বড়গল্প : টালিসমেন

 টালিসমেন 
সুস্মিতা কুণ্ডু 
(ম্যাজিকল্যাম্পে প্রকাশিত)

(১)
ক’দিন ধরেই লাল টয়োটা ক্যামরিটা পার্কিং লটে দেখছে অ্যাবিগেইল। বেশ অনেকদিনই জায়গাটা খালি ছিল, হলুদ রঙের কালি দিয়ে লেখা 313 নম্বরটা দেখা যেত কংক্রিটের কালচে রুক্ষ্ম মেঝেটায়। দুদিকে হলুদ রঙের মোটা দুটো লাইন টেনে সীমা নির্দেশ করা। অ্যাবির হোণ্ডা সিটি-টা থাকে ঠিক ওর উল্টো দিকে 213 নম্বর স্লটটায়। যাদের দুটো করে গাড়ি আছে, একটা এই বেসমেন্ট-এর পার্কিং লটে রাখা থাকে, আরেকটা বাইরের খোলা জায়গায় বানানো পার্কিং লটে থাকে। অনেকেই চায় ভেতরের জায়গা থাকলে, সেখানে রাখতে। এরকম অবস্থায় এতদিন যে কেন খালি পড়েছিল জায়গাটা সেটাই আশ্চর্য। লাল গাড়িটা আগে বাইরে রাখা থাকতে দেখেছে কী না ঠিক মনে করতে পারল না। 

প্রায় ছ’মাস হ’ল এই নতুন ব্লুমন্ড অ্যাপার্টমেন্টটায় শিফট করেছে অ্যাবি। বেশ ভালই জায়গাটা, যদিও ভাড়াটা একটু বেশি আগের অ্যাপার্টমেন্টটার তুলনায়। খুব ভালো হয় যদি একটা রুমমেট পাওয়া যায়। কিন্তু এত ব্যস্ত থাকে যে, রুমমেটের সন্ধান আর করা হয় নি। রিসার্চের কাজে অস্বাভাবিক রকমের চাপ যাচ্ছে। তার ওপর টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্টের কাজও করতে হয়। সব মিলিয়ে দম ফেলার ফুরসৎ থাকে না। এই কমিউনিটির ম্যানেজমেন্ট অফিসে অনেকদিন আগেই বলে রেখেছে, সেরকম কেউ যদি রুম শেয়ার করে থাকতে ইচ্ছুক মেয়ে আসে, যেন অ্যাবিগেইলকে মেইল করে দেয় ওরা। কিন্তু এখনও কোনও খবর দিল না। ক্রেইগলিস্টে একটা অ্যাডভার্টাইজমেন্ট দিয়েছিল এখানে আসার কিছুদিন পরেই, সেও প্রায় মাসপাঁচেক হ’তে গেল, কোনও রেসপন্স আসেনি।

গাড়িটা রিভার্স করতে গেল অ্যাবি, গ্যারাজ থেকে বার করার জন্য। রিয়ার ভিউ মিররে উল্টোদিকের গাড়িটায় ফের চোখ গেল। এক মুহূর্তের জন্য শিউরে উঠল। ঐ গাড়িটার রিয়ার ভিউ মিররে এক জোড়া চোখ। তীব্র জিঘাংসা নিয়ে চেয়ে রয়েছে ওর দিকে। তড়িঘড়ি গাড়িটা ঘুরিয়ে, অটোমেটিক গ্যারাজ ডোরটা খুলতে না খুলতেই জোরে চালিয়ে বেরিয়ে গেল। এক পলক শুধু দেখল, একটা কালো রঙের পোশাক পরা কেউ গাড়িটার স্টিয়ারিং এর পেছনে বসেছিল। মাথাতেও কালো টুপি বা হুড জাতীয় কিছু ছিল, তাই মিররে শুধু জ্বলজ্বলে চোখদুটো ছাড়া সব অন্ধকার লাগছিল। মুখেও মনে হয় মাস্ক ছিল না কি কেজানে। 

(২)

আজ ইউনিভার্সিটিতে কোনো কাজেই মন বসল না। বারবার সকালের অদ্ভুত কাণ্ডটা মনে আসছে। হয়তো এমন হতে পারে ওই গাড়ির লোকটা গাড়ি বার করার জন্যই উঠে বসেছিল গাড়িতে। হয়তো অ্যাবি বেরনোর পরেই বেরিয়েছে। অনেক কিছু যুক্তি খোঁজার চেষ্টা করে ও। কিন্তু বারবার ওই দৃষ্টিটা মনে ভেসে উঠলেই যুক্তিগুলো কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে, কেনই বা কেউ অচেনা কারোর দিকে ওভাবে তাকাবে? 

সারা দিনটা লাইব্রেরিতে টুকটাক বই পড়েই কাটিয়ে দিল। ক’দিন পর  মিউজিয়ামে একটা বড় এগজিবিশন আছে। মাস তিনেক ধরে প্রস্তুতি চলছে তার। রিসার্চ এবং টি. এ.-র কাজ ছাড়াও আরেকটা কাজ করে ও উইকেণ্ডে। ডাউনটাউনে একটা মিউজিয়াম আছে। খুব বড় নয় আবার নেহাতই ছোটো নয়। ওখানে ও টাকার প্রয়োজনে কাজ করে না, করে নিজের আনন্দের জন্য। মিউজিয়াম ব্যাপারটা বেশিরভাগ মানুষের কাছে বোরিং হলেও অ্যাবির মত ইতিহাসের ছাত্রীর কাছে ভীষণই ইন্টারেস্টিং। ঘন্টার পর ঘন্টা কম্পিউটারে বসে, বিভিন্ন আর্টিফ্যাক্টগুলো নিয়ে পড়াশোনা করে। তাদের বৈশিষ্ট্য, কোন যুগের জিনিস, ঐতিহাসিক গুরুত্ব এসব সম্পর্কে নোটস লিখে, কিউরেটর মিঃ রিচার্ড বেনসন এর কাছে জমা দেয়। উনি সেগুলো মিউজিয়ামের অনলাইন রেকর্ডে তুলে রাখেন। 

আরেকটা কাজও অ্যাবি করে, মানে শিখতে শুরু করেছে সবে, অথেন্টিকেশন। সংগ্রহে থাকা বা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বিভিন্ন পারিবারিক অ্যান্টিক জিনিস অনেকেই মিউজিয়ামে দেয়, কেউ বিক্রিও করতে চায়। এই জিনিসগুলোর সত্যাসত্য যাচাই করার জন্য বিশেষ পড়াশোনার দরকার হয়, ট্রেনিং, প্র্যাকটিস সবই লাগে। কিছু ডিগ্রিও লাগে। ইতিহাস নিয়ে গবেষণায় খুব শিগ্গিরই থিসিস সাবমিট করতে চলেছে অ্যাবিগেইল, কাজেই ডিগ্রি ওর এমনিই আছে কিন্তু শুধু পুঁথিগত বিদ্যা সম্বল করে এ কাজ করা যায় না। আলাদা প্যাশন লাগে, ভালবাসা লাগে। মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষের নিজস্ব লোক আছে, যাঁরা অথেন্টিকেশনের কাজটা করে দেন। তাঁদেরই একজন ছিলেন মিস লিডিয়া। উনি বেশ হাতে ধরে যত্ন করে সব শেখাতে শুরু করেছিলেন অ্যাবিকে। ষাটোর্দ্ধ বয়স্কা একাকী মহিলা, অ্যাবির নতুন অ্যাপার্টমেন্ট যে কমিউনিটিতে, উনিও সেখানেই থাকতেন। 

এটাও আরেকটা কারণ ছিল অ্যাবির বেশি টাকা দিয়ে হ’লেও এই কমিউনিটিতে শিফট করার। ইউনিভার্সিটির কাজ সেরে অনেকদিনই ও যেত মিস লিডিয়ার বাড়ি আড্ডা মারতে। ওঁর হাতে বানানো কুকি আর অ্যাপল পাই খেতে খেতে, কফি মাগে চুমুক দিয়ে হাজারও গল্প শুনত অ্যাবি। কিন্তু মাসখানেক আগে মিস লিডিয়া হঠাতই ...

অ্যাবির যা রোজগার তাতে একটু বেশি ভাড়া দিতে ওর কোনও অসুবিধে হওয়ার কথা নয় কিন্তু সমস্যাটা হয় অন্যখানে। ওর আসলে অ্যান্টিক জিনিস কেনার ভীষণ শখ। একটা কিউরিও শপের খোঁজ কেউ দিলে হয়েছে একবার, সঙ্গে সঙ্গে ছুটবে সেখানে। আর নিজের পকেটের কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে রাজ্যের জিনিস কিনে আনবে। ওর লিভিং রুমে ডাঁই করা রয়েছে, অস্ট্রেলিয়ার অ্যাবঅরিজনালদের ট্রাইবাল অ্যান্টিক বুমেরাং,   ইণ্ডিয়ানদের অষ্টধাতুর নটরাজ মূর্তি, ইজিপ্টের শেয়ালদেবতা আনুবিসের প্রস্তরমূর্তি, চাইনিজ জেড পাথরের বুদ্ধমূর্তি, ফ্রেঞ্চ স্যান্ডেলিয়র, এল্ম কাঠের তৈরী জাপানিজ তান্সু, আফ্রিকান ভু-ডু পুতুল, ভেনেজিয়ান মাস্ক, আরও আরও কত কী!

(৩)

দিনের শুরুটা খুব একটা স্বস্তিকর না হ’লেও ধীরে ধীরে সকালের ঘটনাটা ভুলতে বসেছিল অ্যাবি। কিন্তু বিকেলে গ্যারেজে গাড়িটা ঢোকাতে গিয়ে ফের গা’টা ছমছম করে উঠল। নাহ্, লাল ক্যামরিটা নেই 313-তে। ঝটপট ব্যাকপ্যাকটা পাশের সিট থেকে তুলে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে স্যুইচ টিপে গাড়িটা রিমোট-লক করে লিফটের দিকে পা বাড়ালো। নিজের ফ্ল্যাটে ঢুকতে যেন খানিকটা শান্ত হ’ল মনটা। হঠাৎ লক্ষ্য করল ওর দরজার তলা দিয়ে কে যেন একটা সাদা একটা কাগজ গলিয়ে দিয়ে গেছে। খামের মুখটা ছিঁড়ে, কাগজটা বার করল। তাতে লেখা,

টালিসমেন-টা তার ন্যায্য উত্তরাধিকারীকে অবিলম্বে ফেরৎ না দেওয়ার শাস্তি মৃত্যু।”

লাল গাঢ় রঙে লেখা চিঠিটা, ইন ফ্যাক্ট কেমন যেন শুকনো রক্তের মত কালচে লাল রঙটা। অ্যাবি হাত থেকে ফেলে দিল চিঠিটা। সোফাটায় বসে হাঁপাতে লাগল খানিকটা। কে এই ধরনের রসিকতা করছে ওর সাথে, কেনই বা করছে? 


শাওয়ার কিউবিকলে ঢুকে মাথার ওপর ঠাণ্ডা জলের ফোয়ারা চালালো অ্যাবি। কেমন যেন অসুস্থ লাগছে। কী হচ্ছেটা কী ওর সাথে! পুলিশে জানাবে, না কি প্রপার্টি ম্যানেজারকে বলবে? কারণ এই অ্যাপার্টমেন্টগুলোর ভেতরে অবাধে যে কেউ ঢুকতে পারে না, হয় চাবি লাগে অথবা ফ্ল্যাটের কারোর সাথে দেখা করতে হলে সেই ফ্ল্যাট নম্বরের লাগোয়া স্যুইচ টিপে রিং করতে হয়। কেউ খুললে তবেই বাইরের লোক ঢুকতে পারবে। এমন কী মেলম্যানকেও বড় কিছু ডেলিভারিসহ ভেতরে আসতে গেলে একই নিয়মে আসতে হয়, অথবা বাইরের পোস্টবক্সে চিঠিচাপাটি ফেলতে হয়। এই চিঠিটা দরজার তলা দিয়ে কে দিল তবে? 
হঠাৎ করে শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত নেমে যায় অ্যাবির। 313 নম্বর ঘরটা ঠিক ওর মাথার ওপরে, সেই ফ্ল্যাটের বাসিন্দা, ওই প্রতিহিংসাপরায়ণ চোখদুটোর মালিকেরই কাজ নয় তো? 

——

নাইটগাউনটা গায়ে গলিয়ে, অ্যাবি লিভিংরুমে ওর পড়ার টেবলের ড্রয়ারগুলো হাঁটকাতে শুরু করে। 
এই তো! এই তো সেটা। 
কাঠের কারুকার্য করা বক্সটা ড্রয়ার থেকে তুলে আনে অ্যাবি। আলতো হাতে ঢাকনাটা খোলে। ভেতরে ভেলভেটে মোড়া প্রকোষ্ঠটায় একটা গোলাকৃতি কালচে পাথরের টুকরো। তার চারপাশটা সেই আদি অকৃত্রিম বহুমূল্য সোনালী ধাতুতে বাঁধানো এবং বিভিন্ন রঙয়ের ঝলমলে প্রস্তরখণ্ড খচিত। মাঝে একটা ছাপ, হ্যাঁ ছাপই যেটা ঐ ধাতুতে খাঁজ কেটে বানানো একটা পেন্টাক্যল। একটা সুষম বৃত্তের ভেতর আবদ্ধ একটা পঞ্চমুখী তারা, যার প্রতিটা শীর্ষবিন্দু স্পর্শ করে আছে বৃত্তের পরিধিকে, সমান সমান দূরত্বে।

(৪)

চিঠিটায় কী এরই কথা লেখা? হ্যাঁ এটা একটা টালিসমেন, যেটা প্রায় মাস ছয়েক আগে কিনেছিল ও, এই নতুন অ্যাপার্টমেন্টে শিফট করার পরে পরেই। কথায় কথায় একটা নতুন কিউরিও শপের সন্ধান দিয়েছিলেন ওকে মিস লিডিয়া  কথায কথায় একদিন উনিই বলেছিলেন,
-“ওহ অ্যাবি, ইউ মাস্ট ভিজিট দ্য কিউরিও শপ ইন রোজউড স্ট্রিট, ইন ডাউনটাউন। ইট হ্যাজ গট আ ফ্যাবিউলাস কালেকশন। সাম অফ দেম আর জাস্ট এক্স্যাক্ট রেপ্লিকা অফ দ্য ওরিজিনাল ওয়ানস।”

শোনামাত্র আর দেরি করেনি অ্যাবি, পরেরদিন বিকেলেই ছুটেছিল দোকানটায়। এক বিন্দুও বাড়িয়ে বলেননি মিস অ্যান, দোকানটা অ্যান্টিকের খনি। দোকানের মালিক মিঃ লি কিয়াং, অ্যাবি ইতিহাসের ছাত্রী শুনে বেশ আগ্রহভরে ওকে অনেক আইটেম দেখালেন। মিং ভাস থেকে শুরু করে, সিল  অফ সলোমন, ইজিপ্সিয়ন স্ক্যারাব, আরও কত কী! 
অ্যাবির আগ্রহ দেখে মিঃ কিয়াং ওকে বললেন,
-“ওয়েট ইয়ং লেডি, তোমার মত কাস্টমার রোজ রোজ আসে না। আই হ্যাভ দ্য পারফেক্ট থিং ফর ইউ।”
ছোট্ট একটা দরজার ক্রিস্টাল বিডেড কার্টেন এর ওপারে অদৃশ্য হয়ে গেল মিঃ কিয়াং এর শরীরটা। কিছুক্ষণ পর হাতে একটা সুদৃশ্য কাঠের বক্স নিয়ে ফের দোকানের ভেতর এলেন উনি। 
-“দিস ইজ আ ভেরি পাওয়ারফুল টালিসমেন। টালিসমেনকী জানো তো?”
-“অফকোর্স জানি। পাথর বা ধাতু দিয়ে গড়া ম্যাজিকাল অবজেক্ট। যেটা পরলে নাকি সৌভাগ্য আসে। লাকি চার্ম, আর কিছুই না।” উত্তর দিয়েছিল অ্যাবি। 

একটু হেসে বলেন মিঃ কিয়াং,
-“আরবিক শব্দ ‘টালসাম(talsam)’ থেকে এসেছে টালিসমেন(talismen) কথাটি। গ্রিক অভিধানেও এই শব্দটি আছে, ‘টেলেসমা(telesma)’, যার অর্থ হ’ল ’completion, religious rite’। মূল শব্দ ‘teleō’-তে যার অর্থ ‘I complete, perform a rite.’ অর্থাৎ ‘ধর্মীয় রীতি সম্পন্ন করলাম’।”

কিছুটা অধৈর্য হয়ে অ্যাবি বলে,
-“হ্যাঁ ও তো ইন্টারনেটেই লেখা আছে এসব কথা।”

একটা দুর্বোধ্য হাসি খেলে যায় মিঃ কিয়াং-এর ঠোঁটের কোণে। বলেন,
-“মোটের ওপর তাই হলেও ব্যাপারটা এত সাদামাটা নয়। আরও অনেক বেশি ক্ষমতা আছে এই ছোট্ট অ্যাম্যুলেট-টার।”
এই বলে বক্সটা খুলে ধরলেন অ্যাবির সামনে উনি। 

ওই বক্সটাই এই মুহূর্তে অ্যাবির হাতে। ভেতরের টালিসমেনটার গল্পটা বলেছিলেন ওকে মিঃ কিয়াং। টালিসমেনটা শুধু সৌভাগ্যই বহন করে আনে তাই নয়, এটার অধিকারী যে হয় সে নাম-যশ-খ্যাতির শিখরে পৌঁছয়, এমনই ক্ষমতা এই পাথরের টুকরোর। 

কিয়াং এর দোকান থেকে এটিই মাস ছয়েক আগে সেদিন ৫০০০ ডলারের মত চড়া দামে কিনে এনেছিল অ্যাবি। যদিও একটা ধাতব টুকরো কতটা ভাগ্য বদলাবে, সে নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ ছিল ওর। তবুও এমনই একটা খারাপ সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল যে নিজেকে আটকাতে পারল না। 

(৪)

এরপর সময়ের নিয়মে আরও মাস তিনেক কেটে যায়। টালিসমেনটার কথা প্রায় ভুলতেই বসেছিল ও। মিউজিয়ামের নানা আর্টিফ্যাক্ট ঘাঁটতে ঘাঁটতে, বেশ কিছু অকাল্ট স্টাডিজ এর প্রাচীন পাণ্ডুলিপি হাতে এসেছিল। টালিসমেন কীকরে বানাতে হয়, কীই বা তার নিয়মকানুন, কী জাদু করতে পারে এই ম্যাজিকাল বস্তুগুলো। তখন খুব একটা মন দিয়ে এগুলো দেখেনি, কিন্তু যখন পরে মিউজিয়ামে, বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন শতাব্দীর নানা ধরনের টালিসমেন নিয়ে এগজিবিশন এর প্রস্তুতি শুরু হ’ল তখন ফের ওই পুঁথিগুলো ঘাঁটতে শুরু করল অ্যাবি। 

প্রাচীন ভাষায় লেখা পুঁথিগুলোর সবটা না হলেও একটু একটু রহস্য উদ্ধার করতে পারছিল ও। এদের মধ্যে একটি পুঁথি ছিল অ্যানসিয়েন্ট ওয়েলশ ভাষায় লেখা, যার পাঠোদ্ধার করার জন্য অ্যাবি বইটা লুকিয়ে মিউজিয়ামের বাইরে এনেছিল এবং নিয়ে গেছিল মিস লিডিয়ার কাছে। 

“দ্য হারমেটিক অর্ডার অফ দ্য গোল্ডেন ডন” নামের একটি  সংস্থা লণ্ডনে মিস্টিক ফোর্সেস, সুপারন্যাচরাল পাওয়ার, অ্যালকেমি, ব্ল্যাক ম্যাজিক, এসবের চর্চা করত। উনবিংশ শতকের শেষদিকে আর বিংশ শতকের গোড়ার দিকটায় এদের এই অকাল্ট স্টাডিজ ভীষণ বিখ্যাত ছিল। শোনা যায় স্যার আর্থার কোনান ডয়েল, ব্রাম স্টোকার প্রমুখ এই সংস্থার সদস্য ছিলেন, যদিও এই দাবীর সত্যাসত্য নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। 

সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা তিনজনের মধ্যে অন্যতম, ডঃ রবার্ট উইলিয়াম উডম্যান,  সবচেয়ে কম প্রচারের আলোয় তিনিই এসেছিলেন। সম্ভবত এই কারণে, যে ‘গোল্ডেন ডন’-এর দ্বিতীয় ‘অর্ডার’ তৈরী হওয়ার আগেই তাঁর মৃত্য হয়, এবং তাঁর কোনো উত্তরসূরী নিয়োজিত হয়নি। ডঃ উডম্যানের সংগ্রহের থাকা এই পুঁথিটিই কোনওভাবে এসে পড়ে অ্যাবির লাইব্রেরিতে। 

এদিকে অদ্ভুতভাবে ওই টালিসমেনটা হাতে আসার পর একটু একটু করে ওর জীবনের সমস্যাগুলোও দূর হতে শুরু করছিল। বহুদিন ধরে আটকে থাকা থিসিসের কাজ গড়গড়িয়ে এগোতে থাকে। একটা ক্রনিক শারীরিক সমস্যা থেকে রেহাই পায়। দূরসম্পর্কের এক গ্র্যানির সম্পত্তির কিয়দংশ আকস্মিকভাবেই হাতে এসে পড়ে, ওর আর্থিক অবস্থার বেশ কিছুটা উন্নতি ঘটে। হয়ত পুরো ব্যাপারটাই কাকতালীয়, ওর কল্পনা, কিন্তু তবুও যেন কেন অ্যাবির মনে হতে থাকে, এসবের মূলে ওই ৫০০০ ডলার দিয়ে কেনা চাইনিজ অ্যান্টিক শপের টালিসমেনটা। 

——

পুঁথিটার অনেকটা অংশেরই অর্থ উদ্ধার করেন মিস লিডিয়া। মাসদেড়েক আগেই একদিন ওঁর অ্যাপার্টমেন্টে বসে ট্রানস্লেটেড কাগজগুলো অ্যাবির হাতে তুলে দেন তিনি। তখনও অব্দি মিস লিডিয়া জানতেন যে বইটি ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরি থেকে এনেছে অ্যাবি। অবাক হয়ে ওকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন,
-“এ পুঁথি লাইব্রেরিতে থাকা তো বেশ আশ্চর্যজনক ব্যাপার। সাধারণত মিউজিয়ামেই থাকে এসব!”
অ্যাবি এড়িয়ে গেছিল প্রসঙ্গটা, ওঁকে বলেনি যে বিনা অনুমতিতে মিউজিয়ামের প্রপার্টি ও বাইরে এনেছে। 

 সেইদিনটার কথা আজও মনে পড়ে অ্যাবির। বাড়িতে এসে রুদ্ধশ্বাসে পড়ছিল মিস অ্যানের অনুবাদ করা পাতাগুলো। কীভাবে তন্ত্রবিদ্যার সাধনার মাধ্যমে প্রকৃতির নানা শক্তিকে আবদ্ধ করা হয় টালিসমেনের ভেতর। নানা ধরনের রিচ্যুয়ালস-এর মধ্য দিয়ে বিভিন্ন স্পিরিট-কে ধরে রাখা হয় ওই টালিসমেনের ভেতর। কখনও তা সৎ উদ্দেশ্যে, কখনও বা অসৎ। সাধারণত যিনি প্রস্তুত করেন টালিসমেনটি তিনি নিজের জন্যই করেন। বংশানুক্রমে তাঁর রক্তের সম্পর্কের উত্তরপুরুষরাও এই টালিসমেন ধারণ করতে পারেন। একমাত্র তাদেরই অধিকার আছে ওই জাদুক্ষমতার অধিকারী হওয়ার। 

নোটসগুলো পড়তে পড়তে হঠাৎ একটা পাতায় চোখ আটকে যায় অ্যাবির। মিস লিডিয়ার হাতে আঁকা একটা আউটলাইন, খুব চেনা। সঙ্গে সঙ্গে আসল পুঁথির পাতাটা ওল্টায়। একটা ছবি, পেন্টাক্যল, ধাতব দামি রত্নখচিত। সেটা বসানো আরেকটা কালচে পাথরের টুকরোর ওপর। কালচে পাথরের ওপর খাঁজ কেটে একটা পেন্টাগ্রাম বানানো, তার ভেতর ধাতব ওই পেন্টাক্যলটা খাপে খাপে বসানো। তার মানে ওর কাছে যে টালিসমেনটা আছে সেটা গোটা টালিসমেনটা নয়, এর আরেকটা অংশও আছে। 

সঙ্গে সঙ্গে ঠিক করে নিয়েছিল অ্যাবি ওর পরবর্তী পদক্ষেপ। মিউজিয়ামে এগজিবিশনের জন্য আসা আর্টিফ্যাক্টগুলোর মধ্যে যে ওই পেন্টাক্যলটা ও দেখেছে তাতে ওর কোনো সন্দেহ ছিলনা। ওটা অ্যাবির চাই-ই, তবেই সম্পূর্ণ হবে ওর টালিসমেনটা, না জানি আরও কত সৌভাগ্য বয়ে আনবে ওর জন্য। যেন কোনও দুরাত্মা ভর করেছিল ওর ওপর। 

এগজিবিশনের জন্য বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা, বিভিন্ন লোকের দেওয়া আর্টিফ্যাক্টগুলো এনলিস্ট করার সময় অ্যাবি কম্পিউটারের হার্ড ডিস্ক থেকে উড়িয়ে দেয় একটি বিশেষ এন্ট্রি,  ওই ধাতব পেন্টাক্যলটির। তারপর মিস লিডিয়ার কাছে নিয়ে আসার নাম করে অন্য কতকগুলো আর্টিফ্যাক্ট দেখায় কিউরেটর মিঃ বেনসনকে। যেহেতু মিস লিডিয়া শারীরিক অসুস্থতার কারণে ক’দিন মিউজিয়ামে আসতে পারছেন না, তাই তাঁর কাছে অথেন্টিকেশনের নামে ওগুলো নিয়ে যেতে চায় অ্যাবি। ওর মিষ্টি ব্যবহার এবং শেখার আগ্রহ এগুলোর কারণে মিঃ বেনসন আর মিস লিডিয়া দুজনেই ওকে স্নেহ করতেন। তাই এভাবে আর্টিফ্যাক্ট সাধারণত বাইরে না পাঠানো হলেও, মিঃ বেনসন অমত করেননি। ওগুলোর সাথে মিশিয়েই ওই তালিকার বাইরের পেন্টাক্যলটাও নিয়ে আসে অ্যাবি। এবং মিস লিডিয়াকে ওটা বাদে বাকিগুলো দেখিয়ে ফেরৎ দিয়ে আসে মিউজিয়ামে। 

(৫)

চুরি করা ধাতব পেন্টাক্যলটা, অ্যাবির কাছে থাকা পাথরের বাকি অংশটার ওপর বসাতেই খাপে খাপে আটকে গেছিল একদম। এতদিনে সম্পূর্ণ হ’ল টালিসমেনটা। চোখদুটো ঝিকিয়ে উঠেছিল অ্যাবির। 

আজ এক এক করে সব মনে পড়ছে অ্যাবির। হাতে ধরা কাঠের কারুকার্য করা বক্সের মধ্যে থেকে টালিসমেনের পাথুরে অংশটা তুলে টেবলে রাখে। নিচের ভেলভেট মোড়া অংশটার এক কোণে হাতে করে চাপ দিতেই ‘খুট্’ করে একটা শব্দ হয়। নীল ভেলভেটটা তুলতেই তলায় আরেকটা ছোট প্রকোষ্ঠ, তার মধ্যে জ্বলজ্বল করছে রত্নখচিত ধাতব পঞ্চমুখী তারকাটি। একটা হলুদ সোনার চেনে লকেটের মত আটকানো। হাতে করে ওটা তুলে ঘুরিয়ে দেখতে থাকে অ্যাবি। এই টালিসমেনটার জন্যই কত কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে ওকে, টাকা খরচ থেকে শুরু করে মিউজিয়ামে চুরি, এমন কী...

 লাল রঙে লেখা চিঠিটা পেপার শ্রেডারে ঢুকিয়ে যন্ত্রটা চালু করে। একটা যান্ত্রিক আওয়াজের সাথে সাথে কুঁচি কুঁচি হয়ে যায় কাগজগুলো। চেনে আটকানো পেন্টাক্যলটা সযত্নে ফের লুকোনো প্রকোষ্ঠে রাখে, ভেলভেট চাপা দিয়ে টেবলের ওপর থেকে পাথুরে অংশটাও ভেতরে ঢোকায়। তারপর কাঠের বাক্স বন্ধ করে টেবলের ড্রয়ারটা টেনে তার মধ্যে রাখতে যায় অ্যাবি। হঠাৎ কী মনে করে ওটা ড্রয়ারে না রেখে হাতে নিয়ে লিভিং রুমের আলো বন্ধ করে বেডরুমে চলে যায়। 

আরও একজোড়া সতর্ক চোখও যে ওদিকে লিভিংরুম লাগোয়া বাইরের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে উইণ্ডো ব্লাইণ্ডসের ফাঁক দিয়ে এতক্ষণ দেখছিল অ্যাবিকে এবং ওর হাতে ধরা কাঠের বক্সটাকে, সেটা অ্যাবির অগোচরেই থেকে যায়। 
অ্যাবি চলে যেতে ছায়ামূর্তিটি ধীরে ধীরে, ওপরের ফ্লোরের ব্যালকনি থেকে ঝোলানো দড়িটা বেয়ে উঠে যায় তিনতলার বারান্দায়, তারপর কাঁচের দরজা সরিয়ে ঢুকে যায় ভেতরে, 313 নম্বর ফ্ল্যাটের ভেতরে। 

(৬)

পরেরদিন সকালে অ্যাবির একটু দেরিতেই ঘুম ভাঙ্গল। তড়িঘড়ি করে রেডি হতে লাগল ইউনিভার্সিটি যাওয়ার জন্য। এমন সময় ঘরের ডোর অ্যানসারিং মেশিনটা বেজে উঠল। স্যুইচটা টিপে অ্যাবি জিজ্ঞাসা করল,
-“হু’জ দ্যাট?”
একটা মেয়ের গলা ভেসে এল,
-“হাই! দিস ইজ মেলিসা। আয়্যাম হিয়ার বিকজ অফ ইওর অ্যাড ইন ক্রেইগলিস্ট।”
ও হো! ভুলেই গেছিল অ্যাবি অ্যাডভার্টাইজমেন্টটার কথা। রুমমেট চেয়ে বিজ্ঞাপন দিয়েছিল বটে মাস পাঁচেক আগে। 
ফের স্যুইচ টিপে বিল্ডিংয়ের বাইরের গেটটা খুলে অপেক্ষা করতে লাগল, মেয়েটির দোতলার 213 নম্বর ঘরে আসা অব্দি। 
যে সময় বিজ্ঞাপনটা দিয়েছিল তখন অবশ্য টাকার প্রয়োজন ছিল, তারপর টালিসমেনটার প্রভাবে অ্যাবি বেশ মোটা অঙ্কের অর্থের অধিকারিনী হয়েছে। কাজেই এই মুহূর্তে এই মেয়েটিকে বিদেয় করে দেওয়াটাই শ্রেয়। 
ঠিক দেড় মিনিটের মাথায় দরজায় মৃদু টোকা শুনে উঠে গিয়ে দরজাটা খুলে দিল। সামনে একটা লম্বা মেয়ে দাঁড়িয়ে, গায়ে ওভারকোট, চোখে সানগ্লাস। 

লিভিংরুমের সোফায় বসা মেয়েটাকে দেখে যেন কেমন অস্বস্তি বোধ হতে লাগল অ্যাবির। ওকে এই মুহূর্তে পত্রপাঠ রুমমেটের প্রয়োজন নেই বলে পথ দেখাতে পারলেই বাঁচে। কিন্তু মেয়েটি যেন একটু নাছোড়বান্দা।
বলতে লাগল এই মুহূর্তে একটা ঘরের ওর খুব দরকার, অন্তত মাস দুই তিনের জন্যও যদি অন্তত সাব-লিজ নিতে পারে অ্যাবির ২-বি. এইচ. কে. অ্যাপার্টমেন্টের এক্সট্রা বেডরুমটা। 

মাস দেড়েক আগে হ’লেও হয়ত অ্যাবি রাজি হয়ে যেত, প্রয়োজন না থাকলেও। কিন্তু এই মুহূর্তে অন্য কাউকে নিজের সঙ্গে রাখাটা একেবারেই নিরাপদ নয় অ্যাবির জন্য। 
মেয়েটা হঠাৎ একটা অদ্ভুত প্রস্তাব করল, 
-“তোমার ঘরটা দেখে মনে হচ্ছে তুমি অ্যান্টিক কালেক্ট করতে ভালোবাসো। যদি কিছু মনে না করো তোমায় একটা জিনিস দেখাতে চাই।”
এমন কথা শুনে না করে কী করে অ্যাবি! বলল,
-“হ্যাঁ! আমি এই নিয়ে একটু আধটু চর্চা করি বৈকি! তোমার কাছে কী ধরনের অ্যান্টিক আছে জানতে পারি কি মেলিসা?”

মেয়েটা একটু হেসে ওভারকোটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে একটা জিনিস বার করে হাতের তালুতে নিয়ে এগিয়ে ধরল অ্যাবির দিকে। জিনিসটা দেখামাত্র অ্যাবি সোফা থেকে ছিটকে উঠে পড়ল। 

-“এ এ এটা তোমার কাছে ক্ কীকরে...”
-“কেন? এটা তোমার কাছে থাকার কথা ছিল বুঝি মিস অ্যাবিগেইল স্পেন্সার?”
-“হ্যাঁ... মানে ন্ না... মানে...”
-“মানেটা আমি বলছি। ইউ আর আণ্ডার অ্যারেস্ট ফর থেফ্ট অফ ভ্যালুয়েবল প্রপার্টি অফ দ্য মিউজিয়ম অ্যাণ্ড...”
-“আমি চুরি করিনি... এটা তো অথেন্টিকেশনের জন্য...”
-“লেট মি ফিনিশ... অ্যাণ্ড মার্ডার অফ মিস লিডিয়া টাইলর।”

ধপ করে সোফায় বসে পড়ল অ্যাবি। সামনের মেয়েটির হাতের মুঠোয় ধরা টালিসমেনটা সামনের সেন্টার টেবলটায় রাখা। হ্যাঁ সেই টালিসমেনটা যেটা কাল রাত্রেই ও বেডরুমের লকারে নিয়ে গিয়ে রেখেছিল। মেলিসার এক হাতে ততক্ষণে উঠে এসেছে সার্ভিস রিভলবার অন্য হাতে পরিচয়পত্র, তাতে সোনালী ঝিলিক দিচ্ছে, ‘ফেডেরাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন’।

(৭)

এর পরের ঘটনা পুরোটাই ঘটল মিউজিয়মের কিউরেটর মিঃ বেনসনের সামনে, ওঁকে ফোন করে ডেকে আনা হয়েছে। 

বলতে শুরু করে মেলিসা, এফ. বি. আই. অফিসার,
-“আজ থেকে প্রায় মাস ছয়েক আগে মিস অ্যাবিগেইল স্পেন্সার 
ব্লুমন্ড অ্যাপার্টমেন্টস-এ ফ্ল্যাট ভাড়া নেন। অ্যাবি ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের ছাত্রী, রিসার্চও করছে। সেই সাথে স্থানীয় মিউজিয়মে পার্টটাইম কাজও করে। শখের অথেন্টিকেশন, সেই সূত্রেই অ্যাবির পরিচয় হয় মিঃ বেনসন এবং মিস লিডিয়ার সাথে।”
এই বলে একবার চেয়ারে হ্যাণ্ডকাফ পরে বসা অ্যাবির দিকে মুখটা ফেরায় মেলিসা। মিঃ বেনসনও একরাশ ভর্ৎসনার দৃষ্টিতে তাকিয়ে নতমস্তক অ্যাবির দিকে। ফের বলতে শুরু করে মেলিসা। 

-“মিস লিডিয়ার কাছে প্রায়সই যেত অ্যাবি। এবং ওঁর থেকে সন্ধান পেয়েই ওর সংগ্রহে আসে একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ টালিসমেনের অর্ধেক অংশ। এটা প্রায় ছ’মাস আগে, এই বিল্ডিং-এ শিফ্ট করার পরেরই ঘটনা। মাসতিনেক পর মিউজিয়মে হঠাতই অ্যাবির হাতে পড়ে একটি অমূল্য পুঁথি। যেটা বিনা অনুমতিতে লুকিয়ে বাইরে এনে মিস লিডিয়াকে দিয়ে অনুবাদ করায় অ্যাবি। মিঃ বেনসন যেহেতু মাঝেমাঝে মিস লিডিয়া শারীরিক কারণে মিউজিয়ম আসতে না পারলে অ্যাবিকে দিয়ে টুকটাক জিনিস ওঁর কাছে পাঠাতেন অথেন্টিকেশনের জন্য, তাই সন্দেহ করেননি অ্যাবিকে মিস লিডিয়া। পুঁথির অনুবাদ থেকে অ্যাবি জানতে পারে টালিসমেনটির গুরুত্ব, এবং এও জানতে পারে টালিসমেনটির আরেকটি অংশ মিউজিয়মেই এগজিবিশনের জন্য এসেছে। নিজের সাম্প্রতিক কিছু কাকতালীয় সৌভাগ্যে কুসংস্কারগ্রস্ত হয়ে অ্যাবি ভাবে সত্যিই টালিসমেনটির অতীন্দ্রিয় ক্ষমতা আছে। ফের চুরি করে পেন্টাক্যলটি।”

সারা ঘরে পিন পতনের নিস্তব্ধতা। মেলিসা, অ্যাবি, মিঃ বেনসন ছাড়াও আরও দুজন লোকাল পুলিশ ডিপার্টমেন্টের লোকও ঘরে উপস্থিত। সবাই শুনছে মেলিসার কথা। গলা ঝেড়ে আবার বলতে থাকে মেলিসা,

-“মাসখানেক আগেই হত্যাকাণ্ডটি ঘটায় অ্যাবি। 
পেন্টাক্যলটি খুঁজে না পেয়ে সন্দেহ হয় মিঃ বেনসনের, উনি মিস লিডিয়াকে ফোন করেন। মিঃ বেনসনের সাথে কথা হওয়ার পর মিস লিডিয়া সম্ভবত বুঝতে পেরেছিলেন অ্যাবি কিছু খারাপ একটা কাজ করছে। ওঁর ইনট্যুশন হয়ত বলে সামথিং ইজ রং। আর তাই উনি হয়ত কনফ্রন্ট করেন অ্যাবিকে। তখনই অ্যাবি সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলে। কী তাই তো অ্যাবি?”

যার উদ্দেশ্যে বলা সে মাথা নাড়তে নাড়তে বলে,
-“সৌভাগ্য না ছাই, ওই টালিসমেনটা শয়তানের গয়না। ওটা সম্পূর্ণ হওয়ার পরই আমার ওপরেও শয়তান ভর করে। নাহলে আমি কীকরে মিস লিডিয়াকে...”
মুখে চাপা দিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে অ্যাবি। 

মেলিসা বলে, 
-“বাকিটা কি আমি বলব না তুমি বলবে? মিথ্যে বলে বা লুকিয়ে কোনও লাভ নেই। তুমি সবকিছু বড় যত্নে করলেও একটা জিনিস তোমার আয়ত্বে ছিল না। মিস লিডিয়ার ফ্ল্যাটের উল্টোদিকের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা লুকাস, ইটালির ত্রিয়েস্তে শহরের বাসিন্দা। তুমি যখন ভোরবেলায় সব সাক্ষ্যপ্রমাণ লোপাট করে ফিরে যাচ্ছিলে, তখন ও ফ্ল্যাট থেকে বেরোতে যাচ্ছিল, ভোরের ফ্লাইট ধরে ইটালিতে ছুটিতে বাড়ি ফিরবে বলে। বেরোনোর মুহূর্তে নিজের ঘরের দরজার আই-হোল দিয়ে ও তোমায় দেখে মিস লিডিয়ার ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ করে বেরোতে, এবং দরজার বাইরের হাতলের ওপর থেকে রুমাল দিয়ে নিজের হাতের ছাপ মুছতে। নিয়মিত মিস্ লিডিয়ার ফ্ল্যাটে যেহেতু তুমি যাতায়াত করতে লুকাস তোমায় চিনত। কিন্তু দিন কুড়ির জন্য দেশে ফিরে যাওয়ায় ও জানতে পারেনি যে মিস লিডিয়ার মৃত্যু হয়েছে। ফিরে এসে সেটা জানামাত্র ও যোগাযোগ করে লোকাল পুলিশ স্টেশনে, এবং তারপর আমার কাছে ও স্টেটমেন্টও দিয়েছে। কাজেই...”

(৮)

কাঁপা কাঁপা গলায় অ্যাবি শুরু করে,
-“মিস লিডিয়া আমায় সরাসরি প্রশ্ন করেন যে পুঁথিটা আমি না জানিয়ে এনেছিলাম কী না! এরপর পেন্টাক্যলটার কথাও জিজ্ঞাসা করেন। আমি ওঁর সামনে তখনকার মত নিজের দোষ স্বীকার করি। উনি আমাকে বলেন ওগুলো মিউজিয়ামে ফেরত দিতে আর ভবিষ্যতে এরকম কিছু না করতে। তাহলে উনি মিঃ বেনসন বা পুলিশ কাউকে কিছু বলবেন না।”
মাথা নীচু করে বলে চলে অ্যাবি,
-“তখনই ঠিক করে নিয়েছিলাম ওঁকে সরাতে হবে পথ থেকে। 
মিস লিডিয়ার ইনসমনিয়া ছিল, মাঝেমাঝে তাই প্রেসক্রাইবড ঘুমের ওষুধ খেতেন। আমার ওঁর বাড়িতে অবারিত দ্বার ছিল। টয়লেটে যাওয়ার নাম করে আমি কাঁচের আয়নার পেছনের মেডিসিন ক্যাবিনেট থেকে বার করে আনি ঘুমের ওষুধের শিশি। মিস লিডিয়া যেহেতু নিয়মিত ওষুধ খেতেন না তাই ওষুধটা খুঁজে না পেলে বিশেষ বিচলিত হওয়ার কথা নয়, বা নিজের ভুলোমনের কারণেই হারিয়েছেন ভাববেন। এটা খুব সহজেই আঁচ করতে পারি। তারপর মিস লিডিয়ার অন্যমনস্কতার সুযোগে, গল্প করতে করতে, ওঁর হট চকলেটের মধ্যে মিশিয়ে দিই একমুঠো ঘুমের ওষুধ। আমি জানতাম প্রতি রাত্রে উনি শোয়ার আগে হট চকলেট খান। উনি আমাকে এতটাই বিশ্বাস করতেন যে ফ্ল্যাটের একটা চাবিও আমার কাছে দিয়ে রেখেছিলেন। ভোর রাত্রে ফের ঢুকি ওঁর ঘরে, হট চকলেটের গ্লাসটা ধুয়ে রেখে দিই। জলের গ্লাসের পাশে খালি ঘুমের ওষুধের শিশিটা রেখে দিয়ে, সতর্কভাবে নিজের সমস্ত হাতের ছাপ মুছে দিয়ে চলে আসি। আর চাবিটাও রেখে দিয়ে এসেছিলাম, যাতে সন্দেহের তির আমার দিকে না আসে। এই সমস্ত প্ল্যান ওইদিন করার যে কারণ ছিল, সেটা হ’ল মিস লিডিয়ার অ্যাপার্টমেন্টের সিকিওরিটি ক্যামেরাগুলোর রিপ্লেসমেন্ট চলছিল গত দুদিন ধরে। তাই বিল্ডিং এ আমার আসা বা যাওয়ার কোনও রেকর্ড হবেনা ভেবেছিলাম। কিন্তু লুকাস...”

রাগতঃ কণ্ঠে মিঃ বেনসন বলেন,
-“পাপ কখনও চাপা দেওয়া যায় না অ্যাবি, ছিঃ! এত মেধাবী ছাত্রী তুমি। তোমার ভেতর কত সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু তুমি এভাবে মিথ্যে কুসংস্কারের ফাঁদে পা দিয়ে সর্বনাশ ডেকে আনলে। একটা পাথরের টুকরো বা একটা ধাতুর টুকরো তোমার ভাগ্য বদলায়নি, বদলাতে পারে না। তুমি নিজেই এর জন্য দায়ী।”

মেলিসা বলে, 
-“যদিও আপাতদৃষ্টিতে মিস লিডিয়া একাকীত্বের ডিপ্রেশনে আত্মহত্যা করেছেন বলে মনে হবে ঘটনাটা, তাও অনেকগুলো খোলা সূত্র থাকায় লোকাল পি. ডি. হোমিসাইডের মামলা দায়ের করে। কিন্তু ফাইনালি এটা ইনভেস্টিগেট করে এফ. বি. আই। তার কারণ মিস লিডিয়া বহুবার বিভিন্ন প্রাচীন ভাষার তথ্য অনুবাদে সাহায্য করেছেন সরকারকে, যেগুলো ক্লাসিফায়েড ডক্যুমেন্ট মানে, কনফিডেন্সিয়াল ইনফর্মেশন বহন করে। কাজেই ওঁর খুন হওয়ারও অনেক গোপন কারণ থাকতে পারত। 

কিন্তু ফাইনালি তদন্তে মিস অ্যাবিগেইল দোষী প্রমাণিত হবেন এটা আমরাও এক্সপেক্ট করিনি।”

-“সন্দেহটা মিঃ বেনসনেরই হয় শুরুতে কারণ মিস লিডিয়া অ্যাবির মিউজিয়ম থেকে পুঁথি চুরির ঘটনাটা ওঁকে জানান। তারপর মিঃ বেনসনও লক্ষ্য করেন পেন্টাক্যলটা মিসিং। যদিও কম্পিউটারের সব তথ্য অ্যাবি উড়িয়ে দিয়েছিল কিন্তু ও জানত না যে উনি পেপার ফাইলেও রেকর্ড রাখেন। সেটাই অ্যাবির কাল হ’ল।”

(৯)

দ্য প্রাইম সাসপেক্ট অফ মিস লিডিয়া টাইলর মার্ডার কেস অ্যান্ড  থেফ্ট অফ প্রাইসলেস মিউজিয়ম আর্টিফ্যাক্টস, মিস অ্যাবিগেইল স্পেন্সারকে লাল নীল আলো জ্বলা পুলিশের গাড়িতে তুলে দেয় মেলিসা। এবার যা করার কোর্ট করবে। 

ব্লুমণ্ড অ্যাপার্টমেন্টের অ্যাবির 213 নম্বর রুমটা “ডু নট ক্রস” লেখা হলুদ টেপের পুলিশ লাইন দিয়ে ঘিরে দেয়। তারপর উঠে যায় তিনতলার 313 নম্বর ঘরে। ব্যালকনিতে কুণ্ডলি পাকিয়ে রাখা দড়িটা তুলে ঘরে এনে রাখে। জিপলক প্লাস্টিক ব্যাগের মধ্যে রাখা টালিসমেনটা ওভারকোটের পকেট থেকে বার করে টেবিলে রাখে, প্লাস্টিকটার গায়ে স্টিকার লাগানো এভিডেন্স।  
তারপর অন্য পকেট থেকে আরেকটা ছোট কাপড়ের থলি বার করে, তার মধ্যেও রাখা একদম এক রকমের আরেকটা টালিসমেন। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে ওটা। বহুদিন ধরে পাগলের মত খুঁজেছে এটাকে। বিভিন্ন অ্যান্টিক শপ থেকে শুরু করে সমস্ত নামী অনামী মিউজিয়ম, সব জায়গায়। অনেক কাঠখড় পুড়িয়েছে। অ্যাবিকে ধরা নয়, এই টালিসমেনটাকে ধরাই ওর আসল উদ্দেশ্য ছিল। ওটাকে এভিডেন্সের ব্যাগের টালিসমেনটার সাথে বদলে দেয়। 

দুটোর মধ্যে একটাই তফাৎ, অ্যাবির কাছে যে টালিসমেনটা ছিল, যেটা এই মুহূর্তে মেলিসার পকেটের কাপড়ের থলিতে আছে, তার পেন্টাক্যলটার এক কোণে খোদাই করা একটা নাম, যার ইংরাজি হরফে অনুবাদ করলে দাঁড়ায় P. Davies. 
মেলিসা ডেভিস-এর গ্রেট গ্রেট গ্রেট গ্র্যাণ্ডফাদার, প্যাট্রিক ডেভিস। 

লিফটে করে নীচে নেমে, লাল টয়োটা ক্যামরিটায় বসে মেলিসা। পাশের সিটে ছুঁড়ে দেয় এভিডেন্সের জিপলক ব্যাগটা, এটার আর অথেন্টিকেশন হবে না, বহু এভিডেন্সের তলায় চাপা পড়ে থাকবে কোনও লকারে। মিঃ বেনসনও আর ফেরৎ চাননা অভিশপ্ত টালিসমেনটা।
আর যেটায় মেলিসার বংশানুক্রমিক অধিকার, সেটা ওর ওভারকোটের পকেটে সুরক্ষিত আছে। সানগ্লাসটা চোখ থেকে খুলে ড্যাশবোর্ডে রেখে তাকায় রিয়ারভিউ মিররে। ঠিক সেই জ্বলন্ত একজোড়া চোখ ভেসে ওঠে স্ফটিক স্বচ্ছ আয়নায়, যে দুটো অ্যাবি ক’দিন আগেই দেখেছিল উল্টোদিকের গাড়িতে বসে। 

(সমাপ্ত)

ছড়া : শেপটাউন ফানটাউন





পুকুম্যান নানারকম নানারঙের শেপ আঁকতে বড় ভালোবাসেন। তাঁর এই আঁকা দেখে ছড়াখানি আমি লিখেছিনু, বেরিয়েছিল ‘পরবাস’ ওয়েবজিনে।

#শেপটাউন_ফানটাউন
#সুস্মিতা_কুণ্ডু

শেপটাউনে চলছে রে ভাই হুলুস্থুলু কাণ্ড!
পাঁচখানি শেপ ঝগড়াঝাটি করছে যে প্রচণ্ড।

লাল ট্র্যাঙ্গল বলল হেঁকে, ‘আমি সবার সেরা!’
‘কেমন রাঙা মুখটি আমার, মিছেই লড়িস তোরা!’

আজ থেকে এই শেপটাউনের হ’ব আমি রাজা,
আর যত শেপ আছে হেথায়, সবাই আমার প্রজা।

বেগনে গোলক রেগে বলে ‘মানব না তোর কথা,’
‘আমার মতন দেখতে যে হয় সব মানুষের মাথা।’

‘কে না জানে মাথার মাঝেই সব বুদ্ধি থাকে,
আমি ছাড়া শেপের রাজা বলবে সবাই কাকে?’

এমন সময় বাঁকা হাসি হাসল জোরে রম্বাস
‘অনেক হ’ল এবার তোরা থাম তো দেখি, ব্যস!’

বর্ডারখানা নীলচে আমার, কমলা রঙে ঢাকা,
তোদের মত একটি রঙেই নই তো আমি আঁকা।

এই না শুনে সবুজ স্কোয়ার খিঁক খিঁকিয়ে হাসে,
‘দাঁড়া দেখি সোজা হয়ে একটু আমার পাশে!’

‘বাঁকাচোরা রাজা হবে, হেসেই আমি মলুম,
বর্গক্ষেত্র হেলিয়ে নিলেই, রম্বাস হয়ে গেলুম।’

বেজায় রকম গোলমালেতে চটল সেমিসার্কল ,
গর্জে বলে, ‘থামো সবাই, বন্ধ কর শোরগোল!’

‘আমার নামটি অর্ধচন্দ্র, রেগেই হলাম নীল,
ঝগড়াঝাটি না থামালে পড়বে পিঠে কিল’

“এবার থেকে শেপটাউনের হ’লাম আমি শেরিফ,
মিলেমিশে থাকব হেসে, করবে সবাই তারিফ।”

(সমাপ্ত)

https://www.parabaas.com/PB71/LEKHA/cp_kSusmita71.shtml

গল্প : মুক্তো-মেঘ



#মুক্তো-মেঘ
#সুস্মিতা_কুণ্ডু
------------------------

- সে অনেক অনেক দিন আগের কথা। একটা দেশ ছিল। আর পাঁচটা দেশের থেকে একটু আলাদা।

-কেন আলাদা মা? সেখানে বুঝি রাজামশাই এর ইয়াব্বড় গোঁফ নেই বাবার মত?

-না না ... তা নয়।

-তবে কি রাণীমা তোমার মত পাস্তা রাঁধতে পারেনা ? নাকি রাজপুত্তুর নয়ের ঘরের নামতা ভুলে যায় খালি আমার মত?

-আরে কী জ্বালা! সেসব কেন হতে যাবে?

-ও ! তাহলে নির্ঘাত প্রজারা সব ভারী গরিব। খেতে পরতে পায়না। সবসময় কাঁদে।

-উঁহু! মোটেই না, বরং পুরো উল্টো।

-মানে? প্রজারা সব তবে সেই পি. টি. ক্লাসের ব্যায়ামের মত শীর্ষাসন করে নাকি ?

-ফের বাজে বকছিস? যা তোকে আর গল্পই বলবনা।

-না না মা! এই আমি মুখে আঙুল দিলুম। আর কিচ্ছুটি বলবোনা, কথা দিলাম। তুমি গল্পটা শোনাও। নইলে যে সে "আলাদা দেশটার" কথা ভেবে ভেবে আমার আর ঘুম হবেনা। কাল তবে বেলা করে উঠবো। আর ইস্কুলের দেরি হলেই তো তুমি আমায় বকবে।

- ঠিক আছে বাবা! হয়েছে। পাকাবুড়ো কোথাকারের। এবার চুপটি করে শোন।

- হুমমমম। লক্ষ্মী মা টা আমার। বলো ...

- সেই আলাদা দেশটার নাম হল মুক্তোনগর। কেন জানিস? সে দেশের আকাশে জাদুর মেঘ উড়ে বেড়ায়। যখন মেঘগুলো সব ছোট্ট শিশু থাকে, এই তোর মত পুচকে, তখন ওরা কত রকম রঙের হয়। লাল নীল হলুদ কমলা সবুজ। আর যখন ওরা হাসে তখন সারা আকাশ জুড়ে রামধনু আঁকা হয়ে যায়। আর মজার কথা কি জানিস যখন ওরা কাঁদে তখন ওদের চোখের জল মুক্তো হয়ে ঝরে। বিভিন্ন রঙের চকচকে গোলগোল উজ্জ্বল মুক্তো।

-ওরাও বুঝি কাঁদে !!!

-কাঁদবে তো বটেই। যখন দুষ্টুমি করে তোর মতো, ওদের মা বাবারা তো বকে। ওমনি ওরা মুক্তো ঝরায়।

- ওরা কী দুষ্টুমি করে? ওদের কি স্কুল আছে? না কি পার্ক আছে? না বাড়ি আছে যেখানে দুষ্টুমি করবে?

- ওদের স্কুল আছে বৈকী !! সূয্যিমামা ওদের স্কুলের হেডমাষ্টারমশাই। ভারী রাগী। তারপর চাঁদমামা আছে। সে অবশ্য একদম বকাঝকা করেনা মোট্টে।

- হি হি হি হি !

- কী হল ? হাসছিস কেন পাগল ছেলে?

- তুমি ঠিক সূয্যিমামা আর বাবা হল চাঁদমামা।

- তবে রে দুষ্টু !!! আমি রাগী? আর তোকে যে এত্ত এত্ত গল্প শোনাই তার বেলা? যা! আর গল্প বলব না।

- ও মা ! মা গো। আমি তো মজা করছিলাম। তুমি প্লিজ প্লিজ বলো বাকিটা। মেঘেদের ছানাগুলো কী করত সেটা বলো।

- হুমমম !
মেঘেদের ছানারা তো তারাদের আড়ালে সারাদিন লুকোচুরি খেলে বেড়ায়। কখনো খিলখিলিয়ে রামধনু ছড়িয়ে হাসে। কখনো আবার বকুনি খেয়ে মুক্তো ঝরায় টপাটপ। আর সেই রঙবেরঙের মুক্তোগুলো তো সব সূর্যের কিরণ আর চাঁদের আলোর সিঁড়ি বেয়ে গড়িয়ে আসে পৃথিবীর বুকে। ঠিক মুক্তোনগর দেশটার মাটিতে, আর কোত্থাও না। দেশের রাজা প্রজা সকলে সেই মুক্তো কুড়িয়ে জমা করে। তাই দিয়ে অন্য দেশের সাথে সওদা করে। দেশের সবারই অবস্থা ভাল। কারোর ঘরেই অভাব নেই।

- ব্যাস হয়ে গেল? এ কেমন গল্প! যুদ্ধ নেই, রাক্ষস নেই, পরী নেই।

- তুই শোন না আগে পুরোটা। কারোর ঘরে পয়সার আর সুখের অভাব না থাকলেও রাজামশাইয়ের মনে মোটেও সুখ ছিলনা।
রাজামশাই খালি ভাবতেন,

"মুক্তো রাজার ঘরে
মুক্তো প্রজারও ঘরে,
রাজায়-প্রজায় তফাৎটা
হবে কেমনি করে ?!"

- ইসসস কী হিংসুটে পচা রাজাটা মা।

- বটেই তো। হিংসুটে রাজামশাই আর মন্ত্রীমশাই মিলে ডেকে পাঠালেন রাজ্যের সেরা কারিগরকে। চুপিচুপি ষড়যন্ত্র হল অনেক।

-ষড়যন্... সেটা কী গো মা?

- ষড়যন্ত্র সেটা হল গিয়ে শলাপরামর্শ। এই যেমন তুই আর তোর বাবা আমায় লুকিয়ে লুকিয়ে সব দুষ্টু প্ল্যান বানাস। অনেকটা সেরকম।
তা সেই মত বুদ্ধি খাটিয়ে, কারিগর পাক্কা একমাস এগারো দিন ধরে ইয়াব্বড় একটা যন্ত্র বানাল।

- গ্যাজেট ? ডোরেমনের মত?

- সেরকমই। এই গ্যাজেটটা অনেকটা ওই তোর দমকলের খেলনা গাড়িটাতে যেমন ভাঁজ করা সিঁড়ি আছে সেরকম। সব কটা ভাঁজ খুলে দিলে আকাশছোঁয়া বিশাল লম্বা একটা আঁকশি তৈরি হয়ে যায়। আর সেই আঁকশির মাথায় একটা বড় লোহার সাঁড়াশি।

- এ আবার কেমন যন্ত্র মা? যেমন সেই আমরা গ্রামের বাড়িতে লম্বা লাঠি দিয়ে পেয়ারা পাড়ি গাছ থেকে তেমন?

- হুমমম। এই যন্ত্রটা দিয়েই তো রাজার সৈন্যরা সবাই মিলে, আকাশ থেকে ছোট্ট রঙীন সবকটা মেঘ ধরে আনল। যখন অমাবস্যার রাত্রে আকাশে চাঁদমামাও নেই, টিমটিম তারারা, মেঘেদের বাবা মায়েরা, সবাই গভীর ঘুমে, ঠিক তখনই। ধরে এনে তাদের দিল অন্ধকূপে বন্দী করে। কাকপক্ষীও টের পেলনা।

- কিন্তু কেন মা? আমার খুব কান্না পাচ্ছে যে।

- রাজা তো চায়না যে মুক্তোগুলো প্রজারা কেউ পাক। শুধু নিজের জন্যই লুকিয়ে রাখতে চায়। লোভী হিংসুটে রাজা তো। কারোর সাথে ভাগ করে নেবেনা সেই সম্পদ। দিনের পর দিন অন্ধকারে বন্দী করে রাখে মেঘবালক মেঘবালিকাদের। তাদের ভয় দেখায়, কষ্ট দেয় যাতে তারা বেশি করে কাঁদে আর মুক্তো ঝরে অনেক অনেক। কিন্তু তারা সবাই তো গুম হয়ে চুপটি করে বসে থাকে।
কথা কয় না, হাসে না, কাঁদে না।
এভাবেই দিন কাটে, মাস কাটে, বছর ঘোরে। মেঘের বাবা মায়েরা দিন রাত্রি কাঁদে। ভাবে কোথাও গেল ওদের ছানাগুলো। ওদের কান্না তো আর মুক্তো হয়না। ওরা যে বড় হয়ে ধূসর বর্ষার মেঘ হয়ে গেছে। তাই শুধু জলই ঝরে অঝোর ধারায়। মুক্তোনগরের আকাশ শুধু কালো মেঘে আচ্ছন্ন থাকে। সূর্যকিরণ চমকায় না, রাত্রে চাঁদের আলো ছড়ায়না। চারদিকে শুধু জল আর জল।
প্রজারা ভারী কষ্টে, অভাবে দিন কাটায়।

- মা আমি সকলের সাথে শেয়ার করব সবকিছু। ওই পচা রাজাটার মত কিছুতেই হব না।

- তুমি তো আমার লক্ষ্মী বাবুসোনাটা। তারপর কী হল জানিস?
একদিন এক রাখাল ছেলে রাজার কারাগারের পেছনের মাঠে বাঁশী বাজাচ্ছিল। তাই শুনে মেঘছানারা আস্তে আস্তে কয়েদঘরের স্যাঁতস্যাঁতে ঠান্ডা মেঝে থেকে ভেসে উঠল। ওপরের এক চিলতে লোহার গরাদ লাগানো জানালায় চোখ রাখল সবাই। গানের সুরে তাদের মন ভালো হয় একটু। তারা রাখালছেলেকে ডেকে বলে,

"বন্দী মোরা এই কারাতে
এবার যাবেই বুঝি প্রাণ,
রাখাল ছেলে বিদায়বেলায়
শোনাও তোমার গান।"

মেঘেদের দুঃখের কথা শুনে রাখাল ছেলে তার অন্য সব খেলুড়ে বন্ধুদের ডেকে আনল। সবাই মিলে হেসে গেয়ে মেঘেদের খুশি করার চেষ্টা করে। ওরা খুশি হলে হয়ত আবার সূর্যের আলো ছোঁবে এই মুক্তোনগরের মাটিকে।

কিন্তু সেই গানের সুর যেই না দুষ্টু রাজার কানে গেল, সে ওমনি পাঠালো তার সৈন্যদল। হুপহাপ ধুপধাপ করে সৈন্যরা এসে তো ধরতে লাগল রাখাল ছেলে আর তার বন্ধুদের। তাদের শক্ত করে দড়ি দিয়ে পিছমোড়া করে বাঁধতে লাগল। যন্ত্রণায় চীৎকার করে উঠলো অবোধ শিশুগুলো।

- মা গো ! ওদের মা কই? আমার ব্যথা লাগলে তো তুমি চুমু দিয়ে দাও, ব্যথা সেরে যায়। ওদের মা বাবারা পাজী সৈন্যগুলোকে
গুলি করে মারছে না কেন?

- ওদের মা বাবারা তো গরীব। কাজের সন্ধানে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ায় সারাদিন। তাই ওরা জানেইনা এরকম ঘটনা ঘটছে বলে। আর সৈন্যগুলো তো হুকুমের দাস রে বাবু। ঠিক তোর ওই রিমোট কন্ট্রোলওয়ালা রোবটটার মত। রিমোটটা টিপছে তো দুষ্টু রাজাই।

-তারপর কী হলো মা ?

- শিশুগুলোর আর্তনাদে মেঘের দল তো বদ্ধ গরাদের ওইপার থেকে অসহায়ের মত ছটপট করতে থাকে। বারবার মিনতি করতে থাকে সৈন্যদের কাছে, শিশুগুলোকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু কেউ সেই কাকুতি তে কর্ণপাত করে না। অসহায় মেঘের দল এবার ফুঁসতে শুরু করে। রাগে ফুলে ফুলে ওঠে ওদের ধূসর মেঘের শরীর।

- মা ওরা তো রঙীন ছিল তাই না?

- হুমমম। তাই ছিল তো, যখন ওদের বন্দী করা হয়েছিল। তারপর এইভাবে দিনের পর দিন কারারুদ্ধ হয়ে থাকতে থাকতে ওরা কবে যেন বড় হয়ে গেছে। ওদের শিশুসুলভ আনন্দ খুনশুটি সব হারিয়ে গেছে। হাসি আর কান্নার বদলে, শুধু আছে রাগ।
সেই রাগ বিদ্যুৎ হয়ে ঝিলিক দিতে থাকে ওদের শরীর জুড়ে। ওদের শরীর থেকে ছিটকে আসা তীব্র বজ্র বিদ্যুৎ টুকরো টুকরো করে দেয় কারাগারের দেওয়াল।

- মা ওরা আগে কেন তাহলে বেরিয়ে আসেনি ?

- ওরা তো ওই অন্ধকূপে বন্দী থাকতে থাকতে বুঝতেই পারেনি যে কবে বড় হয়ে গেছে। কবে ওদের এত ক্ষমতা হয়েছে।
ওদের ওই রূপ দেখে তো সৈন্যর দল ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ছুট্টে পালালো। মেঘের দল সবাই ভাঙা কারাগার থেকে বেরিয়ে গিয়ে জমা হল রাজপ্রাসাদের মাথায়। মুষলধারে নামলো বৃষ্টি। শয়তান রাজা, তার পাজী মন্ত্রী, দুষ্টু সৈন্যর দল সক্কলে সেই জলের বন্যায় ভেসে একদম দেশের বাইরে বিদেয় হল।
মেঘের ছানারা, রাখাল ছেলেমেয়েরা, সব্বাই ভারী খুশি হয়ে
তা-ধিন তা-ধিন করে নাচতে লাগল।

"রামধনু আর মুক্তো ঝরাই
আমরা মেঘের ছানা,
নাচব আজি গাইবো আজি
কেউ কোরো না মানা।"

"আমরা বাঁধি গান, আর
বাজাই মনের সুখে বাঁশি,
রাখাল শিশুর দল মোরা
ছড়াই খুশি রাশি রাশি।"

- কী সুন্দর গান ! কী সুন্দর গান !

- ওদের নাচ গান শুনে রাখাল শিশুদের মা বাবারা ছুটে এল। আর এল কারা বলতো? মেঘছানাদের মা বাবারা। তারা তো কতদিন দেখেনি তাদের ছেলেমেয়েদের। সে কী আনন্দ তাদের সব্বার। কিন্তু কেউ মোট্টেও কাঁদল না, কাঁদলেই তো বন্যা আসবে আবার।

- আর মা ওরা যে বড় হয়ে গেল, তাহলে আর মুক্তোও ঝরবেনা, রামধনুও উঠবে না যে।

- হ্যাঁ বাবুসোনা। বড় তো একদিন সবাইকে হতে হয়। তখন চারপাশটা এত রঙীন, এত সুন্দর থাকেনা। তখন শক্ত হতে হয় বুঝলি? গর্জে উঠতে হয় ওই মেঘের ছানাদের মতই। তবেই তো দুষ্টু লোকেরা বিদায় নেবে। রামধনু এমনিই উঠবে, মুক্তোও এমনি ঝরবে। মানুষ তো ধনরত্নের চেয়ে ভালবাসাই পেতে চায় বেশি।
আর রাখাল ছেলেমেয়েরা কী বললো জানিস ?

"চাই না মণি, চাই না মুক্তো
 থাকো তোমরা আকাশজুড়ে,
নাচব সবাই, গাইব সবাই
মেঘের ডানায় বেড়াবো উড়ে।"

- কী দারুণ গল্প মা। কী দারুণ। আরেকটা বলো।

- তবে রে ! এবার ঘুমো দেখি। আয় আমি গান গেয়ে ঘুম পাড়াই তোকে।

আমার কথাটি ফুরোলো/ নটে গাছটি মুড়োলো ...

---- সমাপ্ত ----

গল্প : সন্ন শঙ্খচূর্ণী

সন্ন শঙ্খচূর্ণী
সুস্মিতা কুণ্ডু

(১)

দিব্যি বেলদীঘির পাড়ের কৎবেল গাছটায় বসে, পা দোলাতে দোলাতে, একটা পচা কৎবেল ফাটিয়ে তার শাঁসটায় এট্টু কালো পাঁকের টাকনা দিয়ে জম্পেশ করে চেটেপুটে খাচ্ছিল স্বর্ণময়ী... থুক্কুড়ি... সন্ন শাঁকচুন্নি। এমন সময় ঐ বৌটি এসেই সব মজা মাটি করে দিল। ভদ্র গেরস্তঘরের বৌ-মানুষ অমন রাতদুপুরে ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করে কাঁদতে কাঁদতে ঘাটের পানে এলে, একটু কৌতুহল হয় বৈকি। যতই সে প্রেতযোনীপ্রাপ্ত হোক গে, এই ক’মাস আগেও তো সন্ন ‘স্বর্ণময়ী’-ই ছিল রে বাপু। নেহাতই বজ্জাত শাউড়ি, আর পোড়ারমুখো হারামজাদা বরটা মিলে, ঘুমের ভেতরেই ওর গায়ে হড়হড় করে কেরোসিন ঢেলে, দেশলাই কাঠি ঘষে দিল। একবার যদি টেরটি পেত সন্ন, তাহলে ওদের জারিকেন ভর্তি কেরোসিন তেল ওদেরই গায়ে ঢেলে, মুখে নুড়ো জ্বেলে দিত একেবারে। যাকগে সে সব পুরোনো দিনের কথা ভেবে কী লাভ! এমনিতেও তিনকূলে কেউ ছিলনা সন্ন-র।

পিসির বাড়ি লাথিঝ্যাঁটা খেয়ে মানুষ, তবে মুখরা ও চিরটাকালই। পিসেমশাইয়ের বাড়ি আর বন্ধকীর ব্যবসা ছিল এই গাঁয়েই। গরিব লোকেরা জমি গয়না বাড়ি বন্ধক রেখে চড়া সুদে টাকা ধার নিত। কিন্তু শেষ অব্দি শোধ করে উঠতে পারত না, আর সুদখোর পিসেমশাই সেগুলো নিজে দখল করত। সন্ন মোট্টে এই অনাচার দু’চক্ষে সহ্য করতে পারত না। তাই পা টিপে টিপে  শোবার ঘরে ঢুকে, পিসির আঁচল থেকে চুপিচুপি লোহার সিন্দুকের চাবিটা খুলে, সিন্দুক থেকে বন্ধকী দলিল গয়নাগাঁটি বার করে আনত। দুর্ভাগা লোকগুলোকে যখন ওগুলো গিয়ে দিয়ে আসত ভোররাত্রে, ওদের তখন ভূত দেখার মত অবস্থা হ’ত।
 -“তোমাদের সম্পত্তি ফেরৎ দিয়ে গেলুম গোওওও... হরিপদ শকুনির নজর থেকে বাঁচ্চে রেখোওওও।”
বলেই পেছন ফিরে ছুট লাগাত স্বর্ণ, শাড়িটা গাছকোমর করে বেঁধে। এই বেলদীঘিটার পাড় ধরেই ছুটতো পিসির ঘরের দিকে, যেখানে চ্যালাকাঠটা ওর অপেক্ষায় রয়েছে। তা সত্ত্বেও স্বর্ণ এ কাজ করত, পেছনে ফেলে আসা ওই হতভম্ব মুখগুলোয় শান্তির হাসি দেখার জন্যই করত।

বাড়ি ঢুকে দোর দিয়ে পিসির আঁচলে চাবি ফেরত দিয়ে, ভাঁড়ারঘরের মেঝেয় কাঁথাটা বিছিয়ে চুপটি করে শুয়ে পড়ত। খানিক পরে কমলাবালা মানে পিসির হাঁকডাকে ঘুম ভাঙত।
-“ওরে ও হতচ্ছাড়ি স্বর্ণ! ফের চুরি করলি, ফের! যে থালায় খাচ্চিস তাতেই ছিদ্দর করচিস? বলি, আমার দাদাটাকে তো খেলি! নিজের মা’টাকেও ছাড়লিনি রাক্কুসি, এবার কি আমাদের পালা?”
এরপর কথা বলত পিসের হাত আর উনুনের চ্যালাকাঠ। তা এমন লক্ষ্মীছাড়ি বোঝাকে, কে কতদিন ঘাড়ে নিয়ে বসে থাকবে। পিসি-পিসেও তাই গ্রামেরই আরেক অকালকুষ্মাণ্ড দোজবরে রতন মুদির সাথে বে’ দিয়ে দায় সেরে দিল।

তা প্রথম ক’দিন স্বামীর ঘরে ভালোই কেটেছিল স্বর্ণময়ীর। কিন্তু আস্তে আস্তে সকলের রূপ প্রকাশ পেতে লাগল। মুদির দোকানের চালে কাঁকর, ডালে পাথর, সর্ষের তেলে রেডির তেল, গাওয়া ঘি-তে দালদা, এইসব ভেজালের কারবার দেখে স্বর্ণ তো থ’। বারবার বারণ করতে থাকে রতনকে। রতনের তাতে কচুটা, উল্টে শাউড়ি কথা শোনায়,
-“এই যে লতুন বৌ। বেশি বড় বড় কতা কউনি। ব্যবসার তুমি কি বুজবে শুনি মেয়েছেলে হয়ে। ওসব একটু না মেশালে পরে ঘরে লক্ষ্মীর মুখ দেখব কী করে শুনি? তোমার পিসি-পিসে তো দু’গাছা চুড়ি, সরু হার দিয়েই কাজ সারল।
তুমি বরং নাতির মুখ দেকাও দেকি। আগের বৌটা ত আটকুঁড়িই ম’ল।”

ভেতরে ফুঁসলেও নতুন বৌ, তাই লজ্জায় চুপই ছিল। চিত্তির হ’ল সেদিন যেদিন বাচ্চাদের বেবিফুডের টিনে ভেজাল মেশাতে শুরু করল। এমনিতেই গাঁয়ের দিকে বেবিফুডের বিক্রি কম, তাই চড়া দামে বিক্রি করত রতন। গাঁয়ের লোকের দামী খাওয়ার কেনার সামর্থ্য কম তাই গোটা প্যাকেট না বিক্রি করে রতন প্যাকেট কেটে খুচরো গুঁড়ো দুধ, ইনস্ট্যান্ট ফুড, হেলথ ড্রিঙ্ক বানানোর গুঁড়ো, এসব পলিপ্যাকে মুড়ে বেচত। আর গ্রামের লোকের সাধ্য না থাকলেও সাধ যেত ছেলেপিলেকে ওই টিভি তে দেখানো রঙিন বিজ্ঞাপনের পুষ্টিকর জিনিস খাওয়াতে। বেশি লাভের জন্য ওগুলোয় কাঠের গুঁড়ো, ময়দা, যা নয় তাই মেশাতে শুরু করে দেয় রতন আর রতনের মা। একদিন জোর গলায় প্রতিবাদ করে স্বর্ণ। হুমকি দিয়ে বলে,
-“ফের যদি এমনটা করেচো, পুলিশে খবর দেব সদরে গিয়ে।”

সেদিন রাত্রেই ওই দুই পিশাচ মিলে...

যাকগে সেসব কথা, আজ স্বর্ণ নিজেই পিশাচ হয়ে গেছে... সন্ন শাঁকচুন্নি।

কিন্তু এই বৌটার আবার হ’লটা কী! রোজই ঘাটে বাসনের পাঁজা নিয়ে আসে, নাইতে আসে, কাপড় কাচতে আসে। ভারী মিষ্টিপানা মুখটা। সদ্য সদ্য বিয়ে হয়েছে বুঝি। প্রথমদিকে দিব্যি গুণ গুণ করে গান গাইতে গাইতে ছাই দিয়ে বাসন ঘষত। যত দিন গেল মেয়েটার গলা থেকে যেন গান উবে যেতে লাগল। গত ক’দিন ধরেই সন্ন দেখছে, মেয়েটার চোখদুটো যেন লাল লাল ভিজে ভিজে। নিজে ভুক্তভোগী তো তাই বিলক্ষণ এসব লক্ষণ চেনে সন্ন। নির্ঘাৎ শ্বশুরবাড়িরতে সুখে নেই বৌটা। আহা রে মারধোরও করে বোধ হয়।

-“কিন্তু ও কী! ও কী! ও কাঁখের কলসিটায় অমন পেঁচিয়ে দড়ি বাঁধছে কেন রে বাবা! হায় রে কপাল, দড়ির আরেকটা দিক যে নিজের গলায় জড়াচ্ছে!! মরণদশা! এ হতভাগী যে সুসাইড করছে লো!”
আর নিজেকে আটকাতে পারল না সন্ন। সটান গাছ থেকে কালো কালো কংকালসার পা দুটো সোজা ঘাটের চাতালে বাড়িয়ে দিল। তারপর বডিটাও সড়াৎ করে টেনে পায়ের ওপর দাঁড় করিয়ে দিল। রাতদুপুরে আত্মহত্যা করতে আসা বৌটার সামনে একটা ইলাস্টিকের মত কালো কংকাল, তাতে আবার লাল পাড় সাদা কাপড় জড়ানো, আকাশ থেকে এসে দাঁড়ালো। তারপর নাকিসুরে বলে উঠল,
-“ওঁ কীঁ লাঁ মুঁখপুঁড়ী! অঁমনধাঁরা মঁরার শঁখ কেঁন হঁল শুঁনি? বেঁশ তোঁ গাঁন গেঁয়ে সুঁখে ছিঁলি।”

এরপর বলাই বাহুল্য, কী ঘটল।
জলে ঝাঁপ মারার আগেই মুচ্ছো গেল মেয়েটি। সন্ন তো পড়ল মহা ফাঁপরে। এবার কী করে, মেয়েটা যদি মরে যায়, কিংবা জ্ঞান ফিরলে যদি ফের মরতে যায়। অসহায় মানুষ দেখলেই মনটা বড় কেমন করে সন্নর। সেই ছোটোবেলা থেকে শুরু করে বড়বেলা অব্দি, এমন কী মরার পর এই ভূতবেলাতেও অভ্যেস বদলাতে পারল না।

(২)

সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে সন্ন-র কংকাল খুলিতে একটা বুদ্ধি খেলে গেল। সুড়ুৎ করে ওর নিজের দেহটাকে ধোঁয়ার মত বানিয়ে নিয়ে, সেঁধিয়ে গেল বৌটার শরীরের ভেতর। বৌটার ভেতরে সেঁধোতেই একটু একটু করে সব পরিষ্কার হতে লাগল। মেয়েটার সব স্মৃতি ওরও মাথায় ভর্তি হতে থাকল।
-“ও হরি! এ যে নবা-র বৌ।”
এই যাহ্, উত্তেজনার চোটে যে নামটা ধরতে নেই সেই নামটা বলে ফেলেছে। অবিশ্যি মানুষের দেহে ঢোকার পর ও নাম ধরলে কোনও ক্ষতি নেই। সন্নর এই প্রথম অভিজ্ঞতা মানুষের ভেতর ঢোকার। এদ্দিন শুধু শুনেই এসেছে, কী হয় না হয়।
যাকগে আস্তে আস্তে সব সয়ে যাবেখ’ন। এই যে এতদিন ভেসে ভেসে বেড়ানোর পর নিজের পায়ে দাঁড়াল, এটাই তো ভারী অদ্ভুত লাগছে। কেমন যেন ছোট্ট বাচ্চা যখন প্রথম টলমল পায়ে হাঁটতে শেখে অনেকটা সেরকম।

তা নবা মানে নবকুমার, সন্নর পিসতুতো ভাই, সে আবার কবে বে’ করল? অবশ্য মরার পর থেকে এই শাঁকচুন্নির গতি প্রাপ্তি অব্দি বেশ কিছুটা সময় সন্নর বিশেষ মনে নেই। কেমন যেন একটা আলো আঁধারির মত ওই সময়টা, ছায়াহীণ কায়াহীণ সূক্ষ্ম একটা অস্তিত্ব হয়ে আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে ছিল। তারপর ধীরে ধীরে একটু একটু করে জমাট বেঁধে বেঁধে এই ভৌতিক দেহধারণ করল। আশ্রয় নিল বেলদীঘির পাড়ে এই কৎবেলটার গাছে। দু’চারটে মামদো পেত্নী ইয়ার দোস্ত হয়েছে বটে, সব-ই ওই অপঘাতে মৃত্যু। একজন বেম্মদত্যি গুরুদেবও জুটেছেন। ইস্কুলের মাঠের গায়ে যে বেলগাছটা আছেন সেখানে থাকেন, ফি গুরুবারে সন্নর মত সদ্য জন্মানো ভূতেদের, ভূতসমাজের নিয়মকানুনের পাঠ দেন। তবে সন্ন বেঁচে থাকতেই ইস্কুলের ছায়া মাড়ায়নি, মরে আর কী বিদ্যে শিখতে যাবে শুনি। কিন্তু এখন মনে হচ্চে বেম্মগুরুর ক্লাসগুলো করলে হ’ত মন দিয়ে। মানুষের দেহে ঢোকার সুবিধে অসুবিধেগুলো জানা থাকত। মরুক গে! আর ভেবে কী লাভ।

তা নবা মনে হয় ওই সময়েই বে’ করেছে যখন সন্ন ত্রিশঙ্কু অবস্থায় ছিল। সন্নও আর মরে ইস্তক পিসির বাড়ির দিকে যায়নি যে জানতে পারবে। বৌটা ঘাটে আসে তাই চোখে পড়ে এই আর কী।
নতুন শরীরে গুটিগুটি পায়ে বৌটার শ্বশুরঘর মানে পিসির ঘরের দিকে রওনা দেয়। কলসীটার গলা থেকে দড়িটা খুলে ফেলে দিয়ে, জল ভরে কাঁখে চাপিয়ে নেয়। গুটিগুটি করে পূবের আকাশটাও ফরসা হয়ে এসেছে।

বহুদিন পর পিসির ঘরে পা রেখে মনটা কেমন আনচান করে সন্নর। এদিক ওদিক দাওয়া, উনুন, ধানের মরাই, তুলসীতলা, সবকিছুর দিকে চেয়ে চেয়ে দেখে। এমন সময় দুম করে পিঠে একটা জোরদার মুড়ো ঝাঁটার বাড়ি পড়ে, আর চেনা গলায় চিল চিৎকার,
-“পোড়ারমুখী রাতদুপুরে ফের ঘুরে এ বাড়িতে ঢুকলি কেন হতচ্ছাড়ি। তোকে বলেছি না, বাপের ঘর থেকে পণের বাকি এক লাখ টাকাটা আনতে না পারলে আর এ বাড়ির ছায়া মাড়াবিনে!”
দুয়ারে সকালে ঝাঁট দিতে বেরিয়েছিল পিসি মনে হয়, তখনই এই বৌ-এর বেশে সন্ন চোখে পড়ে যায়।

এক পলকের জন্য সন্নর মনে হয়েছিল পিসি বুঝি সেই ছেলেবেলার স্বর্ণকেই বকছে, তারপর বুঝলো এ বাক্যবাণ গরিব বেয়াইয়ের মেয়েটার উদ্দেশ্যে। মাথাটায় আগুন জ্বলে উঠল সন্নর, গোটা গা জ্বলতে লাগল ঠিক সেই দিনটার মত যেদিন রতন মুদি আর তার মা ওকে জ্বালিয়েছিল। শরীরটাকে শক্ত রেখে শুধু ঘাড়টা পেছনদিকে ঘুরিয়ে, চোখের মণিটাকে লাল করে ঘড়ঘড়ে বিকৃত গলায় বলে উঠল,
-“ফেঁর যঁদি আঁমার গাঁয়ে ঝ্যাঁটা ছুঁইয়েছিঁস, তোঁকেই জ্যাঁন্ত উঁনুনে গুঁজে দেঁব।”

পিসির মুখটা বিশাল একটা হাঁ হয়ে আটকেই রয়ে গেল, হাতের ঝাঁটাটা শুধু ঠক করে মাটিতে পড়ে গেল। কোনওমতে পড়ি কি মরি করে পিসি চিৎকার করে দৌড় লাগালো উঠোনের দরজার দিকে। শুধু শোনা গেল,
-“ভ্ ভ্ ভ্ ভূউউউউত! বাঁচাওওও...”
মনে মনে একচোট হেসে নিয়ে, উল্টো পায়ের পাতা ফেলে গটগট করে হেঁটে পিসি-পিসের শোবার ঘরে গিয়ে ঢুকলো।
মাথা না ঘুরিয়েও দিব্যি বুঝতে পারছিল সন্ন, উঠোনের দরজার ওপার থেকে উঁকি দিয়ে বিস্ফারিত চোখে পিসি ওর হাঁটা দেখে ফের দৌড় মারল।
ঘরে ঢুকে দেখে, আজও সেই লোহার সিন্দুকটা পেটে কত লোকের কান্না জমিয়ে গ্যাঁট হয়ে বসে রয়েছে। এক ঝটকায় লোহার দরজাটা উপড়ে আনল সন্ন, পিসির আঁচল থেকে চাবি চুরির আর ওর প্রয়োজন নেই। সবক’টা দলিল গয়নাগাঁটি বার করে এনে একটা গামছায় পুঁটুলি করে বেঁধে রাখল।

দেহধারণের পর বেশ খিদে খিদে পাচ্ছে সন্নর। রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল। বাহ্ কত্ত কী তরকারি রান্না। সবই এই বৌটাই রেঁধেছে, যার দেহে এখন সন্ন বাসা নিয়েছে। মোচার ঘন্ট, কাতলা মাছের কালিয়া, সোনামুগের ডাল...
খাওয়ারগুলোর গন্ধে গা গুলিয়ে উঠল সন্নর। মানুষের দেহ ধারণ করলেও ভৌতিক অভ্যেসগুলো এত সহজে যায় নাকি। একটা কাঁসীতে পচা পান্তা খানিকটা পড়েছিল, ফেলে দেওয়ার জন্য নাকি ওই বৌটার রাতে খাওয়ার জন্যই রাখা ছিল কেজানে। আহা! বেশ টক টক গন্ধ বেরিয়েছে। ঐটেই গপগপ করে খেয়ে নিল ও। তারপর ফের পিসি পিসের ঘরের পালঙ্কতে গিয়ে গ্যাঁট হয়ে বসে রইল।

পিসে আর নবা দুজনের কেউই বাড়িতে নেই। পিসের বন্ধকী কারবারের সেরেস্তাতেই পড়ে রয়েছে, অনেক বড় দাঁও মেরেছে ফের মনে হয় কাউকে ঠকিয়ে। এইরকম দিনগুলোয় সারারাত হিসেব পত্তর চলে বাপব্যাটায়। পিসি মনে হয় হাঁউমাঁউ করে সেখানেই ছুটেছে। পালঙ্কে শুয়ে শুয়ে পুরনো দিনগুলোর কথা ভাবছিল সন্ন। বাপটা চলে গেল গাড়িচাপা পড়ে, শহরে রোজগারের ধান্দায় গিয়ে। মা-টা পাগল হয়ে গেল, তারপর একদিন হারিয়ে গেল। এর দোর তার দোর, এই মাসির বাড়ি, ওই কাকার বাড়ি ঘুরে, সন্নর ঠাঁই হ’ল শেষে পিসির বাড়িতে। সারাদিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খাটত মেয়েটা তবুও নেকনজরে এলনা পিসির। তার ওপর মেয়ের আবার পরোপকারের ব্যামো। চ্যালাকাঠ ছাড়া আর কিই বা ছিল ওর কপালে। তারপর ঠাঁই হ’ল রতন মুদির সংসারে। সেখানেও একই দশা, শেষমেষ প্রাণটাই খুইয়ে বসল। স্বর্ণময়ী থেকে স্বর্ণ হয়ে এখন হল গিয়ে সন্ন শাঁকচুন্নি। হায় রে পোড়া কপাল!

(৩)

সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল সন্ন, এমন সময় বাইরে একটা বিশাল শোরগোল উপস্থিত হ’ল।

-“ওগো শুনচো!!  সব্বনাশ হলো গো! তকন থেকে বলচি আমি মিচে কথা কইনি রে বাপু! তা বাপ ব্যাটায় মানলে তো!”

-“এই ভোররাত্তিরে হিসেবপাতি সেরে একটু গড়াচ্চিলুম সেরেস্তায় তা না কী যে সব পাগলের মত বকবক করে টেনে নিয়ে এলে! কোতায় তোমার ভূত নবার মা, অ্যাঁ?”

-“মায়ের কতা বিশ্বেস করাই ভুল। দেকলে তো বাবা? আগেই বলেছিলুম, কী দেকতে কী দেকেচে, কী শুনতে কী শুনেচে মা!
কতবার বলি এত ভোরে উঠুনি। যা লাগবে কাজ সব বৌমাকে বোলো।”

-“তুই থাম নবা! তোর বৌ কে যে কাল বাপের বাড়ি পাটালি পয়সা আনতে, ভুলে গেচিস? সে আবাগীর ওপরেই ভূতে ভর করেচে। আর মরণদশা, এ বাড়িতেই এসে ঢুকেচে সে ডাইনি।”

-“উফ তোরা মা ব্যাটা থামবি? কোতায় তোমার ভূত?”

-“ওই তো শোবার ঘরে। ওগো তুমি যেউনি ওঘরে। মধু গুণীনকে আগে খবরটা পাটালে হতুনি?”

শোরগোলটা দরজার বাইরে এসে দাঁড়ালো, সন্নও রেডি। দরজা খুললো পিসে, পেছনে নবা, আরও পেছনে পিসির মুণ্ডুখানা উঁকি দিচ্ছে। সাথে আরও দু’চারটে কৌতুহলী মাথা, যারা ভোরবেলায় প্রাতঃকৃত্য সারতে বেরিয়েছিল, রহস্যের গন্ধ পেয়ে নাক গলিয়েছে। চৌকাঠ ডিঙ্গোতে গিয়েই একলাফে তিন হাত পিছিয়ে গেল পিসে। নবা বাপকে টপকে ভেতরে যেতে গিয়ে, ‘আইব্বাপ’ বলে পেছন ফিরে লাফ মারল। নাহ্ তেমন কিছু করেনি সন্ন, ওই শরীরটাকে মানে নবার বৌ এর শরীরটাকে মাটি থেকে তিনফুট ওপরে শূন্যে ভাসিয়ে রেখেছিল, এই আর কী। তাই দেখে তো নবার আর পিসের ভীর্মি খাওয়ার জোগাড়। কোনওমতে দরজাটায় খিল টেনে দিয়ে তিনমূর্তিতে ছুটল মধু গুণীনের বাড়ির দিকে।

আর ওদিকে ঐ কৌতুহলী লোকগুলোর কল্যাণে গোটা গ্রামময় রাষ্ট্র হয়ে গেল হরিপদ মহাজনের ব্যাটার বৌকে ভূতে পেয়েছে।
পাড়ার পর পাড়া উজিয়ে লোক আসতে শুরু করল ভূত-গুণীনের লড়াই দেখবে বলে। সন্ন মনে মনে যে একটু ভয় পায়নি তা নয়, এই প্রথমবার গুণীনের সামনাসামনি হবে, একটু তো বুক ঢিপঢিপ করবেই। তার চেয়েও বড় কথা, এই অভাগী বেচারা বৌটার ওপর ভারী অত্যাচার করবে, ঝাঁটা আগুন সর্ষেপোড়া আরও কত কী!
এমন কিছু করতে হবে যাতে বৌটা শান্তিতে বাঁচতে পারে, ফের মাঝরাতে গলায় দড়ি দিতে না ছোটে।

যথাসময় পিসি পিসে আর নবা তিনজন মিলে মধু গুণীন আর তার খান দুই চ্যালাসহ এসে হাজির। ঘরে বসে সন্ন সব শুনতে পাচ্ছিল। মধু হাঁকলো,
-“কিস্যু চিন্তা করবেননে মা ঠাইরেন। এই মদু গুণীন এসে পড়েচে। ভূত পেত্নী মামদো শাঁকচুন্নি বেম্মদত্যি সব ডরায় আমায়। এমন মন্তর পড়ব, এমন ঝ্যাঁটাপেটা করব, যে পালাতে পথ পাবেনে শাঁকচুন্নির ভূতও।
কই রে নেপো, কই রে হেদো... শিগ্গির মন্তরপড়া জলটা বাড়ির চারদিকে ঝারা দিয়ে ছড়িয়ে আয় দিকিনি। আগে ঘর বন্ধন করি তারপর ধরব ভূতের ঝি-কে।”

সবাই বড়বড় চোখ করে বায়োস্কোপ দেখার মত চেয়ে রয়েছে, কী হয় কী হয়। মধুর চ্যালারা ঘরের দরজাটা হাট করে খুলে দিয়ে পিছিয়ে এলো। সামনে হোমকুণ্ডের মত আগুন জ্বেলে তাতে মুঠো মুঠো সর্ষে ছুঁড়তে ছুঁড়তে মধু মন্তর পড়তে লাগল,

“মামদো পেত্নী বেম্মদত্যি
শাঁকচুন্নির বংশ
ডিড্ডিমাডিং মন্ত্র ফুঁকে
করব তোদের ধ্বংস।”

সেই সাথে হাঁকডাকও শুরু করল,
-“বেরিয়ে আয় বলচি! ভদ্দরঘরের বৌ ঝি-দের ঘাড়ে ভর করেচিস, এত সাহস তোর? জানিসনে এটা মদু গুণীনের এলাকা? আজ তোকে যমের বাড়ি পাঠাবো শাঁকচুন্নি।”

সন্ন ফিক করে হেসে ফেলে, ভাবে,
-“মরা লোককে যমের বাড়ি পাঠায় যে গুণীন তার সাথে মোলাকাতটা সেরেই আসি।”

ধীরে ধীরে এক গলা ঘোমটা টেনে বেরিয়ে আসে নবার বৌ, হরিপদ মহাজনের বৌমা। দাওয়াতে জমা ভীড়টা এক দু’পা পিছিয়ে যায়। সামনে রুগী পেয়ে মধু গুণীন উচ্চৈঃস্বরে ফের অং বং চং মন্ত্র শুরু করল সেই সাথে তাণ্ডবনৃত্য। সন্ন ঘোমটার ভেতর দিয়ে দেখে আর মিটিমিটি হাসে। গুণীন ঝ্যাঁটার বাড়ি মারে আর চ্যাঁচায়,

-“বল তুই কে? কেন ধরেচিস এই ভালোমানুষের বৌটাকে?”

সন্ন খলখল করে হেসে, বিকৃত গলার স্বরে বলে,

-“ভাঁলোমাঁনুষ? কেঁ ওঁই নঁবা? পিঁসি পিঁসে যঁকন আঁমায় মাঁরত, চ্যাঁলাকাঁঠটা ওঁই হঁতভাঁগাই তোঁ এঁগিয়ে দিঁত। এঁবার ওঁর বৌঁকে বাঁগে পেঁইচি। রঁক্ত খাঁব সঁবার আঁমি।”

একথা শোনামাত্র কমলাবালা, হরিপদর কানের কাছে আর্তনাদ করে উঠল,
-“এ যে আমাদের স্বর্ন পোড়ারমুখী গোওওও! এ আমাদের কী বেপদ ঘটল গো!”

মধু গুণীন ফের বলে,
-“অ তুই তবে এবাড়িরই মেয়ে। যে বাড়িতে খেলি পরলি তাদের সব্বনাশ করতে এয়েচিস? বেরো বেরো বলচি বৌমার দ্যাহ থেকেন।”

সন্ন ঘোমটার তলা দিয়ে চেয়ে দেখে ভিড়ের মধ্যে দু’জোড়া চোখ  আতঙ্কে চেয়ে রয়েছে ওর দিকে। সন্নর জীবদ্দশার বর রতন মুদি আর শাউড়ি। মনে মনে সঙ্গে সঙ্গে একটা বুদ্ধি ঠাউরালো সন্ন। বলে উঠল,

-“হিঁ হিঁ হিঁ হিঁ! সঁব্বনাঁশ তোঁ আঁমার কঁরেচে, সাঁরা গাঁয়ের লোঁকের কঁরেচে, এঁই হঁরিপদ মঁহাজন। আঁর ওঁই যেঁ দাঁইড়ে রঁয়েচে রঁতন মুঁদি আঁর ওঁর মাঁ, আঁমার বঁর আঁর শাঁউড়ি। আঁমায় ওঁদের খঁপ্পরে বেঁসজ্জন দিঁল পিঁসি পিঁসে। বাঁচ্চাদের খাঁবারে ভেঁজাল দিঁতে বাঁরণ কঁরেছিঁলুম বঁলে ওঁই দুঁই শঁয়তান আঁমায় পুঁড়িয়ে মাঁরল।”

সব লোক ঘুরে তাকাল ভিড়ের মধ্যের রতন মুদি আর তার মায়ের দিকে। মধু গুণীনও খানিক থমকে গেল। রতন মুদির দোকানের বাচ্চাদের দুধ তো মধুও নিজের তিন বছরের বাচ্চাটাকে কিনে খাইয়েছে। সামনে দাঁড়ানো শাঁকচুন্নি ভর করা বৌটাকে মারতে কেমন যেন হাত কাঁপল। এই ভূত তাড়ানোর ব্যবসা ছেড়েই দিয়েছিল কবে, নেহাতই হরিপদ মহাজনের কাছে জমিটা বন্ধক আছে তাই ওর ডাকে আসতে হ’ল। একটুখানি কমণ্ডুল থেকে জল সামনের আগুনে ঢেলে তাতটা একটু কমিয়ে দিল।

-“তা তুই এই বৌটাকে ধরলি কেন? ওর কী দোষ?”

-“ওঁর দোঁষ হঁল ওঁ আঁমার মঁত হঁতভাগী। আঁমার পিঁসি পিঁসে ভাঁই মিঁলে ওঁকে পঁণের টাঁকার জঁন্য এঁমন জ্বাঁলাতন কঁরেচে যেঁ আঁজ গঁলায় দঁড়ি দিঁতে গেঁসল। আঁমিই ওঁর ভেঁতর ঢুঁকে ওঁকে বাঁচালুম। নঁইলে আঁমার পাঁশের ডাঁলেই এঁতক্ষণে ঠ্যাঁং দোঁলাত।”

গুণগুণ শব্দ ওঠে ভিড়ের মধ্যে। হরিপদ কমলাবালা আর নবার মনে ভূতের ভয়ের চেয়ে পুলিশের ভয় জাঁকিয়ে বসেছে। রতন আর তার মা ধীরে ধীরে পেছু হঠতে শুরু করেছে।

-“এখন কী চাস তুই তবে?”
-“রঁতন আঁর তাঁর মাঁকে পুঁলিশে দেঁওয়ার ব্যঁবস্থা কঁরুক, ঐঁ হঁরিপদ মঁহাজন। এঁই গাঁমছায় বাঁধা সঁব বঁন্ধকীর জিঁনিস বিঁলিয়ে দিঁক। তঁবেই আঁমি যাঁব, নঁইলে এঁই বৌঁটা মঁরবে আঁর তাঁর দাঁয়ে পুঁলিশ ধঁরবে কঁমলাবাঁলাদেঁর।”

জমিটা বাঁচল, চওড়া হাসি খেলে গেল মধু গুণীনের মুখে। কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে চাইল ঘোমটার আড়ালের চোখদুটোর দিকে। ভাগ্যিস বেশি মারধোর করেনি বেচারা মেয়েটাকে। গ্রামের লোকগুলোর চোখ থেকেও ভূতের ভয়টা মিলিয়ে গিয়ে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ল।

(৪)

তারপর আর কী? সন্ন এই গ্রামেই থাকে, বেলদীঘির পাড়ের কৎবেল গাছটায়। মাঝে মাঝে শহরের জেলে গিয়ে রতন আর রতনের মায়ের বেহাল দশা দেখে আসে। গাঁয়ের মেয়ে বৌরা ঘাটে বসে কত গপ্পো করে, সে সব শোনে ঠ্যাং দোলাতে দোলাতে। নবার বৌ রোজ ভোরে আসে, পান্তা আর শুঁটকি মাছের ঝাল নিয়ে। সন্নদিদিকে শোনায় হরিপদ আর কমলাবালা কেমন ভালোমানুষ হয়ে গেছে, নবা কত খেয়াল রাখে ওর।
মধু গুণীনের বৌটাও একদিন এসেছিল কোলের ছেলেটাকে নিয়ে, সন্নর আশীর্বাদ নিতে। সন্ন মনে মনে ভাবে, শাঁকচুন্নিরও এত ভাগ্য!

(সমাপ্ত)

(পরবাস ওয়েব-ম্যাগাজিনে প্রকাশিত)