সুস্মিতা কুণ্ডু
ছুট ছুট ছুট! ডাইনে বাঁয়ে কোনওদিকে না চেয়ে গোল্ডিলকস সোজা দৌড় দিল বাড়ির দিকে। জঙ্গলের মাঝের সরু পথে বিছিয়ে থাকা শুকনো হলুদ কমলা লাল বাদামী পাতা মুড়মুড়িয়ে ভাঙতে লাগল পায়ের চাপে। সেই আওয়াজে গোল্ডিলকসের আরও বুক ধড়ফড় করে উঠল। ভালুকরা কি পিছু নিল! নেবে না-ই বা কেন। তুমি যদি না বলে না কয়ে তাদের ঘরে ঢুকে পড়ো, যদি তাদের রাতের ডিনারের সবটুকু পোরিজ গপাগপ খেয়ে ফেলো তাদের রাগ হবে না বুঝি? শুধু কি তাই? ভালুকছানার অমন সুন্দর ছোট্ট কাঠের চেয়ারটাও তো ভেঙে ফেলেছে ও। এরপর ওরা যদি গোল্ডিলকসকে ধরে শাস্তি দেয় ওদের দোষটা কোথায়?
শাস্তির নামে গলা শুকিয়ে আসে গোল্ডিলকসের। নাগালে পেলে কী শাস্তি দেবে ভালুক বাবা মা? বাড়িতে দুষ্টুমি করলে গোল্ডির বাবা আর মা গোল্ডির সঙ্গে কথা বলাই বন্ধ করে দেয়। আদরও করে না যতক্ষণ না ও নিজের দোষটা শুধরে নেয়! ভালুক মা বাবারা কেমন সাজা দেয় কে জানে তাদের ছানাদের। দৌড়তে দৌড়তেই সাত পাঁচ চিন্তা ভিড় করে মাথায়।
আরও জোরে পা চালায় গোল্ডি। ওই তো জঙ্গলের প্রান্তে দেখা যাচ্ছে ওদের গ্রাম। উইলো গাছের তলায় গোল্ডিদের ছোট্ট বাড়ির ঢালু ছাদের গায়ের চিমনি দিয়ে অল্প অল্প ধোঁয়া বেরোচ্ছে। সাদা বেড়ার গায়ে ফুটে আছে কমলারঙা ক্রিসানথিমাম। বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নেমে আসছে প্রায়। ভাগ্যিস বন থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে! একবার যদি অন্ধকার ঘনিয়ে আসত নির্ঘাৎ পথ হারাত। কিন্তু মা কি এখনও জানতে পারেনি যে গোল্ডি সেই কোন দুপুরে ঘুমন্ত মায়ের পাশটি থেকে উঠে গিয়ে পা টিপে টিপে দরজা খুলে ভোঁকাট্টা হয়ে গেছে!
আজ মনে হয় গোল্ডির লাকি ডে। ওই তো চিমনির ধোঁয়ায় সওয়ার হয়ে কেক বেক হওয়ার মিষ্টিমধুর গাঢ় গন্ধটা নাকে আসছে গোল্ডির। গোল্ডি ছোটা থামিয়ে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে একটু দম নেয়। বুকটা হাপরের মত ওঠানামা করছে। সোনালী চুলের গোছা কপালের ঘামে লেপ্টে গেছে। পরণের হলুদের ওপর লাল পোলকা ডটওয়ালা জামাটাতে বাদামী কাদারও গুটিকয় পোলকা ডট মিশে গেছে। সে যাই হোক, এবার নিশ্চিন্তি! জঙ্গলের সীমানা ছাড়িয়ে এসে গাঁয়ের চৌহদ্দীতে ঢুকে পড়েছে। ভালুকরা আর চাইলেও গোল্ডিলকসের টিকিটিরও নাগাল পাবে না।
ধীরে ধীরে বাড়ির সামনের প্যাশিওতে দাঁড়িয়ে ফ্রকটা ঝেড়েঝুড়ে সাধ্যমত পরিষ্কার করে নিয়ে দরজাটায় ঠেলা দেয় গোল্ডি। অল্প মাথা গলিয়ে উঁকি দিয়ে দেখে মা ফায়ারপ্লেসে একটা লোহার পোকার দিয়ে আগুনটা উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছে। বাবা ওভেন থেকে গরম কেকের ট্রে বার করে আনছে হাতে মোটা দস্তানা গলিয়ে। তার মানে বাবা মা বুঝতে পারেনি যে গোল্ডি জঙ্গলে গিয়েছিল। গোল্ডিকে দরজা দিয়ে ঢুকতে দেখে মা একটা ভুরু কুঁচকে বললে,
-“গোল্ডি আমি কতবার বলেছি না তোকে সন্ধে নামার আগে ঘরে ফিরবি।”
গোল্ডিদের বাড়িটা গ্রামের এক্কেবারে শেষপ্রান্তে বনের কিনারায়, তাই মা বাবা সবসময়ই ওকে সতর্ক করে যেন ভুল করেও না যায় সেদিকপানে। বজ্জাত নেকড়েটার গল্প শোনায়। সেই একবার পাশের গাঁয়ের একটা ছোট্ট মেয়ে যাচ্ছিল তার গ্র্যানির বাড়ি, জঙ্গলের পথ ধরে। গ্র্যানির শরীরটা খারাপ ছিল কিনা, তাই নাতনি যাচ্ছিল ফলমূল নিয়ে দেখা করতে। একটা শয়তান নেকড়ে কী জ্বালাতন-পোড়াতনই না করল বেচারিকে। গোল্ডি চোখ বড়বড় করে নেকড়ের গল্প এক কান দিয়ে শোনে আর অন্য কান দিয়ে বার করে দেয়। বাবামায়ের বারণ শোনার মত শান্ত মানুষ কিনা গোল্ডি!
বাবা তো সেই সকালে গ্রামের হাটে যায় ফুল সব্জি বিক্রি করতে। আর মা সারাদিনের কাজ সেরে দুপুরে দুই চোখের পাতা এক করলেই গোল্ডি টইটই করে ঘুরে বেড়ায় বনের ধারে ধারে। তবে কোনওদিনই খুব বেশি ভেতরপানে যায় না যতটা আজ চলে দিয়েছিল। একটা প্রজাপতির পেছু পেছু বেশ খানিকটা ধাওয়া করে গিয়েই দূর থেকে চোখে পড়েছিল ভালুকদের ছবির মত বাড়িটা। বনের ভেতর এমন সুন্দর বাড়ি কাদের, সেই কৌতূহলের বশেই তো ঢুকে পড়েছিল! তারপর কী কাণ্ড কী কাণ্ড!
মায়ের গলা শুনে নিশ্চিন্ত হয় গোল্ডি ছুট্টে ঢুকে আসে ঘরের ভেতর। সোজা গিয়ে টেবিলে বাবার নামিয়ে রাখা ট্রের কাপকেকগুলোর গন্ধ নেয়। মা বলে ওঠে,
-“ইস সারা দুপুর বিকেল টো টো করে ঘুরে ওই নোংরা হাতে মোটেই খাবে না কিন্তু গোল্ডি। যাও আগে হাত পা ধুয়ে এসো!”
বাবা মুচকি হেসে কেকের একটা কোণ ভেঙে ফুঁ দিয়ে ঠাণ্ডা করে গোল্ডির মুখে দিয়ে দেয়, মায়ের চোখ বাঁচিয়ে। গোল্ডিও একগাল হেসে ছোটে চানঘরের দিকে। খুব বাঁচা বেঁচেছে! ভালুকদের হাত থেকেও আবার মা বাবার কাছে ধরা পড়ে বকুনি খাওয়ার ভয় থেকেও।
সারা সন্ধে একদম লক্ষ্মী মেয়ে হয়ে থাকে গোল্ডি। চুপটি করে হাতের লেখা করে নেয়, নিজের সব খেলনাপাতি গুছিয়ে তুলে রাখে, ডিনারের আগে টেবিলে প্লেট চামচ ছুরি কাঁটা নিজের হাতে সাজায়। বাবা মা তো অবাক! হল কী মেয়ের? যাকগে যা হয় ভালোর জন্যই হয়। বেশি জিগ্গেস করে কাজ নেইকো!
সবই ঠিক চলছিল শুধু কেক খেতে বসে গোল্ডির মনটা একটু খচখচ করতে লাগল। আহা রে! ভালুকছানাটার পোরিজটা যে সবটা গোল্ডি খেয়ে নিল, ওর ছোট্ট চেয়ারটা ভেঙে ফেলল, ছানাটার নিশ্চয়ই খুব মন খারাপ হয়েছে। যতই ভালুক হোক আসলে তো ছোট্ট একটা প্রাণী গোল্ডিরই মত। এই ধরো না কেন কেউ যদি গোল্ডির ভাগের কেকটা খেয়ে নেয় তাহলে কি ওর কষ্ট হবে না? কিংবা ধরো ওর বাবার নিজের হাতে বানিয়ে দেওয়া লিন্ডেন কাঠের মাত্রোস্কা পুতুলগুলো যদি ভেঙে যায় তাহলে কি গোল্ডি হাত পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসবে না?
ভালুকছানারও হয়ত ক্ষিদের চোটে পেট কনকন করছে। প্রিয় চেয়ারটার দুঃখে মন খারাপ করছে। বাবা মা গোল্ডিকে বিছানায় শুইয়ে, পশমের কমফর্টারটা গায়ের চারপাশে গুঁজে দিয়ে, কপালে আলতো চুমু দিয়ে চলে যায় শুতে। এদিকে গোল্ডির কিছুতেই ঘুম নামেনা চোখে। মাথার কাছের জানলাটার শার্সি চুঁইয়ে আধখানা চাঁদের আলো এসে সাদা ফরাসের মত বিছিয়েছে ঘরের মেঝেয়। একটু একটু করে সাদা আলো সরতে সরতে গোল্ডির কাঠের পুতুলগুলোর ওপর। তিনখানা বড় থেকে ছোটো আকারের পুতুল। একটার পেটের ভেতের আরেকটা ঢুকিয়ে রাখা থাকে। প্যাঁচ ঘুরিয়ে খুললেই
একটার পর একটা বেরিয়ে আসে। এমনিতে মাত্রোস্কা পুতুলে মা পুতুলের পেটের ভেতরে ছানা পুতুল থাকে। কিন্তু বাবার বানিয়ে দেওয়া গোল্ডির স্পেশাল পুতুলে আছে তিনটে পুতুল। একটা বাবা পুতুল, একটা মা পুতুল আর একটা ছানা পুতুল। পুতুল তিনটেকে দেখে গোল্ডির খুব করে মনে পড়ে ভালুক পরিবারটার কথা।
আচ্ছা গোল্ডি খামোকাই ওদের ভুল বুঝে ভয় পেলো না তো? ওকে ছোট্ট বিছানাটায় ঘুমোতে দেখে ছানা ভালুকটা চেঁচিয়ে উঠেছিল বটে কিন্তু কই ভালুক মা বাবা তো গোল্ডিকে ধরতে আসেনি। দেখতে গেলে গোল্ডি বেশ ভালোরকম উৎপাত করেছে ওদের বাড়িতে। ওদের পোরিজ খেয়ে নিয়েছে, চেয়ার ভেঙে ফেলেছে, পরিপাটি করে পাতা বিছানা ঘেঁটেঘুঁটে একশা করে দিয়েছে। ভালুক পরিবার ঘরে ফিরে এমন দশা থেকে হতভম্ব হয়ে একটু চিৎকার চেঁচামেচি তো করবেই! সেটাই স্বাভাবিক। আর সেই শুনে গোল্ডি ভাবল ওরা বুঝি রেগে গিয়ে মারধোর করতে আসছে গোল্ডিকে। তখনই বিছানা থেকে লাফিয়ে নেমে দিল ছুট। ভালুকরা নিশ্চয়ই ওকে তাড়া করেনি, কারণ তাড়া করলে গোল্ডির মত ছোট্ট মেয়েকে ধরতে কতক্ষণই বা লাগত।
গোল্ডির অস্বস্তিতে সারা রাত ভালো করে ঘুম আসতে চায় না। একটিবার যাও বা ঘুম আসে, ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখে একটা ভালুকছানা ঝরঝর করে কাঁদছে। ওমনি গোল্ডিরও ঘুম ভেঙে যায়। আর বাকি রাতটুকু ঘুম আসে না বরং একটা বুদ্ধি আসে মাথায়।
মেঝেয় পাতা দুধসাদা চাঁদনীফরাস ভোর হতে বদলে গিয়ে যেই হলদেরঙা রোদগালচের রূপ নিল গোল্ডি ওমনি তড়বড়িয়ে বিছানা ছেড়ে উঠল। অ্যাটিকে রাখা পুরনো সিন্দুক ঘেঁটে এটা বার করে, কখন আবার বেসমেন্টে হাঁটকে ওটা টেনে আনে। বাবা তো সক্কালবেলায় গেল গ্রামের বাজারে নানা জিনিস বেচাকেনা করতে। মা-ও সব কাজকর্ম সেরে গোল্ডিকে দুপুরে স্যুপ আর ব্রেড খেতে দিল। তারপর সূর্য যখন একটু এলিয়ে পড়ল উইলো গাছের মাথা থেকে তখন মা একটু গড়িয়ে নিতে গেল বিছানায়।
যেই না মা ঘুমলো ওমনি গোল্ডিও উঠে তার পিকনিক বাস্কেটটি নিয়ে দৌড় লাগাল সোওওজা বনের দিকে। বেশ খানিকটা ভেতরে গিয়ে চোখে পড়ল সেই সুন্দর ছোট্টমত বাড়িটা। লাল টুকটুক দরজায় ঝুলছে পাইন কোন দিয়ে বানানো গোলাকৃতি তোড়া। ধীরে ধীরে দরজাটা খুলে ভেতরে পা রাখল গোল্ডিলকস। কেউ নেই ঘরের ভেতর। শুধু সেই টেবিলটা আছে, যেটার ওপর আগের দিন পোরিজের বাটিগুলো ছিল। আর আছে দুটো চেয়ার। সেই ছোটো চেয়ারটা যেটা গোল্ডি ভেঙে ফেলেছিল বসতে গিয়ে সেটা আর নেই। ও মৃদু গলাখাঁকারি দিয়ে ডাকল,
-“কেউ আছো? আমি গোল্ডিলকস। কাল আমিই এসেছিলুম তোমাদের বাড়ি। একবারটি আসবে তোমরা? আমি দু’টো কথা কয়েই চলে যাব। কথা দিচ্ছি, কিচ্ছুটি ভাঙব না, নষ্ট করব না।”
গোল্ডির গলার আওয়াজে একটু পরেই ভেতরের একটা ঘর থেকে বেরিয়ে এল ভালুক মা। গোল্ডিকে দেখেই তো সে বড় বড় চোখে চেয়ে রইল। সেই মেয়েটা না! আগেরদিন যে পোরিজ খেয়ে নিয়েছিল, খোকনের পছন্দের রকিং চেয়ারটা ভেঙে ফেলেছিল। কাল সারা সন্ধে, সারা রাত বেচারা কান্নাকাটি করেছে। বহুকষ্টে আজ দুপুরে গান গেয়ে ঘুম পাড়িয়েছে ভালুক মা। তাও কি আর সহজে ঘুমোয়!
কত বুঝিয়ে শেষমেষ ভালুক বাবা ছানাকে কথা দিল যে রকিং চেয়ারখানা আবার সারিয়ে দেবে, তবেই ছানা ঘুমলো। ভালুক বাবা তাই বনের গভীরে গেছে চেয়ারটা জোড়ার কাঠ আনতে। কিন্তু এই সোনালীরঙা চুলওয়ালা মেয়েটা কেন এসেছে আবার?
গোল্ডিরও সামনে অত্তবড় ভালুক মা-কে দেখে একটু যে ভয়ভয় করছিল না তা নয় তবুও সাহস রেখে নরম সুরে বললে,
-“ভালুক মা, আমার নাম গোল্ডিলকস। কাল আমি ভারি অন্যায় করেছি। না বলে তোমাদের বাড়িতে ঢুকেছি। পোরিজ খেয়ে নিয়েছি, চেয়ারও ভেঙে ফেলেছি। কিন্তু পরে বাড়ি গিয়ে আমার খুউউব খারাপ লেগেছে। তাই তো আজ এলাম তোমাদের সঙ্গে দেখা করে ক্ষমা চাইতে।”
ভালুক মা একটু নিশ্চিন্ত হয় মেয়েটার কথা শুনে। বলে,
-“কাল তুমি অমন করে ছুটে পালালে কেন বাছা? আমরা তো তোমার কোনও ক্ষতি করিনি, ভয়ও দেখাইনি।”
গোল্ডি বলল,
-“আসলে আমি তো জানতাম না এটা তোমাদের বাড়ি। ঘুম ভেঙে চোখের সামনে তোমাদের দেখে তাই ভয় পেয়ে ছুটে পালিয়ে এসেছিলাম। সেটা মোটেই ঠিক কাজ হয়নি। যারা এমন সুন্দর গোছানো বাড়িতে থাকে তারা যে ভালো মানুষ... মানে ভালো ভালুক হবে সেটা আমি তখন বুঝতে পারিনি। তাই তো আজ আবার ফিরে এলাম। তোমাদের জন্য উপহারও এনেছি অল্প।”
এই বলে হাতের পিকনিক বাস্কেটটা খোলে গোল্ডিলকস। তার ভেতর থেকে বেরোয় কাগজে মোড়া বেশ ক’টা কাপকেক।
ভালুক মা আর গোল্ডির কথার মাঝে কখন যেন ভালুকছানাও ঘুম ভেঙে টুকটুক করে বাইরে চলে এসেছে। মায়ের আড়াল থেকে ঢুলুঢুলু চোখ মেলে গোল্ডিকে দেখে আরেকটা হলেই চিৎকার করতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই ভালুকছানার চোখ পড়ে গেল গোল্ডির হাতের কাপকেকগুলোর দিকে। গোল্ডির দিকে কাঁচুমাঁচু মুখে চাইল ভালুকছানা। তারপর মায়ের দিকে চেয়ে বললে,
-“মা, সেই মেয়েটা!”
ভালুক মা একটু হেসে ছানাকে বলে,
-“ও হল গোল্ডিলকস। মানুষদের খুকি। কাল ভয় পেয়ে চলে গিয়েছিল তো, তাই আজ এসেছে আমাদের সঙ্গে আলাপ করতে। তোর জন্য কী এনেছে দেখ।”
ভালুকছানা তো কেক দেখে হাততালি দিয়ে লাফিয়ে নেচে ওঠে। গোল্ডির দিকে চেয়ে বলে,
-“এইগুলো আমার জন্য?”
গোল্ডি কাপকেকগুলো ভালুকছানার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে,
-“কী এবার আমায় মাফ করবে তো?”
ভালুকছানা ঘাড় নেড়ে শিগগির খপ করে একটা গোটা কাপকেক মুখে পোরে। গোল্ডি এবার পিকনিক বাস্কেট থেকে বার করে একটা মাত্রোস্কা পুতুল। মোচড় দিয়ে পেটটা ঘুরিয়ে খুলতে বেরোয় আরেকটা পুতুল, সেটাকে খুলতে বেরোয় আরেকটা। ভালুকছানা তো কেক খাওয়া থামিয়ে পুতুলগুলো দেখতে থাকে। গোল্ডি বলে,
-“আমি তোমার চেয়ার তো সারাতে পারব না, কিন্তু এই পুতুলগুলো তোমায় খেলতে দিলাম। আমার বাবা নিজের হাতে আমার জন্য বানিয়ে দিয়েছিল।”
এতক্ষণে ভালুক মা বলে ওঠে,
-“না না সোনা! তোমার এত আদরের খেলনা ওকে দিয়ে দিলে তোমার কষ্ট হবে তো! আসলে তুমিও তো ছোট্ট মেয়েটি। তোমারও কোনও দোষ নেই। আমরাও আসলে মানুষদের একটু ভয়ই পাই। তাই দূরে দূরে থাকি। সেদিন তাই তোমায় দেখে অমন চমকে গিয়েছিলুম।”
ভালুক মায়ের কথা শুনে গোল্ডি তো অবাক। মানুষ ভালুকদের ভয় পায়, আবার ভালুকরাও কিনা মানুষদের ভয় পায়। বোঝো কাণ্ডটা! গোল্ডি বলে,
-“না না আমি তো পুতুলগুলো ওর জন্যই এনেছি। আজ থেকে আমরা তাহলে সব কষ্ট ভয় ভুলে গিয়ে ভালো বন্ধু হলাম, কেমন?”
এমন সময় কাঠের বোঝা কাঁধে নিয়ে ভালুক বাবা এসে ঢুকল ঘরে। ভালুকছানা ওমনি গালভর্তি কেক নিয়ে ছুট্টে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে বলল,
-“বাবা ও গোল্ডি! আমার নতুন বন্ধু!”
ভালুকবাবাকে দেখে গোল্ডি একটু ভয়ই পায়। বিশাল বড় চেহারার, বাদামী লোমওয়ালা প্রাণীকে দেখে ওর মত ছোট্ট মেয়ের একটু তো ভয় পাবেই। কিন্তু ভালুকমা শিগগির সামনে এসে ভালুকবাবাকে সবটা বুঝিয়ে বলে।
ভালুক বাবা তো তখন হো হো করে এমন জোরে হেসে উঠল যে বাড়ির দরজা জানালাগুলোও থরথরিয়ে কেঁপে উঠল। গোল্ডিলকসের বাবাও ঠিক এমনটা করেই হাসে। কই গোল্ডির তো আর একটুও ভয় করছে না। সে বলে,
-“আমি খামোকাই কত ভয় পেলাম কাল তোমাদের!”
ভালুক বাবা হাসিহাসি মুখে বলে,
-“তাতে দোষের কিছু নেই গো খুকি! আসলে ভালো মন্দ তো সব জায়গাতেই আছে। তাই না? এই বনেই তো একটা নেকড়ে আছে। কী পাজী কী পাজী! তেমনি মানুষদের মধ্যেও অনেকে আছে যারা পশুদের ক্ষতি করে। মিলেমিশে থাকতে আর ক’জনায় পারে? তবে তোমার মত এমন ভালো যদি সব মানুষছানাই হয় তাহলে দুনিয়াটা কত সুন্দর হবে ভাবো দেখি!”
গোল্ডি মনে মনে ভাবে ভাগ্যিস সব ভয়কে জয় করে ফের বনে এল তাই তো ভালুকদের কথা জানতে পারল! সত্যিটা বুঝতে পারল।
তারপর সব ভুল বোঝাবুঝির পালা সাঙ্গ হতে কতই না খেলা করল গোল্ডিলকস ভালুকছানার সঙ্গে। অবশেষে বাড়ি ফেরার সময় ঘনিয়ে এলে ভালুক বাবা নিজে গোল্ডিকে পৌঁছে দিয়ে এল জঙ্গলের কিনারা অব্দি। ভালুক মাও অনেক করে গোল্ডিকে ফের আসতে বলেছে ওদের বাড়ি। পোরিজ রেঁধে খাওয়াবে। তবে হ্যাঁ! একটা শর্ত আছে। এবার আর বাবা মাকে লুকিয়ে জঙ্গলে আসা চলবে না কিন্তু গোল্ডির। বাবা মাকে সব সত্যিটা বলে, তাদের সঙ্গে নিয়ে আসতে হবে ভালুকদের বাড়ি।
(সমাপ্ত)

No comments:
Post a Comment