাছারা! আমরা আছি তো, কিছু না কিছু উপায় হবে।”
রাজা শতদলও ছেলেমেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন,
-“তোমরা ছেলেমানুষ, এইসব চিন্তা না করে যাও খেলাধুলো পড়ালেখা করো দেখি।”
খেলার কথায় শঙ্খকুমারীর কিছু একটা মনে পড়ে, সে বলে ওঠে,
-“জানো বাবা আমাদের বন্ধু শঙ্খিনীর বাবা খুব শক্তি ধরেন। অনেক জাদু জানেন। উনি আমাদের সাহায্য করূেন নির্ঘাৎ।”
শঙ্খকুমারও দিদির কথায় সায় দিয়ে বলে,
-“হ্যাঁ মা! শঙ্খিনীর বলেছিল ওর বাবার কাছে একটা জাদুমাণিক আছে। তাই দিয়ে নিশ্চয়ই দুষ্টু দৈত্যকে হারানো যাবে।
শতদল আর কমলিনী তো একে অপরের মুখ চাওয়াটাওয়ি করেন। কে এই শঙ্খিনী? কেই বা তার ক্ষমতাধর বাবা যাঁর কাছে জাদুমাণিক আছে। শিশুদের কথা একেবারে উড়িয়ে দেওয়াটাও ঠিক নয়। এদিকে দুই শিশু বাবা মায়ের মুখ দেখে বোঝে যে ওঁরা ঠিক বুঝতে পারছেন না। তখন বাবা মাকে বুঝিয়ে বলে,
-“শঙ্খিনী আমাদের বন্ধু, পদ্মসায়রে বাস করে গো। ও পদ্মসায়রের রাজকুমারী। কিন্তু পদ্মসায়রের বাসিন্দাদের নাকি মানুষদের সামনে আসা বারণ তাই ওরা জলেই থাকে। শঙ্খিনীর বাবা সর্পরাজ জাদুমাণিক দিয়ে সব ঢেকে রাখেন। কিন্তু রাজকুমারী শঙ্খিনীর একদিন আমাদের দুজনকে সায়রের ধারে খেলতে দেখে খুব ইচ্ছে করে আমাদের বন্ধু হওয়ার। তাই তো জলের বাইরে এসে আমাদের সাথে আলাপ করে। সেই থেকে আমরা বন্ধু।”
এতটা শুনেও ওদের মা বাবার ধন্দ্ব কাটে না। বলেন,
-“কিন্তু জলের মধ্যে মানুষ শ্বাস নেবে কীকরে, বাঁচবে কীকরে?”
শঙ্খকুমার আর শঙ্খকুমারী খিলখিলিয়ে হেসে বলে,
-“এ মা তোমরা কিচ্ছু জানো না। শঙ্খিনী বুঝি মানুষ! ও তো সর্পকন্যা আর ওর বাবা সর্পরাজ।”
এই শুনে শতদল চমকে বলে উঠলেন,
-“তাই তো! আমি বহুকাল আগে ছোটোবেলায় রাজমাতা, ধাইমা সকলের মুখে ঘুমপাড়ানি গল্প শুনতাম বটে যে আমাদের পদ্মসায়রে নাকি এক লুকনো সর্পরাজ্য আছে। তখন ভেবেছিলাম গল্প কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সে সব সত্যি কথাই ছিল, নিছক ছেলেভুলানো গল্প নয়!”
রানি কমলিনী বলেন,
-“তাই যদি সত্যি হয় তাহলে আমরা সর্পরাজের কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করতে পারি। উনি ওঁর জাদুবলে নিশ্চয়ই আমাদের সাহায্য করবেন। সোনারা তোমরা দুটিতে আমাদেরকে নিয়ে যাবে একবার তোমাদের বন্ধু শঙ্খিনী আর তার বাবার কাছে?”
শঙ্খকুমার আর শঙ্খকুমারী বলে,
-“কিন্তু মা ক’দিন হল শঙ্খিনী জানিনা কেন আর খেলতে আসছে না আমাদের সাথে। আগে তো যেদিন যেদিন আকাশে গোল চাঁদ উঠত সেদিনগুলোয় ও অবশ্যই আসত আমাদের সাথে খেলতে। তাছাড়া ওঁরা কি অন্য মানুষদের দেখা দেবেন?”
রাজা শতদল কাতর হয়ে বলেন,
-“এখন তাহলে উপায়?”
🌼🌼🌼🌼
একটু ভেবে রানি কমলিনী ফের বলেন,
-“আজও পূর্ণিমা। সোনার কাঠি রুপোর কাঠি নিয়ে চলুন আমরা যাই পদ্মসায়রে। ততক্ষণ অপেক্ষা করব যতক্ষণ না ওঁরা দেখা দেন। তাঁর সাহায্য চাইব আমরা তন্দ্রাসুরকে হারানোর জন্য। কারণ শঙ্খনগরের মানুষদের কালঘুম পাড়িয়ে পাথরে পরিণত করলে পদ্মসায়রের সর্পবংশও তো বাদ যাবে না। তাই সর্পরাজ নিশ্চয়ই সাহায্য করবেন।”
রাজপ্রাসাদের রত্নকোষের সিন্দুকে রেশমে মোড়া কাঠের বাক্সে রাখা রুপোর কাঠি আর সোনার কাঠি বার করে এনে রাজা আর রানি গেলেন পদ্মসায়রের উদ্দেশে।
পূর্ণিমার ভরা চাঁদের আলোয় ঝিলমিল করছে পদ্মসায়রের কাজলকালো জল। বিরাট আকারের পদ্ম ফুটে রয়েছে সেই সায়রের জলে। নরম মোমের মত সাদা আলো পিছলে পড়ছে পদ্মের নরম গোলাপি পাপড়ির গা বেয়ে। শ্বেতপাথরের ঘাটে নেমে কমলিনী জলস্পর্শ করে স্তব করলেন,
-“হে সর্পরাজ! আমাদের ডাকে সাড়া দিন। আপনি এই পদ্মসায়রের রাজা আর পদ্মসায়র আমাদের শঙ্খনগরেরই অংশ। আজ আমাদের সামনে বড় বিপদ। আপনি আমাদের রক্ষা করুন।”
কিছুক্ষণ পর পদ্মসায়রের ঠিক মধ্যিখানে জল নড়ে উঠল। বুদবুদ আর ঢেউ ভাঙতে লাগল। আসতে আসতে সরসর করে জল কেটে ঘাটের কাছে এসে জল থেকে ফণা তুলল মস্ত একটা সাপ। চকচকে কালো গা চাঁদের রুপোলি আলোয় পিচ্ছিল দেখাচ্ছে। সর্পরাজ বললেন,
-“রানি কমলিনী, রাজা শতদল, আমায় ক্ষমা করবেন আপনারা। আমি দৈত্য তন্দ্রাসুরের কথা জানি কিন্তু মনুষ্যরাজ্যের সাথে সর্পরাজ্যের কোনও সম্পর্ক নেই। আমাদের এই সাপেদের দুনিয়া আপনাদের পদ্মসায়রে আছে এইটুকু শুধু। আর তন্দ্রাসুর এসে জাদু করলেও আমাদের জলের তলার রাজ্যে তার কোনও প্রভাব পড়বে না। আমি আমার সর্পমণির মায়াজাল দিয়ে আমাদের সর্পনগরীকে সুরক্ষিত করে রেখেছি।”
রাজপুত্র বিচলিত হয়ে বলে ওঠেন,
-“কিন্তু বিপদের দিনে আমরা একে অপরকে সাহায্য করাই তো ধর্ম। তাছাড়া আমাদের পুত্রকন্যারা সকলে একে অপরের বন্ধু!”
সর্পরাজ ফুঁসে ওঠেন,
-“কীসের ধর্ম? কীসের বন্ধুত্ব? আমরা নিরীহ সাপেরা এই জলাশয়ে বাস করি। এক একটি পদ্মের মৃণালে আমাদের এক একজনের বাস। আমার কন্যা সর্পরাজ্যের রাজকন্যে শঙ্খিনীকে কিছুদিন আগে আপনাদের মত এক মানুষ অকারণে জলে ঢিল ছুঁড়ে মজা করতে গিয়ে এমন আহত করেছে যে সে মৃত্যপথযাত্রী। আমার সর্পমণির জাদুক্ষমতাও হার মেনেছে। মানুষের নৃশংসতার বলি হয়েছে আমার ছোট্ট মেয়েটি। তার তো কোনও দোষ ছিল না। মানুষরা নিজে থেকে আমাদের বিরক্ত না করলে আমরা নিজে থেকে দংশন করিনা কখনও। কিন্তু আপনারা মানুষরা অকারণ আমোদের জন্য আমাদের আহত করেন। আমি কেন মানুষদের সাহায্য করব?”
রানি কমলিনী শান্ত মৃদু কোমল স্বরে অনুনয় করলেন,
-“আপনি শান্ত হোন সর্পরাজ। যে দুষ্ট মানুষ এই কাজ করেছে আমরা তাকে খুঁজে বার করে বন্দী করব কারাগারে। তবে তার আগে আপনি যদি একবার রাজকন্যা শঙ্খিনীকে আমাদের কাছে আনতেন আমরা চেষ্টা করতাম ওঁকে বাঁচানোর।”
সর্পরাজ কমলিনীর নরম ব্যবহারে একটু শান্ত হলেন। পুরোপুরি বিশ্বাস না হলেও মেয়েকে বাঁচানোর শেষ একটা চেষ্টা করতে সম্মত হলেন। জলে ডুব দিয়ে কিছুক্ষণের জন্য অদৃশ্য হয়ে গেলেন। তারপর ফিরে এলেন একটি দুর্বল শীর্ণ সাপের শরীর নিয়ে, সর্পরাজকন্যা শঙ্খিনী। অসুস্থ আহত বন্ধুকে দেখে শঙ্খকুমার আর শঙ্খকুমারী ডুকরে কেঁদে উঠল কষ্টে।
রানি কমলিনী রেশমের কাপড়ের মোড়ক থেকে সোনার কাঠিটা বার করে সর্পরাজের উদ্দেশে বললেন,
-“তন্দ্রাসুরের রুপোর কাঠি যেমন সকলকে কালঘুম পাড়িয়ে দিতে পারে তেমনি এই সোনার কাঠি পারে কালঘুম ভাঙাতে, চোখের দৃষ্টি ফেরাতে। রাজকন্যে শঙ্খিনীকেও নিশ্চয়ই এই সোনার কাঠি সুস্থ করে তুলবে।”
এই বলে তিনি সোনার কাঠি শঙ্খিনীর দুই চোখে আর ফণার ওপরটায় ছোঁয়ালেন। আস্তে আস্তে শঙ্খিনী সর্পকন্যা প্রাণবন্ত হয়ে উঠতে লাগল। জলের মধ্যে ছটপটিয়ে লেজ নেড়ে সাঁতার কাটতে শুরু করল। তারপর জল থেকে উঠে এসে শঙ্খকুমার আর শঙ্খকুমারীর সাথে খেলতে শুরু করল। এই না দেখে সর্পরাজের তো আনন্দে চোখ দিয়ে জলের ধারা নামল। রাজা শতদল আর রানি কমলিনীর সামনে মাথা নিচু করে বলল,
-“আজ থেকে আমি আপনাদের বন্ধু হলাম। সবরকম বিপদে আপদে এই সর্পকূলকে আপনার পাশে পাবেন। বলুন আমি কিভাবে তন্দ্রাসুরকে আটকাতে আপনাদের সাহায্য করতে পারি।”
🌼🌼🌼🌼
ওদিকে বন্দী ঢ্যাঁকোসুরের থেকে সব খবর পাওয়ার পর, শতদল আর কমলিনী মিলে পদ্মসায়রের সর্পরাজের সাথে পরামর্শ করতে ব্যস্ত। এদিকে হ্যাঁকোসুর তো প্রাণপণে দৌড়ে গিয়ে পৌঁছল তন্দ্রাসুরের দৈত্যপুরীতে। তন্দ্রাসুর তখনও জলআয়নায় নিজের পাকাচুল টেনে টেনে তুলছিল। হ্যাঁকো হাঁপাতে হাঁপাতে কোনওমতে বলল,
-“হ্‌হ্‌হুজুর হুজুর! সেই ছবির রাজপুত্রের সন্ধান পেয়েছি আমরা। রাজপুত্রের রাজ্যের নাম শঙ্খনগর, সে এখন সে রাজ্যের রাজা।ওই-ই ঘুমন্তপুরীর সকলের ঘুম ভাঙ্গিয়ে রাজকন্যেকে উদ্ধার করে নিয়ে গেছে। সোনার কাঠি রুপোর কাঠিও ওর কাছেই আছে!”
হ্যাঁকোর থেকে খবর পেয়ে রেগেমেগে ঘুঁষি পাকিয়ে দাঁত কিড়মিড় করতে গিয়ে খানকতক কাঁচা চুলও জোরসে টেনে ছিঁড়ে ফেললেন।
-“আঁউউউ!”
হাত পা ছুঁড়ে বিকট আর্তনাদ করে উঠল তন্দ্রাসুর আর সেই হাতের ধাক্কা লেগে সামনের জাদু জলাধার পাথরের মেঝেতে পড়ে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। কিন্তু তন্দ্রাসুরের সেসব দিকে মন নেই, হ্যাঁকোকে পিঠে বসিয়ে জাদুবলে উড়ে চলল শঙ্খনগরের উদ্দেশে।
শঙ্খনগরের সীমানার ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে তন্দ্রাসুর নিচে তাকিয়ে দেখতে পেল রাজপ্রাসাদ আর পদ্মফুলে ভরা পদ্মসায়র।
পদ্মসায়রের ঘাটে বসে আছে দুজন মানুষ। তাদের মধ্যে একজনের মুখ তন্দ্রাসুরের বেশ মনে আছে, সেই ঘুমন্তপুরীর রাজকন্যে কমলিনী, আর অন্যজন জাদুআয়নায় দেখা সেই ছবির রাজপুত্র। এদের কাছেই আছে রুপোর কাঠি সোনার কাঠি। শোঁওও করে তন্দ্রাসুর এসে নামল সেখানে। চারদিকে ঝড়ের মত বাতাস উঠল, গাছপালা দুলে উঠল, পদ্মসায়রে তোলপাড়িয়ে ঢেউ উঠল। শতদল আর কমলিনী শিউরে উঠলেন ভয়ে। শঙখকুমার আর শঙখকুমারী বাবা মায়ের আড়ালে লুকলো। সেপাই সান্ত্রী সৈন্য সেনাপতি সবাই ছুটে এল এত শোরগোল শুনে। তন্দ্রাসুরের বিশাল চেহারা দেখে সবার হাতের অস্ত্র হাতেই রয়ে গেল।
তন্দ্রাসুর মেঘের গর্জনের মত হুঙ্কার ছেড়ে বলল,
-“ও! তুমিই সেই রাজপুত্র যে রাজকন্যে উদ্ধার করেছো, ঘুমন্তপুরীর ঘুম ভাঙিয়েছো! এত বড় সাহস তোমার! কোথায় আমার রুপোর কাঠি? কোথায় আমার সোনার কাঠি! এক্ষুনি ফেরৎ দাও নইলে প্রলয়কাণ্ড ঘটাবো আমি তোমার রাজ্যে।”
এইরকম ভয়ঙ্কর দৈত্যর সামনে দাঁড়িয়েও একটুও না ঘাবড়ে রাজা শতদল বললেন,
-“তন্দ্রাসুর দৈত্য! তোমার এক অনুচর ঢ্যাঁকোসুর আমাদের হাতে বন্দী! আমরা আপ্রাণ লড়াই করব তবু ভয়ে পেছপা হবনা। তোমাকে আর তোমার অপর ওই অনুচরকেও বন্দী করব!”
এই শুনে তন্দ্রাসুর প্রবল শব্দ করে অট্টহাস্য করে উঠল।
-“আমায় বন্দী করবে! আমায়!”
যুদ্ধ লাগে লাগে প্রায়, ঠিক তার আগের মুহূর্তে রানি কমলিনী বলে উঠলেন,
-“শোনো তন্দ্রাসুর! তুমি দিনের পর দিন বছরের পর বছর তোমার জাদুকাঠি দিয়ে মানুষকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে তাদের আয়ূ হরণ করেছো। নিজে অমর হওয়ার চেষ্টা করেছো আর বাকিদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছো। তোমরা দৈত্যরা এমনিতেই মানুষদের থেকে ক্ষমতাশালী, দীর্ঘ জীবনের অধিকারী। তাহলে কেন এভাবে মায়াজালের আশ্রয় নিয়ে অপেক্ষাকৃত দুর্বলদের বাঁচার অধিকার কেড়ে নিচ্ছো? তোমাকে অনুরোধ করছি তুমি এই পাপকাজ বন্ধ করে ফিরে যাও তোমার দৈত্যপুরীতে।”
কিন্তু দুষ্টু দৈত্য রাজকন্যার সৎ পরামর্শ শুনলে তো! দুই মুঠোর মধ্যে কপাৎ করে রাজকন্যা শঙ্খকুমারী আর রাজপুত্রকে শঙ্খকুমারকে বন্দী করে বলল,
-“শিগগির বলো জাদুকাঠি কোথায়! নইলে...”
দৈত্যকে ভদ্রভাবে বুঝিয়ে কোনও লাভ হবে না, উল্টে শিশুদের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা দেখে রাজা শতদল বললেন,
-“ওই পদ্মসায়রের মাঝে সবচেয়ে বড় পদ্মফুলের মৃণালের তলায় পোঁতা আছে তোমার জাদুকাঠি দু’টো। তন্দ্রাসুর আবারও বলছি, এইবেলা নিজেকে শুধরে নাও...”
তন্দ্রাসুর শতদলের কথায় কোনও কর্ণপাত না করে হ্যাঁকোসুরকে লক্ষ্য করে বলল,
-“অ্যাই হ্যাঁকো, যা জলে নেমে তুলে আন দেখি আমার জাদুকাঠি দুটো।”
হ্যাঁকোসুরের মনোঃপূত না হলেও হুজুর তন্দ্রাসুরের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস নেই, তবু একবার মিনমিন করে বলার চেষ্টা করল,
-“আজ্ঞে হুজুর আগে ঢ্যাঁকোকে এই মানুষগুলোর কারাগার থেকে উদ্ধার করে আনলে হত না? তারপর নাহয় দুইজন মিলে একসাথে জলে নাবতুম!”
এই শুনে দৈত্য এমন কটকট করে তাকালো যে হ্যাঁকো আর কথা না বাড়িয়ে পদ্মসায়রের শ্বেতপাথরের ঘাটের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর এক পা এক পা করে নেমে বড় করে দম নিয়ে জলে ডুব দিল।
হ্যাঁকো সেই নামল তো নামল আর ওঠার নাম করে না। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে করে অধৈর্য হয়ে তন্দ্রাসুর মাথা ঝাঁকাতে শুরু করল,
-“আজ যদি রুপোর কাঠি সোনার কাঠি না পাই কাউকে আস্ত রাখব না।”
এই বলে শঙ্খকুমার আর শঙ্খকুমারীকে মুঠো আলগা করে মাটিতে নামিয়ে নিজেই সোজা ঝাঁপ দিল জলে। তন্দ্রাসুর বেজায় লম্বা, কিন্তু পদ্মসায়র তার থেকেও গভীর। ধীরে ধীরে পদ্মসায়রের কালো জলের ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেল দৈত্যর শরীরটা।
🌼🌼🌼🌼
সায়রের জলে ডুবে প্রথমটা চোখে ধাঁধা লেগে গেল তন্দ্রাসুরের। বেশ কবার চোখ পিটপিট করার পর আশপাশটা পরিষ্কার হল। রাশি রাশি লম্বা লিকলিকে সরু সরু পদ্মের নাল জলের তলার পাঁক থেকে উঠে জলের পিঠ ফুঁড়ে বেরিয়ে গেছে। তাইতে ফুটে রয়েছে পদ্ম। এইরকম একটা পদ্মের ভেতরেই জাদু করে তন্দ্রাসুর লুকিয়ে রেখেছিল কমলিনীকে। জলের মধ্যে ইতিউতি একবার হ্যাঁকোর সন্ধান করে। তারপর নজরে আসে দূরে একটা বেশ বড়সড় মোটা মত পদ্মের নাল। তার নিচে কী যেন চকচক করছে। ওইটাই কি তবে রুপোর কাঠি সোনার কাঠি? তড়িঘড়ি হাত বাড়িয়ে ধরতে যেতেই কী যেন কালো দড়ির মত এসে তন্দ্রাসুরের হাতটা পেঁচিয়ে ধরল। হাতটা ঝাঁকিয়ে সেটা ছুঁড়ে ফেলার চেষ্টা করতেই আরও ওরকম সরু সরু জিনিস চারপাশ থেকে এসে বেঁধে ফেলতে লাগল ওকে। ভালো করে চেয়ে দেখল দৈত্য, দড়ি নয় সাপ! শত শত সাপ এসে ছেঁকে ধরছে ওকে। হাত পা আর নাড়তেও পারছেনা এত ক্ষমতাশালী দৈত্য। কোনও জাদুশক্তি প্রয়োগ করার আগেই একটা চোখ ধাঁধানো আলোয় সারা শরীর অবশ হয়ে এল তন্দ্রাসুরের।
তন্দ্রাসুর কোনওমতে চোখ মুখ কুঁচকে চেয়ে দেখল একটা বিশাল বড় সাপ এঁকেবেঁকে এগিয়ে আসছে ওর দিকে। সাপটার মাথার ওপর জ্বলজ্বল করছে একটা মণি। সেই মণির আলোয় সম্মোহিত হয়ে পড়ছে ক্রমশ তন্দ্রাসুর। ওই আলোর ছটাতেই চোখে পড়ল পাশে জলের তলাতেই হাজার সাপের বাঁধনে বাঁধা পড়ে শুয়ে আছে হ্যাঁকোসুরও। হিসহিসিয়ে সাপ বলে উঠল,
-“আমি থাকতে তন্দ্রাসুর তুমি শঙ্খনগরের কারোর কোনও ক্ষতি করতে পারবে না। যে জাদুকাঠির প্রভাবে তুমি মানুষকে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে সেই রুপোপ কাঠি সোনার কাঠি দিয়েই তোমায় এই পদ্মসায়রের তলায় চিরতরে বন্দী করে রাখব আমরা।
এদিকে জলের ওপর থেকে বিশাল বড় একটা কাঁচের বাক্স নামিয়ে দিয়েছে শঙ্খনগরের সৈন্যরা। সর্পবন্ধনে আবদ্ধ অবশ তন্দ্রাসুর আর হ্যাঁকোসুরকে সেই কাঁচের বাক্সে শুইয়ে দেওয়ামাত্র জলের ভেতর ঝাঁপ দিয়ে নেমে এলেন রাজা শতদল। কোমরবন্ধনী থেকে সোনার কাঠি আর রুপোর কাঠি বার করে মাথার দিকে সোনার কাঠি আর পায়ের দিকে রুপোর কাঠি রেখে দিলেন। ব্যাস! নিজের ফাঁদে নিজেই বন্দী হয়ে পড়ল তন্দ্রাসুর। কালঘুমের কবলে পাথর হয়ে পড়ে রইল। সর্পরাজের অনুচররা দৈত্য আর তার শাগরেদের শরীর ছেড়ে কাঁচের বাক্সের বাইরে প্রহরায় নিযুক্ত হল।
জলের ওপরে উঠে এলেন রাজা শতদল আর সর্পরাজ। রানি কমলিনীর মুখে হাসি ফুটে উঠল। সর্পরাজ মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানিয়ে বললেন,
-“তন্দ্রাসুর আর কক্ষণও কাউকে মায়াঘুমে আচ্ছন্ন করে তাদের আয়ূ চুরি করতে পারবে না।”
রাজা আর রানিও কথা দিলেন সর্পরাজ্যকে তাঁরা সমস্ত বিপদ থেকে রক্ষা করবেন।
সারা শঙ্খনগর রাজ্য জুড়ে সাতদিন ধরে উৎসবের আয়োজন হল। রানি কমলিনীর পদ্মপুরী থেকেও সকলে এসে যোগ দিলেন সেই আনন্দানুষ্ঠানে। প্রতিটা মানুষ নাচে গানে ভালোমন্দ খাবারদাবারের আয়োজনে মেতে উঠল। আর শঙ্খিনী শঙ্খকুমার শঙ্খকুমারী তিনমূর্তির তো আনন্দ আর ধরে না। এখন যে তাদের আর পূর্ণিমা অব্দি অপেক্ষা করতে হয় না। যখন খুশি তখন খেলতে পারে।
কিন্তু সবাই যখন আনন্দে ব্যস্ত সেই সুযোগে যে বন্দী ঢ্যাঁকোসুর যে অন্ধকারাগার থেকে পালালো সেটা কেউ নজর করলনা...
(সমাপ্ত)
🌼🌼🌼🌼
ছবি: আমি। যদিও এই ছবিটা অন্য কারণে আঁকা তবুও দিলাম গল্পের সাথে। আমার ছোট্ট ছানা এমনটি করেই গলা জড়িয়ে গপ্পো শোনার আবদার জানায় বলেই না আমার লিখতে ইচ্ছে করে।