২৫শে জানুয়ারি,২০১৯-এর ‘আনন্দবাজার স্কুলে’ প্রকাশিত
🔹🔹কড়াইশুঁটির কচুরি🔹🔹
🔹🔹সুস্মিতা কুণ্ডু🔹🔹
॥১॥
ছোটো ছোটো আঙুলগুলো দিয়ে কড়াইশুঁটির খোসাটা ছাড়াতে থাকে কুট্টুস। বিদিশা পায়েসের পাত্রে হাতাটা ঘোরাতে ঘোরাতে নজর করে ছেলেকে। উল্টোদিক দিয়ে খোসাগুলো ছাড়াচ্ছে ছেলেটা। কড়াইশুঁটি পেছনের সরু দিকটায় চাপ দিলেই শুঁটিটা দু’ভাগ হয়ে ভেতরের গোল গোল সবুজ সবুজ কড়াইগুলো বেরিয়ে আসে ঝপ করে। কিন্তু কুট্টুস নখে করে সামনের শক্ত শিরার মত দিকটা খুঁটে খুঁটে শুঁটিটা খুলছে। বিদিশা ওকে বলতে গিয়েও থেমে গেল। বেশ মজা লাগছে কচি কচি হাতের সবুজ সবুজ কড়াইশুঁটির সাথে কুস্তিটা। ফিক্ করে হাসিটা আঁচলে মুছে নিল, কুট্টুস দেখতে পেলেই ‘মা হাসছো কেন? ও মা হাসছো কেন?’ বলে অস্থির করে তুলবে। আর এখন ওর প্রশ্নের বন্যায় উত্তরের বাঁধ দিতে বসলে, হয়ে গেল পায়েস! পায়েস পুড়ে সরভাজা হয়ে যাবে।
কত রান্না বাকি এখনও! সবে আলুর দমটা হয়েছে। এখনও ছোলার ডাল, বেগুনভাজা, চাটনি হবে। কড়াইশুঁটিগুলো বেটে, তেল মশলা দিয়ে নেড়ে পুর বানাতে হবে, তবে তো কচুরি ভাজা হবে। ভেজানো ছোলার ডালটা প্রেসার কুকারে ঢেলে ঢাকনাটা বন্ধ করে গ্যাসের ওপর বসালো বিদিশা। আঁচটা একটু জোর করে দিলো। তাড়াতাড়ি গোটাচারেক সিটি দিয়ে নিতে হবে। একটু নারকেল কুঁচোতে হবে, নারকেল দেওয়া ছোলার ডাল কুট্টুসের খুব পছন্দের। বাকি কাজগুলো মাথার ভেতর একটার পর একটা সাজিয়ে নিতে লাগলো বিদিশা। এমন সময় হাঁটুর কাছে একটা গোঁত্তা লাগল। বিদিশা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে কুট্টুস হামাগুড়ি দিয়ে মায়ের পায়ের কাছে হাতড়াচ্ছে।
-“কী করছিস বাবু? কত কাজ পড়ে এখনও আমার! আর তুই এখন হামাগুড়ি দিচ্ছিস কেন কুট্টুসোনা?”
-“মা তুমি একটু সরো তো দেখি, একটা কড়াইশুঁটি গড়গড়িয়ে এইদিকে গড়িয়ে চলে এল। আমি একটু খুঁজে বার করি তো!”
-“ওহ্ হো! একটাই কড়াইশুঁটি তো! থাক না বাবা ওটা। তুই অন্যগুলো ততক্ষণ ছাড়া দেখি সোনা।”
॥২॥
কুট্টুস ফের কড়াইশুঁটির ডাঁইয়ের কাছে ফেরত গিয়ে, ছাড়াতে শুরু করল। বড় জামবাটিটা একটু একটু করে ভরে উঠছে কড়াইশুঁটিতে। এমন সময়ে মালতী এসে ঢুকলো রান্নাঘরে। ঢুকেই হাঁ হাঁ করে উঠল,
-“ও কী বোদিমণি তুমি এত সক্কাল সক্কাল এত রান্না করচ ক্যানো গো? কেউ আসবে নাকি গো বাড়িতে? আমায় কই কাল কিচু বললেনি? আমি তাহলে আগে আগে এসে হাত লাগাতুম। আর ও কী! কুটুবাবু তুমি কড়াই ছাড়াচ্চো ক্যানো? যাও যাও পোড়তে বোসো! কী সব কাণ্ড! মালতী কি মরে গেছে নাকি? অ বৌদিমণি, কুটুবাবুকে যেতে বলো দিকি পড়ার ঘরে।”
বিদিশা পায়েসটা নামিয়ে, কড়াটা চাপায় বেগুনভাজার জন্য।
-“মালতী, তোর কুটুবাবু আজ রান্নাঘর থেকে নড়বেনা, বুঝলি!”
কুট্টুস কড়াইশুঁটি ছাড়ানো থামিয়ে, মালতীকে ঠেলতে ঠেলতে রান্নাঘর থেকে বার করে ড্রয়িংরুমের দিকে নিয়ে চলল।
-“তুমি আজ রান্নাঘরে কিছুতেই আসবেনা!
বাবাই ও বাবাই! মাতলীপিপিকে টি.ভি.-টা চালিয়ে দাও তো।
মাতলীপিপি তুমি সোফা থেকে নড়বে না।”
কুট্টুস ছোটোবেলা থেকেই মালতীপিসি বলতে পারে না, বলে মাতলীপিপি। ওর ঠ্যালা খেয়ে মালতী সোফার সামনে মেঝেতে হাঁটু মুড়ে বসল।
-“ও দাদাবাবু! কুটুবাবুর কী হোলো বলো দিকিনি? আমায় এই সাতসক্কালে টিভি দেকতে বস্সে দিল। কতো কাজ পড়ে রয়েচে সোমসারের! বোদিমণি একা একা কত খাটচে!”
প্রমিত হেসে বলে,
-“কুটুবাবুকে সেই জন্ম থেকে বড় করছিস এখনও চিনলিনা মালতী! একবার ওর মাথায় কিছু ঢুকলে যতক্ষণ না সেটা করছে, ও ভবী ভোলবার নয়। তুই মিছে বাধা না দিয়ে ও যা বলছে তাই কর দিকিনি। আমি বরং একবার মোড়ের মাথার মিও আমোরে থেকে ঘুরে আসছি।”
-“দাদাবাবু ওই কেক-প্যাসটির দোকানটা তো? কী আনতে হবে আমায় বলো, তুমি ছুটির দিনে কেন আবার শুদুমুদু বেরোবে? ওই বাদামী রঙের প্যাসটি আনব তো? গেল রোববার কুটুবাবুর জন্মদিনে সব্বাই চেটেপুটে কেক খেয়েচিল। বাদামী প্যাসটিগুলো চকলেট দিয়ে বানায় না গো দাদাবাবু? ওইজন্য অত্ত ভালো খেতে। তবে দাদাবাবু কুটুকে বেশি চকলেট খেতে দিউনি, দাঁতের যন্তন্না হবে, পোকা হয়ে দাঁত ক্ষইবে। আর কুটুবাবুকে একটু বোকো তো, চকলেট খেয়ে মোট্টে দাঁত মাজতে চায়নে। বোদিমণি আর আমি তো বলে বলে সারা! যদি তোমার কথা শোনে তবু!”
-“মালতী তোকে কতবার বলেছি প্যাসটি নয়, পেস্ট্রি! আর কুট্টুস তোর কথা যদি না শোনে তবে আর কারোর কথাই শুনবেনা। এখন যা তোর বৌদিমণির কাছ থেকে একটা বড় ব্যাগ এনে দে দেখি! আমি বেরোই।”
॥৩॥
রান্নাঘর থেকে বিদিশার কানে আসে ওদের গলা, মনে মনে হাসে। আজকের দিনটার প্ল্যানিং যে গত রোববার কুট্টুসের জন্মদিনের দিন রাত্রেই হয়ে গেছে, তা তো আর মালতী জানেনা। জানলে হাঁ হাঁ করে মানা করত তখনই। সেদিন জন্মদিনের উৎসব মিটতে রাত্রে মা বাবার মাঝে শুয়ে শুয়ে কুট্টুস জিজ্ঞাসা করছিল,
-“মা তোমার জন্মদিন গরমকালে হয়, আমার তখন ইস্কুল ছুটি থাকে। বাবার জন্মদিন হয় পুজোর ছুটির সময়। আচ্ছা বিল্টুদাদার জন্মদিনও পুজোর ছুটিতেই হয় তাইনা? আর সেই পুচকি বোনুটার? মনে পড়েছে, বড়দিনের দিন। আচ্ছা বাবা আমাদের মাতলীপিপির কবে জন্মদিন?”
সেই প্রশ্নের উত্তরে বিদিশা বা প্রতীম কেউই দিয়ে উঠতে পারেননি।
পরেরদিন সকালে কুট্টুস জিজ্ঞাসা করেছিল মালতীকে,
-“ও মাতলীপিপি তোমার কবে জন্মদিন গো?”
মালতী ঘর মুছতে মুছতে প্রথমে বেখেয়ালে উত্তর দিয়েছিল,
-“অ কুটুবাবু! কালই তো তোমার হেপি বাথডেট হল! কত বন্ধু এল, প্যাসটি এল, ফেলায়েড রাইস, চিল্লি চিকেন। আর সব ভুলে গেলে?”
-“আরে না গো না! আমার না। তোমার জন্মদিন কবে?”
-“আমার? আমার আবার জন্মদিন কী গো! ওই কেলাবের ছেলেগুলো ভোটার কার্ডে কী সব তুলে দিল যেন। বর্ষাকালের দিন একটা, শাবন না ভাদরো মাসের। এদিকে ছোটোবেলায় মা জন্মমাস ধরত তখন ঠাণ্ডার দিনে। কোনটে যে ঠিক, কেজানে। বড়বাবার থানে পুজো দিয়ে মা কপালে একটা সিঁদুরের টিপ লাগ্গে দিত, ব্যাস হয়ে গেল জন্মদিন। তবে জানো কুটুবাবু, যে বছর মা মরে গেল, সে বছরই মা আমায় জন্মদিনে কড়াইশুঁটির কচুরি, নতুন আলুর দম আর নলেন গুড়ের পায়েস করে খাইয়েছিল। কার বাড়ি থেকে চেয়েচিন্তে জুটিয়েছিল কিজানি বুড়ি। বুইতে পেরেছিল মনে হয়, সেটাই শেষ বছর।”
মাতলীপিপির চোখের কোলের চিকচিকটা নজর এড়ায়নি কুট্টুসের। অনেক কথা যা বড়রা বোঝেনা, ছোটোদের মনে তা খুব সহজে গেঁথে যায়।
তারপর থেকেই সারা হপ্তা জুড়ে কুট্টুস তার মাতলীপিপির জন্মদিনের প্রস্তুতি নিয়েছে। আগামী রোববার জন্মদিন পালন হবে। বিদিশা আর প্রতিমও কুট্টুসের প্রস্তাবে মন প্রাণ ঢেলে সাড়া দিয়েছে। কুট্টুস হওয়ার কিছুদিন পরেই যখন খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিল বিদিশা তখন এই মালতীই তো রাতের পর রাত জেগে বুকে করে মানুষ করেছে কুট্টুসকে। আজ যেটা কুট্টুস ভেবেছে সেটা প্রতিমদেরই ভাবার কথা ছিল। কিন্তু নিয়মের মাইনের বাইরে পুজোর শাড়ি আর বোনাস ছাড়া কীই ভেবে উঠতে পারে বড়রা!
॥৪॥
সামনে টিভি চললেও মালতীর মনে অন্য চিন্তাগুলো ঘুরপাক খেতে থাকে। বোদিমণি যে কী করছে রান্নাঘরে তখন থেকে, মালতীকে ঢুকতেও দেয়নি। দাদাবাবুও দোকান যেতে দিল না। মনটা কেমন লাগছে, মালতী কিছু কাজে ভুল করেনি তো? ওকে ছাড়িয়ে দেবে না তো? কাজ হয়ত অন্য বাড়িতে পেয়ে যাবে কিন্তু কুটুবাবুকে না দেখে কীকরে থাকবে মালতী! চোখদুটোয় জল ভরে আসে মালতীর।
-“অ্যাই মালতী এই কাপড়টা ধর আর ও’ঘরে গিয়ে বদলে আয় দিকি। সকালে চান করে এসেছিস মনে হচ্ছে তো, চুল ভিজে এখনও। আর তাহলে চানের দরকার নেই, নতুন কাপড়টা পরে ঠাকুরঘরে একটা প্রণাম ঠুকে আয়।”
মালতী টিভি থেকে চোখ সরিয়ে, অবাক হয়ে বিদিশার বাড়িয়ে ধরা হাতের হলুদ তাঁতের শাড়িটার দিকে তাকায়।
-“অ বোদিমণি! এসব কী গো? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছিনে গো!”
প্রমিত বেশ খানিকক্ষণ আগেই দোকান থেকে ঘুরে এসেছেন। বললেন,
-“তোমার আর বুঝে কাজ নেই! যা বলছে বৌদি তাই করো।”
কাপড় বদলে, ঠাকুরঘরে প্রণাম সেরে এসে মালতি দেখে ডাইনিং টেবলের ওপর একটা বাদামী চকলেট কেক সাজানো। তাতে গোঁজা একটা মোমবাতি জ্বলছে। পাশে কাঁসার থালা বাটিতে ফুলকো ফুলকো কড়াইশুঁটির কচুরী, নতুন আলুর দম আর সোনারঙের নলেন গুড়ের পায়েস।
একগাল হেসে হাততালি দিয়ে তার আদরের কুটুবাবু গাইছে,
-“হ্যাপ্পি বার্থ ডে টু ইউ, হ্যাপ্পি বার্থ ডে টু ইউ, হ্যাপ্পি বার্থ ডে ডিয়ার মাতলীপিপি, হ্যাপ্পি বার্থ ডে টু ইউ!”
দাদাবাবু আর বোদিমণিও হাততালি দিচ্ছে।
মালতীর চোখটা যে কেন আবার ঝাপসা হয়ে আসে!
(সমাপ্ত)

No comments:
Post a Comment