সুস্মিতা কুণ্ডু
মা দুপুরবেলায় চোখের পাতাদুটো একটু এক করলেই, বোমকাই চুপিচুপি ঘরের দরজার খিলটা খুলে বাইরে ছুট লাগায়। অন্তত ঘন্টাখানেকের জন্য নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়ানো যাবে। মা অবশ্য যেদিন ধরে ফেলতে পারে কানটা মুলে বলে,
-“কোথায় চরতে যাওয়া হচ্চে শুনি?”
আচ্ছা বোমকাই কী পুঁটিলাল, যে চরতে যাবে? ও হো তোমরা তো পুঁটিলালকে চেনোনা। ও হ’ল গিয়ে বোমকাইয়ের পোষা ছাগল। অবশ্য পোষা যাকে বলে তা ঠিক নয়, পুঁটিলাল সারাদিন হেথা হোথা, মোড়ের মিষ্টির দোকানে কচুরী খেয়ে ফেলে দেওয়া শালপাতা, বাজারের পচা শুকনো বাতিল সব্জি এসব দিয়ে চড়ুইভাতি করে বেড়ায়। আর এই দুপুর হ’লেই বোমকাইদের বাড়ির বাইরের গ্রিলের গেটের ফাঁক দিয়ে গলে ভেতরে এসে বসে থাকে। একটা কদমগাছ আছে লোহার গেটের ঠিক ভেতরটায়, তারই ছায়াতে বসে থাকে পুঁটিলাল।
বোমকাইয়ের তো পুঁটিলাল দ্য ছাগল, বটুক দ্য বেড়াল, চটর-পটর দ্য চড়ুই পাখির জোড়া, এ’রকম অনেক বন্ধু আছে, যাদের সন্ধান মা বাবা কেউই জানেনা। এমনিতে বোমকাই ওর সব সিক্রেট বাবাকে বলে কিন্তু এই ব্যাপারটায় বাবার কিস্যু করার নেই। বাবারও অনেকদিন ধরে একটা কুকুর পোষার শখ, শুধু মায়ের ভয়ে নামই করতে পারে না। একবার বাবার বন্ধু স্বপনকাকুদের বাড়িতে ট্যাঙ্গো দ্য অ্যালসেশিয়ান উলের গোলার মত তিন তিনটে পাঁশুটে ছানা দিল। বাবা তো অফিসফেরত নাচতে নাচতে একটা ছানা চেয়ে নিয়ে এল পুষবে বলে। কিন্তু সে ঘরে ঢোকার খানিক পরেই মায়ের বেদম হাঁচি শুরু হ’ল। হাতে করে কমপ্ল্যানের ভর্তি গ্লাস নিয়ে মা সবে বোমকাইকে দিতে আসছিল, ঠিক সেই সময় এই কাণ্ড! গ্লাস উল্টে কমপ্ল্যান মায়েরই গায়ে পড়ে একশা। বোমকাইয়েস তাতে অবশ্য ভালোই হয়েছে, কমপ্ল্যানটা আর বেজার মুখে নাক টিপে গলায় ঢালতে হয়নি।
কিন্তু বোমকাইয়ের মত অত ভালো কপাল বাবার মোটেও ছিলনা। তাই মায়ের রক্তচক্ষু দেখে অফিসের জামাটা আর না বদলে সেই পাঁশুটে উলের গোলা বগলদাবা করে ছুটলেন স্বপনকাকুর বাড়ি, ফেরৎ দিতে। আসলে মায়ের কুকুর বেড়াল
এসবের লোমে বেজায় অ্যালার্জি। নাকে একটু লোমের টুকরো হাওয়ায় ভেসে এলেই ব্যাস! ‘হ্যাঁচ্চো হুঁচ্চো হিঁচ্চো’ নানা সুরে মায়ের নাক তার আপত্তি জানান দেয় সোচ্চারে। কাজেই বাবরও আর কুকুর পোষা হয় না। বোমকাইয়ের পুষ্যিদেরও সব বাড়ির বাইরে ঠাঁই হয়।
***********
যাই হোক আজ দুপুরে মনে হচ্ছে দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা খুব কম। কারণ সকালে থেকে আজকে মায়ের অনেক কাজ ছিল। বাবাদের পাড়ার ক্লাব থেকে দুঃস্থদের জন্য সব পুরনো জামাকাপড় দেওয়া হবে, তাই অনেক জামাকাপড় কালেকশন করা হয়েছে। মা আর স্বপনকাকুর বৌ মন্দিরাকাকিমা মিলে সারাসকাল ধরে বেশটি করে সেইসব জামাকাপড় বেছে কেচে শুকিয়ে, ইস্ত্রি করেছে। যেমন তেমন দোমড়ানো মোচড়ানো পোশাক কি মানুষকে দেওয়া যায়? এই দুপুরবেলা সব শেষ করে কাকিমা বাড়ি গেছে আর মা-ও বোমকাইকে খাইয়ে নিজে খেয়ে তারপর বিছানায় গড়িয়েছে একটু।
আজ শনিবার, বোমকাইয়ের ছুটি কিন্তু বাবার অফিস আছে। কাল রবিবার সকলের ছুটি। বাবা আর পাড়ার কাকুরা মিলে সব জামাকাপড় বিলি করতে যাবে। আপাতত সব বোমকাইদের বাড়িতে প্লাস্টিকে ভরে থাক থাক করে ডাঁই করা আছে। সোফার ওপর, টেবিলের ওপর, চেয়ারের ওপর, চারদিকে জামাকাপড় ভর্তি। এমনকি বিছানায় মায়ের মাথার কাছেও বোমকাইয়ের ছোটো হয়ে যাওয়া একগাদা জামা প্যান্ট রাখা। ওগুলো ভাঁজ করতে করতেই মায়ের কখন চোখ লেগে গেছে। অঘোরে ঘুমোচ্ছে মা। সপ্তাহের বাকি পাঁচদিন স্কুল থাকে বলে বোমকাইয়ের চরতে বেরনো হয় না। এই শনি রবিই ভরসা, তাও রবিবার বাবা বাড়িতে থাকলে এক একদিন কেউ ঘুমোয়ইনা তাই ওরও বেরনো হয় না। আজ সুবর্ণ সুযোগ।
চুপিচুপি পা টিপে টিপে বোমকাই শোয়ার ঘরের দরজায় আড়ি পাতল। বেশ মিঠে মিঠে একটা ‘ফুররর ফুস ফররর ফোঁৎ’ আওয়াজ আসছে। তার মানে মা নির্ঘাৎ স্বপ্নে বোমকাইকে নামতা পড়াচ্ছেন মনের আনন্দে। ও দরজাটা আরেকটু টেনে দিয়ে ধীর পায়ে বাইরের দরজার দিকে গেল। বাবা যে টুলটায় বসে সকালে বুটজুতোর ফিতে বাঁধে সেইটে টেনে তার ওপর উঠে দাঁড়িয়ে ছিটকিনিটা খুলে ফেলল বোমকাই। নেমে ফের টুলটাকে জায়গায় সরিয়ে বাইরের উঠোনটায় বেরিয়ে দরজাটা টেনে দিল।
উঠোনে নামতেই নরম নরম রোদ্দুর এসে জড়িয়ে ধরল। সবে শীতকাল আসব আসব করছে, এই সময়ের রোদটা বেশ মিঠে লাগে। সামনের দেবদারু গাছটায় চটর-পটর দুটিতে মিলে কী যেন একটা গুরুগম্ভীর আলোচনায় মত্ত।
চটর বলল, “চিপ চিপ চিরিপ চিরিপ চিঁইইই”
পটর বলল, “চিঁ চ্যাঁও চিঁ চিঁ চ্যাঁঅ্যাঅ্যাও”
বোমকাই বলল, “চিংকা পিকা চিংকি পিকি চুঁউউউ”
তারপর একটা ভাঙা ডাল কুড়িয়ে, হাতে নিয়ে আকাশের গায়ে আঁকিবুকি কাটতে কাটতে এগোল গেটের দিকে। বোমকাইদের বাড়ির সামনে খানিকটা ফাঁকা জায়গা আছে। বাড়িটাসহ জায়গাটা চারদিকে পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। ইঁটের শ্যাওলাধরা পাঁচিল, জায়গায় জায়গায় অশ্বত্থগাছ বটগাছ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে।
সেই পাঁচিলের ওপরে বটুক দ্য বেড়াল থপ করে বসে রয়েছে। লেজটা ঝুলছে আর বোমকাইদের বাড়ির দেওয়ালঘড়ির পেণ্ডুলামের মত তুড়ুক তুড়ুক দুলছে। বোমকাই পাঁচিলের কাছে গিয়ে জমা কপে রাখা দু’থাক ইঁটের পাঁজার ওপর দাঁড়াল। ওকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে বটুক একটা লম্বা হাই তুলল চোখ বুজে। তারপর ডান হাতের থাবাটা চাকুম চুকুম করে চাটতে লাগল। বোমকাই বলল,
“মিঁয়াও ম্যাঁও ম্যাঁও?” মানে হ’ল “আজকাল থাকিস কোথায়?”
বটুক লোম ফুলিয়ে বলল,
“অ্যাঁও? ম্যাঁঅ্যাঅ্যাঅ্যাও!” মানে বোধ হয়, “কেন? এখানেই তো!”
তারপর যেই না বোমকাই ওর দিকে হাতদুটো বাড়িয়েছে ওমনি এক লাফে পাঁচিলের ওপারে, অলক কাকুদের বাড়ির কলতলার দিকে দৌড় মারল। আসলে আজকাল বটুক বড় হয়েছেন তাই বোমকাই ওকে ধরে চটকুমটকু করতে গেলেই পালিয়ে যান বাবু। বোমকাই বিরক্ত হয়ে ইঁটের পাঁজা থেকে লাফিয়ে নেমে বিড়বিড় করল,
-“দুচ্ছাই আমার পুঁটিলালই সবার চে’ ভালো। চটর-পটরের মত উড়েও পালায় না আর বটুকের মত বড়ও হয়ে যায়নি। কী সুন্দর গলা বাড়িয়ে সুড়সুড়ি খায়।”
এই বলে বোমকাই চলল গেটের মুখের কদমগাছটার কাছে, যার ছায়ায় পুঁটি বসে বসে সারা দুপুর ঘাসপাতা ঠোঙা চিবোয়। অন্যদিন স্কুল থেকে যখন ফেরে, রিক্সাকাকু এই কদমগাছের সামনে নামিয়ে দেয় ওকে। বোমকাই তখন টিফিনবক্সে সযত্নে বাঁচিয়ে রাখা একটা পাঁউরুটি, আধখানা রুটি, কোনওদিন এক মুঠো চাউমিন, পুঁটিলালের সামনে ধরে। ঠোঙা চিবিয়ে ক্লান্ত পুঁটিলাল কচর মচর করে অমৃতসমান সেই খাওয়ার টপাটপ খেয়ে বোমকাইয়ের হাতটাও চেটে পরিস্কার করে দেয়।
***********
কদমগাছটার তলায় গিয়ে বোমকাই দেখল পুঁটি এদিক ওদিক কোত্থাও নেই। গেটের ভেতর থেকেই ডাইনে বাঁয়ে যদ্দুর চোখ যায় তাকিয়ে দেখল, নাহ্ নেই তো। রাস্তার ওপারের দোকানের বাইরে দাঁড় করানো জঞ্জাল ফেলার ড্রামগুলোর আশেপাশে দেখল চেয়ে কালো লেজখানা নড়ছে নাকি, কিন্তু না, কোনও চিহ্ন নেই। এমনটাতো কক্ষণও করে না পুঁটি! বোমকাই একটু চিন্তায় পড়ল। ওদের বাড়ির সামনের এই রাস্তাটে মেইন রোড নয়, বড়সড় বাস ট্রাক যায় না এ’পথে। তবে মোটর সাইকেল হামেশাই চলে। বোমকাইয়ের বুকটা কেঁপে ওঠে। মা যে ওকে কদমগাছটার থেকে আর এক পাও এগোতে মানা করেছে সেটা মনে থাকেনা। গেটের লোহার আংটাটা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে ও। ভালো করে ফের চারদিকটা দেখে, কিন্তু কয়েকটা কুকুর ছাড়া আর কোনও প্রাণীই এই দুপুরবেলায় চোখে পড়ে না।
বোমকাইদের বাড়ি থেকে ডানদিকে আর গোটা পাঁচেক বাড়ি পেরোলেই একটা বালি সিমেন্ট ইঁটের গোলা আছে। মাঝে মাঝে ট্রাকে করে সেই দোকানে মাল আসে। ও চেয়ে দেখে একটা ছোটো ট্রাক এসে দাঁড়িয়ে আছে দোকানটার সামনে। কী মনে হতে গুটি গুটি পায় সেদিকে এগিয়ে যায় বোমকাই। সামলে পৌঁছে দেখে ট্রাকের তলায় কী যেন একটা নড়ছে। একটু ঝুঁকে তলার দিকে চেয়ে দেখে, একটা কালিঝুলি মাখা ছোট্ট ছাগলছানা তিরতির করে কাঁপছে। কে আবার? পুঁটিলাল।
তড়িঘড়ি ট্রাকের তলায় ঢুকে বোমকাই পুঁটিলালকে বগলদাবা করে কাঁদতে কাঁদতে দৌড় দিল ঘরের দিকে। গেট ঠেলে ছুট্টে ঢুকে সদর দরজা ঠেলে সোওওজা মায়ের বিছানায়। পুঁটিলালকে বিছানার ওপর নামিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলে। বলাই বাহুল্য এই সমস্ত হুড়ুদ্দুম কাণ্ডের চোটে মায়ের ঘুমটা গেল ভেঙ্গে। চোখ খুলে দেখেন হলদে টি-শার্টে কালো কালো ছোপ, হাতে মুখে কালো তেলকালি মেখে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদছে বোমকাই। যত চোখ মুচছে হাতে করে তত মুখময় কালির প্রলেপ পড়ছে।
আসলে পুঁটিলালকে ট্রাকের তলা থেকে বার করে বুকে চেপে ধরেই দৌড় লাগিয়েছে বোমকাই, লক্ষ্যই করেনি যে ট্রাক থেকে পোড়া কালো মোবিল পড়ে পুঁটিলাল তাইতে মাখামাখি হয়ে ছিল।
মা তো হতভম্ব হয়ে,
-“কী হ’ল বোমকাই? ও বোমকু, কাঁদিস কেন সোনা? এমন কালিঝুলি মাখলি কী করে? কোথাও পড়ে গেছিস? কেটেছড়ে গেল নাকি? দেখা বাবুসোনা শিগগির আমায়। বাবাকে ফোন করি, ইঞ্জেকশন দিতে হ’বে তো!”
ইঞ্জেকশন শুনে বোমকাই তো আরও হাঁউমাউ করে কাঁদতে লাগল আর যা কিছু বলার চেষ্টা করল সব কান্নার তোড়ে ধুয়ে গেল। মা তো কিছুই বুঝতে পারেন না। এমন সময় পিঠের কাছে একটা ঢুঁসো খেয়ে মা তো ‘ও গো বাবা গো চোর চোর! ভূত ভূত’ বলে চেঁচিয়ে উঠলেন। হয়েছেটা কী, পুঁটিলাল তো কালিঝুলি মেখে খাটের ওপর বোমকাইয়ের ছোটোবেলার জামার ভেতর ঢুকে বসেছিল। আর মা এদিকে বোমকাইকে ভোলাতে গিয়ে খেয়ালই করেননি বিছানায় ছাগলছানা! মায়ের পরণের সবুজ শাড়িটাকে পুঁটি কলাপাতা ভেবে বেশটি করে চিবোতে চিবোতে মায়ের পিঠে ঢুঁসো লাগিয়েছে একটা।
মায়ের এরকম আঁতকে ওঠা দেখে বোমকাই নিমেষে কান্না ভুলে খিলখিল করে হাসতে শুরু করল। আর মা সভয়ে পেছনে ফিরে গুঁতোর সোর্স উদ্ধার করতে গিয়ে কালিমাখা ছাগলছানা এবং সেই কালিমালিপ্ত জামাকাপড় বিছানার চাদর বালিশের ঢাকনা দেখে আরেকবার আঁতকে উঠলেন। আঁতকে উঠে শুরু হ’ল হেঁচকি, সেই সাথে অ্যালার্জির জন্য হাঁচি।
“হিইইইক্কা... হ্যাঁচ্চো... হিঁইইইক ... হাঁচ্ছু...”
পাক্কা দু’মিনিট ধরে চলল। পুঁটিলালও কলাপাতারূপী আঁচল চেবানো বন্ধ করে পুটুস পুটুস করে চেয়ে রইল মায়ের দিকে।
বহু কষ্টে পাশের টেবিল থেকে জলের বোতলটা নিয়ে ছিপি খুলে ঢকঢক করে গলায় খানিকটা ঢেলে মা বললেন,
-“এ এ এসব কী বোমকাই?”
বোমকাইয়ের ততক্ষণে কান্না কমে গেছে। মায়ের কোল ঘেঁষে এসে বলল,
-“মা পুঁটিলাল ট্রাকের তলায় ঘুমোচ্ছিল। যদি ট্রাকটা চলতে শুরু করে দিত তাহলে কী হ’ত?”
বলে শিউরে উঠে মা’কে জড়িয়ে ধরল।
মা অবাক হওয়ার সাথে সাথে খুব রেগেও ছিলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে বোমকাইয়ের কাছে সবটা শুনে রাগ করতে পারলেন না আর। পুঁটিলালের সরল মুখটার দিকে চেয়ে বড্ড মায়া লাগল। আহা রে অবলা পশু। বোমকাইয়ের বড্ড পেছু পেছু থাকে সর্বক্ষণ। ছেলেটারও যত ভাব পশুপাখিদের সাথে।
ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
-“কিন্তু বোমকু তুই যে এভাবে দুপুরবেলায় গেটের বাইরে, রাস্তায় চলে গেলি, ট্রাকের তলা থেকে পুঁটিলালকে বার করে আনলি, তোর যদি কোনও বিপদ হ’ত? রাস্তায় কত গাড়িঘোড়া, তারপর যদি ছেলেধরা আসত, তাহলে? মা তখন তো মরেই যেত তাহলে!”
বোমকাই মা’কে আরও জোরে জাপ্টে ধরে, আরও লেপ্টে বসে মায়ের গায়ে, আরও খানিকটা কালি মায়ের নাকে মুখে লাগিয়ে মায়ের মুখটা চেপে ধরে।
-“ও’রকম কথা বলবে না তুমি! খবর্দার না!”
পুঁটিও কী বোঝে কী জানি গুটগুট করে মায়ের কোলে এসে বসে।
-“হ্যাঁচ্চো!”
মায়ের আরেকটা হাঁচি পড়ে এমন যুগল আদরের ঠেলায়।
বাকি দুপুরটা পুনরায় কালিঝুলি মাখা জামাগুলো ধুতে ব্যয় হয়। বোমকাই জল বয়ে দিয়ে, ছাদে মেলে দিয়ে যারপরনাই সাহায্য করে মা কে। পুঁটিও এসেছিল মায়ের কাজে হাত ইয়ে মানে খুর লাগাতে, কিন্তু মা তাকে চাট্টি শাকপাতা দিয়ে বারান্দায় বসিয়ে রেখে এসেছেন ‘হ্যাঁচ্চো’-র ভয়ে।
***********
বিকেলবেলায় বাবা ঘরে পা দিয়ে ডাকলেন,
-“বোমকাইইইই ! ও বোমকুউউউউ!”
বারান্দা থেকে উত্তর এল,
-“ম্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যা!”
বাবা তো অবাক, এমন সময় মা চা-এর কাপটা বাবার হাতে ধরিয়ে বললেন।
-“পুঁটিলাল! বোমকুর পুষ্যি, আজ থেকে বারান্দাতেই থাকবেন।”
বাবা ভ্যাবাচ্যাকা মেরে বললেন,
-“মানে? তোমার যে অ্যালার্জি, হাঁচি, তার কী হবে?”
-“পরে সব কাণ্ড শুনোখ’ন। আপাতত সনাতন মিস্ত্রিকে খবর দাও। বাইরের জায়গাটা তো খালিই পড়ে আছে। ক’টা গাছ রয়েছে শুধু। টিনের চাল দিয়ে ছোটো ছোটো নীচু নীচু ঘর করে দিক ক’টা, পুঁটিলাল, বটুক, আরও কারা কারা সব আছেন তোমার ছেলের সাঙ্গোপাঙ্গো, তাঁরা থাকবেন। আর হ্যাঁ কাঠের বানানো পাখির বাসা ক’টা কিনে এনো, দেবদারু গাছে ঝুলবে, চটর-পটরের জন্য।”
দরজার আড়ালে একটা হাসিহাসি কচি মুখ টুক করে অদৃশ্য হতে দেখে বাবা আর কিছু বললেন না। শুধু মায়ের দিকে চেয়ে ফিক করে হাসলেন, আর বললেন,
-“ট্যাঙ্গোর একটা ছানাকে তবে কাল বিকেলে নিয়ে আসি?”
মা শুধু বললেন,
-“হ্যাঁচ্চো!”
ওদিকে বাইরের ফাঁকা উঠোনে বেজায় আসর বসেছে, বোমকাই হাত পা নেড়ে কীসব বলে চলেছে।
দেবদারু গাছের মাথা থেকে সাড়া এল,
-“চির্প চির্প চিরিইইইইপ”
পাঁচিলের ওপর থেকে আওয়াজ এল,
-“ম্যাঁও ম্যাঁও মিঁয়ায়ায়াওওও!”
বারান্দা থেকে শব্দ এল,
-“ম্যাঅ্যা ম্যাঅ্যা ম্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যা!”
বোমকাই বলল,
-“হিপ হির হুরররররে!”
(সমাপ্ত)




