ছোটোগল্প : ছাতার মাথা


ছাতার মাথা
সুস্মিতা কুণ্ডু

ছাতাটা হাওয়ায় ভেসে ভেসে, মাটিতে গড়িয়ে গড়িয়ে লুটোপুটি খেয়ে বেড়াচ্ছিল। অবশেষে একটা  শুকনো গাছের তলায় এসে একদণ্ড জিরেন নিতে বসল। একটা আলাভোলা লোকও সেই গাছের তলায় জিরোচ্ছিল। ছাতাটা দেখে ভাবল,
-“বাহ্ রে! এটাকে বগলদাবা করি। বৃষ্টি ব্যাটাচ্ছেলে আমাকে সময়ে অসময়ে ভিজিয়ে হাপুশুটি করতে পারবে না আর।”
আলাভোলা পাগলা লোকটা ছাতাটা মাথায় দিয়ে আনন্দে নাচতে নাচতে চলল গ্রামে। গ্রামে ছিল একটা ধূর্ত লোক। তার ছিল একটা হরেক কিসিমের জিনিসের দোকান। সে শক্তপোক্ত ছাতাটা পাগলাটার মাথায় দেখে ভাবলে,
-“বাহ্ রে! একে ঠকিয়ে ছাতাটা নিয়ে নিতে পারলে বেশ শতখানেক টাকায় বেচে দেওয়া যাবে তো!”
যেমনি ভাবা তেমনি কাজ।
-“এই পাগলা! ক্যাডবেরি খাবি? তবে ছাতাখানা দে!”
আলাভোলা পাগলা তো ক্যাডবেরির লোভে ছাতাটা ধূর্ত দোকানদারকে দিয়ে দিল। তারপর দু’টো সস্তার লজেঞ্চুস নিয়ে সেগুলোকেই ক্যাডবেরি ভেবে খেতে খেতে চলে গেল। ছাতার খুব রাগ হল। ইসস! সরল লোকটাকে দুষ্টু দোকানদারটা কেমন ঠকিয়ে দিল!

এদিকে ধূর্ত দোকানদারের দোকানে এল ছোট্ট খুকি আর তার মা। ছোট্ট খুকি থাকে শহরে, তার মামার বাড়ির গ্রামে এসেছে বেড়াতে। রোদে রোদে মাঠেঘাটে ঘুরতে বড় কষ্ট হয় তাই খুকির মা দু-দু’শো টাকা দিয়ে সেই হরেক কিসিমের জিনিসের দোকান থেকে মেয়েকে ছাতাটা কিনে দিল। ছাতা তো বদমাইশ দোকানদারের হাত থেকে রেহাই পেয়ে খুব আনন্দ পেল। ছোট্ট খুকিও ছাতাকে খুব ভালোবেসে ফেলল। ছাতা নিয়ে খায়, ছাতা নিয়ে খেলে, ছাতা নিয়ে ঘুমোয়। দিন দুই বাদেই ছোট্ট খুকি ফিরে যাবে শহরে, ছাতাও সঙ্গে যাবে। ছাতার তো সে কী আনন্দ! শহর দেখবে বলে কথা! কিন্তু খুকির মা বললে,
-“ইসস এই গাঁয়ের এত বড় হ্যান্ডেলওয়ালা ছাতা কি শহরে চলে নাকি? তোকে বরং রঙবেরঙের ফোল্ডিং ছাতা কিনে দেব নিউ মার্কেট থেকে, খুকি। ওই ছাতা আর ঘাড়ে করে নিয়ে যাসনি। ওটা বরং কাউকে দিয়ে দে।”

ছোট্ট খুকি আর কী করে! মামাবাড়ির জমিজিরেত দেখাশোনা করে ভাদুকাকু। ভাদুকাকুর ছেলে হাঁদু, খুকির ভারি দোস্ত। খুকি তাকেই ছাতাটা দিয়ে দিল। হাঁদু তো নতুন ছাতা পেয়ে জব্বর খুশি। উল্টে দেখে পাল্টে দেখে, মাথায় দিয়ে দেখে। শেষমেষ বাড়িতে নিয়ে গিয়ে গোয়ালঘরের আটচালার বাঁশের বাতায় গুঁজে রেখে দিল। আর উপায়ই বা কী? হাঁদুর ওপরে আরও এক দাদা, এক দিদি আর নীচে একজোড়া ভাইবোন। সব মিলিয়ে পঞ্চপাণ্ডব, খাঁদু, হাঁদু, নাদু, ক্ষেন্তি, পান্তি। তারা যদি একবার ছাতার সন্ধান পায়, তাহলে হয়ে গেল! কিন্তু ভাইবোনদের হাত থেকে ছাতাকে বাঁচালেও শেষরক্ষে হল কই!
ছাতা বেচারা বাঁশের বাতায় গোঁজা হয়ে নিজের মন্দ কপালের কথা ভাবছিল, এমন সময় ‘কিঁইচ কিঁইচ!’
মরেছে! একটা গাবদা ছুঁচো!

ব্যাটাচ্ছেলে ছুঁচো কটরকটর করে ছাতার গায়ে দিল চাট্টি ছ্যাঁদা করে। ছাতা তো আর চিৎকার করে কাঁদতে পারে না, মুখ বুজে সহ্য করতে লাগল সব। পরের দিন সকালে হাঁদুর বাবা ভাদুকাকু গোয়ালের বুঁচু গাইকে জাবনা দিতে গিয়ে দেখল কী যেন সব কালো কালো টুকরো টুকরো গরুর ডাবায় পড়ে আছে। ওপরে তাকিয়ে দেখে একটা ছেঁড়া ছাতা। গজগজ করতে করতে ছাতাটাকে নিয়ে কোন চুলোয় ফেলে দিয়ে এলো ভাদুকাকু।

ছাতা আবার সেই  গাছের তলাতেই ফেরৎ এলো। মাটিতে পড়ে পড়ে কাঁদতে লাগল। এমন সময় সেই গাছের তলায় এলো আলাভোলা পাগলাটা। ছাতার তো ওকে দেখে খুব মজা হল। আলাভোলা নিশ্চয়ই ওকে যত্নআত্তি করবে। এদিকে ছাতাটাকে দেখে আলাভোলা ভাবলো,
-“আরেহ্! এটা সেই ছাতাটা না? কিন্তু কেমন বিতিকিচ্ছিরি দশা হয়েছে। এটা আর কোনও কাজে লাগবে না।”
আলাভোলা পাগলার এই ব্যবহারে ছাতা আরও কষ্ট পেল। আঁধারে লুকিয়ে কাঁদতে লাগলো। ছাতার কষ্ট কেউ না বুঝলেও গাছের ফুল আর মাঠের জোনাকিরা বুঝল। তারা দলে দলে ছাতাকে ঘিরে ধরল। ফুলে মোড়া, টিমটিম জোনাকআলো জ্বলা ছাতাকে তো এবার দারুণ সুন্দর দেখাতে লাগল।

আলাভোলা তখন হাত বাড়িয়ে যেই ছাতাকে কুড়োতে গেল ওমনি দমকা বাতাস এসে ছাতাকে উড়িয়ে নিয়ে গেল। অমন সুন্দর দেখতে ছাতাখানা আকাশে উড়ে যেতে লাগল। আলাভোলাও পেছন পেছন ছুটল। ছাতা উড়ল গ্রামের ওপর দিয়ে, পিছু নিল হরেক কিসিমের জিনিসের দোকানের সেই ধূর্ত মালিক। ছাতা ধরা দেয় না। ছাতা উড়ল বড়রাস্তার দিকে। শহরে যাওয়ার বাস ধরবে বলে দাঁড়িয়েছিল ছোট্ট খুকি আর তার মা। ছাতাকে দেখে বাস ফেলে ছুটল পেছন পেছন। ছাতা ধরা দিল না। একে একে ভাদুকাকু, হাঁদু, খাঁদু, নাদু, ক্ষেন্তি, পান্তি সবাই ছুটল। কিন্তু ছাতা কারোর কাছে ধরা দিলনা। ফুলে মোড়া, জোনাকজ্বলা ছাতা আপন খেয়ালে হাওয়ার দোলে ভেসেই চলল, ভেসেই চলল...

(সমাপ্ত)
ছবি: আমি 🙂

No comments:

Post a Comment