পিটার খরগোশের গপ্পো : বিয়েট্রিক্স পটার (অনুবাদ: সুস্মিতা কুণ্ডু)


পিটার খরগোশের গপ্পো

বিয়েট্রিক্স পটার 

(অনুবাদ: সুস্মিতা কুণ্ডু)


অনেক অনেক দিন আগে এক নদীর ধারে থাকত চার চারটে খরগোশের ছানা। নরম তুলোর বলের মত ফুরফুরে ছটপটে ছানাগুলো।   বালির চড়ার পাশে একটা বিশাল বড় ফার গাছের তলায় গর্ত খুঁড়ে বাসা বেঁধেছিল খরগোশ মা। সেই চারটে দুষ্টুমিষ্টি খরগোশছানার নাম কী ছিল জানো? ফ্লপসি, মপসি, কটন টেল আর সবচেয়ে দুষ্টুজনের নাম ছিল পিটার। 

 

একদিন সকালবেলা সূয্যিমামা উঠতে খরগোশ-মা মিসেস ব়্যাবিট তাঁর ছানাদের বললেন, 

-“বাছারা, চাঁদের টুকরো সোনারা আমার, 

আমার ক’টা কথা মন দিয়ে শোন। খেলতে বেরোলে পরে মাঠে যাস, হাটে যাস, পথে যাস, ঘাটে যাস কিন্তু ভুল করেও মিস্টার ম্যাকগ্রেগরের বাগানে যাসনেকো! উঁহু খবর্দার নয়! তোদের বাবা ওই বাগানে গিয়েই তো...”

চোখ ছলছল করে, গলা ধরে আসে খরগোশ মায়ের। রুমালের খুঁটটায় চোখ মুছে বলেন, 

-“তোরা বড় হচ্ছিস বাছারা, হেথাহোথা যেতে শিখেছিস। বিপদ তো চারিদিকে ওঁৎ পেতে বসে আছে। তাই তোদের সব কথা না জানিয়ে রাখলে পরে নিজেদের রক্ষা করবি কী করে! ওই মিস্টার ম্যাকগ্রেগরের বাগানেই তো আটকা পড়ল তোদের বাবা। আর মিসেস ম্যাকগ্রেগরের রান্নাঘরে প্রাণটা বেঘোরে শেষ হল।”


ফ্লপসি, মপসি, কটন-টেল আর পিটার গা ঘেঁষাঘেঁষি করে কাঁদোকাঁদো মুখে চেয়ে থাকে। 

নিজেকে সামলে নিয়ে খরগোশ মা বলেন, 

-“এবার বাছারা খেলতে যাও তোমরা। কিন্তু আমার কথাগুলো মনে থাকে যেন। একদম কোনও দুষ্টুমি নয়! আমি এবার একটু বাজারে বেরোবো। তোমরা লক্ষ্মী হয়ে থাকবে, কেমন?”

চারটে ছানা একযোগে ঘাড় হেলায়। 


খরগোশ মা এক হাতে একটা বেতের ঝুড়ি আর অন্য হাতে একটা ফুল ফুল ছাপ ছাতা নিয়ে চললেন বাজারে। জঙ্গলের পথ ধরে অনেকটা গিয়ে কেক পাঁউরুটির দোকান। দোকানে থরে থরে সাজানো নানারকম সুস্বাদু কেক, রঙচঙে কাপকেক, সাদা পাঁউরুটি, বাদামী পাঁউরুটি। সেই সবের মধ্যে থেকে মিসেস ব়্যাবিট কিনলেন বড়সড় একটা বাদামী পাঁউরুটির টুকরো আর কিশমিশ দেওয়া পাঁচখানা পাঁউরুটি। 


ওদিকে মা যখন দোকানে গেছে ফ্লপসি, মপসি আর কটন-টেল ভাবে ‘কী করা যায়!’। তিনজনই তো ভারি শান্তশিষ্ট খরগোশছানা। মায়ের কথা সবসময় শুনে চলে, অবাধ্য হয় না মোটেই। তাই ওরা ফলের ঝুড়ি নিয়ে গেল ব্ল্যাকবেরি তুলতে। 


কিন্তু পিটার! পিটার তো দুষ্টু শিরোমণি! সে মোটেই অন্য ভাইবোনদের মত শান্ত হয়ে ফল কুড়োতে গেল না। সোওওজা ছুট লাগালো মিস্টার ম্যাকগ্রেগরের বাগানে। যে জিনিসটা বড়রা বারণ করে সেইটে করতেই তার বেশি আগ্রহ। বাগানের বড় গেটটার তলা দিয়ে হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড় করে গলে গিয়ে ঢুকে পড়ল ভেতরে। 


মিস্টার ম্যাকগ্রেগরের সারা বাগান জুড়ে নানা রকম সব্জি ফলমূলের চাষ। পিটার বাগানে ঢুকেই প্রথমে কচমচিয়ে চিবিয়ে খেল চাট্টি সবুজ সবুজ কচি লেটুসপাতা। তারপর গেল ফ্রেঞ্চ বিনসের ছোটোছোটো গাছগুলোর দিকে। পটাপট পটাপট গোটাকতক লম্বা লম্বা পুরুষ্ট সবুজ বিন ছিঁড়ে নিয়ে মুখে পুরে চেবাতে শুরু করল। সেগুলো শেষ করে ইতিউতি চেয়ে দেখল একটু দূরে ঝুরঝুরে মাটির ভেতর থেকে সারি দিয়ে মাথা উঁচিয়ে রয়েছে ঝাড়ালো পাতাগুলো আর তাদের গোড়ায় উঁকি মারছে লাল টুকটুক মূলো। লাফিয়ে লাফিয়ে পিটার গেল সেদিক। মাটি খুঁড়ে ক’টা লাল লাল মূলো বার করে মনের সুখে উদরস্থ করল। 


এবার এই এত্তকিছু খেয়ে তো পেটে ব্যথা হওয়ারই কথা। পিটারেরও তাই হল। পেটের ভেতর যেন কেমন ভুটুরভাটুর হয়। হাওয়া ভরা গ্যাস বেলুনের মত ঢিপঢাপ করে। পিটারের মনে পড়ে যায় পেটব্যথা হলেই মা পার্সলে পাতা এনে চিবোতে দেয় চাট্টি। ম্যাজিকের মত সেরে যায় পিটার। তাই আর দেরি না করে পিটার বাগানে পার্সলে পাতা খুঁজতে লাগল। 


এদিক যায়, ওদিক যায়, সেদিক যায়। একটু দূরেই বাঁশের মাচায় ঝুলছিল লম্বা লম্বা শসা। সেই শসার মাচার আড়াল থেকে যেই না পিটার বেরলো তক্ষুনিই ঘটল বিপদ! সামনে ওটা কে! এ তো খোদ মিস্টার ম্যাকগ্রেগর। 


হাঁটু মুড়ে উবু হয়ে বসে একটা খুরপি দিয়ে মাটি খুঁড়ে বাঁধাকপির ছোট্ট চারা বসাচ্ছেন। যেই না মিস্টার ম্যাকগ্রেগর পিটারকে দেখতে পেলেন ওমনি লাফিয়ে উঠে তাড়া করলেন পিটারকে। একটা লোহার কাঁটা লাগানো ইয়াব্বড় পাতা সাফ করার লাঠি হাতে নিয়ে রে রে করে ছুটতে লাগলেন পিটারের পিছুপিছু। সেইসঙ্গে চিৎকার করতে লাগলেন,

-“ধর ধর ব্যাটা চোরকে!”


পিটারের তো ভয়ে আত্মারাম খাঁচাছাড়া হওয়ার জোগাড়। গোটা বাগানময় পাঁইপাঁই করে ছুটতে শুরু করল। ভয়ের চোটে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পিটার ভুলেই বসল কোন পথ দিয়ে সে বাগানে ঢুকেছিল। 


একপাটি জুতোই খুইয়ে বসল বাঁধাকপির ক্ষেতে। আরেকপাটি জুতো যে কোথায় গেল কে জানে! মনে হয় আলুর ক্ষেতেই সেটা ফেলেছে দৌড়তে গিয়ে। 


দু’পাটি জুতোই হারানোর পর পিটার করল কী চার হাতপায়ে ভর দিয়ে ছুট লাগাল, আরও জোরে, আরও জোরে। প্রায় বেরিয়েই গিয়েছিল মিস্টার ম্যাকগ্রেগরের নাগাল থেকে কিন্তু পিটার বেচারার কপালটাই খারাপ। পড়বি তো পড় সোজা একটা আমলকি গাছের চারপাশে লাগানো জালের মধ্যেই গিয়ে পড়ল পিটার। পিটারের পরণের জ্যাকেটের বড় বড় বোতামগুলো এইসান আটকে গেল জালের ফাঁকে যে কিছুতেই আর বেরোয় না। পিটারের সাধের সুন্দর পেতলের বোতামওয়ালা নীল জ্যাকেটখানা! প্রায় নতুনই আছে। সেই জ্যাকেটই কিনা এমন বিপদ ডাকল! 


পিটার খানিকক্ষণ নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে অবশেষে মনের দুঃখে হাল ছেড়ে দিল। চোখ দিয়ে বড় বড় জলের ফোঁটা উপচে গাল বেয়ে গড়াতে শুরু করল। কিন্তু ওর কান্না কেউই শুনল না, শুনল শুধু ক’টা চড়ুইপাখি। তারা অবিশ্যি ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ করে পিটারের চারদিকে উড়তে লাগল। বারবার ওকে বলতে লাগল আরেকটু জালটা ধরে টানাটানি করে নিজেকে ছাড়াতে। 


কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। মিস্টার ম্যাকগ্রেগর একটা বড় চালুনি নিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছেন। উদ্দেশ্যটা হল ওপর থেকে চালুনিটা চাপা দিয়ে পিটারকে বন্দী করা। কিন্তু পিটারও একবার মরিয়া হয়ে শেষ চেষ্টা করল। শরীরটাকে দুমড়ে মুচড়ে জ্যাকেটটা খুলে ফেলে রেখে কোনওমতে জালটা থেকে নিজেকে মুক্ত করে দৌড় লাগাল। উফ্! একদম ঠিক সময়ে পালিয়েছে। আরেকটু হলেই নইলে চালুনিচাপা পড়ছিল।  


জাল থেকে বেরিয়েই পিটার সোজা দৌড় লাগাল বাগানের কোণের ঢেয়োঢাকনার ঘরটার দিকে। বাগানে ব্যবহার করার রাজ্যের সরঞ্জাম যন্ত্রপাতি বোঝাই ঘরটায়। প্রথমেই পিটার লাফ মারল একটা গাছে জল দেওয়ার ঝারির ভেতর। জিনিসটা লুকনোর জন্য মন্দ জায়গা ছিল না কিন্তু নেহাতই জলে ভর্তি তাই বেশ অসুবিধেই হল পিটারের। 


মিস্টার ম্যাকগ্রেগর দিব্যি বুঝতে পারছিলেন যে পিটার ওই ঢেয়োঢাকনার ঘরেই লুকিয়েছে। হয়ত কোনও ফাঁকা ফুলের টবের তলায় ঢুকে বসে আছে। মিস্টার ম্যাকগ্রেগর একটা একটা করে সব টব উল্টে উল্টে খুঁজতে লাগলেন পিটারকে। 


এমন সময় সেই জলের ঝারির ভেতর থেকে পিটার জোরসে শব্দ করে হেঁচে ফেলল, 

-“আঁ আঁ আঁচ্ছুউউউহ্!”

ব্যাস! হয়ে গেল বিপদ। মিস্টার ম্যাকগ্রেগর টের পেয়েই ফের তাড়া করলেন পিটারকে সঙ্গে সঙ্গে। পায়ে করে পিটারকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করলেন। পিটারও কম যায় না। সহজে ধরা দেওয়ার মত শান্ত খরগোশই নয় সে। যেই না ধরতে যাওয়া ওমনি পিটার তুড়ুক করে লাফ দিল জানালা দিয়ে। তিন তিনটে টবের ফুলগাছের ঘাড় মটকে গেল পিটারের লাফের ঠ্যালায়। মিস্টার ম্যাকগ্রেগরও বেপরোয়া হয়ে পিছু নিতেন, নেহাতই জানালাটার আকারের তুলনায় মিষ্টার ম্যাকগ্রেগরের বপুটি অনেকটাই বড় আয়তনে তাই সে যাত্রায় পিটার রক্ষা পেল। এদিকে এতক্ষণ ধরে একটা ছটপটে খরগোশের পেছনে ছুটে ছুটে মিস্টার ম্যাকগ্রেগরও হা-ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। কাজেই পিটারকে কব্জা করার আশা ছেড়ে দিয়ে তিনি নিজের কাজেই ফিরে গেলেন। 


পিটার হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। দু-দণ্ডের জন্য বসল জিরেন নিতে। দমটা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে ছুটে ছুটে। থরথরিয়ে কাঁপছে গোটা শরীরটা। পিটারের বিন্দুমাত্র ধারণা নেই যে এবার কোন পথে গেলে এই বাগানের গোলকধাঁধা থেকে বেরোতে পারবে। গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মত আবার জলের ঝারির ভেতর লুকোতে গিয়ে ভিজেও গেছে সপসপিয়ে। 


কিছুটা সময় বিশ্রাম নেওয়ার পর পিটার ভাবল এভাবে বসে থাকলে তো আর পথ মিলবে না। তাই ধীরে ধীরে উঠে থুপুস থাপুস করে লাফিয়ে চারদিকটা দেখতে লাগল। 


একটু পরেই দেওয়ালের গায়ে একটা দরজা আবিষ্কার করল পিটার। কিন্তু দুঃখের বিষয় দরজাটায় তালা ঝোলানো। তলা দিয়ে যে গলে যাবে সেরকম বিশেষ জায়গাও নেই। ওইটুকু ফাঁক দিয়ে কি আর পিটারের মত গোলুমোলু খরগোশ গলতে পারে! 


একটা বুড়িমত ইঁদুর দরজার আর তলার পাথরটার ফাঁক দিয়ে বারবার ভেতরে বাইরে যাওয়া আসা করছিল। মুখে করে মটরশুঁটি বিনস এইসব নিয়ে যাচ্ছিল। বাগানের পেছনের বনটার মধ্যে মনে হয় ইঁদুরটার পরিবার থাকে। পিটার ইঁদুরটাকে জিগ্গেস করল গেটটা কোনদিকে। কিন্তু সে বেচারা মুখের ভেতর ইয়াব্বড় মটরশুঁটি পুরে রেখেছে। তাই একটা কথাও কইতে পারল না শুধু ঘাড় নাড়াল এদিকওদিক। 


কী যে উপায় হবে এখন! কী করে পিটার বেরোবে এই বাগান থেকে। ভেবে ভেবে কোনও কূলকিনারা মেলে না। শেষমেষ পিটার হতাশ হয়ে কাঁদতে শুরু করল। 


বেশ খানিকক্ষণ কান্নাকাটি করার পর পিটার নরম তালুতে চোখদুটো মুছে উঠে দাঁড়াল। নাহ্! এভাবে পড়ে পড়ে কাঁদলে বাড়ি ফিরবে কীকরে। মনকে শক্ত করে সোজা হাঁটা দিল বাগানের মাঝ বরাবর এ মাথা থেকে ও মাথা। কিন্তু যত হাঁটে তত ধাঁধার ফাঁদে পড়ে, বেরনোর আর পথ পায় না। 


শেষমেষ গিয়ে পৌঁছল একটা ছোট্টমতন জলাশয়ের সামনে। এই জলাশয় থেকেই ঝারিতে জল ভরে গাছে জল দেন মিস্টার ম্যাকগ্রেগর। একটা দুধসাদা বেড়াল সেই জলাশয়ের পাড়ে বসে জলের ভেতর সাঁতার কাটতে থাকা একটা সোনালী গোল্ড ফিশকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখছিল। বেড়ালটা একেবারে পাথরের মত স্থির হয়ে বসেছিল, কোনও নড়নচড়নই নেই। এক আধবার লেজের ডগাটা যদি না নাড়ত তাহলে বোঝাই যেত না যে একটা জ্যান্ত বেড়াল বসে আছে। মনে হত যেন একটা মূর্তি রাখা আছে। 


পিটার ভাবল এই বেড়ালকে না ঘাঁটিয়ে মানে মানে কেটে পড়াই ভালো। বেড়ালরা যে খরগোশদের বিশেষ বন্ধু কখনোই নয় সে কথা পিটার আগেই শুনেছে ওর খুড়তুতো ভাই বেঞ্জামিনের মুখে। 


পিটার আর উপায় না পেয়ে সেই ঢেয়োঢাকনার ঘরটার দিকেই হাঁটা লাগাল। কিন্তু হঠাৎ আশপাশ থেকেই একটা বিকট ‘খচ খচ খচাৎ’ আওয়াজ কানে এল। পিটার তড়িঘড়ি গিয়ে লুকলো একটা ঝোপের তলায়। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর আর কিছু ঘটল না দেখে পিটার ঝোপের তলা থেকে বেরিয়ে এল। সামনেই ছিল একটা হাতে করে ঠেলে নিয়ে যাওয়ার তিনচাকার ঠ্যালাগাড়ি। পিটার সেইটের গা বেয়ে উঠে ভেতর সেঁধিয়ে গিয়ে তারপর গলা বাড়িয়ে উঁকি মেরে এদিকওদিক দেখতে লাগল। প্রথমেই চোখে পড়ল মিস্টার ম্যাকগ্রেগর সামনের ক্ষেতে লম্বা হাতওয়ালা একটা নিড়ানি দিয়ে পেঁয়াজ তুলছেন জমি থেকে। পিটারের দিকে পেছন ফিরে আছে লোকটা এটাই নিশ্চিন্তি। ওই বিটকেল আওয়াজটা তাহলে এখান থেকেই আসছিল। 


কী করা যায়, কী করা যায়, ভাবতে ভাবতে পিটারের চোখে পড়ল মিস্টার ম্যাকগ্রেগরের ঠিক উল্টোদিকেই সেই গেটটা, যেটার তলা দিয়ে পিটার গলে বাগানে এসেছিল। 


এই তো! শেষমেষ মুক্তির পথ পাওয়া গেছে। পিটার এক্কেবারে নিঃশব্দে পা টিপে টিপে নেমে এল ঠেলাগাড়িটা থেকে। তারপর সমস্ত শক্তি জড়ো করে প্রাণপণে ছুট লাগাল। ছোট রে পা, ছোট! হাঁটু, কই দেখি তোর জোর! কালো আঙুরের ঝোপের পেছনের সরু সোজা পথটা ধরে ছুট! ছুট! 


মিস্টার ম্যাকগ্রেগর যতক্ষণে পিটারকে দেখতে পেলেন পিটার ততক্ষণে হুই মোড়টা টপকে গেটের তলা দিয়ে পিছলে বেরিয়ে গেছে। অবশেষে! বাগানের বাইরের জঙ্গলটায় এসে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল পিটার। 


মিস্টার ম্যাকগ্রেগর পিটারকে ধরতে না পেরে রাগে গরগর করতে করতে ওর ছোট্ট নীল জ্যাকেটটা আর জুতোজোড়াটা খড়ের কাকতাড়ুয়ার গায়ে গলিয়ে দিলেন। কাক তাড়ানোর কাজে আসুক অন্তত এগুলো। 


পিটার একবারটির জন্যও আর দৌড় থামাল না, পেছন ফিরেও চাইল না যতক্ষণ না সেই বিশাল ফার গাছটার তলায় নিজেদের গর্তে এসে পৌঁছল। 


এতক্ষণ ধরে যা চলল এবং এতটা পথ দৌড়নোর ধকলে পিটার এক্কেবারে ক্লান্ত হয়ে গর্তের ভেতর নরম বালির মেঝেয় ধপাস করে শুয়ে পড়ল চোখদুটো বুজে। পিটারের মা মিসেস ব়্যাবিট রান্নায় ব্যস্ত ছিলেন। এই অবস্থায় পিটারকে দেখে মনে মনে ভাবলেন, দুষ্টুটা আবার কোথায় নিজের জামাকাপড় হারিয়ে এল কে জানে! গত দু-হপ্তায় এই নিয়ে দু-দুটো জ্যাকেট আর জুতো খুইয়ে বাড়ি এল পিটার। 


তারপর কী হল? 

তারপর কী হল সে দুঃখের কথা আর কী বলি তোমাদের। শুধু এটুকু বলতে পারি যে পিটারের সন্ধেটা মোটেই ভালো কাটল না। 


খরগোশ মা এসে পিটারকে বিছানায় শুইয়ে দিল। তারপর বয়ামে রাখা কয়েকটা শুকনো হলুদ সাদা ক্যামোমাইল ফুল চিনামাটির টি-পটে জলের সঙ্গে বেশটি করে ফুটিয়ে ক্যামোমাইল টি বানালেন মা। বললেন, 

-“শোওয়ার আগে শুধু এক বড় চামচ ক্যামোমাইল টি আর কিচ্ছু না, ব্যাস! তাহলেই জব্বর ঘুম হবে আর সকালে উঠে এক্কেবারে ঠিক হয়ে যাবি পিটার।”


ওদিকে ফ্লপসি মপসি আর কটন-টেল কিন্তু দিব্যি পাঁউরুটি, দুধ আর ব্ল্যাকবেরি দিয়ে জমিয়ে রাতের খাওয়া সেরে, ঢেঁকুর তুলল। 


(সমাপ্ত)

No comments:

Post a Comment