ছড়া : লাগ ভেলকি

#লাগ_ভেলকি
#সুস্মিতা_কুণ্ডু



সবজে ঘাসে 
ফুলের বাসে
রাংতা মোড়া আকাশ পানে,

ফড়িং নাচে
পিঁপড়ে হাঁচে
চাপবি তো আয় উড়ন যানে।

সাঁই ফটাফট
কান কটাকট
চক্ষু মুদে প্যাঁচা ঢোলে,

দাঁত কপাটি
লাগাও চাঁটি
বেসুরো তাল কাঠের খোলে।

গাছের মাথায়
ব্যাঙের ছাতায়
রোদ মাখানো হলুদ বাটা,

নদীর পাড়ে
ছপাৎ দাঁড়ে
নৌকো দোলে জোয়ার ভাঁটা।

সেই নগরে
ফুল টগরে
রাস্তাঘাটে বিছিয়ে সাদা,

চলছে মেলা
হাজার খেলা
লাড্ডু পাঁপড় পেটটি নাদা।

হেঁইয়ো করে 
চলছে জোরে
হুনহুনা সব পালকি দোলা,

পাগলা সাধু
জমায় জাদু
ভেলকি বোঝাই চটের ঝোলা। 

চরকি বাজি
আলোর সাজি
মাঝ আকাশে ফানুস ছোঁড়ে,

থাকলে ডানা 
নেইকো মানা
হাউই চেপে যাক না উড়ে।

(সমাপ্ত)

কিশলয় ব্লগে প্রকাশিত। 

ছবি: ছানামশাই!

ঝুমকোতারার বন্ধুরা



#colorpencilonpaper by Sukanta Mondal
(কত্তা এঁকেচেন বলে দাবী করলেও আসলে ছানা আঁকতে দিয়েচেন তাই আঁকতে পেরেচেন কিনা! তাই ছানার দাবীতে তার নামটিও খোদাই করেছেন ছানার বাপ।)

#ঝুমকোতারার_বন্ধুরা
#সুস্মিতা_কুণ্ডু

তারপর তো ঝুমকোতারার ভারি মন আনচান করতে লাগল, একটু দূরেই সব খেলুড়েরা গোল হয়ে ‘আনি মানি জানি না’ খেলছে ঘুরে ঘুরে। ও-ই বা কতক্ষণ লুক্কে থাকে! আবার যেতেও কিন্তুকিন্তু লাগছে, যদি ওকে না নেয় দলে? ও যে সবার চে’ বড় আলাদা। সেইজন্যই বুঝি ওরা কখনও ওকে খেলতে ডাকেনা।

অনেক ভেবে শেষমেষ মনে মনে ‘আভি নেহি তো কভি নেহি’ বলে ঝুমকো এগিয়ে গেল খেলুড়েদের দিকে। ওকে দেখে সব্বাই খেলা থামিয়ে বড় বড় চোখ করে চেয়ে রইল। ঝুমকোতারা বললে,
-“হ্যাঁ গা! আমায় তোমরা খেলতে নেবে?”
কমলি ভমলি টমলি সমস্বরে বললে,
-“ত্ তুমি সত্যি সত্যিকারের আমাদের সাথে খেলবে?”
ঝুমকোতারা এট্টু ভরসা পেয়ে বলে,
-“কেন খেলবো না? তোমরা দলে নিলেই দিব্যি খেলব!”
ওরা বলে,
-“তুমি কত্ত সুন্দর! কত রঙ তোমার গায়ে! লাল নীল বেগনে সবুজ! আর আমাদের তো সেই একঘেঁয়ে কমলা! তোমার বুঝি ভারি গুমোর, এমনটা ভেবেই তো আমরা তোমায় কখনও ডাকতে সাহস পাইনি। তুমি তবে আমাদের দলের রানি হবে এসো!”

ঝুমকোতারা তো বেজায় অবাক হয়ে বলে,
-“দ্যাখো কাণ্ড! আমি ভাবি, আমি তোমাদের মত কমলা নই বলে বুঝি তোমরা আমায় দলে নাও না! আমরা সবাই কী বোকা! আজ থেকে আমরা সক্কলে তাহলে দোস্ত হ’লুম! কেউ রানি নয়, কেউ রাজা নয়, কেউ দাসী নয়, কেউ প্রজা নয়!”

তাপ্পর ঝুমকোতারা, কমলি ভমলি টমলি সব্বাই মিলে পাখনা নেড়ে সাঁতরে খেলতে শুরু করল। আমারও খুব ইচ্ছে করছিল ওদের সাথে খেলতে কিন্তু কী করব? আমি তো আর জলের তলায় থাকতে পারিনে!

ছবি: সুকান্ত

গল্প : মণিময় দারোগা

🔸🔸 মণিময় দারোগা 🔸🔸
🔸🔸 সুস্মিতা কুণ্ডু 🔸🔸

🔹🔹(১)🔹🔹

এলেম আছে বটে মণি দারোগার! আশেপাশের পাঁচ-সাতটা গাঁয়ের লোক একবাক্যে তাঁর নামে সেলাম ঠোকে। মণি দারোগা যাকে বলে এক্কেরে নয়নের মণি সকলের। হ’বেন নাই বা কেন! যবে থেকে তিনি বটুকপুর থানার অফিসার-ইন-চার্জ হয়েছেন তবে থেকে এ তল্লাটে আর একটাও চুরি ডাকাতি হয়েছে বলে দেখাতে পারবে কেউ? গেরস্ত মানুষেরা দরজা জানালা হাট করে খুলে নিশ্চিন্তে নাক ডেকে ঘুমোন। একটা স্টিলের গেলাস কিংবা ছেঁড়া গামছাটুকুনও চুরি হয়না।

বটুকপুরের দোকানগুলোতেও আজকাল আর তালা চাবি বিক্রি হয়না। সেই সেবার মদন চাটুজ্জের সদ্য বিয়ে হওয়া ছোটোজামাই কী বিপদেই না পড়ল। অষ্টমঙ্গলায় মেয়ে বাপের বাড়ি এসেছে জোড়ে, সেখান থেকে সটান যাবে বর্ধমান। ফেরার দিন হ’ল চিত্তির। সাধারণত বড় বড় সুটকেস তো সব বাসের মাথাতেই তুলে দেয় কন্ডাকটার-রা। এদিকে সুটকেসের ছোট্ট পিচ্চি তালাটা গেছে ভেঙ্গে। দোকানে দোকানে ঘুরে মদন চাটুজ্জে তালা আর পায়না। শেষমেষ নতুন জামাইকে নারকেল দড়ি দিয়ে বাঁধা সুটকেস নিয়েই বর্ধমান যেতে হ’ল।

নিন্দুকে অবশ্য বলে মণিময় দারোগা তন্ত্রমন্ত্র জানেন, তাঁর নাকি পোষা ভূত আছে একগণ্ডা। সেই ভূতেরাই তো সব চোর ডাকুদের শায়েস্তা করে রাখে। যেমন মণিময় মুকুজ্জে দারোগা হয়ে আসার মাস খানেক পরের কথাটাই ধরুন না। রামাপদ চোর তার সিঁধকাঠিটি নিয়ে হরনাথ মল্লিকের গোয়াল ঘরের মাটির দেওয়ালে ঝুরঝুর করে মাটি খুঁড়তে শুরু করেছিল সবে। হরনাথ সম্পন্ন কৃষক, সম্ভ্রান্ত গৃহস্থ মানুষ। তিন চারটে জার্সি গরু পোষা রয়েছে, দাম কম নয় সেগুলোর। গোয়ালঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে বাড়ির মধ্যে চলে যাওয়ার পথ রয়েছে। রামাপদ তাই সিঁধ দিয়ে ভেতরে ঢুকে তারপর গরু নিয়ে গোয়ালঘরের দরজা খুলে পালানোর মতলব ভেঁজেছিল। কিন্তু যেই না আদ্ধেকটা শরীর ফুটো দিয়ে  গোয়ালের ভেতর গলিয়েছে ওমনি ওপাশ থেকে কে যেন কানের কাছে বলে উঠল,

-“ছ্যা ছ্যা রামাপদ শেষমেষ তুমি গরু চুরি করবে! তোমার বাবা কৃষ্ণপদ কত বড় চোর ছিলেন, জমিদারের গিন্নির গলার সীতাহার চুরি করে তোমার মা-কে উপহার দিয়েছিলেন। তোমার ঠাকুর্দা হরিপদ, ইংরেজ দারোগার কোমর থেকে পিস্তল চুরি করে শ্রীপতি ডাকাতকে দশটা মোহরের বিনিময়ে বেচে দিয়েছিলেন। এইসব নমস্য ব্যক্তিদের বংশধর হয়ে তুমি শেষটায় গরু চুরি করবে?”

আদ্ধেক শরীর নিয়ে ঝুলন্ত ত্রিশঙ্কু অবস্থায় কেউ যদি অমন কানের পাশে ফিসফিস করে, তাহলে অতি বড় ঠাণ্ডা মাথার চোরেরও পিলে চমকে যেতে বাধ্য! রামাপদ তো কোন ছার! ভয়ের চোটে চেঁচিয়ে উঠল,
-“ক্কে কে ওখানে? কে কথা কইল?”
কিন্তু শুকনো গলা দিয়ে ‘কে’-এর পর বাকিটা শুধু ফ্যাসফ্যাসে আওয়াজ বেরলো। তারপর শুরু হ’ল বেদম কাশি। এদিকে রাতদুপুরে ওরকম কাশি আর ফ্যাসফ্যাসে আওয়াজে ভড়কে গিয়ে গোয়ালঘরের কোমলি ধবলি আর হেবলি, তিন জার্সি গাই মিলে গলার ঘন্টা প্রবল বেগে নাড়িয়ে, পা দাপিয়ে সে এক মহা শোরগোল শুরু করল। তাদের ক্ষুরের ঠোকায় গোয়ালঘরের মেঝেয় পড়ে থাকা গোবর খানিক ছিটকে এসে পড়ল রামাপদর মাথায়। রামাপদ কোনওমতে হ্যাঁচোড় প্যাঁচোড় করে সিঁধের গর্তটা থেকে গোয়ালঘরের বেরোতে চেষ্টা করতে গেল। গা ভর্তি তেলের গুণে পিছলে খানিকটা বেরলেও মাটি লেগে গিয়ে তেলতেলে ভাবটা উবে গেল আর হেথাহোথা বেশ ভালোরকমই ছড়ে গেল, ছাল চামড়া উঠে গেল। সেই অবস্থাতেই কোনওমতে ছুটতে শুরু করল রামাপদ। যতই ছুটুক না কেন একটা বিটকেল ‘হাঃ হাঃ হাঃ’ করে অট্টহাসিও যেন ওর পেছন পেছন ছুটতে লাগল। বাড়িতে ঢুকেই দরজায় খিল এঁটে, কান অব্দি কাঁথামুড়ি দিয়ে, শুয়ে পড়ল। তারপর তো দিন আষ্টেক আর কাজেই বেরোতে পারেনি বেচারা। খালি মনে হত যেন সেই অট্টহাসিটা পেছনে তেড়ে আসছে।

🔹🔹(২)🔹🔹

শুধু কি রামাপদ চোর? মাধব ডাকাতও কি ভুক্তভোগী নয় নাকি? এমনিতে মাধব বেচারা ডাকাতির বিজনেসে বড় একটা নাম করতে পারেনি। তবে মাধবের ওপর পূর্বপুরুষদের নামের বোঝা ছিলনা, রামাপদ চোরের মত। মাধবের পূর্বপুরুষরা আবার কলকাতা শহরের সব এক একটা আস্ত গাঁটকাটা, পকেটমার। মাধবেরও হাতে খড়ি হয়েছিল পকেট কাটাতেই। হাতের আঙুলের ফাঁকে আধখানা ব্লেড রেখে নরম লাউয়ের ওপর কাপড় জড়িয়ে, তাইতে দিনের পর দিন প্র্যাকটিস করেছিল মাধব। লাউয়ের খোলায় একটা আঁচড়ও পড়ত না এমনই নিপুণ হাত হয়েছিল মাধবের।

তা একদিন শ্যালদা স্টেশনে মাধব গেল পৈতৃক ব্যবসায় হাতেখড়ি করতে। সব ঠিকঠাকই চলছিল কিন্তু নির্জনে লাউয়ের খোলায় মকশো করা আর ওই ভিড়ে ঠাসা স্টেশনে, হকারের ঠেলা, ঠেলাগাড়ির গুঁতো, কুলির ধাক্কা খেয়ে ব্লেড চালানো আরেক জিনিস। একজন নাদুসনুদুস শেঠজি টাইপের লোকের হাতের আঙ্গুলে বেশ চকমকে পাথর বসানো সোনার আংটি, গলায় হার দেখে, পকেটে মোটা মানিব্যাগ থাকবে এই আশায়, আঙুলের ফাঁকে ব্লেডটা বাগিয়ে ধরে এগিয়েছিল পা টিপে টিপে। এমন সময় পেছন থেকে এক কুলি এসে হুড়মুড়িয়ে পড়ল ঘাড়ে, মাধবও ওমনি ছিটকে শেঠজীর বদলে পাশের মুশকোমত ষণ্ডামার্কা একটা লোকের ঘাড়ে পড়ল। হাতের ব্লেডটায় খোঁচা লেগে লোকটার সার্টিনের শার্টটা “ফ্যাঁঅ্যাঁসস্” করে আর্তনাদ করে অনেকটা ফেঁসে গেল। জামা তো ফাঁসলই, সেই সাথে ফেঁসে গেল বেচারা মাধব। লোকটা ঘুরে কপাৎ করে চেপে ধরল মাধবকে। তারপর যা হওয়ার তাই হ’ল, জনতা জনার্দন উত্তম মধ্যম পিটিয়ে, হাতের সুখ করে নিল।

কোনওমতে পকেটমারদের আড্ডায় ফিরে আসার পর মাধবের জীবিকাতুতো ভাই বেরাদররা তো বটেই, এমনকি মাধবের নিজের বাপ-কাকা অব্দি বেজায় হাসি ঠাট্টা করল ওকে নিয়ে। ওর নামই দিয়ে দিল সবাই “তালকানা মেধো”। তখনই মেধো মানে মাধব প্রতিজ্ঞা করেছিল এই পকেটমারীর অপমানের লাইনে থাকবে না মোট্টে আর। না না তাই বলে সৎ পথে করে কম্মে খাবে এতটাও বড় শপথ করেনি। কথায় বলে না ‘মারি তো গণ্ডার/ লুটি তো ভাণ্ডার’, তাই মেধো ঠিক করল ডাকাতির দল খুলবে। হ্যাঁ! ওইটে ভারি সম্মানের কাজ, লোকের পিটুনি খাওয়ার চেয়ে লোককে পিটুনি দেওয়ার সুযোগ বেশি। রণ-পা পরে হাঁটাটাও বেশ জম্পেশ হবে। আর ওই ‘হারে রেরে রেরে’ করে মশাল বল্লম নিয়ে তেড়ে যাওয়াটার মধ্যেও একটা বেশ ইয়ে মানে বীর বীর ব্যাপার আছে।

কিন্তু কলকাতা শহরের বুকে ডাকাতদল করাটা একটু বাড়াবাড়িই হয়ে যাবে, মাধব ভুলবশতঃ মার খেলেও বুদ্ধি যে একেবারেই নেই তা নয়। তাই চলে এল পিসির বাড়ি বটুকপুরে। এখানে দু’চারটে ছিঁচকে চোরের সাথে দোস্তি করল। তাদের একটু কলকাত্তাইয়া চুরি ডাকাতি পকেটমারির গল্প শুনিয়ে বেশ একটু সমীহ আদায় করল। তারপর জনা চারেক চ্যালা হ’তেই ডাকাতদল খুলল। এদিকে ডাকাতদল খোলায় পিসি ভারী অসন্তুষ্ট হয়ে মাধবকে দিল ঘর থেকে বার করে। তা ভালোই হয়েছে, ডাকাতদলের সর্দার পিসির বাড়িতে থাকে, পিসির পান সেজে দেয়, পুকুর থেকে জল বয়ে এনে দেয়, প্রয়োজনে আলু পটল ঝিঙে কেটে দেয় এমনটা কেউ শুনেছে কখনও? তার চে’ জঙ্গলের মধ্যে পোড়ো মন্দিরে বাস করা বেশি ভালো।

🔹🔹(৩)🔹🔹

তা দলবল গড়ার পর মন্দ ডাকাতি হচ্ছিল না। বিশু গাইনের যাত্রাদলের তাঁবুতে হামলা করে বেশ কিছু জরি চুমকি বসানো রাজা মন্ত্রীর পোশাক বাগিয়েছিল। সেগুলো মাঝেসাঝেই অঙ্গে গলিয়ে বসে থাকে মাধব। বেশ কেষ্টবিষ্টু লাগে নিজেকে। তারপর সেবার দুর্গাপুজোর ভাসানের পরেরদিন চণ্ডীমণ্ডপে হামলা করে প্যাণ্ডেলের বাঁশ কাপড় ত্রিপল সব খুলে এনেছিল। যদিও মাধবের ডানহাত ভেনো একবার বলার চেষ্টা করেছিল, এইসব ডাকাতিগুলোর সাথে ছিঁচকে চুরির আর পার্থক্যটা কোথায়! কিন্তু মাধব তাকে এক হুঙ্কার দিয়ে চুপ করিয়ে দিয়েছিল।

এতবড় মূর্খ যে ডাকাতি আর ছিঁচকে চুরির মধ্যে তফাৎ বোঝে না হতভাগা। ইচ্ছে করে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে দল থেকে বার করে দেয়, কিন্তু নেহাতই দলের সবচেয়ে করিৎকর্মা ডাকাত ওই ভেনোটাই কিনা। আরে বাবা এই যে ডাকাতি করতে বেরনোর আগে স্নান করে শুদ্ধ বস্ত্র পরে মা কালীর ছ’ইঞ্চির বাঁধানো পটের সামনে যে বলি দেয়, এটা কোনও ছিঁচকে চোর করে? বলির ব্যাপারেও কত ফ্যাঁকড়া ভেনোর, বলে কিনা নরবলি না হোক নিদেনপক্ষে একটা পাঁঠাবলি হোক। মাধব কি মাংসের দোকানের কসাই নাকি যে পাঁঠা কাটবে। মাধব বিশুদ্ধ বৈষ্ণবমতে ডাকাত তাই সব্জি বলি দেয়। ঝিঙে চিচিঙে কুমড়ো আখ সব ওর হাতের কাঠারির এক কোপে দু’টুকরো হয়ে যায়।

যাকগে এভাবে মাধব আর মাধবের দলের বৈষ্ণবমতে নিরামিষ ডাকাতি ভালোই চলছিল কিন্তু গোল বাঁধল মণিময় দারোগা এখানে আসার কিছুদিন পরেই। অনেকদিন ধরেই মাধব ডাকাতির প্ল্যান ছকে রেখেছিল কালুরাম কলুর তেলের ঘানিতে। বেশ ক’টা জারিকেন ভর্তি সর্ষের তেল ডাকাতি করে আনতে পারলে কাজে দেবে। যদিও ভেনো এখানেও বাগড়া দিয়ে বলেছিল যে,
-“সর্ষের তেল কি ডাকাতি করার মত বস্তু?”
 মাধবও খেঁকিয়ে উত্তর দিয়েছিল,
-“কেন সর্ষের তেল কোন কাজে লাগেনা শুনি? রান্না করতে, গায়ে মাখতে, প্রদীপ জ্বালাতে...”
-“নাকে দিয়ে ঘুমোতে...” মাধবের কথার মাঝেই ফোড়ন কেটেছিল ভেনো।

মাধব এইসব ছোটোখাটো বাধাতে পাত্তা না দিয়ে বলির কাজে মন দিয়েছিল। স্নান টান সেরে শুদ্ধ পট্টবস্ত্র পরে কপালে ইয়া লম্বা সিঁদুরের তিলক কেটে বলির কাঠারি নিয়ে রেডি হয়েছে। সামনের বেদীতে একটা একটা করে সব সব্জী সাজানো।
‘ওম হুম হ্রিং ক্রিং ট্রিং’ বলে কাঠারিটা তুলেছে, ওমনি কে যেন বলে উঠল,
-“দেখিস মাধব, লাউ কাটতে গিয়ে যেন আবার কারোর জামা কেটে ফেলিসনি!”
মাধব তো ভয়ানক রকমের হতভম্ব হয়ে ইতিউতি দেখতে লাগল, সব্বার আগে দেখল ভেনোর দিকে। নাহ্! সে ব্যাটা তো চুপটি করে বসে বসে নখ কামড়াচ্ছে। বাকি দুই মক্কেল গজা আর ভজা বসে বসে ঝিমোচ্ছে সব্জির ঝুড়ি নিয়ে। এক একটা করে সব্জি এগিয়ে বেদীতে রাখে, আর মাধব ঘ্যাঁচ করে কাটে। বেদীতে একটা কুমড়ো রেখে বসেছিল দু’জন। মাধবের কাঠারি মাঝ আকাশে থেমে যেতে গজা-ভজা বলে উঠল,
-“কী হ’ল সদ্দার! কী হ’ল সদ্দার!”

মাধব নিজেকে সামলে নিয়ে ভাবল নিশ্চয়ই ভুল শুনেছে, বলল,
-“কিছু নয়! লাউটা সরিয়ে একটা আখ বসা দেখি।”

গজা-ভজা বলে উঠল,
-“লাউ কোথা সদ্দার? কুমড়ো তো! তোমার পিসির বাড়ির মাচা থেকেই তো তুলে আনলুম।”

-“অ্যাঁ কী সব্বোনাশ করেছিস! পিসি তো এবার আমাকেই কুমড়োর ছক্কা বানিয়ে ছেড়ে দেবে রে!”

মাধব দাঁত কিড়মিড় করে ফের কাঠারি তোলে, সামনে চেয়ে দেখে কুমড়ো কই? সবুজ চকচকে একটা লাউ সামনের বেদীতে। আর কানের কাছে ফিসফিসিনি আওয়াজ,
-“কাঠারি দিয়ে কাটবি মেধো নাকি আধখানা ব্লেড আনব?”

এইবার মাধব কাঠারি ফেলে এক লাফে বেদী থেকে তিন হাত দূরে সরে গেল। সেবারের মত বলি ক্যানসেল হয়ে গেল। মাধব ঘামতে ঘামতে পিসির বাড়ি গিয়ে জ্বর এসেছে বলে কম্বলমুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল, পিসির চ্যাঁচানি শুনতে শুনতে।
-“কোন অলপ্পেয়ে হতচ্ছাড়া ড্যাকরা অমন নধর কুমড়োখানা মাচা থেকে তুলে নিয়ে গেল! পোড়ারমুকো! ওই কুমড়ো তোর পেটে সইবে না অনামুখো!”

তারপর থেকেই আর ডাকাতি করতে বেরোতে সাহস হয় না মাধবের। মাধবের দলের আরেক চ্যালা বগলা হ’ল গিয়ে গুপ্তচর। বগলা খবর আনল নতুন দারোগা মণিময় নাকি ভূত পোষেন। আর সেই ভূত বগলদাবা করে নিয়েই নাকি তিনি বটুকপুরে এসেছেন। এই ভূতই নাকি বটুকপুরের সব চোর ডাকাতদের অবস্থা টাইট করে রেখেছে।এই খবর পাওয়ার পর ভেনো ভজা গজা অনেক করে বললেও খুব একটা লাভ হয়নি। মাধব কিছুতেই আর বলিও দেয়নি, ডাকাতিও করতে বেরোয়নি।

🔹🔹(৪)🔹🔹

রামাপদ, মাধব, মাধবের স্যাঙাতরা, আরও এদিক ওদিকে গাঁয়ের চোরেরা সব বেজায় নাজেহাল অবস্থায় দিন কাটাতে লাগল। যেই কেউ চুরিচামারি বা অন্যায় কোনও কাজ করতে যায় ওমনি কানের কাছে সেই ফিসফিস। ওদিকে মণিময় দারোগা দিনদিন একটার পর একটা পদক বাগাচ্ছেন পুলিশ বিভাগ থেকে ওঁর অসামান্য কর্মকাণ্ডর জন্য, আর ভুঁড়িটিও সেই সাথে বাগাচ্ছেন। একেই বলে ‘ঝড়ে কাক মরে, ফকিরের কেরামতি বাড়ে।”

এই চোর ডাকাতদের দলবলের মধ্যে ভেনো বেশ বুদ্ধি ধরে, আট ক্লাস অব্দি পড়ালেখা করেছে। ভেনো চুপিচুপি বগলাকে ডেকে বলল,
-“হ্যাঁরে ব্যাটা বগলা! তোর হঠাৎ কেন মনে হল যে মণিময় দারোগা ভূত পোষে? ভূত কি গরু না ছাগল? ভূত দুধ দেয় গোবর দেয় যে লোকে পুষবে? আর পুষবে বললেই হ’ল? ভূত পাবে কোথায়? সে কি হাটে বাজারে পাঁচ হাজারটাকায় জোড়া কিনতে মেলে? যদিও বা মেলে, সে ভূত মানুষের পোষ মানবে কেন? উল্টে মানুষেরই ঘাড় মটকে মেরে ফেলবে।”

ভেনোর এত প্রশ্নে বগলা বেজায় রেগে গিয়ে বলল,
-“ত্ ত্ তবে কী আমি মিছে বলচি? ওই তো সেদিন থ্ থ্ থানার হাবিলদার ম্ ম্ মাণিকলাল আর প্ প্ প্ পুরন্দর হাটে এসেছিল। আমিও তখন ঘুরঘুর করছিলুম হাটের এদিক ওদিক, যদি কিছু হ্ হ্ হাতসাফাই করতে পারি সেই মতলবে। এমন সময় দেখলুম ওরা নিজেদের মধ্যে ব্ ব্ বলাবলি করছে। ‘বড়সাহেবের পোষা ভ্ ভ্ ভূত আছে।’ আমি নিজের কানে আ আ আড়ি পেতে শুনলুম।”

বগলা তোতলাতে তোতলাতে যা বলল সেটা সবাই একবাক্যে বিশ্বাস করলেও ভেনোর মনে সন্দেহ জাগল। ভেনো স্থির করল সরেজমিনে তদন্ত করেই দেখবে। যেমনি ভাবা তেমনি কাজ। সন্ধেবেলায় সূয্যিমামা পাটে যেতেই একটা কালো চাদর মুড়ি দিয়ে ভেনো চলল মণিময় দারোগার বাড়ির দিকে। বেশ বড়সড় সাদা বাড়ি, সরকার বাহাদুরের টাকায় তৈরি, বটুকপুরের দারোগার জন্য। বাড়ির চারদিকে উঁচু বেড়া দেওয়া। তবে বেড়ার গায়ে একটা বাবলাগাছ রয়েছে, তার ডালপালাগুলো বেড়া টপকে বেশ ভেতরে বাড়ির জানালার সামনে অব্দি চলে গেছে। ভেনো বহুকষ্টে কাঁটা বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে একটা ডাল বেয়ে জানলার কাছে গিয়ে উঁকি মারল ঘরের ভেতর।

এই ঘরটা মনে হয় বৈঠকখানাই হবে। একটা মেহগনি কাঠের গোল টেবিলের ওপর ফুলদানি রাখা। একটা চেয়ার টেনে বসে আছেন মণিময় দারোগা। দারোগাগিন্নি একটা ট্রে-তে করে দু’কাপ চা এনে টেবলে রেখে, আরেকটা চেয়ার টেনে বসেন।
চা-টা খেতে গিয়ে দারোগাগিন্নি বলে ওঠেন,
-“এই যাহ্! বিস্কুটের কৌটাটা আনতে ভুলে গেলুম।”
মণিময় দারোগা হাঁকলেন,
-“সুখো, ওরে সুখময়! দে না বাবা বিস্কুটের কৌটোটা তাক থেকে পেড়ে এনে একটু।”
চোখ দুটো ছানাবড়ার মত করে ভেনো বাবলা গাছের ডালে বসে দেখল, একটা কৌটো হাওয়ায় উড়তে উড়তে এসে থামল মণি দারোগার মাথার কাছে, শূন্যে ভাসতে লাগল। আপনা আপনিই কৌটোর ঢাকনার প্যাঁচটা ঘুরে ঘুরে খুলে গেল। দুটো বিস্কুট বেরিয়ে এল কৌটোর ভেতর থেকে। সোজা ভেসে ভেসে দুলে দুলে ল্যান্ড করল মণি দারোগার প্লেটে। ফের দু’টো বিস্কুট একইভাবে উড়ে এসে জাঁকিয়ে বসল দারোগাগিন্নির প্লেটে। তারপর কৌটোর ঢাকনা বন্ধ হয়ে নিজে থেকেই যথাস্থানে চলে গেল। শুধু তাই নয়, ঘর ঝাড়ু দেওয়াও নিজে নিজেই করছে একটা মুড়ো ঝাঁটা। চা খাওয়া হ’তে টেবলের ওপরের কাপ প্লেটগুলোও ওই বিস্কুটের মত ভেসে ভেসে চলে গেল, রান্নাঘরের দিকে বোধ হয়।

কিন্তু এমন অশৈলী কাণ্ড দেখে ভেনো আর যথাস্থানে থাকতে পারল না। বাবলা গাছের কাঁটাভরা ডালে হাত পা ছিঁড়ে স্থানচ্যূত হয়ে পড়ল নিচের ঝোপে। ঝোপে পড়ামাত্র সর্বাঙ্গ জ্বলে উঠল, ভেনো হাড়ে হাড়ে মানে চামড়ায় চামড়ায় বুঝতে পারল বিছুটির ঝোপে পড়েছে। কিন্তু ঝড়ঝড় করে শব্দ হওয়াতে মণি দারোগা উঠে এসে জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বাজখাঁই হাঁক ছেড়েছেন,
-“কে রে ওখানে?”
তাই বিছুটির ঝোপের মধ্যেই চুপ করে ঘাপটি মেরে বসে রইল ভেনো। কিছুক্ষণ পরে মণি দারোগা জানালার কাছ থেকে সরে যেতে, কোনওক্রমে উঠে গা চুলকোতে চুলকোতে দৌড় লাগাল কষে।

🔹🔹(৫)🔹🔹

পৈতৃক প্রাণটা হাতে নিয়ে ফিরে তো এল ভেনো কিন্তু বুঝতে পারল যে সুখো ভূতের জন্যই ওদের এই দুরবস্থা। কাজেই ওদের চুরি ডাকাতির ব্যবসা নির্বিঘ্নে চালাতে গেলে মণিময় দারোগার পোষা সুখময় ভূতের একটা গতি করতে হবে। মাধবের একার দ্বারা কিছু হবে বলে মনে হয় না। এলাকার সমস্ত চোর ডাকাতকে এক করতে হবে। এত সহজে ঘাবড়ে হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্র ভেনো মস্তান নয়।
যেমন ভাবা তেমনি কাজ, চারপাশের এলাকার সব চোর ডাকাতদের জড়ো করে নিজের মতলবের কথা বলল ভেনো। মাধব দলের লিডার হ’লেও ভূতে বড্ড ভয় পায় তাই এ ব্যাপারে ভেনোর কর্তৃত্বই নির্বিবাদে মেনে নিল।

নির্দিষ্ট দিনে, বটুকপুরের জঙ্গলের পোড়ো মন্দিরে মাধব ডাকাতের আস্তানায় এসে হাজির হ’ল তান্ত্রিক ঘুটঘুটেশ্বর। অন্ধকারের মত কালো ঘুটঘুটে রঙ বলে তাঁর নাম ঘুটঘুটেশ্বর। তাঁর গুরু হ’লেন ফটফটেশ্বর, তিনি খড়ম ফটফটিয়ে হাঁটতেন কিনা। তাঁর গুরু হ’লেন কুটকুটেশ্বর। শোনা যায় যে তাঁর দাড়ি আর জটার এমন জঙ্গল ছিল মুখ আর মাথাময় যে সেখানে উকুন তো নস্যি, ছারপোকা, তেলেপোকাও বাস করত নাকি!
ভালোমত খোঁজখবর করেই তান্ত্রিক জোগাড় করেছে ভেনো। তান্ত্রিক এসেই হুঙ্কার ছেড়ে ডাকল,
-“নমোঃ গুরু ফটফটেশ্বর! নমোঃ তস্য গুরু কুটকুটেশ্বর! কোথায় তোদের দারোগার পোষা ভূত। এক্ষুনি তার দফা শেষ করব। বাঘে  ছুঁলে আঠেরো ঘা, পুলিশে ছুঁলে ছত্রিশ ঘা, ঘুটঘুটেশ্বর ছুঁলে ঘায়ের ওপর ঘা! মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা! গোদের ওপর বিষফোঁড়া!”

বলতে বলতে উত্তেজনায় পোড়ো মন্দিরের গায়ের বুড়ো অশ্বত্থগাছের শেকড়ে প্রায় হুমড়ি খেয়েই পড়ে যাচ্ছিলেন তান্ত্রিক মহাশয়। বগলা ছুটে গিয়ে ধরল তান্ত্রিকমহাশয়কে।
-“ঘ্ ঘ্ ঘ্ ঘুট্ ঘুট্...”
বগলার জিভের এই ঘ্যাচাং করে ব্রেক লেগে ঘটঘটাং চিৎকারে তান্ত্রিক মহাশয় আর্তনাদ করে উঠলেন,
-“ওগো মাগো ঘ্যাঁঘা ভূতে ধরলো গো...”
ভেনো জলদি ছুটে এসে সামাল দেয়,
-“তান্ত্রিক ঠাকুর, ও ঘ্যাঁঘা ভূত হ’তে যাবে কেন! ও তো বগলা!”
তান্ত্রিক নিজের ভুল বুঝতে পেরে ঝাঁঝিয়ে ওঠেন,
-“জানি হে ছোকরা! আমি আবার ভূত চিনব না?! কোথায় তোদের সুখো ভূত? তাকে ঝেড়ে যদি দুখোভূত না করে দিয়েছি, তবে আমার নামটাই বদলে দিস।”
এই বলে নানারকম বিটকেল বিটকেল জিনিস ঝোলা থেকে বার করে যজ্ঞের আয়োজন করতে থাকেন ঘুটঘুটেশ্বর। গিরগিটির চোখ, কাকের পালক, শেয়ালের লেজ, ব্যাঙের ঘিলু, দেখে গা গুলিয়ে ওঠে সকলের। ‘হ্রিম ক্লিম ফট্ ফটাস’ করে মন্ত্র পড়তে থাকে ঘুটঘুটেশ্বর।

ওদিকে ভেনোর প্ল্যানমতো ভজা আর গজা দৌড়ে যায় থানায়। ভর দুপুরবেলায় ভুঁড়ির ওপর চেপে বসে থাকা বেল্টটা আলগা করে, চেয়ারে পা তুলে মিহি সুরে নাকটা ডাকতে শুরু করেছিলেন মণিময়। দুপুরে গিন্নি চারতলা টিফিন ক্যারিয়ারে চর্ব্য চোষ্য ভরে সুখময়ের হাতে করে আকাশপথে পাঠিয়েছিলেন। খাওয়াটা একটু অপরিমিতই হয়ে গেছে। ঠিক এমন সময় হাঁউ মাঁউ করে ভজা আর গজা এসে আছড়ে পড়ল মণি দারোগার দুই হাঁটুর ওপর। মণিময় চমকে বিষম খেয়ে মাথা চাপড়াতে লাগলেন।
ভেনোর দেওয়া ট্রেনিং অনুযায়ী ভজা আর গজা পালা করে করে বলে চলল,
-“হুজুর মাই বাপ!”
-“হুজুর ধর্মাবতার!”
-“বটুকপুরের জঙ্গলে...”
-“পোড়ো মন্দিরে...”
-“এক বিটকেল কাপালিক এসেছে...”
-“নরবলি দেবে বলে আয়োজন করেছে...”
-“হুজুর আপনি বাঁচান!”
-“হুজুর আপনি রক্ষা করুন!”

‘কাপালিক’, ‘নরবলি’, এসব শুনে তো বেজায় ভড়কে গেলেন মণিময় দারোগা। বিড়বিড় করে জপতে থাকলেন,
-“বাবা সুখময়! বাছা একটু দ্যাখো দিকিনি! কীসব নরবলি কাপালিক বলছে! ওগুলো তো তোমার ডিপার্টমেন্ট কিনা।”

এদিকে জোরে জোরে ভজা আর গজাকে বললেন
-“ঠিক আছে ঠিক আছে! তোরা যা আমি এক্ষুনি ফোর্স নিয়ে যাচ্ছি।
পুরন্দর! মাণিকলাল! বন্দুক লে আও!”

ভজা আর গজা মুখ টিপে হাসতে হাসতে থানা থেকে বিদেয় হ’ল।

ওদিকে সুখময় তখন গিন্নিমার আজ্ঞামত আসনে ফোঁড় তোলা, শুকনো জামা কাপড় তুলে এনে ইস্ত্রি করা, ভাঁজ করা, বিকেলের জলখাবারের লুচির ময়দা মাখা, জল তোলা, সুপুরী কাটা, সব কাজ একসাথে করছিল। অবশ্য সুখময়ের এসব বাম হাতের তর্জনীর কাজ। শুধু ইশারা করলেই কাজ হ’তে থাকে আপনা আপনি। হাত লাগাতে হয়না, যন্ত্রপাতি এমনিই চলে নিজে থেকে। তাই গিন্নিমা ওকেই সব কাজ বুঝিয়ে দিয়ে দুপুরবেলায় একটু গড়িয়ে নেন। দারোগা মশাই স্মরণ করতেই সুখময়ের ধোঁয়ার টিকি খাড়া হয়ে উঠল! ছুটল... ইয়ে মানে উড়ল বটুকপুরের জঙ্গলের পোড়ো মন্দিরের কাপালিকের সন্ধানে।

🔹🔹(৬)🔹🔹

পোড়ো মন্দিরে ততক্ষণে বিশাল এক আগুন জ্বেলেছে ঘুটঘুটেশ্বর। তার চারপাশে ঘুরে ঘুরে নেত্য করে চলেছে আর মন্ত্র পড়ছে,
-“ওম দুম ফটাস! হিং ক্লিং চটাস! ফটফটায় পিড়িং! কুটকুটায় কিড়িং! ফট ফটাস! চট চটাস!”
ওই ফটাস আর চটাসগুলো অবশ্য মশা মারার শব্দ। কাপালিকের চারপাশে রামাপদ চোর, মাধব ডাকাত, ভেনো শাগরেদ, বগলা গুপ্তচর, ভজা-গজা, আশপাশের গাঁয়ের আরও খানক’তক চোর ডাকু, সব উৎসুক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তান্ত্রিক কেমন করে মণি দারোগার পোষা ভূতটাকে ধরে সেটা দেখবে বলে।

হঠাৎ একটা জোরে ঝড় উঠল মন্দিরকে ঘিরে। চারপাশের গাছের পাতা উড়ে এসে পড়তে লাগল যজ্ঞের আগুনের ওপর। ধুলোয় ঢেকে গেল চারদিক। চারপাশের ভিড় নিমেষে পাতলা হয়ে এল। সবাই পোড়ো মন্দিরের ভেতরে গিয়ে ঢুকল এক লাফে। ভাঙ্গা দেউলের মধ্যে যদি ঠাকুর আগলায় ভূতের হাত থেকে। ওদিকে ঘুটঘুটেশ্বর তান্ত্রিক মনে মনে বেজায় ভয় পেলেও মুখের জোরটা বহাল রাখে,
-“কে রে হতচ্ছাড়া মর্কট ভূত! শিগগির দেখা দে। নাহলে এক্ষুনি মন্তর পড়ে তোকে নিকেশ করে যমের দক্ষিণ দোরে পাঠাব। জানিস আমি কে? আমি ঘুটঘুটেশ্বর তান্ত্রিক, আমার গুরু ফটফটেশ্বর তান্ত্রিক, তস্য গুরু কুটকুটেশ্বর ... ”

উড়ন্ত ধুলোগুলো আস্তে আস্তে একটা জমাট অবয়ব ধরে। সেই ধুলোর মূর্তি হা হা করে হেসে বলে ওঠে,
-“ও ঘুটঘুটে তান্ত্রিক! সে সব তো বুঝলুম তুমি বিশাল তান্ত্রিক।
কিন্তু আমি ভূত না মর্কট সেটা তো ঠিক করে দ্যাখো আগে। আর মরা ভূতকে মেরে যমের বাড়ি পাঠাবে! আমার বোধ হচ্ছে তোমার মাথায় ঘিলুর কিঞ্চিৎ অভাব ঘটেছে, দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে এসেছে। দাঁড়াও আমিই তোমার ব্যবস্থা করি।”
এই বলে সেই ধুলোর মূর্তি মানে সুখো ভূত জোরসে ফুঁ দিল। ওমনি মাটিতে রাখা ব্যাঙের ঘিলু, গিরগিটির চোখগুলো সব উড়ে গিয়ে পড়ল ঘুটঘুটেশ্বরের মাথায়। সেসব মাখামাখি হয়ে একসা কাণ্ড! তান্ত্রিক তো রেগে লাল হয়ে আরও জোরে মন্ত্র পড়তে লাগল আর তাণ্ডব নৃত্য করতে লাগল। তখন সেই ধুলোর মূর্তি বেশটি করে গা ঝাড়া দিল। সব ধুলো ঝরে গিয়ে একটা ছাইরঙা ধোঁয়ায় গড়া মূর্তি বেরিয়ে এল। তার আবার মাথায় ধোঁয়ার টিকি, এটাই সুখময়ের আসল রূপ।

এবার সুখময় টিকটা টিং টিং করে নাড়াতেই কাকের পালকগুলো আর শেয়ালের লেজ উড়ে গিয়ে বেদম কাতুকুতু লাগাতে শুরু করল তান্ত্রিককে। সে ব্যাটা তো,
-“তবে রে! হা হা হি হি! দেখাচ্ছি মজা! উহুহু! ভুঁড়িতে নয় ভুঁড়িতে নয়! নচ্ছার ভূত! হো হো হো!”
এই বলে পরিত্রাহী চিৎকার করতে করতে তাণ্ডবনৃত্য ছেড়ে বাঁদরনাচ শুরু করল।
পোড়ো মন্দিরের ভেতর থেকে যত সব চোর ডাকাতের দল তো ভয়ে আধমরা হয়ে সুখো ভূতের হাতে ঘুটঘুটেশ্বরের এই দুর্দশা দেখতে লাগল। সুখো ওদের ভয় দেখানোর জন্য যেই একটু বিকট মূর্তি ধরে দাঁত খিঁচিয়ে তেড়ে গেল, ওমনি সবক’টা মিলে ‘বাবা গো মা গো’ করে পালাতে গিয়ে এমন ধাক্কাধাক্কি শুরু করল যে সেই পুরনো নড়বড়ে দেউলের দেওয়াল ভেঙ্গে হুড়মুড়িয়ে পড়ল ওদের ঘাড়ে।

ওদিকে মণি দারোগা সুখো ভূতকে স্মরণ করার খানিকক্ষণ পর ভাবল,
-“এতক্ষণে সুখো নিশ্চয়ই কাপালিক ব্যাটাকে জব্দ করে ফেলেছে। এবার তবে আমি নিশ্চিন্তে অকুস্থলে যেতে পারি।”
এই ভেবে পুরন্দর আর মাণিকলাল হাবিলদারকে সঙ্গে নিয়ে, ক’টা জংধরা গাদা বন্দুক নিয়ে রওয়ানা দিলেন।
বটুকপুরের জঙ্গলের পোড়ো মন্দিরে পৌঁছে দেখলেন এক বিকটদর্শন কাপালিক চিৎকার করে পাগলের মত নাচছে। শুধু তাই নয়, পোড়ো মন্দিরের দেওয়াল ভেঙ্গে পড়েছে আর তার তলায় একগাদা লোক চাপা পড়েছে। যে সে লোক নয়, এলাকার সব নাম করা চোর ডাকু। আর দেখলেন সুখময়ের ধোঁয়ার শরীরটা পাশের অশ্বত্থ গাছের ডালে বসে ধোঁয়ার ঠ্যাংদুটো দোলাচ্ছে।

তড়িঘড়ি চোর ডাকুগুলোকে আর সেই সাথে ফেরেব্বাজ তান্ত্রিককেও বেঁধে, থানায় নিয়ে গিয়ে সোওওজা হাজতে পুরলেন মণি দারোগা। সুখো ভূতের ভয়ে তাদের আর ট্যাঁ ফোঁ করারও ক্ষমতা ছিল না।

🔹🔹(৭)🔹🔹

এই ঘটনার পর বটুকপুর তো বটেই পুলিশের ওপর মহলেও সুখময় ভূতের কথা রাষ্ট্র হয়ে গেল। পুলিশের বড়কর্তারা ভাবলেন এবারে তো তবে মেডেল সুখময়কে দিতে হয়, মণিময় দারোগা কেন মিছে নাম কামাবেন। কিন্তু সমস্যা একটাই সুখময়ের ধোঁয়ার শরীরের হাওয়ার গলায় মেডেলটা ঝোলাবেন কীকরে। কেউ কেউ সমাধান জানাল, সুখময়ের জীবদ্দশার কোনও ছবি জোগাড় করে তাইতেই মেডেল ঝোলালে হয়। কিন্তু সে উপায়েও সমাধান হ’লনা। কারণ সুখময়ের মনেই নেই তার জীবদ্দশার কথা। মণিময় দারোগার বাড়ির বাগানে হঠাতই নিজেকে প্রেতদশাপ্রাপ্ত অবস্থায় আবিষ্কার করেছিল সুখময়, আর কিছুই মনে ছিলনা। কীভাবে মারা গেল, কী হয়েছিল, কোথায় বাড়ি, কিচ্ছু না! চোর ডাকাতের মুখ দেখে তাদের অতীত জেনে নিতে পারলেও সুখময় নিজের অতীত মনে করতে পারত না। কেজানে হয়ত নিজের মুখটা ধোঁয়াশা হয়ে গিয়ে, দেখতে পেত না, তাই হয়ত। গিন্নিমা প্রথমে বাড়িতে ভূতের আবির্ভাবে ভির্মি খেলেও পরে বেশ পোষা বেড়ালটির মত পোষ মানিয়ে নিয়েছিলেন সুখময়কে। ‘সুখময়’ নামটাও গিন্নিমারই দেওয়া, মণিময়ের সাথে মিলিয়ে।

অবশ্য যাকে মেডেল দেওয়ার জন্য এত চিন্তাভাবনা তার এই বিষয়ে কোনও মাথাব্যথা নেই। সুখো ভূত মাধবের পিসির বাড়ির খড়ের চালে বসে গান শুনতে ব্যস্ত। মাধবের পিসি ভাইপোর ডাকাতির জন্য ভিটেয় যে পাপ লেগেছে তাই শুদ্ধি করতে হরিনামের আসর বসিয়েছে। পিসির আবার ভূতে ভারী ভয় কি না।
“হরি দিন তো গেল ... সন্ধে হ’ল... পার করো আমারে!”
সুখময় চালে বসে তাল দিয়ে হরিনাম সংকীর্তন শুনতে থাকে আর ভাবতে থাকে নামগানের গুনে যদি প্রেতদশা থেকে উদ্ধার পায়। ব্যাটাচ্ছেলের এটাও মনে নেই যে ভূতেদের ‘হরিনাম’ শোনা মানা!

(সমাপ্ত)

(পরবাসিয়া পাঁচালীতে প্রকাশিত)

গল্প : সাদা মৌমাছির দেশে




সাদা মৌমাছির দেশে
সুস্মিতা কুণ্ডু

এক ছিল মৌমাছিদের দেশ। দেশ মানে এই মানুষদের দেশের মত এত্ত বড় দেশ নয়। মৌমাছিদের দেশ হল গিয়ে একটা ফুলে ফুলে ভরা বাগান। সেই বাগানের বড় একটা গাছে একটা পেটমোটা মৌচাক, তার ভেতরে একটা রানি মৌমাছি, আর অনেক অনেক এমনি এমনি মৌমাছি। লাল মৌমাছি, নীল মৌমাছি, হলুদ মৌমাছি, গোলাপী মৌমাছি... আরও কতরকমের মৌমাছি। তোমরা ভাবছ বুঝি, ‘হি হি হি! কী বুদ্ধু দ্যাখো! মৌমাছি যে শুধু হলদে হয় তাও জানেনা!’
হুঁহ্, জানি বাবা জানি! সঅঅঅব জানি। কিন্তু গপ্পো বলতে গেলে ও’রকম একটু আধটু বলতে হয়। বুঝলে? তারপর বাকিটা শোনো তো দেখি মন দিয়ে।

মৌমাছির সেই দেশের রানি হলেন মৌটুসি মৌমাছি। মৌটুসি মৌমাছির আগের রানি ছিলেন ভারি অলস। তিনি কোনও নিয়মকানুন মানতেন না, দেশে তাই বড় অরাজকতা ছিল। যে রঙের মৌমাছিরা দলে ভারি তারা সব ফুলের মধু খেয়ে ফুল নষ্ট করে দিত। তার ফলে অন্য মৌমাছিরা পর্যাপ্ত পরিমাণে মধু পেত না। কিন্তু নতুন রানি মৌটুসি মৌমাছি খুব কড়া। তিনি সারা দেশে নিয়ম করলেন, যে মৌমাছির গায়ে যা রঙ, সে শুধু সেই রঙের ফুলেরই মধু খাবে। যেমন ধরো লাল মৌমাছি খাবে শুধু লাল লাল ফুলের মধু... জবা, লাল গোলাপ, লাল চন্দ্রমল্লিকা এইসব। হলুদ মৌমাছি খাবে সূর্যমুখী, গাঁদা, কলকে, এইসব ফুলের মধু। এমনধারা বন্দোবস্ত আর কী...

মৌটুসি রানির দেশে ছিল একটিমাত্র সাদা মৌমাছি। নতুন আইনকানুনে ঝগড়াঝাটি বন্ধ হয়ে সবারই বেশ সুবিধে হলেও বিপদে পড়ল সাদা মৌমাছি। সাদা ফুল ঢের ঢের হয় বটে, জুঁই, বেলি, গন্ধরাজ... কিন্তু মুশকিল হল সকাল হলেই সব সাদা ফুল শুকিয়ে যায়। তখন তাদের ভেতর থেকে আর একটুকুনও মধু পাওয়া যায় না। এদিকে মৌমাছিরা তো রাতের বেলায় ঘুটঘুট্টি আঁধারে চোখে ভালো দেখতে পায় না। উড়তে গেলে গাছের গায়ে দুমদাম ধাক্কা খায়। তাই সাদা মৌমাছি বেচারা পড়ল ফাঁপরে। মৌটুসি রানিমা খুব রাগী, তাঁর কাছে গিয়ে নালিশ করার সাহস সাদা মৌমাছির নেই। তার ওপর আবার মৌটুসি রাণিমার দেশে নিয়মকানুন বড্ড আঁটোসাঁটো। নালিশ করেও কোনও লাভ হবেনা। মনের দুঃখে সাদা মৌমাছি তার দেশ ছেড়ে লাঠির ডগায় পৌঁটলা করে তার মধু খাওয়ার বাটিটা নিয়ে রওয়ানা দিল। যে দিকে চোখ যায় চলে যাবে।

সবার চোখের আড়ালে দেশ ছেড়ে বিদায় নিল সাদা মৌমাছি। উড়তে উড়তে পৌঁছল পাশের দেশে... মানে পাশের বাগানে। সেই বাগানেও নানা রঙের মৌমাছি বোঁওওও বোঁওওও করে নানা রঙের ফুলে উড়ে বেড়াচ্ছে। সাদা মৌমাছি চোখ বড়বড় করে দেখে, নীল অপরাজিতা ফুলে লাল মৌমাছি বসেছে, লাল রঙ্গন ফুলে হলুদ মৌমাছি বসেছে, হলুদ ঝিটিফুলে বেগনে মৌমাছি বসেছে। কী কাণ্ড! এদের দেশে বুঝি কোনও নিয়মকানুন নেই? কিন্তু কেউ মারপিটও তো করছে না! সবাই হাসি খুশি মুখে নেচে নেচে গেয়ে গেয়ে মধু খেয়ে বেড়াচ্ছে। এমনকি বেশ ক’টা সাদা মৌমাছিও নানা রঙের ফুলে বসে বসে মধু খাচ্ছে। মৌটুসি রানির দেশের সাদা মৌমাছি তো এর আগে অন্য সাদা মৌমাছি দেখেনি, তাই ভারি কৌতুহল হল।

সে গিয়ে নতুন দেশের একটা সাদা মৌমাছিকে ডেকে বলল,
-“হ্যাঁ ভাই শুনছ? বলছি কী তোমাদের এই দেশটার নামটা কী গো?”
সেই সাদা মৌমাছি তখন একটা কমলা রঙের গোলাপফুলের মধু খাচ্ছিল। সে উত্তর দিল,
-“আমাদের দেশের নাম মৌপরী রানির দেশ। তুমি কে গা? তোমায় তো আগে কখনও দেখিনি এখেনে।”
-“আমি মৌটুসি রানির দেশের একমাত্র সাদা মৌমাছি। কিন্তু সে দেশে আমি ভারি বিপদে পড়েছি, তাই দেশ ছেড়ে এখানে এসেছি।”
এই বলে ফোঁৎ ফোঁৎ করে কাঁদতে লাগলো মৌটুসি রানির দেশের সাদা মৌমাছি। মৌপরী রানির দেশের সাদা মৌমাছি তাকে খানিকটা কমলা মধু দিয়ে বলল,
-“আহা! আহা! ওমনি করে কাঁদতে আছে নাকি? নাও দেখি, এই মধুটুকুন গলায় ঢেলে শান্ত হয়ে গোলাপের পাপড়িতে বোসো। তারপর সব খুলে বলো দিকি আমায়।”

অনেকদিন পর পেটপুরে মধু খেতে খেতে মৌটুসি রানির দেশের সাদা মৌমাছি সব কথা খুলে বলল তার নতুন বন্ধুকে। মৌপরী রানির দেশের সাদা মৌমাছি সব শুনেটুনে বলল,
-“এ আবার কী একুশে আইন রে বাবা! লাল মৌমাছি শুধু লাল ফুলের মধু খাবে আর নীল মৌমাছি শুধু নীল ফুলের মধু খাবে। এদিকে সাদা মৌমাছি পেটে কিল মেরে বসে থাকবে। তোমাদের মৌটুসি রানির মাথায় একদম বুদ্ধিশুদ্ধি কিছুই নেই দেখছি। আমাদের মৌপরী রানিকে কেমন মাথা খাটিয়ে নিয়ম করেছেন!”
-“ও তোমাদের দেশেও নিয়ম আছে বুঝি? আমার তো দেখে মনে হচ্ছিল কোনও নিয়ম নেই, যে যেমন খুশি রঙের ফুল থেকে মধু খাচ্ছে।”
-“আছে রে বাবা আছে! সব নিয়ম আছে। রামধনুর সাতটা রঙ হয় জানো তো? বেগনে-নীল-আশমানি-সবুজ-হলুদ-কমলা-লাল। সেই রামধনুর রঙেই আমাদের দেশের সব মৌমাছির সাতটা দিনের খাবারের হিসেব বাঁধা। যেমন ধরো, এই আজ আমি কমলা ফুলের মধু খাচ্ছি, গতকাল খেয়েছিলুম হলুদ ফুলের মধু, আগামীকাল খাবো লাল ফুলের মধু, পরশু খাবো বেগনে, তরশু খাবো নীল, নরশু খাবো আশমানী...”
-“ওরে বাবা থামো থামো বন্ধু! আমার মাথা ঘুরছে এত রঙের মধু শুনে! আমদের দেশে একটা মৌমাছির তো একই রঙের ফুলের মধু খেয়েই সারাজীবন কেটে যায়!”
-“ইসস কী বাজে নিয়ম তোমাদের দেশে বাপু! নানারকম ফুলের মধু না খেলে নানারকম সোয়াদ পাবে কীকরে শুনি? এই যে লাল ফুলের মধু কেমন বাতাসার মত মিষ্টি, হলুদ ফুলের মধু ঝোলাগুড়ের মত, কমলা ফুলের মধু নলেন গুড়ের মত, সবজে ফুলের মধু রসগোল্লার রসের মত, বেগনে ফুলের মধু মিছরির মত...”
-“ফের আমার মাথা চক্কর কাটতে শুরু করেছে বন্ধু!”
-“থাক তবে আর শুনে কাজ নেই তোমার। তোমাকে বরং মৌপরী রানিমার কাছে নিয়ে যাই চলো। উনি ভারি বুদ্ধিমতী। উনিই বরং তোমার সমস্যার একটা উপায় বাতলাবেন।”

মৌটুসি রানির দেশের সাদা মৌমাছিকে নিয়ে মৌপরী রানির দেশের সাদা মৌমাছি গেল রানি মৌপরীর কাছে। রানি মৌপরী সব শুনেটুনে বললেন,
-“মৌটুসি তো আমারই ছোটো বোন। আসলে মৌটুসি বড্ড বদরাগী কিনা তাই রাগের মাথায় হুটপাট করে কড়া কড়া নিয়ম বানায় শুধু। কিন্তু ভালো করে দেশ চালাতে হলে, সবাইকে সুখে রাখতে হলে ঠাণ্ডা মাথায়, অনেক ভাবনা চিন্তা করে কাজ করতে হয়। সবার সুবিধে অসুবিধেই মাথায় রাখতে হয়ে। মৌটুসির দেশের সাদা মৌমাছি তুমি কিচ্ছুটি ভেবোনাকো। আমি গিয়ে বোনকে সব বুঝিয়ে বলে আসব’খন। তুমি বরং ততদিন আমার দেশের ফুলের মধু খেয়ে বন্ধুদের সাথে খেলে বেড়াও।”

তারপর? তারপর আর কী?
মৌটুসি রানির দেশের সাদা মৌমাছি তার নতুন বন্ধু মৌপরী রানির দেশের সাদা মৌমাছির সাথে নানারঙের ফুলে ঘুরে ঘুরে মধু খেয়ে বেড়াতে লাগলো।
এদিকে আমারও যে বড্ড মিষ্টি খেতে ইচ্ছে করছে। যাই দেখি, মায়ের হেঁশেলে নলেন গুড়ের নরম পাকের সন্দেশ আর ক’টা আছে নাকি খুঁজে আসি। তোমরাও বরং ততক্ষণ যে যার প্রিয় মিষ্টিগুলো একবার চেখে নাও দিকিনি।

(সমাপ্ত)

গল্প : কড়াইশুঁটির কচুরী

২৫শে জানুয়ারি,২০১৯-এর ‘আনন্দবাজার স্কুলে’ প্রকাশিত

🔹🔹কড়াইশুঁটির কচুরি🔹🔹
🔹🔹সুস্মিতা কুণ্ডু🔹🔹

॥১॥

ছোটো ছোটো আঙুলগুলো দিয়ে কড়াইশুঁটির খোসাটা ছাড়াতে থাকে কুট্টুস। বিদিশা পায়েসের পাত্রে হাতাটা ঘোরাতে ঘোরাতে নজর করে ছেলেকে। উল্টোদিক দিয়ে খোসাগুলো ছাড়াচ্ছে ছেলেটা। কড়াইশুঁটি পেছনের সরু দিকটায় চাপ দিলেই শুঁটিটা দু’ভাগ হয়ে ভেতরের গোল গোল সবুজ সবুজ কড়াইগুলো বেরিয়ে আসে ঝপ করে। কিন্তু কুট্টুস নখে করে সামনের শক্ত শিরার মত দিকটা খুঁটে খুঁটে শুঁটিটা খুলছে। বিদিশা ওকে বলতে গিয়েও থেমে গেল। বেশ মজা লাগছে কচি কচি হাতের সবুজ সবুজ কড়াইশুঁটির সাথে কুস্তিটা। ফিক্ করে হাসিটা আঁচলে মুছে নিল, কুট্টুস দেখতে পেলেই ‘মা হাসছো কেন? ও মা হাসছো কেন?’ বলে অস্থির করে তুলবে। আর এখন ওর প্রশ্নের বন্যায় উত্তরের বাঁধ দিতে বসলে, হয়ে গেল পায়েস! পায়েস পুড়ে সরভাজা হয়ে যাবে। 

কত রান্না বাকি এখনও! সবে আলুর দমটা হয়েছে। এখনও ছোলার ডাল, বেগুনভাজা, চাটনি হবে। কড়াইশুঁটিগুলো বেটে, তেল মশলা দিয়ে নেড়ে পুর বানাতে হবে, তবে তো কচুরি ভাজা হবে। ভেজানো ছোলার ডালটা প্রেসার কুকারে ঢেলে ঢাকনাটা বন্ধ করে গ্যাসের ওপর বসালো বিদিশা। আঁচটা একটু জোর করে দিলো। তাড়াতাড়ি গোটাচারেক সিটি দিয়ে নিতে হবে। একটু নারকেল কুঁচোতে হবে, নারকেল দেওয়া ছোলার ডাল কুট্টুসের খুব পছন্দের। বাকি কাজগুলো মাথার ভেতর একটার পর একটা সাজিয়ে নিতে লাগলো বিদিশা। এমন সময় হাঁটুর কাছে একটা গোঁত্তা লাগল। বিদিশা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে কুট্টুস হামাগুড়ি দিয়ে মায়ের পায়ের কাছে হাতড়াচ্ছে। 
-“কী করছিস বাবু? কত কাজ পড়ে এখনও আমার! আর তুই এখন হামাগুড়ি দিচ্ছিস কেন কুট্টুসোনা?”
-“মা তুমি একটু সরো তো দেখি, একটা কড়াইশুঁটি গড়গড়িয়ে এইদিকে গড়িয়ে চলে এল। আমি একটু খুঁজে বার করি তো!”
-“ওহ্ হো! একটাই কড়াইশুঁটি তো! থাক না বাবা ওটা। তুই অন্যগুলো ততক্ষণ ছাড়া দেখি সোনা।”

॥২॥

কুট্টুস ফের কড়াইশুঁটির ডাঁইয়ের কাছে ফেরত গিয়ে, ছাড়াতে শুরু করল। বড় জামবাটিটা একটু একটু করে ভরে উঠছে কড়াইশুঁটিতে। এমন সময়ে মালতী এসে ঢুকলো রান্নাঘরে। ঢুকেই হাঁ হাঁ করে উঠল,
-“ও কী বোদিমণি তুমি এত সক্কাল সক্কাল এত রান্না করচ ক্যানো গো? কেউ আসবে নাকি গো বাড়িতে? আমায় কই কাল কিচু বললেনি? আমি তাহলে আগে আগে এসে হাত লাগাতুম। আর ও কী! কুটুবাবু তুমি কড়াই ছাড়াচ্চো ক্যানো? যাও যাও পোড়তে বোসো!  কী সব কাণ্ড! মালতী কি মরে গেছে নাকি? অ বৌদিমণি, কুটুবাবুকে যেতে বলো দিকি পড়ার ঘরে।” 
বিদিশা পায়েসটা নামিয়ে, কড়াটা চাপায় বেগুনভাজার জন্য। 
-“মালতী, তোর কুটুবাবু আজ রান্নাঘর থেকে নড়বেনা, বুঝলি!”
কুট্টুস কড়াইশুঁটি ছাড়ানো থামিয়ে, মালতীকে ঠেলতে ঠেলতে রান্নাঘর থেকে বার করে ড্রয়িংরুমের দিকে নিয়ে চলল।
-“তুমি আজ রান্নাঘরে কিছুতেই আসবেনা! 
বাবাই ও বাবাই! মাতলীপিপিকে টি.ভি.-টা চালিয়ে দাও তো। 
মাতলীপিপি তুমি সোফা থেকে নড়বে না।”

কুট্টুস ছোটোবেলা থেকেই মালতীপিসি বলতে পারে না, বলে মাতলীপিপি। ওর ঠ্যালা খেয়ে মালতী সোফার সামনে মেঝেতে হাঁটু মুড়ে বসল।
-“ও দাদাবাবু! কুটুবাবুর কী হোলো বলো দিকিনি? আমায় এই সাতসক্কালে টিভি দেকতে বস্সে দিল। কতো কাজ পড়ে রয়েচে সোমসারের! বোদিমণি একা একা কত খাটচে!”
প্রমিত হেসে বলে,
-“কুটুবাবুকে সেই জন্ম থেকে বড় করছিস এখনও চিনলিনা মালতী! একবার ওর মাথায় কিছু ঢুকলে যতক্ষণ না সেটা করছে, ও ভবী ভোলবার নয়। তুই মিছে বাধা না দিয়ে ও যা বলছে তাই কর দিকিনি। আমি বরং একবার মোড়ের মাথার মিও আমোরে থেকে ঘুরে আসছি।”
-“দাদাবাবু ওই কেক-প্যাসটির দোকানটা তো? কী আনতে হবে আমায় বলো, তুমি ছুটির দিনে কেন আবার শুদুমুদু বেরোবে? ওই বাদামী রঙের প্যাসটি আনব তো? গেল রোববার কুটুবাবুর জন্মদিনে সব্বাই চেটেপুটে কেক খেয়েচিল। বাদামী প্যাসটিগুলো চকলেট দিয়ে বানায় না গো দাদাবাবু? ওইজন্য অত্ত ভালো খেতে। তবে দাদাবাবু কুটুকে বেশি চকলেট খেতে দিউনি, দাঁতের যন্তন্না হবে, পোকা হয়ে দাঁত ক্ষইবে। আর কুটুবাবুকে একটু বোকো তো, চকলেট খেয়ে মোট্টে দাঁত মাজতে চায়নে। বোদিমণি আর আমি তো বলে বলে সারা! যদি তোমার কথা শোনে তবু!”
-“মালতী তোকে কতবার বলেছি প্যাসটি নয়, পেস্ট্রি! আর কুট্টুস তোর কথা যদি না শোনে তবে আর কারোর কথাই শুনবেনা। এখন যা তোর বৌদিমণির কাছ থেকে একটা বড় ব্যাগ এনে দে দেখি! আমি বেরোই।”

॥৩॥

রান্নাঘর থেকে বিদিশার কানে আসে ওদের গলা, মনে মনে হাসে। আজকের দিনটার প্ল্যানিং যে গত রোববার কুট্টুসের জন্মদিনের দিন রাত্রেই হয়ে গেছে, তা তো আর মালতী জানেনা। জানলে হাঁ হাঁ করে মানা করত তখনই। সেদিন জন্মদিনের উৎসব মিটতে রাত্রে মা বাবার মাঝে শুয়ে শুয়ে কুট্টুস জিজ্ঞাসা করছিল,
-“মা তোমার জন্মদিন গরমকালে হয়, আমার তখন ইস্কুল ছুটি থাকে। বাবার জন্মদিন হয় পুজোর ছুটির সময়। আচ্ছা বিল্টুদাদার জন্মদিনও পুজোর ছুটিতেই হয় তাইনা? আর সেই পুচকি বোনুটার? মনে পড়েছে, বড়দিনের দিন। আচ্ছা বাবা আমাদের মাতলীপিপির কবে জন্মদিন?”
সেই প্রশ্নের উত্তরে বিদিশা বা প্রতীম কেউই দিয়ে উঠতে পারেননি। 

পরেরদিন সকালে কুট্টুস জিজ্ঞাসা করেছিল মালতীকে,
-“ও মাতলীপিপি তোমার কবে জন্মদিন গো?”
মালতী ঘর মুছতে মুছতে প্রথমে বেখেয়ালে উত্তর দিয়েছিল,
-“অ কুটুবাবু! কালই তো তোমার হেপি বাথডেট হল! কত বন্ধু এল, প্যাসটি এল, ফেলায়েড রাইস, চিল্লি চিকেন। আর সব ভুলে গেলে?”
-“আরে না গো না! আমার না। তোমার জন্মদিন কবে?”
-“আমার? আমার আবার জন্মদিন কী গো! ওই কেলাবের ছেলেগুলো ভোটার কার্ডে কী সব তুলে দিল যেন। বর্ষাকালের দিন একটা, শাবন না ভাদরো মাসের। এদিকে ছোটোবেলায় মা জন্মমাস ধরত তখন ঠাণ্ডার দিনে। কোনটে যে ঠিক, কেজানে। বড়বাবার থানে পুজো দিয়ে মা কপালে একটা সিঁদুরের টিপ লাগ্গে দিত, ব্যাস হয়ে গেল জন্মদিন। তবে জানো কুটুবাবু, যে বছর মা মরে গেল, সে বছরই মা আমায় জন্মদিনে কড়াইশুঁটির কচুরি, নতুন আলুর দম আর নলেন গুড়ের পায়েস করে খাইয়েছিল। কার বাড়ি থেকে চেয়েচিন্তে জুটিয়েছিল কিজানি বুড়ি। বুইতে পেরেছিল মনে হয়, সেটাই শেষ বছর।”
মাতলীপিপির চোখের কোলের চিকচিকটা নজর এড়ায়নি কুট্টুসের। অনেক কথা যা বড়রা বোঝেনা, ছোটোদের মনে তা খুব সহজে গেঁথে যায়। 

তারপর থেকেই সারা হপ্তা জুড়ে কুট্টুস তার মাতলীপিপির জন্মদিনের প্রস্তুতি নিয়েছে। আগামী রোববার জন্মদিন পালন হবে। বিদিশা আর প্রতিমও কুট্টুসের প্রস্তাবে মন প্রাণ ঢেলে সাড়া দিয়েছে। কুট্টুস হওয়ার কিছুদিন পরেই যখন খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিল বিদিশা তখন এই মালতীই তো রাতের পর রাত জেগে বুকে করে মানুষ করেছে কুট্টুসকে। আজ যেটা কুট্টুস ভেবেছে সেটা প্রতিমদেরই ভাবার কথা ছিল। কিন্তু নিয়মের মাইনের বাইরে পুজোর শাড়ি আর বোনাস ছাড়া কীই ভেবে উঠতে পারে বড়রা! 

॥৪॥

সামনে টিভি চললেও মালতীর মনে অন্য চিন্তাগুলো ঘুরপাক খেতে থাকে। বোদিমণি যে কী করছে রান্নাঘরে তখন থেকে, মালতীকে ঢুকতেও দেয়নি। দাদাবাবুও দোকান যেতে দিল না। মনটা কেমন লাগছে, মালতী কিছু কাজে ভুল করেনি তো? ওকে ছাড়িয়ে দেবে না তো? কাজ হয়ত অন্য বাড়িতে পেয়ে যাবে কিন্তু কুটুবাবুকে না দেখে কীকরে থাকবে মালতী! চোখদুটোয় জল ভরে আসে মালতীর।  

-“অ্যাই মালতী এই কাপড়টা ধর আর ও’ঘরে গিয়ে বদলে আয় দিকি। সকালে চান করে এসেছিস মনে হচ্ছে তো, চুল ভিজে এখনও। আর তাহলে চানের দরকার নেই, নতুন কাপড়টা পরে ঠাকুরঘরে একটা প্রণাম ঠুকে আয়।”
মালতী টিভি থেকে চোখ সরিয়ে, অবাক হয়ে বিদিশার বাড়িয়ে ধরা হাতের হলুদ তাঁতের শাড়িটার দিকে তাকায়। 
-“অ বোদিমণি! এসব কী গো? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছিনে গো!”
প্রমিত বেশ খানিকক্ষণ আগেই দোকান থেকে ঘুরে এসেছেন। বললেন,
-“তোমার আর বুঝে কাজ নেই! যা বলছে বৌদি তাই করো।”

কাপড় বদলে, ঠাকুরঘরে প্রণাম সেরে এসে মালতি দেখে ডাইনিং টেবলের ওপর একটা বাদামী চকলেট কেক সাজানো। তাতে গোঁজা একটা মোমবাতি জ্বলছে। পাশে কাঁসার থালা বাটিতে ফুলকো ফুলকো কড়াইশুঁটির কচুরী, নতুন আলুর দম আর সোনারঙের নলেন গুড়ের পায়েস। 
একগাল হেসে হাততালি দিয়ে তার আদরের কুটুবাবু গাইছে,
-“হ্যাপ্পি বার্থ ডে টু ইউ, হ্যাপ্পি বার্থ ডে টু ইউ, হ্যাপ্পি বার্থ ডে ডিয়ার মাতলীপিপি, হ্যাপ্পি বার্থ ডে টু ইউ!”
দাদাবাবু আর বোদিমণিও হাততালি দিচ্ছে। 
মালতীর চোখটা যে কেন আবার ঝাপসা হয়ে আসে! 

(সমাপ্ত)

বড়গল্প : কিচিরমিচির


কিচিরমিচির
সুস্মিতা কুণ্ডু

আজ সেই কোন সক্কাল থেকে ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে। চারপাশটা কেমন যেন স্যাঁতস্যাঁতে। জানলার বাইরের একফালি আকাশটা গত দু’দিন ধরে বড্ড ঘোলাটে হয়ে আছে। ধুর! তিতলির একদম ভালো লাগে না এমনধারা বেরঙ আকাশ।
এর চে' ছোটমাসির গত বছরের জন্মদিনে দেওয়া আকাশি গাউনটার মত রঙের আকাশ বেশি পছন্দ ওর। জামাটায় যেমন সাদা সাদা গোলাপ ফুল বানানো ভেলভেটের, আকাশের গায়েও ওমনি সাদা সাদা ঝুমকো ঝুমকো মেঘ যখন ঘুরে বেড়ায়, অবাক চোখে চেয়ে থাকে ও। জানলার গ্রিলটায় মাথাটা চেপ্পে ধরে, মুঠোয় রডগুলো আঁকড়ে, বসে থাকে বিছানার ওপর ঘন্টার পর ঘন্টা।

বাবাই খাটটাকে জানলাটার গায়ে সরিয়ে দিয়েছে একদম, যাতে তিতলি জানলার সামনে বসলেই ওপরে আকাশ আর নিচে ওদের বাগানটা দেখতে পায়। বাগানে মা নিজের হাতে কতরকম ফুলের চারা লাগিয়েছিল ক'মাস আগে। নয়নতারা, বেলি, জুঁই, রঙ্গন, দোপাটি, আরও কত কী। তিতলি সবক'টার নাম জানেনা। প্রতি বছর নানা রকম মরশুমি ফুল লাগায় মা। শীতকালে গাঁদা, ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা সব লাগিয়েছিল। সেগুলো একবার ফুল হয়ে তারপর সব শুকিয়ে মরে গেছে। অন্যান্যবার মা বাবা আর রাঙাপিসি মিলে আগাছা পরিষ্কার করে দেয়। এবারে আর কেউ বাগানের দিকে নজরই করেনি। আগাছায় ভরে গেছে অনেক, শুকনো গাছগুলোও ফেলা হয়নি। রাঙাপিসি কতরকম সব্জি লাগাত, বেগুন, টমেটো, ঢ্যাঁড়স, উচ্ছে, এবারে কিচ্ছুটি লাগায়নি। সবাই যে কেন এত মনমরা হয়ে থাকে! একটুও ভালো লাগেনা তিতলির।

দুটো চড়ুই পাখি ক'দিন ধরে খুব তিতলিদের বাগানে আনাগোনা জুড়েছে। বাইরে যাওয়ার রাস্তাটা বাগানের মধ্যে দিয়েই। নুড়ি বিছানো পথটা তিতলিদের বাড়ির সদর দরজা থেকে শুরু করে বাগানের ভেতর দিয়ে গেছে রাস্তার ধারের গেটটায়। ওই সিমেন্টের থামওয়ালা লোহার দরজা লাগানো গেটটার মাথায় চড়ুইদুটো একবার বসে, আবার ফুড়ুৎ করে উড়ে যায়। তিতলি আগে ভাবত ওরা এমনিই খেলা করে বুঝি, কিন্তু দিন পনেরো আগে ওদের মুখে করে খড় কুটি আনতে দেখে মা'কে জিজ্ঞাসা করেছিল। মা বলেছিল ওরা নাকি বাসা তৈরি করবে।

***************

গেটের থামটায় তিতলিদেরও এই বাসার নামটা লেখা আছে, 'পদ্মালয়', সাথে বাবার মায়ের রাঙাপিসির আর ওর নামও আছে, সাদা শ্বেতপাথরের ওপর কালো কালো অক্ষরে। ঠিক তার নিচে একটা ছোট্ট খুপরি আছে। লেটার বক্স করার জন্য ছিল, কিন্তু আর বসানো হয়নি। ওদের বাড়িটায় অনেক কিছুই এরকম অসমাপ্ত, অসম্পূর্ণ পড়ে আছে। তাতেই খড়কুটো জমা করে বাসা বানাচ্ছে চড়ুইদুটো। ওদের বাসাটাও তিতলিদের বাসাটার মত, অসম্পূর্ণ।

তিতলির মায়ের অনেকদিনের স্বপ্ন একটা নিজের বাড়ির, আর একটা বাগানের। শহর থেকে দূরে তাই এই মফস্বলে একটু জায়গা কিনে বাড়ি বানাতে শুরু করেছিল বাবা। কিন্তু মাঝপথে সব থমকে গেল। দু’দিকের বিশাল খরচ সামলানো যে খুব শক্ত, সেটা তিতলির মত ছোট্ট মেয়েও বোঝে। বাড়িটায় এখনও রঙ হয়নি, প্লাস্টার হয়েই পড়ে আছে ভেতরে বাইরে। পাঁচিল আর গেটটা অবশ্য আগের জমির মালিকেরই দেওয়া ছিল, ওরা নতুন নেমপ্লেটটা বসিয়ে নিয়েছে। সিঁড়ির ওপরের ছাদটাও টিন দিয়ে ঢাকা। তিতলি ছোট্ট চিবুকটা হাতের ওপর রেখে ভাবতে থাকে, কবে যে আবার বাগানটায় যাবে!
নতুন জায়গায় এসে পুরোনো স্কুলের, পাড়ার বন্ধুদের জন্য বড্ড মন কেমন করছিল। এখানের স্কুলটায় সবে যেতে শুরু করেছিল, কিন্তু সে’রকম কোনও বন্ধু হওয়ার আগেই ও ঘরবন্দী হয়ে গেল।

কী পচা একটা অসুখ যে ওর হয়েছে! কিছুদিন ছাড়া ছাড়াই হসপিটালে যেতে হয়, ডাক্তার কাকু, সিস্টার দিদিরা সব ইঞ্জেকশন দেয়। আরও কীসব কঠিন কঠিন পরীক্ষা হয়। তিতলির বড় কষ্ট হয়। এদিকে নল ওদিকে পাইপ সব নিয়ে যেন নিজেকে কেমন ওই এলিয়েনদের মত দেখতে লাগে। আচ্ছা সিনেমায় দেখায়, এলিয়েনদের কত ক্ষমতা। একটা অমন এলিয়েন যদি তিতলি পেত, কী ভালোটাই না হ’ত। ওর সব রোগ এলিয়েন বন্ধু সারিয়ে দিত ম্যাজিক করে।
কিন্তু ওগুলো মনে হয় শুধু সিনেমায়, গল্পেই হয়। সত্যি সত্যি মানুষ মরেই যায়। যেমন ঠামাই চলে গেল। ঠামাই চলে যেতে ওই বাড়িটায় আর কারোর মন বসত না। রাঙাপিসিও সারাদিন মন কেমন করে ঘুরত, তাই তো ওরা এখানে চলে এল আরও। কিন্তু আসার মাসকয়েক পরেই তিতলির এই অসুখ ধরা পড়ল, সবাইকে এক নিমেষে ভাসিয়ে দিল চিন্তার সাগরে।

******************

দুপুরে আকাশ ভেঙ্গে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি এল। সে কী জলের ঝাট। তিতলির বিছানাটা জানালার ধারে, আরেকটু হলেই ভিজে ঢোল হয়ে যেত। বাবাই এসে শিগ্গির জানলাগুলো বন্ধ করে দিল। একটু আলতো করে বকে তিতলিকে বলল,
-“হ্যাঁ রে মেয়ে! বৃষ্টির জল আসছে ডাকবি তো গলা তুলে কাউকে।”
আজকাল তিতলিকে কেউ ঠিক করে বকেও না। কী কাণ্ড দেখো! তিতলি নাকি বকুনিও মিস করছে। সত্যি সত্যি ওর শরীর খারাপ করেছে।
আসলে বৃষ্টির ঝাট গায়ে এসে পড়লেও ও তখনও চড়ুইদুটোকে দেখেই চলেছিল। বড্ড ভিজে গেছে পাখিদুটো, তাও ওই সিমেন্টের থামের খোপটার মুখে কী যেন আড়াল করে বসে আছে। সেটাই উঁকিঝুঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করছিল ও, মানে যতটা ওই দেখা যায় আর কী জানলার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে।
নাহ্! ভালো করে কিছু বুঝতে পারা যাচ্ছেনা এতদূর থেকে।

-“অ্যাই তিতলি দুধ খাবি?”
রাঙাপিসির ডাকে মুখ ফিরিয়ে চাইল তিতলি। হাতে দুধের গ্লাসটা নিয়ে দাঁড়িয়ে।
তিতলি একগাল হেসে বলে,
-“এ্যাই রাঙাপিসি! এদিকে আয়, শোন শোন। দ্যাখ ওই থামে দুটো চড়ুই পাখি। কদ্দিন ধরে আসছে ওরা। দেখেছিস ওদের তুই?”
-“হ্যাঁ তো দেখেছি তো। ওরা তো বাসা গড়েছে ওই থামের ফোকরটায়। তুই জানিসনা তিতলি? ঐ যে রে যেখানটায় দাদা বলেছিল লাল একটা লেটারবক্স লাগাবে।”
-“তাআআআই রাঙাপিসি? কী মজা! বাসার ভেতর বাসা। কী দারুণ না?”
-“তাই তো! আমাদের বাসার ভেতর ওদের বাসা! এ্যাই জানিস জানিস, ওরা আবার ডিম পেড়েছে।”
-“চড়ুইপাখির ডিম!!! কেমন দেখতে রে রাঙাপিসি? আমায় বাগানে একবারটি নিয়ে যাবি দেখাতে রে?”
-“তোকে নিয়েই যাব তো। তিনটে কেমন ছাই ছাই রঙের ডিম। এই ছোট্ট ছোট্ট ঠিক মার্বেল গুলির মত।
এ্যাই তিতলি কদ্দিন মার্বেল খেলিসনি আমার সাথে।
হ্যাঁরে তুই কবে ঠিক হবি রে? এ বছর দেখ আমি একা একা একটাও গাছ লাগাতে পারিনি। দাদা বৌদিও সবসময় মন খারাপ করে থাকে। আমার মোট্টে ভাল্লাগেনা রে তিতলি।
তুই শিগ্গির সেরে যা তো, আমরা ফের এক্কা দোক্কা খেলব বাগানে।”

***********

তিতলির খুব মায়া হয় রাঙাপিসির জন্য। আহারে সত্যিই তো বড্ড একা হয়ে পড়েছে, ওর সঙ্গীটা। সবাই বলে রাঙাপিসি আর পাঁচজনের মত স্বাভাবিক নয়। নামেই রাঙাপিসির বয়স অনেক, আসলে রাঙাপিসি ওরই মত বাচ্চা। এই কারণেই নাকি রাঙাপিসির বে’থা হয়নি, ঠাকুমা বলত আর দুঃখ করত।
কিন্তু তিতলি রাঙাপিসিকে খুব ভালোবাসে। বড় হতে তিতলির একদম ভালো লাগে না। বাবার অফিস, মায়ের সংসারের কাজ, কত্তরকমের কঠিন কঠিন সমস্যা! নাহ্ নেহাতই যদি বড় হতে হয় তিতলি মোটেও ডাক্তার অ্যাস্ট্রোনট কিচ্ছু হতে চায় না। ও বড় হয়ে রাঙাপিসি হতে চায়, ওরকম বাচ্চাই থাকতে চায়।
-“অ্যাই তিতলি যাবি... যাবি? চড়ুই পাখির বাসা দেখতে? কী ভাবছিস অ্যাত্ত তখন থেকে?”
-“কিছু না রে রাঙাপিসি! কাল তো আমার ডাক্তারখানা যাওয়া। কীসব রিপোর্ট আসবে। তাই দেখে ডাক্তারকাকু বলবেন আমি সেরে যাব না মরে যাব।”
-“অ্যাই তিতলি তুই সত্যি সত্যি মরে যাবি রে? তুই মরে গেলে আমিও না মরে যাব। আমার একা একা বড় কষ্ট হয়। আমার তো তোর মত ইস্কুল নেই যে নতুন বন্ধু হবে। মা-ও আমায় না বলে দুম করে মরে গেল। এখন তুইও যদি মরে যাস...”

************

-“আহ্ ঠাকুরঝি ফের এসব উল্টোপাল্টা কথা বলছো তুমি। তোমার দাদা না মানা করেছে তোমায়। যাও দেখি, টেবিলে মুড়িমাখা আছে কাঁসীতে, ঝটপট খেয়ে নাও গিয়ে। নইলে একটু বোসো, আমি তিতলিকে ওষুধটা খাইয়ে তারপর তোমায় তরকারি মেখে ডেলা ডেলা করে খাইয়ে দেবখ’ন মুড়ি।”

-“মা! কাল আমার রিপোর্ট আসবে, না গো? মা আমি আবার আগের মত হব? স্কুলে যাব, বাগানে খেলব, সবরকম খাওয়ার খাব?”

-“হ্যাঁ রে মা! হবিই তো! এই দিনটার আশাতেই তো বসে আছি কবে থেকে রে মা। আমি যাই এখন, রাজ্যের কাজ পড়ে।”
চোখের জল লুকোতে রান্নাঘরের দিকে ছুটলেন অনুমিতা। কত মিথ্যে প্রবোধ দেবেন নিজেদের আর ওই একরত্তি মেয়েটাকে।
ডাক্তারবাবু কথাটা যে কানে ভাসছে।
-“এ ধরনের রোগ লাখে একটা সারে। তিতলি সেরে উঠলে সেটা মিরাক্যল হবে চিকিৎসা শাস্ত্রের মতে।”

মিরাক্যল কি হবে কাল? রিপোর্টগুলো কি মিথ্যে করে দেবে সেই অমোঘ ভবিতব্যকে?

হতাশ দুই মা বাবা ছলনাময়ী আশার প্রলোভনে বুক বাঁধে নতুন করে।

************

-“বড্ড ঝড় গেল কাল রাত্তিরে তাই না? উফ এতদিন পর জানো ঝড় বৃষ্টি রোদ এসব নিয়ে চিন্তা করার কথা মাথায় এল। নাহলে তিতলির চিন্তাতেই চব্বিশ ঘন্টা...”

-“আর ও’কথা ভেবনা অনু। বিপদের দিন কেটে গেছে। আজ যেমন ঝড় হয়ে মেঘ কেটে গেল তেমনি আমাদের জীবনের কালো মেঘও কেটে গিয়ে রোদ ঝলমলে সূর্য উঠেছে।”

-“জানো তো, আমার মনে হয় ভগবানই বুঝি কাল থেকে আমাদের মনের অবস্থা বুঝে প্রকৃতিকে এঁকেছেন। কাল থেকে মেঘের মতই আঁধার গুমোট হয়েছিল মনটা। তারপর সারাদিন বুকের মাঝে ঝড়। কী বলবেন ডাক্তারবাবু! আমাদের তিতলি সেরে যাবে তো?”

-“ঠিক বলেছ অনু। আজ বিকেলে যখন ডাক্তারবাবু আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘বিক্রমবাবু, মিরাক্যল ঘটেছে।’ আমি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলামনা। তারপর হসপিটাল থেরে বাইরে বেরিয়ে দেখি মেঘ কেটে গোধূলীর আলো ফুটেছে। আমাদের তিতলি বিপদ মুক্ত।”

বহুদিন পর সন্ধেবেলায় চায়ের কাপ হাতে এভাবে গল্প করতে বসল মনে হয় বিক্রম আর অনুমিতা, তিতলির বাবা-মা। তিতলির ঘর থেকে কচি গলার আওয়াজ আসে,
-“বাবাই, মা, আজ রাঙাপিসি আমার কাছে শোবে প্লিজ প্লিজ। আজ যে তোমরা বললে সব ঠিক হয়ে গেছে...”

ডাইনিং টেবল থেকে হেঁকে বিক্রম বলেন,
-“তাই হবে মা, তাই হবে। রাঙা আজ তোর কাছেই শোবে।”
-“তাহলে তো সারারাত গপ্পোই বেশি হবে ঘুমের চেয়ে।” ছদ্মরাগে বলেন অনুমিতা। যদিও গলার সুরে প্রচ্ছন্ন সম্মতিরই লক্ষণ।

**************

-“অ্যাই তিতলি আমার না ভারী আনন্দ হচ্ছে আজ। তুই আর আমায় ছেড়ে কোত্থাও যাবি না।”
আনন্দে তিতলিকে জড়িয়ে ধরে রাঙাপিসি। তিতলিও পিসিকে জড়িয়ে ধরে বলে,
-“না রে রাঙাপিসি। আমরা আবার আগের মত থাকবো। খেলব, গাইব, গাছ লাগাব। এই রাঙাপিসি আমাকে কাল সকালে চড়ুই পাখির বাসাটা আর ডিম দেখাতে নিয়ে যাবি রে?”

চড়ুই পাখিদের কথা শুনে নিমেষে মুখে আঁধার নেমে আসে রাঙাপিসির। কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে,
-“এ যাআআআহ্ তিতলি! তোকে তো বলাই হয়নি। আজ তো দুপুরে আমি তোদের জন্য কতক্ষণ অপেক্ষা করলাম। তারপর বাগানে একা একা গিয়ে বসে রইলাম। কী কাণ্ড দেখি জানিস? চড়ুইদুটো খুব কাঁদছে। ঝড়ে ওদের বাসা পড়ে গিয়ে তিনটে ডিমের একটা ভেঙ্গে গেছে। মোটে আর দুটো গোটা রয়েছে। আমি আবার ডিমশুদ্ধু বাসাটা ওই খোপটায় তুলে দিয়ে এলাম।”

রাঙাপিসির মুখে এ কথা শুনে তিতলি তো থ’। মনটা ভারী খারাপ হয়ে যায় তিতলির। মাথা নেড়ে বলে,
-“কী বলছিস রাঙাপিসি! ইসসস চড়ুই মা বাবাটার কত কষ্ট হচ্ছেরে। আমায় যখন ইঞ্জেকশন দেয়, ডাক্তারকাকু মাথা নেড়ে নেড়ে কীসব বলে, তখন মা বাবাইও কত কষ্ট পেত। চড়ুইরাও তো মা বাবা বল? ওদের না জানি মনে কত ব্যথা লেগেছে। আমি কাল সকালেই বাবাইকে বলব ওই দুটো ডিমসহ বাসাকে আমাদের বারান্দাটায় তুলে আনতে। তাহলে ওই ডিমগুলোর আর কিচ্ছু হবে না।”

***********

-“চড়ুই-বৌ, লক্ষ্মীটি আর কেঁদোনা অমন করে।”
-“কাঁদবো না গো? আমার অমন সুন্দর ছানাটা অকালে চলে গেল! ভগবান কী নেই? ঝড় পাঠিয়ে আমাদের খড়কুটোর বাসা ভেঙ্গে কী পেলেন উনি? আমার বাছার পেরাণটা নিয়ে কী লাভটা হ’ল ওঁর!”
-“এভাবে বোলো না চড়ুই-বৌ! ভগবান অত নিষ্ঠুর নয়।”
-“তুমি এখনও এই কথা বলবে, চড়ুই?”
-“হ্যাঁ গো বলব। তুমি তিতলির খবরটা শোনোনি বুঝি?”
-“না তো! আবার কোনও খারাপ খবর দিওনা তুমি। আমি সইতে পারব না।”
-“তিতলি সুস্থ হয়ে উঠেছে। আর এ নাকি জাদু, নইলে মানুষের ক্ষমতা ছিলনা তিতলিকে সারানোর।”
-“জাদু!”
-“হ্যাঁ গো চড়ুই-বৌ, হ্যাঁ। জাদু! স্বয়ং ঈশ্বর করেছেন। আমাদের যে ছানাটা অকালে চলে গেল, সে তো সত্যি সত্যি যায়নি। তার প্রাণটা ঈশ্বর তিতলির ভেতরে ভরে দিয়েছেন যে। এখন এই বাকি দুই ছানা, কিচির আর মিচির-এর মত তিতলিও আমাদেরই সন্তান গো।”
-“এমনটাও হয় গো? তুমি সত্যি বলছ?”
-“হয় না আবার? এই মাত্র তো তিতলির ঘরের জানলায় বসে শুনে এলুম, তিতলি ওর রাঙাপিসিকে বলছে, আমাদের বাসাটা ওদের ঘরের বারান্দায় তুলে নিয়ে গিয়ে রাখবে।”
-“ভগবান মঙ্গল করুক ওদের। কিচির মিচির আর তিতলি, তিন ভাইবোন একসাথেই বড় হোক তবে। হ্যাঁ গো আমায় একবার নিয়ে যাবে ঐ জানলাটায়, যেখান থেকে তিতলির কথা শোনো তুমি?”
-“কেন নিয়ে যাবোনা? চলো না চলো।”

***************

-“এই রাঙাপিসি ওঠ ওঠ, ওঠ না। সুয্যিমামা মাথায় উঠল যে। জানিস কাল রাত্রে কী অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছি।”
-“উমমম তিতলি, এই জন্য তোর কাছে শুই না। হাবিজাবি স্বপ্ন দেখবি আর আমায় তুলে দিবি।”
-“তুই শোন না। কাল স্বপ্নে দুটো চড়ুই পাখি, ওই যে রে যারা ওই বাগানের গেটটার থামের ফোকরে বাসা করেছে, তারা এই জানলাটায় এসেছিল।”

তিতলির কথা শুনে রাঙাপিসি বিছানায় উঠে বসল চোখ রগড়ে।
-“স্বপ্ন... চড়ুই...”
-“হ্যাঁ রে! তুই বললি না যে ঝড়ে ওদের ডিম নষ্ট হয়ে গেছে। আসল তা হয়নি। ওই ডিমের ছানাটার প্রাণটা ঠাকুর আমার মধ্যে ভরে দিয়েছেন। তাই তো আমার রোগ সেরে গেছে। ডাক্তারকাকু বললেন না মিরাক্যল!”
-“মিরাক্যল মানে কী রে তিতলি?”
ঢুলুঢুলু রাঙাপিসির গালটা টিপে দিয়ে তিতলি বলে,
-“তুই না কিচ্ছু জানিসনা! মিরাক্যল মানে ম্যাজিক... জাদু। ওই জাদু করেই ঠাকুর আমায় চড়ুই পাখির ছানার প্রাণটা দিয়ে দিয়েছেন। তাই তো চড়ুই মা আর চড়ুই বাবা আমার কাছে এসেছিল স্বপ্নে...”
খিলখিল করে হেসে রাঙাপিসি বলে ওঠে,
-“ওই দেখো, আমায় বোকা বলিস, আসলে তুই-ই একটা বোকা। স্বপ্ন হবে কেন? সত্যি সত্যি এসেছিল তো ওরা কাল রাত্রে। বলল, ওদের আরও দুটো ছানা, কিচির আর মিচির-এর মত তিতলি, তুইও ওদের ছানা।”
তিতলি অবাক হয়ে চিৎকার করে ওঠে,
-“হ্যাঁ হ্যাঁ কিচির মিচির, এই নামদুটোই তো বলেছিল। আমরা দু’জন কি তবে একই স্বপ্ন দেখলুম? না কি সত্যি সত্যিই এসেছিল ওরা?”

এমন সময় মা বাবা ঘরে ঢোকে। অনুমিতা বলে ওঠেন,
-“দুই মূর্তিতে সক্কাল সক্কাল কী কিচিরমিচির করছিস পাখির মত?”
বিক্রম বলেন,
-“আমাদেরও বল দেখি তোদের সব রহস্য গল্প।”

তিতলি আর রাঙাপিসি একে অপরের মুখ চেয়ে হেসে ওঠে। ঈশারায় বুঝি বা কিছু কথা হয়।
শ্ শ্ শ্... সব কথা বড়দের জানতে নেই...

(সমাপ্ত)

একপর্ণিকা ওয়েব ম্যাগাজিনে প্রকাশিত।

গল্প : বাঁদরনাচ

বাঁদরনাচ
সুস্মিতা কুণ্ডু

ডাউন মেচেদা-হাওড়া লোকাল প্লাটফর্মে এসে দাঁড়াতেই হুড়মুড় করে ভেণ্ডার কামরা থেকে তিন চারটে পোঁটলা পুঁটলি সহ আলুথালু চেহারার একটা লোক নামল। নামল না বলে ধাক্কা মেরে নামানো হ’ল বলাই ভালো। আরও দু’চারটে লোক গুটি গুটি করে প্রায় সবক’টা কামরা থেকেই নামল। ভর দুপুরে প্লাটফর্ম আর ট্রেন দুটোই প্রায় ফাঁকা। আপিসটাইমের দৌড় ঘন্টা তিন চারেক আগেই শেষ হয়ে গেছে, ফের শুরু হবে আবার বিকেল পাঁচটা থেকে উল্টোদিকের ‘আপ’ গাড়িগুলো যাওয়ার প্লাটফর্মে।

হুড়মুড়িয়ে নামা লোকটা আস্তে আস্তে ধুলো ঝেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে হাতের পোঁটলাগুলো সব রাখল সিমেন্টের লাল লম্বা বেঞ্চটায়। আকাশী আর সাদায় চেক-কাটা একটা লুঙ্গি আর লাল রঙের নামী কোম্পানির লোগো দেওয়া একটা রংচটা ববলিং ওঠা গেঞ্জি। গালে খিমচি কেটে ধরা যাবে এমন নুন-মরিচ দাড়ি, উস্কোখুস্কো চুল মাথায়। লোকটা বেঞ্চের ওপর বসতেই একটা বাদামী আর গোলাপী ফুলকাটা ছিটের কাপড়ের পোঁটলা লাফিয়ে লোকটার ঘাড়ে উঠে পড়ল। তাই দেখে, সামনের চায়ের দোকানের ঝাঁপ বন্ধ করতে থাকা বাচ্ছা ছেলেটার হাত থেকে জংধরা তালাটা ঠং করে কংক্রিটের প্লাটফর্মে পড়ে গেল। আরও এদিক ওদিকের লোকজন বিস্ময়ে চেয়ে রইল লোকটার দিকে।

এ রামোঃ! পুঁটলি কোথায়? এ তো একটা বাঁদর! ওই তো, আরেকটা বাদামীর ওপর হলুদ চকরাবকরা পুঁটলিও নড়ছে।
দুটো বাঁদর, মানে একটা বাঁদর আর আরেকটা বাঁদরী। অন্তত ওদের বেশভূষা তাই বলছে। একটার পরনে গোলাপী ফুল ফুল ফ্রক, গলায় সস্তা পুঁতির মালা। অন্যটার অঙ্গে বছর তিনেকের কোনও বাচ্ছার হলুদ রঙের পুরনো শার্ট, আর একহাতে একটা প্লাস্টিকের সবুজ খেলনা ঘড়ি। লোকটা তার মানে বাঁদরের খেলা দেখায়। বাঁদরগুলো বড় বাধ্য, চেন বা দড়ি কিছু দিয়েই আটকানো নেই তবুও ওদের মালিকের পাশ ছেড়ে নড়ছেনা। শুধু দুটোতেই লোকটার ঘাড়ে উঠে বসে জুল জুল করে চায়ের দোকানের সামনের নোংরা ঝুড়িতে পড়ে থাকা বাপুজী কেকের মোড়কগুলোকে দেখছে।

-“কা রে জাকি বিটিয়া? কা রে শরফ? ভুক লাগি কা? রুক যা বিটুয়া তনিক। তোহ্ কা হাম লাড্ডু খিলাইবে, নাহি নাহি! কেকওয়া খিলাইবে।” কোলে নামিয়ে নিয়ে পোষ্য দুটোকে আপন মনে বলতে থাকে লোকটা, গায়ের বাদামী লোমে বিলি কাটতে কাটতে। অনেকদিন আগে একটা সিনেমা দেখেছিল বিনি টিকিটে হলে ঢুকে। একটা ভারী প্রভুভক্ত কুকুরের গল্প, ‘তেরি মেহেরবানিয়া’। তারপর কী কান্না কেঁদেছিল ওর পোষা ছোট্ট চুন্নু আর মুন্নুকে জড়িয়ে। নায়কটাকে খুব মনে ধরেছিল, তাই ওদের নাম বদলে সেদিনই রেখেছিল ‘জাকি’ আর ‘শরফ’। খেলা দেখাতে গিয়ে কেউ মজা করলে বলে, “নাম মে কা হ্যায় বাবুজী? যো আচ্ছা লাগা উসি নাম সে পুকারিয়ে, হামার জাকি অউর শরফ বদলেঙ্গে থোড়ে হি!”

“হোয়াটস্ ইন আ নেম” শেক্সপীয়র সাহেব, “হোয়াটস ইন আ নেম”। তোমার বাক্যি এতটা গভীরে ক’জন বোঝে গো।

পাশের সিমেন্টের বেঞ্চে আরেকটি পরিপাটি পরিবার ততক্ষণে এসে বসেছে, পরের ট্রেনের অপেক্ষায়। বিরক্তমুখের গম্ভীর বাবা, সম্ভবত আগের ট্রেনটি টার্গেট করেও মিস করার কারণেই, বারবার ঘড়ি দেখছেন। মা’টি গরমেও ভারী একটা জমকালো শাড়ি পরে গলদঘর্ম, সেইসাথে উটকো সোনার আভরণের উৎপাত তো আছেই। বছর ছয়েকের মেয়েটা ভারী মিষ্টি, পুটুর পুটুর করে একবার চায়ের দোকানের কাপ ডিশ ধোয়ার বাচ্ছা ছেলেটাকে দেখছে, আবার কখনও ‘জাকি’ আর ‘শরফ’ কে দেখছে। ভারী গম্ভীর সেই বাবাটি খানিকটা দূরে প্লাটফর্মের নাম লেখা গোল মত লোহার প্লেটটার নিচে লাগানো টাইমটেবিলটার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলেন।

এদিকে গুটি গুটি পায়ে চায়ের দোকানের ঝাঁপ ফেলে ছেলেটি এসে দাঁড়িয়েছে বাঁদরের মালিকের সামনে।
-“ইকটু বাঁদরলাচ দিখাবেনি চাচা?”
-“বাবুয়া ইকজনের জন্য খিলা দিখাব? লস হো যায়গা বেওসার”
-“আরে ফিরি-তে দেখবনি গো চাচা, এই কেক টা দিব তোমার বাঁদরগুলোকে।”

কী মনে করে হেসে ওঠে লোকটা, তারপর সামনে একটা প্লাস্টিক পাততে শুরু করে, বাঁদুর দুটোকে ওটায় নামিয়ে ঝোলা থেকে একটা ডুগডুগি বাজিয়ে শুরু করে...
-“তেরি মেহেরবানিয়া জনাব... আসুন আসুন খিলা দেখুন হিরো অউর হিরোইনের...জাকি শরফ... “
মণিবের আদেশমত নানা খেলা শুরু করে দুই পোষ্য। অপার বিস্ময়ে দেখে হাফপ্যান্ট পরা বছর আষ্টেকের আরেকটা খেটে খাওয়া মানুষ। খেলার মাঝে হাত বাড়িয়ে কেকটা দেয়, জাকি লাফিয়ে এসে কেকটা নেয় ছোট্ট কড়া পড়া মুঠোটা থেকে।

আরও একজোড়া কাজল পরা চোখও কিন্তু তার দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছে এদিকেই। তার মা ব্যস্ত ফোনে,
-“হ্যাঁ হ্যাঁ... ভেবোনা... বিকেলের আগেই পৌঁছব... লগ্ন তো সন্ধেয়... পার্লারের লোক এসে গেছে? আমার চুলটা কিন্তু...”
গোধূলী লগ্নে বিয়ে মনে হয়।

মায়ের অন্যমনষ্ক থাকার সুযোগে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসে কমলা ফ্রক। তন্ময় হয়ে হাফপ্যান্টওয়ালার পাশে দাঁড়িয়ে দেখে। এমন সময় একটা গ্যালপিং মেদিনীপুর লোকাল তীব্র হর্ণ বাজিয়ে গাঁক গাঁক তেড়ে আসে প্লাটফর্মের পাশে, ‘ডাউন’ লাইন ধরে। আওয়াজে চমকে গিয়ে ‘জাকি’ লাফ মেরে দেয় সামনের কমলা ফ্রকের গায়ে। ভয়ে চেঁচিয়ে ওঠে শিশুটি। ইতিমধ্যে টাইমটেবল দেখে তার বাবা এসে গেছে সামনাসামনি। তড়িঘড়ি ছুটে এসে মেয়ের গায়ের ওপর থেকে বাঁদরটাকে তুলে ধরে ছুঁড়ে দেয় অসম্ভব রাগে, প্লাটফর্মের অপরদিকের এক্সপ্রেস ট্রেন যাওয়ার লাইনটায়। প্লাটফর্মের কোনে মাথা ঠুকে নিচের লাইনে পড়ে জাকি। টাইমটেবলের লোকাল ট্রেনের লিস্টের বাইরের একটা দূরপাল্লার নীল দৈত্য ঝমঝম করে তখনই ছুটে চলে যায় ওর ওপর দিয়ে....

দোকানের ছেলেটি আকূল হয়ে দৌড়ে যায়। থ্রু এক্সপ্রেস ট্রেনটার পেরোনোর মিনিটখানেক সময়টুকু অনন্ত লাগে। মেয়েটি আরেকবার চিৎকার করে মুখ লুকোয় দু’হাতের চেটোয়। লোক জমা হয়ে গেছে ততক্ষণে। ছেলেটি এক লাফে লাইনে নেমে খানিকটা এগিয়ে যায়। দুচোখে জল নিয়ে তুলে আনে  গোলাপী বাদামী একটা ছিন্নভিন্ন দলাপাকানো শরীর...

স্তম্ভিত সকলে, ফোন রেখে মা ছুটে এসে কোলে তুলে নেয় মেয়েকে, চোখে তীব্র ঘৃণার দৃষ্টি স্বামীর দিকে। বাকি জনা কয়েক মানুষেরও চোখেও ভৎর্সনা। শুধু ‘জাকি’-র মালিকেরই চোখটা বোজা। কাঠের মত স্থির হয়ে গেছে তখনই, যখন জাকি-কে ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছিল মাঝের লাইনের ট্রেনটার সামনে।
প্লাটফর্মের দুদিকের লাইন দিয়ে দুটো ট্রেনের সবেগে ছুটে যাওয়া, তীব্র আওয়াজ, ঘটনার আকস্মিকতা, কিছুই টলাতে পারেনি আরেকটি ছোটো প্রাণীকে তার পারফর্মেন্স থেকে। “দ্য শো মাষ্ট গো অন”। ময়লা প্লাস্টিকটার ওপর দু’হাত অঞ্জলি করে দাঁড়িয়ে আছে ‘শরফ’, খেলা শেষের অভ্যাসের প্রাপ্যর আশায় বুঝি। চোখ খুলে অদ্ভুত দৃষ্টিতে সামনের ভদ্রলোকটির দিকে তাকিয়ে ‘জাকি’ আর ‘শরফ’-এর মালিক বলে ওঠে,
-“বাবুজী, খিলা দিখায়া, মেহেরবানি করকে কুছ...”

(সমাপ্ত)
(এখন কবিতার কাগজে প্রকাশিত)

ছোটোগল্প : ছাতার মাথা


ছাতার মাথা
সুস্মিতা কুণ্ডু

ছাতাটা হাওয়ায় ভেসে ভেসে, মাটিতে গড়িয়ে গড়িয়ে লুটোপুটি খেয়ে বেড়াচ্ছিল। অবশেষে একটা  শুকনো গাছের তলায় এসে একদণ্ড জিরেন নিতে বসল। একটা আলাভোলা লোকও সেই গাছের তলায় জিরোচ্ছিল। ছাতাটা দেখে ভাবল,
-“বাহ্ রে! এটাকে বগলদাবা করি। বৃষ্টি ব্যাটাচ্ছেলে আমাকে সময়ে অসময়ে ভিজিয়ে হাপুশুটি করতে পারবে না আর।”
আলাভোলা পাগলা লোকটা ছাতাটা মাথায় দিয়ে আনন্দে নাচতে নাচতে চলল গ্রামে। গ্রামে ছিল একটা ধূর্ত লোক। তার ছিল একটা হরেক কিসিমের জিনিসের দোকান। সে শক্তপোক্ত ছাতাটা পাগলাটার মাথায় দেখে ভাবলে,
-“বাহ্ রে! একে ঠকিয়ে ছাতাটা নিয়ে নিতে পারলে বেশ শতখানেক টাকায় বেচে দেওয়া যাবে তো!”
যেমনি ভাবা তেমনি কাজ।
-“এই পাগলা! ক্যাডবেরি খাবি? তবে ছাতাখানা দে!”
আলাভোলা পাগলা তো ক্যাডবেরির লোভে ছাতাটা ধূর্ত দোকানদারকে দিয়ে দিল। তারপর দু’টো সস্তার লজেঞ্চুস নিয়ে সেগুলোকেই ক্যাডবেরি ভেবে খেতে খেতে চলে গেল। ছাতার খুব রাগ হল। ইসস! সরল লোকটাকে দুষ্টু দোকানদারটা কেমন ঠকিয়ে দিল!

এদিকে ধূর্ত দোকানদারের দোকানে এল ছোট্ট খুকি আর তার মা। ছোট্ট খুকি থাকে শহরে, তার মামার বাড়ির গ্রামে এসেছে বেড়াতে। রোদে রোদে মাঠেঘাটে ঘুরতে বড় কষ্ট হয় তাই খুকির মা দু-দু’শো টাকা দিয়ে সেই হরেক কিসিমের জিনিসের দোকান থেকে মেয়েকে ছাতাটা কিনে দিল। ছাতা তো বদমাইশ দোকানদারের হাত থেকে রেহাই পেয়ে খুব আনন্দ পেল। ছোট্ট খুকিও ছাতাকে খুব ভালোবেসে ফেলল। ছাতা নিয়ে খায়, ছাতা নিয়ে খেলে, ছাতা নিয়ে ঘুমোয়। দিন দুই বাদেই ছোট্ট খুকি ফিরে যাবে শহরে, ছাতাও সঙ্গে যাবে। ছাতার তো সে কী আনন্দ! শহর দেখবে বলে কথা! কিন্তু খুকির মা বললে,
-“ইসস এই গাঁয়ের এত বড় হ্যান্ডেলওয়ালা ছাতা কি শহরে চলে নাকি? তোকে বরং রঙবেরঙের ফোল্ডিং ছাতা কিনে দেব নিউ মার্কেট থেকে, খুকি। ওই ছাতা আর ঘাড়ে করে নিয়ে যাসনি। ওটা বরং কাউকে দিয়ে দে।”

ছোট্ট খুকি আর কী করে! মামাবাড়ির জমিজিরেত দেখাশোনা করে ভাদুকাকু। ভাদুকাকুর ছেলে হাঁদু, খুকির ভারি দোস্ত। খুকি তাকেই ছাতাটা দিয়ে দিল। হাঁদু তো নতুন ছাতা পেয়ে জব্বর খুশি। উল্টে দেখে পাল্টে দেখে, মাথায় দিয়ে দেখে। শেষমেষ বাড়িতে নিয়ে গিয়ে গোয়ালঘরের আটচালার বাঁশের বাতায় গুঁজে রেখে দিল। আর উপায়ই বা কী? হাঁদুর ওপরে আরও এক দাদা, এক দিদি আর নীচে একজোড়া ভাইবোন। সব মিলিয়ে পঞ্চপাণ্ডব, খাঁদু, হাঁদু, নাদু, ক্ষেন্তি, পান্তি। তারা যদি একবার ছাতার সন্ধান পায়, তাহলে হয়ে গেল! কিন্তু ভাইবোনদের হাত থেকে ছাতাকে বাঁচালেও শেষরক্ষে হল কই!
ছাতা বেচারা বাঁশের বাতায় গোঁজা হয়ে নিজের মন্দ কপালের কথা ভাবছিল, এমন সময় ‘কিঁইচ কিঁইচ!’
মরেছে! একটা গাবদা ছুঁচো!

ব্যাটাচ্ছেলে ছুঁচো কটরকটর করে ছাতার গায়ে দিল চাট্টি ছ্যাঁদা করে। ছাতা তো আর চিৎকার করে কাঁদতে পারে না, মুখ বুজে সহ্য করতে লাগল সব। পরের দিন সকালে হাঁদুর বাবা ভাদুকাকু গোয়ালের বুঁচু গাইকে জাবনা দিতে গিয়ে দেখল কী যেন সব কালো কালো টুকরো টুকরো গরুর ডাবায় পড়ে আছে। ওপরে তাকিয়ে দেখে একটা ছেঁড়া ছাতা। গজগজ করতে করতে ছাতাটাকে নিয়ে কোন চুলোয় ফেলে দিয়ে এলো ভাদুকাকু।

ছাতা আবার সেই  গাছের তলাতেই ফেরৎ এলো। মাটিতে পড়ে পড়ে কাঁদতে লাগল। এমন সময় সেই গাছের তলায় এলো আলাভোলা পাগলাটা। ছাতার তো ওকে দেখে খুব মজা হল। আলাভোলা নিশ্চয়ই ওকে যত্নআত্তি করবে। এদিকে ছাতাটাকে দেখে আলাভোলা ভাবলো,
-“আরেহ্! এটা সেই ছাতাটা না? কিন্তু কেমন বিতিকিচ্ছিরি দশা হয়েছে। এটা আর কোনও কাজে লাগবে না।”
আলাভোলা পাগলার এই ব্যবহারে ছাতা আরও কষ্ট পেল। আঁধারে লুকিয়ে কাঁদতে লাগলো। ছাতার কষ্ট কেউ না বুঝলেও গাছের ফুল আর মাঠের জোনাকিরা বুঝল। তারা দলে দলে ছাতাকে ঘিরে ধরল। ফুলে মোড়া, টিমটিম জোনাকআলো জ্বলা ছাতাকে তো এবার দারুণ সুন্দর দেখাতে লাগল।

আলাভোলা তখন হাত বাড়িয়ে যেই ছাতাকে কুড়োতে গেল ওমনি দমকা বাতাস এসে ছাতাকে উড়িয়ে নিয়ে গেল। অমন সুন্দর দেখতে ছাতাখানা আকাশে উড়ে যেতে লাগল। আলাভোলাও পেছন পেছন ছুটল। ছাতা উড়ল গ্রামের ওপর দিয়ে, পিছু নিল হরেক কিসিমের জিনিসের দোকানের সেই ধূর্ত মালিক। ছাতা ধরা দেয় না। ছাতা উড়ল বড়রাস্তার দিকে। শহরে যাওয়ার বাস ধরবে বলে দাঁড়িয়েছিল ছোট্ট খুকি আর তার মা। ছাতাকে দেখে বাস ফেলে ছুটল পেছন পেছন। ছাতা ধরা দিল না। একে একে ভাদুকাকু, হাঁদু, খাঁদু, নাদু, ক্ষেন্তি, পান্তি সবাই ছুটল। কিন্তু ছাতা কারোর কাছে ধরা দিলনা। ফুলে মোড়া, জোনাকজ্বলা ছাতা আপন খেয়ালে হাওয়ার দোলে ভেসেই চলল, ভেসেই চলল...

(সমাপ্ত)
ছবি: আমি 🙂