সাদা মৌমাছির দেশে
সুস্মিতা কুণ্ডু
এক ছিল মৌমাছিদের দেশ। দেশ মানে এই মানুষদের দেশের মত এত্ত বড় দেশ নয়। মৌমাছিদের দেশ হল গিয়ে একটা ফুলে ফুলে ভরা বাগান। সেই বাগানের বড় একটা গাছে একটা পেটমোটা মৌচাক, তার ভেতরে একটা রানি মৌমাছি, আর অনেক অনেক এমনি এমনি মৌমাছি। লাল মৌমাছি, নীল মৌমাছি, হলুদ মৌমাছি, গোলাপী মৌমাছি... আরও কতরকমের মৌমাছি। তোমরা ভাবছ বুঝি, ‘হি হি হি! কী বুদ্ধু দ্যাখো! মৌমাছি যে শুধু হলদে হয় তাও জানেনা!’
হুঁহ্, জানি বাবা জানি! সঅঅঅব জানি। কিন্তু গপ্পো বলতে গেলে ও’রকম একটু আধটু বলতে হয়। বুঝলে? তারপর বাকিটা শোনো তো দেখি মন দিয়ে।
মৌমাছির সেই দেশের রানি হলেন মৌটুসি মৌমাছি। মৌটুসি মৌমাছির আগের রানি ছিলেন ভারি অলস। তিনি কোনও নিয়মকানুন মানতেন না, দেশে তাই বড় অরাজকতা ছিল। যে রঙের মৌমাছিরা দলে ভারি তারা সব ফুলের মধু খেয়ে ফুল নষ্ট করে দিত। তার ফলে অন্য মৌমাছিরা পর্যাপ্ত পরিমাণে মধু পেত না। কিন্তু নতুন রানি মৌটুসি মৌমাছি খুব কড়া। তিনি সারা দেশে নিয়ম করলেন, যে মৌমাছির গায়ে যা রঙ, সে শুধু সেই রঙের ফুলেরই মধু খাবে। যেমন ধরো লাল মৌমাছি খাবে শুধু লাল লাল ফুলের মধু... জবা, লাল গোলাপ, লাল চন্দ্রমল্লিকা এইসব। হলুদ মৌমাছি খাবে সূর্যমুখী, গাঁদা, কলকে, এইসব ফুলের মধু। এমনধারা বন্দোবস্ত আর কী...
মৌটুসি রানির দেশে ছিল একটিমাত্র সাদা মৌমাছি। নতুন আইনকানুনে ঝগড়াঝাটি বন্ধ হয়ে সবারই বেশ সুবিধে হলেও বিপদে পড়ল সাদা মৌমাছি। সাদা ফুল ঢের ঢের হয় বটে, জুঁই, বেলি, গন্ধরাজ... কিন্তু মুশকিল হল সকাল হলেই সব সাদা ফুল শুকিয়ে যায়। তখন তাদের ভেতর থেকে আর একটুকুনও মধু পাওয়া যায় না। এদিকে মৌমাছিরা তো রাতের বেলায় ঘুটঘুট্টি আঁধারে চোখে ভালো দেখতে পায় না। উড়তে গেলে গাছের গায়ে দুমদাম ধাক্কা খায়। তাই সাদা মৌমাছি বেচারা পড়ল ফাঁপরে। মৌটুসি রানিমা খুব রাগী, তাঁর কাছে গিয়ে নালিশ করার সাহস সাদা মৌমাছির নেই। তার ওপর আবার মৌটুসি রাণিমার দেশে নিয়মকানুন বড্ড আঁটোসাঁটো। নালিশ করেও কোনও লাভ হবেনা। মনের দুঃখে সাদা মৌমাছি তার দেশ ছেড়ে লাঠির ডগায় পৌঁটলা করে তার মধু খাওয়ার বাটিটা নিয়ে রওয়ানা দিল। যে দিকে চোখ যায় চলে যাবে।
সবার চোখের আড়ালে দেশ ছেড়ে বিদায় নিল সাদা মৌমাছি। উড়তে উড়তে পৌঁছল পাশের দেশে... মানে পাশের বাগানে। সেই বাগানেও নানা রঙের মৌমাছি বোঁওওও বোঁওওও করে নানা রঙের ফুলে উড়ে বেড়াচ্ছে। সাদা মৌমাছি চোখ বড়বড় করে দেখে, নীল অপরাজিতা ফুলে লাল মৌমাছি বসেছে, লাল রঙ্গন ফুলে হলুদ মৌমাছি বসেছে, হলুদ ঝিটিফুলে বেগনে মৌমাছি বসেছে। কী কাণ্ড! এদের দেশে বুঝি কোনও নিয়মকানুন নেই? কিন্তু কেউ মারপিটও তো করছে না! সবাই হাসি খুশি মুখে নেচে নেচে গেয়ে গেয়ে মধু খেয়ে বেড়াচ্ছে। এমনকি বেশ ক’টা সাদা মৌমাছিও নানা রঙের ফুলে বসে বসে মধু খাচ্ছে। মৌটুসি রানির দেশের সাদা মৌমাছি তো এর আগে অন্য সাদা মৌমাছি দেখেনি, তাই ভারি কৌতুহল হল।
সে গিয়ে নতুন দেশের একটা সাদা মৌমাছিকে ডেকে বলল,
-“হ্যাঁ ভাই শুনছ? বলছি কী তোমাদের এই দেশটার নামটা কী গো?”
সেই সাদা মৌমাছি তখন একটা কমলা রঙের গোলাপফুলের মধু খাচ্ছিল। সে উত্তর দিল,
-“আমাদের দেশের নাম মৌপরী রানির দেশ। তুমি কে গা? তোমায় তো আগে কখনও দেখিনি এখেনে।”
-“আমি মৌটুসি রানির দেশের একমাত্র সাদা মৌমাছি। কিন্তু সে দেশে আমি ভারি বিপদে পড়েছি, তাই দেশ ছেড়ে এখানে এসেছি।”
এই বলে ফোঁৎ ফোঁৎ করে কাঁদতে লাগলো মৌটুসি রানির দেশের সাদা মৌমাছি। মৌপরী রানির দেশের সাদা মৌমাছি তাকে খানিকটা কমলা মধু দিয়ে বলল,
-“আহা! আহা! ওমনি করে কাঁদতে আছে নাকি? নাও দেখি, এই মধুটুকুন গলায় ঢেলে শান্ত হয়ে গোলাপের পাপড়িতে বোসো। তারপর সব খুলে বলো দিকি আমায়।”
অনেকদিন পর পেটপুরে মধু খেতে খেতে মৌটুসি রানির দেশের সাদা মৌমাছি সব কথা খুলে বলল তার নতুন বন্ধুকে। মৌপরী রানির দেশের সাদা মৌমাছি সব শুনেটুনে বলল,
-“এ আবার কী একুশে আইন রে বাবা! লাল মৌমাছি শুধু লাল ফুলের মধু খাবে আর নীল মৌমাছি শুধু নীল ফুলের মধু খাবে। এদিকে সাদা মৌমাছি পেটে কিল মেরে বসে থাকবে। তোমাদের মৌটুসি রানির মাথায় একদম বুদ্ধিশুদ্ধি কিছুই নেই দেখছি। আমাদের মৌপরী রানিকে কেমন মাথা খাটিয়ে নিয়ম করেছেন!”
-“ও তোমাদের দেশেও নিয়ম আছে বুঝি? আমার তো দেখে মনে হচ্ছিল কোনও নিয়ম নেই, যে যেমন খুশি রঙের ফুল থেকে মধু খাচ্ছে।”
-“আছে রে বাবা আছে! সব নিয়ম আছে। রামধনুর সাতটা রঙ হয় জানো তো? বেগনে-নীল-আশমানি-সবুজ-হলুদ-কমলা-লাল। সেই রামধনুর রঙেই আমাদের দেশের সব মৌমাছির সাতটা দিনের খাবারের হিসেব বাঁধা। যেমন ধরো, এই আজ আমি কমলা ফুলের মধু খাচ্ছি, গতকাল খেয়েছিলুম হলুদ ফুলের মধু, আগামীকাল খাবো লাল ফুলের মধু, পরশু খাবো বেগনে, তরশু খাবো নীল, নরশু খাবো আশমানী...”
-“ওরে বাবা থামো থামো বন্ধু! আমার মাথা ঘুরছে এত রঙের মধু শুনে! আমদের দেশে একটা মৌমাছির তো একই রঙের ফুলের মধু খেয়েই সারাজীবন কেটে যায়!”
-“ইসস কী বাজে নিয়ম তোমাদের দেশে বাপু! নানারকম ফুলের মধু না খেলে নানারকম সোয়াদ পাবে কীকরে শুনি? এই যে লাল ফুলের মধু কেমন বাতাসার মত মিষ্টি, হলুদ ফুলের মধু ঝোলাগুড়ের মত, কমলা ফুলের মধু নলেন গুড়ের মত, সবজে ফুলের মধু রসগোল্লার রসের মত, বেগনে ফুলের মধু মিছরির মত...”
-“ফের আমার মাথা চক্কর কাটতে শুরু করেছে বন্ধু!”
-“থাক তবে আর শুনে কাজ নেই তোমার। তোমাকে বরং মৌপরী রানিমার কাছে নিয়ে যাই চলো। উনি ভারি বুদ্ধিমতী। উনিই বরং তোমার সমস্যার একটা উপায় বাতলাবেন।”
মৌটুসি রানির দেশের সাদা মৌমাছিকে নিয়ে মৌপরী রানির দেশের সাদা মৌমাছি গেল রানি মৌপরীর কাছে। রানি মৌপরী সব শুনেটুনে বললেন,
-“মৌটুসি তো আমারই ছোটো বোন। আসলে মৌটুসি বড্ড বদরাগী কিনা তাই রাগের মাথায় হুটপাট করে কড়া কড়া নিয়ম বানায় শুধু। কিন্তু ভালো করে দেশ চালাতে হলে, সবাইকে সুখে রাখতে হলে ঠাণ্ডা মাথায়, অনেক ভাবনা চিন্তা করে কাজ করতে হয়। সবার সুবিধে অসুবিধেই মাথায় রাখতে হয়ে। মৌটুসির দেশের সাদা মৌমাছি তুমি কিচ্ছুটি ভেবোনাকো। আমি গিয়ে বোনকে সব বুঝিয়ে বলে আসব’খন। তুমি বরং ততদিন আমার দেশের ফুলের মধু খেয়ে বন্ধুদের সাথে খেলে বেড়াও।”
তারপর? তারপর আর কী?
মৌটুসি রানির দেশের সাদা মৌমাছি তার নতুন বন্ধু মৌপরী রানির দেশের সাদা মৌমাছির সাথে নানারঙের ফুলে ঘুরে ঘুরে মধু খেয়ে বেড়াতে লাগলো।
এদিকে আমারও যে বড্ড মিষ্টি খেতে ইচ্ছে করছে। যাই দেখি, মায়ের হেঁশেলে নলেন গুড়ের নরম পাকের সন্দেশ আর ক’টা আছে নাকি খুঁজে আসি। তোমরাও বরং ততক্ষণ যে যার প্রিয় মিষ্টিগুলো একবার চেখে নাও দিকিনি।
(সমাপ্ত)
