গল্প: বোমকাই ও পুঁটিলাল


বোমকাই ও পুঁটিলাল
সুস্মিতা কুণ্ডু

মা দুপুরবেলায় চোখের পাতাদুটো একটু এক করলেই, বোমকাই চুপিচুপি ঘরের দরজার খিলটা খুলে বাইরে ছুট লাগায়। অন্তত ঘন্টাখানেকের জন্য নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়ানো যাবে। মা অবশ্য যেদিন ধরে ফেলতে পারে কানটা মুলে বলে, 
-“কোথায় চরতে যাওয়া হচ্চে শুনি?”

আচ্ছা বোমকাই কী পুঁটিলাল, যে চরতে যাবে? ও হো তোমরা তো পুঁটিলালকে চেনোনা। ও হ’ল গিয়ে বোমকাইয়ের পোষা ছাগল। অবশ্য পোষা যাকে বলে তা ঠিক নয়, পুঁটিলাল সারাদিন হেথা হোথা, মোড়ের মিষ্টির দোকানে কচুরী খেয়ে ফেলে দেওয়া শালপাতা, বাজারের পচা শুকনো বাতিল সব্জি এসব দিয়ে চড়ুইভাতি করে বেড়ায়। আর এই দুপুর হ’লেই বোমকাইদের বাড়ির বাইরের গ্রিলের গেটের ফাঁক দিয়ে গলে ভেতরে এসে বসে থাকে। একটা কদমগাছ আছে লোহার গেটের ঠিক ভেতরটায়, তারই ছায়াতে বসে থাকে পুঁটিলাল। 

বোমকাইয়ের তো পুঁটিলাল দ্য ছাগল, বটুক দ্য বেড়াল, চটর-পটর দ্য চড়ুই পাখির জোড়া, এ’রকম অনেক বন্ধু আছে, যাদের সন্ধান মা বাবা কেউই জানেনা। এমনিতে বোমকাই ওর সব সিক্রেট বাবাকে বলে কিন্তু এই ব্যাপারটায় বাবার কিস্যু করার নেই। বাবারও অনেকদিন ধরে একটা কুকুর পোষার শখ, শুধু মায়ের ভয়ে নামই করতে পারে না। একবার বাবার বন্ধু স্বপনকাকুদের বাড়িতে ট্যাঙ্গো দ্য অ্যালসেশিয়ান উলের গোলার মত তিন তিনটে পাঁশুটে ছানা দিল। বাবা তো অফিসফেরত নাচতে নাচতে একটা ছানা চেয়ে নিয়ে এল পুষবে বলে। কিন্তু সে ঘরে ঢোকার খানিক পরেই মায়ের বেদম হাঁচি শুরু হ’ল। হাতে করে কমপ্ল্যানের ভর্তি গ্লাস নিয়ে মা সবে বোমকাইকে দিতে আসছিল, ঠিক সেই সময় এই কাণ্ড! গ্লাস উল্টে কমপ্ল্যান মায়েরই গায়ে পড়ে একশা। বোমকাইয়েস তাতে অবশ্য ভালোই হয়েছে, কমপ্ল্যানটা আর বেজার মুখে নাক টিপে গলায় ঢালতে হয়নি। 

কিন্তু বোমকাইয়ের মত অত ভালো কপাল বাবার মোটেও ছিলনা। তাই মায়ের রক্তচক্ষু দেখে অফিসের জামাটা আর না বদলে সেই পাঁশুটে উলের গোলা বগলদাবা করে ছুটলেন স্বপনকাকুর বাড়ি, ফেরৎ দিতে। আসলে মায়ের কুকুর বেড়াল 
 এসবের লোমে বেজায় অ্যালার্জি। নাকে একটু লোমের টুকরো হাওয়ায় ভেসে এলেই ব্যাস! ‘হ্যাঁচ্চো হুঁচ্চো হিঁচ্চো’ নানা সুরে মায়ের নাক তার আপত্তি জানান দেয় সোচ্চারে। কাজেই বাবরও আর কুকুর পোষা হয় না। বোমকাইয়ের পুষ্যিদেরও সব বাড়ির বাইরে ঠাঁই হয়। 

***********

যাই হোক আজ দুপুরে মনে হচ্ছে দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা খুব কম। কারণ সকালে থেকে আজকে মায়ের অনেক কাজ ছিল। বাবাদের পাড়ার ক্লাব থেকে দুঃস্থদের জন্য সব পুরনো জামাকাপড় দেওয়া হবে, তাই অনেক জামাকাপড় কালেকশন করা হয়েছে। মা আর স্বপনকাকুর বৌ মন্দিরাকাকিমা মিলে সারাসকাল ধরে বেশটি করে সেইসব জামাকাপড় বেছে কেচে শুকিয়ে, ইস্ত্রি করেছে। যেমন তেমন দোমড়ানো মোচড়ানো পোশাক কি মানুষকে দেওয়া যায়? এই দুপুরবেলা সব শেষ করে কাকিমা বাড়ি গেছে আর মা-ও বোমকাইকে খাইয়ে নিজে খেয়ে তারপর বিছানায় গড়িয়েছে একটু। 

আজ শনিবার, বোমকাইয়ের ছুটি কিন্তু বাবার অফিস আছে। কাল রবিবার সকলের ছুটি। বাবা আর পাড়ার কাকুরা মিলে সব জামাকাপড় বিলি করতে যাবে। আপাতত সব বোমকাইদের বাড়িতে প্লাস্টিকে ভরে থাক থাক করে ডাঁই করা আছে। সোফার ওপর, টেবিলের ওপর, চেয়ারের ওপর, চারদিকে জামাকাপড় ভর্তি। এমনকি বিছানায় মায়ের মাথার কাছেও বোমকাইয়ের ছোটো হয়ে যাওয়া একগাদা জামা প্যান্ট রাখা। ওগুলো ভাঁজ করতে করতেই মায়ের কখন চোখ লেগে গেছে। অঘোরে ঘুমোচ্ছে মা। সপ্তাহের বাকি পাঁচদিন স্কুল থাকে বলে বোমকাইয়ের চরতে বেরনো হয় না। এই শনি রবিই ভরসা, তাও রবিবার বাবা বাড়িতে থাকলে এক একদিন কেউ ঘুমোয়ইনা তাই ওরও বেরনো হয় না। আজ সুবর্ণ সুযোগ। 

চুপিচুপি পা টিপে টিপে বোমকাই শোয়ার ঘরের দরজায় আড়ি পাতল। বেশ মিঠে মিঠে একটা ‘ফুররর ফুস ফররর ফোঁৎ’ আওয়াজ আসছে। তার মানে মা নির্ঘাৎ স্বপ্নে বোমকাইকে নামতা পড়াচ্ছেন মনের আনন্দে। ও দরজাটা আরেকটু টেনে দিয়ে ধীর পায়ে বাইরের দরজার দিকে গেল। বাবা যে টুলটায় বসে সকালে বুটজুতোর ফিতে বাঁধে সেইটে টেনে তার ওপর উঠে দাঁড়িয়ে ছিটকিনিটা খুলে ফেলল বোমকাই। নেমে ফের টুলটাকে জায়গায় সরিয়ে বাইরের উঠোনটায় বেরিয়ে দরজাটা টেনে দিল। 

উঠোনে নামতেই নরম নরম রোদ্দুর এসে জড়িয়ে ধরল। সবে শীতকাল আসব আসব করছে, এই সময়ের রোদটা বেশ মিঠে লাগে। সামনের দেবদারু গাছটায় চটর-পটর দুটিতে মিলে কী যেন একটা গুরুগম্ভীর আলোচনায় মত্ত। 
চটর বলল, “চিপ চিপ চিরিপ চিরিপ চিঁইইই”
পটর বলল, “চিঁ চ্যাঁও চিঁ চিঁ চ্যাঁঅ্যাঅ্যাও”
বোমকাই বলল, “চিংকা পিকা চিংকি পিকি চুঁউউউ”
তারপর একটা ভাঙা ডাল কুড়িয়ে, হাতে নিয়ে আকাশের গায়ে আঁকিবুকি কাটতে কাটতে এগোল গেটের দিকে। বোমকাইদের বাড়ির সামনে খানিকটা ফাঁকা জায়গা আছে। বাড়িটাসহ জায়গাটা চারদিকে পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। ইঁটের শ্যাওলাধরা পাঁচিল, জায়গায় জায়গায় অশ্বত্থগাছ বটগাছ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। 

সেই পাঁচিলের ওপরে বটুক দ্য বেড়াল থপ করে বসে রয়েছে। লেজটা ঝুলছে আর বোমকাইদের বাড়ির দেওয়ালঘড়ির পেণ্ডুলামের মত তুড়ুক তুড়ুক দুলছে। বোমকাই পাঁচিলের কাছে গিয়ে জমা কপে রাখা দু’থাক ইঁটের পাঁজার ওপর দাঁড়াল। ওকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে বটুক একটা লম্বা হাই তুলল চোখ বুজে। তারপর ডান হাতের থাবাটা চাকুম চুকুম করে চাটতে লাগল। বোমকাই বলল, 
“মিঁয়াও ম্যাঁও ম্যাঁও?” মানে হ’ল “আজকাল থাকিস কোথায়?”
বটুক লোম ফুলিয়ে বলল,
“অ্যাঁও? ম্যাঁঅ্যাঅ্যাঅ্যাও!” মানে বোধ হয়, “কেন? এখানেই তো!”
তারপর যেই না বোমকাই ওর দিকে হাতদুটো বাড়িয়েছে ওমনি এক লাফে পাঁচিলের ওপারে, অলক কাকুদের বাড়ির কলতলার দিকে দৌড় মারল। আসলে আজকাল বটুক বড় হয়েছেন তাই বোমকাই ওকে ধরে চটকুমটকু করতে গেলেই পালিয়ে যান বাবু। বোমকাই বিরক্ত হয়ে ইঁটের পাঁজা থেকে লাফিয়ে নেমে বিড়বিড় করল, 
-“দুচ্ছাই আমার পুঁটিলালই সবার চে’ ভালো। চটর-পটরের মত উড়েও পালায় না আর বটুকের মত বড়ও হয়ে যায়নি। কী সুন্দর গলা বাড়িয়ে সুড়সুড়ি খায়।”

এই বলে বোমকাই চলল গেটের মুখের কদমগাছটার কাছে, যার ছায়ায় পুঁটি বসে বসে সারা দুপুর ঘাসপাতা ঠোঙা চিবোয়। অন্যদিন স্কুল থেকে যখন ফেরে, রিক্সাকাকু এই কদমগাছের সামনে নামিয়ে দেয় ওকে। বোমকাই তখন টিফিনবক্সে সযত্নে বাঁচিয়ে রাখা একটা পাঁউরুটি, আধখানা রুটি, কোনওদিন এক মুঠো চাউমিন, পুঁটিলালের সামনে ধরে। ঠোঙা চিবিয়ে ক্লান্ত পুঁটিলাল কচর মচর করে অমৃতসমান সেই খাওয়ার টপাটপ খেয়ে বোমকাইয়ের হাতটাও চেটে পরিস্কার করে দেয়। 

***********

কদমগাছটার তলায় গিয়ে বোমকাই দেখল পুঁটি এদিক ওদিক কোত্থাও নেই। গেটের ভেতর থেকেই ডাইনে বাঁয়ে যদ্দুর চোখ যায় তাকিয়ে দেখল, নাহ্ নেই তো। রাস্তার ওপারের দোকানের বাইরে দাঁড় করানো জঞ্জাল ফেলার ড্রামগুলোর আশেপাশে দেখল চেয়ে কালো লেজখানা নড়ছে নাকি, কিন্তু না, কোনও চিহ্ন নেই। এমনটাতো কক্ষণও করে না পুঁটি! বোমকাই একটু চিন্তায় পড়ল। ওদের বাড়ির সামনের এই রাস্তাটে মেইন রোড নয়, বড়সড় বাস ট্রাক যায় না এ’পথে। তবে মোটর সাইকেল হামেশাই চলে। বোমকাইয়ের বুকটা কেঁপে ওঠে। মা যে ওকে কদমগাছটার থেকে আর এক পাও এগোতে মানা করেছে সেটা মনে থাকেনা। গেটের লোহার আংটাটা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে ও। ভালো করে ফের চারদিকটা দেখে, কিন্তু কয়েকটা কুকুর ছাড়া আর কোনও প্রাণীই এই দুপুরবেলায় চোখে পড়ে না। 

বোমকাইদের বাড়ি থেকে ডানদিকে আর গোটা পাঁচেক বাড়ি পেরোলেই একটা বালি সিমেন্ট ইঁটের গোলা আছে। মাঝে মাঝে ট্রাকে করে সেই দোকানে মাল আসে। ও চেয়ে দেখে একটা ছোটো ট্রাক এসে দাঁড়িয়ে আছে দোকানটার সামনে। কী মনে হতে গুটি গুটি পায় সেদিকে এগিয়ে যায় বোমকাই। সামলে পৌঁছে দেখে ট্রাকের তলায় কী যেন একটা নড়ছে। একটু ঝুঁকে তলার দিকে চেয়ে দেখে, একটা কালিঝুলি মাখা ছোট্ট ছাগলছানা তিরতির করে কাঁপছে। কে আবার? পুঁটিলাল। 

তড়িঘড়ি ট্রাকের তলায় ঢুকে বোমকাই পুঁটিলালকে বগলদাবা করে কাঁদতে কাঁদতে দৌড় দিল ঘরের দিকে। গেট ঠেলে ছুট্টে ঢুকে সদর দরজা ঠেলে সোওওজা মায়ের বিছানায়। পুঁটিলালকে বিছানার ওপর নামিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলে। বলাই বাহুল্য এই সমস্ত হুড়ুদ্দুম কাণ্ডের চোটে মায়ের ঘুমটা গেল ভেঙ্গে। চোখ খুলে দেখেন হলদে টি-শার্টে কালো কালো ছোপ, হাতে মুখে কালো তেলকালি মেখে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদছে বোমকাই। যত চোখ মুচছে হাতে করে তত মুখময় কালির প্রলেপ পড়ছে। 
আসলে পুঁটিলালকে ট্রাকের তলা থেকে বার করে বুকে চেপে ধরেই দৌড় লাগিয়েছে বোমকাই, লক্ষ্যই করেনি যে ট্রাক থেকে পোড়া কালো মোবিল পড়ে পুঁটিলাল তাইতে মাখামাখি হয়ে ছিল। 
মা তো হতভম্ব হয়ে, 
-“কী হ’ল বোমকাই? ও বোমকু, কাঁদিস কেন সোনা? এমন কালিঝুলি মাখলি কী করে? কোথাও পড়ে গেছিস? কেটেছড়ে গেল নাকি? দেখা বাবুসোনা শিগগির আমায়। বাবাকে ফোন করি, ইঞ্জেকশন দিতে হ’বে তো!”

ইঞ্জেকশন শুনে বোমকাই তো আরও হাঁউমাউ করে কাঁদতে লাগল আর যা কিছু বলার চেষ্টা করল সব কান্নার তোড়ে ধুয়ে গেল। মা তো কিছুই বুঝতে পারেন না। এমন সময় পিঠের কাছে একটা ঢুঁসো খেয়ে মা তো ‘ও গো বাবা গো চোর চোর! ভূত ভূত’ বলে চেঁচিয়ে উঠলেন। হয়েছেটা কী, পুঁটিলাল তো কালিঝুলি মেখে খাটের ওপর বোমকাইয়ের ছোটোবেলার জামার ভেতর ঢুকে বসেছিল। আর মা এদিকে বোমকাইকে ভোলাতে গিয়ে খেয়ালই করেননি বিছানায় ছাগলছানা! মায়ের পরণের সবুজ শাড়িটাকে পুঁটি কলাপাতা ভেবে বেশটি করে চিবোতে চিবোতে মায়ের পিঠে ঢুঁসো লাগিয়েছে একটা। 

মায়ের এরকম আঁতকে ওঠা দেখে বোমকাই নিমেষে কান্না ভুলে খিলখিল করে হাসতে শুরু করল। আর মা সভয়ে পেছনে ফিরে গুঁতোর সোর্স উদ্ধার করতে গিয়ে কালিমাখা ছাগলছানা এবং সেই কালিমালিপ্ত জামাকাপড় বিছানার চাদর বালিশের ঢাকনা দেখে আরেকবার আঁতকে উঠলেন। আঁতকে উঠে শুরু হ’ল হেঁচকি, সেই সাথে অ্যালার্জির জন্য হাঁচি। 
“হিইইইক্কা... হ্যাঁচ্চো... হিঁইইইক ... হাঁচ্ছু...” 
পাক্কা দু’মিনিট ধরে চলল। পুঁটিলালও কলাপাতারূপী আঁচল চেবানো বন্ধ করে পুটুস পুটুস করে চেয়ে রইল মায়ের দিকে। 

বহু কষ্টে পাশের টেবিল থেকে জলের বোতলটা নিয়ে ছিপি খুলে ঢকঢক করে গলায় খানিকটা ঢেলে মা বললেন, 
-“এ এ এসব কী বোমকাই?”
বোমকাইয়ের ততক্ষণে কান্না কমে গেছে। মায়ের কোল ঘেঁষে এসে বলল,
-“মা পুঁটিলাল ট্রাকের তলায় ঘুমোচ্ছিল। যদি ট্রাকটা চলতে শুরু করে দিত তাহলে কী হ’ত?”
বলে শিউরে উঠে মা’কে জড়িয়ে ধরল। 
মা অবাক হওয়ার সাথে সাথে খুব রেগেও ছিলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে বোমকাইয়ের কাছে সবটা শুনে রাগ করতে পারলেন না আর। পুঁটিলালের সরল মুখটার দিকে চেয়ে বড্ড মায়া লাগল। আহা রে অবলা পশু। বোমকাইয়ের বড্ড পেছু পেছু থাকে সর্বক্ষণ। ছেলেটারও যত ভাব পশুপাখিদের সাথে। 
ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
-“কিন্তু বোমকু তুই যে এভাবে দুপুরবেলায় গেটের বাইরে, রাস্তায় চলে গেলি, ট্রাকের তলা থেকে পুঁটিলালকে বার করে আনলি, তোর যদি কোনও বিপদ হ’ত? রাস্তায় কত গাড়িঘোড়া, তারপর যদি ছেলেধরা আসত, তাহলে? মা তখন তো মরেই যেত তাহলে!”

বোমকাই মা’কে আরও জোরে জাপ্টে ধরে, আরও লেপ্টে বসে মায়ের গায়ে, আরও খানিকটা কালি মায়ের নাকে মুখে লাগিয়ে মায়ের মুখটা চেপে ধরে। 
-“ও’রকম কথা বলবে না তুমি! খবর্দার না!”
পুঁটিও কী বোঝে কী জানি গুটগুট করে মায়ের কোলে এসে বসে। 
-“হ্যাঁচ্চো!”
মায়ের আরেকটা হাঁচি পড়ে এমন যুগল আদরের ঠেলায়। 

বাকি দুপুরটা পুনরায় কালিঝুলি মাখা জামাগুলো ধুতে ব্যয় হয়। বোমকাই জল বয়ে দিয়ে, ছাদে মেলে দিয়ে যারপরনাই সাহায্য করে মা কে। পুঁটিও এসেছিল মায়ের কাজে হাত ইয়ে মানে খুর লাগাতে, কিন্তু মা তাকে চাট্টি শাকপাতা দিয়ে বারান্দায় বসিয়ে রেখে এসেছেন ‘হ্যাঁচ্চো’-র ভয়ে। 

***********

বিকেলবেলায় বাবা ঘরে পা দিয়ে ডাকলেন,
-“বোমকাইইইই ! ও বোমকুউউউউ!”
বারান্দা থেকে উত্তর এল,
-“ম্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যা!”

বাবা তো অবাক, এমন সময় মা চা-এর কাপটা বাবার হাতে ধরিয়ে বললেন।
-“পুঁটিলাল! বোমকুর পুষ্যি, আজ থেকে বারান্দাতেই থাকবেন।”

বাবা ভ্যাবাচ্যাকা মেরে বললেন,
-“মানে? তোমার যে অ্যালার্জি, হাঁচি, তার কী হবে?”

-“পরে সব কাণ্ড শুনোখ’ন। আপাতত সনাতন মিস্ত্রিকে খবর দাও। বাইরের জায়গাটা তো খালিই পড়ে আছে। ক’টা গাছ রয়েছে শুধু। টিনের চাল দিয়ে ছোটো ছোটো নীচু নীচু ঘর করে দিক ক’টা, পুঁটিলাল, বটুক, আরও কারা কারা সব আছেন তোমার ছেলের সাঙ্গোপাঙ্গো, তাঁরা থাকবেন। আর হ্যাঁ কাঠের বানানো পাখির বাসা ক’টা কিনে এনো, দেবদারু গাছে ঝুলবে, চটর-পটরের জন্য।”

দরজার আড়ালে একটা হাসিহাসি কচি মুখ টুক করে অদৃশ্য হতে দেখে বাবা আর কিছু বললেন না। শুধু মায়ের দিকে চেয়ে ফিক করে হাসলেন, আর বললেন,
-“ট্যাঙ্গোর একটা ছানাকে তবে কাল বিকেলে নিয়ে আসি?”
মা শুধু বললেন,
-“হ্যাঁচ্চো!”

ওদিকে বাইরের ফাঁকা উঠোনে বেজায় আসর বসেছে, বোমকাই হাত পা নেড়ে কীসব বলে চলেছে। 
দেবদারু গাছের মাথা থেকে সাড়া এল,
-“চির্প চির্প চিরিইইইইপ”
পাঁচিলের ওপর থেকে আওয়াজ এল,
-“ম্যাঁও ম্যাঁও মিঁয়ায়ায়াওওও!”
বারান্দা থেকে শব্দ এল,
-“ম্যাঅ্যা ম্যাঅ্যা ম্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যা!”

বোমকাই বলল,
-“হিপ হির হুরররররে!”

(সমাপ্ত)

ছড়া: পাঁচটি হাঁসের ছানা



পাঁচটি হাঁসের ছানা
সুস্মিতা কুণ্ডু 

পাঁচটা হাঁসের ছানা
প্যাঁক প্যাঁক দিনভর,
মাঠেঘাটে ঘোরে আর
বেড়ায় নদীর চর।

বিকেলবেলা মা ডাকে
‘বাছারা ঘরে আয়,’
চারটে মোটে ফিরে আসে
একটি কোথায় হায়!

চারটি হাঁসের ছানা 
ঘুরতে গেল ফের,
কেঁচো খেল, পোকা খেল
গুগলি খেল ঢের।

মা ডাকে ‘আয় আয়’
তিনটি এল মোটে,
চিন্তায় মা-র ঘুম হয় না
কষ্টে বুকটি ফাটে।

তিনটি ছানা ফের বেরল
না শুনে মা-র কথা,
দীঘির জলে সাঁতার দিল
হারাল এক সেথা।

ভয়ে ভয়ে ফের ডাকে মা
‘বাছারা কোথায় গেলি?
তিনটি মিলে ঘুরতে গিয়ে
দুইটি ফিরে এলি?’

দুইটি ছানা ডানপিটে
ভয় ডর নেই প্রাণে,
লুকিয়ে বেরোয় ভোরবেলা
মা-র কথা না মানে।

খুঁজতে গিয়ে ফের মা দেখে
একটি ছানাই বসে,
প্যাঁক প্যাঁক ডাকটি ছেড়ে
মা কাঁদতে লাগে কষে।

শেষ ছানাটি মাঝরাতে
খুঁজতে বেরোয় ভাইবোন,
চারজনকে নিয়েই ফিরবে
এই করেছে পণ।

একটি ছানাও রইলনাকো
হাঁস-মা কী যে করে! 
এমন সময় হাঁসেদের বাবা
ফিরে এল যে ঘরে।

জোর গলাতে ডাকল বাবা
“খোকা খুকু আয় ফিরে!”
পাঁচটি ছানাই এল ঘরে
নাচে বাবা মা-কে ঘিরে।

(পপুলার ইংরাজি নার্সারি রাইম ‘Five little ducks went swimming one day’-এর 
ছায়া অবলম্বনে ছড়াটি লেখা)

ছড়া: হালুম বাঘু



হালুম বাঘু
সুস্মিতা কুণ্ডু

আমি একটি বাঘুর ছানা
‘হালুম’ আমার নাম,
নদীর ধারে সবুজ বন
সেথায় আমার ধাম।

হলুদ কালোয় ডোরাকাটা
রঙটি আমার ঝলমল,
গলা আমার বাজখাঁই, আর
গায়ে বিশাল বল।

তোমরা আমায় ভয় পেওনা
আমি মোট্টে রাগী নই,
পশু পাখি খাই না ধরে
খাই চিঁড়ে আর দই।

গাছের ফল আর নদীর জল
এটাই আমার খাদ্য,
দস্যি আমি নইকো মোটে
বেজায় আমি বাধ্য। 

পাঠশালে যাই পড়িলিখি
বন্ধু আমার কত,
ময়না টিয়া সিংহ হাতি
যেথায় আছে যত।

তোমরা যদি খেলতে আসো
সবুজ বনের ধারে,
একটিবার ডেকো আমায়
‘হালুম’ বলে জোরে।

মিলেমিশে থাকব আমি
খেলব সবার সাথে,
বাঘুর ছানা হলেও আমি 
খুশি দুধ আর ভাতে।

(সমাপ্ত)

গল্প: বন্ধু



বন্ধু  
সুস্মিতা কুণ্ডু


নাহ্ !! আজ আর রাজকন্যের মনটা একটুও ভালো লাগছে না। 
রাণীমা এত্ত যত্ন করে কিশমিস কাজু দেওয়া গোবিন্দভোগ চালের পায়েস রেঁধে আনলেন। রুপোর বাটিতে সোনার চামচ গোঁজা সাদা ধবধবে মিষ্টি গন্ধওয়ালা পায়েস। রাজকন্যের ভারী প্রিয়, তাও এতটুকুনিও মুখে ছোঁয়াল না কন্যে। খেলতেও গেল না সখীদের সাথে। 

স্বয়ং রাজা বিক্রমজিৎ দরবারের সব কাজ ফেলে অন্দরমহলে এসে মেয়েকে কোলে নিয়ে বসে কত্ত গল্প শোনালেন। বাঘ শিকারের গল্প, হরিণ শিকারের গল্প। তাতে তো কন্যের মন গললোই না উল্টে ইয়াব্বড় মুক্তোর মত জলের ফোঁটা টপ টপ করে গড়াতে লাগল চোখ দিয়ে। 
রাজামশাই তো আরোই শশব্যস্ত হয়ে বলে উঠলেন,

"কীসের কষ্ট, কাঁদিস কেন?
বল'না আমায় মা!
মুখের কথা খসলে পরেই
পাবি যা চাই তা। "

ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কোনোক্রমে রাজকন্যা ইন্দুমতী বলল,

"মানুষ এত দুষ্টু কেন
পশু শিকার করে!
বাবা তোমার তির ধনুকে
কেউ যেন না মরে।"

এই শুনে তো রাজামশাই সঙ্গে সঙ্গে সারা রাজ্যে পশু শিকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেন। সাথে সাথে এও ঘোষণা করলেন পশুপাখিদের জন্য অভয়ারণ্য গড়ে তোলা হবে। আর সেখানে যদি কোনো শিকারী বা ব্যাধ নিরীহ পশুদের আক্রমণ করে, তাহলে তক্ষুনি তাদের কারাগারে নিক্ষেপ করা হবে। 

এই শুনে রাজকন্যের সোনার বরণ মুখে প্রতিপদের চাঁদের মত একফালি হাসি খেলে গেল। কিন্তু সে মোটেই বেশিক্ষণের জন্য নয়। আবার হাসি মিলিয়ে গিয়ে ঘোর অমাবস্যে নামল।

এবার এলেন রাজকন্যের প্রিয় দাদাভাই, রাজ্যের রাজপুত্তুর ইন্দ্রকুমার, বোনকে ভোলাতে। এমনিতে ভাই বোনে দিন রাত্তির খুনসুটি লেগেই আছে। এই একজন বোনের চুল ধরে টেনে দিয়ে পালাচ্ছে একজন তো অন্যজন দাদার পাঠশালের পুঁথি লুকিয়ে দিচ্ছে। 
কিন্তু যত ঝগড়াই হোক তবুও বোনের চোখে জল মোট্টে দেখতে ভালো লাগছেনা ছোট্ট রাজপুত্তুরের। তিনি তো অঙ্গভঙ্গী করে মজার মজার ছড়া বলে হাসানোর চেষ্টা করতে লেগে পড়লেন,

"হিহি হাহা হোহো
রাশি রাশি হাসি!
খক খক খুক খুক
হাঁচি আর কাশি!"

তাতেও রাজকন্যে হাসে না। তখন রাজপুত্তুর সোনার দাঁড়ে ঝোলানো ময়না পাখিটাকে এনে রাজকন্যের সামনে রেখে তার লেজ ধরে টানতে লাগলেন। ভাবলেন রাজকন্যে বুঝি ভারী মজা পাবে। 
কিন্তু ও মা !! মজা কোথায় রাজকন্যে কাঁদতে কাঁদতে ছুট্টে গিয়ে ময়নার পায়ের রুপোর বেড়ি খুলে দিলেন। ওমনি ময়না ফুড়ুৎ। 
রাজপুত্র তো রেগে চীৎকার করতে যাবেন তক্ষুনি ওই একরত্তি মেয়ে গম্ভীর গলায় বলে উঠল,

-"দাদাভাই তুমি দুষ্টুমি করলে যখন গুরুমশাই, বাবা তোমায় শাস্তি দিয়ে ঘরে বন্ধ করে রাখেন, তোমার ভালো লাগে? আর ময়না তো কোনো দুষ্টুমিই করেনি। ও তবে কেন বন্দী থাকবে বলো?"

এর উত্তরে তো কারোর মুখে আর কথা জোগায় না। অগত্যা রাজপুত্তুরও হার মেনে ফিরে গেলেন। 

অবশেষে এলেন রাণীমা, পদ্মাবতী। মেয়ের গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে কোলে বসিয়ে বললেন, 

-"হ্যাঁরে ইন্দু মা। বল না মা কী হয়েছে তোর? কেন তোর মন ভার? কেন হাসি নেই তোর মুখে ? 
তুই কী খেতে চাস বল মা। আমি সরু সরু সাদা চালের ভাত, সোনালী ঘি মাখিয়ে তোর মুখে তুলে দেব? 
কী পরবি বল মা। সোনা রুপোর জরিতে নকশা তোলা আশমানি রঙের শাড়ি বুনে দেবে কারিগর?
তোর কোন খেলনা চাই বল মা। সেই ঝমঝম ঘুঙুর বাঁধা পুতুলটা? নাকি ছোট্ট চোখ ছোট্ট নাকওলা চিনে পুতুলটা?"

-"মা আমার কিচ্ছুটি চাই না মা গো।"

-"তবে কেন খাসনি মা? কেন তবে খেলতে যাসনি সইদের সাথে? বল আমায় সত্যি কথা।"

রাজকন্যে মাথা নেড়ে ছলোছলো চোখে ধরা ধরা গলায় বলে ওঠে। 
-"সে কথা আমি বলতে পারব না মা গো।"

রাণীমা মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ভাবেন, কীসের এমন কষ্ট মেয়ের যে মাকেও বলতে পারছে না।  নিজের গলা থেকে পান্নার লকেট দেওয়া সোনার হারটা খুলে পরিয়ে দিলেন ইন্দুমতীর গলায়। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
-"আমি যখন ছোটো ছিলাম তোর মতো, আমার মা আমায় এই লকেটটা দিয়ে একটা মন্ত্র শিখিয়েছিলেন। লকেটটা মুঠোয় ধরে চুপিচুপি এই মন্ত্রটা আওড়ালে, সব সমস্যা জাদুবলে অদৃশ্য হয়ে যাবে। আয় তোকে শিখিয়ে দি।"

"পান্নাপরী, লুকোচুরি
আর খেলোনা আমার সাথে,
ডাকছি তোমায় দাও সাড়াটি
ঘোচাও দুঃখ নিজের হাতে।"

মেয়েকে মন্ত্র শিখিয়ে রাণীমা চলে গেলেন। ইন্দুমতী লকেটটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগল। ভাবতে লাগল তার সমস্যার সমাধান কি সত্যিই হবে এই লকেট দিয়ে। বিড়বিড় করে মায়ের শেখানো মন্ত্রটা আওড়াতে থাকে ইন্দু। 

যেই না মন্ত্রটা বলা পুরোটা, ওমনি কী কাণ্ড কী কাণ্ড !! পান্নার লকেটটা থেকে সবুজ আলো ঠিকরে উঠলো। চারপাশটা যেন সবুজ আলোর বন্যায় ভেসে গেল। রাজকন্যে তাড়াতাড়ি চোখে হাতটা চাপা দিলেন। কিছুক্ষণ বাদে চোখ থেকে হাত সরিয়ে দেখেন, এক পরী দাঁড়িয়ে। কী সুন্দর, কী সুন্দর দেখতে তাকে। গায়ের রঙ শ্যামবর্ণ, সবুজ রেশমের মত চুল, পিঠের পালকের ডানা দুটোও গাঢ় সবুজ রঙের। আর চোখদুটো! যেন ওই লকেটের পান্নার দুটো টুকরো বসানো। ইন্দু তো অবাক হয়ে দেখতে থাকে তাঁকে। মুগ্ধতা কাটে যখন সেই পান্নাপরী সুরেলা গলায় বলে ওঠে, 

"রাজকন্যে ইন্দুমতী
হাজির পান্নাপরী,
তোমার কষ্ট দূর করতে
বলো না কী করি ?"

যে কথা মা বাবা দাদাভাই কাউকে বলতে পারেনি ইন্দুমতী সেই কথা ধীরে ধীরে বলে পান্নাপরীকে। 

-" জানো পান্নাপরী, কাল বিকেলে সইদের সাথে রাজপ্রাসাদের বসন্তবাগানে খেলা করছিলাম। আমি, মন্ত্রীকন্যে অপালা, সেনাপতিকন্যে রুচিরা, আর মালীকন্যে রূপমতিয়া। 
রূপমতিয়া খুব ভালো জানো তো। ও রোজ আমাদের তিনজনের জন্য ফুল দিয়ে মালা বানিয়ে দেয়, মুকুট বানিয়ে দেয়। তাতে প্রজাপতির ডানা থেকে ঝরে পড়া রঙিন রেণু লাগিয়ে দেয়। 
কিন্তু ওর গায়ের রঙ আমাদের তিনজনের মত এর'ম সোনার বর্ণ নয়, আর ওর এরকম সোনা রুপো রেশম দিয়ে বানানো জামাও নেই। তাই তো অপালা, রুচিরা ওরা সব বললে, ওর সাথে খেলা নাকি চলবে না। ও কালো, ও গরিব। ও নাকি আমাদের বন্ধু নয়কো মোট্টে।"

পান্নাপরী মধুর হেসে বলে, 
-"আচ্ছা ইন্দু আমিও তো তোমাদের মত তপ্ত কাঞ্চনবর্ণা নই। আমার গায়ে দেখো সোনা নয়, সবুজ পাতা আর ফুলের মালা। তাই বলে কি আমার সাথে তোমার বন্ধুত্ব করবে না?"

-"আমি তো সব্বার সাথে বন্ধুত্ব করতেই চাই পান্নাপরী। তোমাকে, রূপমতিয়াকে, সব্বাইকে। কিন্তু ওরা যে বলল, রূপমতিয়াকে খেলতে নিলে ওরা সবাই ওদের বাবাদেরকে গিয়ে নালিশ করবে। তখন মন্ত্রীমশাই, সেনাপতিমশাই যদি আমার বাবাকে বলেন তাহলে বাবা তো রূপমতিয়াদের তাড়িয়ে দেবেন। তাই তো আমি কাউকে কিচ্ছু বলিনি। আমি কি করব পান্নাপরী আমায় বলে দাও।"

-"ইন্দু তুমি কিচ্ছু চিন্তা কোরোনা। আমি আছি না মুশকিল আসান পান্নাপরী। তুমি এবার সব সখীদের নিয়ে খেলতে যাও দেখি, রূপমতিয়াকেও সঙ্গে নিও। তারপর দেখো আমি কী করি।"

-"সত্যি পান্নাপরী ?! তুমি সব ঠিক করে দেবে ?"

-  "আমি মুশকিল আসান
    আমি পান্নাপরী 
    কষ্ট সব গায়েব হবে
    দেখো জাদুকরী"

রাজকন্যে তো ভারী খুশি হয়ে নাচতে নাচতে চললেন বসন্ত বাগানে। অপালা, রুচিরা সব ওর অপেক্ষাতেই বসেছিল। দূরে এক কোণে রূপমতিয়া শুকনো মুখে দাঁড়িয়ে। বাগানের ভেতর আসার সাহস হয়নি সে বেচারার। রাজকন্যেকে হাসিমুখে আসতে দেখে ওরও মুখে হাসি ফুটল। রূপমতিয়ার হাতটি ধরে ইন্দু তাকে সবার মাঝে নিয়ে এল। ওকে দেখেই তো অপালা আর রুচিরার ভীষণ মুখ ভার। রাজকন্যেকে তারা বলে উঠলো,
-"রাজকন্যে ইন্দু! আমরা কিন্তু কিছুতেই খেলব না ওর সাথে। তুমি বেছে নাও ওর সই হবে না কি আমাদের সই হবে।"

ইন্দু তো মনে মনে তখন পান্নাপরীকে স্মরণ করে চলেছে। এমন সময় হঠাৎ সারা বসন্তবাগান সবুজ আলোয় ভরে গেল। সবাই তো ভারী অবাক। একমাত্র ইন্দুই জানে এটা পান্নাপরীর আসার সংকেত। কিন্তু সবুজ আলোর রোশনাই কাটতে সবাই দেখে সামনে একটা থুত্থুড়ে বুড়ি দাঁড়িয়ে। চুলে তার কতদিনের জটা। দাঁতগুলো সব হলুদ। নখগুলো খোঁচা খোঁচা। হাতে একটা বাঁকা চোরা লাঠি। খনখনে গলায় হেসে উঠে বুড়ি বলে উঠলো

"আমি হলাম শ্যাওলা ডাইন 
আমি জলের তলায় থাকি,
ছোট্ট ছোট্ট ছেলে মেয়েদের
দাস দাসী বানিয়ে রাখি।"

এবার তো সকলেই এমনকি ইন্দুমতীও ভীষণ ভীষণ ভয় পেল। এ কী রে বাবা ! পান্নাপরী কই?! শ্যাওলা ডাইন বাঁকা লাঠিটায় ভর দিয়ে একপাক নেচে নিল। ইন্দুর হাতটা কপাৎ করে ধরে বলল,

-"এই তো! এবার রাজকন্যে দাসী করব। আগামী এক বছরের জন্য আমার জলের তলার শ্যাওলা মহলে কাজ করবি তুই। ঘর ঝাড়পোঁছ করবি, রান্না করবি, বাসন মাজবি, কাপড় কাচবি, আমার গা হাত পা টিপে দিবি।"

শুনে তো রাজকন্যে কাঁদতে শুরু করল। কাজ করার কষ্টের চেয়েও তো বেশি কষ্ট হবে মা বাবা দাদাভাই কে ছেড়ে থাকতে। এ কীরকম হল! পান্নাপরী কোথায় গেল? সে যে তবে বলল সব সমস্যা দূর করবে। দুঃখে দু'চোখ বেয়ে জলের ধারা গড়ায় ইন্দুমতীর। 

অপালা রুচিরা ওরাও বলে উঠল,
-"শ্যাওলা ডাইন তোমরা আমাদের সই রাজকন্যে কে ছেড়ে দাও দয়া করে। সোনা দানা মণি মুক্তো হীরে জহরৎ যা চাইবে সব দেব। শুধু ইন্দুকে ছেড়ে দাও।"

খ্যানখ্যান করে হেসে উঠে ডাইনিবুড়ি বলল,
-"আমার বাড়ির ঝি তাহলে কে হবে শুনি? এই যে মেয়ে তবে রাজকন্যের বদলে তুই চল এক বছরের জন্য।"

অপালা ওমনি ঘাবড়ে পিছিয়ে গিয়ে মাথা নেড়ে বলে,
-"না না তা কী করে হয়! আমি ওসব কাজ পারিনে মোটেও।"

-"তাহলে তুই চল!" রুচিরার দিকে ফিরে বলে শ্যাওলা ডাইন। 

রুচিরাও অপালার মতই বলে ওঠে,
-"আমি মা বাবাকে ছেড়ে অতদিন কিছুতেই থাকতে পারব না, কিছুতেই না।"

ডাইনিবুড়ি হলুদ হলুদ দাঁত বার করে, জটা নেড়ে, আরো জোরে হেসে বলে ওঠে,
-"তোদের তিনটেকেই তবে নিয়ে যাই। আমাকে তাহলে আর তিন বছরের জন্য দাসী খুঁজতে হবে না।"

এই শুনে তো রুচিরা আর অপালা গলা ছেড়ে কাঁদতে শুরু করল। এমন সময় সবার অলক্ষ্যে থাকা রূপমতিয়া কখন যেন গুটিগুটি পায়ে সামনে এগিয়ে এসেছে। ধীর গলায় বলে সে,

-"শ্যাওলা বুড়ি! ও শ্যাওলা বুড়ি। তুমি রাজকন্যে ইন্দুমতী, মন্ত্রীকন্যে অপালা আর সেনাপতিকন্যে রুচিরা, তিনজনকেই ছেড়ে দাও। তার বদলে আমাকে নিয়ে চলো তিন বছরের জন্য। আমি তোমার সঅঅঅব কাজ করে দেব। আমার এসব অব্যেস আছে। ওঁরা কি পারেন বলো এত্তসব কঠিন কাজ। আর ওঁরা চলে গেলে রাজ্যেরই বা কী হবে! ওঁদের মা বাবারা কেঁদে কেঁদেই যে সারা হবেন। তখন রাজ্য চলবে কী করে? আমি বরং একছুটে আমার বাবা মা কে সব জানিয়েই ফিরে আসছি। তারপর যেথায় বলবে, যতদিনের জন্য বলবে, আমি যাব। 
তুমি শুধু আমার সই-দের ছেড়ে দাও দয়া করে।"

ইন্দুমতী সহ বাকীরা অবাক চোখে চেয়ে রইল মালীর মেয়ের দিকে, যার না আছে ওদের মত সোনার বরণ অঙ্গ। না আছে অঙ্গ ভরা সোনার গহণা, না আছে সোনার জরীবোনা রেশমের জামা। কিন্তু আছে একটা সোনার মত নিখাদ নির্মল উজ্জ্বল মন। 

ইন্দুমতী বলে উঠল,
-"দেখলি অপালা, দেখলি রুচিরা। শুনলি তোরা রূপমতিয়ার কথা। ওর মত বন্ধু ক'জনের আছে?! আর তোরা কীনা ওর সাথেই খেলতে চাইছিলি না।"

অপালা আর রুচিরার চোখের গড়িয়ে পড়া জল বলে দিল ওরা ওদের ভুলটা বুঝেছে আর মনে মনে খুব লজ্জা পেয়েছে। এগিয়ে এসে দুজনে রূপমতিয়ার দুটি হাত ধরে বলল,
-"রূপমতিয়া বোন আমাদের। ক্ষমা করে দে আমাদের। আমরা আজ থেকে চারজন প্রাণের সই হলাম।"

রূপমতিয়া তো এদিকে লজ্জায় অস্থির। ইন্দুমতী তো ওর প্রাণের সই ছিলই, আরো দুই সই পেয়ে আজ তো রূপমতিয়া সবচেয়ে ধনী মানুষ সারা রাজ্যে।

চারটে শিশু হাতে হাত দিয়ে খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। ঘুরে ঘুরে নেচে নেচে গাইতে লাগল।

"আমরা চারটি সই
হাসি গাই আর নাচি,
সবাইকে বিলিয়ে খুশি
আনন্দেতে বাঁচি।"

ভুলেই গেল যে শ্যাওলা ডাইনির মত বিপদ তাদের সামনে। সেদিকে খেয়াল পড়তেই সবাই ভয়ে ভয়ে তাকায়। কিন্তু কোথায় শ্যাওলা ডাইনি? তার জায়গায় দাঁড়িয়ে মিষ্টি একটা সবুজ ডানাওয়ালা পরী, পান্নাপরী। ইন্দুমতী তো দৌড়ে গিয়ে হাতটা ধরল পান্নাপরীর। বলে উঠল,

-" পান্নাপরী তুমিই তবে শ্যাওলা ডাইনির ছদ্মবেশ নিয়েছিলে? আমরা তো ভয়েই মরি।" 

মিষ্টি হেসে নরম গলায় পান্নাপরী বলে,

-"যাদের রূপমতিয়ার মত বন্ধু আছে, তাদের আবার ভয়টা কীসের  শুনি। এবার থেকে তাহলে চার সখীতে মিলে মজা করে থাকো, কেমন? সবসময় মনে রাখবে সোনা-দানা, নাম-যশ, রূপ-রঙ এসব দিয়ে কিন্তু বন্ধুত্বের বিচার হয়না মোট্টে। আসল বন্ধু সেই যে প্রয়োজনে নিজের কথা ভুলে গিয়ে অন্যজনকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসবে। তোমরা চারজন একে অপরের এবং রাজ্যের সকলের প্রকৃত বন্ধু হয়ে ওঠো। আর কোনো বিপদে পড়লে আমি তো আছিই। আজ তবে চলি কেমন?"


"আমার কথাটি ফুরোলো
নটে গাছটি মুড়োল
চার সখী আর পান্নাপরী 
আহা! দেখে চক্ষু জুড়োলো।"

-----------------------
(ইচ্ছামতী-তে প্রকাশিত)

ছড়া: ফাঁকিবাজ হাঁদু


ফাঁকিবাজ হাঁদু
সুস্মিতা কুণ্ডু

টগবগে লগবগে ঘোড়াখানি খাসা, 
রঙচঙে কেশরেতে মাথা তার ঠাসা। 

বাদামী যে রঙ তার, কানদুটো খোঁচা,
ছোটো দু’টো ফুটোওলা নাকখানা বোঁচা।

একগাল হাসি মুখে, দাঁতগুলো সাদা,
নাম তার ‘হাঁদু’ তবু নয়কো সে হাঁদা।

 লেজ তার একগোছা চামরের মত ঝাড়,
গরবেতে হেঁটে যায়, চোখ তুলে নাড়ে ঘাড়।

 ভোর হ’লে সব ঘোড়া যায় ছুটে মাঠেতে,
হাঁদু থাকে চোখ বুজে মিছিমিছি ঘুমেতে।

যেই সব যায় চলে, ফাঁকা হয় আশপাশ,
হাঁদু খায় ছোলা আর মশা মারে হুসহাস।

 বেলা হলে গাড়ি টেনে হাটে যায় সকলে,
হাঁদু বলে ‘উহ্ আহ্ পেটে বড় ব্যথা যে!’

সব ঘোড়া কাজ করে হাঁদু মারে ফাঁকি,
খেয়ে আর ঘুমিয়ে দিন কাটে বাকি। 

হাঁদু ভারী আলসে, নয় মোটে ঠাণ্ডা,
ঘোড়া নয় হাঁদু হ’ল কুঁড়েদের পাণ্ডা।

(সমাপ্ত)