সুস্মিতা কুণ্ডু
অনেকদিন আগের কথা, সেথায় ছিল দুটি গ্রাম
লালপুর আর নীলপুর, এই ছিল তাদের নাম।
লালপুরে থাকে ছোট্ট ভুতু, নীলপুরেতে তুতু
দুইজনাতে দোস্তি ভারী, নয়কো তারা ভীতু।
রোজ বিকেলে মিলত দুজন, দুই গাঁয়েরই প্রান্তে
যেথায় বইছে ছোট্ট নদী, নামটি কি চাও জানতে?
নামেই নদী পাগলাঝোরা, দেখতে সরু নালা
সাঁকো সেতুর নেইকো বালাই, হেঁটেই যে পথচলা।
গাঁযের যত ছেলে বুড়ো, কিংবা গরুর গাড়ি
পায়ে হেঁটেই টপকে নদী, পৌঁছে যেত বাড়ি।
এমনি করেই যেত কেটে বছর বছর মজায়
কিন্তু আকাশ ভেঙে এল বৃষ্টি বাদল বেজায়।
সেই বছরে বর্ষারাণী হলেন ভারী ক্ষিপ্ত
কেউ জানেনা কী করলে হবেন তিনি তৃপ্ত।
খালবিল সব উপচে গেল, নদী ছাপায় দু’কূল
একখানিও নেই যে সাঁকো, মস্ত হ’ল ভুল।
তুতু-ভুতুর বন্ধ খেলা,যে যার গ্রামে বন্দী
নদীর তীরে সখার কাছে পড়েই যে রয় মনটি।
অনেক কান্নাকাটির শেষে বুদ্ধিতে দেয় ধার
যে যার গ্রামের রাজার কাছে চলল নিয়ে আবদার।
ভুতু গেল লালপুররাজ চূণীলালের কাছে
বলল, “রাজা, ওইপারেতে বন্ধু যে মোর আছে।
কিছু উপায় করো তুমি, নদীতে দাও বাঁধ
তোমার রাজ্যের প্রজা মোরা, এইটে মোদের সাধ।”
চূণীরাজা সবটা শুনে, বললে “ঠিক হায়, আচ্ছা!
পাগলাঝোরায় বাঁধব সেতু, দিলুম কথা সাচ্চা।”
দশজন লোক, একটা হাতি, দুটো ঘোড়ার গাড়ি
বস্তা বস্তা খড় কাদা, বাঁশ আনল কাঁড়িকাঁড়ি।
বাঁশ আর খড়ের কাঠামো, তাইতে লেপা মাটি
শুকনো হলেই চলবে লোকে, ফটফটিয়ে চটি।
যেমন ভাবা তেমন কাজ, হয় কবে এ দুনিয়ায়?
ঝমঝমিয়ে নামল বৃষ্টি, কাঁচা সাঁকো গলল হায়!
খবর গেল নীলপুরেতে, বললে রাজা নীলকান্ত
“এমন কাণ্ড হবেই হবে, সবাই যে সেটা জানত”
তুতু তখন বললে কেঁদে, “ও রাজামশাই মহান!
একটা কিছু উপায় করুন, সাঁকোটিকে বাঁচান!”
নীলকান্ত মুচকি হাসে, “কুছ পরোয়া নাই,
চূণীব্যাটার যা মুরোদে নেই, করব আমি তাই!”
রাজমিস্ত্রি তলব হল, চুন সুরকি ইঁটও এল
‘হাঁইসা’ বলে বিশ মিস্ত্রি, পাকা সাঁকো গড়তে গেল।
দুমদাম ধুপধাপ ঠকঠাক, ইঁটের ওপর ইঁটের সারি
সাঁকো এবার হ’ল জব্বর, টপকে যে যায় জুড়িগাড়ি।
একদিন যায়, দু’দিন যায়, হপ্তা পেরোয় তরতরিয়ে
হঠাৎ করে এক দুপুরে, ভাঙল সাঁকো হুড়মুড়িয়ে।
নদীর তলায় পলিমাটি, নরম নরম আলতুসি
তার ওপর সেতু বাঁধা, ওজন যে তার বড্ড বেশি।
বড় বড় ওই থামদুটো, নদীর গর্ভে গেল ঢুকে
পাকা সাঁকোর জীবদ্দশা, এক নিমেষে গেল চুকে।
নীলকান্ত বেজায় দুঃখী, চূণীলাল হাসে ‘হা হা হা’
“লালপুর যা পারল নাকো, নীলপুর কেমনে পারবে তা!”
এদিকে দুই বন্ধু আহা! তুতু-ভুতু খেলুড়ের দল
মনের দুঃখে নদীর ধারে, ফেলছে বসে চোখের জল।
তাই না দেখে দুই রাজা, মনের ভেতর কষ্ট পায়
দু’জন মিলে ভাবল বসে, এবারে কী করা যায়?
কোষাগারের সোনা রুপো, দিলেন দু’জন উজাড় করে
তুতু-ভুতু ফের খেলবে, রত্নসাঁকো দেবেন গড়ে।
আর দেরি নয় এত্তটুকু, যেমন ভাবা তেমনি কাজ
গড়ল সেতু চোখজুড়োনো, রুপোর অঙ্গ সোনার সাজ।
দলে দলে মানুষ এল, দেখতে আজব সেতু
বসল লেঠেল চৌকিদার, পাহারা দেওয়ার হেতু।
রাতের বেলায় ঢুলল কষে, রাজার একশ পাহারাদার
চোর ডাকাতে ভাঙল সেতু, সোনা নিয়ে পগারপার!
মাথায় হাত পড়ল সবার, দুই রাজা আর গ্রামের লোক
তুতু-ভুতু বুদ্ধি দিল, বর্ষারাণীর যজ্ঞ হোক।
শুনে সবার প্রার্থনা, হলেন তুষ্ট বর্ষারাণী
তুতু-ভুতুর কাতর ডাকে, দিলেন তিনি অভয়বাণী।
নদীর পাড়ের গাছগুলো সব, লকলকিয়ে বাড়ে
দুকূল থেকে ডালপালা মেলে, বিশাল সেতু গড়ে।
দুইপাড়ের যত গাছের সারি, জুড়ে বানায় সাঁকো
হাজার জল আর ঝড়ে, মোটেও টলবে নাকো।
আনন্দেতে আটখানা হয়, তুতু-ভুতু আর সবাই
পাগলাঝোরাই দুই পারেতে, খুশির বসত সদাই।
(‘লন্ডন ব্রিজ ইজ ফলিং ডাউন’-ছড়াটি থেকে অনুপ্রাণিত।)

No comments:
Post a Comment